📘 হাদীসের কিসসা > 📄 হযরত ইউনুস (আঃ) এর কাহিনী

📄 হযরত ইউনুস (আঃ) এর কাহিনী


ইরাকের নিনোয়া নামক স্থানে হযরত ইউনুস (আঃ) কে মানুষের হেদায়াতের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তিনি তাদেরকে ঈমান আনয়ন ও নেক কাজ করার আহ্বান জানাতে থাকেন। কিন্তু তারা ক্রমাগত তার আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি তাদের প্রতি রূষ্ট হয়ে তাদের জনপদ ত্যাগ করে চলে যান। এতে তারা ঘাবড়ে যায় এবং এখনই আযাব এসে যাবে বলে আশংকা করে। ফলে নবীর অনুপস্থিতিতেই তারা ঈমান আনয়ন করে এবং আযাব থেকে নিস্তার পায়। ওদিকে হযরত ইউনুস মনে করেছিলেন যে, এতক্ষণে আল্লাহর আযাব এসে তার জনগণকে হয়তো ধ্বংস করে দিয়েছে। কেননা কোন নবী যখন তাঁর জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে হিজরত করেন, তখন সাধারণতঃ ঐ জনপদের জন্য আযাব অনিবার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারলেন যে, তাদের ওপর কোন আযাবই আসেনি এবং তারা ভালো আছে। তখন তিনি নিজেকে নিয়ে শংকিত হয়ে পড়লেন। কেননা প্রথমতঃ তিনি ভাবলেন, তাঁর জাতির কাছে তিনি মিথ্যুক প্রতিপন্ন হয়ে গেছেন। এখন আর তারা তাঁকে বিশ্বাস করবে না অথবা তাকে হত্যা করে ফেলবে।

অগত্যা তিনি নিজ অঞ্চলে ফিরে আসার পরিবর্তে অন্য দেশে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন। পথিমধ্যে একটা নদী পার হবার জন্য নৌকায় আরোহন করলেন। নৌকা এক দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে ডুবে যেতে উদ্যত হলে মাঝি বললো যে, আরোহীদের মধ্য থেকে একজনকে পানিতে ফেলে দিতে হবে, তাহলে অন্যরা বেঁচে যাবে। এখন কাকে ফেলা হবে, সেটা স্থির করার জন্য আরোহীদের নামে লটারী করা হলো। এতে হযরত ইউনুসের নাম উঠলো এবং তাকে নদীতে ফেলে দেয়া হলো।

আল্লাহ একটি মাছকে আদেশ দিলেন হযরত ইউনুসকে গিলে খেয়ে পেটে পুরে রাখতে। মাছের পেটে গিয়ে হযরত ইউনুস আত্মসমালোচনা করেন এবং নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে নিম্নরূপ দোয়া করেনঃ হে আল্লাহ! তুমি পবিত্র। তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আমি যুলুমকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি। অতঃপর আল্লাহ তাকে মুক্তি দেন এবং মাছটি তাকে একটি দ্বীপে গিয়ে উদগিরণ করে দেয়।

হযরত ইউনুস আল্লাহর নির্দেশক্রমে জাতিকে বলেছিলেন তোমরা ঈমান না আনলে তিন দিনের মধ্যে আযাব আসবে। সেই সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিনি আশংকা করেন যে, তাদের ওপর আযাব এসে যাবে। এই মনে করে তিনি আযাব থেকে দূরে থাকার জন্য অন্যত্র চলে যান। কিন্তু তারপর তাদের ঈমান আনার কারণে আযার না আসা সত্ত্বেও তিনি তাদের কাছে ফিরে আসেননি। তাদেরকে ছেড়ে যাওয়া এবং তাদের কাছে ফিরে না আসা- এই দু'টো কাজই তিনি নিজ মতানুসারে করেন অথবা এর একটি নিজের মতে এবং অন্যটি আল্লাহর নির্দেশে করেন- সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তবে যে কোন একটি কাজ যে তিনি ওহির অপেক্ষা না করেই নিজের মতানুসারে করেছিলেন এবং সে জন্য আল্লাহ তাকে পানিতে ও পানি থেকে মাছের পেটে নিক্ষেপ করে মৃদু শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ওহীর অনুপস্থিতিতে নিজের ইজতিহাদ তথা সুচিন্তিত মত অনুসারে কাজ করা কোন নবীর পক্ষে কোন গুনাহ নয়, তবে ধৈর্যধারণ করে ওহির নির্দেশের অপেক্ষা করাই সম্ভবতঃ আল্লাহর দৃষ্টিতে উত্তম ছিল।

শিক্ষাঃ ১. কোন ব্যাপারে শরীয়তের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকলে সে ব্যাপারে নিজস্ব বা অন্যের মত অনুসরণ করা কোন মুসলমানের জন্যই বৈধ নয়। আর নির্দেশ নিজের অজানা থাকলে যারা অভিজ্ঞ, তাদের কাছ থেকে জেনে নেয়া এবং অপেক্ষা করা জরুরী। ২. বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে নিজের ভুলত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া ও মুক্তি চাওয়া যখন আল্লাহর নবীদের নীতি, তখন সাধারণ মুসলমানদের জন্য তা আরো বেশী অপরিহার্য কর্তব্য।

📘 হাদীসের কিসসা > 📄 উয়াইস করনীর ঘটনা

📄 উয়াইস করনীর ঘটনা


হযরত আছীর বিন আমর থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমরের কাছে যখনই ইয়ামানের মুসলিম বীর মুজাহিদরা আসতো, তখন তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করতেনঃ তোমাদের মধ্যে উয়াইস বিন আমের করনী নামে কেউ আছে নাকি? এভাবে খোঁজ-খবর নিতে নিতে এক সময় তিনি তাকে পেলেন। অতঃপর বললেনঃ আপনিই কি উয়াইস বিন আমের? উয়াইস বললেনঃ হ্যাঁ।

হযরত ওমরঃ আপনার বাড়ী কি ইয়ামানের কারণ নামক স্থানে? উয়াইসঃ জ্বি।

হযরত ওমরঃ আপনার গায়ে কি কুষ্ঠ রোগ হয়েছিল এবং এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা বাদে তার সবটাই কি এখন সেরে গেছে? উয়াইসঃ জ্বি。

হযরত ওমরঃ আপনার কি মা আছেন? উয়াইসঃ হ্যাঁ।

হযরত ওমরঃ "আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, ইয়ামানের বীর মুজাহিদদের সাথে উয়াইস বিন আমের নামক এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসবে। তার বাড়ী ইয়ামানের কারণে। তার কুষ্ঠ রোগ ছিল। এক দিরহাম জায়গা বাদে তা সেরে যাবে। তার এক মা থাকবে এবং সে এত মাতৃভক্ত হবে যে, মার দোহাই দিয়ে সে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দেবেন। সম্ভব হলে তার কাছে গিয়ে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফের আবেদন জানাতে অনুরোধ করো।" অতএব, হে উয়াইস। আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। উয়াইস তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।

হযরত ওমরঃ আপনি কোথায় চলেছেন? উয়াইসঃ কুফায়।

হযরত ওমরঃ আমি কি কুফার শাসকের কাছে আপনার যত্ন নেয়ার জন্য একটা চিঠি লিখে দেবো?

উয়াইসঃ না, সাধারণ মানুষের কাছে থাকতেই আমি ভালোবাসি। এরপর কুফাবাসীরা যখনই হজ্জ করতে মক্কা ও মদীনায় আসতো, তখনই হযরত ওমর তাদের কাছে উয়াইসের খোঁজ-খবর নিতেন এবং তার সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) এর উক্তি সবাইকে জানাতেন। তারপর দলে দলে লোকেরা উয়াইসের কাছে যেতো এবং গুনাহ মাফের দোয়া চাইতো।

অপর রেওয়ায়েতে আছে, হযরত ওমর বলেনঃ রাসূল (সাঃ) উয়াইসকে শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী বলেছেন। রাসূল (সাঃ) এর জীবদ্দশায় ঈমান আনা সত্ত্বেও উয়াইস নিজের কুষ্ঠ রোগ ও পঙ্গু মায়ের সেবা-শুশ্রুষার কারণে রাসূল (সাঃ) এর সাথে দেখা করতে ও সাহাবীর মর্যাদা লাভ করতে পারেননি। কিন্তু আল্লাহ তাকে শ্রেষ্ঠ তাবেয়ীর মর্যাদাই শুধু দেননি, সাহাবীদেরকেও তাঁর কাছে গুনাহ মাফের দোয়া চাইবার উপদেশ দিয়েছেন। কথিত আছে, উয়াইস ওহোদ যুদ্ধে রাসূল (সাঃ) এর দাঁত ভেঙ্গে যাওয়ার খবর শুনে প্রচন্ড আবেগে বেসামাল হয়ে গিয়ে নিজের কয়েকটি দাঁত পাথর দিয়ে আঘাত করে ভেঙ্গে ফেলেছিলেন।

শিক্ষাঃ ইসলামের যথার্থ অনুসারী ও শুভাকাংখী হলে সাহাবী না হয়েও মানুষ উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে ও আল্লাহর প্রিয় হতে পারে। বিশেষতঃ পিতামাতার সেবা যে মানুষকে কত উর্দ্ধে তুলে দিতে পারে তা এ ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00