📘 হাদিসের প্রামানিকতা > 📄 'হাদীছ' সম্পর্কে মওলানা মওদূদীর আক্বীদা

📄 'হাদীছ' সম্পর্কে মওলানা মওদূদীর আক্বীদা


'হাদীছ' সম্পর্কে মাওলানা মওদূদীর আক্বীদা
(عقيدة المودودي في الحديث)
হাদীছ ও হাদীছ শাস্ত্রবিদগণ সম্পর্কে মাওলানা মওদূদীর আক্বীদা লিখিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর 'মাসলাকে এ'তেদাল' (مسلک اعتدال) নামক নিবন্ধে, যার বঙ্গানুবাদ 'সুষম মতবাদ' নামে প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত প্রবন্ধে তিনি হাদীছকে 'যান্নী' (ظنی) বা 'ধারণা নির্ভর' বলে অগ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন। যদিও এ ব্যাপারে তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছেন। তবুও অনেক ঘুরিয়ে তিনি যে কথাটি বুঝাতে চেয়েছেন তা এই যে, হাদীছের উপরে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপনের কোন নিশ্চিত ভিত্তি নেই। কেননা বর্ণনাকারী একজন মানুষ হিসাবে ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। অতএব এ ক্ষেত্রে নিশ্চিত সত্যে উপনীত হওয়ার একমাত্র পথ হ'ল ফক্বীহদের মর্ম অনুধাবন (تفقہ) ও তাঁদের বিশেষ রুচিবোধ (خاص ذوق)। মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণকে তিনি সাংবাদিক (اخباری) দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী বলে মনে করেন, যারা কেবল সংবাদের সত্যাসত্য যাচাই করেন, কিন্তু এর তাৎপর্য (تفقہ) অনুধাবন করেন না। যেমন তিনি বলেন,
محدثین رحمھم اللہ کی خدمات مسلم ... کلام اس میں نہیں بلکہ صرف اس امر میں ہے کہ کلیہ ان پر اعتماد کرنا کہاں تک درست ہے، بہر حال تھے تو انسان ہی... پہر آپ کیسے کہ سکتے ہیں کہ جس کو وہ صحیح قرار دیتے ہیں وہ حقیقت میں بہی صحیح ہے؟ ... مزید برآں ظن غالب ان کو جس بنا پر حاصل ہوتا تہا وہ بلحاظ روایت تہا نہ کہ بلحاظ درایت - ان کا نقطہ نظر زیادہ تر اخباری ہوتا تہا، فقہ ان کا اصل موضوع نہ تھا ... یہ ماننا پڑیگا کہ احادیث کے متعلق جو کچھ یہی تحقیقات انہوں نے کی ہے اس میں دو طرح کی کمزوریاں موجود ہیں، ایک بلحاظ اسناد اور دوسرے بلحاظ تفقہ -
'মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণের খিদমত সর্বস্বীকৃত।.... এতে কোন কথা নেই। কথা কেবল এ বিষয়ে যে, পুরোপুরিভাবে তাঁদের উপরে ভরসা করা কতটুকু সঠিক হবে। হাযার হৌক তাঁরা তো ছিলেন মানুষই। ... অতএব কিভাবে আপনি একথা বলতে পারেন যে, তাঁরা যে হাদীছকে 'ছহীহ' সাব্যস্ত করেছেন, আসলেই সেটা ছহীহ। ... অধিকন্তু যার কারণে তাদের মধ্যে হাদীছের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সর্বোচ্চ ধারণার সৃষ্টি হয়, সেটি হ'ল রেওয়ায়াতের (বর্ণনার) দৃষ্টিকোণ, দিরায়াতের (যুক্তি গ্রাহ্যতার) দৃষ্টিকোণ নয়। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বেশীর বেশী সাংবাদিকের দৃষ্টিভঙ্গি, ফিক্বহ বা তাৎপর্য অনুধাবন তাদের বিয়ষবস্তু ছিল না। ... অতএব একথা মানতেই হবে যে, হাদীছসমূহে যেসব গবেষণা তাঁরা করেছেন, তাতে দু'টি দিকে তাঁদের দুর্বলতা ছিল। ১- সনদের দিক দিয়ে ২- মর্ম অনুধাবনের দিক দিয়ে। ২৭
প্রিয় পাঠক! নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, কত সুন্দরভাবে তিনি ফিকুহকে হাদীছের উপরে স্থান দিতে চেয়েছেন। অথচ কে না জানে যে, হাদীছের তাৎপর্য অনুধাবনের ক্ষেত্রে স্থান-কাল পাত্র ভেদে মুজতাহিদ ফক্বীহগণের মধ্যে সকল যুগে মতভেদ হয়েছে। কিন্তু হাদীছের ভাষায় কোন পরিবর্তন হয়নি, হবেও না ইনশাআল্লাহ। অতএব হাদীছের বর্ণনার বিশুদ্ধতা যাচাই করাই হ'ল মুখ্য। আর বর্ণনার সত্যাসত্য যাচাইয়ের জন্য বর্ণনাকারীকে যাচাই করা সর্বাধিক প্রয়োজন। মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণ তাই সনদ যাচাইয়ের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। আর একারণেই তাবেঈ বিদ্বান আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (১১৮-১৮১হিঃ) বলেছেন, الْإِسْنَادُ عِنْدِي مِنَ الدِّينِ، لَوْلاً الْإِسْنَادُ لَقَالَ مَنْ شَاءَ مَا شَاءَ 'আমার নিকটে সনদ হ'ল দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। যদি সনদ যাচাই না হ'ত, তাহ'লে যে যা খুশি তাই বলত' (মুক্বাদ্দামা মুসলিম পৃঃ ১৫)। মুহাদ্দিছগণ সনদ যাচাইয়ের সাথে সাথে হাদীছের 'দিরায়াত' বা যুক্তিগ্রাহ্যতা সূক্ষ্মভাবে যাচাই করেছেন। উছুলে হাদীছের ছাত্রগণ তা ভালভাবেই জানেন। অতএব মাওলানার উপরোক্ত মন্তব্য হাদীছ বিরোধীদের উত্থাপিত মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগেরই প্রতিধ্বনি মাত্র। যদিও মাওলানা হাদীছ অস্বীকারকারী ছিলেন না।
তিনি বলেন, 'উপরোক্ত আলোচনায় একথা বুঝা গেছে যে, হাদীছকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তিগণ যেমন ভুলের উপরে আছে, তেমনি ঐ ব্যক্তিগণও ভুল থেকে নিরাপদ নন, যারা হাদীছের কেবল রেওয়ায়াতের উপরে ভরসা করে থাকেন। সঠিক রাস্তা ঐ দু'টির মাঝখানে রয়েছে। আর সেটি হ'ল ঐ রাস্তা, যা মুজতাহিদগণ অবলম্বন করেছেন। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর ফিক্বহে আপনি এমন বহু মাসআলা দেখবেন, যা মুরসাল, মু'যাল ও মুনক্বাতি' (ইত্যাদি 'যঈফ') হাদীছসমূহের উপরে ভিত্তিশীল। অথবা যেখানে শক্তিশালী সনদের হাদীছ বাদ দিয়ে দুর্বল সনদের হাদীছ গ্রহণ করা হয়েছে। অথবা যেখানে হাদীছ কিছু বলছে, ইমাম আবু হানীফা কিংবা তাঁর শিষ্যগণ কিছু বলছেন। ইমাম মালেকের অবস্থাও অনুরূপ'। ২৮
একটু পরে গিয়ে মাওলানা হাদীছের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের দ্বিতীয় মানদণ্ড (دوسری کسوٹی) নির্ধারণ করেছেন ফক্বীহদের বিশেষ রুচিকে (خاص ذوق)। যার মাধ্যমে তাঁরা হাদীছ পরখ করেন এবং তাতে হৃদয়ে প্রশান্তি (اطمینان) লাভ করলে হাদীছটি গ্রহণ করেন। যদিও মুহাদ্দিছগণের দৃষ্টিতে তা ত্রুটিপূর্ণ (مرجوح) হয়' ২৯ যেমন তিনি বলেন,
یہ دوسری کسوٹی کونسی ہے؟ ہم اس سے پہلے اشارہ اس کا ذکر کئی مرتبہ کر چکے ہیں۔ جس شخص کو اللہ تفقہ کی نعمت سے سرفراز فرماتا ہے اس کے اندر قرآن اور سیرت رسول صلی علم کے غائر مطالعہ سے ایک خاص ذوق پیدا ہو جاتا ہے جس کی کیفیت بالکل ایسی ہے جیسے ایک پرانے جوہری کی بصیرت ... اس مقام پر پہونچ جانے کے بعد انسان اسناد کا زیادہ محتاج نہیں رہتا۔ وہ اسناد کا مدد ضرور لیتا ہے مگر اس کے فیصلے کا مدار اس پر نہیں ہوتا۔
'এই দ্বিতীয় মানদণ্ড কোনটি? ইতিপূর্বে আমরা কয়েকবার এ বিষয়ে ইঙ্গিতে উল্লেখ করেছি। আল্লাহ যাকে মর্ম অনুধাবনের অনুগ্রহে সিক্ত করেন, তার মধ্যে কুরআন ও রাসূল-চরিত গভীরভাবে অধ্যয়নের ফলে এক বিশেষ রুচিবোধ (خاص ذوق) সৃষ্টি হয়। যার প্রকৃতি ঠিক ঐরূপ, যেরূপ একজন পুরানো স্বর্ণকারের দূরদৃষ্টি।... এই স্থানে পৌঁছে যাবার পর মানুষ সনদের প্রতি বেশী মুখাপেক্ষী থাকেনা। সে সনদ থেকে অবশ্যই সাহায্য নেয়। কিন্তু সিদ্ধান্তের ভিত্তি তার উপরে থাকেনা'।৩০
চটকদার যুক্তির মাধ্যমে মাওলানা নিজেদের রায়-কে হাদীছের উপরে স্থান দিতে চেয়েছেন। যা ভ্রান্ত ফের্কা মু'তাযিলাদের অনুকরণ বৈ কিছুই নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হ'ল, ব্যক্তিগত রুচিই যদি ছহীহ-যঈফ বাছাইয়ের ও হাদীছ কবুল করা বা না করার মানদণ্ড হয়, তাহ'লে তো হাদীছের কোন অস্তিত্বই থাকবে না। কেননা ব্যক্তিগত রুচি তো সবার এক নয়। তাছাড়া একথার অর্থ তাহ'লে কি হবে যে, ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) যঈফ হাদীছকে রায়-এর উপরে অগ্রাধিকার দিতেন? ছাহাবা, তাবেঈন ও উম্মতের সেরা বিদ্বানমণ্ডলী ছহীহ হাদীছ পাওয়ার সাথে সাথে ইতিপূর্বেকার আমল ছেড়ে দিয়ে ছহীহ হাদীছের অনুসারী হয়েছেন কেন? এবং কেনই বা তাঁদের 'রায়' পরিত্যাগ করে ছহীহ হাদীছের অনুসারী হওয়ার জন্য স্ব স্ব অনুরক্তদের নির্দেশ দিয়ে গেলেন?
বস্তুতঃ মাওলানার উক্ত বক্তব্য একেবারেই কল্পনাপ্রসূত এবং বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেছেন যে, إِيَّاكُمْ وَالْقَوْلِ فِي دِيْنِ اللَّهِ بِالرَّأْيِ وَعَلَيْكُمْ بِاتِّبَاعِ السُّنَةِ فَمَنْ خَرَجَ عَنْهَا ضَلَّ 'তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে 'রায়' অনুযায়ী কোন কথা বল না। তোমাদের কর্তব্য হ'ল সুন্নাহ্ অনুসরণ করা। যে ব্যক্তি সুন্নাহ থেকে বেরিয়ে গেল, সে পথভ্রষ্ট হ'ল'।" আর প্রথম ছহীহ হাদীছের সংকলন 'মুওয়াত্রা'র স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ত্ব ইমাম মালেক (৯৫-১৭৯ হিঃ)-এর বিরুদ্ধে এরূপ কথা বলা রীতিমত তোহমত বৈকি! এইসব মহামতি ইমামগণ কখনোই জেনেশুনে হাদীছের বিরুদ্ধে নিজেদের 'রায়'-কে অগ্রাধিকার দেননি। বরং এ বিষয়ে তাঁদের সকলের বক্তব্য প্রায় একইরূপ ছিল যে, ছহীহ হাদীছই আমাদের মাযহাব। ৩২
মাওলানার উক্ত প্রবন্ধ মাসিক 'তারজুমানুল কুরআন' মে ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হ'লে আহলেহাদীছ ওলামায়ে কেরাম তাঁকে চ্যালেঞ্জ করে প্রমাণ চেয়ে পত্র লিখলে তিনি জবাবে লিখেন যে, اس وقت میرے پیش نظر مطلوبہ نظیر نہیں ہے اور ویسے بہی نظیریں پیش کرنے سے بحث کا سلسلہ دراز ہوتا ہے সম্মুখে অনুরূপ কোন প্রমাণ নেই। তবে এসব প্রমাণ পেশ করতে গেলে আলোচনা দীর্ঘায়িত হয়ে যায়'।৩০
মাওলানা তাঁর আলোচনায় ছহীহ হাদীছের উপরে মুজতাহিদগণের রায় ও তাঁদের ব্যক্তিগত রুচিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁকেই সঠিক পথ বলে মন্তব্য করেছেন। অথচ আহলেসুন্নাত ওয়াল জামা'আতের চিরন্তন নীতি হ'ল, হাদীছ মওজুদ থাকতে কিয়াস বৈধ নয়' (আর-রিসালাহ পৃঃ ৫৯৯) এবং إِذَا وَرَدَ الْأَثَرُ بَطَلَ النَّظَرُ 'যখনই হাদীছ পাওয়া যাবে, তখনই যুক্তি বাতিল হবে'। ৩৪
তাছাড়া ফক্বীহগণের পরস্পরের মতভেদে ফিকহের কিতাবসমূহ ভরপুর। এমনকি ইমাম গাযযালী (রহঃ)-এর হিসাব মতে খোদ আবু হানীফা (রহঃ)-এর সমস্ত ফৎওয়ার দুই-তৃতীয়াংশের বিরোধিতা করেছেন তাঁর দুই প্রধান শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রাহেমাহুমাল্লাহ)'।
যে ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) নিজের ব্যাপারে তাঁর প্রধান শিষ্য আবু ইউসুফকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, لا تَرُو عَنِّى شَيْئًا فَإِنِّى وَاللهُ لا أَدْرِي مُخْطَى أَنَا أَمْ مُصْيْبٌ তুম আমার পক্ষ থেকে কোন মাসআলা বর্ণনা কর না। কেননা আল্লাহ্র কসম! আমি জানি না আমি নিজ সিদ্ধান্তে বেঠিক না সঠিক' (খত্নীব ১৩/৪০২), সেক্ষেত্রে মাওলানা মওদূদী কিভাবে বলতে পারেন যে, মুজতাহিদগণের রায় ও তাঁদের ব্যক্তিগত রুচিই হ'ল নিশ্চিত জ্ঞানলাভের সঠিক উপায়। তিনি কি তাহ'লে মুসলিম উম্মাহকে কুরআন ও সুন্নাহ্ স্পষ্ট পথ থেকে বের করে ইসলামী চিন্তাবিদগণের পরস্পর বিরোধী চিন্তাধারার ধূম্রজালে আবদ্ধ করতে চান? এটা নিঃসন্দেহে ছাহাবায়ে কেরام ও সালাফে ছালেহীনের অনুসৃত পথ হ'তে বিচ্যুতি। যে পথে ভ্রান্তি আছে, সত্য নেই। অশান্তি আছে, প্রশান্তি নেই।
উল্লেখ্য যে, কুরআন ও হাদীছের চিরস্থায়ী নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ গ্রহণ করেছেন (হিজর ১৫/৯, ক্বিয়ামাহ ৭৫/১৬-১৯)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةً ‘আমি তোমাদের নিকটে এসেছি স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন দ্বীন নিয়ে'। যার রাত্রি হ'ল দিবসের ন্যায় আলোকিত। এই আলোকিত দ্বীনকে সন্দেহবাদের অন্ধকারে ঢেকে দেবার অপপ্রয়াস থেকে প্রত্যেক মুমিনকে অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে।
দুর্ভাগ্য এই যে, যুক্তিবাদের ধাঁধানো চোখে আমরা অনেক সময় অন্ধকার দেখি। ফলে সহজ চিন্তার স্নিগ্ধ আলোকে আমরা অহি-র বিধানের প্রকাশ্য রাস্তা খুঁজে পেতে অনেক সময় ব্যর্থ হই। যে জন্য মাওলানা মওদূদীর ন্যায় ইসলামের একজন সিপাহসালারের অতি যুক্তিবাদী চক্ষু এমনকি ছহীহ বুখারীর হাদীছসমূহের বিশুদ্ধতাও খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন তিনি বলেন, کوئی شریف آدمی یہ نہیں کہ سکتا کہ حدیث کا جو مجموعہ ہم تک پہونچا ہے وہ قطعی طور پر صحیح ہے۔ مثلاً بخاری، جسکے بارے میں اصح الکتب بعد کتاب اللہ کھا جاتا ہے ، حدیث میں کوئی بڑے سے بڑا غلو کر نیوالا ہی یہ نہیں کہ سکتا کہ اس میں جو چھ سات ہزار احادیث درج ہیں وہ ساری کی ساری صحیح ہے۔
'কোন শরীফ লোক এ কথা বলতে পারে না যে, হাদীছের যে সমষ্টি আমাদের নিকটে পৌঁছেছে, তার সবটা অকাট্যভাবেই ছহীহ। যেমন বুখারী, যাকে আল্লাহর কেতাবের পরে সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ কিতাব বলা হয়, হাদীছের অতি বড় ভক্তও একথা বলতে পারে না যে, এর মধ্যে যে ছয়-সাত হাযার হাদীছ সংকলিত আছে, তার সবটাই ছহীহ'। ৩৭ কি তাচ্ছিল্যভরা ভয়ংকর মন্তব্য! অথচ এ প্রসঙ্গে ভারতগুরু শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী (রহঃ) বলেন,
أَمَّا الصَّحِيْحَانَ فَقَدِ اتَّفَقَ الْمُحَدِّثُوْنَ عَلَى أَنَّ جَمِيعَ مَا فِيْهِمَا مِنَ الْمُتَّصِلِ الْمَرْفُوعِ صَحِيْحٌ بِالْقَطْعِ، وَأَنَّهُمَا مُتَوَاتِرَانِ إِلَى مُصَنِّفَيْهِمَا، وَأَنَّهُ كُلُّ مَنْ يُهَوِّنُ أَمْرَهُمَا فَهُوَ مُبْتَدِعْ مُتَّبِعُ غَيْرِ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ - (١٣٤/١ (حجة الله البالغة
'ছহীহায়েন অর্থাৎ ছহীহ বুখারী ও মুসলিম সম্পর্কে হাদীছ বিশারদ পণ্ডিতগণ একমত হয়েছেন যে, এ দু'য়ের মধ্যে মুত্তাছিল মারফু' যত হাদীছ রয়েছে, সবই অকাট্যভাবে ছহীহ। যে ব্যক্তি ঐ দুই গ্রন্থ সম্পর্কে হীন ধারণা পোষণ করবে, সে বিদ'আতী এবং মুসলিম উম্মাহ্র বিরোধী তরীকার অনুসারী'।
অথচ হাদীছের সনদ এবং বর্ণনাগত ও তাৎপর্যগত বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের ব্যাপারে ইমাম বুখারী (রহঃ) -এর কঠোর শর্তাবলী এবং ফিক্বহ বিষয়ে তাঁর তীক্ষ্ণ দূরদর্শিতা কিংবদন্তীর ন্যায় প্রসিদ্ধ। হজ্ব ও বাতিলের পার্থক্যকারী ওমর ফারুক (রাঃ) বলেন, وَالَّذِيْ نَفْسُ عُمَرَ بِيَدِهِ مَا قَبَضَ اللَّهُ تَعَالَى رُوْحَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا رَفَعَ الْوَحْيَ عَنْهُ حَتَّى أَغْنَي أُمَّتَهُ - كُلُّهُمْ عَنِ الرَّأْي 'যাঁর হাতে ওমরের জীবন তাঁর কসম করে বলছি, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর নবীর রূহ কবয করেননি এবং 'অহি' উঠিয়ে নেননি, যতক্ষণ না তাঁর উম্মত সকল প্রকার 'রায়' (তথা যুক্তিবাদ) হ'তে মুক্ত হ'তে পেরেছে'। ৩৯ অতএব মুজতাহিদগণের 'রায়' নয়, বরং মুহাদ্দিছগণের গৃহীত ছহীহ হাদীছই হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী মানদণ্ড।

টিকাঃ
২৭. সাইয়িদ আবুল আ'লা মওদূদী, তাফহীমাত (দিল্লী: মারকাযী মাকতাবা ইসলামী, ১৯৭৯) ১/৩৫৬ পৃঃ।
২৮. তাফহীমাত ১/৩৬০ পৃঃ।
২৯. ঐ, ১/৩৬১।
৩০. ঐ, ১/৩৬১-৬২।
৩১. আব্দুল ওয়াহহাব শা'রানী (৮৯৮-৯৭৩হিঃ), মীযানুল কুবরা (দিল্লী ছাপাঃ ১২৮৬ হিঃ) ১/৬৩ পৃঃ।
৩২. ঐ, ১/৭৩।
৩৩. তাফহীমাত ১/৩৬৬।
৩৪. আলবানী, আল-হাদীছু হুজিয়াতুন বিনাফসিহী, পৃঃ ২৯।
৩৫. দ্রঃ 'আহলেহাদীছ আন্দোলন' (ডক্টরেট থিসিস) পৃঃ ১৮০; গৃহীত শারহু বেকায়াহ-এর মুকাদ্দামাহ (দিল্লী ছাপা ১৩২৭ হিঃ) পৃঃ ২৮ শেষ লাইন; ঐ দেউবন্দ ছাপা, তাবি, পৃঃ ৮)।
৩৬. আহমাদ, বায়হাক্বী, মিশকাত হা/১৭৭ 'কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা' অনুচ্ছেদ।
৩৭. যাওয়াবে' পৃঃ ১৪৫, গৃহীত সাপ্তাহিক আল-ই'তিছাম লাহোর, ২৭ মে ও ৩ জুন ১৯৫৫।
৩৮. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (কায়রোঃ দারুত তুরাছ, ১৩৫৫ হিঃ) ১/১৩৪ পৃঃ।
৩৯. মীযান ১/৬২।

📘 হাদিসের প্রামানিকতা > 📄 ‘যান্নী'-এর ব্যাখ্যা

📄 ‘যান্নী'-এর ব্যাখ্যা


'যান্নী'-এর ব্যাখ্যা ( شرح الظني )
খ্রিষ্টান প্রাচ্যবিদগণ ও তাদের অনুসারী মুসলিম পণ্ডিতগণ হাদীছ শাস্ত্রের গভীরে প্রবেশ না করার ফলে 'যান্ন' (ظن)-এর ব্যাখ্যায় দারুণভাবে ভ্রান্তি তে পড়েছেন। তাঁরা 'যান্নী'-এর আভিধানিক অর্থ 'ধারণা নির্ভর' হিসাবে ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন। অথচ প্রকৃত অর্থ তা নয়।
উর্দুতে 'যান্ন' কল্পনা বা ধারণা অর্থে ব্যবহৃত হ'লেও আরবীতে বিনা কারণে উক্ত অর্থে ব্যবহৃত হয় না। যেমন ভাষাবিদ রাগেব ইসফাহানী বলেন,
الظَّن: اِسْمٌ لِمَا يَحْصُلُ عَنْ أَمَارَةِ، وَمَتَى قَوِيَتْ أَدَّتْ إِلَى الْعِلْمِ، وَمَتَى ضَعُفَتْ جِدًّا لَّمْ يَتَجَاوَزْ حَدَّ التَّوَهُم
'যে জ্ঞান নির্দশনসমূহের মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাকে 'যান্ন' বলা হয়। নিদর্শন ও প্রমাণাদি যখন শক্তিশালী হয়, তখন তা ইল্ল্ম বা দৃঢ় বিশ্বাস অর্থে উপনীত হয়। আর যখন নিদর্শন ও প্রমাণাদি খুবই দুর্বল হয়, তখন তা ধারণার সীমা অতিক্রম করে না' (মুফরাদাত)। কুরআনে উপরোক্ত দুই অর্থেই 'যান্ন' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন-
(১) 'দৃঢ় বিশ্বাস' ( الظن في معني اليقين ) অর্থে। যেমন-
(ক) আল্লাহ বলেন, الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُوْا رَبِّهِمْ وَأَنَّهُمْ إِلَيْهِ رَاجِعُونَ '(ঈমানদার তারাই, যারা দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে, নিশ্চয়ই তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাত লাভ করবে এবং তারা তাঁরই নিকটে ফিরে যাবে' (বাক্বারাহ ২/৪৬)।
(খ) পাপীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَرَأَى الْمُجْرِمُونَ النَّارَ فَظَنُّوا أَنَّهُمْ مُوَاقِعُوهَا وَلَمْ يَجِدُوا عَنْهَا مَصْرِفًا 'অপরাধীরা আগুন দেখে দৃঢ়ভাবে বুঝবে যে, তারা সেখানে পতিত হচ্ছে এবং তারা ওখান থেকে কোন পরিত্রাণস্থল পাবে না' (কাহফ ১৮/৫৩)।
(গ) অতঃপর জান্নাতীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, 'ডানহাতে আমলনামা পাওয়ার পর খুশীতে তারা বলে উঠবে, هَاؤُمُ اقْرَءُوا كتابية، إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي ملاق حسابيه 'এই নাও! আমার আমলনামা, তোমরা পড়ে দেখ'। 'আমি দৃঢ় বিশ্বাস রাখতাম যে, আমাকে অবশ্যই হিসাবের সম্মুখীন হ'তে হবে' (হা-ক্বাহ ৬৯/২০)।
(ঘ) জিনেরা কুরআন শুনে বলেছিল, وَأَنَا ظَنَنَّا أَنْ لَنْ تُعْجِزَ اللَّهُ فِي الْأَرْضِ وَلَنْ نُعْجِزَهُ هَرَبًا আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আমরা কখনোই পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাস্ত করতে পারব না এবং পালিয়ে গিয়েও তাঁকে ব্যর্থ করতে পারব না' (জিন্ন ৭১/১২)।
(২) 'ধারণা' (الظن في معني الخرص) অর্থে। যেমন-
(ক) আল্লাহ বলেন, إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ 'অধিকাংশ লোক ধারণার অনুসরণ করে এবং তারা কেবল অনুমান ভিত্তিক কথা বলে' (আন'আম ৬/১১৬)।
(খ) অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَمَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا '(ফেরেশতা) বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল ধারণার অনুসরণ করে। অথচ সত্যের মুকাবিলায় ধারণার কোন মূল্য নেই' (নাজম ৫৩/২৮)।
মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণ হাদীছকে যে 'যানু' বলেছেন, তার অর্থ হ'ল প্রথমোক্ত 'যান্ন'। তার অর্থ কখনোই শেষোক্ত 'যান্ন' বা নিছক ধারণা ও কল্পনা নয়।
ইসলামী শরী'আতে প্রথমোক্ত 'যান্ন'-এর গুরুত্ব অপরিসীম। চুরি, মদ্যপান ব্যভিচার, হত্যাকাণ্ড প্রভৃতি অপরাধের বিচার ও শাস্তি বিধানের জন্য আদালতের বিচারক বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে 'নিশ্চত ধারণা'য় উপনীত হওয়ার চেষ্টা করেন। দীর্ঘ ও সূক্ষ্ম তদন্তের পর আসামীর ব্যাপারে ধারণা নিশ্চিত হ'লেই তবে তাকে দণ্ড প্রদান করা হয়। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্বের সর্বযুগের তাবৎ বিচার ব্যবস্থাই নির্ভর করছে ধারণার উপরে। নিশ্চিত ধারণার ভিত্তিতেই মানুষের জেল-ফাঁস হয়ে থাকে।
ইসলাম উক্ত রূপ 'নিশ্চিত ও প্রমাণসিদ্ধ ধারণা'-কে শুধু সমর্থনই দেয়নি, বরং গুরুত্ব দিয়েছে। যেমন মৃত্যুকালীন অছিয়তের সময় দু'জন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী রাখার নির্দেশ দানের পর কুরআনে বলা হচ্ছে, 'যদি তোমাদের সন্দেহ হয়, তবে উভয়কে ছালাতের পরে থাকতে বলবে। তারপর উভয়ে আল্লাহর নামে শপথ করবে যে, আমরা এই সাক্ষ্যের মাধ্যমে কোনরূপ স্বার্থ হাছিল করব না, যদিও তার নিকটাত্মীয় হয় এবং তারা বলবে যে, আমরা গোনাহ করব না, (যদি করি, তাহ'লে) সে অবস্থায় আমরা গোনাহগারদের অন্তর্ভুক্ত হব'। 'অতঃপর যদি জানা যায় যে, উক্ত দু'জন সাক্ষী কোন পাপে লিপ্ত হয়েছে (অর্থাৎ মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে), তাহ'লে অন্য দু'জন তাদের স্থলে দাঁড়িয়ে যাবে এবং দু'জনে আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে যে, আমাদের সাক্ষ্য অবশ্যই ঐ দু'জনের সাক্ষ্য অপেক্ষা সত্য এবং আমরা সীমালংঘনকারী নই। (যদি হই) তাহ'লে সেক্ষেত্রে আমরা নিশ্চিতভাবে যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হ'য়ে যাব' (মায়েদাহ ৫/১০৬-১০৭)।
উক্ত আয়াতে সাক্ষ্য মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা ব্যক্ত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে সাক্ষ্য 'যান্ন' বা ধারণা নির্ভর প্রমাণিত হয়েছে। তথাপি পুনরায় সঠিক সাক্ষ্যের মাধ্যমেই বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে বিবাহের সাক্ষী, চুরির সাক্ষী, ব্যভিচারের সাক্ষী, হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে ন্যায়নিষ্ঠ সাক্ষীদের সাক্ষ্যের উপরেই নির্ভর করতে বলা হয়েছে। যদিও সাক্ষ্যের মাধ্যে সত্য-মিথ্যার আশংকা বিদ্যমান থাকে। বিচারক চূড়ান্ত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিশ্চিত সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করবেন, এটাই সর্বদা কাম্য থাকে এবং বাদী-বিবাদী সকলেই উক্ত 'রায়' মেনে নেন ও সেমতে ফাঁসির দড়ির নীচে আসামী নিজের গলা বাড়িয়ে দেন। একইভাবে চিকিৎসক তাঁর সর্বোচ্চ ধারণার ভিত্তিতেই রোগ নির্ণয় করেন ও ঔষধ নির্বাচন করেন বা রোগীর অস্ত্রোপচার করেন। রোগী নির্বিবাদে তা মেনে নেন এবং মৃত্যুর সম্ভাবনা জেনেও বণ্ড লিখে দিয়ে ডাক্তারের অস্ত্রোপচারের টেবিলে নিজেকে সমর্পণ করে দেন।
হাদীছের বিশুদ্ধতা প্রমাণের ক্ষেত্রেও মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণ চিকিৎসক ও বিচারকের ন্যায় চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। কেবল বর্ণনাকারীকে নয় বরং সনদ, মতন ও আনুষঙ্গিক সকল বিষয় যাচাই করেই তাঁরা হাদীছটি সত্য সত্যই রাসূল (ছাঃ)-এর কি-না সে বিষয়ে নিশ্চিত ধারণা লাভে সচেষ্ট হন। যেসব হাদীছের ক্ষেত্রে তাঁরা নিশ্চিত হন, সেগুলি 'ছহীহ' সাব্যস্ত হয়। আর যেগুলিতে নিশ্চিত হতে পারেন না, সেগুলি 'যঈফ' সাব্যস্ত হয়। বর্ণনাকারীর সংখ্যা সর্বস্তরে অগণিত হলে এবং তাতে মিথ্যার কোন অবকাশ না থাকলে এবং সেগুলি সর্বযুগে অবিরত ধারায় বর্ণিত ও গৃহীত হ'লে সেগুলিকে 'মুতাওয়াতির' (متواتر) বলা হয়। পক্ষান্তরে বর্ণনাকারী একজন বা একাধিক হ'লে তাকে 'আহাদ' (آحاد) বলা হয়। ইবনু হাযম আন্দালুসী (রহঃ) বলেন,
القسم الثاني من الأخبار ما نقله الواحد عن الواحد فهذا إذا اتصل برواية العدول إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم وجب العمل به ووجب العلم بصحته أيضا
'যদি একজন সত্যনিষ্ঠ রাবী আরেকজন সত্যনিষ্ঠ রাবী থেকে বর্ণনা করেন এবং এভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন সনদ বা বর্ণনাসূত্র পাওয়া যায়, তবে তার উপরে আমল ওয়াজিব হবে এবং তাকে বিশুদ্ধ জানাও ওয়াজিব হবে'। তিনি বলেন, এ বিষয়ে উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত রয়েছে এবং ইমাম আবু হানীফা, মালেক, শাফেঈ, আহমাদ, দাউদ প্রমুখ বিদ্বানগণ থেকেও একই কথা প্রমাণিত হয়েছে'।
তিনি বলেন, পরবর্তী যুগের কিছু লোক 'খবরে ওয়াহেদ' (خبر واحد) সম্পর্কে সন্দেহবাদ আরোপ করতে চেয়েছেন। অথচ তারা বলে থাকেন যে, ইসলাম পূর্ণাঙ্গ দ্বীন, যা সূরায়ে মায়েদাহ ৩ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে এবং আল্লাহ নিজেই কুরআন ও হাদীছের হেফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন, যা সূরা হিজ্র ৯ ও ক্বিয়ামাহ ১৬-১৯ আয়াতসমুহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। এক্ষণে আধুনিক চিন্তাবিদগণের ধারণা মতে উক্ত পূর্ণাঙ্গ দ্বীনে যদি সন্দেহ সৃষ্টি করা হয় এবং তাতে সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত হয়ে যায় ও তা পার্থক্য করার সুযোগ না থাকে, তাহ'লে ইসলাম পূর্ণাঙ্গ ও সর্বশেষ দ্বীন কিভাবে হবে? বরং উক্ত সন্দেহবাদ আরোপের মাধ্যমে দ্বীনের সুদৃঢ় ইমারতকে ধ্বংস করা হবে। অতএব এটাই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত সত্য কথা যে, ন্যায়নিষ্ঠ রাবীদের মাধ্যমে বর্ণিত হাদীছ অকাট্ট ও বিশুদ্ধ এবং তার উপরে দৃঢ় বিশ্বাস ও আমল দু'টিই ওয়াজিব'।
মাওলানা মওদূদী 'মুতাওয়াতির' হাদীছগুলিকে 'ইয়াক্বীনী' (-) বা নিশ্চিত বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন। কিন্তু 'আহাদ' হাদীছগুলিকে বিশ্বাসযোগ্য বলেননি। এখানে গিয়ে তিনি মুজতাহিদগণের রায় ও তাদের ব্যক্তিগত রুচিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অথচ অল্প সংখ্যক 'মুতাওয়াতির' হাদীছ ব্যতীত ইসলামী শরী'আতের বিশাল ভাণ্ডারের প্রায় সবটুকুই নির্ভর করে 'আহাদ' পর্যায়ের হাদীছসমূহের উপরে। ফলে 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ের হাদীছসমূহকে সন্দেহ বা অবিশ্বাস করার অর্থ পুরো ইসলামী শরী'আতকে অবিশ্বাস করা। জানিনা সুন্নাহকে বাদ দিয়ে এঁরা ইসলামের নামে দেশে কিসের হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবেন!
মূলতঃ 'আহাদ' পর্যায়ের হাদীছসমূহে যদি সত্যতা ও নিশ্চয়তার প্রমাণাদি মওজুদ থাকে, বিদ্বানগণ তা কবুল করে থাকেন এবং খোদ সংকলক যদি হাদীছের বিশুদ্ধতার অপরিহার্যতাকে নিজের জন্য শর্ত করে থাকেন, তবে ঐ হাদীছ নিঃসন্দেহে কবুলযোগ্য। চাই সেটা আক্বীদা বিষয়ে হৌক বা আহকাম বিষয়ে হৌক। যেমন বুখারী-মুসলিম সংকলিত ও হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) বর্ণিত বিখ্যাত হাদীছ إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بالنيات 'নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপরে নির্ভরশীল' (মুসলিম)। হাদীছটির একমাত্র রাবী ওমর (রাঃ) এবং এটি 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ের হাদীছ। হাদীছটি উম্মতের সকল বিদ্বান কবুল করে নিয়েছেন এবং এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সংকলক মুহাদ্দিছগণ নিশ্চয়তা দিয়েছেন। অনুরূপভাবে ছাদাক্বাতুল ফিত্র ফরয হওয়ার হাদীছ, ফরয গোসলের হাদীছ প্রভৃতি খবরে ওয়াহেদের অন্তর্ভুক্ত।
ইবনু হাযম (রহঃ) বলেন, মূলতঃ ১ম শতাব্দী হিজরী পর্যন্ত আহলুস সুন্নাহ, খারেজী, শী'আ, ক্বাদারিয়া সকলে 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ের হাদীছকে বিনা বাক্য ব্যয়ে কবুল করতেন। কিন্তু দ্বিতীয় শতাব্দীতে এসে মু'তাযিলা দার্শনিকগণ ইজমায়ে উম্মতের বিরোধিতা করে এ প্রশ্ন উত্থাপন করেন ও বিতর্কে লিপ্ত হন'। ৪১
পরবর্তীকালে এদের কূটতর্কে বিভ্রান্ত হয়েছেন বহু বিদ্বান এবং সেই সুযোগ গ্রহণ করেছেন প্রাচ্যবিদ খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ। আবার তাদেরই যুক্তিবাদের ধূম্রজালে আটকা পড়েছেন বহু আধুনিক ইসলামী চিন্তাবিদ। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন-আমীন!

টিকাঃ
৪০. ইসমাঈল সালাফী, হুজ্জিয়াতে হাদীছ (লাহোর ১৪০১ হিঃ/১৯৮১ খৃঃ) পৃঃ ১১৬-১১৭, গৃহীত: আল-ইহকাম ১/১০৮, ১১৪, ১২৩, ১২৪।
৪১. হুজ্জিরাতে হাদীছ পূঃ ১১২, গৃহীত: আল-ইহকাম ১/১১৪।

📘 হাদিসের প্রামানিকতা > 📄 যুগে যুগে হাদীছ অস্বীকারকারীগণ

📄 যুগে যুগে হাদীছ অস্বীকারকারীগণ


(منكرو الحديث في العصور) আল্লামা ইসমাঈল গুজরানওয়ালা (১৩১৪-১৩৭৮/১৮৯৫-১৯৬৮) প্রদত্ত যুগে যুগে হাদীছ অস্বীকারকারীদের তালিকাটি নিম্নে প্রদত্ত হ'ল :
১. খারেজী (خارجی): এরা প্রধানতঃ রাসূল পরিবারের মর্যাদায় বর্ণিত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। ২০০ হিজরীর পরে এদের আবির্ভাব ঘটে।
২. শী'আ (شیعر) : এরা ছাহাবীগণের মর্যাদায় বর্ণিত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। ২০০ হিজরীর পরে এদের আবির্ভাব হয়।
৩. মু'তাযিলা ও জাহমিয়া (معز وجی): এরা আল্লাহ্ গুণাবলী সংক্রান্ত হাদীছ সমূহকে অস্বীকার করে। ২২১ হিজরীর পরে এদের আবির্ভাব হয়।
৪. ক্বাযী ঈসা ইবনে আবান ও তার অনুসারীগণ এবং পরবর্তী ফক্বীহদের মধ্যে ক্বাযী আবু যায়েদ দাবূসী প্রমুখ। তাদের দৃষ্টিতে গায়ের ফক্বীহ ছাহাবীগণের বর্ণিত হাদীছকে তারা অস্বীকার করেন। ২২১ হিজরীর পরে এদের আবির্ভাব ঘটে।
৫. মু'তাযিলা ও দার্শনিকদের সাথে ফক্বীহদের একটি ছোট দল। এরা উচ্ছ্বল ও ফুরু' তথা মূল ও প্রশাখাগত সকল বিষয়ে খবরে ওয়াহেদ পর্যায়ের হাদীছসমূহের ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। ৪০০ হিজরীর পর এদের আবির্ভাব হয়।
৬. পাশ্চাত্য সভ্যতায় ভীত ইসলামী পণ্ডিতগণ। যেমন মৌলবী চেরাগ আলী, স্যার সৈয়দ আহমাদ খান ও তাদের অনুসারীবৃন্দ। এরা হাদীছ শাস্ত্রে আনকোরা। তাদের ধারণা মতে হাদীছ সমূহ মূলতঃ ইতিহাসের সমষ্টি মাত্র। অতএব সেখান থেকে চাহিদামত তারা কিছু গ্রহণ করেছেন ও কিছু বর্জন করেছেন। ১৩০০ হিজরীর কাছাকাছি সময়ে এদের আবির্ভাব ঘটে।
৭. মৌলবী আব্দুল্লাহ চকড়ালবী, মিস্ত্রী মুহাম্মাদ রামাযান গুজরানওয়ালা, মৌলবী হাশমত আলী লাহোরী, মৌলবী রফীউদ্দীন মুলতানী। ১৩০০ হিজরীর পরবর্তী এই সকল বিদ্বান হাদীছকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।
৮. মৌলবী আহমাদ দ্বীন অমৃতসরী, মিষ্টার গোলাম আহমাদ পারভেয। এরা স্যার সৈয়দ আহমাদের দ্বারা প্রভাবিত। তবে এরা জাহিল ও লাগামহীন। ১৪শ শতাব্দীর এই ব্যক্তিগণের নিকটে কুরআন, হাদীছ ও পুরা দ্বীনটাই একটা খেলা মাত্র। তাদের মতে বেশীর বেশী এটাকে একটা রাজনৈতিক দর্শন মনে করা যেতে পারে। যাকে যখন-তখন বদলানোর অধিকার আমাদের আছে। তবে মৌলবী আহমাদ দ্বীন কোন কোন 'মুতাওয়াতির' আমলকে এগুলি থেকে পৃথক মনে করতেন।
৯. মাওলানা শিবলী নো'মানী (১৮৫৭-১৯১৪), হামীদুদ্দীন ফারাহী, আবুল আ'লা মওদূদী (১৯০৩-১৯৭৯), আমীন আহসান ইছলাহী এবং নাদওয়াতুল ওলামা লাক্ষ্ণৌ-এর বিদ্বানমণ্ডলী। তবে সাইয়িদ সুলায়মান নাদভী (১৮৮৪-১৯৫৫) ব্যতীত। ১৩শ ও ১৪শ শতাব্দী হিজরীর এই শেষোক্ত বিদ্বানগণ হাদীছের অস্বীকারকারী নন। তবে এঁদের চিন্তাধারায় হাদীছের প্রতি গুরুত্বহীনতা ও তাচ্ছিল্যভাব (استخفاف واستحقار ) প্রকাশ পায় এবং তাঁদের আলোচনায় হাদীছ অস্বীকারের চোরাপথ সমূহ খুলে যায়। ৪২

টিকাঃ
৪২. হুজ্জিয়াতে হাদীছ পৃঃ ১১৩-১১৪।

📘 হাদিসের প্রামানিকতা > 📄 মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া

📄 মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া


২. মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া (১৩১৭-১৪০২ হিঃ/১৮৯৮-১৯৮২ খৃঃ)
তাবলীগ জামা'আতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস (১৩০৩-১৩৬৩/১৮৮৫-১৯৪৪ খৃঃ)-এর নির্দেশক্রমে অন্যতম নেতা মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া কান্ধলভী সাহারানপুরী 'তাবলীগী নেছাব' প্রণয়ন করেন। যাতে হেকায়াতে ছাহাবা এবং ফাযায়েলে নামায, তাবলীগ, যিকর, কুরআন, রামাযান, দরূদ, ছাদাক্বাত ও হজ্জসহ মোট ৯টি বিষয়ে দু'খণ্ডে সমাপ্ত বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ১৯২১ সালে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের 'মেওয়াত' )میوات( এলাকার 'ফীরোযপুর নিমক' )فیروز پورنمک( গ্রামে প্রচলিত তাবলীগ জামা'আত অস্তিত্ব লাভ করে। যেখানে মাওলানা ইলিয়াস (১৮৮৫-১৯৪৪ খৃঃ জন্মস্থান: মেওয়াত, হরিয়ানা, ভারত) তাঁর শিষ্যদের নিকট প্রায়ই যেতেন। একদা সেখানে থাকা অবস্থায় তাঁর কিছু শিষ্য এসে বলল যে, তারা কালেমা শিখানোর জন্য ও মসজিদে ছালাতে আসার জন্য বাড়ী বাড়ী গিয়ে লোকদের দাওয়াত দিয়ে থাকে। তাদের একাজটি তাঁর খুব পসন্দ হয় এবং অন্যান্য গ্রামেও দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি তাদের উৎসাহ দেন। এভাবেই প্রচলিত তাবলীগ জামা'আতের সূচনা হয়। ৪৩
তাবলীগী নেছাব )تبلینی نصاب : আহলেহাদীছের নিকটে 'ছহীহায়েন'-এর যে মর্যাদা, তাবলীগী ভাইদের নিকটে 'তাবলীগী নেছাব'-এর সেই মর্যাদা বললেও অত্যুক্তি হবে না। এ কিতাবটিই তাদের নিকটে সর্বাধিক মর্যাদামণ্ডিত এবং ঘরে-বাইরে, সফরে-অবসরে সর্বদা অতি যত্নের সাথে পঠিত। তাবলীগী নেছাবের লেখক 'শায়খুল হাদীছ' নামে খ্যাত। অথচ হাদীছের পিঠে মিষ্টিমুখে যে ছুরিকাঘাত তিনি করেছেন, তা অন্য কারু পক্ষে সম্ভব হয়েছে কি-না সন্দেহ। কুরআনের আয়াত ও হাদীছের অপব্যাখ্যার সাথে সাথে তিনি যেসব উদ্ভট ও কাল্পনিক মা'রেফতী গল্পসমূহ জুড়ে দিয়েছেন, তা একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। দুর্ভাগ্য যে, এই কিতাবটি বিভিন্ন মসজিদে জামা'আত শেষে ইমাম অথবা তাবলীগের লোকেরা মুছল্লীদেরকে অতি বিনয় ও নম্রতার সাথে পড়ে শুনিয়ে থাকেন ও শেষে দলবদ্ধভাবে মুনাজাত (প্রার্থনা) করে থাকেন।
অথচ এগুলি পড়লে আল্লাহভক্তির স্থান দখল করে নেয় তথাকথিত মুরব্বী ও বুযর্গ ভক্তি। কুরআন-হাদীছের স্থান দখল করে নেয় বিভিন্ন তরীকার ছুফী ও তাদের কাশফ ও কারামতের মিথ্যা ও অলীক কাহিনীসমূহ। মুছল্লীর মাথার মধ্যে তখন ঐসব ভিত্তিহীন কল্পকথা ঘুরপাক খেতে থাকে। আর ভাবে যে, কখন চিল্লায় গিয়ে ঐসব ছুফী বুর্গের ন্যায় উচ্চ মর্যাদা লাভে ধন্য হব। আশ্চর্যের বিষয়, দারুল উলূম দেউবন্দের মসজিদেও নাকি এ কিতাবটি পড়ে মুছল্লীদের শুনানো হয় এবং এ যাবত তার এই বইটির প্রতিবাদে কেউ কোন বই প্রকাশ করেছেন বলে জানা যায়নি। উপমহাদেশের বিশাল হানাফী জামা'আতের হাযার হাযার হানাফী আলেম এ বইটিকে কিভাবে নীরবে সর্মথন দিয়ে চলেছেন।
ভেবে আশ্চর্য হ'তে হয় যে, 'ইসরাঈলে' ইসলামী বইপত্র নিষিদ্ধ, সেখানেও এ কিতাবের রয়েছে অবাধ প্রবেশাধিকার এবং এ কিতাবের প্রচারক তাবলীগী ভাইদের রয়েছে সেদেশে নির্বিঘ্নে পদচারণার ঢালাও অনুমতি। একইভাবে অনুমতি রয়েছে সেখানে কাদিয়ানীদের ব্যাপক প্রবেশাধিকারের। কাদিয়ানীদের হেড অফিস লণ্ডনে ও ইসরাঈলের হাইফা নগরীতে। দু'টি আন্দোলনেরই উৎসস্থল ভারত উপমহাদেশ এবং দু'টিরই জন্ম বৃটিশ আমলে। কাদিয়ানীরা ধর্মদ্রোহী কাফের। কিন্তু তারা ইসলামের নামেই দেশে ও বিদেশে বিকৃত ইসলামের প্রচার করে থাকে। পক্ষান্তরে তাবলীগীরা ইসলামের গণ্ডীর মধ্যে থেকেই ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা দেশ-বিদেশে প্রচার করে। আখেরাতে মুক্তির সন্ধানী হুঁশিয়ার মুমিনগণ সাবধানে পা ফেলবেন, এটাই কাম্য।
তাবলীগী নেছাবের অন্য বিষয় বাদ দিয়ে কেবল তাদের হাদীছ প্রচারের কয়েকটি নমুনা উদাহরণ স্বরূপ তুলে ধরা হ'ল:
১. ওমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আদম (আঃ) অপরাধ করার পর আল্লাহ্ আরশের দিকে তাকিয়ে দেখেন সেখানে লেখা আছে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'। তখন তিনি মুহাম্মাদের অসীলায় আল্লাহ্র নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। অতঃপর আল্লাহ আদমকে বলেন, যদি মুহাম্মাদ না হ'তেন, তাহ'লে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না'। অন্য একটি প্রসিদ্ধ জাল হাদীছ উক্ত মর্মে প্রচলিত আছে, 'লাওলা-কা লামা খালাক্বতুল আফলা-কা' (যদি আপনি না হ'তেন, তাহ'লে আসমান-যমীন কিছুই সৃষ্টি করতাম না)। ৪৪
অন্যত্র 'ফাযায়েলে দরূদ শরীফে' (পৃঃ ৮৫, গল্প নং ১৪) তিনি বলেছেন, 'শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী স্বীয় 'মাদারেজুন নবুঅত' বইয়ে লিখেছেন যে, যখন হযরত হাওয়া-র জন্ম হ'ল, তখন হযরত আদম (আঃ) তার দিকে হাত বাড়াতে চাইলেন। ফেরেশতারা বললেন, ছবর কর, যতক্ষণ না বিয়ে হবে এবং মোহর না দেওয়া হবে। আদম (আঃ) বললেন, মোহর কি? ফেরেশতারা বললেন, 'মুহাম্মাদ-এর উপর তিনবার দরূদ শরীফ পাঠ করুন'। এক রেওয়ায়াতে বিশ বারের কথা এসেছে।' অথচ পবিত্র কুরআনে আদম সৃষ্টির ও তাঁর তওবা করার যে বর্ণনা রয়েছে (বাক্বারাহ ৩০-৩৯; আ'রাফ ২৪), সেখানে এসবের কিছুই নেই।
পীর-আউলিয়াদের 'অসীলা' ধরে পরকালে মুক্তি পাওয়ার বৈধতা প্রমাণের জন্য এসব জাল হাদীছ ও মিথ্যা বর্ণনা পেশ করা হয়েছে। এরা পীর ধরতে বলেন না, বরং 'মুরব্বী' ধরতে বলেন। যেমন শায়খুল হাদীছ 'ফাযায়েলে তাবলীগে' (পৃঃ ৩) বলেছেন, যুগের ওলামা-মাশায়েখ হযরতগণের রেযামন্দি ও সন্তুষ্টি পরকালীন নাজাতের অসীলা ও গোনাহের কাফফারা হয়ে থাকে...।' অথচ কুরআন ও হাদীছের নির্দেশনা অনুযায়ী রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসরণ ব্যতীত পরকালে মুক্তি পাবার কোন উপায় নেই (বুখারী, মিশকাত হা/১৪৩)।
২. হযরত আদম (আঃ) হিন্দুস্তান থেকে পায়ে হেঁটে এক হাযার বার হজ্জ করেছেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, নবীদের সাধারণ রীতি ছিল পায়ে হেঁটে হজ্জ করা। ৪৫
বাস্তবতা এই যে, শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) মদীনা থেকে মক্কায় সওয়ারীতে এসে বিদায় হজ্জ করেছিলেন। অথচ ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর ন্যায় একজন প্রখ্যাত ছাহাবীর নামে এমন মিথ্যা বর্ণনা চালিয়ে দেওয়া হ'ল। একইভাবে আদম (আঃ) সম্পর্কিত বর্ণনাটি একেবারেই ভিত্তিহীন। কেননা তাঁর মোট বয়স ছিল ৯৪০ অথবা ৯৬০ বছর। ৪৬ তাছাড়া তিনি হিন্দুস্তানে বসবাস করেছেন বলে কুরআন ও ছহীহ হাদীছে কোন প্রমাণ নেই।
৩. ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করবে, তার জন্য আমার শাফা'আত ওয়াজিব হবে'। অন্য বর্ণনায় 'যে ব্যক্তি আমার মৃত্যুর পরে আমাকে যিয়ারত করবে, সে ব্যক্তি যেন আমার জীবদ্দশায় আমার সাথে সাক্ষাত করল'। অন্য বর্ণনায় 'যে ব্যক্তি হজ্জ করল, অথচ আমার কবর যিয়ারত করল না, সে আমার উপর যুলুম করল'।৪৭ হাদীছগুলি মওযু বা জাল। ৪৮ আর এটা স্পষ্ট যে, রাসূল (ছাঃ)-এর কবর যেয়ারত হজ্জের কোন অংশ নয়।
৪. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি ছালাত কাযা করবে, যদিও সে তা পরে আদায় করে, তথাপি সময় মত ছালাত আদায় না করার কারণে ঐ ব্যক্তি এক হোক্ববা জাহান্নামে থাকবে। এক 'হোকুবা' হ'ল ২ কোটি ৮৮ লক্ষ বছর। ৪৯ পাঠক স্মরণ রাখুন, খন্দকের যুদ্ধে রাসূল (ছাঃ)-এর পর পর কয়েক ওয়াক্ত ছালাত এবং খায়বার যুদ্ধে ফজরের ছালাত ক্বাযা হয়েছিল। এতদ্ব্যতীত ছাহাবায়ে কেরাম থেকেও ছালাত কাযা করার বহু প্রমাণ দেখা যায়। তাহ'লে তাঁদের অবস্থা কী হবে?
৫. (ক) মুসলমানদের জিহাদী জাযবা খতম করার জন্য তিনি বিনা সনদে লেখেন, একদা রাসূল (ছাঃ) নাজদে সৈন্য পাঠান। তারা দ্রুত যুদ্ধ জয় করে গণীমতের মালামাল সহ ফিরে আসেন। এত দ্রুত ফিরে আসায় লোকেরা বিস্ময় প্রকাশ করলে রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমি কি তোমাদেরকে এর চাইতেও কম সময়ে এর চাইতেও বেশী গণীমত লাভকারী দল সম্পর্কে সংবাদ দিব না? তারা হ'ল ঐসব লোক, যারা ফজরের ছালাত জামা'আতের সাথে আদায় করে। অতঃপর সূর্যোদয়ের পরে দু'রাক'আত ইশরাকের ছালাত আদায় করে'।৫০ তিনি ইশারাক্কের দু'রাক'আত ছালাতকে জিহাদের বিজয়ের চাইতেও উত্তম বলে গণ্য করেছেন।
(খ) আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, কুযা'আহ (قضاعة) গোত্রের দু'জন ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে এসে একত্রে মুসলমান হ'লেন। পরে তাদের একজন শহীদ হয়ে গেলেন। আরেকজন একবছর পরে স্বাভাবিকভাবে মারা গেলেন। তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) পরে স্বপ্নে দেখেন যে, শহীদ ব্যক্তির আগেই ইনি জান্নাতে প্রবেশ করেছেন। তিনি বলেন যে, এতে বিস্মিত হয়ে আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, ঐ ব্যক্তি কি এক রামাযানের পূর্ণ ছিয়াম ও একবছরে ছয় হাযারের বেশী রাক'আত সুন্নাত ছালাত আদায় করেনি? ৫১ অর্থাৎ শাহাদাত লাভের চাইতে সুন্নাত-নফলের মর্যাদা বেশী।
এইভাবে সনদ বিহীন স্বপ্নের বর্ণনা ছাহাবী ও রাসূল (ছাঃ)-এর নামে লাগামহীন ভাবে লিখতে এইসব শায়খুল হাদীছের হৃদয় একটুও কেঁপে ওঠেনি। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ্বে দখলদার ইংরেজের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের মুসলমানেরা যখন জিহাদ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তখনই দেউবন্দ- সাহারানপুরের এইসব ছুফী-শায়খুল হাদীছগণ মুসলমানদের জিহাদ থেকে বিমুখ করে বৃটিশের গোলামীর দিকে ফিরিয়ে নেবার এবং দ্বীনের নামে মুসলমানদের ঈমানী চেতনা বিনাশ করে তাবলীগের বেশে দেশ-বিদেশে ঘুরানোর মিশন নিয়ে মাঠে নেমে ছিলেন। আর তার পুরস্কার স্বরূপ তখন থেকে এযাবৎ তারা ইহুদী-খৃষ্টান প্রভাবিত সকল দেশে বিনা বাধায় তাদের কথিত তাবলীগী মিশন চালিয়ে যাচ্ছে।
(গ) ত্বাউস বলেন, বায়তুল্লাহ দর্শন করা উত্তম হ'ল ঐ ব্যক্তির ইবাদতের চাইতে, যিনি ছিয়াম পালনকারী, রাত্রি জাগরণকারী এবং আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদকারী'। ৫২
এখানে বায়তুল্লাহ দর্শনকে তিনি জিহাদের চাইতে উত্তম বলতে চেয়েছেন। এতদ্ব্যতীত তাদের মধ্যে এই 'মুনকার' হাদীছটির খুবই প্রসিদ্ধি রয়েছে যে, رَجَعْنَا مِنَ الْجِهَادِ الْأَصْغَرِ إِلَى الْجِهَادِ الْأَكْبَر ‘আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে ফিরে এলাম'।৫৩ এর দ্বারা তারা তাদের হালকায়ে যিক্রের মজলিসগুলিকে 'বড় জিহাদ' এবং সশস্ত্র জিহাদের ময়দানকে 'ছোট জিহাদ' হিসাবে গণ্য করতে চেয়েছেন। ৫৪
৬. আবু হুরায়রা (রাঃ)-হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আমার উপর পঠিত দরূদ পুলছিরাত পার হওয়ার সময় 'নূর' (জ্যোতি) হবে। যে ব্যক্তি জুম'আর দিন আমার উপর ৮০ বার দরূদ পড়বে, তার আশি বছরের গোনাহ মাফ করা হবে'। ৫৫

টিকাঃ
৪৩. দিল্লী: পাক্ষিক মাজাল্লা আহলেহাদীছ পূঃ ৭. ২১শে জুন ১৯৮৬ ইং/১৩ই শাওয়াল ১৪০৬ হিঃ সম্পাদক ও লেখক: হাকীম মুহাম্মাদ আজমল খাঁ।
৪৪. সিলসিলা যঈফাহ ওয়াল মওযূ'আহ হা/২৫, ২৮২; ফাযায়েলে যিকর (মূল উর্দু, দিল্লী: উর্দু বাযার, মদীনা বুক ডিপো, ১৩৯৫হিঃ/১৯৭৫ খৃঃ) পৃঃ ৯৫।
৪৫. ফাযায়েলে হজ্জ পৃঃ ৩৫।
৪৬. তিরমিযী, মিশকাত হা/৪৬৬২, 'শিষ্টাচার' অধ্যায়, 'সালাম' অনুচ্ছেদ; ঐ, হা/১১৮, 'ঈমান' অধ্যায়, 'তাক্বদীরে বিশ্বাস' অনুচ্ছেদ; তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৫০৭২, ৮/৪৫৯ পৃঃ।
৪৭. ফাযায়েলে হজ্জ ৯৬, ৯৭, ৯৮ পৃঃ।
৪৮. দারাকুৎনী, ইরওয়াউল গালীল হা/১১২৭-২৮।
৪৯. ফাযায়েলে নামায, পৃঃ ৩৯।
৫০. ফাযায়েলে নামায, পৃঃ ২০।
৫১. ফাযায়েলে নামায পৃঃ ১৫।
৫২. ফাযায়েলে হজ্জ, পৃঃ ৭৭।
৫৩. সিলসিলা যঈফাহ ওয়াল মওযূ'আহ হা/২৪৬০, হাদীছ 'মুনকার'।
৫৪. আব্দুর রহমান উমরী, তাবলীগী জামা'আত আওর উসকা নিছাব (নয়াদিল্লী: দারুল কিতাব, ১৯৮৮ খৃঃ); পৃঃ ৮৪।
৫৫. ফাযায়েলে দরূদ শরীফ ১/৩৮, হা/৪; সিলসিলা যঈফাহ হা/৩৮০৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00