📄 যুগে যুগে হাদীছ অস্বীকারকারীগণ
(منكرو الحديث في العصور) আল্লামা ইসমাঈল গুজরানওয়ালা (১৩১৪-১৩৭৮/১৮৯৫-১৯৬৮) প্রদত্ত যুগে যুগে হাদীছ অস্বীকারকারীদের তালিকাটি নিম্নে প্রদত্ত হ'ল :
১. খারেজী (خارجی): এরা প্রধানতঃ রাসূল পরিবারের মর্যাদায় বর্ণিত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। ২০০ হিজরীর পরে এদের আবির্ভাব ঘটে।
২. শী'আ (شیعر) : এরা ছাহাবীগণের মর্যাদায় বর্ণিত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। ২০০ হিজরীর পরে এদের আবির্ভাব হয়।
৩. মু'তাযিলা ও জাহমিয়া (معز وجی): এরা আল্লাহ্ গুণাবলী সংক্রান্ত হাদীছ সমূহকে অস্বীকার করে। ২২১ হিজরীর পরে এদের আবির্ভাব হয়।
৪. ক্বাযী ঈসা ইবনে আবান ও তার অনুসারীগণ এবং পরবর্তী ফক্বীহদের মধ্যে ক্বাযী আবু যায়েদ দাবূসী প্রমুখ। তাদের দৃষ্টিতে গায়ের ফক্বীহ ছাহাবীগণের বর্ণিত হাদীছকে তারা অস্বীকার করেন। ২২১ হিজরীর পরে এদের আবির্ভাব ঘটে।
৫. মু'তাযিলা ও দার্শনিকদের সাথে ফক্বীহদের একটি ছোট দল। এরা উচ্ছ্বল ও ফুরু' তথা মূল ও প্রশাখাগত সকল বিষয়ে খবরে ওয়াহেদ পর্যায়ের হাদীছসমূহের ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। ৪০০ হিজরীর পর এদের আবির্ভাব হয়।
৬. পাশ্চাত্য সভ্যতায় ভীত ইসলামী পণ্ডিতগণ। যেমন মৌলবী চেরাগ আলী, স্যার সৈয়দ আহমাদ খান ও তাদের অনুসারীবৃন্দ। এরা হাদীছ শাস্ত্রে আনকোরা। তাদের ধারণা মতে হাদীছ সমূহ মূলতঃ ইতিহাসের সমষ্টি মাত্র। অতএব সেখান থেকে চাহিদামত তারা কিছু গ্রহণ করেছেন ও কিছু বর্জন করেছেন। ১৩০০ হিজরীর কাছাকাছি সময়ে এদের আবির্ভাব ঘটে।
৭. মৌলবী আব্দুল্লাহ চকড়ালবী, মিস্ত্রী মুহাম্মাদ রামাযান গুজরানওয়ালা, মৌলবী হাশমত আলী লাহোরী, মৌলবী রফীউদ্দীন মুলতানী। ১৩০০ হিজরীর পরবর্তী এই সকল বিদ্বান হাদীছকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।
৮. মৌলবী আহমাদ দ্বীন অমৃতসরী, মিষ্টার গোলাম আহমাদ পারভেয। এরা স্যার সৈয়দ আহমাদের দ্বারা প্রভাবিত। তবে এরা জাহিল ও লাগামহীন। ১৪শ শতাব্দীর এই ব্যক্তিগণের নিকটে কুরআন, হাদীছ ও পুরা দ্বীনটাই একটা খেলা মাত্র। তাদের মতে বেশীর বেশী এটাকে একটা রাজনৈতিক দর্শন মনে করা যেতে পারে। যাকে যখন-তখন বদলানোর অধিকার আমাদের আছে। তবে মৌলবী আহমাদ দ্বীন কোন কোন 'মুতাওয়াতির' আমলকে এগুলি থেকে পৃথক মনে করতেন।
৯. মাওলানা শিবলী নো'মানী (১৮৫৭-১৯১৪), হামীদুদ্দীন ফারাহী, আবুল আ'লা মওদূদী (১৯০৩-১৯৭৯), আমীন আহসান ইছলাহী এবং নাদওয়াতুল ওলামা লাক্ষ্ণৌ-এর বিদ্বানমণ্ডলী। তবে সাইয়িদ সুলায়মান নাদভী (১৮৮৪-১৯৫৫) ব্যতীত। ১৩শ ও ১৪শ শতাব্দী হিজরীর এই শেষোক্ত বিদ্বানগণ হাদীছের অস্বীকারকারী নন। তবে এঁদের চিন্তাধারায় হাদীছের প্রতি গুরুত্বহীনতা ও তাচ্ছিল্যভাব (استخفاف واستحقار ) প্রকাশ পায় এবং তাঁদের আলোচনায় হাদীছ অস্বীকারের চোরাপথ সমূহ খুলে যায়। ৪২
টিকাঃ
৪২. হুজ্জিয়াতে হাদীছ পৃঃ ১১৩-১১৪।
📄 মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া
২. মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া (১৩১৭-১৪০২ হিঃ/১৮৯৮-১৯৮২ খৃঃ)
তাবলীগ জামা'আতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস (১৩০৩-১৩৬৩/১৮৮৫-১৯৪৪ খৃঃ)-এর নির্দেশক্রমে অন্যতম নেতা মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া কান্ধলভী সাহারানপুরী 'তাবলীগী নেছাব' প্রণয়ন করেন। যাতে হেকায়াতে ছাহাবা এবং ফাযায়েলে নামায, তাবলীগ, যিকর, কুরআন, রামাযান, দরূদ, ছাদাক্বাত ও হজ্জসহ মোট ৯টি বিষয়ে দু'খণ্ডে সমাপ্ত বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ১৯২১ সালে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের 'মেওয়াত' )میوات( এলাকার 'ফীরোযপুর নিমক' )فیروز پورنمک( গ্রামে প্রচলিত তাবলীগ জামা'আত অস্তিত্ব লাভ করে। যেখানে মাওলানা ইলিয়াস (১৮৮৫-১৯৪৪ খৃঃ জন্মস্থান: মেওয়াত, হরিয়ানা, ভারত) তাঁর শিষ্যদের নিকট প্রায়ই যেতেন। একদা সেখানে থাকা অবস্থায় তাঁর কিছু শিষ্য এসে বলল যে, তারা কালেমা শিখানোর জন্য ও মসজিদে ছালাতে আসার জন্য বাড়ী বাড়ী গিয়ে লোকদের দাওয়াত দিয়ে থাকে। তাদের একাজটি তাঁর খুব পসন্দ হয় এবং অন্যান্য গ্রামেও দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি তাদের উৎসাহ দেন। এভাবেই প্রচলিত তাবলীগ জামা'আতের সূচনা হয়। ৪৩
তাবলীগী নেছাব )تبلینی نصاب : আহলেহাদীছের নিকটে 'ছহীহায়েন'-এর যে মর্যাদা, তাবলীগী ভাইদের নিকটে 'তাবলীগী নেছাব'-এর সেই মর্যাদা বললেও অত্যুক্তি হবে না। এ কিতাবটিই তাদের নিকটে সর্বাধিক মর্যাদামণ্ডিত এবং ঘরে-বাইরে, সফরে-অবসরে সর্বদা অতি যত্নের সাথে পঠিত। তাবলীগী নেছাবের লেখক 'শায়খুল হাদীছ' নামে খ্যাত। অথচ হাদীছের পিঠে মিষ্টিমুখে যে ছুরিকাঘাত তিনি করেছেন, তা অন্য কারু পক্ষে সম্ভব হয়েছে কি-না সন্দেহ। কুরআনের আয়াত ও হাদীছের অপব্যাখ্যার সাথে সাথে তিনি যেসব উদ্ভট ও কাল্পনিক মা'রেফতী গল্পসমূহ জুড়ে দিয়েছেন, তা একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। দুর্ভাগ্য যে, এই কিতাবটি বিভিন্ন মসজিদে জামা'আত শেষে ইমাম অথবা তাবলীগের লোকেরা মুছল্লীদেরকে অতি বিনয় ও নম্রতার সাথে পড়ে শুনিয়ে থাকেন ও শেষে দলবদ্ধভাবে মুনাজাত (প্রার্থনা) করে থাকেন।
অথচ এগুলি পড়লে আল্লাহভক্তির স্থান দখল করে নেয় তথাকথিত মুরব্বী ও বুযর্গ ভক্তি। কুরআন-হাদীছের স্থান দখল করে নেয় বিভিন্ন তরীকার ছুফী ও তাদের কাশফ ও কারামতের মিথ্যা ও অলীক কাহিনীসমূহ। মুছল্লীর মাথার মধ্যে তখন ঐসব ভিত্তিহীন কল্পকথা ঘুরপাক খেতে থাকে। আর ভাবে যে, কখন চিল্লায় গিয়ে ঐসব ছুফী বুর্গের ন্যায় উচ্চ মর্যাদা লাভে ধন্য হব। আশ্চর্যের বিষয়, দারুল উলূম দেউবন্দের মসজিদেও নাকি এ কিতাবটি পড়ে মুছল্লীদের শুনানো হয় এবং এ যাবত তার এই বইটির প্রতিবাদে কেউ কোন বই প্রকাশ করেছেন বলে জানা যায়নি। উপমহাদেশের বিশাল হানাফী জামা'আতের হাযার হাযার হানাফী আলেম এ বইটিকে কিভাবে নীরবে সর্মথন দিয়ে চলেছেন।
ভেবে আশ্চর্য হ'তে হয় যে, 'ইসরাঈলে' ইসলামী বইপত্র নিষিদ্ধ, সেখানেও এ কিতাবের রয়েছে অবাধ প্রবেশাধিকার এবং এ কিতাবের প্রচারক তাবলীগী ভাইদের রয়েছে সেদেশে নির্বিঘ্নে পদচারণার ঢালাও অনুমতি। একইভাবে অনুমতি রয়েছে সেখানে কাদিয়ানীদের ব্যাপক প্রবেশাধিকারের। কাদিয়ানীদের হেড অফিস লণ্ডনে ও ইসরাঈলের হাইফা নগরীতে। দু'টি আন্দোলনেরই উৎসস্থল ভারত উপমহাদেশ এবং দু'টিরই জন্ম বৃটিশ আমলে। কাদিয়ানীরা ধর্মদ্রোহী কাফের। কিন্তু তারা ইসলামের নামেই দেশে ও বিদেশে বিকৃত ইসলামের প্রচার করে থাকে। পক্ষান্তরে তাবলীগীরা ইসলামের গণ্ডীর মধ্যে থেকেই ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা দেশ-বিদেশে প্রচার করে। আখেরাতে মুক্তির সন্ধানী হুঁশিয়ার মুমিনগণ সাবধানে পা ফেলবেন, এটাই কাম্য।
তাবলীগী নেছাবের অন্য বিষয় বাদ দিয়ে কেবল তাদের হাদীছ প্রচারের কয়েকটি নমুনা উদাহরণ স্বরূপ তুলে ধরা হ'ল:
১. ওমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আদম (আঃ) অপরাধ করার পর আল্লাহ্ আরশের দিকে তাকিয়ে দেখেন সেখানে লেখা আছে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'। তখন তিনি মুহাম্মাদের অসীলায় আল্লাহ্র নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। অতঃপর আল্লাহ আদমকে বলেন, যদি মুহাম্মাদ না হ'তেন, তাহ'লে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না'। অন্য একটি প্রসিদ্ধ জাল হাদীছ উক্ত মর্মে প্রচলিত আছে, 'লাওলা-কা লামা খালাক্বতুল আফলা-কা' (যদি আপনি না হ'তেন, তাহ'লে আসমান-যমীন কিছুই সৃষ্টি করতাম না)। ৪৪
অন্যত্র 'ফাযায়েলে দরূদ শরীফে' (পৃঃ ৮৫, গল্প নং ১৪) তিনি বলেছেন, 'শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী স্বীয় 'মাদারেজুন নবুঅত' বইয়ে লিখেছেন যে, যখন হযরত হাওয়া-র জন্ম হ'ল, তখন হযরত আদম (আঃ) তার দিকে হাত বাড়াতে চাইলেন। ফেরেশতারা বললেন, ছবর কর, যতক্ষণ না বিয়ে হবে এবং মোহর না দেওয়া হবে। আদম (আঃ) বললেন, মোহর কি? ফেরেশতারা বললেন, 'মুহাম্মাদ-এর উপর তিনবার দরূদ শরীফ পাঠ করুন'। এক রেওয়ায়াতে বিশ বারের কথা এসেছে।' অথচ পবিত্র কুরআনে আদম সৃষ্টির ও তাঁর তওবা করার যে বর্ণনা রয়েছে (বাক্বারাহ ৩০-৩৯; আ'রাফ ২৪), সেখানে এসবের কিছুই নেই।
পীর-আউলিয়াদের 'অসীলা' ধরে পরকালে মুক্তি পাওয়ার বৈধতা প্রমাণের জন্য এসব জাল হাদীছ ও মিথ্যা বর্ণনা পেশ করা হয়েছে। এরা পীর ধরতে বলেন না, বরং 'মুরব্বী' ধরতে বলেন। যেমন শায়খুল হাদীছ 'ফাযায়েলে তাবলীগে' (পৃঃ ৩) বলেছেন, যুগের ওলামা-মাশায়েখ হযরতগণের রেযামন্দি ও সন্তুষ্টি পরকালীন নাজাতের অসীলা ও গোনাহের কাফফারা হয়ে থাকে...।' অথচ কুরআন ও হাদীছের নির্দেশনা অনুযায়ী রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসরণ ব্যতীত পরকালে মুক্তি পাবার কোন উপায় নেই (বুখারী, মিশকাত হা/১৪৩)।
২. হযরত আদম (আঃ) হিন্দুস্তান থেকে পায়ে হেঁটে এক হাযার বার হজ্জ করেছেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, নবীদের সাধারণ রীতি ছিল পায়ে হেঁটে হজ্জ করা। ৪৫
বাস্তবতা এই যে, শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) মদীনা থেকে মক্কায় সওয়ারীতে এসে বিদায় হজ্জ করেছিলেন। অথচ ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর ন্যায় একজন প্রখ্যাত ছাহাবীর নামে এমন মিথ্যা বর্ণনা চালিয়ে দেওয়া হ'ল। একইভাবে আদম (আঃ) সম্পর্কিত বর্ণনাটি একেবারেই ভিত্তিহীন। কেননা তাঁর মোট বয়স ছিল ৯৪০ অথবা ৯৬০ বছর। ৪৬ তাছাড়া তিনি হিন্দুস্তানে বসবাস করেছেন বলে কুরআন ও ছহীহ হাদীছে কোন প্রমাণ নেই।
৩. ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করবে, তার জন্য আমার শাফা'আত ওয়াজিব হবে'। অন্য বর্ণনায় 'যে ব্যক্তি আমার মৃত্যুর পরে আমাকে যিয়ারত করবে, সে ব্যক্তি যেন আমার জীবদ্দশায় আমার সাথে সাক্ষাত করল'। অন্য বর্ণনায় 'যে ব্যক্তি হজ্জ করল, অথচ আমার কবর যিয়ারত করল না, সে আমার উপর যুলুম করল'।৪৭ হাদীছগুলি মওযু বা জাল। ৪৮ আর এটা স্পষ্ট যে, রাসূল (ছাঃ)-এর কবর যেয়ারত হজ্জের কোন অংশ নয়।
৪. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি ছালাত কাযা করবে, যদিও সে তা পরে আদায় করে, তথাপি সময় মত ছালাত আদায় না করার কারণে ঐ ব্যক্তি এক হোক্ববা জাহান্নামে থাকবে। এক 'হোকুবা' হ'ল ২ কোটি ৮৮ লক্ষ বছর। ৪৯ পাঠক স্মরণ রাখুন, খন্দকের যুদ্ধে রাসূল (ছাঃ)-এর পর পর কয়েক ওয়াক্ত ছালাত এবং খায়বার যুদ্ধে ফজরের ছালাত ক্বাযা হয়েছিল। এতদ্ব্যতীত ছাহাবায়ে কেরাম থেকেও ছালাত কাযা করার বহু প্রমাণ দেখা যায়। তাহ'লে তাঁদের অবস্থা কী হবে?
৫. (ক) মুসলমানদের জিহাদী জাযবা খতম করার জন্য তিনি বিনা সনদে লেখেন, একদা রাসূল (ছাঃ) নাজদে সৈন্য পাঠান। তারা দ্রুত যুদ্ধ জয় করে গণীমতের মালামাল সহ ফিরে আসেন। এত দ্রুত ফিরে আসায় লোকেরা বিস্ময় প্রকাশ করলে রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমি কি তোমাদেরকে এর চাইতেও কম সময়ে এর চাইতেও বেশী গণীমত লাভকারী দল সম্পর্কে সংবাদ দিব না? তারা হ'ল ঐসব লোক, যারা ফজরের ছালাত জামা'আতের সাথে আদায় করে। অতঃপর সূর্যোদয়ের পরে দু'রাক'আত ইশরাকের ছালাত আদায় করে'।৫০ তিনি ইশারাক্কের দু'রাক'আত ছালাতকে জিহাদের বিজয়ের চাইতেও উত্তম বলে গণ্য করেছেন।
(খ) আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, কুযা'আহ (قضاعة) গোত্রের দু'জন ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে এসে একত্রে মুসলমান হ'লেন। পরে তাদের একজন শহীদ হয়ে গেলেন। আরেকজন একবছর পরে স্বাভাবিকভাবে মারা গেলেন। তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) পরে স্বপ্নে দেখেন যে, শহীদ ব্যক্তির আগেই ইনি জান্নাতে প্রবেশ করেছেন। তিনি বলেন যে, এতে বিস্মিত হয়ে আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, ঐ ব্যক্তি কি এক রামাযানের পূর্ণ ছিয়াম ও একবছরে ছয় হাযারের বেশী রাক'আত সুন্নাত ছালাত আদায় করেনি? ৫১ অর্থাৎ শাহাদাত লাভের চাইতে সুন্নাত-নফলের মর্যাদা বেশী।
এইভাবে সনদ বিহীন স্বপ্নের বর্ণনা ছাহাবী ও রাসূল (ছাঃ)-এর নামে লাগামহীন ভাবে লিখতে এইসব শায়খুল হাদীছের হৃদয় একটুও কেঁপে ওঠেনি। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ্বে দখলদার ইংরেজের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের মুসলমানেরা যখন জিহাদ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তখনই দেউবন্দ- সাহারানপুরের এইসব ছুফী-শায়খুল হাদীছগণ মুসলমানদের জিহাদ থেকে বিমুখ করে বৃটিশের গোলামীর দিকে ফিরিয়ে নেবার এবং দ্বীনের নামে মুসলমানদের ঈমানী চেতনা বিনাশ করে তাবলীগের বেশে দেশ-বিদেশে ঘুরানোর মিশন নিয়ে মাঠে নেমে ছিলেন। আর তার পুরস্কার স্বরূপ তখন থেকে এযাবৎ তারা ইহুদী-খৃষ্টান প্রভাবিত সকল দেশে বিনা বাধায় তাদের কথিত তাবলীগী মিশন চালিয়ে যাচ্ছে।
(গ) ত্বাউস বলেন, বায়তুল্লাহ দর্শন করা উত্তম হ'ল ঐ ব্যক্তির ইবাদতের চাইতে, যিনি ছিয়াম পালনকারী, রাত্রি জাগরণকারী এবং আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদকারী'। ৫২
এখানে বায়তুল্লাহ দর্শনকে তিনি জিহাদের চাইতে উত্তম বলতে চেয়েছেন। এতদ্ব্যতীত তাদের মধ্যে এই 'মুনকার' হাদীছটির খুবই প্রসিদ্ধি রয়েছে যে, رَجَعْنَا مِنَ الْجِهَادِ الْأَصْغَرِ إِلَى الْجِهَادِ الْأَكْبَر ‘আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে ফিরে এলাম'।৫৩ এর দ্বারা তারা তাদের হালকায়ে যিক্রের মজলিসগুলিকে 'বড় জিহাদ' এবং সশস্ত্র জিহাদের ময়দানকে 'ছোট জিহাদ' হিসাবে গণ্য করতে চেয়েছেন। ৫৪
৬. আবু হুরায়রা (রাঃ)-হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আমার উপর পঠিত দরূদ পুলছিরাত পার হওয়ার সময় 'নূর' (জ্যোতি) হবে। যে ব্যক্তি জুম'আর দিন আমার উপর ৮০ বার দরূদ পড়বে, তার আশি বছরের গোনাহ মাফ করা হবে'। ৫৫
টিকাঃ
৪৩. দিল্লী: পাক্ষিক মাজাল্লা আহলেহাদীছ পূঃ ৭. ২১শে জুন ১৯৮৬ ইং/১৩ই শাওয়াল ১৪০৬ হিঃ সম্পাদক ও লেখক: হাকীম মুহাম্মাদ আজমল খাঁ।
৪৪. সিলসিলা যঈফাহ ওয়াল মওযূ'আহ হা/২৫, ২৮২; ফাযায়েলে যিকর (মূল উর্দু, দিল্লী: উর্দু বাযার, মদীনা বুক ডিপো, ১৩৯৫হিঃ/১৯৭৫ খৃঃ) পৃঃ ৯৫।
৪৫. ফাযায়েলে হজ্জ পৃঃ ৩৫।
৪৬. তিরমিযী, মিশকাত হা/৪৬৬২, 'শিষ্টাচার' অধ্যায়, 'সালাম' অনুচ্ছেদ; ঐ, হা/১১৮, 'ঈমান' অধ্যায়, 'তাক্বদীরে বিশ্বাস' অনুচ্ছেদ; তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৫০৭২, ৮/৪৫৯ পৃঃ।
৪৭. ফাযায়েলে হজ্জ ৯৬, ৯৭, ৯৮ পৃঃ।
৪৮. দারাকুৎনী, ইরওয়াউল গালীল হা/১১২৭-২৮।
৪৯. ফাযায়েলে নামায, পৃঃ ৩৯।
৫০. ফাযায়েলে নামায, পৃঃ ২০।
৫১. ফাযায়েলে নামায পৃঃ ১৫।
৫২. ফাযায়েলে হজ্জ, পৃঃ ৭৭।
৫৩. সিলসিলা যঈফাহ ওয়াল মওযূ'আহ হা/২৪৬০, হাদীছ 'মুনকার'।
৫৪. আব্দুর রহমান উমরী, তাবলীগী জামা'আত আওর উসকা নিছাব (নয়াদিল্লী: দারুল কিতাব, ১৯৮৮ খৃঃ); পৃঃ ৮৪।
৫৫. ফাযায়েলে দরূদ শরীফ ১/৩৮, হা/৪; সিলসিলা যঈফাহ হা/৩৮০৪।
📄 তাবলীগীদের অলীক কাহিনীসমূহের কিছু নমুনা
তাবলীগীদের অলীক কাহিনী সমূহের কিছু নমুনা (بعض القصص المنكرة للتبليغيين)
১. ছুফী সাইয়িদ আহমাদ রিফা'ঈ হজ্জের পরে মদীনায় গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কবর যিয়ারত করেন ৫৫৫ হিজরীতে এবং সেখানে গিয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর প্রশংসায় দু'লাইন কবিতা পাঠ করেন। তখন রাসূল (ছাঃ) খুশী হয়ে তাঁর দু'হাত বের করে দিলেন ও রিফা'ঈ তাতে চুমু খেলেন'। লেখক শায়খুল হাদীছ (?) মাওলানা যাকারিয়া এক ধাপ বাড়িয়ে বলেন যে, ঐ সময় সেখানে প্রায় ৯০,০০০ লোক উপস্থিত ছিলেন, যারা উক্ত দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। যাদের মধ্যে ('বড় পীর') আব্দুল কাদের জীলানী (৪৭০-৫৬১ হিঃ) উপস্থিত ছিলেন'।৫৬
২. মাওলানা যাকারিয়া নিজের 'দালায়েলুল খায়রাত' বইটি লেখার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন যে, তিনি একদা সফর অবস্থায় ওযূর পানির সংকটে পড়েন। দড়ি-বালতি না থাকার কারণে তিনি কুয়া থেকে পানি উঠাতে পারছিলেন না। একটি মেয়ে এ দৃশ্য দেখে কুয়ার নিকটে এসে তাতে থুথু নিক্ষেপ করল। সাথে সাথে কুয়ার পানি কিনারা পর্যন্ত উঠে এলো। লেখক বিস্মিত হয়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, এটি দরূদ শরীফের বরকত। এ ঘটনার পর আমি উক্ত বইটি লিখি'। ৫৭ পাঠকগণ ভালভাবেই জানেন যে, হিজরতের পর পানির কষ্টে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরাম মদীনায় কিভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে জনৈক ইহুদীর নিকট থেকে ওছমান (রাঃ) বি'রে রূমাহ (بئر رومة) নামক বিখ্যাত কুয়াটি খরিদ করে সেটি মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে দেন। ৫৮ অথচ একটি সাধারণ বালিকার থুথু নিক্ষেপে কুয়া ভরে গেল। গল্প আর কাকে বলে!!
৩. শায়খ আবুল খায়ের আক্বতা' বলেন, আমি পাঁচদিন যাবত কিছু খেতে না পেয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ অন্তে তাঁর মেহমান হিসাবে তাঁর কবরের নিকটে ঘুমিয়ে গেলাম। এমতাবস্থায় স্বপ্নে আমার নিকটে রাসূল (ছাঃ) তাঁর তিন সাথী আবুবকর, ওমর ও আলী (রাঃ)-কে নিয়ে এলেন। আমি উঠে দাঁড়িয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর কপালে চুমু খেলাম। অতঃপর তিনি আমাকে একটি রুটি দান করলেন। অর্ধেক রুটি খাওয়া শেষ না হ'তেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তখন দেখি যে, বাকী অর্ধেক রুটি আমার হাতে ধরা আছে'। ৫৯ তাবলীগী নেছাবের প্রায় সর্বত্র এ ধরনের উদ্ভট স্বপ্ন ও ভিত্তিহীন গল্পসমূহ উদ্ধৃত হয়েছে। যা পাঠককে পথভ্রষ্ট করে মাত্র।
৪. দরূদেই জান্নাত:
(ক) জনৈক ছুফী বলেন, মিসত্বাহ নামে আমার এক প্রতিবেশী ছিল, যে সর্বদা মদে দূর হয়ে থাকত। তার দিন-রাতের কোন খবর থাকত না। আমি তাকে বহু উপদেশ দিয়েছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। আমি তাকে তওবা করতে বলতাম। কিন্তু সে তাও করেনি। অবশেষে যখন সে মারা গেল, তখন আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, সে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদার সাথে আছে। কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল, আমি এক মুহাদ্দিছের মজলিসে ছিলাম। এক সময় তিনি বললেন, যে ব্যক্তি উচ্চৈঃস্বরে দরূদ পড়বে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে। একথা শুনে আমি জোরসে দরূد পড়ি এবং অন্যেরাও পড়ে। ফলে ঐ মজলিসে উপস্থিত আমাদের সকলের গোনাহ মাফ হয়ে যায়। আর সেকারণেই আমি আজ জান্নাতে এসেছি।৬০ শুধু মদখোর মিসত্বাহ নয়, ইমাম শাফেঈ (রাঃ)-এর মত উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মহান ব্যক্তিও নাকি কেবল দরূদ পাঠের কারণে জান্নাত লাভ করেছেন।
তাঁর অন্য নেক আমলের কারণে নয়। যেমন (খ) তাঁর একজন শাগরেদের বরাতে লেখা হয়েছে, আমি আমার উস্তাদের মৃত্যুর পরে তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। জিজ্ঞেস করলাম, উস্তাদজী কেমন আছেন? তিনি বললেন, আমাকে খুবই সম্মানের সাথে জান্নাতে নেওয়া হয়েছে। আর এসবই হয়েছে কেবলমাত্র দরূদের বরকতে'। ৬১
নিকৃষ্ট পাপী ও শ্রেষ্ঠ পুণ্যবান দু'জনের দু'টি বানোয়াট গল্প দিয়ে লেখক শায়খুল হাদীছ বুঝাতে চেয়েছেন যে, আমলের কোন প্রয়োজন নেই; কেবল দরূদ পাঠ করলেই জান্নাত অবধারিত। জান্নাত লাভ যদি এতই সস্তা হ'ত, তাহ'লে ওহোদের ময়দানে রাসূল (ছাঃ)-এর দাঁত ভাঙতো না এবং তাঁর ও ছাহাবায়ে কেরামের জীবনে এত কষ্ট হ'ত না। শুধু ঘরে বসে দরূদ পড়লেই ইসলাম কায়েম হ'ত।
কেবল ছুফী ও ইমামের নামে নয় এবার সরাসরি ছাহাবী, তাবেঈ ও রাসূলের নামে মিথ্যাচার। যেমন (গ) হযরত আব্দুর রহমান বিন সামুরাহ (রাঃ) বলেন যে, একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বাইরে এলেন এবং আমাদের বললেন, আমি রাত্রিতে স্বপ্নে একটি আশ্চর্য দৃশ্য দেখলাম যে, একজন ব্যক্তি পুলছেরাতের উপর কখনো পা ঘেঁষে চলছে, কখনো হাঁটুতে ভর করে চলছে, কখনো যেন কোন কিছুতে আটকে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আমার উপর দরূদ তার নিকটে পৌঁছে গেল এবং সে তাকে দাঁড় করিয়ে পুলছেরাত পার করে দিল।' (ঘ) 'বিখ্যাত তাবেঈ হযরত সুফিয়ান বিন ওয়ায়না (রাঃ) হযরত খালাফ থেকে বর্ণনা করেন যে, আমার এক বন্ধু ছিল যে আমার সঙ্গে হাদীছ পড়ত, তার মৃত্যু হয়ে গেল। আমি তাকে স্বপ্নে দেখলাম যে নতুন সবুজ কাপড় পরে সে দৌড়-ঝাপ করছে। আমি বললাম, তুমি তো আমার হাদীছের সহপাঠি ছিলে। তোমার এত উচ্চ সম্মান ও মর্যাদা কি কারণে হ'ল? সে বলল, হাদীছ তো আমি তোমার সাথেই লিখতাম। কিন্তু যখনই হাদীছের নীচে নবী করীম (ছাঃ)-এর নাম আসত, তখনই আমি তার নীচে 'ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম' লিখে দিতাম। আল্লাহ জাল্লা শানুহু তারই বিনিময়ে আমাকে এই মহা সম্মান দান করেছেন, যা তুমি দেখছ'। ৬২
এইসব ভিত্তিহীন গল্প দিয়ে এরা মুসলমানকে কুরআন-হাদীছ থেকে দুরে সরিয়ে নিয়ে পীর-মাশায়েখ, ছুফী-বুযর্গ ও বিদ'আতী মুরব্বীদের গোলামে পরিণত করেছে এবং হাদীছ বাদ দিয়ে এদের অলীক কেচ্ছা-কাহিনী ও কাশফ-কারামতের উপর বিশ্বাসী করে গড়ে তুলেছে। অথচ নবী ব্যতীত অন্য কারু ইলহাম ও স্বপ্ন, ইসলামে কোন দলীল হিসাবে গৃহীত নয়। সম্ভবতঃ এ কারণেই তাবলীগী ভাইয়েরা তাদের কোন তা'লীমে কুরআনের তাফসীর বা কোন অনূদিত হাদীছ গ্রন্থ পাঠ করেন না। ফলে সারা জীবন তাবলীগ করেও এরা ছহীহ তরীকায় ছালাতটুকু আদায় করতে শিখে না। মসজিদগুলিতে এখন কুরআন-হাদীছের তা'লীমের বদলে এদের এইসব মিথ্যা গল্পে ভরা তাবলীগী নেছাবের তা'লীম হয়ে থাকে। কেননা তাদের শোনানো হয় যে, একবার তাবলীগে গেলে তার প্রতিটি নেক আমলের বিনিময়ে ঊনপঞ্চাশ কোটি নেকী হয়। ৬৩
এই নেকীর পাহাড় তাদের বর্তমান মুরব্বীদের আবিষ্কার। যেমন তারা এখন আবার চালু করেছে যে, যারা তাদের বার্ষিক ইজতেমায় (টঙ্গী) যায় এবং আখেরী মুনাজাতে অংশ নেয়, তারা একটি কবুল হজ্জের নেকী পায়। অর্থাৎ সে ঐদিনের মত পাপমুক্ত হয়, যেদিন তার মা তাকে নিষ্পাপ অবস্থায় প্রসব করেছিল। ফলে বহু লোক এখন মক্কায় হজ্জে যাওয়ার চাইতে টঙ্গী যাওয়াকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। সেখানে এখন প্রতিবছর লাখো মানুষের ঢল নামছে। অথচ বোকারা জানেনা যে, কোটি মানুষের জমায়েত হ'লেও তা কখনো হজ্জের নেকীর সাথে তুলনীয় নয়। এরপরেও সেখানে গিয়ে শেখার কিছু নেই, দেশী-বিদেশী ভাষায় ছয় উছুলের বর্ণনা আর তাবলীগী নেছাবের চর্বিত চর্বণ ছাড়া। মানুষ ভাবে এখানে এলাম, হজ্জের ছওয়াব পেলাম। বহু পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এ বিষয়ে উম্মতকে হুঁশিয়ার করে গিয়েছেন এই বলে যে, لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى لَا يُحَجَّ الْبَيْتُ ‘কিয়ামত হবেনা যতদিন না বায়তুল্লাহ্র হজ্জ বন্ধ হয়’। ৬৪ হ্যাঁ, সেটাই শুরু করেছে তাবলীগী ভাইয়েরা। ওদিকে আরেক দল ছুটছে 'ওরসে' গরু-খাসি নিয়ে মৃত পীরের অসীলায় ও তার গদ্দীনশীন হুযুরের দো'আ ও তাবাররুক নিয়ে অভীষ্ট লাভের উদ্দেশ্যে কিংবা জান্নাত পাবার মিথ্যা ধারণার বশবর্তী হয়ে। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন!
'ফাযায়েলে দরূদ শরীফে' বর্ণিত ৫০টি গল্পের শেষ গল্পে মাওলানা যাকারিয়া বলেন, ফাযায়েলের পুস্তিকা সমূহ লিখার সময়কালে এই নাচীয ও তার অনেক বন্ধু স্বপ্নের মধ্যে সুসংবাদ প্রাপ্ত হন। শেষে 'ফাযায়েলে দরূদ শরীফ' লেখার সময় দু'বার স্বপ্ন দেখি যে, এই পুস্তিকা শেষে ক্বাছীদা (প্রশংসামূলক দীর্ঘ কবিতা) অবশ্যই লিখো। তখন আমি মোল্লা জামীর বিখ্যাত ক্বাছীদা লেখার সিদ্ধান্ত নিই। কেননা উক্ত ক্বাছীদা লিখে হজ্জে গেলে তিনি যখন মদীনায় গিয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তা পড়তে এরাদা করেন, তখন রাসূল (ছাঃ) মক্কার আমীরকে পরপর দু'বার স্বপ্নে বলে দেন যে, জামী যেন মদীনায় না আসে। তখন তাকে গ্রেফতার করে জেলখানায় রাখা হয়। পরে তৃতীয়বার স্বপ্নে তিনি আমীরকে বলেন যে, লোকটি অপরাধী নয়। তবে সে আমার প্রশংসায় ক্বাছীদা লিখেছে, যা সে আমার কবরে এসে পড়তে চায়। তাতে তার সাথে মুছাফাহার জন্য কবর থেকে আমার হাত বের হবে। তখন লোকদের মধ্যে ফিৎনার সৃষ্টি হতে পারে। সেজন্য আমি তাকে এখানে আসতে নিষেধ করেছি।' এরপর তাকে জেল থেকে বের করা হয় ও উচ্চ সম্মান দেওয়া হয়। লেখক মাওলানা যাকারিয়া বলেন, উক্ত কাহিনী জানার কারণেই তাঁর লিখিত ক্বাছীদার প্রতি নাচীযের হৃদয় আকৃষ্ট হয় এবং এখনও পর্যন্ত সেই ধারণায় কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। অতঃপর তিনি ৩২ লাইনের ফার্সী ক্বাছীদা উর্দু অনুবাদ সহ যোগ করেছেন (পৃঃ ১১২-১১৩)।
উপরে বর্ণিত কাহিনীর মাধ্যমে মাওলানা যাকারিয়ার কুরআন-হাদীছ বিরোধী আক্বীদা পরিষ্কার হয়ে গেছে। কেননা কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, 'তুমি কোন কবরবাসীকে শুনাতে পারো না' (ফাতির ৩৫/২২)। 'তুমি কোন মৃতব্যক্তিকে শুনাতে পারো না' (নামল ২৭/৮০)। মৃতব্যক্তি কারু উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। সেটা সম্ভব হলে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর কবরের পাশেই ইমামতি করা অবস্থায় খলীফা ওমর (রাঃ)-এর উপর আততায়ীর হামলা ও পরে শাহাদাত লাভ এবং মসজিদের পাশেই তৃতীয় খলিফা হযরত ওছমান গণী (রাঃ)-এর উপর বিদ্রোহীদের হামলা ও শাহাদাত লাভ রাসূল (ছাঃ) ঠেকিয়ে দিতেন বা অন্যদের স্বপ্ন দেখিয়ে ঠেকাতে বলতেন। অথচ উপরে বর্ণিত এক উদ্ভট স্বপ্নকেই মাওলানা যাকারিয়া তাঁর তাবলীগী নেছাব লেখার উদ্দেশ্য হিসাবে গ্রহণ করেছেন, যা একেবারেই ইসলাম বিরোধী।
টিকাঃ
৫৬. ফাযায়েলে হজ্জ, ২/১৩০-১৩১ পৃঃ।
৫৭. ফাযায়েলে দরূদ শরীফ ১/৮৩ গল্প নং ৬।
৫৮. তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত হা/৬০৬৬, সনদ হাসান; আলবানী, ইরওয়াউল গালীল হা/১৫৯৪।
৫৯. ফাযায়েলে দরূদ পৃঃ ১০৫ গল্প নং ৪৮(২); ফাযায়েলে হজ্জ পৃঃ ১২৮ গল্প নং ৮।
৬০. ফাযায়েলে দরূদ শরীফ পৃঃ ৮৬ গল্প নং ১৭।
৬১. ফাযায়েলে দরূদ শরীফ পৃঃ ৮২, গল্প নং ৩।
৬২. ফাযায়েলে দরূদ শরীফ পৃঃ ৮৯ গল্প নং ২৩ ৩২৪।
৬৩. এজন্য দু'টি যঈফ হাদীছ (আবুদাউদ হা/২৪৯৮ 'জিহাদ' অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৪; ইবনু মাজাহ হা/২৭৬১ অনুচ্ছেদ-৪, মিশকাত হা/৩৮৫৭) সাতশো ও সাত লক্ষ নেকী গুণ করে এই উনপঞ্চাশ কোটি বানানো হয়েছে।
৬৪ বুখারী হা/১৫৯৩; 'হজ্জ' অধ্যায়-২৫, অনুচ্ছেদ-৪৭।
📄 চিল্লা প্রথা
চিল্লা প্রথা (بدعة الأربعين)
চল্লিশ দিনের জন্য নিজস্ব খরচে তাবলীগে বের হওয়াকে 'চিল্লা' বলে। চিল্লা হ'ল তাবলীগীদের ভিত্তিমূলক রুকন (الركن الأساسي)। যে ব্যক্তি চিল্লায় বের হয়, তাকে তারা মহব্বত করে, সম্মান করে ও তার অপরাধসমূহ ক্ষমা করে। আর যারা এর বিরোধিতা করে, তারা তাকে গ্রহণ করে না, যদিও সে ইসলামের ফরয-ওয়াজিবসমূহ পালন করে। প্রচলিত বিদ'আতী তাবলীগকে শরী'আত সিদ্ধ প্রমাণ করার জন্য তারা সূরা আলে ইমরানের ১১০ নং আয়াতে বর্ণিত أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ -এর অপব্যাখ্যা করে এটাকেই ‘চিল্লার পক্ষে কুরআনী নির্দেশ' বলতে চেয়েছেন এবং এই মর্মে তাবলীগের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস নাকি স্বপ্নে আদিষ্ট হয়েছেন এই মর্মে যে, إِنَّكَ أُخْرِجْتَ لِلنَّاسِ مِثْلَ الْأَنْبِيَاءِ নবীগণের ন্যায়।' যদিও তিনি নিজে চিল্লায় যেতেন না। বরং অধিকাংশ সময় আব্দুল কুদ্দুস গাঙ্গোহীর কবরের পিছনে বসে থাকতেন এবং নূর সাঈদ বাদায়ূনীর কবরের নিকটে নিরালায় জামা'আতে ছালাত আদায় করতেন। ৬৬ অথচ কবরে ছালাত আদায় করা শরী'আতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শায়খ তাক্বিউদ্দীন হেলালী বলেন, 'চিল্লা তাদের দ্বীনের সারমর্ম' (خلاصة دينهم)।
এর ভিত্তিতেই তারা পরস্পরে ভালবাসে অথবা শত্রুতা করে। অথচ এর মাধ্যমে তারা ধর্মীয় ও বৈষয়িক জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। যেমন, (১) এর মাধ্যমে তারা দ্বীনের মধ্যে বিদ'আত সৃষ্টি করে এবং সুন্নাতে রাসূলের বিরোধিতা করে (২) তারা স্ত্রী-সন্তানাদি ও পিতা-মাতার হক নষ্ট করে (৩) ছাত্রদেরকে তাদের দ্বীনী ইল্ম শিক্ষা করা থেকে বিরত রাখে (৪) তারা ব্যবসায়ীদের ব্যবসা থেকে দূরে রাখে এবং তাদের মাধ্যমে যারা যাকাত ও ছাদাক্বা লাভ করত, তাদেরকে বঞ্চিত করে। এভাবে বহু বঞ্চিত মানুষের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র কাছে ও মানুষের কাছে জমা হয়'। তিনি বলেন, 'ইসলাম আসার আগে ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পায়ে হেটে বহু দূরে চলে যেত। বাধ্য না হলে তারা কোন কিছুতে সওয়ার হতো না। অতঃপর জঙ্গলে বা অন্য কোথাও নিরালায় বসে ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর হয়ে ঈশ্বর বন্দনায় লিপ্ত হতো। এভাবে তারা দিনের পর দিন কাটিয়ে দিত'। তিনি বলেন, 'হে তাবলীগীরা! তোমাদের এই ঘরবাড়ি ছেড়ে চিল্লায় যাওয়ার প্রথা যদি ব্রাহ্মণদের ধর্ম থেকে না নেওয়াও হয়, তথাপি এটি হ'ল নিকৃষ্টতম বিদ'আত ও নিকৃষ্টতম ভ্রষ্টতা। যা ভারতীয় মূর্তিপূজারীদের হুবহু অনুকরণ, যা তোমরা পুরোপুরিভাবে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছ। অথচ তোমাদের এই জোশ ও পারস্পরিক সহযোগিতা ব্যয় করা ওয়াজিব ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতের দিকে মানুষকে আহবানের কাজে'। তিনি বলেন, 'তাবলীগীদের মাদরাসাগুলি মানুষের রায়-কিয়াসের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় ও সেখানে রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতকে সংকুচিত করা হয়'। তিনি বলেন, 'তাবলীগীরা বলে, তাদের চিল্লার মাধ্যমে বহু অমুসলিম মুসলমান হয়'। উত্তরে একথা বলা যায় যে, 'এতে শুরুটা ভাল হলেও পরিণামে মন্দ হয়। কেননা সে ছাহাবা, তাবেঈন ও সালাফে ছালেহীনের তরীকায় গড়ে ওঠে না। বরং তাবলীগীদের বিদ'আতী ও ভ্রান্ত রীতিতে গড়ে ওঠে। ফলে যে ব্যক্তি এভাবে তৈরী হয়, সে ব্যক্তির ইসলাম কবুলে খুশী হবার কিছু নেই। কেননা সে ৭২ ফের্কার অন্তর্ভুক্ত হয়, যাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জাহান্নামের দুঃসংবাদ দিয়েছেন'। ৬৭
চিল্লায় গিয়ে মানুষকে ছয় উছুল (কালেমা, ছালাত, ইলম ও যিকর, ইকরামুল মুসলিমীন, তাছহীহে নিয়ত, তাবলীগ) শিখানো হয়। ফলে ইসলামের ৫টি বুনিয়াদ শিক্ষা (ঈমান, ছালাত, যাকাত, ছিয়াম, হজ্জ) গৌণ হয়ে যায়। অমনিভাবে ৪ মাযহাব ফরয সহ ১৩০ ফরয মুখস্ত করানো হয়। এছাড়া নানা দায়েমী ফরয, দায়েমী সুন্নাত, খানাপিনা-পেশাব-পায়খানা সহ নানা বিধ আদব, ফরয-ওয়াজিব ও সুন্নাতের বিরাট তালিকা মুখস্ত করানো, গাশত-তা'লীম, সফর-মোশাওয়ারা, অতঃপর ফাযায়েলের বায়ান ইত্যাদির মধ্যে একজন মানুষকে সর্বদা ব্যস্ত রাখা হয়। ৬৮ অথচ তাদেরকে কুরআন ও হাদীছ শিখানো হয় না। তাওহীদ ও শিরক, সুন্নাত ও বিদ'আত বুঝানো হয় না। যেগুলি ইসলামের মৌলিক বিষয়।
টিকাঃ
৬৫. আব্দুর রহমান উমরী, তাবলীগী জামা'আত আওর উসকা নিছাব (নয়াদিল্লী: দারুল কিতাব, ১৯৮৮ খৃঃ), পৃঃ ১৩; গৃহীত: মালফুযাতে মাওলানা ইলিয়াস পৃঃ ৫১।
৬৬. আল-ক্বাওলুল বালীগ পৃঃ ২১৫, ১৬, ২৬।
৬৭. আল-ক্বাওলুল বালীগ পৃঃ ২২২, ২২৩।
৬৮. এক মোবাল্লেগের পয়লা নোট বই, ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ জুলফিকার আহমদ মজুমদার (ঢাকা: ১৯৭৮)।