📄 হযরত ঈসা (আঃ) এর উম্মতের এক দরবেশের কাহিনী
ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের আকাশে উত্থিত হওয়ার পর যখন তাঁর উম্মতের মধ্যে নানা রকমের শেরক ও বিদয়াতের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে, তখন যারা হযরত ঈসা (আঃ) আনীত আল্লাহর আসল দ্বীনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেন এবং তার প্রচার চালাতে থাকেন, তাদের একটি দল এক সময়ে ইয়ামানের নাজরান প্রদেশে বসতি স্থাপন করে। এই দলটির যিনি নেতা ছিলেন তাঁর নাম ছিল ফিমিউন। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সৎ, ন্যায়পরায়ন, দুনিয়ার স্বার্থত্যাগী ও কঠোর পরিশ্রমী ব্যক্তি। তাঁর দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হতো। প্রথমে তিনি দেশ থেকে দেশান্তরে সফর করে আল্লাহর দ্বীন প্রচার করতেন এবং প্রধানতঃ পল্লী অঞ্চলের মানুষের অতিথি হতেন। যে গ্রামেই তিনি পুণ্যবান ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হয়ে যেতেন সেখান থেকে অন্যত্র চলে যেতেন, যেখানে কেউ তাকে চেনে না। কেননা তিনি আশংকা করতেন যে, ভক্তদের ভক্তি ও আতিথেয়তার বাড়াবাড়ি তাকে দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন করে গোমরাহীর দিকে নিয়ে যেতে পারে। তিনি শুধু নিজের উপার্জন থেকে খাওয়া দাওয়া করতেন। ঈসায়ী শরিয়তের বিধি অনুযায়ী তিনি রবিবারে কোন কাজ করতেন না এবং সেদিন একটি নির্জন এলাকায় গিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নামায ও ইবাদাতে মশগুল থাকতেন। একবার সিরিয়ার একটি গ্রামে অবস্থানকালে তিনি গোপনে নামায পড়েন। কিন্তু একজন গ্রামবাসী তা দেখে ফেলে। তার নাম ছিল সালেহ। সে ফিমিউনকে এত ভালোবেসে ফেললো যে জীবনে সে আর কখনো কাউকে অতটা ভালোবাসেনি। ফিমিউন যেখানে যেতেন সে তার সাথে সেখানে যেতো, কিন্তু ফিমিউন তা টের পেতেন না। একদিন রবিবার তিনি যথারীতি নির্জন জায়গায় গেলে তার অজান্তেই সালেহ তাঁর পিছু পিছু যায়। সালেহ অতি সংগোপনে অদূরে বসে তার কার্যকলাপ লক্ষ্য করতে লাগলো। দেখলো ফিমিউন নামায পড়ছেন। নামায পড়ার সময় সহসা দেখলো, তানীন নামক সাত শিংধারী একটা সাপ ফিমিউনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফিমিউন সাপকে দেখে তার মৃত্যুর জন্য দোয়া করতেই সাপটি মারা পড়লো। সালেহ সাপকে তার দিকে এগুতে দেখেছিল, কিন্তু সে যে মারা গেছে, তা সে দেখতে পায়নি। সে ভয়ে চিৎকার করে বললোঃ “ওহে ফিমিউন! তোমার দিকে সাপ এগিয়ে গেছে।” কিন্তু ফিমিউন তার চিৎকারে ভ্রুক্ষেপ করলেন না। তিনি নামায অব্যাহত রাখলেন এবং শেষ করলেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তিনি চলে গেলেন। ফিমিউনের জানতে বাকী থাকলো না যে, এখানে লোকজন তাকে চিনে ফেলেছে। আর সালেহও বুঝতে পারলো যে, ফিমিউন তার উপস্থিতি টের পেয়ে গেছেন। সে তাঁকে বললোঃ "হে ফিমিউন! তুমি নিশ্চয়ই অবগত আছ যে, আমি আজ পর্যন্ত তোমার মত কাউকে ভালবাসিনি। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই।"
ফিমিউন বললেনঃ "তোমার ইচ্ছাটা মন্দ নয়। তবে আমার অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছ। তুমি যদি মনে কর, এভাবে আমার সাথে টিকে থাকতে পারবে, তাহলে থাকো।” সালেহ তার সহচর হয়ে গেল। গ্রামবাসী ফিমিউনের রহস্য প্রায় বুঝে ফেলার উপক্রম করেছিল। সে সময় কোন ব্যক্তির হঠাৎ কোন অসুখ-বিসুখ হলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে ফিমিউন তার জন্য দোয়া করতেন এবং তৎক্ষণাত সে ভালো হয়ে যেতো। কিন্তু কোন বিপন্ন বা রুগ্ন ব্যক্তি তাকে ডাকলে তিনি যেতেন না। এক গ্রামবাসীর ছেলের অসুখ হলো। সে ফিমিউনের বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে জানলো যে, কারো বাড়ী তাকে ডাকা হলে তিনি যান না। তবে তিনি মজুরীর বিনিময়ে মানুষের বাড়ীঘর নির্মাণ করেন। লোকটি তার ছেলেকে নিজের কক্ষে রাখলো এবং তাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল। তারপর সে ফিমিউনের কাছে গিয়ে বললোঃ “ওহে ফিমিউন! আমি নিজের বাড়ীতে কিছু কাজ করাতে চাই। তুমি আমার সাথে চল, কি কাজ করতে হবে তা দেখে আসবে।” ফিমিউন তার সাথে গেলেন এবং তার কক্ষে প্রবেশ করলেন। তখন তিনি সেই গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার এ ঘরে আপনি কি কাজ করতে চান? লোকটি কাজের বিবরণ দিয়ে বালকের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে ফেললো এবং বললোঃ “হে ফিমিউন! এই যে আপনার এক বান্দা অসুস্থ। তার ভালো হওয়ার জন্য দোয়া করুন।” তিনি দোয়া করতেই বালক সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠে দাঁড়ালো।
ফিমিউন বুঝলেন, এখানেও তিনি পরিচিত হয়ে গেছেন। তাই তিনি ঐ গ্রাম থেকে প্রস্থান করলেন। সালেহ তাঁর সাথে চললো। সিরিয়ার একটি অঞ্চল দিয়ে চলার সময় পার্শ্ববর্তী একটি প্রকান্ড গাছের ওপর থেকে এক ব্যক্তি ডাকলোঃ “হে ফিমিউন!” ফিমিউন ডাকে সাড়া দিলেন। সে বললোঃ আমি তোমার অপেক্ষায় রয়েছি এবং ভাবছি, কখন তুমি আসবে। সহসা তোমার আওয়াজ শুনে চিনলাম যে তুমি এসেছ। তুমি যেওনা। আমি এক্ষুনি মারা যাচ্ছি, তুমি আমার জানাজা পড়াবে। লোকটি সত্যিই মারা গেল। ফিমিউন তার জানাজা পড়ালেন এবং দাফন করলেন। তারপর আবার রওনা হলেন এবং সালেহ তাকে অনুসরণ করলো। এ সময় তারা আরব ভূখন্ডের বেশ খানিকটা অতিক্রম করে ফেলেছেন। সহসা একটি আরব কাফেলা তাদের উভয়কে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে নাজরানে বিক্রি করলো。
নাজরানবাসী তখন বাদবাকী আরবদের মত পৌত্তলিক। তারা তাদের সামনে অবস্থিত একটি দীর্ঘ খেজুর গাছের পূজা করতো। প্রতি বছর তার কাছে মেলা বসতো। মেলার সময় লোকেরা ঐ গাছকে সবচেয়ে সুন্দর কাপড় ও অলংকারাদি উৎসর্গ করতো। কাফেলাটি ঐ গাছের কাছে গেল এবং সেখানে একদিন অবস্থান করলো。
নাজরানের জনৈক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি কাফেলার কাছ থেকে ফিমিউনকে এবং অপর একজন সালেহকে কিনে নিল। রাতে ফিমিউনকে তার মনিব যে ঘরে থাকতে দিত, তিনি সেখানে তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন। তাঁর ঘরটি কোন আলো ছাড়াই সারারাত আলোকিত থাকতো। তাঁর মনিব এটা দেখতে পেয়ে বিস্মিত হলো। সে তাঁকে তাঁর ধর্ম কি জিজ্ঞেস করলো। ফিমিউন তাকে তাঁর ধর্মের বিষয়ে অবহিত করলেন এবং বললেনঃ তোমরা গোমরাহীর ভেতরে লিপ্ত আছ। এই খেজুর গাছ কারো ক্ষতি বা উপকার কিছুই করতে পারে। আমি যে খোদার ইবাদত করি তাকে যদি আমি বলি এই গাছকে ধ্বংস করে দিন, তিনি অবশ্যই তাকে ধ্বংস করে দেবেন। তিনি আল্লাহ, তাঁর কোন শরীক নাই। তার মনিব বললোঃ বেশ তুমি গাছটাকে ধ্বংস করে দেখাও তো দেখি। এটা করতে পারলে আমরা সকলে তোমার ধর্ম গ্রহণ করবো এবং আমাদের ধর্ম ত্যাগ করবো। ফিমিউন ওজু করে দু'রাকাত নামায পড়ে আল্লাহর কাছে ঐ গাছটির ধ্বংসের জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ তৎক্ষণাত একটা ঝড় বইয়ে দিয়ে গাছটিকে সমূলে উৎপাটিত করে মাটিতে ফেলে দিলেন। তখন নাজরানবাসী তার ধর্মে দীক্ষিত হলো। তারা হযরত ঈসা (আঃ) এর আসল ও অবিকৃত শরীয়তের অনুসারী হলো। এরপর নাজরানবাসীর ওপর এমন কিছু আপদ নেমে আসে, যা দুনিয়ার সর্বত্র সত্য দ্বীনের অনুসারীদের ওপর নেমে থাকে। সেই থেকে নাজরানে ঈসায়ী ধর্মের অভ্যুদয় ঘটে。
শিক্ষা: এই ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এই যে, ইসলাম প্রচারের কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের সব সময় নিজস্ব স্বতন্ত্র জীবিকার ব্যবস্থা রাখা উচিত। যাতে জীবিকার ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল, লোভ মুক্ত ও হালাল উপার্জনে ব্রতী থাকা যায়। আর সর্বাবস্থায় তাদের দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়া ও তাকওয়া ভিত্তিক জীবন যাপন করা উচিত।
📄 হযরত সোলাইমান (আঃ) এর ন্যায়বিচার
(ক) হযরত সোলায়মান (আঃ) এর আমলে একদিন দুই মহিলা তাঁর দরবারে বিচারপ্রার্থী হয়ে এলো। এদের একজনের কোলে ছিল একটি শিশু। কিন্তু উভয় মহিলাই শিশুটি নিজের বলে দাবী জানাচ্ছিল।
হযরত সোলায়মান প্রথমে উভয়ের যুক্তি প্রমাণ আলাদা আলাদা ভাবে শুনলেন। তারপর তিনি উভয়কে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তারা কিছুতেই সমঝোতায় আসতে রাজী হলো না। অগত্যা হযরত সোলায়মান এই মর্মে রায় দিলেন যে, তোমরা যখন কোনমতেই আপোষ রফা করতে রাজী নও, তখন এই শিশুকে আমি দ্বিখন্ডিত করে উভয়কে সমান সমান অংশ দিয়ে দেব।
এ কথা শুনে এক মহিলা তো নীরব রইল। কিন্তু অপরজন চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। সে বললোঃ "দোহাই আল্লাহর! আপনি শিশুটিকে কাটবেন না। ওকে বরং ঐ মহিলার কোলেই দিয়ে দিন, ও বেঁচে থাকুক। আমি না হয় মাঝে মাঝে দিয়ে দেখে আসবো।"
এ কথা শোনার পর হযরত সোলায়মানের আর বুঝতে বাকী থাকলো না যে, শেষোক্ত মহিলাই শিশুটির আসল মা। তাই শিশুটি তিনি তাকেই দিলেন। (বুখারী)
শিক্ষা : একজন ন্যায় পরায়ন ও বিচক্ষণ শাসক বা বিচারককে শুধু শরীয়ত ও আইন জানলেই চলে না সেই সাথে মানুষের মনস্তত্ত্বও জানতে হয়। নচেৎ সুবিচার নিশ্চিত করা যায় না।
(খ) একবার দুই ব্যক্তি হযরত দাউদ (আঃ) এর নিকট উপস্থিত হলো। তাদের একজন ছাগল-ভেড়া পালন এবং অপরজন কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। কৃষিজীবী লোকটি ছাগল-ভেড়া পালনকারীর বিরুদ্ধে নালিশ করলো যে, সে নিজের একপাল ছাগল ভেড়া ছেড়ে দিয়ে আমার ক্ষেতের সমস্ত ফসল খাইয়ে ফেলেছে। হযরত দাউদ (আঃ) অভিযুক্ত ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ নিরূপণ করলেন। অতঃপর যে ছাগল ভেড়াগুলো ফসল নষ্ট করেছে, সবগুলোর দামও জেনে নিলেন। তিনি যখন জানলেন যে, নষ্টকৃত ফসলের মূল্য নষ্টকারী ছাগল ভেড়াগুলো সমান, তখন তিনি ফসলের মালিককে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ ঐ ছাগল ভেড়াগুলো দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। এরপর বাদী বিবাদী দরবার থেকে বেরিয়ে গেল।
যখন তারা দরজার বাইরে এলো, তখন হযরত সোলায়মানের সাথে তাদের দেখা হলো। তিনি জানতে চাইলেন যে, তাদের মামলার বিচার কিভাবে হয়েছে। জবাবে তারা হযরত দাউদের রায় শুনিয়ে দিল। হযরত সোলায়মান তাদেরকে অপেক্ষা করতে বললেন এবং পিতা হযরত দাউদের কাছে গিয়ে বললেন যে, এই মামলার নিষ্পত্তির ব্যাপারে আমার একটা ভিন্ন মত ছিল। সেই মত গ্রহণ করলে উভয় পক্ষ উপকৃত হবে। হযরত দাউদ জিজ্ঞাসা করলেন, সেটি কি? হযরত সোলায়মান বললেনঃ ছাগল ভেড়াগুলোকে ক্ষেতের মালিকের নিকট এবং ক্ষেতকে ছাগলের মালিকের নিকট অর্পণ করা হোক। যখন সে ছাগল ভেড়ার দুধ মাংস ইত্যাদি খেয়ে ক্ষতি পূর্ণ আদায় করে নেবে, তখন ছাগল ভেড়া ও জমি মূল মালিকের কাছে ফেরত যাবে। ইত্যবসরে ক্ষেতের ফসল আগের অবস্থায় ফিরে যাবে এবং ছাগলের মালিক উপার্জনের উপকরণ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় অভাবে পড়বে না। কেননা জমি চাষ করে ফসল ফলিয়ে সে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে। হযরত দাউদ এই রায়টি মেনে নিলেন এবং নিজের রায় পাল্টে ফেললেন。
শিক্ষা: অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার পাশাপাশি তার কল্যাণের কথা চিন্তা করাও প্রত্যেক বিচারকের কর্তব্য। অপরাধীকে এমন শাস্তি দেয়া উচিত নয় যাতে সে দেউলে হয়ে যায় এবং পুনরায় অপরাধে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়।
📄 হযরত ইউনুস (আঃ) এর কাহিনী
ইরাকের নিনোয়া নামক স্থানে হযরত ইউনুস (আঃ) কে মানুষের হেদায়াতের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তিনি তাদেরকে ঈমান আনয়ন ও নেক কাজ করার আহ্বান জানাতে থাকেন। কিন্তু তারা ক্রমাগত তার আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি তাদের প্রতি রূষ্ট হয়ে তাদের জনপদ ত্যাগ করে চলে যান। এতে তারা ঘাবড়ে যায় এবং এখনই আযাব এসে যাবে বলে আশংকা করে। ফলে নবীর অনুপস্থিতিতেই তারা ঈমান আনয়ন করে এবং আযাব থেকে নিস্তার পায়। ওদিকে হযরত ইউনুস মনে করেছিলেন যে, এতক্ষণে আল্লাহর আযাব এসে তার জনগণকে হয়তো ধ্বংস করে দিয়েছে। কেননা কোন নবী যখন তাঁর জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে হিজরত করেন, তখন সাধারণতঃ ঐ জনপদের জন্য আযাব অনিবার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারলেন যে, তাদের ওপর কোন আযাবই আসেনি এবং তারা ভালো আছে। তখন তিনি নিজেকে নিয়ে শংকিত হয়ে পড়লেন। কেননা প্রথমতঃ তিনি ভাবলেন, তাঁর জাতির কাছে তিনি মিথ্যুক প্রতিপন্ন হয়ে গেছেন। এখন আর তারা তাঁকে বিশ্বাস করবে না অথবা তাকে হত্যা করে ফেলবে।
অগত্যা তিনি নিজ অঞ্চলে ফিরে আসার পরিবর্তে অন্য দেশে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন। পথিমধ্যে একটা নদী পার হবার জন্য নৌকায় আরোহন করলেন। নৌকা এক দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে ডুবে যেতে উদ্যত হলে মাঝি বললো যে, আরোহীদের মধ্য থেকে একজনকে পানিতে ফেলে দিতে হবে, তাহলে অন্যরা বেঁচে যাবে। এখন কাকে ফেলা হবে, সেটা স্থির করার জন্য আরোহীদের নামে লটারী করা হলো। এতে হযরত ইউনুসের নাম উঠলো এবং তাকে নদীতে ফেলে দেয়া হলো।
আল্লাহ একটি মাছকে আদেশ দিলেন হযরত ইউনুসকে গিলে খেয়ে পেটে পুরে রাখতে। মাছের পেটে গিয়ে হযরত ইউনুস আত্মসমালোচনা করেন এবং নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে নিম্নরূপ দোয়া করেনঃ হে আল্লাহ! তুমি পবিত্র। তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আমি যুলুমকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি। অতঃপর আল্লাহ তাকে মুক্তি দেন এবং মাছটি তাকে একটি দ্বীপে গিয়ে উদগিরণ করে দেয়।
হযরত ইউনুস আল্লাহর নির্দেশক্রমে জাতিকে বলেছিলেন তোমরা ঈমান না আনলে তিন দিনের মধ্যে আযাব আসবে। সেই সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিনি আশংকা করেন যে, তাদের ওপর আযাব এসে যাবে। এই মনে করে তিনি আযাব থেকে দূরে থাকার জন্য অন্যত্র চলে যান। কিন্তু তারপর তাদের ঈমান আনার কারণে আযার না আসা সত্ত্বেও তিনি তাদের কাছে ফিরে আসেননি। তাদেরকে ছেড়ে যাওয়া এবং তাদের কাছে ফিরে না আসা- এই দু'টো কাজই তিনি নিজ মতানুসারে করেন অথবা এর একটি নিজের মতে এবং অন্যটি আল্লাহর নির্দেশে করেন- সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তবে যে কোন একটি কাজ যে তিনি ওহির অপেক্ষা না করেই নিজের মতানুসারে করেছিলেন এবং সে জন্য আল্লাহ তাকে পানিতে ও পানি থেকে মাছের পেটে নিক্ষেপ করে মৃদু শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ওহীর অনুপস্থিতিতে নিজের ইজতিহাদ তথা সুচিন্তিত মত অনুসারে কাজ করা কোন নবীর পক্ষে কোন গুনাহ নয়, তবে ধৈর্যধারণ করে ওহির নির্দেশের অপেক্ষা করাই সম্ভবতঃ আল্লাহর দৃষ্টিতে উত্তম ছিল।
শিক্ষাঃ ১. কোন ব্যাপারে শরীয়তের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকলে সে ব্যাপারে নিজস্ব বা অন্যের মত অনুসরণ করা কোন মুসলমানের জন্যই বৈধ নয়। আর নির্দেশ নিজের অজানা থাকলে যারা অভিজ্ঞ, তাদের কাছ থেকে জেনে নেয়া এবং অপেক্ষা করা জরুরী। ২. বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে নিজের ভুলত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া ও মুক্তি চাওয়া যখন আল্লাহর নবীদের নীতি, তখন সাধারণ মুসলমানদের জন্য তা আরো বেশী অপরিহার্য কর্তব্য।
📄 উয়াইস করনীর ঘটনা
হযরত আছীর বিন আমর থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমরের কাছে যখনই ইয়ামানের মুসলিম বীর মুজাহিদরা আসতো, তখন তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করতেনঃ তোমাদের মধ্যে উয়াইস বিন আমের করনী নামে কেউ আছে নাকি? এভাবে খোঁজ-খবর নিতে নিতে এক সময় তিনি তাকে পেলেন। অতঃপর বললেনঃ আপনিই কি উয়াইস বিন আমের? উয়াইস বললেনঃ হ্যাঁ।
হযরত ওমরঃ আপনার বাড়ী কি ইয়ামানের কারণ নামক স্থানে? উয়াইসঃ জ্বি।
হযরত ওমরঃ আপনার গায়ে কি কুষ্ঠ রোগ হয়েছিল এবং এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা বাদে তার সবটাই কি এখন সেরে গেছে? উয়াইসঃ জ্বি。
হযরত ওমরঃ আপনার কি মা আছেন? উয়াইসঃ হ্যাঁ।
হযরত ওমরঃ "আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, ইয়ামানের বীর মুজাহিদদের সাথে উয়াইস বিন আমের নামক এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসবে। তার বাড়ী ইয়ামানের কারণে। তার কুষ্ঠ রোগ ছিল। এক দিরহাম জায়গা বাদে তা সেরে যাবে। তার এক মা থাকবে এবং সে এত মাতৃভক্ত হবে যে, মার দোহাই দিয়ে সে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দেবেন। সম্ভব হলে তার কাছে গিয়ে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফের আবেদন জানাতে অনুরোধ করো।" অতএব, হে উয়াইস। আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। উয়াইস তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
হযরত ওমরঃ আপনি কোথায় চলেছেন? উয়াইসঃ কুফায়।
হযরত ওমরঃ আমি কি কুফার শাসকের কাছে আপনার যত্ন নেয়ার জন্য একটা চিঠি লিখে দেবো?
উয়াইসঃ না, সাধারণ মানুষের কাছে থাকতেই আমি ভালোবাসি। এরপর কুফাবাসীরা যখনই হজ্জ করতে মক্কা ও মদীনায় আসতো, তখনই হযরত ওমর তাদের কাছে উয়াইসের খোঁজ-খবর নিতেন এবং তার সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) এর উক্তি সবাইকে জানাতেন। তারপর দলে দলে লোকেরা উয়াইসের কাছে যেতো এবং গুনাহ মাফের দোয়া চাইতো।
অপর রেওয়ায়েতে আছে, হযরত ওমর বলেনঃ রাসূল (সাঃ) উয়াইসকে শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী বলেছেন। রাসূল (সাঃ) এর জীবদ্দশায় ঈমান আনা সত্ত্বেও উয়াইস নিজের কুষ্ঠ রোগ ও পঙ্গু মায়ের সেবা-শুশ্রুষার কারণে রাসূল (সাঃ) এর সাথে দেখা করতে ও সাহাবীর মর্যাদা লাভ করতে পারেননি। কিন্তু আল্লাহ তাকে শ্রেষ্ঠ তাবেয়ীর মর্যাদাই শুধু দেননি, সাহাবীদেরকেও তাঁর কাছে গুনাহ মাফের দোয়া চাইবার উপদেশ দিয়েছেন। কথিত আছে, উয়াইস ওহোদ যুদ্ধে রাসূল (সাঃ) এর দাঁত ভেঙ্গে যাওয়ার খবর শুনে প্রচন্ড আবেগে বেসামাল হয়ে গিয়ে নিজের কয়েকটি দাঁত পাথর দিয়ে আঘাত করে ভেঙ্গে ফেলেছিলেন।
শিক্ষাঃ ইসলামের যথার্থ অনুসারী ও শুভাকাংখী হলে সাহাবী না হয়েও মানুষ উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে ও আল্লাহর প্রিয় হতে পারে। বিশেষতঃ পিতামাতার সেবা যে মানুষকে কত উর্দ্ধে তুলে দিতে পারে তা এ ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায়।