📄 তিন বেলা খাবারগ্রহণ
চার্লস পেরি অনুদিত ১৩শ শতাব্দির নামবিহীন এক আন্দালুসীয় রান্না বিষয়ক গ্রন্থের কিছু অংশ।
**সূচনা: বাঁধাকপির সাথে মাংসের স্যুপ**
মাংস নেন এবং সেটাকে যতটা সম্ভব সুন্দরভাবে কেটে নেন। আপনার সাধ্য মতো টাটকা পনির নেন, এটাকে কাটুন এবং এর উপর ধনেপাতার সাথে থেতলানো পিঁয়াজ নিক্ষেপ করুন। বাঁধাকপির সাথে সংযুক্ত চোখের মতো অংশটি নেন, সেদ্ধ করুন, এরপর মসলা বাটার কাঠের যন্ত্রে সবকিছু গুঁড়ো করুন এবং একবার কিংবা দু'বার সেদ্ধ করার পর সেগুলো একটি পাত্রে ঢালুন। কিছু মুরী (এক প্রকার চাটনি), সামান্য ভিনেগার এবং কিছু মরিচ ও কেওড়া মিশ্রিত করুন। মাখা ময়দার দলা অথবা লবণমিশ্রিত মাখা ময়দার দলা এবং ডিম দিয়ে পাত্রের উপাদানগুলো ঢেকে দেন।
**খাবারের প্রধান অংশ: টাটকা পনিরের সাথে মিরকাস**
কিছু মাংস নেন, পূর্বের বর্ণনা মোতাবেক সতর্কতার সাথে কাটুন। এদিক ওদিকে ছড়াবে না, খুব নরম নয়, এমন কিছু টাটকা পনির নেন এবং ছোট ছোট করে কাটা মাংসের অর্ধেক কেটে মাংসের সাথে মেশান এবং কয়েকটা ডিম যোগ করুন। এরসাথে মরিচ, লবঙ্গ এবং শুকনো ধনেপাতা মেশান। এগুলোর উপর কিছু পরিমাণ পুদিনা ও ধনেপাতার রস ঢালুন। মাখতে থাকুন যাতে করে মাংসের ভেতরের অংশ তথা মাংসের আঁশের সাথে আটকানো উপাদানের সাথে মসলাগুলো ঠেসে যায়। এরপর তেলে ভাজুন। ভাজা শেষে সস বা চাটনি দিয়ে কিংবা আপনার ইচ্ছে মতো খেতে থাকুন।
**খাবারের প্রধান অংশ: তাজিনে পাকানো রোস্ট**
কম বয়সী হৃষ্টপুষ্ট বকরীর পুরো একটি অংশ নেন এবং সেটাকে একটি বড় তাজিনে (ঢাকনাযুক্ত রান্নার মাটির পাত্র, যা উত্তর আফ্রিকায় এখনো ব্যবহৃত হয়) স্থাপন করুন। এটা চুল্লিতে রাখুন এবং যতক্ষণ না বাদামী বর্ণ ধারণ করছে, ততক্ষণ এটা সেখানে রেখে দেন। এটা নামিয়ে নেন, উল্টে দেন এবং দ্বিতীয়বারের জন্য চুল্লিতে রাখুন, যতক্ষণ না উভয় অংশ বাদামী বর্ণ ধারণ করছে। এরপর এটা নামিয়ে নেন এবং এতে লবণ, গোল মরিচ ও দারুচিনি ছিটিয়ে দেন। এটা খুবই স্বাস্থ্যকর ও উল্লেখ করার মতো একটি রোস্ট। কেননা চর্বি ও আর্দ্রতা পাত্রেই থেকে যায় এবং আগুনে মাংসের কিছুই নষ্ট হয় না, যেমনটি শিক কিংবা তাননুর (মাটির চুল্লিতে) পাকানো রোস্টে হয়ে থাকে।
**খাবারের প্রধান অংশ: মাছের সারিদ**
একটি বড় মাছ টুকরো টুকরো করুন, ডিমের সাদা অংশ, মরিচ, দারুচিনি, দরকারি সব ধরনের মসলা এবং সামান্য কিছু গাঁজানো খামির মেশান। ভালোমতো মিশ্রিত হওয়া পর্যন্ত মাখাতে থাকুন। একটি পাত্র নেন এবং তাতে এক চামচ ভিনেগার, দু' চামচ ধনিয়ার রস, দেড় চামচ পিঁয়াজের রস, এক চামচ মুরী নাক্বী (গমের ময়দা), মসলা, স্বাদ বাড়ানোর মসলা, পাইন বাদাম, ছয় চামচ তেল, প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি ও লবণ যোগ করে মোটামুটি উত্তাপের আগুনে রাখুন। এগুলো যখন কিছু সময় ধরে সেদ্ধ হবে, তখন টুকরো টুকরো করা মাছগুলোকে মাছের আকৃতিতে রেখে তার ভেতরে একটি বা দুটো সেদ্ধ ডিম প্রবেশ করান। সেদ্ধ হতে থাকা ঝোলের মাঝে সতর্কতার সাথে এগুলো ছেড়ে দেন। বাদবাকি অংশকে বড় মাংসল বলের মতো করে কাটুন এবং এগুলোর সাথে সেদ্ধ ডিমের কুসুম লেপ্টে দেন। পাত্রের সবকিছু ভালোমতো পাকাতে থাকুন এবং পাকানো শেষ হলে মাছ ও মাছের সাথে লেপ্টে থাকা কুসুমের অংশগুলো
তুলে নেন। এরপর এগুলো তেলে ভাজুন, যতক্ষণ না বাদামী বর্ণ ধারণ করছে। অতঃপর পাত্রের উপদানগুলোর সাথে ছয়টি ডিম, থেতলানো কাজুবাদাম, পাউরুটির ভেতরের অংশ এবং কুসুম রেখে দেন।
**খাবারের প্রধান অংশ: মুরগির রোস্ট**
কম বয়সী মোটাতাজা কয়েকটি মুরগি নেন, পরিষ্কার করে সেগুলো পানি, লবণ ও মসলাসহ সেদ্ধ করুন। এরপর এগুলো পাত্র থেকে নামিয়ে নেন এবং মাংসের চর্বিসহ একটি থালাতে ঝোল ঢালুন এবং কয়লাতে রোস্ট করার ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, সেগুলো এর সাথে মেশান। সেদ্ধ মুরগির মাংসের সাথে সেগুলো মাখাতে থাকুন এবং এরপর মাংসের অংশগুলো শিকে স্থাপন করে মাঝারি উত্তাপের আগুনে রেখে বারবার এদিক ওদিক নাড়াতে থাকুন, যতক্ষণ না বাদামী বর্ণ ধারণ করছে। এরপর অবশিষ্ট থাকা ঝোল ছিটিয়ে দেন এবং পরিবেশন করুন। এটা পশুর মাংস থেকে সুস্বাদু। অন্যান্য পাখির রোস্টও একই পদ্ধতিতে রান্না করা যাবে।
**মিষ্টি: আল-আমীরের সারদা**
সাদা ময়দাকে পানি, সামান্য তেল এবং গাঁজানো খামির দ্বারা ভালোমতো দলা পাকান এবং চারটি চিকন রাগিফাতুন (এক ধরনের রুটি - পিঠার চেয়ে পাতলা করে বেলে চ্যাপ্টা করা, অনেকটা পাতলা ডিমের বড়ার মতো) তৈরি করুন। তেল দিয়ে কড়াইয়ে ভাজুন, যতক্ষণ না হালকা বাদামী হচ্ছে। এরপর তেল থেকে এগুলো উঠিয়ে নেন এবং ভালোভাবে পিষুন। দলা থেকে এরপর মুজাবানা (পনিরের পাইয়ের) আকৃতির মতো দলা বানান এবং এগুলোর উপরের আবরণটিকে শক্ত রাখুন। তেলে এগুলোকে ভাজুন এবং এগুলো যেন সাদা থাকে, আর বাদামী না হয়, তা নিশ্চিত করুন, পাশাপাশি উপরের শক্ত আবরণটি ভাজতে থাকুন। এরপর খোসা ছাড়ানো পেস্তা বাদাম, কাজুবাদাম, পর্যাপ্ত চিনি নেন; বেশ ভালোভাবে এগুলো মেশাতে থাকুন, মসলা মাখুন, এরপর কড়া গোলাপজল ঢালুন এবং এগুলোর সাথে গোল রাগিফাতুন যোগ করে ভালোমতো মিশে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নাড়তে থাকুন। ইতোপূর্বে যে ফাঁপা পুডিং জাতীয় দলাটি পাকানো হয়েছে, তা এই মিশ্রন দিয়ে পূর্ণ করুন। এরপর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে আবদ্ধ করে পাকাতে থাকুন, তবে অতিরিক্ত পাকানো যেন না হয়। এগুলো থালায় পরিবেশন করে তার উপর কড়া গোলাপজল, পর্যাপ্ত চিনি ছিটিয়ে পরিবেশন করুন। যদি ঘনীভূত সিরাপ, মধু মেশানো গোলাপজলের সিরাপ থাকে, তা ফোঁটায় ফোঁটায় ঢেলে দিন, এতে এটার স্বাদ বহুগুণে বেড়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
**শরবত: ডালিমের সিরাপ**
এক রাতল (প্রায় ৫০০ গ্রামের মতো) ওজনের টক ডালিম এবং সেই পরিমাণ মিষ্টি ডালিম নেন, এই দুটোকে একসাথে পিষে শরবত বানান এবং দুই রাতল চিনি মেশান এবং এগুলো পাকাতে থাকুন, যতক্ষণ না তা সিরাপের মতো হচ্ছে। অসুখ নিরাময়, পিপাসা নিবারণ, পিত্তের ব্যাধি উপশমে এটা বেশ কার্যকর এবং এটা দেহকে মৃদুভাবে হালকা করে।
📄 ঘড়ি
ইচ্ছা, আশা, স্বপ্ন দেখা কিংবা ভয়, যা-ই করি না কেন, আমাদের সাথে নিয়ে কিংবা আমাদের ছাড়াই সময় তার আপন গতিতে বয়ে চলে। ভয় পাইয়ে দেয়া পরীক্ষা (Exam), গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার কিংবা জন্মদিন যাই হোক না কেন, প্রতিটি কাজেরই শুরু ও শেষ হওয়ার একটি সময় রয়েছে।
প্রথম সূর্যঘড়ি থেকেই মানুষ সময় মাপতে চাইতো। এখন আমাদের রয়েছে নীরব- ডিজিটাল ঘড়ি এবং সেইসাথে আধুনিক টিকটিক শব্দ করা ঘড়ি। এগুলোর পূর্বপুরুষ হচ্ছে ধপধপ শব্দ করা ক্লেপসিডরা (জলচালিত সময় গণনার যন্ত্র) ও জলচালিত ঘড়িসমূহ। ক্লেপসিডরা ঘড়িতে সময় মাপার জন্য বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত সাধারণ একটি পাত্র থাকে, যা ঘড়ির তলে থাকা নল দিয়ে গড়িয়ে নামা পানির প্রবাহ মাপে। এই ঘড়ি খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-এর দিকে মিশরে ব্যবহৃত হতো।
আরেকটি প্রাচীন জলচালিত সময় গণনার যন্ত্র এসেছে ভারত থেকে, যা ঘটিকা ইয়ান্ত্রা নামে পরিচিত। যন্ত্রটি (তামা বা নারিকেলের তৈরি) ছোট অর্ধমণ্ডল আকৃতির পাত্রবিশিষ্ট, যার নিচের প্রান্তে সরু একটি ছিদ্র রয়েছে। প্রবাহিত পানি ধারণের জন্য নিচে একটি পাত্র থাকে এবং তা ধীরে ধীরে পানিতে পূর্ণ হতে থাকে। উপরে থাকা পাত্রের পানি যখন একেবারে খালি হওয়ার ধারপ্রান্তে পৌঁছে, তখন শ্রুতিগোচর একটি ধপ শব্দ হয়, যা সময় গণনাকারীকে সতর্ক করে দেয় এবং তিনি এই প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করেন। ঘড়িটি বৌদ্ধ ও হিন্দু মন্দিরগুলোতে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং পরবর্তীতে ভারতীয় মুসলিম মসজিদগুলোতে ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
আমাদের গল্পের সূচনা ১৩শ শতাব্দির জলচালিত ঘড়ি এবং দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের দিয়ারবাকির অঞ্চলের উদ্ভাবনকুশলী আল-জাযারী নামের এক ব্যক্তির হাত ধরে। ধার্মিক এই মুসলিম ছিলেন উচ্চতর দক্ষতাবিশিষ্ট একজন প্রকৌশলী, যিনি স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ধারণার জন্ম দেন। তিনি তার পূর্ব পুরুষদের মেশিন ও প্রযুক্তির ইতিহাস, বিশেষ করে প্রাচীন গ্রিক ও ভারতীয়দের বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের ইতিহাস দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন।
"সময় এই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে: নিশ্চয় মানবজাতি ক্ষতির মাঝে আছে, কেবল তারা ছাড়া - যারা ঈমান আনে, সৎ কর্ম করে এবং একে অপরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।" - কুরআন (আল-আসর, ১০৩)
১২০৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে, দিয়ারবাকিরের আরটুক বংশের রাজাদের জন্য কাজ করার সুবাদে আল-জাযারী সব ধরনের আকৃতি ও মাপের অসংখ্য ঘড়ি তৈরি করেছিলেন। তৎকালীন রাজা নাসিরুদ্দীন তাকে বলেন, "আপনি অতুলনীয় সব ডিভাইস তৈরি করেছেন এবং এগুলো আপনার ইন্দ্রিয় থেকে মূর্তমান বাস্তবে রূপ নিয়েছে, তাই নিজেকে আপনি যেসব কাজে পরিশ্রান্ত করেছেন এবং চমৎকারভাবে যা তৈরি করেছেন, তা নষ্ট করবেন না। আমি চাচ্ছি আপনি আমার জন্য এমন একটি গ্রন্থ রচনা করবেন, যাতে আপনার স্বতন্ত্র সৃষ্টিগুলোর বিবরণ এবং নির্বাচিত যন্ত্রগুলোর সচিত্র বিবরণ একত্রে থাকবে।"
রাজকীয় এই দাবীর ফল হিসেবে প্রকৌশলবিদ্যার উপর রচিত হয় "কিতাব ফী মারিফাতিল হিয়াল আল- হানদাসা" (সুনিপুণ যান্ত্রিক ডিভাইস) নামের এক অতুলনীয় গ্রন্থ। বিভিন্ন প্রকৌশল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকদের জন্য গ্রন্থটি এক অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়, যেহেতু জলচালিত সময় গণনার যন্ত্রসহ এই গ্রন্থ ছয়টি বিভাগে ৫০-টি যান্ত্রিক ডিভাইসের বিবরণ নিয়ে আলোচনা করেছে।
আজ যেমনিভাবে সময় জানা প্রয়োজন, তেমনিভাবে ৭০০ বছর আগের মুসলিমদের বেলায়ও সময় জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আর আল-জাযারী ঘড়ি বানানোর এই মুসলিম সংস্কৃতিকে সযত্নে লালন করেছিলেন। মুসলিমরা জানতো সময় আটকানো যায় না, প্রতিনিয়ত আমরা এটা হারিয়ে ফেলছি এবং সময়কে ভালো কাজে ব্যয় করার জন্য সময় জানা আবশ্যক। প্রতিদিনের সালাত ঠিক সময়ে আদায়ের জন্য সঠিক ওয়াক্ত জানা মুসলিমদের জন্য প্রয়োজনীয়। মসজিদগুলোর জন্য ওয়াক্তের সময় জানাটা জরুরী ছিল, কেননা তাদেরকে প্রতিদিন সালাতের জন্য আযান দিতে হতো। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক অনুষ্ঠান, যেমন: রমযানের রোযা শুরুর সময়, ঈদ উদ্যাপনের সময় অথবা মক্কাতে হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে সফর করার মতো বিষয়াদি আগে থেকে নির্ধারণ করতে হয়।
'অতুলনীয় সব ডিভাইস' যেটার দিকে রাজা নাসিরুদ্দীন ইশারা করেছিলেন, তাতে বড় হাতি-ঘড়িটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সময় বলে দেয়ার পাশাপাশি বড় আকৃতির এই ঘড়ি ছিল প্রতিপত্তি, আড়ম্বর ও ধন-সম্পদের প্রতীক। সময় বলে দেয়ার প্রথম রোবটিক যন্ত্রগুলোর মাঝে এই হাতি-ঘড়িকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ছিদ্রযুক্ত পাত্রের নিয়ন্ত্রিত নিমজ্জন
ভারতীয় ঘটিকা ইয়ান্ত্রা - পাত্রটি পানি দ্বারা পূর্ণ হলে তা পূর্ব নির্ধারিত সময় পর পর ট্যাংকে নিমজ্জিত হয়। পাত্রের এই নিমজ্জন নির্ভর করে পাত্রের আয়তন, ওজন এবং পাত্রের তলদেশে থাকা ছিদ্রের আকারের উপর। পাত্রটি যখন ট্যাংকের তলদেশে আঘাত করে, তখন ধপ করে একটা শব্দ হয়, যা সময় গণনাকারীকে সতর্ক করে দেয় এবং সে এই প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করে।
হাতি-ঘড়ি
আল-জাযারীর যান্ত্রিক বিস্ময়
বহু সাংস্কৃতিক তাৎপর্যমণ্ডিত
জলচালিত ঘড়ি
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা। আল-জাযারীর উল্লেখযোগ্য অবদান পাম্প ও ইঞ্জিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ 'ক্রাংক ও সংযুক্ত রড সিস্টেম
স্থান। দিয়ারবাফির, আধুনিককালের তুরস্ক
তারিখ। ১৩শ শতাব্দির শুরুর দিক
আবিষ্কারক। আল-জাযায়ী, প্রকৌশলী
আজকের দিনের নির্ভুল ডিজিটাল ও যান্ত্রিক ঘড়িসমূহ ছাড়া আধুনিক জীবনের গতি দৃশ্যত অসম্ভব। কিন্তু ৮০০ বছরেরও বেশি সময় আগেকার আবিষ্কারকগণ সালাতের ওয়াক্ত নির্ধারণ, রোযা ও ঈদ উদ্যাপনের সময় অথবা হজ্জ পালনের দিনক্ষণ নির্ধারণের জন্য ইতোমধ্যেই সময় গণনার নানা অত্যাধুনিক ডিভাইস তৈরি করেছিল।
হাতি-ঘড়িটি এমনই এক অনবদ্য সৃষ্টি, যা মানবজাতির বৈচিত্রকে উদ্যাপন করে। ভারতীয় জলচালিত সময় গণনার যন্ত্র দ্বারা অনুপ্রাণিত এই হাতি-ঘড়ির চলমান অংশগুলো স্বয়ংক্রিয় ছিল। এর সাথে রয়েছে মিশরীয় ফিনিক্স (বিশেষ ধরনের পৌণিক পাখি), গ্রিক হাইড্রলিক (জলশক্তিচালিত) প্রযুক্তি, চীনা ড্রাগন, ভারতীয় হাতি এবং আরবের পোশাক পরিহিত যান্ত্রিক মানবমূর্তি। স্পেন থেকে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক প্রভাবকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছে এই ঘড়ি।
দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের প্রখ্যাত প্রকৌশলী আল-জাযারী হলেন এই ঘড়ির আবিষ্কারক। তিনি সব ধরনের আকৃতি ও মাপের অসংখ্য যন্ত্র তৈরি করেছিলেন এবং ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে রচনা করেন "কিতাব ফী মারিফাতিল হিয়াল আল-হানদাসা" নামের এক অতুলনীয় গ্রন্থ। তার উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে: পাম্প, ইঞ্জিন এবং অন্যান্য বহু যন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ক্রাংক [crank - সামনে পিছনে কোনো যন্ত্রকে ঘোরাতে ইংরেজি 'এল' আকৃতির হাতলবিশেষ) বা ঘূর্ণায়মান চাকা, সংযুক্ত রড ও পিস্টন সিস্টেমের সমন্বয়, যা চক্রাকার গতিকে সরলরৈখিক গতিতে সঞ্চারিত করে। তিনি সব ধরনের যান্ত্রিক গঠনশৈলী দ্বারা প্রবলভাবে আকর্ষিত ছিলেন, এমনকি তার গ্রন্থে স্বয়ংক্রিয় হাত-ধোয়ার যন্ত্র এবং একটি কামশাফ্ট (দাঁতযুক্ত সঞ্চালন দণ্ড) দ্বারা চালিত যান্ত্রিক বাদ্যযন্ত্রের বিবরণ পর্যন্ত আছে।
হাতি-ঘড়িটি সময় গণনার জন্য একটি পাত্র ব্যবহার করতো, যা লুকানো ট্যাংকে নিমজ্জিত হতো। এটা এসেছে ভারতীয় ঘটিকার গঠনশৈলী থেকে। মিশর থেকে গ্রিক, আগেরকার বহু সভ্যতাই জলচালিত ঘড়ি ব্যবহার করেছে, যেখানে পাত্রে পানির প্রবাজ বা পাত্র থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ার উপর ভিত্তি করে সময় হিসেবে করা হতো। তাদের ডিভাইসগুলোকে ক্লেপসিডরা বলা হতো, যার মানে: 'পানি চোর'।
প্রতি অর্ধ ঘন্টা পর পর সময় নির্দেশকটি অভিনব কিছু আওয়াজ ও নাড়াচাড়া করতো। ঘড়ির চূড়া থেকে একটি বল ঘুরতে শুরু করতো এবং একটি ঘন্টা-ডায়ালকে চালু করতো। অন্যদিকে একজন লিপিকার ও তার কলম চক্রাকারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘুরে কত মিনিট অতিবাহিত হয়েছে, তা প্রদর্শন করতো। বলটি যখন নিচে পতিত হতো, তখন তা হাতি চালকের হাতে থাকা কাঠের ছোট হাতুড়িকে করতাল বা মন্দিরাকে আঘাত করার জন্য সবেগে নিক্ষেপ করতো।
বাজপাখি ও তার পিছনে বসানো ঘূর্ণন প্রদর্শনের জন্য সুলতান পাশের দিকে সরে যায়।
বলটি একটি পাখাকে আঘাত করে সূর্যোদয়ের পর কত ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছে, তা প্রদর্শনের জন্য রুপার ডায়াল ও কালো ভায়ালের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে।
চীনা ড্রাগন বলকে ধরে এবং বলসহ নিচে নেমে আসে। ড্রাগনটি ক্ষুদ্র কীলককে কেন্দ্র করে উঠানামা করে।
প্রাতঃ অর্থ ঘন্টা পরপর পানিপূর্ণ পাত্রটি ঘড়ির একেবারে চূড়ার শীর্ষে থাকা বলটিকে নিচে নিক্ষেপ করে। এতে আওয়াজ হয় এবং ফিনিক্স পাখিও নড়েচড়ে উঠে।
সবশেষে, বলটি একটি পাত্রে পতিত হয়, যা হাতি চালকের হাতে থাকা কাঠের হাতুড়িকে সবেগে নিক্ষেপ করে, যেন তা করতাল বা মন্দিরাকে আঘাত করে। একইসাথে এটা পাত্রকে কাত করে পুরো চক্রকে পুনরায় শুরু করে।
পাত্রটি যখন ধীরে ধীরে ডুবে যায়, তখন তা দড়িতে টান দেয়। এতে করে লিপিকার ও তার কলম কত মিনিট পার হয়েছে, তা প্রদর্শন করে।
হাতির বিশাল দেহটি পানির ট্যাংক লুকিয়ে রাখে। এতে একটি পাত্র আছে, যার তলদেশে ছোট ছিদ্র রয়েছে।
📄 দাবা
বুদাপেস্টের স্নানাগারের বহিরঙ্গনের উষ্ম জলাশয় থেকে বাষ্প উড়ছে, আর ওদিকে মার্বেলের দাবা-বোর্ডের উপর গুটিসুটি হয়ে লোকজন জটলা পাকিয়ে আছে। চীনে পার্কের মাঝে দাবা- বোর্ডগুলো বিছানো থাকে, যেমনিভাবে বিছানো আছে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে। ৬৪ বর্গ একক ও ৩২-টি গুটি সম্বলিত মানস-যুদ্ধের এই খেলা প্রায় সব জাতিগোষ্ঠীর লোকেরাই খেলেছে। সাদামাটা আকার ও ধরন সত্ত্বেও এটাতে খেলা যাবে, এমন সম্ভাব্য প্রতিযোগিতার সংখ্যা গণনার বাহিরে।
দাবাকে ঘিরে যত ধরনের গল্প-কাহিনী, উপমা ও ব্যক্তিত্ব আছে, তা এটাকে এক রহস্যময় মাত্রা দিয়েছে এবং এই খেলার সুনির্দিষ্ট উৎস আজও অজানা। হয় এটা ভারত থেকে এসেছে, নতুবা পারস্য থেকে। ১৪শ শতাব্দিতে ইবনে খালদুন দাবার্কে সাসা ইবনে দাহির নামের প্রখ্যাত এক ভারতীয় বিদ্বানের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
প্রাচীন ভারতে চতুরঙ্গ নামে একটি খেলা ছিল, যার অর্থ: 'চার অঙ্গ বা বাহুর সমাহার'। সম্ভবত এটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর চারটি শাখাকে বোঝাচ্ছে, অর্থাৎ হাতি, অশ্বারোহী, রথ এবং পদাতিক সৈন্য। চতুরঙ্গ ঠিক দাবা না হলেও এটাকে আজকের দিনের দাবার পূর্বপুরুষ বলা যায়।
১৪শ শতাব্দির পারসীয় এক পাণ্ডুলিপি আমাদের জানাচ্ছে যে, কীভাবে ভারতীয় এক দূত পারস্যের দরবারে দাবা নিয়ে উপস্থিত হয়, যেখান থেকে মধ্যযুগীয় স্পেনে ভ্রমণকালে আরবদের দ্বারা এটা ইউরোপে পৌঁছায়।
ইউরোপে পৌঁছানোর পূর্বে পারসীয়রা নিজেদের যুদ্ধবাজি ক্রিয়া ব্যবহার করে এই খেলাকে ছাতরঙে বদলে দেয়। আরবরা পারস্যে এসে দাবা বা তৎকালীন সুবিদিত শতরঞ্জের সংস্পর্শে আসে এবং এটাকে তারা নিজেদের সংস্কৃতিতে আত্মীভূত করে নেয়।
ওই সময় খেলার গুটিগুলো ছিল: শাহ-রাজা; ফিরযান-সেনাপতি, আধুনিক সময়ে এসে যা রাণী; ফীল-হাতি, আজ যা বিশপ; ফারাস-ঘোড়া; রুখ-রথ, যা এখন ক্যাসল বা নৌকা; এবং বাইদাক-পদাতিক সৈন্য বা বোড়ে।
সাধারণ জনগণের পাশাপাশি অভিজাত লোকদের মাঝেও খেলাটি ভীষণ জনপ্রিয়তা লাভ করে, আর বিশেষভাবে আব্বাসীরা এটাকে লুফে নেয়। আস-সুলী, আর-রাযী, আল-আদানী এবং ইবনে নাদিম ছিলেন ভীষণ পারদর্শী দাবাড়ু। বিশ্ব শতাব্দীর মাঝামাঝিতে রুশ গ্র্যান্ড মাস্টার ইউরি আভেরবাক তার এক চ্যাম্পিয়নশিপ খেলায় এক আশ্চর্যজনক চাল চেলে বিজয়ী হন। অনেকেই এটাকে এক নতুন উদ্ভাবনচतुर চাল মনে করেন। কিন্তু এক হাজার বছরের বেশি সময় আগে আস- সুলী এই চাল কল্পনা করে গেছেন।
আরব গ্র্যান্ড মাস্টারগণ দাবা, এটার নিয়ম-কানুন ও কৌশল নিয়ে ব্যাপক লিখেছেন, যা মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
দাবার ইতিহাস, খেলার সূচনা, সমাপ্তি এবং সমস্যা নিয়ে বহু গ্রন্থ লেখা হয়েছে। আনুমানিক ১৩৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত "দাবা খেলার রণকৌশলের উদাহরণ" নামের গ্রন্থটি প্রথমবারের মতো 'কানা সন্নাসিনী ও তার তপস্বিনী'-এর মতো দাবা খেলার সূচনা ঘটায়।
সংস্কৃতির প্রবল বায়ু বয়ে আনা বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও ধারা সৃষ্টিকারী যিরইয়াব ৯ম শতাব্দির শুরুর দিকে আন্দালুসে দাবা নিয়ে আসেন। 'চেকমেট' শব্দটি পারস্য ভাষা থেকে উদ্ভূত, যা 'শাহমাত' শব্দের বিকৃতরূপ। শাহমাত শব্দের অর্থ: 'রাজা পরাস্ত হয়েছে'।
আন্দালুস থেকে স্পেনবাসী খ্রিস্টান, মোজারাব এবং উত্তর স্পেনের পিরিনীয় পর্বতমালা অতিক্রম করে একেবারে দক্ষিণ ফ্রান্সের পার্বত্য অঞ্চল পর্যন্ত দাবা পৌঁছে যায়। ইউরোপীয়দের দ্বারা প্রথম দাবার উল্লেখ পাওয়া যায় ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে, যখন বার্সেলোনার এরমেসিন্ডের স্ত্রীর উইল অনুসারে তিনি তার স্ফটিকে তৈরি দাবার গুটিগুলো নাইমে অবস্থিত সেন্ট জাইলস আশ্রমে দান করে দেন। কয়েক বছর পরে অস্তিয়ার কার্ডিনাল দামিসি পোপ পঞ্চম গ্রেগরির কাছে এই আর্জি জানিয়ে পত্র লেখেন যে, তিনি যেন যাজকদের মাঝে 'ধর্মদ্রোহীদের খেলা' ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধকল্পে দাবার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
বাণিজ্য পথ ধরে মধ্য এশিয়া থেকে শুরুর দিকের রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের শুষ্ক প্রান্তর পর্যন্ত দাবা ছড়িয়ে পড়ে: ৭ম ও ৮ম শতাব্দির পারসীয় দাবা-গুটি সমরকন্দ ও ফারগানাতে পাওয়া গেছে। ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ভাইকিং বাণিজ্য পথ ধরে দাবা আরও দূরে ছড়িয়ে পড়ে, যেহেতু ভাইকিংরা এটা স্ক্যান্ডেনেভিয়া পর্যন্ত নিয়ে যায়। ওইসব বাণিজ্য পথ ধরে ১১শ শতাব্দির দিকে দাবা আইসল্যান্ড পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং ১১৫৫ খ্রিস্টাব্দে লেখা আইসল্যান্ডীয় বীরত্বগাথায় ডেনিশ রাজা কুন্ট দ্য গ্রেট-এর কথা আলোচিত হয়, যেখানে ১০২৭ খ্রিস্টাব্দে রাজার দাবা খেলার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
১৪শ শতাব্দির দিকে দাবা ইউরোপে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং 'বিচক্ষণ' নামে পরিচিত রাজা দশম আলফোনসো ১৩শ শতাব্দিতে Book of Chess and Other Games (দাবা এবং অন্যান্য খেলা) শীর্ষক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। গত ৮-শতাব্দি ধরে দাবার ইতিহাস কেবল সমৃদ্ধি হয়নি, বরং এটা নানা হাস্যরসাত্মক ঘটনারও জন্ম দিয়েছে, যেমন: ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের রোবটিক দাবাড়ু।
হাঙ্গেরীয় ওলফাংগ ডি কেম্পেলেন তার অন্ধ দাবাপ্রেমী রাণী, সম্রাজ্ঞী মারিয়া থেরেসাকে একটি উপহার দেয়ার কথা ভাবলেন এবং তিনি রাণীকে 'লৌহ মুসলিম' নামের একটি দাবার রোবট মেশিন উপহার দেন, পরবর্তীতে যেটার নাম 'তুর্কি উছমানী' (অটোমান তুর্ক) রাখা হয়। এই রোবট এতটাই দক্ষতার সাথে দাবা খেলতো যে, ওই সময়ের বাঘা বাঘা দাবাড়ুকে পর্যন্ত হারিয়ে দিতো। এটার নিচে থাকা আলমারির কামরার মাঝে এক দাবাড়ু জড়ো হয়ে বসে থাকতো। মানুষজন এই পাগড়ি পরিহিত রোবটের কেরামতি দেখার জন্য মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতো। প্রকৃতপক্ষে, ১৫ জন স্বতন্ত্র দাবাড়ু ৮৫ বছর ধরে অটোমান 'রোবটিক' তুর্ক ছদ্মবেশে এই রোবটকে অধিকারে রেখেছিল।
📄 সঙ্গীত
সঙ্গীত ছাপিয়ে গেছে মহাদেশ, সভ্যতা-সংস্কৃতি, মানুষ ও প্রকৃতির গণ্ডি। ভাষার মতো এটাও আমাদের যোগাযোগে সহায়তা করে। কিন্তু বিংশ ও একবিংশ শতাব্দির শিল্পী ও গায়কেরা কি এটা জানে, তাদের অধিকাংশ বাদ্যযন্ত্রই এসেছে ৯ম শতাব্দির মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমদের হাত ধরে? এই মুসলিম শিল্পীগণ, বিশেষ করে আল-কিন্দী সঙ্গীতের স্বরলিপি তথা সঙ্গীতের লিখিত রূপ ব্যবহার করতেন। পাশাপাশি মুসলিমরা সঙ্গীতের স্বরগ্রামের নোট বা স্বরলিপির সুর সংকেত অক্ষরের পরিবর্তে বর্ণ দিয়ে নামকরণ করে, যাকে Solmization বলে। এই বর্ণমালাই আজকের সঙ্গীতের মৌলিক স্বরগ্রাম। আমাদের সকলেই দো, রে, মি, ফা, সো, লা, তি (বাংলায় সারে, গা, মা, পা, দা নি, সা)-এর সাথে পরিচিত। এই নোটগুলোর জন্য ব্যবহৃত আরবী বর্ণ - দাল, রা, মিম, ফা, সোয়াদ, লাম, সিন। আজকের স্কেল বা স্বরগ্রামের সাথে ৯ম শতাব্দিতে ব্যবহৃত আরবী বর্ণমালার উচ্চারণগত সাদৃশ্য দারুণভাবে লক্ষণীয়।
আল-কিন্দীর প্রায় ৭০ বছর পরে আল-ফারাবী ভায়োলিন পরিবাবের আদিপুরুষ রাবাবাহ ও টেবিল যিথার (বহুতারের) বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন। তিনি সঙ্গীতের উপর পাঁচটি গ্রন্থ লেখেন, যার মধ্যে সঙ্গীত তত্ত্বের উপর রচিত "কিতাব মুউসিকি আল-কাবীর" (সঙ্গীতশাস্ত্রীয় বড় পুস্তক) হচ্ছে তার অনন্যকীর্তি। ১২শ শতাব্দিতে, গ্রন্থটি হিব্রু ভাষায় অনুদিত হয় এবং পরবর্তীতে লাতিন ভাষায়। আল-ফারাবী ও তার গ্রন্থের প্রভাব ১৬শ শতাব্দি পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
ভ্রাম্যমান শিল্পী, বণিক এবং পর্যটকগণ আরবী সঙ্গীতকে ইউরোপে দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং ৮০০ বছর ধরে মুসলিম শাসনাধীন স্পেন ও পর্তুগালের সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক রূচিবোধের ধারা গড়ে উঠার ক্ষেত্রে এটা যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছিল। এর একটি আদি নমুনা পাওয়া যাবে Cantigas de Santa Maria সংকলনটিতে। কাস্টিলা ও আরাগনের রাজা দশম আলফোনসো এল সাবিয়োর নির্দেশে ১২৫২ খ্রিস্টাব্দের দিকে এটা রচিত হয়। এই সংকলনে কুমারী মরিয়ামের উপর প্রায় ৪১৫-টি ধর্মীয় সঙ্গীত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
"৮ম শতাব্দির শুরুর দিকে আরবরা যখন ইউরোপে আসে, তখন তারা ছিল সঙ্গীতের বিকাশে ... বাদ্যযন্ত্র নির্মাণে ইউরোপীয় জাতিগোষ্ঠীর চেয়ে অত্যন্ত অগ্রসর, আর এভাবেই তাদের সাঙ্গীতিক প্রভাবের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা সম্ভব হবে।" - কার্ল এঙ্গেল, বিংশ শতাব্দির একজন সঙ্গীত-ইতিহাসবেত্তা।
ইউরোপে এই নতুন সঙ্গীত ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বহু ব্যক্তির অবদান রয়েছে। উল্লেখ করার মতো প্রভাবকের ক্ষেত্রে কেবল একজনের নামই উঠে আসে, তিনি 'কালোপাখি' ডাকনামে পরিচিত যিরইয়াব। মূলত তার সুরেলা কণ্ঠ ও কালো গাত্রবর্ণের কারণে তার এ ডাকনাম। সহজাত প্রতিভার অধিকারী এই ব্যক্তি বাগদাদের এক প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পীর শিক্ষার্থী ছিলেন।
কিন্তু সঙ্গীতে তার প্রতিভা ও শ্রেষ্ঠত্ব ধীরে ধীরে তার সঙ্গীতগুরুকে পিছনে ফেলে দেয়। আর তাই উমাইয়া খলীফা তাকে আন্দালুসে আমন্ত্রণ জানায়।
৮২২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খলীফা দ্বিতীয় আবদুর রহমানের শাসনাধীন কর্ডোবার দরবারে যিরইয়াব স্থায়ী হন। এখানে যিরইয়াব সমৃদ্ধি ও তার শিল্পের সমাদর লাভ করেন এবং মাসিক ২০০ স্বর্ণ দিনার পারিশ্রমিক ও সেইসাথে আরও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া একজন দরবারী বিনোদন শিল্পীতে পরিণত হন।
তার বহু অর্জনের মাঝে রয়েছে: কর্ডোবাতে দুনিয়ার প্রথম সঙ্গীত শিক্ষাদান কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ঐকতান ও গীতি কবিতা শেখানো হতো; আরব বীণা (আল-উ'দ) ইউরোপে নিয়ে আসা এবং তাতে পঞ্চম আরেকটি তার যোগ করা, কাঠের মিজরাব (তার টানার জন্য অঙ্গলিসংলগ্ন ছোট ধাতুবিশেষ)-কে শকুনের বড়ো পালক দিয়ে তৈরি মিজরাব দ্বারা বদলে দেয়া এবং ছন্দোবদ্ধ ও তালের প্যারামিটার বা স্থিতিমাপকগুলোকে নিয়মের অধীন না রেখে সঙ্গীত তত্ত্বকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে বিন্যাস করা।
বিংশ শতাব্দির ফরাসি ঐতিহাসিক হেনরি টোরেস বলেন, "প্রাচ্যের এই লোক (অর্থাৎ যিরইয়াবের) আগমনের পরপরই কর্ডোবা জুড়ে আমোদ-প্রমোদ ও বিলাসী জীবনের বাতাস বয়ে যায়। যিরইয়াবকে ঘিরে থাকতো কবিতা ও অপরূপ আনন্দে ঘেরা পরিবেশ। দু'জন ক্রীতদাসের সহচর্যে রাত্রি বেলায় তিনি তার গান রচনা করতেন এবং এরা তার জন্য বীণা বাজিয়ে দিতো। তিনি তার শিল্পকে নজিরবিহীন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন।"
সামরিক বাদকদল
অটোমান সাম্রাজ্য ছিল প্রথম ইউরো-এশীয় সাম্রাজ্য, যাদের স্থায়ী সামরিক বাদকদল ছিল। ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত মেহতারহান সামরিক বাদকদল সুলতানের অভিযানসমূহে অংশ নিতো। যোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা করতে এবং শত্রুদের ভয় পাইয়ে দিতে বাদকদলটি যুদ্ধের মাঝে বাজনা শুরু করে দিতো। অভিজাত সেনাদল, জানেসারিরও ৬ থেকে ৯ সদস্যের বাদকদল ছিল, যারা ড্রাম (ঝুরনা), শিঙ্গা, ত্রিকোণ বাদ্যযন্ত্র, মন্দিরা (ঝিল) এবং কেটলি জাতীয় যুদ্ধের ড্রাম (কাস এবং নাক্কারা) বাজাতো। এসব বাদ্যযন্ত্র উটের পিঠে বহন করে আনা হতো।
শান্তি স্থাপন ও যুদ্ধ উভয়ক্ষেত্রে ইউরোপীয়রা জানেসারি বাদকদলের মুখোমুখি হতো। রাষ্ট্রদূতদের দেয়া বিভিন্ন অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে অটোমান- তুর্কি বাদযন্ত্রের ব্যবহার ইউরোপে একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়, যা 'তুরকিউরি' ফ্যাশন নামে পরিচিত ছিল। ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনার দ্বারপ্রান্তে জানেসারি সেনাদল পরাজিত হয় এবং তারা তাদের বাদ্যযন্ত্র ফেলে যায়। এই ঘটনা ইউরোপীয় সামরিক বাদকদলের উৎপত্তির পথ দেখায়। এমনকি নেপোলিয়ান বোনাপার্টের ফরাসি সামরিক বাদকদল পর্যন্ত অটোমান বাদ্যযন্ত্র, যেমন: মন্দিরা এবং কেটলি জাতীয় যুদ্ধের ড্রাম দ্বারা সজ্জিত ছিল। বলা হয় যে, অস্ট্রারলিটসের যুদ্ধে (১৮০৫) নেপোলিয়ানের সাফল্যের পিছনে বিউগলের ঝঙ্কার মানসিক প্রভাবে অন্যতম ভূমিকা রেখেছিল।