📄 ওয়াদামত ঋণ পরিশোধের গুরুত্ব
রাসুল (সাঃ) বলেনঃ একবার বনী ইসরাইলের এক ব্যক্তি একই গোত্রের জনৈক ধনাঢ্য ব্যক্তির নিকট এক হাজার দিনার ধার চাইলো। ধনাঢ্য লোকটি তাকে বললোঃ "ঠিক আছে। আমি ধার দিতে প্রস্তুত। তবে কয়েকজন সাক্ষী নিয়ে এসো। তাদেরকে সাক্ষী রেখে আমি তোমাকে ধার দেবো।” ধার প্রার্থী বললোঃ "সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।”
ধনাঢ্য ব্যক্তি তখন বললোঃ "তাহলে এমন একজন লোক নিয়ে এসো, যে এই ঋণের জন্য জামিন থাকবে।" লোকটি এবারও বললোঃ "জামিন হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।” তখন ধনাঢ্য লোকটি বললোঃ "তুমি সত্য কথাই বলেছ।" অতঃপর সে তাকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এক হাজার দিনার ধার দিলো।
লোকটি এই ঋণ নিয়ে সমুদ্র ভ্রমণে বেরিয়ে গেলো এবং নিজের প্রয়োজন পূরণ করলো। অতঃপর দেশে ফিরে আসার জন্য জাহাজের সন্ধান করতে লাগলো, যাতে নির্দ্ধারিত দিনে সে ঐ ঋণ পরিশোধ করতে পারে। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও সে কোন জাহাজ ধরতে পারলো না। অগত্যা সে একখানা কাঠের টুকরো ছিদ্র করে তার ভেতরে এক হাজার দিনার ও ঋণ দাতার উদ্দেশ্যে লেখা একখানা চিঠি ঢুকিয়ে তা শিশা গালিয়ে বন্ধ করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিলো।
অতঃপর সে আল্লাহর নিকট কাকুতি মিনতি সহকারে দোয়া করলোঃ "হে আল্লাহ! তুমি তো জান, অমুকের নিকট থেকে আমি এক হাজার দিনার ধার নিয়েছিলাম। সে সাক্ষী চাইলে আমি বললাম, সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। অতঃপর সে জামিন চাইলে আমি বললাম, জামিন হিসাবে আল্লাহ যথেষ্ট। সে সাক্ষী ও জামিন হিসাবে তোমাকে পেয়েই সন্তুষ্ট হয়েছিল। আমি যথাসময়ে তার ঋণ পরিশোধের জন্য সামুদ্রিক যান সন্ধানে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। কিন্তু সক্ষম হইনি। তাই এই এক হাজার দিনার আমি তোমার নিকট সোপর্দ করছি।” এই বলেই সে ঐ কাষ্ঠখন্ড সমুদ্রে নিক্ষেপ করলো। এরপরও সে জাহাজের সন্ধানে ব্যাপৃত রইলো।
ওদিকে ঋণদাতা নির্দ্ধারিত দিনে সমুদ্রতীরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলো। ভাবলো, হয়তো তার খাতক কোন জাহাজে করে ফিরে আসবে এবং তাকে ঋণ পরিশোধ করবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কোন জাহাজ কিনারে ভিড়তে দেখলো না। সে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। সহসা দেখলো, এক টুকরো কাঠ ভাসতে ভাসতে এসে কিনারে আসলো। লোকটি ঐ কাঠের টুকরোটি জ্বালানী হিসাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বাড়ীতে নিয়ে গেলো। বাড়ীতে নিয়ে যেই কাঠখানি চেরাই করলো, অমনি তার ভেতর থেকে চিঠি ও এক হাজার দিনার বেরিয়ে পড়লো।
কয়েকদিন পরই খাতক এসে হাজির। সে পৃথকভাবে তাকে এক হাজার দিনার দিলো। কারণ সে ভেবেছিল সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়া কাঠের টুকরো তার মহাজন পায়নি। এমনকি ব্যাপারটা তাকে জিজ্ঞাসা করতেও সে সংকোচ বোধ করলো। এক হাজার দিনার হাতে গুঁজে দিয়ে সে বিলম্বের জন্য ওজর পেশ করতে ও ক্ষমা চাইতে লাগলো। বললো, সময়মত সামুদ্রিক যান না পাওয়ার কারণেই তার এই বিলম্ব হয়েছে।
মহাজন বললোঃ "আচ্ছা, তুমি কি আমার কাছে কোন জিনিস পাঠিয়েছ?” সে বললোঃ "আমি আপনার নিকট ওজর পেশ করছি যে, সময়মত জাহাজ ধরতে না পেরে আমার বিলম্ব হয়েছে।"
মহাজন বললোঃ "তাহলে শোনো! তুমি কাঠের টুকরোতে করে যা পাঠিয়েছ, তা আল্লাহ আমার কাছে পৌছে দিয়েছেন। এই এক হাজার দিনার আমার প্রয়োজন নেই। এটা তুমি নিয়ে যাও।” (বুখারী, নাসায়ী)
শিক্ষাঃ
(১) ওয়াদামত ঋণ পরিশোধ করা কর্তব্য। হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে লড়াই করে শহীদ হয়, তার সকল গুনাহ আল্লাহ মাফ করলেও ঋণ মাফ করেন না। কারণ ওটা বান্দার হক।
(২) যে কোন ব্যাপারে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা সত্ত্বেও যথাসাধ্য চেষ্টা অব্যাহত রাখা কর্তব্য।
(৩) ঋণের আদান-প্রদান কালে সাক্ষী বা জামিন রাখা অথবা লিখিত দলিল স্বাক্ষর করা শরীয়তে দৃষ্টিতে বাদ্যতামূলক। তবে পূর্ববর্তী নবীদের শরীয়তে এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা ছিল না। কুরআনের সূরা বাকারায় এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, যাতে কোন বিতর্কের সৃষ্টি না হয়।
(৪) কোন ব্যক্তি যদি সাক্ষ্য বা জামিন হাজির করতে অক্ষম হয় এবং আল্লাহকে সাক্ষী ও জামিন রাখে, তবে তাকে বিশ্বাস করে ঋণ দিয়ে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করা উত্তম। মনে রাখতে হবে, সুদ-বিহীন ঋণ প্রদান ক্ষেত্র বিশেষে দান করার চেয়েও বেশী সওয়াবের কাজ। কেননা এটা সাধারণতঃ বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারে সহায়তা করে। দানশীল ব্যক্তি সাধারণতঃ নিজের ইচ্ছা অনুসারে উদ্ধৃত্ত সম্পদ থেকে দান করে থাকে। কিন্তু ঋণদাতা বিপন্ন ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য নিজের অত্যাবশ্যকীয় সম্পদ থেকেও ঋণ দিয়ে থাকে।
📄 অপাত্রে দান
হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ একবার এক ব্যক্তি শপথ করলো যে, আজ রাতে কিছু ছদকা না করে সে ঘুমাবে না। অতঃপর ছদকার অর্থ নিয়ে রাস্তায় বেরুলো। যে ব্যক্তিকে সে ছদকা দিল, সে ছিল একজন চোর। লোকটি তাকে চিনতো না। যখন ব্যাপারটা জানাজানি হলো, তখন লোকে তাকে উপহাস করলো যে, একটা চোরকে সে ছদকা দিয়েছে। কিন্তু সে কিছুমাত্র হতোদ্যম হলো না। বরং আল্লাহর শোকর আদায় করলো।
পরের দিন পুনরায় শপথ করলো যে, রাতে কিছু ছদকা না নিয়ে সে ঘুমাবে না। কিন্তু আজও তার অজান্তে ছদকা গিয়ে পড়লো এক ব্যাভিচারীর হাতে। এবারও তাকে বিদ্রুপ শুনতে হলো এবং সে যথারীতি আল্লাহর শোকর আদায় করলো।
তৃতীয় দিনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। আজ তার ছদকা জুটলো এক ধনী ব্যক্তির কপালে। আজও তাকে উপহাসে জর্জরিত করা হলো। কিন্তু সে আল্লাহর শোকর আদায় করলো।
এই লোকটি কিছু দিন পর মারা গেলে ফেরেশতারা তাকে জানালেন যে, তার সকল ছদকাই কবুল হয়েছে। চোরকে দেয়া ছদকা এই জন্য কবুল হয়েছে যে, এ ছদকা পাওয়ার পর তার চুরির অভ্যাস ত্যাগ করার আশা করা যায়। ব্যভিচারীরও শুধরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর ধনী ব্যক্তি ছদকা পেয়ে লজ্জিত হয়ে নিজে ছদকার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। (বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী)
শিক্ষা : দান ছদকা না জেনে অপাত্রে দিলেও তা বৃথা যায় না। তবে জেনে শুনে উপযুক্ত ও অভাবী ব্যক্তিকে দেওয়াই উত্তম। কোন অপরাধী যদি ছদকা পেলে শুধরে যাবে বলে আশা করা যায়, তবে তাকে ছদকা দেয়া যাবে।
📄 অন্যায়ের প্রতিরোধ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ একবার আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতা জিবরীলকে আদেশ দিলেন যে, "যাও, অমুক জনপদটি ধ্বংস করে দিয়ে এসো।" জিবরীল সেই জনপদটিতে গিয়েই দেখলেন, সেখানে একজন দরবেশ রয়েছেন, দিনরাত তিনি নামায পড়েন ও যিকির তাসবীহ করেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি আল্লাহকে বললেন, "হে আল্লাহ! এখানে তোমার এক বান্দা রয়েছেন যিনি সর্বক্ষণ তোমাকে স্মরণ করছেন।"
আল্লাহ জবাবে বললেনঃ তাকে শুদ্ধই ধ্বংস করে দাও। কেননা তার সামনে ইসলামের অবমাননা হয়, নাফরমানী করা হয়, জুলুমবাজী ও পাপাচারের সয়লাব বয়ে যায়। কিন্তু তার মুখমন্ডলে তাতে কোন বিরক্তির চিহ্ন ফুটে ওঠে না এবং তার মন কিছুমাত্র অস্থির হয় না।
অতঃপর জিবরীল সেই জনপদটি ধ্বংস করে দেন।
শিক্ষা : অন্যায়, অত্যাচার ও পাপাচারের প্রতিরোধে যার যেটুকু ক্ষমতা থাকে, সে অনুসারে অবদান রাখা কর্তব্য। কর্তব্য পালন না করে কেবল নফল নামায ও যিকির ইত্যাদিতে ব্যাপৃত থাকলে দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। এক হাদীসে রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ কোন অন্যায় কাজ সংঘটিত হতে থাকলে সর্বশক্তি দিয়ে তা ঠেকাও, তা যদি না পারো তবে মুখ দিয়ে সদুপদেশ দাও, তাও যদি না পারো তবে মনে তাকে ঘৃণা ও অপছন্দ কর এবং কিভাবে তা বন্ধ করা যায় তা চিন্তা করতে থাকো। শেষোক্ত পন্থা হলো সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।
📄 তিনজন মুসাফির
হযরত উমার (রাজিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; "তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মধ্য থেকে তিন ব্যক্তি একবার সফরে বেরুলো। পথ চলতে চলতে এক জায়গায় রাত হলে তারা একটি পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিল। গুহার ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই পর্বতের ওপর থেকে একটি প্রকান্ড পাথর গড়িয়ে পড়লো এবং যে গুহায় তারা আশ্রয় নিয়েছিল তার মুখ ঐ পাথরে চাপা পড়ে বন্ধ হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে ঐ তিন ব্যক্তি পরামর্শ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, এত বড় পাথরের অবরোধ থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের একটি মাত্র উপায় আছে। সেটি হচ্ছে এই যে, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অতীত জীবনের কৃত সৎ কর্মসমূহের দোহাই দিয়ে আল্লাহর কাছে মুক্তি চাইবো।
সিদ্ধান্ত মোতাবেক এক ব্যক্তি নিম্নরূপ দোয়া করলোঃ "হে আল্লাহ! আমার পিতামাতা বৃদ্ধ হয়ে গেলে তাদের আগে আমি নিজ পরিবার পরিজনের আর কাউকে রাতের খাবার খাওয়াতাম না। একদিন জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে আমার বাড়ী ফিরতে দেরী হয়ে যায়। বাড়ী ফিরে দেখি, তারা উভয়ে ঘুমিয়ে গেছেন। আমি তাদের রাতের খাওয়ার জন্য দুধ দুইয়ে আনলাম। কিন্তু দেখলাম, তারা তখনো ঘুমিয়ে। পিতামাতার খাওয়ার আগে আমার বা আমার পরিবারের লোকদের খাওয়া আমি সমিচীন মনে করলাম না। তারা কখন জেগে ওঠেন, তার অপেক্ষায় আমি সারা রাত দুধের পাত্র হাতে নিয়ে বসে রইলাম। আমার ছেলে মেয়েরা ক্ষুধার যন্ত্রনায় আমার পায়ের ওপর গড়াগড়ি খেয়ে কান্নাকাটি করছিল। কিন্তু আমি তাতেও বিচলিত হইনি। ভোর হয়ে গেলে পিতামাতা জেগে উঠলেন এবং দুধ খেয়ে নিলেন। হে আল্লাহ! এ কাজটি আমি যদি তোমাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে করে থাকি, তাহলে এই পাথরের অবরোধ থেকে আমাদেরকে উদ্ধার কর।"
এ পর্যন্ত বলা মাত্রই পাথরটা খানিকটা সরে দাঁড়ালো। তবে সেটুকু তাদের বেরিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
রাসূল (সাঃ) বললেনঃ এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তি এভাবে দোয়া করতে লাগলো। "হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। আমি তাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসতাম। কিন্তু সে আমাকে তেমন ভালোবাসতো না। অবশেষে একদিন দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে সে আমার কাছে সাহায্য চাইতে এলো। সুযোগ বুঝে এবার আমি তার কাছে পুনরায় ভালোবাসা নিবেদন করলাম এবং একশো বিশ দীনার দিলাম। সে আমার সাহায্য গ্রহণ করলো তবে সেই সাথে আমাকে কঠোরভাবে সাবধান করে দিল যে, তার ব্যাপারে আমি শরীয়তের পর্দার বিধান লংঘন না করি। আমি তার সতর্কবাণী মেনে নেই এবং তাকে যে সাহায্য দিয়েছিলাম তার দাবীও পরিত্যাগ করি। হে আল্লাহ! আমি এ সংযম যদি তোমার ভয়েই অবলম্বন করে থাকি তবে আমাদেরকে এই অবরোধ অবস্থা থেকে মুক্ত কর।"
এ কথা বলার সঙ্গে বিশাল পাথরখানি আরো একটু সরে দাঁড়ালো। কিন্তু তখনো বেরুবার পথ সুগম হয়নি।
রাসূল (সাঃ) বললেন, এরপর তৃতীয় ব্যক্তি বলতে আরম্ভ করলোঃ "হে আল্লাহ! আমি এক সময় কয়েকজন শ্রমিক নিয়োগ করি। কাজের শেষে তাদের একজন বাদে সকলের পারিশ্রমিক দিয়ে দেই। এই লোকটি নিজের পারিশ্রমিক না নিয়েই চলে যায়। অতঃপর আমি তার প্রাপ্য অর্থকে লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করি। কালক্রমে তা থেকে প্রচুর সম্পদ উৎপন্ন হয়।” কিছুকাল পরে সে আমার কাছে আসে এবং তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক চায়। আমি তাকে বললামঃ তুমি যে বিপুল সংখ্যক গরু, ছাগল ও উট দেখতে পাচ্ছ, এ সবই তোমার পারিশ্রমিক।" সে বললোঃ "দোহাই আল্লাহর! আমার সাথে তামাশা করবেন না।" আমি বললামঃ "মোটেই তামাশা নয়।" অতঃপর তাকে বুঝিয়ে বললে সে সানন্দে গ্রহণ করলো এবং ওগুলোকে হাকিয়ে নিয়ে চলে গেল। হে আল্লাহ! আমি এই কাজটি যদি তোমাকে খুশী করার জন্যই করে থাকি, তাহলে আমরা যে দুর্বিষহ অবস্থায় পড়েছি তা থেকে নিষ্কৃতি দাও।"
এ পর্যন্ত বলার সঙ্গে পাথরটি গুহার মুখ থেকে সম্পূর্ণরূপে সরে গেল। অতঃপর আল্লাহর ঐ তিন বান্দা গুহা থেকে বেরিয়ে গন্তব্য স্থানের দিকে রওনা হলো। (বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী)
শিক্ষা : হাদীসের কিস্সাটি অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। বিশেষতঃ নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলোকে এর অন্যতম প্রধান শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করা যায়ঃ
১. নিজের কৃত কোন সৎ কর্মের জন্য গর্ববোধ বা অহংকার প্রকাশ করা যদিও অন্যায়, কিন্তু কোন ভালো কাজ করতে পারা এবং খারাপ কাজ পরিহার করতে পারাকে নিজের সৌভাগ্য ও আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করে সন্তোষ ও তৃপ্তি বোধ করা এবং আল্লাহর শোকর করা মহত্ত্বের পরিচায়ক। এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ "ভালো কাজ করতে পেরে আনন্দ বোধ করা ও খারাপ কাজ করে অনুতপ্ত হওয়া ঈমানের লক্ষণ।" আর এ ধরনের কোন নিঃস্বার্থ ও একনিষ্ঠ সৎকর্ম যদি নিজের অতীত জীবনে থেকে থাকে, তবে তার দোহাই দিয়ে দোয়াও করা যায় এবং সে দোয়া কবুল হওয়ার আশাও করা যায়।
২. পিতামাতার খিদমত, পরোপকার ও খোদাভীতি মানুষকে আখেরাতের কল্যাণের পাশাপাশি বহুবিধ পার্থিব বিপদ মুসিবত থেকেও উদ্ধার করে থাকে。
৩. পিতামাতার অধিকার স্ত্রী ও সন্তানদের অধিকারের ওপর অগ্রগণ্য। বিশেষতঃ পিতামাতা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব উপার্জনক্ষম সন্তানদের।
৪. শ্রমিক মালিক সম্পর্কের একটি চমকপ্রদ নমুনা এ হাদীসে তুলে ধরা হয়েছে। মালিকের নিকট শ্রমিকের কোন পাওনা গচ্ছিত থাকলে তা হারাম উপায়ে নয় বরং হালাল পন্থায় লাভজনক ব্যবসায়ে খাটিয়ে যতদূর সম্ভব বাড়িয়ে ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও মহৎ কাজ। আর না হোক, চাওয়া মাত্র তালবাহানা না করে আসল পাওনা সম্পূর্ণরূপে ফেরত দেয়া বাঞ্ছনীয়। শ্রমিকের উৎপাদনের লভ্যাংশে শরীক করার প্রতি উৎসাহ প্রদানও এ হাদীসের অন্যতম লক্ষ্য বলে প্রতীয়মান হয়।
৫. বিপন্ন মানুষকে, বিশেষত নারীকে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে স্বার্থোদ্ধারের মানসে কোন সাহায্য করা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ধরনের শোষণ ও ঘৃণ্য মানসিকতার পরিচায়ক।
৬. শত বিপদাপদ ও নির্যাতনের ভেতরেও জুলুমকারীকে সদুপদেশ দান, সতর্ক করা ও খোদাভীতির শিক্ষা দিতে কুণ্ঠিত হওয়া চাইনা। মুসলিম নারী ক্রীতদাসী হয়েও স্বীয় জালেম ও অমুসলিম মনিবকে ক্রমাগত সদুপদেশ দিতে দিতে নিষ্ঠাবান মুসলিমে পরিণত করেছে- এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়। আলোচ্য হাদীসটিতেও এক দুর্ভিক্ষপীড়িত মুসলিম রমণীর সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সতীত্ব লক্ষণীয়।
৭. সর্বাবস্থায় পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করা ও আল্লাহর সাহায্য কামনা করা কর্তব্য। যেমন আল্লাহর ঐ তিন বান্দা করেছিলেন।