📘 হাদীসের কিসসা > 📄 মুমিনের নামায

📄 মুমিনের নামায


একবার রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন যে, নাজদে দুটি গোত্র মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি কালবিলম্ব না করে সাতশো সাহাবীকে সাথে নিয়ে যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে নাজদ অভিমুখে যাত্রা করলেন। হযরত উসমান ইবনে আফফানকে তিনি মদীনায় নিজের স্থলাভিস্থিক্ত রেখে গেলেন। যথাস্থানে পৌঁছে তিনি 'যাতুর রিকা' নামক পর্বতবেষ্টিত এক উপত্যকায় শিবির স্থাপন করলেন। এ কারণে এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে 'গাযওয়ায়ে যাতুর রিকা'।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর ত্বরিত উপস্থিতির ফলে শত্রুদল এতই ঘাবড়ে গেল যে, তারা রণে ভংগ দিয়ে চতুর্দিকে পালিয়ে গেল। ফলে যুদ্ধ না করেই রাসূল (সাঃ) সসৈন্যে মদীনায় ফিরে গেলেন। তবে এই অভিযানকালে এমন একটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে যা চিরদিন মুসলমানদের জন্য শিক্ষা ও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। এই অভিযানকালে রাসূল (সাঃ)-এর তাবু পাহারা দেয়ার জন্য প্রতি রাত্রে পালাক্রমে কয়েকজন করে সাহাবীকে নিয়োগ করা হয়। যেদিন হযরত আব্বাদ (রাঃ) ও আম্মার ইবনে ইয়াসার (রাঃ) কে পাহারার কাজে নিয়োগ করা হয়, সেই দিনই ঘটে এই মর্মস্পর্শী ঘটনা।

হযরত আব্বাদ ও হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসার পরস্পরে পুরো রাতটাকে এভাবে ভাগ করে নিয়েছিলেন যে, প্রথম ভাগে পাহারার দায়িত্ব হযরত আব্বাদের ওপর এবং শেষের অংশ হযরত আম্মারের ওপর পড়লো। হযরত আব্বাদের পাহারার পালা শুরু হলো। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নফল নামাযের ভক্ত। তাই ভাবলেন, এত দীর্ঘ সময় চুপচাপ থেকে লাভ কী? সময়টা নামায পড়ে কাটিয়ে দেয়া যাক। তাই তিনি নফল নামাযের নিয়ত করে নামাযে সূরা কাহাফ পড়া শুরু করে দিলেন। ওদিকে হযরত আম্মার ঘুমিয়ে পড়লেন। হযরত আব্বাদ যখন নামাযে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সূরা পাঠরত, তখন চারদিকে গাঢ় অন্ধকার। এক কাফের সন্তর্পনে সামনে এল। সে দূর থেকে স্পষ্ট দেখতে পেল না যে কোন পাহারাদার আছে কিনা। তবে দূর থেকে হযরত আব্বাদকে একটা গাছ মনে করলো। আবার তার মনে সন্দেহ হলো যে, ওটা গাছ না হয়ে একটা মানুষও হতে পারে। তাই সে নিজের সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য তাকে লক্ষ্য করে একটা তীর ছুঁড়লো। তীর হযরত আব্বাদের পিঠে গিয়ে ঢুকলো। কিন্তু নামায ছাড়লেন না। কাফেরটি সন্দেহমুক্ত হওয়ার জন্য একে একে তিনিটে তীর ছুঁড়লো। প্রত্যেকটি তীর তার গায়ে বিদ্ধ হয়ে প্রবল রক্তপাত ঘটালো। অগত্যা বাধ্য হয়ে তিনি নামায ছেড়ে দিয়ে হযরত আম্মারকে ডেকে ঘুম থেকে জাগালেন। ইত্যবসরে তার নড়াচড়া টের পেয়ে ও কথাবার্তা শুনে শত্রু সৈন্যটি নীরবে প্রস্থান করলো। হযরত আম্মার তাকে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি প্রথম তীরের সাথে সাথেই আমাকে ডাকলেন না কেন?"

হযরত আব্বাদ বললেনঃ আমি নামাযে সূরা কাহাফ পাঠ করছিলাম। এতে এত মজা লাগছিল যে সূরা শেষ না করে কিছুতেই নামায ছাড়তে ইচ্ছা হচ্ছিল না।

হযরত আব্বাদ (রাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে মুরতাদদের বিরুদ্ধেও জেহাদে অংশগ্রহণ করেন এবং ভন্ড নবী মুসাইলিমার বিরুদ্ধে জিহাদ করতে গিয়ে শহীদ হন।

শিক্ষা : (১) শত্রুর আক্রমণের প্রস্তুতির কথা জানার পর চুপ করে বসে না থেকে আক্রমণ প্রতিহত করার যথাসাধ্য প্রস্তুতি নেয়া উচিত। (২) নামাযে পঠিত কুরআনের অর্থের দিকে খেয়াল রাখলে নামাযে মনোনিবেশ করা সহজ হয়।

📘 হাদীসের কিসসা > 📄 মুমিনের আতিথেয়তা

📄 মুমিনের আতিথেয়তা


একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললোঃ আমি অনাহারে আছি। রাসূল (সাঃ) তৎক্ষণাত অন্য এক ব্যক্তিকে নিজের এক স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে কিছু খাবার আনতে বললেন। কিন্তু রাসূল (সাঃ) এর ঐ স্ত্রী জানালেন যে, তাঁর কাছে পানি ছাড়া আর কিছু নেই। অতঃপর একে একে অন্য সকল স্ত্রীর কাছে খাবার চেয়ে পাঠালেন। কিন্তু প্রত্যেকের কাছ থেকে একই জবাব পেলেন যে, পানি ছাড়া আর কিছুই নেই।

অতঃপর রাসূল (সাঃ) তাঁর সাহাবীগণের কাছে জানতে চাইলেন যে, তোমাদের কারো এই ব্যক্তিকে আজকের রাতের জন্য আতিথেয়তা করার ক্ষমতা আছে কি? আনসারদের একজন বললেন: “হে রাসূল! আমি প্রস্তুত।” তিনি লোকটিকে নিয়ে নিজের পরিবারের কাছে গেলেন এবং তাঁর স্ত্রীকে বললেন: "আল্লাহর রাসূলের মেহমানকে যতন কর।" স্ত্রী বললেন: আমার ছেলেমেয়েদের খাবার ছাড়া আর কিছু নেই। সাহাবী বললেন: বেশ তো, ওদেরকে অন্য কোন বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট করে রাখ। তারপর রাতের খাবার চাইলে ঘুম পাড়িয়ে রাখ। আর আমাদের মেহমান খেতে আসলে আলো নিভিয়ে দাও এবং এরূপ ভান কর যেন আমরাও তার সাথে খাচ্ছি। অতঃপর তারা একত্রে বসলেন। কিন্তু শুধু মেহমান তৃপ্ত হয়ে আহার করলো। আর তারা উভয়ে এবং ছেলেমেয়েরা অনাহারে রাত কাটিয়ে দিলেন।

সকাল বেলা তিনি যখন রাসূল (সাঃ) এর নিকট এলেন, তখন দেখলেন, রাসূল (সাঃ) পুরো ঘটনা ওহীর মাধ্যমে জেনে ফেলেছেন। তিনি বললেনঃ তোমরা দু'জনে তোমাদের মেহমানের সাথে রাত্রে যে ব্যবহার করেছ, তাতে আল্লাহ তায়ালা মুগ্ধ হয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)

শিক্ষা: মেহমানের যত্ন করা ইসলামে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এমনকি প্রয়োজনে নিজেরা অভুক্ত থেকেও মেহমানকে আপ্যায়ন করানো উচিত।

📘 হাদীসের কিসসা > 📄 মুমিনের আত্মসংযম

📄 মুমিনের আত্মসংযম


হযরত আলী (রা)-এর একটি ঘটনা। এক যুদ্ধে তিনি এক কাফিরকে পরাস্ত করে তার বুকের ওপর চড়ে বসলেন। তিনি যখন তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে কাফিরটি হযরত আলীর মুখে থুথু নিক্ষেপ করল। হযরত আলী (রা) তৎক্ষণাৎ তাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। কাফিরটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আমাকে হত্যা না করে ছেড়ে দিলেন কেন?'
উত্তরে হযরত আলী (রা) বললেন, 'আমি এতক্ষণ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যখন তুমি আমার মুখে থুথু দিলে, তখন আমার ব্যক্তিগত ক্রোধ জাগ্রত হলো। এখন তোমাকে হত্যা করলে তা আল্লাহর জন্য হবে না, বরং আমার নিজের রাগের বশবর্তী হয়ে হবে। তাই আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম।'
এই ঘটনাটি মুমিনের আত্মসংযমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ব্যক্তিগত আবেগ ও ক্রোধকে দমন করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

📘 হাদীসের কিসসা > 📄 মুমিনের আত্মসমালোচনা

📄 মুমিনের আত্মসমালোচনা


হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলতেন, 'তোমরা নিজেদের হিসাব নিজেরা নাও, তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগে। আর নিজেদের আমল মেপে নাও, তোমাদের আমল মাপা হওয়ার আগে।'
মুমিন ব্যক্তি প্রতিদিন ঘুমানোর আগে তার সারাদিনের কাজের হিসাব নেয়। সে চিন্তা করে, আজ আমি কী কী ভালো কাজ করেছি এবং কী কী ভুল করেছি। যদি কোনো পাপ হয়ে থাকে, তবে সে তাৎক্ষণিক তওবা করে এবং ভবিষ্যতে তা না করার প্রতিজ্ঞা করে। এই আত্মসমালোচনাই মুমিনকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে অটল রাখে এবং পরকালের কঠিন হিসাবের জন্য প্রস্তুত করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00