📄 অকৃতজ্ঞতার পরিণাম
বনী ইসরাঈলে তিনজন লোক ছিল—একজন কুষ্ঠরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা এবং একজন অন্ধ। আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করার জন্য ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতার দোয়ায় তারা সুস্থ হয়ে গেল এবং আল্লাহ তাদের যথাক্রমে উট, গরু ও ছাগল দিয়ে ধনী করে দিলেন।
বহুদিন পর সেই ফেরেশতা আবার মানুষের রূপ ধরে তাদের কাছে সাহায্য চাইতে গেলেন। কুষ্ঠরোগী এবং টাকওয়ালা তাদের আগের অবস্থার কথা অস্বীকার করল এবং গরিবকে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানাল। ফলে তারা আবার তাদের পূর্বের রোগাক্রান্ত ও দরিদ্র অবস্থায় ফিরে গেল। কিন্তু অন্ধ ব্যক্তিটি বলল, 'আমি অন্ধ ছিলাম, আল্লাহ আমাকে দৃষ্টি দিয়েছেন। আমি দরিদ্র ছিলাম, তিনি আমাকে ধনী করেছেন। তুমি যা চাও নিয়ে যাও।' তার কৃতজ্ঞতার কারণে আল্লাহ তার সম্পদ ও সুস্থতা বজায় রাখলেন। অকৃতজ্ঞরা ধ্বংস হলো, আর কৃতজ্ঞ ব্যক্তি পুরস্কৃত হলো।
বনী ইসরাঈলে তিনজন লোক ছিল—একজন কুষ্ঠরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা এবং একজন অন্ধ। আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করার জন্য ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতার দোয়ায় তারা সুস্থ হয়ে গেল এবং আল্লাহ তাদের যথাক্রমে উট, গরু ও ছাগল দিয়ে ধনী করে দিলেন।
বহুদিন পর সেই ফেরেশতা আবার মানুষের রূপ ধরে তাদের কাছে সাহায্য চাইতে গেলেন। কুষ্ঠরোগী এবং টাকওয়ালা তাদের আগের অবস্থার কথা অস্বীকার করল এবং গরিবকে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানাল। ফলে তারা আবার তাদের পূর্বের রোগাক্রান্ত ও দরিদ্র অবস্থায় ফিরে গেল। কিন্তু অন্ধ ব্যক্তিটি বলল, 'আমি অন্ধ ছিলাম, আল্লাহ আমাকে দৃষ্টি দিয়েছেন। আমি দরিদ্র ছিলাম, তিনি আমাকে ধনী করেছেন। তুমি যা চাও নিয়ে যাও।' তার কৃতজ্ঞতার কারণে আল্লাহ তার সম্পদ ও সুস্থতা বজায় রাখলেন। অকৃতজ্ঞরা ধ্বংস হলো, আর কৃতজ্ঞ ব্যক্তি পুরস্কৃত হলো।
📄 আসহাবুল উখদুদের ঘটনা
রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক অতীব পরাক্রমশালী রাজা ছিল আর তার ছিল এক যাদুকর। সে যখন বৃদ্ধ হয়ে গেল, তখন রাজাকে বললোঃ আমি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি। এক বালককে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। আমি তাকে যাদু শিখাবো। রাজা একটি বালককে যাদু শেখার জন্য তার কাছে পাঠালো। তার যাতায়াতের রাস্তায় ছিল হযরত ঈসা (আ) এর শরীয়তের অনুসারী একজন দরবেশ। একদিন সে আসা যাওয়ার সময় কিছুক্ষণ তার কাছে বসলো এবং তার কথাবার্তা শুনে মুগ্ধ হলো। এভাবে সে প্রতিদিন আসা যাওয়ার সময় দরবেশের কাছে বসতে লাগলো। যাদুকরের কাছে গেলে সে তাকে বিলম্বের কারণে মারধোর করতো। এতে সে দরবেশের কাছে যাদুকরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো। দরবেশ বললো যখন যাদুকর তোমাকে বিলম্বের কারণ জিজ্ঞাসা করবে তখন বলবে আমার পরিবারবর্গ আমাকে আটকে রেখেছিল। আর যখন তোমার পরিবারবর্গ তোমার কাছে বিলম্বের কারণ জানতে চাইবে, তখন বলবে যাদুকর আমাকে আটকে রেখেছিল।
এভাবেই চলতে লাগলো বালকটির আসা যাওয়া। একই সাথে যাদুকরের কাছে যাদু এবং দরবেশের কাছে ইসলামী বিধান শিখতে লাগলো। বাড়ী থেকে যাদুকরের কাছে যাওয়ার সময় একবার এবং যাদুকরের কাছ থেকে বাড়ী যাওয়ার সময় আর একবার দরবেশের কাছে বসতো এবং তার উপদেশ শুনতো। কিছুদিন এভাবে চলার পর বালকটা উভয়ের ব্যাপারে সন্দিহান ও দোদুল্যমান হয়ে পড়লো। কোন্টি সত্য ও সঠিক, তা সে বুঝে উঠতে পারলো না।
এই সময়ে একদিন সে রাস্তার ওপর একটা বিশালকায় জন্তু দেখতে পেলো। জন্তুটি এমনভাবে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিল যে, লোকজন আসা যাওয়া করতে পারছিল না। বালকটি তখন মনে মনে বললোঃ "আজ আমি দেখে নেবো দরবেশ শ্রেষ্ঠ না যাদুকর শ্রেষ্ঠ।" তাই সে একটি পাথরখন্ড হাতে নিয়ে বললোঃ "হে আল্লাহ! দরবেশের কার্যকলাপ যদি তোমার নিকট যাদুকরের কার্যকলাপের চেয়ে বেশী পছন্দনীয় হয়, তবে এই জানোয়ারটাকে মেরে ফেল, যাতে লোকজন পথ চলতে পারে।” তারপর সে ঐ পাথরখন্ড ছুঁড়ে মারলো এবং তাতে জানোয়ারটা মারা গেল। আর লোকজন যে যার পথে চলে গেলো। তারপর সে দরবেশের কাছে এসে সমস্ত বৃত্তান্ত জানালো। দরবেশ তাকে বললোঃ "প্রিয় বৎস! তুমি আজ আমার চেয়ে উত্তম হয়ে গেছ। তবে তুমি খুব শীঘ্রই পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। যদি তুমি কোন পরীক্ষায় পড়ে যাও, তবে আমার সন্ধান দিও না।"
এরপর বালকটি এমন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হলো যে, সে কেবল আল্লাহর কাছে দোয়া করা মাত্রই অন্ধ ও কুষ্ঠরোগী ভালো হয়ে যেতো এবং এভাবে অন্যান্য রোগেরও চিকিৎসা করতো।
রাজার পাত্রমিত্রদের একজন অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে এই খবর শুনে বালকটার কাছে উপঢৌকন নিয়ে এসে বললোঃ তুমি আমাকে আরোগ্য দান করবে এই আশায় এ সব এনেছি। বালক বললোঃ আমি কাউকে আরোগ্য দান করি না। আল্লাহই আরোগ্য দান করেন। যদি তুমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো, তবে আমি দোয়া করবো। আশা করা যায় যে, তিনি আরোগ্য দান করবেন। সে তখন আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো। আর আল্লাহ তৎক্ষণাৎ তাকে আরোগ্য দান করলেন। তারপর সে রাজ দরবারে ফিরে গিয়ে আগের মত নিজ দায়িত্বে নিয়োজিত হলো। রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ "তোমার চোখ কে ফিরিয়ে দিল?” সে উত্তর দিলঃ "আমার প্রভু!” রাজা বললোঃ "আমি ছাড়া তোমার কোন প্রভু আছে না কি?" সে বললোঃ "আমার ও তোমার সকলেরই প্রভু আল্লাহ।” এতে রাজা তাকে ধরে শাস্তি দিতে লাগলো। অবশেষে সে শাস্তি থেকে রেহাই পাবার আশায় বালকের কথা বলে দিল। তখন বালকটিকে ধরে আনা হলো। রাজা তাকে বললোঃ হে প্রিয় বালক! তোমার যাদুবিদ্যার যথেষ্ট খ্যাতি ছড়িয়েছে। শুনেছি তুমি নাকি অন্ধ ও কুষ্ঠরোগী আরোগ্য করে থাকো এবং আরো বহু অলৌকিক কর্মকান্ড করে থাকো। বালক বললোঃ আমি কাউকে আরোগ্য দান করি না। আরোগ্য দান তো আল্লাহই করেন। এ কথা শুনে রাজা তাকেও শাস্তি দিতে লাগলো。
অবশেষে বালকটি হযরত ঈসার শরীয়তপন্থী দরবেশের কথা বলে দিল। তখন দরবেশকে আনা হলো। তাকে তার ধর্ম ত্যাগ করতে বলা হলো। কিন্তু সে অস্বীকার করলো। তখন রাজা একখানি করাত আনিয়ে দরবেশের মাথার মাঝখান থেকে চেরাই করে দ্বিখন্ডিত করে ফেললো। তারপর আনা হলো রাজার সেই সভাসদকে। তাকেও তার ধর্ম ত্যাগ করতে বলা হলো। কিন্তু সে অস্বীকার করায় তাকেও করাত দিয়ে চিরে দু'টুকরো করে ফেলা হলো।
এরপর আনা হলো বালকটিকে। তাকেও তার ধর্ম ত্যাগ করতে বলা হলো। কিন্তু সে অস্বীকার করলো। তখন রাজা তাকে তার কতিপয় কর্মচারীর হাতে সমর্পন করে বললোঃ তোমরা তাকে পাহাড়ের চূড়ার ওপর নিয়ে যাও। তখন যদি সে তার ধর্ম ত্যাগ করে তবে তো ভালো কথা। নচেত তাকে সেখান থেকে ফেলে দিও।
লোকেরা বালকটাকে নিয়ে যেই পাহাড়ে উঠলো। বালক বললোঃ হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে চাও এদের হাত থেকে আমাকে মুক্তি দান কর। তখন পাহাড়টি এমন জোরে কেঁপে উঠলো যে, রাজার লোকেরা নীচে পড়ে মারা গেলো এবং বালক স্বচ্ছন্দে রাজার কাছে গিয়ে হাজির হলো। রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ তোমার সঙ্গীরা কোথায়? সে বললোঃ তাদের ব্যাপারে আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। এতে রাজা অনুমান করতে পারলো যে, তার আর বেঁচে নেই।
এরপর রাজা তাকে আরেক দল কর্মচারীর হাতে সোপর্দ করে বললোঃ তোমরা এক একটি নৌকায় তুলে সমুদ্রের মাঝখানে নিয়ে যাও। তারপর সে যদি তার ধর্ম ত্যাগে রাজী না হয়, তবে তাকে সেখানে সমুদ্রের পানিতে ফেলে দেবে।
নৌকা চললো মাঝ দরিয়া অভিমুখে। বালক আবার বললোঃ হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে চাও, তাদের হাত থেকে আমাকে মুক্তি দাও। এতে নৌকা তাদেরকে নিয়ে ডুবে গেলো এবং ছেলেটি শান্তভাবে রাজার দরবারে হাজির হলো। রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ তোমার সঙ্গীরা কোথায়? সে বললোঃ তাদের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করতে আল্লাহই যথেষ্ট হয়েছে।
এরপর সে রাজাকে বললোঃ আমি যেভাবে বলবো সেভাবে কাজ করলেই তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে। রাজা জিজ্ঞেস করলোঃ কিভাবে? সে বললোঃ একটি মাঠে জনগণকে সমবেত কর। তারপর আমাকে শূলে চড়াও। তারপর আমার তীরদানি থেকে একটি তীর নিয়ে ধনুকে জুড়ে দিয়ে বলঃ বালকটির প্রভু আল্লাহর নামে তীর মারছি। এরূপ করলে তুমি আমাকে মারতে পারবে।
রাজা তখন মাঠে লোক সমবেত করে বালককে শূলের ওপর বসালো। তারপর বালকের তীরদানি থেকে তীর নিয়ে ধনুকে জুড়ে দিয়ে বললোঃ 'বিসমিল্লাহি রাব্বিল গুলাম” অর্থাৎ বালকটার প্রভু আল্লাহর নামে তীর মারলাম। এই বলে তীর নিক্ষেপ করলো, বালকটি তাতে বিদ্ধ হলো ও মারা গেলো।
এ দৃশ্য দেখে জনতা সমস্বরে বলে উঠলোঃ এই বালক যে প্রভুর কথা বলে, সেই আল্লাহর ওপর আমরা ঈমান আনলাম। এ খবর পেয়ে রাজা ক্রোধে অধীর হয়ে উঠলো। তার পারিষদবর্গ তাকে বললোঃ যে আশংকা আপনার ছিল তাইতো ঘটে গেল। এখনতো দেশশুদ্ধ লোক ঈমান এনে ফেলেছে।
রাজা তখন রাস্তার পাশে দীর্ঘ গর্ত খোড়ার হুকুম দিল। গর্ত খোড়া হলে তাতে আগুন জ্বালানো হলো। রাজা বললোঃ যে ব্যক্তি তার ঈমান ত্যাগ করবে না তাকে ঐ আগুনে ফেলে দাও। যারা ইসলামের ওপর অবিচল রইল, তাদের সবাইকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে শহীদ করা হলো। এক সময় সন্তান কোলে নিয়ে এক মহিলা এলো। সে আগুনের মধ্যে যেতে ইতস্ততঃ করলে শিশুটি অলৌকিভাবে বাকশক্তি লাভ করলো এবং বললোঃ আম্মা! আপনি সবর করুন (অর্থাৎ আগুনে ঝাপ দিতে সংকোচ করবেন না)। কারণ আপনি তো সত্যের ওপরে আছেন। (মুসলিম শরীফ)
পর্যালোচনাঃ এই ঘটনাটিকে ইতিহাসে আসহাবুল উখদুদের ঘটনা বলা হয়। উখদুদ অর্থ আগুনের কুন্ডলী। পবিত্র কুরআনের সূরা আল বুরুজে এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গীত দেয়া হয়েছে।
সাধারণ অবস্থায় নিজেকে হত্যা করতে কাউকে পরামর্শ দেয়া বা তার কৌশল শিখিয়ে দেয়া আত্মহত্যার শামিল। আত্মহত্যা কখনো জায়েজ নয়। তবে আলোচ্য ঘটনায় বালকটি যে পরিস্থিতিতে এ কাজ করেছিল তা স্বাভাবিক অবস্থার পর্যায়ে পড়ে না। তা ছাড়া সম্ভবতঃ সে আল্লাহর ইঙ্গীতে কাজ করেছিল, যা ওহী ব্যতীত ইলহামের মাধ্যমেও এসে থাকতে পারে। এমনও হতে পারে যে, এরূপ কৌশলে জীবন বিসর্জন দেয়ার ফলে সমগ্র দেশ ঈমান আনবে বলে বালক ধারণা করেছিল, বাস্তবেও তাই ঘটেছিল।
শিক্ষাঃ এ ঘটনাটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে, প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তির যে কোন সময় যে কোন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। এমনকি যদি ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত হয় এবং তাতে কিছু সাফল্য ও বিজয় আসতে থাকে, তাহলেও প্রত্যেক সাফল্যের সাথে সাথে পরীক্ষার তীব্রতা ও কঠোরতা বেড়ে যাওয়া বিচিত্র নয়।
দ্বিতীয় শিক্ষা এই যে, এক আল্লাহর প্রতি ঈমানই ছিল হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রকৃত শিক্ষা। তিনিও ইসলামের একজন নবী ছিলেন এবং ইসলামেরই দাওয়াত দিয়েছেন। পরবর্তীকালে তার অনুসারীরা তার আনিত ইসলামী শরীয়ত বিকৃত করে তার নাম রাখে খৃস্টবাদ এবং নিজেরা খৃস্টান নামে পরিচিত হয়। এই খৃস্টবাদ ও খৃস্টানদের সাথে হযরত ঈসার প্রকৃত শিক্ষার কোন সম্পর্ক নেই। আলোচ্য ঘটনায় উল্লেখিত দরবেশ, বালক ও অন্যান্য শহীদগণ ছিলেন হযরত ঈসার প্রকৃত অনুসারী ও খাঁটি মুসলমান-খৃস্টান নয়।
📄 সততার এক নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ একবার এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির নিকট থেকে এক খন্ড জমি কিনলো। ক্রেতা তার কেনা জমিতে স্বর্ণমুদ্রায় পরিপূর্ণ একটি কলসী পেলো। সে তৎক্ষণাৎ ঐ জমির সাবেক মালিকের নিকট কলসীটি নিয়ে গেলো এবং বললোঃ "তোমার এই স্বর্ণ নিয়ে নাও, তোমার জমিতে এটি পাওয়া গেছে। আমি তো তোমার কাছ থেকে জমি কিনেছি। স্বর্ণ কিনিনি।" সাবেক জমিওয়ালা বললোঃ “না, ও স্বর্ণ তোমার। কেননা আমি ঐ জমিতে যেখানে যা কিছু আছে- সব শুদ্ধই বিক্রয় করেছি।" কিন্তু ক্রেতা কিছুতেই এ কথা মানতে রাজী হলো না।
অবশেষে উভয়েই তৃতীয় এক ব্যক্তির মধ্যস্ততা গ্রহণ করলো। তৃতীয় ব্যক্তিটি উভয়ের বক্তব্য শুনলেন। দেখলেন, উভয়ে নিজ নিজ বক্তব্যে অনড়। তখন বিরোধ মিটাবার কি উপায় করা যায় ভাবতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত একটি কৌশল তিনি উদ্ভাবন করে ফেললেন।
তিনি বিবাদমান লোক দু'টিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের কোন সন্তান আছে কি? একজন জানালো তার একটি ছেলে আছে। অপরজন জানালো তার একটি মেয়ে আছে।
মধ্যস্তকারী বললেন, ঠিক আছে। এই স্বর্ণ তোমাদের কাউকেই নিতে হবে না। তোমরা তোমাদের ছেলে মেয়েকে পরস্পরে বিয়ে দাও। এই স্বর্ণ দিয়ে বিয়ের ব্যয় নির্বাহ কর এবং যা বেঁচে যায়, তা নব দম্পতিকে উপটৌকন দাও।
উভয়ে এই রায় বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিলো। (বুখারী ও মুসলিম)
শিক্ষাঃ
(১) যে কোন বিরোধ বা বিতর্কের মীমাংসার জন্য নিরপেক্ষ তৃতীয় ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের মধ্যস্ততা গ্রহণ করা ইসলামী রীতি। এই তৃতীয় ব্যক্তি উভয় বিবাদমান পক্ষের সম্মতিক্রমে মনোনীত হবে এবং তার ফায়সালা মেনে নেয়া উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক হবে।
(২) আলোচ্য ঘটনার বিবাদমান ব্যক্তিদ্বয় খোদাভীরুতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উভয়েই জমির ভেতরে প্রাপ্ত স্বর্ণ অপর পক্ষকে দেয়ার জন্য উদগ্রীব- নিজে নেয়ার জন্য নয়। একজন মুমিনের প্রকৃত চরিত্র এ রকমই হওয়া উচিত।
(৩) ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে বিক্রেতার বক্তব্যই সঠিক। কেননা জমি যখন বিক্রয় অথবা দানসূত্রে হস্তান্তরিত হয়, তখন বিক্রেতা বা দাতা ইচ্ছাপূর্বক কোন কিছু বাদ না দিলে ঐ জমির ওপরে বা অভ্যন্তরে যা-ই থাক্, সব সমেতই হস্তান্তরিত হবে। দাতা বা বিক্রেতা যদি কোন জিনিস দান বা বিক্রয় বহির্ভূত বলে ঘোষণা করে, তবে তা হস্তান্তরের আগেই অথবা যে সময়ের জন্য ক্রেতা বা গ্রহীতা অনুমতি দেয়, সে সময়ের মধ্যেই তা সরিয়ে নিতে হবে।
(৪) ছেলে বা মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য কি ধরণের পরিবার ও কি ধরণের বর কনে খোঁজা দরকার, সে ব্যাপারেও এই কিস্সাটিতে চমৎকার শিক্ষা রয়েছে। একটি উন্নত মানের ইসলামী চরিত্র সম্পন্ন পরিবারের বর কনেই প্রত্যেক মুসলিম পরিবারের কাম্য হওয়া উচিত। পরিবারের ইসলামী ভাবধারা অক্ষুন্ন রাখার এটাই একমাত্র উপায়।
📄 তওবার মহিমা
হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ "তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মধ্যে এক ব্যক্তি এক নাগাড়ে ৯৯ জনকে হত্যা করে। অতঃপর সে সৎপথে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। সে লোকজনের কাছে দেশের সেরা আলেমের সন্ধান চায়। লোকেরা তাকে জনৈক দরবেশের সন্ধান দেয়। সে ঐ দরবেশের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে যে, আমি তো ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছি। এ পাপ থেকে আমার নিষ্কৃতি লাভের কোন উপায় আছে কি? দরবেশ বললো, না। সে তৎক্ষণাত ঐ দরবেশকে হত্যা করে একশো পূর্ণ করলো। এরপর পুনরায় একজন ভালো আলেমের অনুসন্ধানে বেরুলো। এবার একজন আলেমের সন্ধান পেলো। তাকে সে জিজ্ঞাসা করলো, আমি তো একশো জন মানুষ হত্যা করেছি। আমার তওবার অবকাশ আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তওবার পথে বাধা দেয়ার অধিকার কারো নেই। তবে তোমাকে নিজের গ্রাম ছাড়তে হবে। কারণ, ওটা খারাপ লোকদের বসতি। তুমি অমুক গ্রামে চলে যাও। সেখানে আল্লাহর অনুগত লোকেরা বাস করে। সেখানে গিয়ে তাদের সাথে তুমিও আল্লাহর আনুগত্যের পথ অবলম্বন কর।
লোকটি উক্ত আলেমের কথামত স্বগ্রাম ত্যাগ করে সৎলোকদের গ্রামের দিকে রওনা হলো। পথের মাঝামাঝি জায়গায় উপনীত হলে তার আয়ু শেষ হয়ে গেলো। তার কাছে দুই ধরনের ফেরেশতা হাজির হলো- রহমতের ফেরেশতা ও আযাবের ফেরেশতা। তারা পরস্পরে ঝগড়া করতে লাগলো রহমতের ফেরেশতারা বললো: এই ব্যক্তি তওবা করে আল্লাহর দিকে আন্তরিকভাবে প্রত্যাবর্তিত হয়েছিল। কাজেই এর প্রাণ আমরা গ্রহণ করবো। আযাবের ফেরেশতারা বললোঃ সে কখনো কোন সৎ কাজ করেনি। তাই ওর প্রাণ আমাদেরই প্রাপ্য। এই ঝগড়ার মীমাংসার জন্য সেখানে মানুষের আকৃতিতে একজন ফেরেশতা এলো। সে বললোঃ তোমরা ঝগড়া থামাও। দু'দিকের রাস্তা মেপে দেখো। কোনটা দীর্ঘতর। যে দিকের রাস্তা ক্ষুদ্রতর হবে, তাকে সেদিকের অধিবাসী ধরে নিতে হবে। অতঃপর রাস্তা মাপলে দেখা গেল, তার গন্তব্যস্থল সংলগ্ন রাস্তাই ক্ষুদ্রতর। তখন রহমতের ফেরেশতারা তার প্রাণ সংহার করলো।” (বুখারী, মুসিলম, ইবনে মাজা)
একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, সৎলোকদের গ্রামটি এক বিঘত পরিমাণ নিকটতর ছিল। অপর এক বর্ণনায় আছে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় আদেশ বলে সৎ লোকদের গ্রামটিকে নিকটতর করে দেন। আর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, মৃত্যুর ফেরেশতা আসার পরও সে হামাগুড়ি দিয়ে গন্তব্যস্থলের দিকে কিঞ্চিৎ এগিয়ে যায়。
শিক্ষা: এ কিসসাটিও অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। বিশেষতঃ নিম্নোক্ত বিষয়গুলো এ হাদীসের অন্যতম শিক্ষনীয় বলে বিবেচিত হতে পারেঃ
(১) মুর্খ দরবেশের চাইতে হকপন্থী আলেমই মানুষকে সৎপথের সন্ধান দিতে অধিকতর যোগ্য।
(২) কেউ যদি একনিষ্ঠ মনে ন্যায় পথে অগ্রসর হবার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার পথ কেউ আটকাতে পারে না। আল্লাহ স্বয়ং তাকে সাহায্য করেন।
(৩) সৎ হবার জন্য সৎ লোকদের সংসর্গ অবলম্বন ও অসৎ লোকদের সাহচর্য বর্জন অপরিহার্য। এ জন্য প্রয়োজনে নিজের জন্মভূমি থেকে হিজরত করা কর্তব্য। আর হিজরত করা যেখানে সম্ভব নয় কিংবা হিজরত করে যথার্থ সৎলোকের সংসর্গ পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই, সেখানে একমাত্র বিকল্প কর্মপন্থা হলো, আশপাশের মানুষকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে ইসলামী পরিবেশ গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী কর্মসূচী নিয়ে কাজ শুরু করে দেয়া। আল্লাহ আমাদেরকে সৎ লোক ও সৎ পরিবেশ তৈরীর তৌফিক দিন। আমীন।