📄 অধঃপতনের কারণ
অধঃপতনের কারণ (سبب الانحطاط)
মুসলিম উম্মাহ্র অধঃপতনের বহুবিধ কারণের মধ্যে সবচাইতে বড় কারণ হ'ল কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। কুরআন ও হাদীছের নিরপেক্ষ অনুসরণ ও এতদুভয়ের প্রকাশ্য ও সরলার্থের উপরে আমল ও গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে লোকেরা ক্রমে দলপূজা ও ব্যক্তি পূজায় লিপ্ত হয়। আর এগুলি শুরু হয় মূলতঃ রাজনৈতিক ও দুনিয়াবী স্বার্থকে কেন্দ্র করে। আবুবকর (রাঃ)-এর আড়াই বছরের খেলাফতকাল ব্যয়িত হয় মূলতঃ ইসলামের প্রতিরক্ষার কাজে তথা 'মুরতাদ' বা ধর্মত্যাগীদের ঢল ঠেকানো, যাকাত অস্বীকারকারীদের ও ভণ্ডনবীদের ফেৎনা, বিদেশী বৈরী শক্তির হামলা মুকাবিলা করা ইত্যাদি কাজে। ওমর (রাঃ)-এর ১০ বছরের খেলাফতকালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং মুসলিম শক্তির বিজয়াভিযান এগিয়ে চলে বাধাহীন গতিতে। মুসলমানদের জীবনযাত্রায় সচ্ছলতা ফিরে আসে। ওছমান গণী (রাঃ)-এর ১২ বছরের খেলাফতকালের প্রথমার্ধ্ব ব্যাপী এই অভিযান অব্যাহত থাকে ও মুসলিম শক্তি তৎকালীন পৃথিবীতে একক বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু এরি মধ্যে কিছু বিলাসী লোক দ্বীনকে দুনিয়া হাছিলের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে। ইহুদী সন্তান আবদুল্লাহ বিন সাবা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে ঐসব দুনিয়াদার লোকদেরকে খেলাফতের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করতে থাকে। ফলে রাজনৈতিক বিশৃংখলা দেখা দেয়। যার পরিণতিতে তৃতীয় খলীফা ওছমান (রাঃ) ও পরে চতুর্থ খলীফা আলী (রাঃ) নিহত হন। চরমপন্থী খারেজীরা আলী ও মু'আবিয়া (রাঃ) উভয়কে এবং মিকুদাদ, সালমান ফারেসী ও আবু যার গেফারীসহ হাতে গণা কয়েকজন ব্যতীত সকল ছাহাবীকে 'কাফের' বলতে থাকে। এইভাবে নেতৃস্থানীয় ছাহাবীগণকে 'কাফের' বলার কারণে উম্মতের মধ্যে তাঁদের বিশাল ভাবমূর্তি ও মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়। যে কেউ তাঁদের সমালোচনায় সাহসী হয়ে ওঠে। ফলে মুসলিম ঐক্য হুমকির মুখে পড়ে যায়। মদীনা ও দামেস্ক এবং পরে কুফা ও দামেস্ক রাজনৈতিক বিভক্তির দুই কেন্দ্রে পরিণত হয়। অতঃপর আব্বাসীয় আমলে বাগদাদে একক রাজধানী স্থাপিত হয়।
উপরোক্ত রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে মসজিদ, মাদরাসা সর্বত্র আক্বীদাগত বির্তক শুরু হয়ে যায়। বছরার মা'বাদ জুহানী (মৃঃ ৮০হিঃ) তাক্বদীরকে অস্বীকার করে। জাহম বিন ছাফওয়ান সমরকন্দী (নিহত ১২৮ হিঃ) আল্লাহ্ গুণাবলীকে অস্বীকার করে। ওয়াছিল বিন 'আত্মা (৮০-১৩১ হিঃ) বছরায় মু'তাযিলা মতবাদের জন্ম দেয়। তারা যুক্তির আলোকে ছহীহ হাদীছসমূহের যাচাই শুরু করে এবং তাদের মন মত না হ'লে তাকে অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখাতে থাকে অথবা নিজেদের মন মত করে নেওয়ার জন্য অপব্যাখ্যা ও দূরতম ব্যাখ্যা শুরু করে দেয়।
মোটকথা কুরআন ও সুন্নাহ্ মূল বাহক ও প্রচারক মহামান্য ছাহাবীগণের বিরুদ্ধে কুচক্রীরা মেতে ওঠে। ইহুদী-খৃষ্টান থেকে ধর্মান্তরিত নও-মুসলিম লোকেরাই মূলতঃ এই চক্রান্তে নেতৃত্ব দেয়। যাতে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হাদীছ শাস্ত্রকে বাতিল প্রমাণ করা যায়। আর হাদীছকে বাতিল বা অগ্রহণযোগ্য কিংবা সন্দেহযুক্ত প্রমাণ করতে পারলেই কুচক্রীদের উদ্দেশ্য সফল হবে। কেননা হাদীছের স্তম্ভের উপরেই ইসলামের সুউচ্চ প্রাসাদ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
📄 ছাহাবীগণের ভূমিকা
ছাহাবীগণের ভূমিকা ) موقف الصحابة
ছাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের শিষ্য তাবেঈনে এযام সর্বদা হাদীছের পাহারাদার হিসাবে দৃঢ় হিমাদ্রির ন্যায় ভূমিকা পালন করে গেছেন। হাদীছের নামে মিথ্যা বর্ণনা, হাদীছের অপব্যাখ্যা, দূরতম ব্যাখ্যা ইত্যাদি থেকে তাঁরা ছিলেন বহু যোজন দূরে। এসব বিষয় ছিল তাঁদের স্বপ্নেরও বাইরে। এ কারণে তাঁরা জনগণের মধ্যে 'আহলুল হাদীছ' 'আহলুস সুন্নাহ' ইত্যাদি নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁদের বিরোধীরা 'আহলুল বিদ'আ' তথা বিদ'আতী নামে অভিহিত হতে থাকে (মুক্বাদ্দামা মুসলিম পৃ. ১৫)।
উল্লেখ্য যে, রাজনৈতিক গোলযোগের ফলে ছাহাবীগণের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হ'লেও তাঁদের মধ্যে আক্বীদাগত কোন বিভক্তি দেখা দেয়নি। তাঁরা পরস্পরকে 'কাফির' বলেননি বা কারুর রক্ত হালাল বলেননি। তাঁদের মধ্যে যা কিছু বিরোধ ছিল, তা ছিল স্রেফ ইজতিহাদী মতবিরোধ। যাঁর ইজতিহাদ সঠিক ছিল, তিনি দ্বিগুণ ছওয়াব পাবেন এবং যাঁর ইজতিহাদ বেঠিক ছিল, তিনি একগুণ ছওয়াব পাবেন।
বসরার থাকাকালীন সময়ে একদা ছাহাবী ইমরান বিন হুছাইন (রাঃ) জনৈক ব্যক্তিকে হাদীছ শুনাচ্ছিলেন। তখন একজন লোক এসে বলল, হে আবু নাজীদ! আপনি আমাদেরকে কুরআন শুনান। ইমরান বিন হুছাইন (রাঃ) তখন লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা কি ছালাত আদায় কর না? তোমরা কি যাকাত আদায় কর না? তাহ'লে তা কার দেওয়া পদ্ধতিতে আদায় কর? লোকটি বলল, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে এসব বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। অতঃপর লোকটি নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলল : أَحْيَيْتَنِي أَحْيَاكَ الله 'আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুন!'১২
উমাইয়া বিন খালিদ একবার সকল মাসআলা কুরআন থেকে বের করার চেষ্টা করেন। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা মুক্বীম অবস্থায় ও ভীতির অবস্থায় ছালাত আদায়ের বিষয় কুরআনে পাই। কিন্তু সফরে ছালাত আদায়ের বিষয় তো কুরআনে পাই না।
তখন ইবনু ওমর (রাঃ) তাকে বললেন, يَا ابْنَ أَخِي، إِنَّ اللَّهَ بَعَثَ إِلَيْنَا مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا تَعْلَمُ شَيْئًا، فَإِنَّمَا نَفْعَلُ كَمَا رَأَيْنَا مُحَمَّدًا -يَفْعَلُ 'হে ভাতিজা! মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে আল্লাহ আমাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন, যখন আমরা কিছুই জানতাম না। নিশ্চয়ই আমরা করে থাকি, যেমনভাবে আমরা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে করতে দেখেছি'। ১৩
তবে এই ধরনের প্রশ্ন তৎকালীন মুসলিম সমাজে ব্যাপকতা লাভ করেনি। বরং ব্যক্তি পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল। আর মূলতঃ ইরাকের বছরাতেই এটি সীমাবদ্ধ ছিল। সেকারণ বছরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবেঈ বিদ্বান আইয়ূব সাখতিয়ানী (৬৮-১৩১ হিঃ) নিজ শহরের লোকদের চূড়ান্তভাবে বলে দেন إِذَا حَدَّثْتَ الرَّجُلَ بالسُّنَّةِ فَقَالَ: دَعْنَا مِنْ هَذَا وَحَدَّتْنَا مِنَ الْقُرْآنِ فَاعْلَمْ -أَنَّهُ ضَالٌ وَمُصْلِّ 'যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে হাদীছ শুনাবে, তখন সে যদি বলে যে, ছাড় এসব, আমাদেরকে কুরআন শুনাও, তখন তুমি জেনো যে, ঐ লোকটি নিজে পথভ্রষ্ট এবং অন্যকে পথভ্রষ্টকারী'। ১৪
ব্যক্তি পর্যায়ে হাদীছ বিরোধী উক্ত মনোভাব সীমাবদ্ধ থাকলেও দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ দিকে এসে বেশ কিছু লোককে পাওয়া যায়, যারা পুরা হাদীছ শাস্ত্রকেই অস্বীকার করে অথবা 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ের হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। যদিও মুসলিম উম্মাহ্র সার্বিক সামাজিক জীবনে এর ব্যাপক প্রভাব তখনও পড়েনি, আজও পড়েনি। ফালিল্লা-হিল হাম্দ। তবে হাদীছ বিরোধী ষড়যন্ত্র প্রকাশ্যে ও পরোক্ষে সর্বদা অব্যাহত ছিল, আজও আছে। দুর্ভাগ্যক্রমে এই লোকেরা এখন আর বাইরের কেউ নয়, বরং ঘরের। ইসলামের বড় বড় বিদ্বান হিসাবে যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। এক্ষণে বিগত ও বর্তমান যুগের প্রকাশ্য ও পরোক্ষ হাদীছ বিরোধীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় আমরা তুলে ধরার প্রয়াস পাব। যাতে সাধারণ মুসলমানগণ এদের ধোঁকায় না পড়েন।
টিকাঃ
১২. মুস্তাদরাকে হাকেম ১/১০৯-১০ পৃঃ।
১৩. মুস্তাদরাকে হাকেম ১/২৫৮ পৃঃ।
১৪. ছালাহুদ্দীন মকবুল আহমাদ, যাওয়াবে' ফী ওয়াজহিস সুন্নাহ (রিয়াদ: দার আলমিল কুতুব) তাবি, পৃঃ ৪৬।
📄 প্রাচীন যুগের হাদীছ অস্বীকারকারীগণ
প্রাচীন যুগের হাদীছ অস্বীকারকারীগণ (منكرو السنة قديماً)
১. খারেজী (خارجي): এরা প্রথমে আলী (রাঃ)-এর দলভুক্ত ছিল। কিন্তু তিনি মু'আবিয়া (রাঃ)-এর সাথে রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্দেশ্য দু'জন ছাহাবীকে শালিশ মেনে নেওয়ায় এরা তাঁর বিরোধী হয়ে যায় এবং শ্লোগান তোলে যে, لَا حُكَمَ إِلَّا اللَّه 'কোন হুকুমদাতা নেই আল্লাহ ব্যতীত' অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কাউকে শালিশ মানিনা। অতঃপর উক্ত শালিশীর সমর্থক সকল ছাহাবীকে তারা 'কাফির' বলে এবং তাঁদের বর্ণিত ফিৎনা পরবর্তী সকল হাদীছকে তারা অস্বীকার করে।
২. শী'আ (شيعة): আলী (রাঃ)-এর ভণ্ড সমর্থক এই দলের লোকেরা তাদের ধারণা মতে হাতে গণা কয়েকজন ছাহাবী ব্যতীত সকল ছাহাবীকে 'কাফির' বলে এবং তাঁদের বর্ণিত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। তাদের পসন্দমত কিছু ছাহাবীর বর্ণিত হাদীছসমূহকেই মাত্র তারা গ্রহণ করে থাকে।
৩. মু'তাযিলা (معتزلة): বুদ্ধিবাদী এই দলটির অতি যুক্তিবাদী তৎপরতায় প্রমাণিত হয় যে, প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে এই মতের অনুসারী লোকেরা পুরা হাদীছ শাস্ত্রকেই অস্বীকার করেছে। এমনকি যুক্তির বাইরে হওয়ায় তারা কুরআনের অবোধ্য বিষয়গুলি (إعجاز القرآن) এবং রাসূল (ছাঃ)-এর মু'জিযাসমূহকে (معجزة) অস্বীকার করেছে। আবু হুরায়রা (রাঃ)-কে তারা 'সেরা মিথ্যুক' (أَكَذَبُ الناس) বলতেও দ্বিধা বোধ করেনি। ছাহাবী ও তাবেঈগণের ফৎওয়াসমূহকে তারা তাচ্ছিল্য করে এবং তাঁদেরকে মূর্খ ও মুনাফিক বলে। এমনকি তাঁদেরকে স্থায়ীভাবে জাহান্নামী বলে (নাউযুবিল্লাহ) (যাওয়াবে' পৃঃ ৫৯)।
তবে সঠিক কথা এই যে, উপরোক্ত ভ্রান্ত দলগুলি পুরা হাদীছ শাস্ত্রকে অস্বীকার করেনি। বরং তাদের স্বার্থের বিরোধী হাদীছসমূহকেই মূলতঃ তারা অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করে। যেমন খারেজীরা আহলে বায়তের মর্যাদায় বর্ণিত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। মু'তাযিলারা আল্লাহ্ গুণাবলী সংক্রান্ত হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। যদিও ঐসব দলগুলি অন্যান্য প্রশাখাগত বিষয়ে বর্ণিত কিছু কিছু হাদীছ মান্য করে থাকে।
ইবনু হাযম আন্দালুসী (৩৮৪-৪৫৬ হিঃ) বলেন, মুসলিম উম্মাহ্র সকল দল-উপদল বিশ্বস্ত একক বর্ণনাকারীর বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ভুক্ত হাদীছ বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিতেন। এ ব্যাপারে উম্মতের মধ্যে ঐক্যমত ছিল। কিন্তু ১ম শতাব্দী হিজরীর শেষের দিকে কিছু মু'তাযিলা দার্শনিক এই নীতির ব্যত্যয় ঘটান এবং 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ের হাদীছসমূহে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন'। ১৫ এই মু'তাযিলী যুক্তিবাদী ঢেউ বিভিন্ন ফিক্বহী মাযহাবের বিদ্বানগণের মধ্যেও লাগে কেবলমাত্র আহলেহাদীছ বিদ্বানগণ ব্যতীত। ফালিল্লা-হিল হাম্দ।
টিকাঃ
১৫. আল-ইহকাম ফী উছলিল আহকাম (কায়রো : দারুল হাদীছ, ১৪২৬/২০০৫) পৃঃ ১২৬।
📄 আধুনিক যুগে হাদীছ অস্বীকারকারীগণ
(منكرو السنة حديثا
ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে মাথা চাড়া দেওয়া হাদীছ বিরোধী দলগুলির অপতৎপরতা পরবর্তীতে স্থান বিশেষে ধিকি ধিকি ভাবে টিকে থাকলেও মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণের অব্যাহত প্রতিরোধের মুখে তা ব্যাপকতা লাভ করতে পারেনি। এমনকি আব্বাসীয় খলীফা মামুন, মু'তাছিম ও ওয়াছিক্ক বিল্লাহ্ (১৯৮-২৩২ হিঃ/৮১৩-৮৪৭ খৃঃ) সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা সত্ত্বেও যুক্তিবাদের নামে ভ্রান্ত মু'তাযিলা মতবাদ বৃহত্তর মুসলিম জনসাধারণের গ্রহণযোগ্যতা লাভে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। যদিও ঐসময় আহলেহাদীছ বিদ্বানগণের উপরে নেমে আসে ভূমিকম্পসদৃশ বিপদ-মুছীবত ও যুলুম-অত্যাচারসমূহ। এভাবে শত রাজনৈতিক নির্যাতন ও জেল-যুলুম সহ্য করেও তাঁদের দৃঢ় প্রতিরোধ সাধারণ জনগণের হৃদয় জয় করে। যা হাদীছ শাস্ত্রের পবিত্রতা ও উচ্চ মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়ক হয়।
কিন্তু পঞ্চম শতাব্দী হিজরী থেকে সপ্তম শতাব্দী হিজরী পর্যন্ত (৪৮০-৬৯১হিঃ/১০৯৫-১২৯১খৃঃ-২০২/১৯৬ বছর) ফিলিস্তীন উদ্ধারের নামে খ্রিষ্টান ইউরোপের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রায় দু'শো বছর ব্যাপী সংঘটিত 'ক্রুসেড' যুদ্ধে পরাজিত ও ব্যর্থ খ্রিষ্টান নেতারা মুসলিম বিশ্বকে করায়ত্ত করার জন্য ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। তারা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের নীলনকশা অংকন করে এবং এজন্য বিশেষ কিছু শিক্ষিত লোক নিয়োগ করে। যারা আরবী ও ইসলামী সাহিত্য বিষয়ে গবেষণা ও অনুবাদে আত্মনিয়োগ করেন।
অন্যদিকে আর্থিকভাবে দুর্বল মুসলিম দেশগুলিতে সমাজ কল্যাণের নামে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে মানবপ্রেমিক সেজে তারা সামনে আসে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে ইসলামী গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে তারা বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করতে থাকে। যা মুসলমানেরা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে করতে সক্ষম হয়নি। মূল্যবান স্কলারশিপ দিয়ে মুসলিম দেশসমূহের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাগুলিকে তারা গবেষণার নামে নিজেদের দেশে নিয়ে যায় এবং উচ্চতর ডিগ্রী ও লোভনীয় সুযোগ-সুবিধার ফাঁদে ফেলে তাদেরকে মানসিক গোলামে পরিণত করে। তারা ইসলামকে প্রাচীন ভেবে তাকে আধুনিক করার সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। কেউ কেউ তাদের ভ্রান্ত আক্বীদা-বিশ্বাসকে ইসলামী লেবাস পরিধান করাতে সচেষ্ট হন। এভাবে তাদের নানামুখী ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান দিক ছিল এই যে, 'আমাদের জন্য কুরআনই যথেষ্ট হাদীছের কোন প্রয়োজন নেই'। কেননা হাদীছ হ'ল 'যান্নী' বা ধারণা নির্ভর। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে এগুলি লিপিবদ্ধ আকারে রেখে যাননি। সেকারণ এতে অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে একক রাবীর বর্ণিত হাদীছসমূহকে, যাকে 'খবরে ওয়াহেদ' বলা হয়।
অতঃপর ঐসব লোকগুলি 'সংস্কার'-এর নাম নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাদের গুরু 'প্রাচ্যবিদ' (Orientalist) নামে খ্যাত ইউরোপীয় খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের অনুকরণে কাজ করতে থাকেন। মুক্তবুদ্ধির নামে তারা কথিত মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার বিরুদ্ধে তরুণদের উত্তেজিত ও আকৃষ্ট করতে থাকেন। এইভাবে ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস এবং ছাহাবী ও তাবেঈগণের ঈমানী দৃঢ়তা সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরাই ইসলাম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরূপে মুসলিম সমাজে আবির্ভূত হন ও তাদের দেওয়া ভুল ও বিকৃত ব্যাখ্যায় সমাজে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। মুসলমান নামধারী এইসব কলমী মুনাফিকরাই ইসলামের স্থায়ী ক্ষতি সাধনে সক্ষম হয়, যা সশস্ত্র 'ক্রুসেড' যুদ্ধের মাধ্যমে করা সম্ভব হয়নি।
এইসব মুক্তবুদ্ধি ইসলামী চিন্তাবিদগণ কয়েকভাবে বিভক্ত। কেউ পুরো হাদীছ শাস্ত্রের বিরুদ্ধে 'সন্দেহবাদ' আরোপ করেছেন। কেউ শুধুমাত্র 'খবরে ওয়াহেদ' জাতীয় হাদীছগুলিতে সন্দেহ সৃষ্টি করেছেন। কেউ হাদীছ বাদ দিয়ে কেবলমাত্র কুরআনের অনুসারী হওয়ার দাবী করেছেন। কেউ নিজের স্বার্থের কিছু হাদীছকে স্বীকার করেছেন, বাকীগুলিকে অস্বীকার বা অপব্যাখ্যা করেছেন। অনেকে হাদীছ শাস্ত্রকে সরাসরি অস্বীকার করেননি, তবে যুক্তির নামে এমন সব অপযুক্তির অবতারণা করেছেন, যা হাদীছ অস্বীকারকারীদের চেয়েও অধিক ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে এবং যা লোকদের নিকটে হাদীছের উচ্চ মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে।
পাশ্চাত্যে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন গোল্ডযিহের (১৮৫০-১৯২১), জোসেফ শাখত, মার্গোলিয়থ, গ্যাস্টন ওয়াট, টমাস আর্নল্ড, কার্ল ব্রোকেলম্যান, আর.এ. নিকলসন, এ.জে. আরবেরী, আলফ্রেড হিউম, হ্যামিল্টন এ.আর. গীব, মন্টগোমারী ওয়াট, এস.এম. যুইমার, এ.জে. ভিনসিক, হেনরী ল্যামেন্স (১৮৬৮-১৯৫১) প্রমুখ।
পক্ষান্তরে প্রাচ্যে এই আন্দোলনের উৎস ভূমি হ'ল প্রধানতঃ দু'টি। ১. মিসরে মুফতী মুহাম্মাদ আব্দুহু (১৮৪৯-১৯০৫) ও তাঁর অনুসারীবৃন্দ ২. ভারতে স্যার সৈয়দ আহমাদ খান (১৮১৭-১৮৯৮) ও তাঁর অনুসারীবৃন্দ।