📄 অন্যায়ের প্রতিরোধ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ একবার আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতা জিবরীলকে আদেশ দিলেন যে, "যাও, অমুক জনপদটি ধ্বংস করে দিয়ে এসো।" জিবরীল সেই জনপদটিতে গিয়েই দেখলেন, সেখানে একজন দরবেশ রয়েছেন, দিনরাত তিনি নামায পড়েন ও যিকির তাসবীহ করেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি আল্লাহকে বললেন, "হে আল্লাহ! এখানে তোমার এক বান্দা রয়েছেন যিনি সর্বক্ষণ তোমাকে স্মরণ করছেন।"
আল্লাহ জবাবে বললেনঃ তাকে শুদ্ধই ধ্বংস করে দাও। কেননা তার সামনে ইসলামের অবমাননা হয়, নাফরমানী করা হয়, জুলুমবাজী ও পাপাচারের সয়লাব বয়ে যায়। কিন্তু তার মুখমন্ডলে তাতে কোন বিরক্তির চিহ্ন ফুটে ওঠে না এবং তার মন কিছুমাত্র অস্থির হয় না।
অতঃপর জিবরীল সেই জনপদটি ধ্বংস করে দেন।
শিক্ষা : অন্যায়, অত্যাচার ও পাপাচারের প্রতিরোধে যার যেটুকু ক্ষমতা থাকে, সে অনুসারে অবদান রাখা কর্তব্য। কর্তব্য পালন না করে কেবল নফল নামায ও যিকির ইত্যাদিতে ব্যাপৃত থাকলে দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। এক হাদীসে রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ কোন অন্যায় কাজ সংঘটিত হতে থাকলে সর্বশক্তি দিয়ে তা ঠেকাও, তা যদি না পারো তবে মুখ দিয়ে সদুপদেশ দাও, তাও যদি না পারো তবে মনে তাকে ঘৃণা ও অপছন্দ কর এবং কিভাবে তা বন্ধ করা যায় তা চিন্তা করতে থাকো। শেষোক্ত পন্থা হলো সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।
📄 তিনজন মুসাফির
হযরত উমার (রাজিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; "তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মধ্য থেকে তিন ব্যক্তি একবার সফরে বেরুলো। পথ চলতে চলতে এক জায়গায় রাত হলে তারা একটি পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিল। গুহার ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই পর্বতের ওপর থেকে একটি প্রকান্ড পাথর গড়িয়ে পড়লো এবং যে গুহায় তারা আশ্রয় নিয়েছিল তার মুখ ঐ পাথরে চাপা পড়ে বন্ধ হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে ঐ তিন ব্যক্তি পরামর্শ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, এত বড় পাথরের অবরোধ থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের একটি মাত্র উপায় আছে। সেটি হচ্ছে এই যে, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অতীত জীবনের কৃত সৎ কর্মসমূহের দোহাই দিয়ে আল্লাহর কাছে মুক্তি চাইবো।
সিদ্ধান্ত মোতাবেক এক ব্যক্তি নিম্নরূপ দোয়া করলোঃ "হে আল্লাহ! আমার পিতামাতা বৃদ্ধ হয়ে গেলে তাদের আগে আমি নিজ পরিবার পরিজনের আর কাউকে রাতের খাবার খাওয়াতাম না। একদিন জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে আমার বাড়ী ফিরতে দেরী হয়ে যায়। বাড়ী ফিরে দেখি, তারা উভয়ে ঘুমিয়ে গেছেন। আমি তাদের রাতের খাওয়ার জন্য দুধ দুইয়ে আনলাম। কিন্তু দেখলাম, তারা তখনো ঘুমিয়ে। পিতামাতার খাওয়ার আগে আমার বা আমার পরিবারের লোকদের খাওয়া আমি সমিচীন মনে করলাম না। তারা কখন জেগে ওঠেন, তার অপেক্ষায় আমি সারা রাত দুধের পাত্র হাতে নিয়ে বসে রইলাম। আমার ছেলে মেয়েরা ক্ষুধার যন্ত্রনায় আমার পায়ের ওপর গড়াগড়ি খেয়ে কান্নাকাটি করছিল। কিন্তু আমি তাতেও বিচলিত হইনি। ভোর হয়ে গেলে পিতামাতা জেগে উঠলেন এবং দুধ খেয়ে নিলেন। হে আল্লাহ! এ কাজটি আমি যদি তোমাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে করে থাকি, তাহলে এই পাথরের অবরোধ থেকে আমাদেরকে উদ্ধার কর।"
এ পর্যন্ত বলা মাত্রই পাথরটা খানিকটা সরে দাঁড়ালো। তবে সেটুকু তাদের বেরিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
রাসূল (সাঃ) বললেনঃ এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তি এভাবে দোয়া করতে লাগলো। "হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। আমি তাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসতাম। কিন্তু সে আমাকে তেমন ভালোবাসতো না। অবশেষে একদিন দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে সে আমার কাছে সাহায্য চাইতে এলো। সুযোগ বুঝে এবার আমি তার কাছে পুনরায় ভালোবাসা নিবেদন করলাম এবং একশো বিশ দীনার দিলাম। সে আমার সাহায্য গ্রহণ করলো তবে সেই সাথে আমাকে কঠোরভাবে সাবধান করে দিল যে, তার ব্যাপারে আমি শরীয়তের পর্দার বিধান লংঘন না করি। আমি তার সতর্কবাণী মেনে নেই এবং তাকে যে সাহায্য দিয়েছিলাম তার দাবীও পরিত্যাগ করি। হে আল্লাহ! আমি এ সংযম যদি তোমার ভয়েই অবলম্বন করে থাকি তবে আমাদেরকে এই অবরোধ অবস্থা থেকে মুক্ত কর।"
এ কথা বলার সঙ্গে বিশাল পাথরখানি আরো একটু সরে দাঁড়ালো। কিন্তু তখনো বেরুবার পথ সুগম হয়নি।
রাসূল (সাঃ) বললেন, এরপর তৃতীয় ব্যক্তি বলতে আরম্ভ করলোঃ "হে আল্লাহ! আমি এক সময় কয়েকজন শ্রমিক নিয়োগ করি। কাজের শেষে তাদের একজন বাদে সকলের পারিশ্রমিক দিয়ে দেই। এই লোকটি নিজের পারিশ্রমিক না নিয়েই চলে যায়। অতঃপর আমি তার প্রাপ্য অর্থকে লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করি। কালক্রমে তা থেকে প্রচুর সম্পদ উৎপন্ন হয়।” কিছুকাল পরে সে আমার কাছে আসে এবং তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক চায়। আমি তাকে বললামঃ তুমি যে বিপুল সংখ্যক গরু, ছাগল ও উট দেখতে পাচ্ছ, এ সবই তোমার পারিশ্রমিক।" সে বললোঃ "দোহাই আল্লাহর! আমার সাথে তামাশা করবেন না।" আমি বললামঃ "মোটেই তামাশা নয়।" অতঃপর তাকে বুঝিয়ে বললে সে সানন্দে গ্রহণ করলো এবং ওগুলোকে হাকিয়ে নিয়ে চলে গেল। হে আল্লাহ! আমি এই কাজটি যদি তোমাকে খুশী করার জন্যই করে থাকি, তাহলে আমরা যে দুর্বিষহ অবস্থায় পড়েছি তা থেকে নিষ্কৃতি দাও।"
এ পর্যন্ত বলার সঙ্গে পাথরটি গুহার মুখ থেকে সম্পূর্ণরূপে সরে গেল। অতঃপর আল্লাহর ঐ তিন বান্দা গুহা থেকে বেরিয়ে গন্তব্য স্থানের দিকে রওনা হলো। (বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী)
শিক্ষা : হাদীসের কিস্সাটি অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। বিশেষতঃ নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলোকে এর অন্যতম প্রধান শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করা যায়ঃ
১. নিজের কৃত কোন সৎ কর্মের জন্য গর্ববোধ বা অহংকার প্রকাশ করা যদিও অন্যায়, কিন্তু কোন ভালো কাজ করতে পারা এবং খারাপ কাজ পরিহার করতে পারাকে নিজের সৌভাগ্য ও আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করে সন্তোষ ও তৃপ্তি বোধ করা এবং আল্লাহর শোকর করা মহত্ত্বের পরিচায়ক। এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ "ভালো কাজ করতে পেরে আনন্দ বোধ করা ও খারাপ কাজ করে অনুতপ্ত হওয়া ঈমানের লক্ষণ।" আর এ ধরনের কোন নিঃস্বার্থ ও একনিষ্ঠ সৎকর্ম যদি নিজের অতীত জীবনে থেকে থাকে, তবে তার দোহাই দিয়ে দোয়াও করা যায় এবং সে দোয়া কবুল হওয়ার আশাও করা যায়।
২. পিতামাতার খিদমত, পরোপকার ও খোদাভীতি মানুষকে আখেরাতের কল্যাণের পাশাপাশি বহুবিধ পার্থিব বিপদ মুসিবত থেকেও উদ্ধার করে থাকে。
৩. পিতামাতার অধিকার স্ত্রী ও সন্তানদের অধিকারের ওপর অগ্রগণ্য। বিশেষতঃ পিতামাতা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব উপার্জনক্ষম সন্তানদের।
৪. শ্রমিক মালিক সম্পর্কের একটি চমকপ্রদ নমুনা এ হাদীসে তুলে ধরা হয়েছে। মালিকের নিকট শ্রমিকের কোন পাওনা গচ্ছিত থাকলে তা হারাম উপায়ে নয় বরং হালাল পন্থায় লাভজনক ব্যবসায়ে খাটিয়ে যতদূর সম্ভব বাড়িয়ে ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও মহৎ কাজ। আর না হোক, চাওয়া মাত্র তালবাহানা না করে আসল পাওনা সম্পূর্ণরূপে ফেরত দেয়া বাঞ্ছনীয়। শ্রমিকের উৎপাদনের লভ্যাংশে শরীক করার প্রতি উৎসাহ প্রদানও এ হাদীসের অন্যতম লক্ষ্য বলে প্রতীয়মান হয়।
৫. বিপন্ন মানুষকে, বিশেষত নারীকে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে স্বার্থোদ্ধারের মানসে কোন সাহায্য করা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ধরনের শোষণ ও ঘৃণ্য মানসিকতার পরিচায়ক।
৬. শত বিপদাপদ ও নির্যাতনের ভেতরেও জুলুমকারীকে সদুপদেশ দান, সতর্ক করা ও খোদাভীতির শিক্ষা দিতে কুণ্ঠিত হওয়া চাইনা। মুসলিম নারী ক্রীতদাসী হয়েও স্বীয় জালেম ও অমুসলিম মনিবকে ক্রমাগত সদুপদেশ দিতে দিতে নিষ্ঠাবান মুসলিমে পরিণত করেছে- এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়। আলোচ্য হাদীসটিতেও এক দুর্ভিক্ষপীড়িত মুসলিম রমণীর সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সতীত্ব লক্ষণীয়।
৭. সর্বাবস্থায় পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করা ও আল্লাহর সাহায্য কামনা করা কর্তব্য। যেমন আল্লাহর ঐ তিন বান্দা করেছিলেন।
📄 লুকমান হাকীমের কিস্সা
হযরত লুকমান হাকীম হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের সমসাময়িক একজন অত্যন্ত জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি ছিলেন। পবিত্র কুরআনে তাঁর নাম উল্লেখ করতঃ তাঁর কতিপয় উপদেশ উদ্ধৃত করা হয়েছে। নবী না হয়েও কুরআনে তাঁর মত এত গুরুত্ব আর কোন ব্যক্তি পাননি। নবী বা রাসূল না হওয়া সত্ত্বেও তার কথাবার্তা ও আচরণে নবীসুলভ বিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও সততা প্রতিফলিত হতো। এজন্য তিনি লুকমান হাকীম নামে পরিচিত ছিলেন。
হযরত লুকমানের জন্মস্থান বা বংশ পরিচয় সংক্রান্ত কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে তাঁর সম্পর্কে শুধু নিম্নোক্ত তথ্যসমূহ জানা যায়ঃ প্রথম জীবনে তিনি সিরিয়ার এক ধনবান ব্যক্তির অধীনে গোলামীর জীবন যাপন করেন। তারপর তার মধ্যে অসাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে তাঁর মনিব তাকে মুক্ত করে দেয়।
গোলামী জীবনের পূর্বে তিনি মেষ রাখাল ছিলেন বলে জানা যায়। সেই সময় তাঁর সমবয়সী আর এক রাখালও তাঁর সাথে মেষ চরাতো। তাঁদের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল।
পরবর্তীকালে যখন হযরত লুকমান একজন হাকীম অর্থাৎ জ্ঞানী ব্যক্তিরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করেন, তখন তাঁর সেই বাল্য বন্ধুটি একদিন তাঁকে একটি বিরাট জনসমাবেশে ওয়ায নসিহত করতে দেখে। সে সমাবেশ শেষে তাঁকে জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি কি সেই ব্যক্তি নও, যার সাথে আমি মাঠে বকরী চরাতাম। হযরত লুকমান বললেন, তা তুমি আমাকে ঠিকই চিনেছ। আমি বাল্যকালে বকরী চরাতাম। সে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি এই মর্যাদা কিভাবে অর্জন করলে? তিনি বললেনঃ আমি চারটি স্বভাব দ্বারা এই মর্যাদা লাভ করেছিঃ (১) কখনো হারাম সম্পদ উপার্জন করিনি। (২) কখনো মিথ্যা বলিনি। (৩) কখনো আমানতের খেয়ানত করিনি। (৪) কখনো সময়ের অপচয় করিনি।
অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা প্রসূত ও জ্ঞানদীপ্ত কথা ও কর্মকান্ডকে হিকমত বলা হয়ে থাকে। পবিত্র কুরআনে ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতে হযরত লুকমানের যে সব হিকমত বর্ণিত হয়েছে, তার কিছু কিছু নিম্নে তুলে ধরা হচ্ছেঃ
• পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হিকমতের বাণীঃ
• নিজ পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশাবলী
১. হে বৎস। আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না। আল্লাহর সাথে শরীক করা একটা মারাত্মক জুলুম।
২. হে বৎস! তুমি যদি একটি তিলেরমত ক্ষুদ্র আকার ধারণ কর, অতঃপর কোন পাথরের অভ্যন্তরে অথবা আকাশের ওপরে অথবা ভূগর্ভে আত্মগোপন কর, তবুও আল্লাহ সেখান থেকে তোমাকে বের করবেন।
৩. হে বৎস! তুমি নামায কায়েম কর, সৎ কাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ কর এবং এই পথে যে বিপদ আপদের সম্মুখীন হও, তাতে ধৈর্য ধারণ কর।
৪. মানুষের সাথে আচরণের সময় মুখ বিকৃত করো না এবং পৃথিবীতে অহংকারের সাথে চলাফেরা করো না। ধীরস্থিরভাবে চলাফেরা কর এবং অনুচ্চ কন্ঠে কথা বল।
• রেওয়ায়েত থেকে প্রাপ্ত হিকমতের বিবরণঃ
১. হযরত লুকমান যখন গোলামীর জীবন যাপন করতেন, তখন একই মনিবের অধীন তার সাথে আরো একটি গোলাম কর্মরত ছিল। একবার সেই গোলামটি মনিবের কোন খাদ্যদ্রব্য চুরি করে খেয়ে ফেলে। মনিব উভয়কে দোষারোপ করেন। এতে হযরত লুকমান ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। কিভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন, তা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। অতঃপর মনিবকে পরামর্শ দিলেন যে, আপনি আমাদের দু'জনকে গরম পানি খাইয়ে দিন। এতে উভয়ের বমি হবে এবং যে প্রকৃত চোর, তার পেট থেকে বমির সাথে ভক্ষিত জিনিসের অংশ বেরিয়ে পড়বে। মনিব তার পরামর্শ মত কাজ করলেন এবং হযরত লুকমান নির্দোষ সাব্যস্ত হলেন।
এই ঘটনা থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে, কোন মিথ্যা অপবাদ মাথায় নিয়ে কারো চুপ করে বসে থাকা উচিত নয়। তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রতিবাদ করা উচিত এবং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করা উচিত।
২. একবার হযরত লুকমানের মনিব তার বন্ধুর সাথে পাশা খেলে হেরে যায়। খেলার যে বাজী পূর্বাহ্নে নির্দ্ধারিত হয়েছিল, সে অনুসারে হয় তাকে তার সমস্ত সম্পদ বিজয়ী বন্ধুকে দিতে হবে নতুবা পার্শ্ববর্তী নদীর সমস্ত পানি তাকে খেয়ে ফেরতে হবে। খেলায় হেরে যাওয়ার পর বন্ধুটি তার মনিবকে এই দুটি শর্তের একটি অবিলম্বে পালন করার জন্য চাপ দিতে লাগলো। মনিব অতিকষ্টে তার বন্ধুর কাছে একদিন সময় নিয়ে বাড়িতে চলে এল এবং লুকমানকে সমস্ত বিষয় খুলে বললো। লুকমান একটু চিন্তা করেই তাকে বললেনঃ আপনি আপনার বন্ধুকে এক কানাকড়িও দেবেন না। বরং নদীর পানি খেয়ে ফেলার শর্তটাই পালন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করবেন। তবে তাকে বলবেন, প্রথমে সে যেন নদীর দু'পাশে বাঁধ দিয়ে দেয়। তা না হলে এক দিক দিয়ে পানি খেয়ে ফেললে অন্য দিক থেকে নদীতে আরো পানি ঢুকে পড়বে। হযরত লুকমানের শিখানো এই বুদ্ধিতে তাঁর মনিব বিপদ থেকে রক্ষা পেল এবং তার বন্ধু অবৈধভাবে বন্ধুর অর্থ আত্মসাতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো। এতে খুশী হয়ে মনিব তাকে মুক্তি দিলেন।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, মানুষকে অন্যের জুলুম ও শোষণ থেকে বাঁচানোর জন্য যেখানে শক্তি প্রয়োগের পথ বন্ধ, সেখানে কৌশল প্রয়োগ করতে হবে।
৩. আর একদিন হযরত লুকমান হাকীমের মনিব তাঁকে আদেশ দিল যে, আমার জন্য একটি বকরী যবাই করে তার দেহের সর্বোত্তম অংশ রান্না করে নিয়ে এস। হযরত লুকমান বকরীর হৃদপিন্ড ও জিহ্বা রান্না করে আনলেন। পরদিন মনিব আবার নির্দেশ দিলেন বকরীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট অংশ রান্না করতে। লুকমান আবারও জিহ্বা ও হৃদপিন্ড রান্না করে খাওয়ালেন। মনিব জিজ্ঞাসা করলোঃ কি হে লুকমান! আজও দেখি, তুমি একই অঙ্গ রান্না করে এনেছ। একই অঙ্গ সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে নিকৃষ্ট কিভাবে হয়? হযরত লুকমান বললেনঃ যে কোন জীবের জিহ্বা ও হৃদপিন্ডই তার সর্ব প্রধান অঙ্গ। এই দুটি যখন ভালো থাকে, তখন সেও হয় উৎকৃষ্ট জীব। আর এ দুটি যখন খারাপ হয়, তখন সে হয় নিকৃষ্ট জীব।
এই ঘটনা থেকে প্রকারান্তরে হযরত লুকমান শিক্ষা দিলেন যে, মানুষের বেলায়ও এই কথা প্রযোজ্য। সে যদি তার হৃদয় দিয়ে সৎ চিন্তা করে এবং জিহ্বা দিয়ে সৎ কথা বলে, পবিত্র জিনিস পানাহার করে, তবে সে সর্বোত্তম প্রাণীকে পরিণত হতে পারে, নতুবা নিকৃষ্টতম প্রাণীতে পরিণত হবে। বলা বাহুল্য, তাঁর এ হিকমতটি হাদীস কুরআনের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৪. আর একদিন হযরত লুকমানের মনিব তাকে নির্দেশ দিল তাঁর যমীনে তিল বপন করতে। হযরত লুকমান চালাকী করে তিলের পরিবর্তে সরিষা বপন করলেন। পরে যখন ফসল জন্মালো তখন মনিব বললো, আমি তো তোমাকে তিল বপন করতে বলেছিলাম। তুমি সরিষা বপন করলে কেন? হযরত লুকমান বললেনঃ আমি তো ভেবেছিলাম, সরিষা বুনলেই তিল হবে। মনিব বললেনঃ তা কি করে হয়? তখন হযরত লুকমান বললেনঃ আপনি যখন সব সময় পাপ কাজ করে উত্তম ফল বেহেশ্ত পাওয়ার আশা করেন, তখন সরিষা বুনে আমি তিল পাওয়ার আশা করলে দোষ কী? এ কথা শুনে মনিব চমকে উঠলো এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করলো।
৫. আর একবার লুকমান হাকীম একটি জাহাজে আরোহন করে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছিলেন। জাহাজে একজন সওদাগর ও তার সাথে একটি বালক ভৃত্য ছিল। জাহাজ সমুদ্রের মাঝখানে গেলে তার উত্তাল তরঙ্গমালা দেখে বালকটি বিকট চিৎকার করে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। সে জীবনে আগে কখনো সমুদ্র দেখেনি। তাই সমুদ্রের মাঝখানে এসে সে ভয়ে কাঁদতে লাগলো। সওদাগর অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনই লাভ হলো না। এই অবস্থা দেখে লোকমান হাকীম সওদাগরের কাছে এগিয়ে গেলেন এবং তাকে বললেন, 'আপনি বোধ হয় বালকটির কান্নাকাটি থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদি কিছু মনে না করেন, আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। সওদাগর সানন্দে রাযী হলো। লুকমান বালকটিকে নিয়ে জাহাজের এক প্রান্তে চলে এলেন। তারপর তার কোমরে একটি রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধলেন। অতঃপর তাকে সাগরের পানির মধ্যে ফেলে দিয়ে কিছুক্ষণ রশি ধরে টেনে নিয়ে চললেন। বালকটি পানিতে পড়বার সময় গগণবিদারী একটা চিৎকার দিল। কিন্তু তারপরই নিরবে হাবুডুবু খেতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে লুকমান তাকে টেনে তুললেন এবং সওদাগরের কাছে রেখে এলেন। এবার সে আর কান্নাকাটি করলো না। শান্ত হয়ে বসে থাকলো। সওদাগর বিস্মিত হয়ে লুকমানকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ অসম্ভবকে আপনি কিভাবে সম্ভব করলেন? লুকমান বললেনঃ ব্যাপারটা কঠিন কিছু ছিল না। বালকটি সমুদ্র কখনো দেখেনি। তাই সমুদ্রের ভয়াল চেহারা দর্শনই তাকে ভয়ে দিশেহারা করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু যখন সে দেখলো, সমুদ্রের পানিতে পড়ে যাওয়া বা ডুবে যাওয় আরো ভয়াবহ ব্যাপার। তখন তার কাছে জাহাজে বসে সমুদ্র দেখা অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক কাজ বলে মনে হতে লাগলো। এ জন্যই সে এখন শান্ত। আমি বিষয়টা প্রথমেই বুঝে নিয়ে এই কৌশল প্রয়োগ করেছি।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, বিপদ দেখেই অস্থির হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মনে রাখতে হবে যে, যে বিপদ এখন সামনে এসেছে ভবিষ্যতে তার চেয়েও বড় বিপদ আশা বিচিত্র কিছু নয়।
📄 নামায সংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনা
বর্ণিত আছে যে, বনী ইসরাইলের এক মহিলা একবার হযরত মূসার (আঃ) কাছে এল। সে বললোঃ হে আল্লাহর রাসূল। আমি একটি ভীষণ পাপের কাজ করেছি। পরে তওবাও করেছি। আপনি দোয়া করুন যেন আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করেন। মূসা (আঃ) বললেনঃ তুমি কি গুনাহ করেছ? সে বললোঃ আমি ব্যভিচার করেছিলাম। অতঃপর একটি অবৈধ সন্তান প্রসব করি এবং তাকে হত্যা করে ফেলি। মূসা (আঃ) বললেনঃ "হে মহাপাতকিনী। এক্ষুনি বেরিয়ে যাও। আমার আশংকা আকাশ থেকে এক্ষুনি আগুন নামবে এবং তাতে আমরা সবাই ভস্মীভূত হবো।" মহিলাটি ভগ্ন হৃদয়ে বেরিয়ে গেল। অল্পক্ষণ পরেই জিবরীল (আঃ) এলেন। তিনি বললেনঃ "হে মুসা। আল্লাহ আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছেন কী কারণে এই তওবাকারিণীকে তাড়িয়ে দিলেন? তার চেয়েও কি কোন অধম মানুষকে আপনি দেখেননি?” মূসা বললেনঃ “হে জিবরীল। এর চেয়ে পাপিষ্ঠ কে আছে?” জিবরীল (আঃ) বললেনঃ "ইচ্ছাকৃতভাবে নামায তরকারী।"
অপর একটি ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি তার বোনের দাফন কাফন সম্পন্ন করে বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখলো তার মানিব্যাগটি নেই। পরে তার মনে হলো, ওটা কবরের ভেতরে পড়ে গেছে। তাই সে ফিরে গিয়ে কবর খুড়লো। দেখলো, কবর জুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। সে পুনরায় মাটি চাপা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ী গেল। তার মায়ের কাছে সমস্ত ঘটনা জানালে তিনি বললেন, মেয়েটি নামাযের ব্যাপারে খামখেয়ালী করতো এবং সময় গড়িয়ে গেলে নামায পড়তো। বিনা ওজরে নামায কাযা করলে যদি এরূপ পরিণতি হতে পারে তাহলে বেনামাযীর পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে। তা ভাবতেও গা শিউরে উঠে।
শুধু নির্দ্ধারিত সময়ের মধ্যে নামায পড়াই যথেষ্ট নয়। নামাযকে সুষ্ঠুভাবে ও বিশুদ্ধভাবে পড়াও জরুরী। নচেত অশুদ্ধ নামায পড়া নামায না পড়ারই সমতুল্য। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, একদিন এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলো। রাসূল (সাঃ) তখন মসজিদেই বসে ছিলেন। লোকটি নামায পড়লো। অতঃপর রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে সালাম করলো। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেনঃ তুমি ফিরে যাও এবং নামায পড়। কারণ, তুমি নামায পড়নি। সে চলে গেল এবং আগের মত আবার নামায পড়ে রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে সালাম করলো। তিনি সালামের জবাব দিয়ে আবার বললেনঃ তুমি ফিরে যাও এবং নামায পড়। কেননা, তুমি নামায পড়নি। এরূপ তিনবার নামায পড়ার পর লোকটি বললোঃ হে আল্লাহর রাসূল। আমি এর চেয়ে ভালভাবে নামায পড়তে পারি না। আমাকে শিখিয়ে দিন। তিনি বললেনঃ "প্রথমে নামাযে দাঁড়িয়ে তাকবীর বল। অতঃপর যতটুকু পার কুরআন পাঠ কর। অতঃপর রুকু কর এবং রুকুতে গিয়ে স্থির হও। অতঃপর উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াও। তারপর সিজদা দাও এবং সিজদায় গিয়ে স্থির হও। তারপর স্থির হয়ে বস। অতঃপর আবার সিজদা দাও এবং সিজদায় স্থির হও। এভাবে নামায শেষ কর।"
শিক্ষা: ঈমানের পরেই নামায সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। সময়ানুবর্তিতার সাথে ও বিশুদ্ধভাবে নামায না পড়লে আখেরাতে নাজাত লাভের আশা করা যায় না।