📘 হাদিসের প্রামানিকতা > 📄 প্রাচীন যুগের হাদীছ অস্বীকারকারীগণ

📄 প্রাচীন যুগের হাদীছ অস্বীকারকারীগণ


প্রাচীন যুগের হাদীছ অস্বীকারকারীগণ (منكرو السنة قديماً)
১. খারেজী (خارجي): এরা প্রথমে আলী (রাঃ)-এর দলভুক্ত ছিল। কিন্তু তিনি মু'আবিয়া (রাঃ)-এর সাথে রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্দেশ্য দু'জন ছাহাবীকে শালিশ মেনে নেওয়ায় এরা তাঁর বিরোধী হয়ে যায় এবং শ্লোগান তোলে যে, لَا حُكَمَ إِلَّا اللَّه 'কোন হুকুমদাতা নেই আল্লাহ ব্যতীত' অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কাউকে শালিশ মানিনা। অতঃপর উক্ত শালিশীর সমর্থক সকল ছাহাবীকে তারা 'কাফির' বলে এবং তাঁদের বর্ণিত ফিৎনা পরবর্তী সকল হাদীছকে তারা অস্বীকার করে।
২. শী'আ (شيعة): আলী (রাঃ)-এর ভণ্ড সমর্থক এই দলের লোকেরা তাদের ধারণা মতে হাতে গণা কয়েকজন ছাহাবী ব্যতীত সকল ছাহাবীকে 'কাফির' বলে এবং তাঁদের বর্ণিত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। তাদের পসন্দমত কিছু ছাহাবীর বর্ণিত হাদীছসমূহকেই মাত্র তারা গ্রহণ করে থাকে।
৩. মু'তাযিলা (معتزلة): বুদ্ধিবাদী এই দলটির অতি যুক্তিবাদী তৎপরতায় প্রমাণিত হয় যে, প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে এই মতের অনুসারী লোকেরা পুরা হাদীছ শাস্ত্রকেই অস্বীকার করেছে। এমনকি যুক্তির বাইরে হওয়ায় তারা কুরআনের অবোধ্য বিষয়গুলি (إعجاز القرآن) এবং রাসূল (ছাঃ)-এর মু'জিযাসমূহকে (معجزة) অস্বীকার করেছে। আবু হুরায়রা (রাঃ)-কে তারা 'সেরা মিথ্যুক' (أَكَذَبُ الناس) বলতেও দ্বিধা বোধ করেনি। ছাহাবী ও তাবেঈগণের ফৎওয়াসমূহকে তারা তাচ্ছিল্য করে এবং তাঁদেরকে মূর্খ ও মুনাফিক বলে। এমনকি তাঁদেরকে স্থায়ীভাবে জাহান্নামী বলে (নাউযুবিল্লাহ) (যাওয়াবে' পৃঃ ৫৯)।
তবে সঠিক কথা এই যে, উপরোক্ত ভ্রান্ত দলগুলি পুরা হাদীছ শাস্ত্রকে অস্বীকার করেনি। বরং তাদের স্বার্থের বিরোধী হাদীছসমূহকেই মূলতঃ তারা অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করে। যেমন খারেজীরা আহলে বায়তের মর্যাদায় বর্ণিত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। মু'তাযিলারা আল্লাহ্ গুণাবলী সংক্রান্ত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। যদিও ঐসব দলগুলি অন্যান্য প্রশাখাগত বিষয়ে বর্ণিত কিছু কিছু হাদীছ মান্য করে থাকে।
ইবনু হাযম আন্দালুসী (৩৮৪-৪৫৬ হিঃ) বলেন, মুসলিম উম্মাহ্র সকল দল-উপদল বিশ্বস্ত একক বর্ণনাকারীর বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ভুক্ত হাদীছ বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিতেন। এ ব্যাপারে উম্মতের মধ্যে ঐক্যমত ছিল। কিন্তু ১ম শতাব্দী হিজরীর শেষের দিকে কিছু মু'তাযিলা দার্শনিক এই নীতির ব্যত্যয় ঘটান এবং 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ের হাদীছসমূহে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন'। ১৫ এই মু'তাযিলী যুক্তিবাদী ঢেউ বিভিন্ন ফিক্বহী মাযহাবের বিদ্বানগণের মধ্যেও লাগে কেবলমাত্র আহলেহাদীছ বিদ্বানগণ ব্যতীত। ফালিল্লা-হিল হাম্দ।

টিকাঃ
১৫. আল-ইহকাম ফী উছলিল আহকাম (কায়রো : দারুল হাদীছ, ১৪২৬/২০০৫) পৃঃ ১২৬।

📘 হাদিসের প্রামানিকতা > 📄 আধুনিক যুগে হাদীছ অস্বীকারকারীগণ

📄 আধুনিক যুগে হাদীছ অস্বীকারকারীগণ


(منكرو السنة حديثا
ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে মাথা চাড়া দেওয়া হাদীছ বিরোধী দলগুলির অপতৎপরতা পরবর্তীতে স্থান বিশেষে ধিকি ধিকি ভাবে টিকে থাকলেও মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণের অব্যাহত প্রতিরোধের মুখে তা ব্যাপকতা লাভ করতে পারেনি। এমনকি আব্বাসীয় খলীফা মামুন, মু'তাছিম ও ওয়াছিক্ক বিল্লাহ্ (১৯৮-২৩২ হিঃ/৮১৩-৮৪৭ খৃঃ) সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা সত্ত্বেও যুক্তিবাদের নামে ভ্রান্ত মু'তাযিলা মতবাদ বৃহত্তর মুসলিম জনসাধারণের গ্রহণযোগ্যতা লাভে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। যদিও ঐসময় আহলেহাদীছ বিদ্বানগণের উপরে নেমে আসে ভূমিকম্পসদৃশ বিপদ-মুছীবত ও যুলুম-অত্যাচারসমূহ। এভাবে শত রাজনৈতিক নির্যাতন ও জেল-যুলুম সহ্য করেও তাঁদের দৃঢ় প্রতিরোধ সাধারণ জনগণের হৃদয় জয় করে। যা হাদীছ শাস্ত্রের পবিত্রতা ও উচ্চ মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়ক হয়।
কিন্তু পঞ্চম শতাব্দী হিজরী থেকে সপ্তম শতাব্দী হিজরী পর্যন্ত (৪৮০-৬৯১হিঃ/১০৯৫-১২৯১খৃঃ-২০২/১৯৬ বছর) ফিলিস্তীন উদ্ধারের নামে খ্রিষ্টান ইউরোপের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রায় দু'শো বছর ব্যাপী সংঘটিত 'ক্রুসেড' যুদ্ধে পরাজিত ও ব্যর্থ খ্রিষ্টান নেতারা মুসলিম বিশ্বকে করায়ত্ত করার জন্য ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। তারা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের নীলনকশা অংকন করে এবং এজন্য বিশেষ কিছু শিক্ষিত লোক নিয়োগ করে। যারা আরবী ও ইসলামী সাহিত্য বিষয়ে গবেষণা ও অনুবাদে আত্মনিয়োগ করেন।
অন্যদিকে আর্থিকভাবে দুর্বল মুসলিম দেশগুলিতে সমাজ কল্যাণের নামে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে মানবপ্রেমিক সেজে তারা সামনে আসে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে ইসলামী গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে তারা বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করতে থাকে। যা মুসলমানেরা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে করতে সক্ষম হয়নি। মূল্যবান স্কলারশিপ দিয়ে মুসলিম দেশসমূহের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাগুলিকে তারা গবেষণার নামে নিজেদের দেশে নিয়ে যায় এবং উচ্চতর ডিগ্রী ও লোভনীয় সুযোগ-সুবিধার ফাঁদে ফেলে তাদেরকে মানসিক গোলামে পরিণত করে। তারা ইসলামকে প্রাচীন ভেবে তাকে আধুনিক করার সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। কেউ কেউ তাদের ভ্রান্ত আক্বীদা-বিশ্বাসকে ইসলামী লেবাস পরিধান করাতে সচেষ্ট হন। এভাবে তাদের নানামুখী ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান দিক ছিল এই যে, 'আমাদের জন্য কুরআনই যথেষ্ট হাদীছের কোন প্রয়োজন নেই'। কেননা হাদীছ হ'ল 'যান্নী' বা ধারণা নির্ভর। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে এগুলি লিপিবদ্ধ আকারে রেখে যাননি। সেকারণ এতে অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে একক রাবীর বর্ণিত হাদীছসমূহকে, যাকে 'খবরে ওয়াহেদ' বলা হয়।
অতঃপর ঐসব লোকগুলি 'সংস্কার'-এর নাম নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাদের গুরু 'প্রাচ্যবিদ' (Orientalist) নামে খ্যাত ইউরোপীয় খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের অনুকরণে কাজ করতে থাকেন। মুক্তবুদ্ধির নামে তারা কথিত মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার বিরুদ্ধে তরুণদের উত্তেজিত ও আকৃষ্ট করতে থাকেন। এইভাবে ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস এবং ছাহাবী ও তাবেঈগণের ঈমানী দৃঢ়তা সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরাই ইসলাম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরূপে মুসলিম সমাজে আবির্ভূত হন ও তাদের দেওয়া ভুল ও বিকৃত ব্যাখ্যায় সমাজে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। মুসলমান নামধারী এইসব কলমী মুনাফিকরাই ইসলামের স্থায়ী ক্ষতি সাধনে সক্ষম হয়, যা সশস্ত্র 'ক্রুসেড' যুদ্ধের মাধ্যমে করা সম্ভব হয়নি।
এইসব মুক্তবুদ্ধি ইসলামী চিন্তাবিদগণ কয়েকভাবে বিভক্ত। কেউ পুরো হাদীছ শাস্ত্রের বিরুদ্ধে 'সন্দেহবাদ' আরোপ করেছেন। কেউ শুধুমাত্র 'খবরে ওয়াহেদ' জাতীয় হাদীছগুলিতে সন্দেহ সৃষ্টি করেছেন। কেউ হাদীছ বাদ দিয়ে কেবলমাত্র কুরআনের অনুসারী হওয়ার দাবী করেছেন। কেউ নিজের স্বার্থের কিছু হাদীছকে স্বীকার করেছেন, বাকীগুলিকে অস্বীকার বা অপব্যাখ্যা করেছেন। অনেকে হাদীছ শাস্ত্রকে সরাসরি অস্বীকার করেননি, তবে যুক্তির নামে এমন সব অপযুক্তির অবতারণা করেছেন, যা হাদীছ অস্বীকারকারীদের চেয়েও অধিক ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে এবং যা লোকদের নিকটে হাদীছের উচ্চ মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে।
পাশ্চাত্যে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন গোল্ডযিহের (১৮৫০-১৯২১), জোসেফ শাখত, মার্গোলিয়থ, গ্যাস্টন ওয়াট, টমাস আর্নল্ড, কার্ল ব্রোকেলম্যান, আর.এ. নিকলসন, এ.জে. আরবেরী, আলফ্রেড হিউম, হ্যামিল্টন এ.আর. গীব, মন্টগোমারী ওয়াট, এস.এম. যুইমার, এ.জে. ভিনসিক, হেনরী ল্যামেন্স (১৮৬৮-১৯৫১) প্রমুখ।
পক্ষান্তরে প্রাচ্যে এই আন্দোলনের উৎস ভূমি হ'ল প্রধানতঃ দু'টি। ১. মিসরে মুফতী মুহাম্মাদ আব্দুহু (১৮৪৯-১৯০৫) ও তাঁর অনুসারীবৃন্দ ২. ভারতে স্যার সৈয়দ আহমাদ খান (১৮১৭-১৮৯৮) ও তাঁর অনুসারীবৃন্দ।

📘 হাদিসের প্রামানিকতা > 📄 মিসরীয় স্কুল

📄 মিসরীয় স্কুল


مدرسة المصر) ১. মুফতী মুহাম্মাদ আবদুহু (১৮৪৯-১৯০৫ খৃঃ)
এই বিখ্যাত মিসরীয় পণ্ডিত আধুনিক মিসরে 'সংস্কার' আন্দোলনের নেতা হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। যখন পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আরব বিশ্বের উপরে তাদের কালো থাবা বিস্তার করে এবং আরবীয় ইসলামী সংস্কৃতিকে মধ্যযুগীয় কুসংস্কার হিসাবে চিত্রিত করার জন্য উঠেপড়ে লাগে ও এরই অন্যতম দিক হিসাবে ইসলামের ভিত নাড়িয়ে দেবার জন্য হাদীছ শাস্ত্রের প্রামাণিকতার বিরুদ্ধে নানাবিধ চক্রান্ত শুরু করে, তখন তাদের এই চক্রান্ত জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েন বহু ইসলামী পণ্ডিত। মুফতী মুহাম্মাদ আবদুহু ছিলেন তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। যদিও ইসলামের পক্ষে তাঁর ছিল জোরালো ভূমিকা।
যেমন তিনি বলেন,
إن المسلمين ليس لهم إمام فى هذا العصر غير القرآن وإن الإسلام الصحيح هو ما كان عليه الصدر الأول قبل ظهور الفتن
'এ যুগে মুসলমানদের জন্য কোন ইমাম বা নেতা নেই 'কুরআন' ব্যতীত। সত্যিকারের ইসলাম সেটাই, যা ইসলামের প্রথম শতকে ফিৎনা সৃষ্টির পূর্বে ছিল'। তিনি আরও বলেন, لا يمكن أن يعتبر حديث من أحاديث الآحاد 'খবরে ওয়াহেদ পর্যায়ভুক্ত কোন হাদীছকে আক্বীদা دليلا على العقيدة বিষয়ে দলীল হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়' (যাওয়াবে' পৃঃ ৭২)।
ডঃ মুছতুফা সাবাঈ বলেন, 'নিঃসন্দেহে মুফতী মুহাম্মাদ আবদুহু আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংস্কারক। তিনি স্বীয় যুগের অতুলনীয় ইসলামী দার্শনিক ছিলেন। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শত্রুদের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রহরীর ন্যায় কলমী যোদ্ধা ছিলেন। সাথে সাথে মুসলিম বিশ্বে চিন্তাধারার ক্ষেত্রে শতবর্ষব্যাপী বৈকল্যের আঁধারে আলোর সঞ্চার করেছিলেন। তথাপি তিনি ছিলেন হাদীছ শাস্ত্রে খুবই কম জ্ঞানের অধিকারী। তিনি ইসলামের পক্ষে মানতিত্ত্ব বা তর্কশাস্ত্র ও যুক্তিবাদের অস্ত্রের উপর অধিক ভরসা করতেন'।
মিসরীয় স্কুলের বিশ্ববিখ্যাত পণ্ডিত সৈয়দ রশীদ রিযা (১৮৬৫-১৯৩৫ খৃঃ) ও ডঃ তাওফীকু ছিদক্বী প্রথম জীবনে মুফতী মুহাম্মাদ আবদুহু-র অনুসারী ছিলেন। সৈয়দ রশীদ রিযা-র জগদ্বিখ্যাত পত্রিকা 'আল-মানার'-য়ে এই সময় হাদীছের প্রামাণিকতার বিরুদ্ধে অনেক নিবন্ধ প্রকাশিত হ'ত। যেমন ডঃ তাওফীকু ছিদক্বী লিখিত প্রবন্ধ وحده القرآن هو الإسلام 'ইসলাম বলতে একমাত্র কুরআনকেই বুঝায়'। ১৬ বলা বাহুল্য, সৈয়দ রশীদ রিযা এইসব লেখনীর সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। কিন্তু তাঁদের উস্তাদ মুফতী মুহাম্মাদ আবদুহু-র মৃত্যুর পরে যখন আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিতদের হাদীছ শাস্ত্রের প্রতি অবহেলা এবং বিভিন্ন ফিক্বহী মাযহাব ও দর্শন শাস্ত্রের প্রতি তাদের অতি উৎসাহ ও গভীর পাণ্ডিত্য প্রত্যক্ষ করেন, তখন তিনি মিসরে 'সুন্নাতের ঝাণ্ডা উড্ডীনকারী' হিসাবে আবির্ভূত হন। তিনি হাদীছের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলের উত্থাপিত প্রশ্নসমূহের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে থাকেন এবং বিভিন্ন ফেকুহী মাযহাবে হাদীছ বিরোধী যেসব ফৎওয়া লিপিবদ্ধ রয়েছে, তিনি তার তীব্র বিরোধিতা করতে থাকেন। পরবর্তীকালে মিসরের কুখ্যাত হাদীছ দুশমন আবু রাইয়াহ্ আবির্ভাবকালে যদি তিনি জীবিত থাকতেন, তবে সৈয়দ রশীদ রিযা যে তার প্রথম প্রতিবাদকারী হ'তেন, এতে কোন সন্দেহ নেই (আস-সুন্নাহ পৃঃ ৩০)। ডঃ তাওফীকু ছিদক্বীও আল্লাহ্র রহমতে তাঁর পূর্বের ভূমিকা পরিত্যাগ করেন ও সৈয়দ রশীদ রিযা-র সাথে ঐক্যমতে সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেন।১৭
২. ডঃ আহমাদ আমীন (১৮৮৬-১৯৫৪ খৃঃ)
এই মিসরীয় পণ্ডিত 'ফাজরুল ইসলাম' 'যুহাল ইসলাম' ও 'যুহরুল ইসলাম' নামে সাড়া জাগানো তিনটি গ্রন্থের বিখ্যাত লেখক। এই গ্রন্থসমূহে তিনি ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদগণের পদাংক অনুসরণ করেন এবং হাদীছ শাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডারে সন্দেহের ধূম্রজাল সৃষ্টি করেন। এভাবে তিনি জমহূর মুসলিম বিদ্বানগণের গৃহীত তরীকার বাইরে চলে যান। 'ফাজরুল ইসলাম' গ্রন্থে তিনি 'হাদীছ' সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। যেখানে তিনি চর্বির মধ্যে বিষ মিশিয়েছেন ও হক্ক-এর সাথে বাতিল মিশ্রিত করেছেন। দুঃখের বিষয় এই যে, উক্ত ভ্রান্ত আক্বীদার উপরেই তিনি মৃত্যু বরণ করেন। বরং তাঁর ভ্রান্ত আক্বীদার বই পড়ে বহু লোক ভ্রান্ত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। যেমন তিনি বলেন,
وقد وضع العلماء للجرح والتعديل قواعد ليس هنا محل ذكرها ولكنهم والحق يقال عنوا بنقد الإسناد أكثر مما عنوا بنقد المتن... حتى نري البخاري نفسه على جليل قدره ورقيق بحثه يثبت أحاديث دلت الحوادث الزمنية والمشاهدة التجربية على أنها غير صحيحة لا قتصاره على نقد الرجال
'বিদ্বানগণ হাদীছ বর্ণনাকারী রাবীদের সমালোচনায় বহু নিয়ম-বিধান প্রণয়ন করেছেন। যার সবকিছু এখানে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু সত্য কথা বলতে কি তাঁরা হাদীছের মতনের (Text) চাইতে সনদের (Chain of narrators) সমালোচনাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।..... এমনকি যদি আমরা খোদ বুখারীকে দেখি, তবে দেখব যে, সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ সত্ত্বেও সমকালীন ঘটনাবলী ও বাস্তব অভিজ্ঞতা সমূহ প্রমাণ করে যে, তাঁর গৃহীত হাদীছ সমূহ ছহীহ নয়, কেবল রাবীদের সমালোচনায় তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার কারণে'।১৮ আহমাদ আমীনের এই মন্তব্য যে নির্জলা মিথ্যা বরং মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণের বিরুদ্ধে নিছক অপবাদ, একথা উচ্ছ্বলে হাদীছের সাধারণ ছাত্রও খবর রাখেন। বরং বলা চলে যে, উপরোক্ত মন্তব্য তাঁর নিজস্ব গবেষণাপ্রসূত নয়; বরং তাঁর অনুসরণীয় খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণের মন্তব্যের অনুকরণ মাত্র। যেমন প্রাচ্যবিদ গ্যাস্টন ওয়াট বলেন, হাদীছ শাস্ত্রবিদগণ হাদীছ সর্ম্পকে গভীর গবেষণা করেছেন। কিন্তু সেগুলি ছিল সব রাবী ও সনদের সমালোচনামুখী। ..... তাঁরা 'মতনে'র সমালোচনা করেননি'। উক্ত প্রাচ্যবিদ খ্রিষ্টান পণ্ডিতের বক্তব্য আর মুসলিম পণ্ডিত ডঃ আহমাদ আমীনের বক্তব্যে ও মন্তব্যে কোন পার্থক্য নেই।
ডঃ আহমাদ আমীনের ছেলে 'হুসায়েন' পিতার চেয়ে আরও একধাপ এগিয়ে গেছেন। যিনি دليل المسلم الحزين إلى مقتضى السلوك في القرن العشرين বইয়ের মধ্যে ইসলামের মূলনীতিসমূহ ও বিশেষ করে সুন্নাতে নববী সর্ম্পকে তীব্র হিংসাত্মক বক্তব্যসমূহ সন্নিবেশিত করেছেন। উক্ত বইটি ১৯৮৪ সালে কায়রোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বই প্রদর্শনীতে 'শ্রেষ্ঠ বই' হিসাবে পুরস্কার লাভ করেছে।
উক্ত বইয়ে তিনি বলেন, 'আহমাদ আমীন আমাদের উপরে 'ছালাত'-কে 'ফরয' করে যাননি। তিনি চোরের হাত কাটা ঐসময় সিদ্ধ মনে করতেন, যখন খোলা ময়দানে কোন পথিকের নিকট থেকে চুরি করা হয়। কিন্তু বর্তমানে এটি কোন গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে না। অতএব বর্তমান অবস্থায় এই হুকুম অবশ্যই পরিবর্তন করা উচিত'।
মহিলাদের পর্দা সম্পর্কে তিনি বলেন, ليس للحجاب أي علاقة بالإسلام 'পর্দার সঙ্গে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই'.....। এরূপ বহু অশোভন ও অনর্থক কথায় ভরে আছে পৃথিবীর কথিত ঐ 'শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি'!
ডঃ আহমাদ আমীনের আরেক অনুসারী পণ্ডিত ইসমাঈল আদহাম ১৩৫৩ হিজরীতে প্রকাশিত عن تاريخ السنة নামক নিবন্ধে বলেন, ছহীহ গ্রন্থসমূহে যেসব হাদীছ লিপিবদ্ধ আছে, সেসবের ভিত্তি মযবুত নয়, বরং সন্দেহপূর্ণ এবং সেগুলোর মধ্যে জাল হওয়ার দোষাবলী অগ্রগণ্য (بل هي مشكوك فيها وتغلب عليها صفة الوضع)।
৩. মাহমুদ আবু রাইয়াহ
এই পণ্ডিত ব্যক্তি সুন্নাতে নববী তো বটেই সরাসরি ছাহাবীগণের প্রতি হিংসাপরায়ণ। বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহ যে মহান ছাহাবীর নিকট থেকে সবচেয়ে বেশী হাদীছ লাভ করেছে, হাদীছের শ্রেষ্ঠ হাফেয ছাহাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর উপরেই তার ক্রোধ সবচেয়ে বেশী। রাসূল (ছাঃ)-এর খাছ দো'আপ্রাপ্ত ও আল্লাহ্র বিশেষ রহমত প্রাপ্ত অনুপম চরিত্র মাধুর্যের অধিকারী এই মানুষটিকে কালিমালিপ্ত করার জন্য মিসরীয় পণ্ডিত তার একটি বইয়ের নাম তাচ্ছিল্যভরে রেখেছেন شيخ المضيرة أبو هريرة 'মযীরাহ' খাদ্যের ভক্ষক আবু হুরায়রা'। আবু হুরায়রা (রাঃ) উক্ত খাদ্যটি পসন্দ করতেন বলে ছা'আলাবী ও বদী'উয্যামান হামাযানী প্রমুখ বর্ণনা করেছেন। যদিও এইসব সাহিত্যিকদের মাধ্যমে প্রচারিত উক্ত বর্ণনার কোন বিশুদ্ধ ভিত্তি নেই'। ১৯
অনুরূপভাবে তার রচিত أضواء على السنة المحمدية বইয়ের মধ্যেও হাদীছ ও আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদ্গার করেছেন। সুন্নী নামধারী এই পণ্ডিত মূলতঃ শী'আ ছিলেন। যা তার লেখনীতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
উপরোক্ত মাহমূদ আবু রাইয়ার লেখনীসমূহকে পুঁজি করে আরেকজন পণ্ডিত সাইয়িদ ছালেহ আবুবকর একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম الاضواء القرآنية في اكتساح الأحاديث الإسرائيلية وتطهير البخاري منها হাদীছসমূহকে ঝাড়ু দেওয়ার জন্য এবং বুখারীকে ঐসব থেকে পবিত্র করার জন্য কুরআনী জ্যোতিসমূহ'। উক্ত বইয়ে তিনি ছহীহ বুখারীর ১০০ টি হাদীছ বাছাই করেছেন, যেগুলি তার মতে ইহুদীদের রচিত এবং ইমাম বুখারী সেগুলিকে ছহীহ সাব্যস্ত করেছেন (নাউযুবিল্লাহ) ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দিকে সম্বন্ধ করেছেন। তার এই বাছাইয়ের জন্য তিনি প্রামাণ্য দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন নিকৃষ্টতম হাদীছ দুশমন মাহমূদ আবু রাইয়া বইসমূহকে।
অনুরূপ আরেকজন পণ্ডিত আহমাদ যাকী আবু শাদী, যিনি স্বীয় বই ثورة الإسلام )'ইসলামের বিপ্লব' পৃঃ ৪৪)-য়ে বলেন,
هذه سنن ابن ماجة والبخارى وجميع كتب الحديث والسنة طافحة بأحاديث وأخبار لا يمكن أن يقبل صحتها العقل ولا نرضي نسبتها إلى الرسول وأغلبها يدعو إلى السخرية بالإسلام والمسلمين والنبي الأعظم والعياذ بالله -
'এই যে সুনান ইবনু মাজাহ ও বুখারী বা হাদীছ ও সুন্নাহর কিতাবসমূহ, যা হাদীছ ও খবরসমূহ দ্বারা পরিপূর্ণ, জ্ঞানের পক্ষে এগুলির বিশুদ্ধতা মেনে নেয়া সম্ভব নয়। এগুলিকে রাসূলের দিকে সম্বন্ধ করতে আমরা রাযী নই। বরং এগুলির অধিকাংশই ইসলাম, মুসলমান ও মহান নবীর প্রতি ঠাট্টার দিকে আহবান করে। 'আমরা এসব থেকে আল্লাহ্ আশ্রয় চাই'।
উপরোক্ত পণ্ডিতগণ ছাড়াও মুক্তবুদ্ধি ইসলামী চিন্তাবিদ নামে খ্যাত আরও বেশ কয়েকজন ব্যক্তি আছেন, যারা চেতনে বা অবচেতনে বুঝে বা না বুঝে প্রাচীন বা আধুনিক হাদীছ দুশমনদের চটকদার যুক্তিবাদের খপ্পরে পড়ে ইসলামের নামেই ইসলামের মূল স্তম্ভ হাদীছ শাস্ত্রের প্রামাণিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছেন, যা তাদের লেখনী সমূহ দ্বারা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ঐসকল ব্যক্তি ও তাদের বইসমূহের কয়েকটি নিম্নরূপ:
১. ডঃ আলী হাসান আব্দুল কাদের نظرة عامة في تاريخ الفقه الإسلامي 'ইসলামী ফিক্বহের ইতিহাসের উপরে সাধারণ দৃষ্টিপাত'।
২. শায়খ মুহাম্মদ 'ইমারাহ الإسلام والوحدة 'ইসলাম ও ঐক্য'।
৩. মুহাম্মাদ আল-গাযালী السنة النبوية بين أهل الفقه وأهل الحديث 'সুন্নাতে নববী: ফিক্বহবিদ ও হাদীছবিদগণের মধ্যখানে'।
৪. মুহাম্মদ আহমাদ খালাফুল্লাহ العدل الإسلامي 'ইসলামী ন্যায়নীতি'।
৫. ডঃ হাসান তোরাবী تاريخ التجديد الإسلامي 'ইসলামী সংস্কারবাদের ইতিহাস'।
অনুরূপভাবে ডঃ আব্দুল হামীদ মুতাওয়াল্লী মত পোষণ করেন যে, 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ভুক্ত হাদীছসমূহ দ্বারা কোন বিধানগত হুকুম সাব্যস্ত হবে না'। অন্যেরা বলেন, এসবের দ্বারা কোন 'হুদূদ' বা শান্তি বিধান সাব্যস্ত করা যাবে না। অন্য একজন পণ্ডিত শায়খ শালতৃত 'ছহীহ' ও 'মুতাওয়াতির' হাদীছ সমূহের বিরুদ্ধে গিয়ে শেষ যামানায় ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ সম্পর্কিত আক্বীদাকে অস্বীকার করেন। অন্য একজন পণ্ডিত হামাদ সাঈদান মত পোষণ করেন যে, শেষ দিকের সংকলনগুলিতে দুশমনরা ছহীহ বুখারীতে বহু মওযু বা জাল হাদীছ জুড়ে দিয়েছে'। বস্তুতঃ একথা বলে তিনি নিজেকে অজ্ঞ ও হাদীছ দুশমনদের কাতারে শামিল করেছেন। এমনিভাবে তিনি তাঁর কোন কোন বইয়ে কবর আযাবের সর্বসম্মত আক্বীদার ব্যাপারেও সন্দেহ পোষণ করেছেন। যে বিষয়টি মু'তাযিলাগণ ব্যতীত কোন মুসলমান অস্বীকার করেনি।
ডঃ হাসান তোরাবী ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা করার দণ্ড, ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ প্রভৃতিকে অস্বীকার করেন। এতদ্ব্যতীত তাঁর বইসমূহে রয়েছে ভয়ংকর ভ্রান্তিসমূহ। অথচ এই ব্যক্তি সূদানে শরী'আতী আইন কায়েম করার জন্য সোচ্চার। জানিনা সুন্নাতে নববীকে বাদ দিয়ে এবং হাদীছ শাস্ত্রকে অস্বীকার করে তিনি কার শরী'আত দেশে প্রতিষ্ঠা করতে চান।
আরব বিশ্বের নামকরা সাহিত্যিকদের মধ্যে ইসলামের ও ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে যিনি সবচাইতে নগ্ন হামলা চালিয়েছেন, তিনি হ'লেন মিসরের অন্ধ সাহিত্যিক ও সমালোচক ডঃ ত্বহা হুসাইন (১৩০৭-১৩৭৩ হিঃ/১৮৮৯- ১৯৭৩ খৃঃ)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উচ্চ মর্যাদার উপরে আঘাত হেনে তাঁর লিখিত বই على هامش السيرة ('চরিত্রের আশে পাশে')-এর ৫০ পৃষ্ঠায় شوق الحبيب إلى الحبيب 'প্রিয়তমের প্রতি প্রিয়তমের আর্কষণ' শিরোনামে উম্মুল মু'মেনীন যায়নাব বিনতে জাহশের সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর বিবাহের ঘটনা অত্যন্ত নগ্ন ভাষায় পেশ করেছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, এই বইটি মিসরীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় সে দেশের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে পাঠ্যপুস্তক হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছে।
চার্লস ডারউইনের (১৮০৯-১৮৮২) বিবর্তনবাদের অন্ধ সমর্থক ও নাস্তি ক্যবাদী দর্শনের অনুসারী অন্যতম মিসরীয় সাহিত্যিক নাজীব মাহফুয (১৯১১-২০০৬) সম্ভবতঃ ইসলাম সর্ম্পকে তাঁর কপট লেখনীর পুরস্কার হিসাবেই ১৯৮৮ সালে আন্তর্জাতিক 'নোবেল' প্রাইজে ভূষিত হয়েছিলেন। যার বিষদুষ্ট বই সমূহ এখন বাজারে বহুল প্রচলিত। বাংলাদেশের অনেক ব্যক্তি তার প্রশংসায় মুক্তকচ্ছ।

টিকাঃ
১৬. যাওয়াবে' পৃঃ ৭৪, গৃহীত: আল-মানার ৯ম বর্ষ ৭ ও ১২ সংখ্যা।
১৭. যাওয়াবে' পৃঃ ৭৫, গৃহীত: আল-মানার ১০ম বর্ষ... দ্রঃ।
১৮. ড. আহমাদ আমীন, ফাজরুল ইসলাম (মিসর ১৯৭৫) পৃঃ ২১৭-২১৮।
১৯. ড. মুহুত্বফা আস-সাবাঈ, আস-সুন্নাহ (বৈরুত: আল-মাকতাবুল ইসলামী, ৪র্থ সংস্করণ ১৪০৫/ ১৯৮৫) পৃঃ ৩৩৫।

📘 হাদিসের প্রামানিকতা > 📄 ভারতীয় স্কুল

📄 ভারতীয় স্কুল


(مدرسة الهند) ভারতীয় স্কুল
১. স্যার সৈয়দ আহমাদ খান (১৮১৭-১৮৯৮ খৃঃ)
আরব বিশ্বে মিসরীয় পণ্ডিত মুফতী মুহাম্মাদ আবদুহু (১৮৪৯-১৯০৫ খৃঃ) ও তাঁর অনুসারীদের ফিৎনার সমসাময়িক কালে ভারত উপমহাদেশে স্যার সৈয়দ আহমাদ খান ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়' এই ফিৎনার সূতিকাগার হিসাবে গণ্য হয়।
هو في الهند أشبه شيئ بالشيخ محمد عبده في CRINE GRAIN 58 مصر 'মিসরে মুফতী মুহাম্মাদ আবদুহু-র ন্যায় তিনি ছিলেন ভারতে'। তিনি বলেন 'الإصلاح عندهما إصلاح العقلية ! اصلاح ছিল যুক্তিবাদ ভিত্তিক সংস্কার'।
সৈয়দ আহমাদ খান যদিও ভারতে ইংরেজ শাসনের সমর্থক ছিলেন।
তথাপি তিনি তাদের খৃষ্টানীকরণের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি তাদের বিরুদ্ধে ও ইসলামের পক্ষে জোরালো কলমী যুদ্ধ চালিয়েছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি কুরআন-হাদীছের চাইতে মানতিত্ত্ব ও যুক্তিবাদের উপরে অধিক নির্ভর করেছেন। তাঁর জ্ঞান তাঁর ইল্মের চাইতে বেশী ছিল।
কুরআনের যুক্তি ভিত্তিক তাফসীর করতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, 'কুরআন যখন সঠিকভাবে বুঝা যাবে, তখন তা জ্ঞানের সাথে মিলে যাবে।.....অতএব জ্ঞান ও রুচির আলোকে তাফসীর করা ওয়াজিব'। এর ফলে তিনি তাঁর জ্ঞান ও রুচি বিরোধী বহু আয়াত ও ছহীহ হাদীছের ভুল অর্থ ও দূরতম তাবীল করেছেন। জ্ঞান মোতাবেক না হওয়ায় তিনি নবীদের মু'জেযাকে অস্বীকার করেছেন এবং বহু ছহীহ হাদীছকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর আক্বীদাসমূহের ছিটেফোঁটা নিম্নরূপ:
(১) হৃদয়ের বিশ্বাসকেই মাত্র ঈমান বলা হয়। যদি কেউ হৃদয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি আনুগত্য পোষণ করে, সে ব্যক্তি মুমিন। যদিও সে অন্য ধর্মের বাহ্যিক নিদর্শনাদির সাথে সামঞ্জস্য রাখে। যেমন হিন্দুদের ন্যায় গলায় ও বগলের নীচ দিয়ে পৈতা ঝুলানো, ইহুদী-খৃষ্টান ও মজুসীদের ন্যায় কোমরে বেল্ট বা শিকল পরিধান করা কিংবা গলায় ক্রুশ (বা তার সদৃশ বস্তু) ঝুলানো, তাদের পূজা- পার্বণ, বড় দিন ইত্যাদি উৎসবাদিতে যোগদান করা (২) 'নবুঅত' উন্নত চরিত্রের একটি দৃঢ় স্বভাবগত ক্ষমতার নাম (৩) নবীদের মু'জেযা তাঁদের নবুঅতের প্রমাণের অন্তর্ভুক্ত নয় (৪) কুরআন উন্নত ভাষা ও অলংকারের জন্য معجز বা হতবুদ্ধিকারী নয়; বরং হেদায়াত ও শিক্ষাসমূহের কারণে (৫) কুরআনের কোন আয়াত শব্দগত, অর্থগত বা হুকুমগত কোন দিক দিয়েই 'মানসূখ' বা হুকুম রহিত নয় (৬) আসমানী কোন কিতাবে কখনোই কোন 'তাহরীফ' বা শাব্দিক পরিবর্তন হয়নি (৭) রাসূল (ছাঃ)-এর পরবর্তী খলীফাগণ 'নবুঅতের প্রতিনিধি' নন ইত্যাদি।
তাঁর এই কল্পনানির্ভর অতি যুক্তিবাদী ধ্যান-ধারণা বহু বিলাসী পণ্ডিতের মনোজগতে নাড়া দেয় এবং তারাও একই পথ ধরে হাদীছ অস্বীকারের চোরা পথ বেছে নেন। যেমন মৌলবী চেরাগ আলী, আব্দুল্লাহ চকড়ালবী, আহমাদ দ্বীন অমৃতসরী প্রমুখ পণ্ডিত প্রকাশ্যে বলতে থাকেন যে, দ্বীনী বিষয়সমূহে কুরআনই যথেষ্ট, হাদীছের কোন প্রয়োজন নেই। তবে যেগুলি তাদের প্রবৃত্তির অনুকূলে হ'ত, সেগুলিকে তারা গ্রহণ করতেন।
২. চেরাগ আলী
সৈয়দ আহমাদ খানের চিন্তাধারার অনুসারী মৌলবী চেরাগ আলী বলেন, ‘সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড হিসাবে হাদীছের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের কোন প্রয়োজন নেই। কেননা চূড়ান্ত বিচারে হাদীছের উপরে ভরসা করা সম্ভব নয়’।
৩. আব্দুল্লাহ চকড়ালবী
সৈয়দ আহমাদ খানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইনি ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে লাহোরে হাদীছ অস্বীকারের আন্দোলন শুরু করেন এবং বেশ কিছু বই রচনা করেন। তিনি বলেন, ‘লোকেরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপরে মিথ্যারোপ করেছে এবং তার নামে হাদীছ বর্ণনা করেছে’। তিনি তাঁর দলীয় লোকদের জন্য ছালাতের নতুন নিয়ম-বিধি জারি করেন এবং বলেন যে, আযান ও এক্বামত দেওয়া বিদ'আত। এ ধরনের আরও কিছু বিদ'আতী নিয়ম তিনি চালু করেন।
৪. মুহিব্বুল হক আযীমাবাদী
সৈয়দ আহমাদ খানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইনি পাটনাতে ইনকারে হাদীছের আন্দোলন শুরু করেন, যেমন আব্দুল্লাহ চকড়ালবী লাহোরে আন্দোলন শুরু করেন।
৫. নাযীর আহমাদ দেহলভী
আরবী ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর যথেষ্ট দখল ছিল। তিনি হাদীছের রাবীদের সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘এরা মূর্খ। এরা হাদীছের তাৎপর্য বুঝে না’। তিনি বৃদ্ধ বয়সে কুরআন হেফয করেন এবং উর্দু ভাষায় কুরআনের তরজমা ও তাফসীর করেন। উক্ত তাফসীরের মধ্যে তিনি অগ্রাহ্য কথা সমূহ ভরে দিয়েছেন।
৬. আহমাদ দ্বীন অমৃতসরী
আব্দুল্লাহ চকড়ালবীর সহযোগী এই ব্যক্তি পূর্ব পাঞ্জাবের অমৃতসরে ইনকারে হাদীছের আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। ‘আল-উম্মাতুল ইসলামিয়াহ' (ইসলামী দল) নামক দলের তিনি প্রতিষ্ঠাতা।
৭. এনায়াতুল্লাহ মাশরেকী
লণ্ডনের কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারী এই পণ্ডিত উগ্র আধুনিকতার ঝাণ্ডা উড্ডীন করেন ও সালাফে ছালেহীনের পথ থেকে বিচ্যুত হন। তিনি আলেমদের থেকে ও তাঁদের অনুসৃত ইসলাম থেকে নিজেকে বিমুক্ত ঘোষণা করেন। তিনি হাদীছ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং তার বইসমূহে দ্বীনের মূলনীতিসমূহের ব্যাপারে বিদ্রুপ করেন। তিনি শুধুমাত্র কুরআনের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনার মূলনীতি সমূহ তৈরী করেন এবং এজন্য ১০ টি উচ্ছ্বল বা মূলনীতি নির্ধারণ করেন ও ধারণা করেন যে, এগুলিই হ'ল কুরআনের সারবস্তু ও রিসালাতের মূল কথা।
৮. ক্বাযী মুহাম্মাদ শফী'
হাদীছ সম্পর্কে তার লেখনীসমূহে বহু বিচ্যুতি রয়েছে। যেমন তিনি বলেন, 'বহু হাদীছ এমন রয়েছে, যা যৌন সাহিত্যের সাথে সামঞ্জস্য রাখে' (নাউযুবিল্লাহ)।
৯. আসলাম জয়রাজপুরী
হাদীছ অস্বীকারকারীদের মধ্যে উপমহাদেশে শীর্ষস্থানীয়দের অন্যতম। ইনি হাদীছ অস্বীকারকারীদের নেতা গোলাম আহমাদ পারভেয-এর প্রধান সহযোগী, বরং উস্তায ছিলেন। ইনিই হাদীছের বিরুদ্ধে তার নষ্ট চিন্তাধারা সমূহ 'মাক্কামে হাদীছ' (হাদীছের স্থান) নামে উর্দুতে দু'খণ্ডে বই আকারে প্রকাশ করেন।
১০. গোলাম আহমাদ পারভেয
'আহলে কুরআন' (কুরআনের অনুসারী) নামক হাদীছ বিরোধী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এই ব্যক্তি তার সংগঠনের মুখপত্র 'তুলু'এ ইসলাম' ( طلوع اسلام বা ইসলামের উদয়) নামক পত্রিকার মাধ্যমে এবং হাদীছের বিরুদ্ধে বহু বই ও পুস্তিকা প্রকাশের মাধ্যমে ইনকারে হাদীছের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কুরআন ও হাদীছের ইল্‌মে অজ্ঞ কতিপয় ইংরেজী শিক্ষিত পণ্ডিত বিজাতীয় ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তার সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হাদীছের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক দুশমনী শুরু করেন। তাদের প্রতিপাদ্য বিষয় হ'ল: আধুনিক যুগে প্রাচীন যুগের ফেলে আসা হাদীছের অনুসরণ বাতিল।'
ডঃ মুহাম্মাদ মুছতুফা আ'যমী বলেন, প্রাচীন ও আধুনিক যুগের সকল মুনকিরে হাদীছ ছালাত, যাকাত, হজ্জ ইত্যাদি ফরযসমূহ ও এসবের ক্রিয়ানুষ্ঠানসমূহ কবুল করে নিয়েছে। কিন্তু 'আহলে কুরআন' গ্রুপ এমন কউর হাদীছ দুশমন যে, তারা এসব সর্বজন গৃহীত ইবাদত সমূহকেও অস্বীকার করেছে। তারা বলে যে, 'কুরআন আমাদের বারবার ছালাতের ও যাকাতের হুকুম করেছে। এভাবে পুনরুক্তি না করে আল্লাহ ইচ্ছা করলে এসবের ব্যাখ্যা দিতে পারতেন এবং বলতে পারতেন 'তোমরা যোহর, আছর ও এশা চার রাক'আত, মাগরিব তিন রাক'আত ও ফজর দু'রাক'আত পড়; কিন্তু তিনি এসব বলেননি। অতএব আনুষ্ঠানিকভাবে ছালাত, যাকাত, ছিয়াম, হজ্জ ইত্যাদি ইবাদতের কোন বাধ্যবাধকতা নেই'।
এতেই বুঝা যায়, তারা হাদীছের বিরোধিতায় কতদূর পৌঁছে গেছে। তারা বুঝে না যে, কুরআন ও হাদীছ উভয়ের বর্ণনাকারী হ'লেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এবং উভয়ের বাহক ও প্রচারক হ'লেন ছাহাবায়ে কেরাম। তারা হাদীছকে অস্বীকার করে পরোক্ষভাবে রাসূলকেই অস্বীকার করেছে (নাউযুবিল্লাহ)।
হাদীছ দুশমনদের উক্ত কাতারে অগ্রণীদের মধ্যে উর্দু পত্রিকা 'নুকার' )نگار 'নিষ্কৃতি')-এর সম্পাদক নিয়ায ফতেহপুরী এবং ইনকারে হাদীছ বিষয়ে বিভিন্ন পুস্তিকার লেখক গোলাম জীলানী বারকু ছিলেন অন্যতম। হাদীছের প্রামাণিকতার বিরুদ্ধে তাদের বহু ভ্রান্তিকর ও অমার্জনীয় লেখনীসমূহ রয়েছে। তবে তারা উভয়ে মৃত্যুর পূর্বে তওবা করে গেছেন (আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করুন!)। কিন্তু যে সকল লেখনী তাদের বেরিয়ে গেছে, যা লোকদের জন্য স্থায়ী ভ্রান্তির উৎস হয়ে আছে, সেগুলি পড়ে যেন কোন অল্প বুদ্ধি লোক বিভ্রান্ত না হন, সেদিকে সুধী পাঠক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

টিকাঃ
২০. নিয়ায ফতেহপুরী রচিত উর্দু 'ছাহাবিয়াত' বইটি 'মহিলা সাহাবী' নামে বাংলায় অনুবাদ করেছেন জনাব গোলাম সোবহান সিদ্দিকী। প্রকাশক : আল-ফালাহ পাবলিকেশন্স, ঢাকা। যেখানে ১৪ জন মহিলা ছাহাবীর জীবনী আলোচিত হয়েছে। আলোচনায় লেখক তাঁর উদ্দেশ্য ঠিক রেখেছেন। যেমন মা আয়েশা (রাঃ)-এর জীবনী আলোচনা শেষে 'একটি পর্যালোচনা' শিরোনামে তিনি বলেন, তিনি (অর্থাৎ আয়েশা (রাঃ) যা কিছু বলতেন, যে ব্যাখ্যা করতেন, তা ছিল সম্পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক এবং যুক্তি নির্ভর। তাঁর এমন বর্ণনা খুব কমই পাওয়া যাবে, যা বিশ্বাস করার জন্য অহেতুক ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে।.... তিনি ছিলেন অন্ধ অনুকরণের ঘোর বিরোধী। রাসূলে খোদার কথা ও কাজের সত্যিকার তাৎপর্যে উপনীত হওয়ার জন্য সর্বদা চেষ্টা করতেন তিনি। শরীয়তে সবচেয়ে যুক্তিযুক্তের অনুবর্তনের যে প্রবল ধারা তার বর্ণনা থেকে প্রতিভাত হয়, তা সাধারণতঃ অন্য কারো বর্ণনায় পরিলক্ষিত হয় না' (মহিলা সাহাবী পৃঃ ৬৫)।
পাঠক! নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, লেখক এখানে মা আয়েশা (রাঃ)-এর যুক্তিবাদী মেধাকেই অগ্রগণ্য করেছেন। তাঁর হাদীছ অনুসরণকে নয়। অথচ আলী (রাঃ) বলেছেন, যদি দ্বীন মানুষের 'রায়' বা জ্ঞান মোতাবেক হ'ত, তাহ'লে মোযার নীচে মাসাহ করা উত্তম হ'ত মোযার উপরে মাসাহ করার চাইতে' (আবুদাউদ হা/১৬২ 'মাসাহ' অনুচ্ছেদ নং ৬৩)। নিঃসন্দেহে ইসলাম জ্ঞান ও যুক্তিবাদী ধর্ম। কিন্তু তাই বলে তার সবকিছুই সর্বদা সকলের যুক্তি ও জ্ঞান মোতাবেক হবে, এমনটি কখনোই নয়। কেননা মানুষের জ্ঞান সবার সমান নয় এবং আল্লাহর জ্ঞানের সাথে মানুষের জ্ঞান তুলনীয় নয়। অতএব চোখ-কান খোলা রেখে এসব লেখকদের বই পড়তে হবে। নইলে নিজের অজান্তেই এদের পাতানো ফাঁদে আটকে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যাবে।-লেখক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00