📄 হাদীছের প্রামাণিকতা
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
عَنْ أَبِي رَافِعٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَكِتا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ الْأَمْرُ مِنْ أَمْرِى مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ لَا أَدْرِى مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ ، رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاؤُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ-
অনুবাদ: আবু রাফে' (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, 'আমি যেন তোমাদের কাউকে এরূপ না দেখি যে, সে তার গদীতে ঠেস দিয়ে বসে থাকবে, আর তার কাছে আমার কোন আদেশ বা নিষেধাজ্ঞা পৌঁছলে সে বলবে যে, আমি এসব কিছু জানিনা। যা আল্লাহর কিতাবে পাব, তারই আমরা অনুসরণ করব'।'
হাদীছের ব্যাখ্যা: উপরোক্ত হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণী বিধৃত হয়েছে যে, মুসলমানদের মধ্যকার একদল লোক হাদীছকে অগ্রাহ্য করবে এবং নিজেদেরকে শুধু কুরআনের অনুসারী বলে দাবী করবে। এর অন্তর্নিহিত কারণও উক্ত হাদীছে ইঙ্গিতে বলে দেওয়া হয়েছে যে, ঐসব লোকেরা হবে বিলাসী ও দুনিয়াদার। এরা হাদীছে বর্ণিত ইসলামের বিস্তারিত আদেশ ও নিষেধাবলীর পাবন্দী হ'তে নিজেদেরকে মুক্ত করে নিজ নিজ স্বেচ্ছাচারিতা বহাল রাখার জন্য কুরআনের অনুসারী হওয়ার দাবী করবে। কারণ কুরআনে মূল বিষয়গুলিই মাত্র বর্ণিত হয়েছে, ব্যাখ্যা আসেনি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় কথা, কর্ম ও সম্মতিমূলক আচরণের মাধ্যমে কুরআনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বাস্তব নমুনা পেশ করে গেছেন। এমনকি কুরআনে বর্ণিত হয়নি, এমন অনেক বিষয় রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক নির্দেশিত হয়েছে, যা উম্মতের জন্য অবশ্য পালনীয়। কেননা কুরআনে আল্লাহ নিজেই বলেছেন,
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا، (الحشر (۷)
রাসূল তোমাদের নিকটে যা নিয়ে আসেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক' (হাশর ৫৯/৭)।
অথচ উক্ত লোকগুলি মুখে ও কলমে রাসূল (ছাঃ)-এর প্রশংসাগীতি গাইলেও তাঁর আদেশ-নিষেধ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখার জন্য বিভিন্ন চোরাপথ তালাশ করে। আর সেকারণে তারা হাদীছকে প্রকাশ্যে অথবা পরোক্ষে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করে।
দ্বিতীয়তঃ কুরআনের ব্যাখ্যা যদি হাদীছে না আসত, তাহ'লে এই সব পণ্ডিত লোকগুলি কুরআনের ইচ্ছামত ব্যাখ্যা করতে পারত, যেভাবে ইহুদী-নাছারা পণ্ডিতেরা তাওরাত-ইঞ্জীলের করেছে। তারা কেবল অপব্যাখ্যাই করেনি বরং মূল তাওরাত-ইঞ্জীলের মধ্যে শব্দ ও বাক্য সংযোজন ও বিয়োজন করে উক্ত এলাহী গ্রন্থদ্বয়কে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছে। ফলে ইহুদী-নাছারাগণ মূল তাওরাত-ইঞ্জীল থেকে বঞ্চিত হয়ে তাদের ধর্মযাজকদের পায়রবী করছে। ইসলামকেও যাতে অনুরূপ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যায়, সেজন্য 'আলেম' নামধারী স্বার্থদুষ্ট কিছু দুনিয়াদার লোক হাদীছকে তাদের স্বেচ্ছাচারিতার পথে প্রধান অন্তরায় বিবেচনা করে হাদীছের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই এ ষড়যন্ত্র চলে আসছে, যা আজও অব্যাহত আছে। এই ষড়যন্ত্রের ধরণ ও পদ্ধতি বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রূপ হয়েছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ও প্রচারমূলক আন্দোলন ছাহাবাযুগ থেকে এযাবত অব্যাহত রয়েছে, যা ইতিহাসে 'আহলেহাদীছ আন্দোলন' নামে পরিচিত।
টিকাঃ
১. আহমাদ, আবুদাউদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, বায়হাক্বী; সনদ ছহীহ, মিশকাত, আলবানী হা/১৬২; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/১৫৪ 'ঈমান' অধ্যায়, 'কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা' অনুচ্ছেদ।
📄 হাদীছ-এর গুরুত্ব
হাদীছ-এর গুরুত্ব (أهمية الحديث)
১. 'হাদীছ' সরাসরি আল্লাহ্র 'অহি'। কুরআন 'অহিয়ে মাত্লু' যা তেলাওয়াত করা হয়। কিন্তু হাদীছ 'অহিয়ে গায়ের মাত্লু' যা তেলাওয়াত করা হয় না। যেমন-
(ক) আল্লাহ বলেন, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى ، إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى রাসূল তাঁর ইচ্ছামত কিছু বলেন না। কেবলমাত্র অতটুকু বলেন, যতটুকু তাঁর নিকটে 'অহি' করা হয়' (নাজম ৫৩/৩-৪)।
(খ) তিনি অন্যত্র বলেন, وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ - عَلَيْكَ عَظِيمًا 'আল্লাহ আপনার উপরে নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমত (সুন্নাহ) এবং আপনাকে শিখিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার উপরে আল্লাহ্র অনুগ্রহ অপরিসীম' (নিসা ৪/১১৩)।
(গ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَلا إِنِّي أُوتِيتُ الْقُرْآنَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ ، أَلا يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيكَتِهِ يَقُولُ عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلالٍ فَأَحِلُّوهُ وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُوْلُ اللَّهِ كَمَا حَرَّمَ اللَّهُ ... رواه أبو داؤد والترمذي
'জেনে রাখো! আমি কুরআন প্রাপ্ত হয়েছি ও তার ন্যায় আরেকটি বস্তু। সাবধান! এমন একটি সময় আসছে যখন বিলাসী মানুষ তার গদিতে বসে বলবে, তোমাদের জন্য এ কুরআনই যথেষ্ট। সেখানে যা হালাল পাবে, তাকেই হালাল জানবে এবং সেখানে যা হারাম পাবে, তাকেই হারাম জানবে। অথচ আল্লাহ্র রাসূল যা হারাম করেছেন তা আল্লাহ কর্তৃক হারাম করার অনুরূপ'। এখানে 'কুরআন' হ'ল 'প্রকাশ্য অহি' এবং তার ন্যায় আরেকটি বস্তু হ'ল 'হাদীছ' যা 'অপ্রকাশ্য অহি'।
(ঘ) জিব্রীল (আঃ) সরাসরি নেমে এসে মানুষের বেশে রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের মজলিসে বসে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ইসলাম, ঈমান, ইহসান প্রভৃতি বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন।
২. হাদীছ হ'ল কুরআনের ব্যাখ্যা স্বরূপ। যেমন আল্লাহ বলেন, وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُوْنَ আপনার নিকটে 'যিক্র' নাযিল করেছি, যাতে আপনি লোকদের উদ্দেশ্যে নাযিলকৃত বিষয়গুলি তাদের নিকটে ব্যাখ্যা করে দেন এবং যাতে তারা চিন্তা- গবেষণা করে' (নাহল ১৬/৪৪)।
৩. হাদীছের অনুসরণ ব্যতীত কেউ মুমিন হ'তে পারে না। যেমন আল্লাহ বলেন, فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا - (النساء ٦٥) 'আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা কখনোই মুমিন হ'তে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের বিবাদীয় বিষয়সমূহে আপনাকেই একমাত্র সমাধানকারী হিসাবে গ্রহণ করবে। অতঃপর আপনার দেওয়া ফায়ছালা সম্পর্কে তারা তাদের মনে কোনরূপ দ্বিধা-সংকোচ পোষণ না করবে এবং অবনতচিত্তে তা গ্রহণ না করবে' (নিসা ৪/৬৫)।
৪. হাদীছের বিরোধিতা করার কোন এখতিয়ার মুমিনের নেই। যেমন আল্লাহ বলেন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا - (الأحزاب (٣٦) 'কোন মুমিন পুরুষ ও নারীর পক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দেওয়া ফায়ছালার ব্যাপারে (ভিন্নমত পোষণের) কোনরূপ এখতিয়ার নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করল, সে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে নিপতিত হ'ল' (আহযাব ৩৩/৩৬)।
৫. হাদীছ মেনে নেওয়া উম্মতের উপরে অপরিহার্য। যেমন আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا، তোমাদেরকে যা প্রদান করেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক' (হাশর ৫৯/৭)।
৬. হাদীছ অনুসরণের মধ্যেই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি নিহিত। যেমন আল্লাহ বলেন, قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رحيم - (آل عمران (۳۱) 'আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবেসে থাক, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহ'লে তিনি তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ সমূহ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়াময়' (আলে ইমরান ৩/৩১)। অত্র আয়াতে একথা স্পষ্ট যে, আল্লাহর ভালোবাসার সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য ও অনুসরণ শর্তযুক্ত। অতএব হাদীছের অনুসরণ ব্যতীত আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ সম্ভব নয়।
৭. হাদীছের বিরোধিতা করা কুফরী। যেদিকে ঈঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ 'আপনি বলে দিন যে, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রাসূলের। যদি তারা এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহ'লে (তারা জেনে রাখুক যে,) আল্লাহ কখনোই কাফেরদের ভালবাসেন না' (আলে ইমরান ৩/৩২)।
৮. বিবাদীয় বিষয়ে কিতাব ও সুন্নাহ্ দিকেই ফিরে যেতে হবে, অন্যদিকে নয়। যেমন আল্লাহ বলেন, فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ ۚ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا (النساء - (৫৯ 'যদি তোমরা কোন বিষয়ে ঝগড়া কর, তাহ'লে তোমরা বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। সেটাই হবে উত্তম ও পরিণামের দিক দিয়ে সুন্দরতম' (নিসা ৪/৫৯)।
৯. হাদীছের অনুসরণ অর্থ আল্লাহ্র অনুসরণ। যেমন আল্লাহ বলেন, مَن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا 'যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহ্র আনুগত্য করল, আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিল, আমরা তাদের উপরে আপনাকে পাহারাদার হিসাবে প্রেরণ করিনি' (নিসা ৪/৮০)।
১০. হাদীছের বিরোধিতায় জাহান্নাম অবধারিত। যেমন আল্লাহ বলেন, وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا (الجن (۲۳) 'আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করল, তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত হ'ল। সেখানে সে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে' (জিন্ন ৭২/২৩)।
১১. হাদীছের বিরোধিতা করলে দুনিয়া ও আখেরাতে ফিৎনায় পড়া অবশ্যম্ভাবী। যেমন আল্লাহ বলেন, فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ 'যারা রাসূলের আদেশ-নিষেধের বিরোধিতা করে, তারা যেন এ বিষয়ে ভয় করে যে, তাদেরকে (দুনিয়াবী জীবনে) গ্রেফতার করবে নানাবিধ ফিৎনা এবং (পরকালীন জীবনে) গ্রেফতার করবে মর্মান্তিক আযাব' (নূর ২৪/৬৩)।
১২. হাদীছের সিদ্ধান্ত মেনে না নেওয়া মুনাফিকের লক্ষণ। যেমন আল্লাহ বলেন, وَيَقُولُونَ آمَنَّا بِالله وَبِالرَّسُولِ وَأَطَعْنَا ثُمَّ يَتَوَلَّى فَرِيقٌ مِنْهُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَمَا أُولَئِكَ بِالْمُؤْمِنِينَ - وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُمْ مُعْرِضُون - (النور ٤٧ - ٤٨ ) -
'তারা বলে আমরা আল্লাহ ও রাসূলের উপরে ঈমান এনেছি ও তাঁর আনুগত্য করি। অতঃপর তাদের মধ্যকার একদল লোক পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। বস্তুতঃ তারা মুমিন নয়।' 'অনুরূপভাবে যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফায়ছালার দিকে আহ্বান করা হয়, তখন তাদের মধ্যকার একদল লোক মুখ ফিরিয়ে নেয় (নূর ২৪/৪৭-৪৮)। 'অথচ মুমিনদের কথা এরূপ হওয়া উচিত যে, যখন তাদেরকে ফায়ছালার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহ্বান করা হবে তখন তারা বলবে, আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম। বস্তুতঃ তারাই হ'ল সফলকাম' (নূর ২৪/৫১)।
(খ) অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُول رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّوْنَ عَنْكَ صُدُودًا - (النساء (٦١) তাদেরকে বলা হয় যে, তোমরা এস ঐ সত্যের দিকে, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন এবং এস রাসূলের দিকে, তখন আপনি মুনাফিকদের দেখবেন যে, তারা আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে (বা আপনার নিকটে আসা থেকে লোকদের পথ রুদ্ধ করে দেবে)' (নিসা ৪/৬১)।
১৩. রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত তথা হাদীছের অনুসরণকে ওয়াজিব করে আল্লাহ পবিত্র কুরআনের অন্যূন ৪০ জায়গায় বর্ণনা করেছেন।
১৪. ছাহাবায়ে কেরাম হাদীছকে আল্লাহ প্রেরিত 'অহি' হিসাবেই বিশ্বাস করতেন। যেমন আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, একদা জনৈকা মহিলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে এসে বললেন, 'হে আল্লাহ্র রাসূল! পুরুষেরা আপনার সব হাদীছ নিয়ে গেল। এক্ষণে আমাদেরকে আপনি নিজের থেকে একটা দিন নির্দিষ্ট করে দিন, যেদিন আমরা আপনার নিকটে আসব এবং আপনি আমাদেরকে শিখাবেন, যা আল্লাহ আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন'। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের জন্য একটা দিন ও স্থান নির্দিষ্ট করে দেন ও সেখানে আগমন করেন। অতঃপর তাদেরকে শিক্ষা দেন যা আল্লাহ তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন'।
এখানে তিনটি বিষয় সাব্যস্ত হয় (১) রাসূল (ছাঃ)-এর যামানায় পুরুষ ও নারী সকলে হাদীছ শিক্ষাকে প্রধান কর্তব্য বলে মনে করতেন (২) পুরুষের ন্যায় মহিলাগণও রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে হাদীছ শিখতে আসতেন (৩) হাদীছকে তাঁরা সবাই আল্লাহ্র সরাসরি 'অহি' হিসাবে বিশ্বাস করতেন।
১৫. হাদীছের উপরে বিশ্বাস রাখা বা না রাখাই হ'ল মুমিন ও কাফিরের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
فَمَنْ أَطَاعَ مُحَمَّدًا فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ عَصَى مُحَمَّدًا فَقَدْ عَصَى اللَّهُ ، .gla-s wins o وَمُحَمَّدٌ فَرَقَ بَيْنَ النَّاسِ ، رواه البخاري করল, সে আল্লাহ্ আনুগত্য করল। যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহ্ অবাধ্যতা করল। মুহাম্মাদ হ'লেন লোকদের মধ্যে হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী মানদণ্ড'।
১৬. হাদীছ অমান্য করলে জাহান্নামী হ'তে হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى قَيْلَ وَمَنْ أَبَي؟ قَالَ : مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى ، رواه البخاري 'আমার প্রত্যেক উম্মত জান্নাতে যাবে। কেবল তারা ব্যতীত, যারা অসম্মত হবে। জিজ্ঞেস করা হ'ল 'অসম্মত' কারা? তিনি বললেন, যারা আমার আনুগত্য করল, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং যারা আমার অবাধ্যতা করবে, তারাই হ'ল অসম্মত'।'
১৭. হারাম ও হালালের বিধান প্রদানে হাদীছের স্থান কুরআনের ন্যায়। বরং তার চেয়ে বেশী। যেমন গৃহপালিত গাধা, দন্ত-নখরওয়ালা হিংস্র পশু ও পক্ষী কুরআনে হারাম করা হয়নি, অথচ হাদীছে হারাম করা হয়েছে।"
কুরআনে সকল মৃত এবং রক্তকে হারাম করা হয়েছে' (বাক্বারাহ ২/১৭৩)। অথচ হাদীছে দু'প্রকার মৃত অর্থাৎ মাছ ও টিডিড পাখি এবং দু'প্রকার রক্ত অর্থাৎ কলিজা ও প্লীহাকে হালাল করা হয়েছে।১০
১৮. হাদীছ কেবল কুরআনের ব্যাখ্যাকারী নয়, বরং অনেক সময় কুরআনই হাদীছের প্রত্যয়নকারী।
যেমন (ক) হিজরতের পূর্বে মক্কায় ১২ নববী বর্ষে সংঘঠিত মি'রাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয হয় এবং জিব্রীল (আঃ) এসে রাসূল (ছাঃ)-কে ওযু ও ছালাতের নিয়ম-কানুন শিক্ষা দেন এবং তখন থেকেই ছাহাবায়ে কেরাম নিয়মিত ওযূসহ ছালাত আদায় করতে থাকেন। অথচ ওযুর ফরয পদ্ধতি সম্পকে সূরা মায়েদাহ্র ৬ নং আয়াত নাযিল হয় মি'রাজের ঘটনার ৮ বছর পরে ৬ষ্ঠ হিজরীতে মদীনায়।
(খ) মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (রহঃ) বলেন, ইহুদীদের শনিবার ও নাছারাদের রবিবার সাপ্তাহিক উপাসনার দিনের বিপরীতে আনছার ছাহাবীগণ মদীনায় আস'আদ বিন যুরারাহ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে শুক্রবার জুম'আর ছালাত আদায় শুরু করেন এবং তাঁরাই সর্বপ্রথম 'জুম'আহ' নামকরণ করেন। কেননা এদিনের পূর্বনাম ছিল 'আরূবাহ' (العروبة)। পরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হিজরত করে এলে জুম'আ ফরয হওয়ার আয়াত সম্বলিত সূরা জুম'আ নাযিল হয়।"
তবে যেহেতু হাদীছের বিশাল ভাণ্ডারের সংগ্রহ, সংকলন ও সংরক্ষণ কুরআনের ন্যায় 'মুতাওয়াতির' বা অবিরত ধারায় বর্ণিত ও সকলের নিকটে সমভাবে ও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়নি, সেকারণ বিদ্বানগণ হাদীছকে কুরআনের পরে দ্বিতীয় স্তরে রেখেছেন। তবে কুরআনের সংক্ষিপ্ত, অস্পষ্ট ও মৌলিক বিধান সমূহের বিপরীতে বিস্তারিত, সুস্পষ্ট এবং মৌলিক ও বিস্তৃত বিধানাবলী সম্বলিত হাদীছ শাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা মুমিন জীবনে সর্বাধিক। যা ব্যতীত পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামী জীবন যাপন করা মুমিনের জন্য আদৌ সম্ভবপর নয়।
১৯. হাদীছের অনুসরণ ব্যতীত মুমিনের সকল নেক আমল বিফলে যাবে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ -)۳۳( محمد ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্র আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমরা তোমাদের আমলসমূহকে বিনষ্ট করো না' (মুহাম্মাদ ৪৭/৩৩)।
২০. আক্বীদা ও আহকাম সকল বিষয়ে হাদীছ হ'ল চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী।
যেমন (১) কবর আযাব, ঈসা (আঃ)-এর ঊর্ধ্বারোহণ ও ক্বিয়ামতের প্রাক্কালে অবতরণ, মাহদীর আগমন, দাজ্জালের আবির্ভাব প্রভৃতি আক্বীদাগত বিষয় (২) ছালাত, ছিয়াম, যাকাত ও হজ্জের নিয়ম-কানুন ইত্যাদি ইবাদতগত বিষয় (৩) ব্যবসা-বাণিজ্যসহ হালাল-হারামের অর্থনৈতিক বিধানসমূহ, স্ত্রীর সাথে তার বোন ও খালা-ফুফুকে বিবাহ না করা, রক্ত সম্পর্কীয়দের ন্যায় দুগ্ধ সম্পর্কীয়দের সাথে বিবাহের নিষিদ্ধতাসহ বিবাহ ও তালাকের বিস্তারিত নিয়ম ও বিধানসমূহ, পৌত্রের সম্পত্তিতে দাদীর উত্তরাধিকার, সামাজিক জীবনে আমীরের আনুগত্য, বিবাহিত ও অবিবাহিত যেনাকারের শাস্তির পার্থক্য, মদ্যপান, অঙ্গচ্ছেদন ও ক্ষতিকরণ ইত্যাদি বিভিন্ন অপরাধের শাস্তিবিধানসহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াবলীর বিস্তারিত বিধি-বিধান কেবলমাত্র হাদীছের মাধ্যমেই আমরা প্রাপ্ত হয়েছি। সেকারণ হাদীছের অনুসরণ ব্যতীত ইসলামের অনুসরণ কল্পনা করা অসম্ভব।
টিকাঃ
২. আবুদাউদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১৬৩।
৩. ড. মুহাম্মাদ আবু শাহবাহ, দিফা' 'আনিস সুন্নাহ (কায়রো: মাকতাবাতুস সুন্নাহ ১৪০৯/১৯৮৯) পৃ: ১৫।
৪. হাদীছে জিব্রীল, মুসলিম, মিশকাত হা/২।
৫. বুখারী, মিশকাত হা/১৭৫৩; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/১৬৬১ 'জানাযা' অধ্যায় 'মৃতের জন্য ক্রন্দন' অনুচ্ছেদ।
৬. বুখারী, মিশকাত হা/১৪৪ 'কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা' অনুচ্ছেদ।
৭. বুখারী, মিশকাত হা/১৪৩।
৮. আবুদাউদ, মিশকাত হা/১৬৩; মুসলিম, মুত্তাফাক্ক 'আলাইহ, মিশকাত হা/৪১০৫, ৪১০৬।
৯. এক প্রকার ছোট মরুপক্ষী, যা সচরাচর আরবরা শিকার করে খেত।
১০. আহমাদ, ইবনু মাজাহ প্রভৃতি, মিশকাত হা/৪১৩২ 'শিকার ও যবহ' অধ্যায়, 'যে সব বস্তু খাওয়া হালাল ও হারাম'।
১১. তাফসীর কুরতুবী ১৮/৯৮ সূরা জুম'আ ৯ আয়াতের ব্যাখ্যা।
📄 অধঃপতনের কারণ
অধঃপতনের কারণ (سبب الانحطاط)
মুসলিম উম্মাহ্র অধঃপতনের বহুবিধ কারণের মধ্যে সবচাইতে বড় কারণ হ'ল কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। কুরআন ও হাদীছের নিরপেক্ষ অনুসরণ ও এতদুভয়ের প্রকাশ্য ও সরলার্থের উপরে আমল ও গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে লোকেরা ক্রমে দলপূজা ও ব্যক্তি পূজায় লিপ্ত হয়। আর এগুলি শুরু হয় মূলতঃ রাজনৈতিক ও দুনিয়াবী স্বার্থকে কেন্দ্র করে। আবুবকর (রাঃ)-এর আড়াই বছরের খেলাফতকাল ব্যয়িত হয় মূলতঃ ইসলামের প্রতিরক্ষার কাজে তথা 'মুরতাদ' বা ধর্মত্যাগীদের ঢল ঠেকানো, যাকাত অস্বীকারকারীদের ও ভণ্ডনবীদের ফেৎনা, বিদেশী বৈরী শক্তির হামলা মুকাবিলা করা ইত্যাদি কাজে। ওমর (রাঃ)-এর ১০ বছরের খেলাফতকালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং মুসলিম শক্তির বিজয়াভিযান এগিয়ে চলে বাধাহীন গতিতে। মুসলমানদের জীবনযাত্রায় সচ্ছলতা ফিরে আসে। ওছমান গণী (রাঃ)-এর ১২ বছরের খেলাফতকালের প্রথমার্ধ্ব ব্যাপী এই অভিযান অব্যাহত থাকে ও মুসলিম শক্তি তৎকালীন পৃথিবীতে একক বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু এরি মধ্যে কিছু বিলাসী লোক দ্বীনকে দুনিয়া হাছিলের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে। ইহুদী সন্তান আবদুল্লাহ বিন সাবা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে ঐসব দুনিয়াদার লোকদেরকে খেলাফতের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করতে থাকে। ফলে রাজনৈতিক বিশৃংখলা দেখা দেয়। যার পরিণতিতে তৃতীয় খলীফা ওছমান (রাঃ) ও পরে চতুর্থ খলীফা আলী (রাঃ) নিহত হন। চরমপন্থী খারেজীরা আলী ও মু'আবিয়া (রাঃ) উভয়কে এবং মিকুদাদ, সালমান ফারেসী ও আবু যার গেফারীসহ হাতে গণা কয়েকজন ব্যতীত সকল ছাহাবীকে 'কাফের' বলতে থাকে। এইভাবে নেতৃস্থানীয় ছাহাবীগণকে 'কাফের' বলার কারণে উম্মতের মধ্যে তাঁদের বিশাল ভাবমূর্তি ও মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়। যে কেউ তাঁদের সমালোচনায় সাহসী হয়ে ওঠে। ফলে মুসলিম ঐক্য হুমকির মুখে পড়ে যায়। মদীনা ও দামেস্ক এবং পরে কুফা ও দামেস্ক রাজনৈতিক বিভক্তির দুই কেন্দ্রে পরিণত হয়। অতঃপর আব্বাসীয় আমলে বাগদাদে একক রাজধানী স্থাপিত হয়।
উপরোক্ত রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে মসজিদ, মাদরাসা সর্বত্র আক্বীদাগত বির্তক শুরু হয়ে যায়। বছরার মা'বাদ জুহানী (মৃঃ ৮০হিঃ) তাক্বদীরকে অস্বীকার করে। জাহম বিন ছাফওয়ান সমরকন্দী (নিহত ১২৮ হিঃ) আল্লাহ্ গুণাবলীকে অস্বীকার করে। ওয়াছিল বিন 'আত্মা (৮০-১৩১ হিঃ) বছরায় মু'তাযিলা মতবাদের জন্ম দেয়। তারা যুক্তির আলোকে ছহীহ হাদীছসমূহের যাচাই শুরু করে এবং তাদের মন মত না হ'লে তাকে অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখাতে থাকে অথবা নিজেদের মন মত করে নেওয়ার জন্য অপব্যাখ্যা ও দূরতম ব্যাখ্যা শুরু করে দেয়।
মোটকথা কুরআন ও সুন্নাহ্ মূল বাহক ও প্রচারক মহামান্য ছাহাবীগণের বিরুদ্ধে কুচক্রীরা মেতে ওঠে। ইহুদী-খৃষ্টান থেকে ধর্মান্তরিত নও-মুসলিম লোকেরাই মূলতঃ এই চক্রান্তে নেতৃত্ব দেয়। যাতে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হাদীছ শাস্ত্রকে বাতিল প্রমাণ করা যায়। আর হাদীছকে বাতিল বা অগ্রহণযোগ্য কিংবা সন্দেহযুক্ত প্রমাণ করতে পারলেই কুচক্রীদের উদ্দেশ্য সফল হবে। কেননা হাদীছের স্তম্ভের উপরেই ইসলামের সুউচ্চ প্রাসাদ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
📄 ছাহাবীগণের ভূমিকা
ছাহাবীগণের ভূমিকা ) موقف الصحابة
ছাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের শিষ্য তাবেঈনে এযام সর্বদা হাদীছের পাহারাদার হিসাবে দৃঢ় হিমাদ্রির ন্যায় ভূমিকা পালন করে গেছেন। হাদীছের নামে মিথ্যা বর্ণনা, হাদীছের অপব্যাখ্যা, দূরতম ব্যাখ্যা ইত্যাদি থেকে তাঁরা ছিলেন বহু যোজন দূরে। এসব বিষয় ছিল তাঁদের স্বপ্নেরও বাইরে। এ কারণে তাঁরা জনগণের মধ্যে 'আহলুল হাদীছ' 'আহলুস সুন্নাহ' ইত্যাদি নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁদের বিরোধীরা 'আহলুল বিদ'আ' তথা বিদ'আতী নামে অভিহিত হতে থাকে (মুক্বাদ্দামা মুসলিম পৃ. ১৫)।
উল্লেখ্য যে, রাজনৈতিক গোলযোগের ফলে ছাহাবীগণের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হ'লেও তাঁদের মধ্যে আক্বীদাগত কোন বিভক্তি দেখা দেয়নি। তাঁরা পরস্পরকে 'কাফির' বলেননি বা কারুর রক্ত হালাল বলেননি। তাঁদের মধ্যে যা কিছু বিরোধ ছিল, তা ছিল স্রেফ ইজতিহাদী মতবিরোধ। যাঁর ইজতিহাদ সঠিক ছিল, তিনি দ্বিগুণ ছওয়াব পাবেন এবং যাঁর ইজতিহাদ বেঠিক ছিল, তিনি একগুণ ছওয়াব পাবেন।
বসরার থাকাকালীন সময়ে একদা ছাহাবী ইমরান বিন হুছাইন (রাঃ) জনৈক ব্যক্তিকে হাদীছ শুনাচ্ছিলেন। তখন একজন লোক এসে বলল, হে আবু নাজীদ! আপনি আমাদেরকে কুরআন শুনান। ইমরান বিন হুছাইন (রাঃ) তখন লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা কি ছালাত আদায় কর না? তোমরা কি যাকাত আদায় কর না? তাহ'লে তা কার দেওয়া পদ্ধতিতে আদায় কর? লোকটি বলল, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে এসব বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। অতঃপর লোকটি নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলল : أَحْيَيْتَنِي أَحْيَاكَ الله 'আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুন!'১২
উমাইয়া বিন খালিদ একবার সকল মাসআলা কুরআন থেকে বের করার চেষ্টা করেন। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা মুক্বীম অবস্থায় ও ভীতির অবস্থায় ছালাত আদায়ের বিষয় কুরআনে পাই। কিন্তু সফরে ছালাত আদায়ের বিষয় তো কুরআনে পাই না।
তখন ইবনু ওমর (রাঃ) তাকে বললেন, يَا ابْنَ أَخِي، إِنَّ اللَّهَ بَعَثَ إِلَيْنَا مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا تَعْلَمُ شَيْئًا، فَإِنَّمَا نَفْعَلُ كَمَا رَأَيْنَا مُحَمَّدًا -يَفْعَلُ 'হে ভাতিজা! মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে আল্লাহ আমাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন, যখন আমরা কিছুই জানতাম না। নিশ্চয়ই আমরা করে থাকি, যেমনভাবে আমরা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে করতে দেখেছি'। ১৩
তবে এই ধরনের প্রশ্ন তৎকালীন মুসলিম সমাজে ব্যাপকতা লাভ করেনি। বরং ব্যক্তি পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল। আর মূলতঃ ইরাকের বছরাতেই এটি সীমাবদ্ধ ছিল। সেকারণ বছরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবেঈ বিদ্বান আইয়ূব সাখতিয়ানী (৬৮-১৩১ হিঃ) নিজ শহরের লোকদের চূড়ান্তভাবে বলে দেন إِذَا حَدَّثْتَ الرَّجُلَ بالسُّنَّةِ فَقَالَ: دَعْنَا مِنْ هَذَا وَحَدَّتْنَا مِنَ الْقُرْآنِ فَاعْلَمْ -أَنَّهُ ضَالٌ وَمُصْلِّ 'যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে হাদীছ শুনাবে, তখন সে যদি বলে যে, ছাড় এসব, আমাদেরকে কুরআন শুনাও, তখন তুমি জেনো যে, ঐ লোকটি নিজে পথভ্রষ্ট এবং অন্যকে পথভ্রষ্টকারী'। ১৪
ব্যক্তি পর্যায়ে হাদীছ বিরোধী উক্ত মনোভাব সীমাবদ্ধ থাকলেও দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ দিকে এসে বেশ কিছু লোককে পাওয়া যায়, যারা পুরা হাদীছ শাস্ত্রকেই অস্বীকার করে অথবা 'খবরে ওয়াহেদ' পর্যায়ের হাদীছসমূহকে অস্বীকার করে। যদিও মুসলিম উম্মাহ্র সার্বিক সামাজিক জীবনে এর ব্যাপক প্রভাব তখনও পড়েনি, আজও পড়েনি। ফালিল্লা-হিল হাম্দ। তবে হাদীছ বিরোধী ষড়যন্ত্র প্রকাশ্যে ও পরোক্ষে সর্বদা অব্যাহত ছিল, আজও আছে। দুর্ভাগ্যক্রমে এই লোকেরা এখন আর বাইরের কেউ নয়, বরং ঘরের। ইসলামের বড় বড় বিদ্বান হিসাবে যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। এক্ষণে বিগত ও বর্তমান যুগের প্রকাশ্য ও পরোক্ষ হাদীছ বিরোধীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় আমরা তুলে ধরার প্রয়াস পাব। যাতে সাধারণ মুসলমানগণ এদের ধোঁকায় না পড়েন।
টিকাঃ
১২. মুস্তাদরাকে হাকেম ১/১০৯-১০ পৃঃ।
১৩. মুস্তাদরাকে হাকেম ১/২৫৮ পৃঃ।
১৪. ছালাহুদ্দীন মকবুল আহমাদ, যাওয়াবে' ফী ওয়াজহিস সুন্নাহ (রিয়াদ: দার আলমিল কুতুব) তাবি, পৃঃ ৪৬।