📄 হাদীছ বিরোধীদের যুক্তিসমূহ
(أدلة منكري الحديث (sline Rasions
১. কুরআন সকল বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পেশ করেছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْء 'আমরা কিতাবে কোন কিছু ছাড়িনি' (আন'আম ৬/৩৮)। অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন, وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْء 'আর আমরা আপনার উপরে কুরআন নাযিল করেছি (মানুষের প্রয়োজনীয়) সকল বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা হিসাবে' (নাহল ১৬/৮৯)। অতএব হাদীছের প্রয়োজন নেই (যাওয়াবে' পৃঃ ৩১৯)।
প্রথম আয়াতের 'কিতাব' অর্থ হ'ল, 'লওহে মাহফুয'। যেখানে আল্লাহ মানুষের দ্বীন-দুনিয়ার প্রয়োজনীয় সকল বিষয় লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, কিছুই ছাড়েননি বা লিখতে ভুলেন নি।
দ্বিতীয় আয়াতের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাই হ'ল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ২৩ বছরের দীর্ঘ নবুঅতী জীবন। যাঁর কথা, কর্ম ও সম্মতি সমূহ 'হাদীছ' হিসাবে উম্মতের নিকট মওজুদ রয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوهُ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَمَا نَهَاكُمْ 'আমার রাসূল তোমাদের যা প্রদান করেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও' (হাশর ৫৯/৭)। এখানে 'প্রদান করেন' অর্থ 'আদেশ করেন' (ইবনু কাছীর)। যেমন 'আব্দুল কায়েস' গোত্রের প্রতিনিধি দল রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে এলে তিনি তাদেরকে চারটি বিষয়ে আদেশ করেন ও চারটি বিষয় নিষিদ্ধ করেন। অতঃপর তিনি উক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। ২১ অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ Coins بأَمْرِ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَمَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ فَاجْتَنِبُوهُ কোন বিষয়ে আদেশ দেই, তখন তোমরা তা সাধ্যমত পালন কর। আর যখন কোন বিষয়ে নিষেধ করি, তখন তা থেকে বিরত হও'। ২২
একদা আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হাদীছ শুনালেন, لَعَنَ اللَّهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُوتَشِمَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ الله 'আল্লাহ লা'নত করেছেন ঐ সমস্ত নারীর প্রতি যারা অন্যের শরীরে উল্কি অংকন করে, নিজ শরীরে উল্কি অংকন করায়, যারা সৌন্দর্যের জন্য ভ্রর চুল উপড়ে ফেলে ও দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে। যে সব নারী আল্লাহ্ সৃষ্টিতে বিকৃতি আনয়ন করে।' একথা বনু আসাদের জনৈকা মহিলা উম্মে ইয়াকূবের নিকট পৌঁছলে তিনি ইবনু মাসউদের নিকটে এসে বললেন, আপনি কি এরূপ কথা বলেছেন? ইবনু মাসউদ বললেন, আমি কেন তাকে লা'নত করব না, যাকে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) লা'নত করেছেন এবং যা আল্লাহ্ কিতাবে রয়েছে? তখন মহিলাটি বলল, আমার কাছে রক্ষিত কুরআনের কোথাও একথা পাইনি। জবাবে ইবনু মাসউদ বললেন, যদি তুমি কুরআন ভালভাবে পড়, তাহ'লে পাবে। তুমি কি দেখনি আল্লাহ বলেছেন, ... وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ 'আমার রাসূল তোমাদের যা আদেশ করেন, তা গ্রহণ কর... (হাশর ৫৯/৭)। তখন মহিলাটি বলল, হাঁ। ইবনু মাসউদ বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে উক্ত কাজে নিষেধ করেছেন'। তখন মহিলাটি বলল, আমার ধারণা আপনার পরিবারে এরূপ আছে। ইবনু মাসউদ বললেন, যাও দেখে আসো। মহিলাটি ভিতরে গিয়ে তেমন কিছু না পেয়ে ফিরে এল। তখন ইবনু মাসউদ (রাঃ) বললেন, যদি এরূপ থাকত, তাহ'লে তুমি আমাদের দু'জনকে (স্বামী-স্ত্রীকে) একত্রে পেতে না (অর্থাৎ তালাক হয়ে যেত)'। ২০
মোটকথা সুন্নাহর মাধ্যমেই কুরআন تبيانًا لكُلِّ شَيْئ 'সকল বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা' হয়েছে। অতএব হাদীছ ব্যতীত কুরআন অনুসরণ করা সম্ভব নয়।
২. কুরআন আল্লাহ সহজ করেছেন। অতএব হাদীছের প্রয়োজন নেই। যেমন আল্লাহ বলেছেন, وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذَّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكر 'আমরা কুরআনকে সহজ করেছি উপদেশ লাভের জন্য। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? (ক্বামার ৫৪/১৭, ২২, ৩২, ৪০)।
উত্তর: এখানে কুরআন সহজ হওয়ার অর্থ হ'ল, এর শিক্ষা-দীক্ষা সহজ- সরল ও বাস্তবায়নযোগ্য। যেমন ছালাত কায়েম কর, যাকাত দাও, ছিয়াম রাখ, হজ্জ কর। পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। অন্যায় ও অশ্লীলতা হ'তে দূরে থাক ইত্যাদি। এগুলি যেকোন কুরআন পাঠক সহজে বুঝতে পারেন। কিন্তু কুরআন অনুধাবনের অর্থ তা নয়। যেমন আল্লাহ অন্যত্র كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلَيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ
'এই কিতাব যা আমরা আপনার নিকট নাযিল করেছি, তা বরকতমণ্ডিত। তা এজন্য নাযিল করেছি যাতে লোকেরা এর আয়াতসমূহ গবেষণা করে এবং জ্ঞানীরা এ থেকে উপদেশ হাছিল করে' (ছোয়াদ ৩৮/২৯)। তিনি أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوْبِ أَقْفَالُهَا؟ 'কেন তারা কুরআন গবেষণা করেনা? নাকি তাদের হৃদয় সমূহ তালাবদ্ধ?' (মুহাম্মাদ ৪৭/২৪)। কুরআন গবেষণা ও তার মর্ম অনুধাবন ও সেখান থেকে বিধি-বিধান নির্ধারণ ও উপদেশ আহরণের জন্য প্রয়োজন কুরআনের ভাষা ও অলংকার জ্ঞানে পরিপক্কতা অর্জন করা ও অন্যান্য যরূরী বিষয়াদিতে দক্ষতা লাভ করা। বস্তুতঃ কুরআনের প্রথম ব্যাখ্যাতা হ'লেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)। অতঃপর ছাহাবায়ে কেরام, যাদের কাছে তিনি কুরআন বর্ণনা করেছেন, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করেছেন ও উপদেশ প্রদান করেছেন। যা লিপিবদ্ধ আছে 'হাদীছ' ও 'আছারে'। অতএব হাদীছ ব্যতীত কুরআন অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
৩. আল্লাহ কেবল কুরআন হেফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন, হাদীছের নয়।
উত্তর: আল্লাহ বলেছেন, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ 'আমরা যিকর নাযিল করেছি এবং আমরাই এর হেফাযতকারী' (হিজর ১৫/৯)। এখানে 'যিকর' অর্থ যেমন 'কুরআন' তেমনি 'হাদীছ'। বরং পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শরী'আতের হেফাযতকারী হ'লেন আল্লাহ। কেননা ইসলাম হ'ল পূর্ণাঙ্গ দ্বীন এবং তা মানবজাতির জন্য আল্লাহ্র একমাত্র মনোনীত ধর্ম (মায়েদাহ ৫/৩)। অতএব শত্রুরা যতই চক্রান্ত করুক, একে ধ্বংস করার ক্ষমতা কারু নেই। আল্লাহ এর হেফাযতকারী। অতএব 'যিকর' কেবলমাত্র কুরআন নয়, বরং হাদীছ সহ পূর্ণাঙ্গ শরী'আত। আল্লাহ বলেন, فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ 'অতএব তোমরা জিজ্ঞেস কর জ্ঞানীদের যদি তোমরা না জানো' (নাহল ১৬/৪৩)। এখানে 'আহলুয যিকর' অর্থ আল্লাহ্ দ্বীনে অভিজ্ঞ ব্যক্তি।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, لَا تُحَرِّكْ بِهِ لسَانَكَ لَتَعْجَلَ به (١٦) إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ (۱۷) فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ (۱۸) ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ (۱۹) 'অহি' আয়ত্ব করার জন্য দ্রুত জিহ্বা সঞ্চালন করবেন না'। 'নিশ্চয়ই তা সংরক্ষণ ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমাদের'। 'অতএব যখন আমরা (জিব্রীলের মাধ্যমে) তা পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন'। 'অতঃপর এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমাদেরই' (ক্বিয়ামাহ ৭৫/১৬-১৯)। এখানে 'বিশদ ব্যাখ্যা' অর্থ 'হাদীছ', যা অহি ও ইলহামের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর নবীকে প্রদান করেছেন। অতএব কুরআন ও হাদীছ দু'টিরই হেফাযতের দায়িত্ব আল্লাহ্।
ইবনু হাযম (রহঃ) বলেন, শরী'আত অভিজ্ঞ বিদ্বানগণের মধ্যে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই যে, আল্লাহ প্রেরিত সকল 'অহি' যিকরের অন্তর্ভুক্ত এবং সকল 'অহি' সংরক্ষিত। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ যা হেফাযত করে থাকেন।
আর আল্লাহ যার হেফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন, তা সকল প্রকার ক্ষতি হ'তে নিরাপদ এবং যা চিরকালের জন্য সকল প্রকার তাহরীফ বা পরিবর্তন ও বাতিলকরণ হ'তে মুক্ত।' তিনি বলেন, 'যারা যিকর অর্থ স্রেফ 'কুরআন' বলেন, তাদের এ দাবী মিথ্যা ও প্রমাণহীন। বরং কুরআন ও সুন্নাহ সবটাই 'অহি' এবং সবটাই যিকরের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ স্বীয় নবীকে বলেন, وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ 'আর আমরা আপনার প্রতি 'যিকর' নাযিল করেছি মানুষকে ব্যাখ্যা করে দেওয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে। যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে' (নাহল ১৬/৪৪)।
বস্তুতঃ রাসূল (ছাঃ) প্রদত্ত ব্যাখ্যা ও তাঁর প্রদর্শিত পথই হ'ল 'সুন্নাহ' বা 'হাদীছ' যা ছাহাবায়ে কেরামের স্মৃতি ও লেখনীর মাধ্যমে চিরকালের জন্য কুরআনের ন্যায় সংরক্ষিত হয়ে আছে।
টিকাঃ
২১. নাসাঈ হা/৫৬৪৩ 'পানীয়' অধ্যায় ৩৬ অনুচ্ছেদ, মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৭।
২২. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ, মিশকাত হা/২৫০৫, 'মানাসিক' অধ্যায়-১০।
২৩. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ, মিশকাত হা/৪৪৩১, 'পোষাক' অধ্যায়-২২, 'চুল আঁচড়ানো' অনুচ্ছেদ-৩।
📄 উপমহাদেশে হাদীছ বিরোধী সংগঠন সমূহ
উপমহাদেশে হাদীছ বিরোধী সংগঠন সমূহ (فِرَقُ الْمُنْكِرِين فِي الْحَدِيثِ فِي شِبْهِ الْقَارَّةِ الْهِنْدِيَّةِ)
উপমহাদেশে হাদীছ বিরোধীদের কেন্দ্রস্থল ছিল ভারতের আলীগড়, অমৃতসর প্রভৃতি শহর। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরে এটি পাকিস্ত ানের লাহোরে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে বসে তারা ইসলামের নামে অর্জিত পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ ও জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে লিপ্ত হয়।
ভারতেও এর রেশ চলতে থাকে। পাশ্চাত্য বিশ্বে এর অপপ্রচার ব্যাপ্তি লাভ করে। উর্দুভাষী না হওয়ায় বাংলাভাষী মুসলমানগণের অধিকাংশ এদের করাল থাবা থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু ইতিমধ্যে এদের কারু কারু বই বাংলায় অনুদিত হয়ে ব্যাপকহারে প্রচারিত হওয়ায় তরুণ ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেকে প্রতারিত হচ্ছেন এবং দেশে হাদীছ বিরোধী মনোভাব ক্রমে মাথাচাড়া দিচ্ছে।
বর্তমানে হাদীছ বিরোধীদের কয়েকটি ফের্কা পাকিস্তানে সংগঠিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যেমন:
১. আহলে কুরআন (فِرْقَه اَهْلِ قُرْآن)
আব্দুল্লাহ চকড়ালবী প্রতিষ্ঠিত এই দলের পুরো নাম ‘আহলু যিকরে ওয়াল কুরআন’ যার বর্তমান নেতা মুহাম্মাদ আলী রাসূল লাক্কী। পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে এর অফিস রয়েছে। এ দলের মুখপত্র ‘বালাগুল কুরআন’ (بَلاغُ القُرْآن) পত্রিকার মাধ্যমে এদের ভ্রান্ত আক্বীদা পাকিস্তানে সর্বত্র প্রচারিত হচ্ছে। অথচ কুরআনেরই নির্দেশ অনুযায়ী রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত অনুসরণ করা ফরয। আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ কর, তাহ’লে তিনি তোমাদেরকে ভালবাসবেন ও তোমাদের গোনাহসমূহ মাফ করে দিবেন’ (আলে ইমরান ৩/৩১)।
২. উম্মাতে মুসলিমাহ (فرقة آمنة مسلمة)
আব্দুল্লাহ চকড়ালবীর অনুসারী খাজা আহমদ দ্বীন প্রথমে ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবের অমৃতসরে এই দলের গোড়াপত্তন করেন। ১৯৪৭-এর পরে এই দল লাহোরে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এখানেই তাদের প্রধান কেন্দ্র এবং 'ফায়যে ইসলাম' (فیض اسلام) পত্রিকা তাদের প্রধান মুখপত্র।
৩. তাহরীকে তা'মীরে ইনসানিয়াত (فرقة تعمیر انسانیت)
আব্দুল খালেক মালূহ কর্তৃক লাহোরে প্রতিষ্ঠিত এই দলের তরুশ ও তুখোড় নেতা ক্বাযী কেফায়াতুল্লাহ উর্দু, আরবী ও ইংরেজীতে বহু বই লিখে তার দলের আদর্শ প্রচার করে চলেছেন।
৪. ফের্কা তুলু'এ ইসলাম (فرقه طلوع اسلام)
গোলাম আহমাদ পারভেয কর্তৃক প্রথমে হিন্দুস্তানে প্রতিষ্ঠিত এই দলটির নেতারা ১৯৪৭-এর পরে লাহোরে এসে তাদের ভ্রান্ত আক্বীদার প্রচার শুরু করেন এবং পাকিস্তানের প্রায় সকল শহরে শাখা কায়েম করেন। ইউরোপের বিভিন্ন শহরেও এ দলের শাখা রয়েছে। যেখান থেকে হাদীছ বিরোধী আক্বীদা সমূহ নিয়মিতভাবে প্রচার করা হয়। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা গোলাম আহমাদ পারভেয ৩০ টির উপর বই লেখেন। যার কোন কোনটি ৩ বা ৪ খণ্ডে সমাপ্ত। তবে এই দলের দবদবা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে দলের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে ১৯৬১ সালে প্রায় এক হাযার ওলামায়ে কেরামের সম্মিলিতভাবে 'কুফরী' ফৎওয়া প্রদানের কারণে। করাচীর 'মাদরাসা 'আরাবিয়া ইসলামিয়াহ' এই মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করে।
📄 আহলেহাদীছ সংগঠনসমূহের প্রতিরোধ আন্দোলন
আহলেহাদীছ সংগঠনসমূহের প্রতিরোধ আন্দোলন (حركة جمعيات أهل الحديث خلاف المنكرين)
উপরোক্ত দল সমূহের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে উপমহাদেশের আহলেহাদীছ সংগঠনগুলি জোরালো ভূমিকা পালন করে। এসময় অন্যান্য ওলামায়ে কেরাম ছাড়াও তিনজন আহলেহাদীছ বিদ্বান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তাঁদের পরিচালিত তিনটি প্রসিদ্ধ পত্রিকার মাধ্যমে। (১) মাওলানা মুহাম্মাদ হোসায়েন বাটালবী (মৃঃ ১৯২০ খৃঃ) স্বীয় 'ইশা'আতুস সুন্নাহ' (إشاعة السنة) পত্রিকার মাধ্যমে (২) মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী (১৮৬৮-১৯৪৮ খৃঃ) স্বীয় 'আহলেহাদীছ' (أهل الحديث) পত্রিকার মাধ্যমে এবং মাওলানা আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানী (১৩২৭-১৪০৮ হিঃ/১৯১০-১৯৮৮ খৃঃ) স্বীয় 'আল-ই'তিছام' (الاعتصام) পত্রিকার মাধ্যমে। সাথে সাথে তাঁদের প্রতিষ্ঠিত আহলেহাদীছ সংগঠনসমূহ এবং তাঁদের লিখিত বিভিন্ন বই ও পুস্তিকাসমূহ হাদীছের প্রামাণিকতার পক্ষে এবং হাদীছ বিরোধীদের বিপক্ষে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু এঁরা নন। বরং উপমহাদেশের সকল আহলেহাদীছ বিদ্বান যুগে যুগে হাদীছ অস্বীকারকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আপোষহীন জিহাদ চালিয়ে গেছেন। যেকোন নিরপেক্ষ গবেষক একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন।
📄 হাদীছে সন্দেহবাদীদের কয়েকজন
হাদীছে সন্দেহবাদীদের কয়েকজন (بعض المتشككين في الحديث)
অমুসলিমদের কেউ হাদীছের বিরুদ্ধে লিখলে মুসলমানেরা তা সহজে গ্রহণ করে না। পক্ষান্তরে মুসলিম পণ্ডিতগণের কেউ যখন হাদীছের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে লেখেন, তখন মুসলমানদের অধিকাংশ তা গ্রহণ না করলেও কিছু লোক অবশ্যই তা গ্রহণ করেন। কিন্তু মুশকিল হয় তখনই, যখন দেখা যায় যে, কোন ব্যক্তি দেশে ইসলামী আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করেছেন, ইসলামের পক্ষে জান-মাল, সময় ও শ্রমের কুরবানী দিচ্ছেন, অথচ ইসলামী আইনের অন্যতম মূল উৎস 'হাদীছ'-এর প্রামাণিকতা সম্পর্কে সন্দেহজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। একদিকে তিনি হাদীছের পক্ষে কথা বলছেন, অন্যদিকে তার লেখনী ও বক্তব্য হাদীছ বিরোধীদের পক্ষে মযবুত দলীল হিসাবে প্রতিভাত হচ্ছে, এমন ধরনের ইসলামী চিন্তাবিদগণের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ্র আক্বীদা ও আমলের সর্বাধিক ক্ষতি সাধিত হয়ে থাকে। এমনি ধরনের দু'একজন সুপ্রসিদ্ধ ও প্রভাবশালী আলেমের দৃষ্টান্ত উদাহরণ স্বরূপ নিম্নে তুলে ধরা হ'ল।-
১. মাওলানা মওদূদী (১৯০৩-১৯৭৯ খৃঃ)
সাইয়িদ আবুল আ'লা মওদূদী ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের আওরঙ্গাবাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪১ সালে তিনি (جماعت اسلامی )'জামায়াতে ইসলামী' - ইসলামী দল) নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন এবং ترجمان القرآن 'তারজুমানুল কুরআন' (কুরআনের মুখপত্র) নামে একটি উর্দু মাসিক পত্রিকা বের করেন। তিনি ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপরে অসংখ্য বই ও পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। নাস্তিক্যবাদী চিন্তাধারা ও পাশ্চাত্যের ইসলাম বিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে তাঁর আকর্ষণীয় ও যুক্তিপূর্ণ লেখনী বহু লোকের চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেয় ও তারা ইসলামের জন্য জান-মাল উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
১৯৪৭-এর পরে তিনি পাকিস্তানের লাহোরে হিজরত করেন ও পাকিস্তানে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পূর্ব পাকিস্তানে মাওলানা আব্দুর রহীম (১৯১৮-১৯৮-৭) তাঁর বইসমূহ বাংলায় অনুবাদ করেন। ফলে বাংলাদেশে তাঁর অনুসারীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থকে। পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে এই দল বর্তমানে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
মাওলানা মওদূদী বিভিন্ন বিষয়ে বেশুমার লেখনীর অধিকারী ছিলেন। ফলে অনেক কিছু ভুল হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। তিনি নিজেও সেকথা স্বীকার করেছেন এবং তাঁর তাফসীর 'তাফহীমুল কুরআন'-এর প্রথম সংস্করণের অনেক বিষয় তিনি পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করেছেন। যেমন সূরা বাক্বারাহ ২০৩ আয়াত ও সূরা নিসা ১১ আয়াতের ভুল তাফসীর তিনি পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করেছেন। অনুরূপভাবে তাঁর পত্রিকা 'তারজুমানুল কুরআনে' (৪র্থ বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যা ১৯৫৫ পৃঃ ৩৭৯)। যখন তিনি মোতা' (متعہ) বা ঠিকা বিবাহ জায়েয ফৎওয়া দিলেন, তখন ওলামায়ে কেরামের প্রতিবাদের মুখে পরে তিনি তা থেকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং স্বীয় 'রাসায়েল ও মাসায়েল' বইয়ের মধ্যে এজন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। ২৪ যদিও শী'আরা তাঁর উক্ত ফৎওয়া নিজেদের পক্ষে ও সুন্নীদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু 'তাফহীমুল কুরআনে' আল্লাহ্র নাম ও গুণাবলী সংক্রান্ত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় তিনি ভ্রান্ত ফির্কা মু'তাযিলাদের অনুকরণে যেসব তাবীল করেছেন, তা থেকে প্রত্যাবর্তন করেননি।
অনুরূপভাবে মু'জেযা সংক্রান্ত কিছু কিছু আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি তাবীলের আশ্রয় নিয়েছেন। যেমন সূরা আম্বিয়া ৭৯ আয়াতের ব্যাখ্যায় 'পাহাড়সমূহ ও পক্ষীকুলকে আমি দাউদ-এর জন্য অনুগত করে দিয়েছি, যারা তাসবীহ পাঠ করে'-এর ব্যাখ্যা তিনি এভাবে করেছেন যে, দাউদ (আঃ) যখন তাঁর সুন্দর কণ্ঠে আল্লাহ্র প্রশংসা করতেন, তখন পাহাড়সমূহ তাঁর মিষ্টিমধুর আওয়াযের কারণে কেঁপে কেঁপে উঠত এবং পক্ষীকুল দাঁড়িয়ে যেত'। 'পর্বত সমূহের অনুগত হওয়া'কে 'সুর লহরীতে প্রকম্পিত হওয়া'র এই কাল্পনিক ব্যাখ্যার জন্য খ্যাতনামা মুফাসসির আব্দুল মাজেদ দরিয়াবাদী বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, এটি তাফসীর নয়, বরং তাহরীফ অর্থাৎ কুরআনের মর্ম পরিবর্তন (দ্রঃ তাফসীরে মাজেদী)। এধরনের আরও বহু উদাহরণ বিদ্বানগণ উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু এসব বিষয়ে ওলামায়ে কেরাম ভুল ধরিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রত্যাবর্তন করেননি। অথচ এসব ভুলের মূল কারণ হ'ল, কুরআনের তাফসীর করার সময় হাদীছের প্রতি গুরুত্ব কম দেওয়া এবং যুক্তিবাদের প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়া।
অনুরূপভাবে তিনি হাদীছ শাস্ত্র, হাদীছের প্রামাণিকতা, সনদ ও মতনের বিশুদ্ধতা যাচাই ইত্যাদি বিষয়ে মুহাদ্দেছীনের গৃহীত جرح وتعدیل তথা 'সমালোচনা ও পর্যালোচনা'র নীতিমালা সম্পর্কে অযৌক্তিক সন্দেহবাদ আরোপ করেছেন। বরং তাঁদের তীব্র সমালোচনায় তিনি এতদূর পৌঁছে গিয়েছেন যে, কোন কোন ক্ষেত্রে হাদীছ অস্বীকারকারীদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। ফলে হাদীছ অস্বীকারকারী দলের নেতা গোলাম আহমাদ পারভেয মাওলানা মওদূদীর বক্তব্যকে নিজেদের পক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করেন। যেমন তিনি স্বীয় পত্রিকায় লিখেন যে, 'হাদীছ অস্বীকারের ব্যাপারে আমার ও মাওলানা মওদূদীর আক্বীদা একই রূপ। অতএব 'জামায়াতে ইসলামী' যেন এব্যাপারে আমার সাথে বেশী ঝগড়া না করে'। ২৫
গোলাম আহমাদ পারভেয-এর উক্ত মন্তব্য সত্য নয় এবং মাওলানা মওদূদীও নিঃসন্দেহে হাদীছ অস্বীকারকারী নন। কিন্তু হাদীছ সংক্রান্ত তাঁর লেখনী সমূহ পরীক্ষা করে দেখলে তা পাঠককে হাদীছ অস্বীকারের চূড়ান্ত সীমায় চলে যেতে বাধ্য করে। এর কারণ (১) তিনি হাদীছ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণের গৃহীত মূলনীতি ও পদ্ধতিসমূহের তোয়াক্কা না করে তার তীব্র সমালোচনা করেছেন (২) 'কেবল রেওয়ায়াতের দিকে মুহাদ্দিছগণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছেন, দেরায়াতের দিকে রাখেননি' বলে হাদীছ অস্বীকারকারীদের সুরে সুর মিলিয়ে তাঁদের উপরে অযথা তোহমত দিয়েছেন। (৩) বুখারী ও মুসলিমের কতিপয় হাদীছের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে তিনি সন্দেহ পোষণ করেছেন (৪) 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ের হাদীছসমূহের বিশাল ভাণ্ডারকে তিনি 'ধারণা নির্ভর' হওয়ার দোষ চাপিয়ে তা অগ্রাহ্য করতে চেয়েছেন।
অথচ উপরের দাবীগুলির কোনটিই তাঁর নিজস্ব নয়, বরং বিগত যুগের মু'তাযিলা দার্শনিক, আধুনিক কালের খ্রিষ্টান প্রাচ্যবিদগণ ও তাদের বশংবদ মুসলিম পণ্ডিতগণ হাদীছের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ইতিপূর্বে উত্থাপন করেছেন, সেগুলিই মাওলানা নিজের যুক্তিবাদী ভাষায় আরো জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন। শুধু তিনিই নন, তাঁর সাহিত্যের ভক্ত ও আন্দোলনের অনুসারীদের চিন্তাধারায়ও তার স্পষ্ট ছাপ পরিদৃষ্ট হয়। ফলে কুরআন-সুন্নাহর হুকুমত কায়েম করার শ্লোগান নিয়ে মাঠে নামলেও এই দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সুন্নাতের পাবন্দী অতীব নগণ্য। ছহীহ হাদীছের প্রতি আকর্ষণবোধ বলা চলে শূন্যের কোঠায়। 'এটাও ঠিক ওটাও ঠিক' বলে শুদ্ধ-অশুদ্ধ সবকিছুকে তারা একাকার করতে চান। এমনকি শহীদ মিনারে যাওয়া ও সেখানে ফুল দেওয়ার মত শিরকী ও বিদ'আতী বিষয়গুলিকেও তারা 'পাপও নেই পুণ্যও নেই' বলে হালকা করে দেখেন। ২৬
টিকাঃ
২৪ বঙ্গানুবাদ 'রাসায়েল ও মাসায়েল' (ঢাকা: শতাব্দী প্রকাশনী, ৩য় মুদ্রণ ২০০১), ৩/৩৭-৩৯ পৃঃ, গৃহীত: তরজুমানুল কুরআন (রবীউল আউয়াল ১৩৭৫ হিঃ/নভেম্বর ১৯৫৫ খৃঃ)।
২৫. তুল্'এ ইসলাম' এপ্রিল-মে ১৯৫৫।
২৬. জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর আমীর মাওলানা মতীউর রহমান নিজামী ও সহ-সেক্রেটারী আব্দুল কাদের মোল্লার বক্তব্য দ্রষ্টব্য: দৈনিক ইনকিলাব ১১.১০.০২ ও ২২.৬.০৩ ইং।