📄 আবু জাহলের যুলুম প্রতিরোধে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)
জাহেলিয়াত যুগে আবু জাহল জনৈক ইয়াতীমের অভিভাবক ছিল। সে ঐ ইয়াতীমের পৈতৃক সম্পত্তি দেখাশুনার নামে নিজেই ভোগ দখল করতো এবং ইয়াতীমকে তার কোন অংশই দিত না। একদিন সেই ইয়াতীম বালক তার কাছে এসে পিতার পরিত্যক্ত সম্পত্তির কিছু অংশ চাইল। তার গায়ে তখন কাপড় চোপড়ও ছিল না। কিন্তু পাষন্ড আবু জাহল তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করলো না, ছেলেটি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে হতাশ হয়ে ফিরে চললো। কোরায়েশ নেতাদের কয়েকজন দুষ্টামি করে তাঁকে বললোঃ "মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কাছে যেয়ে নালিশ করে দে। সে আবু জাহলের কাছ থেকে সুপারিশ করে তোর সম্পত্তি আদায় করে দেবে।” আসলে তাদের মতলব ছিল আবু জাহলের সাথে একটা টক্কর লাগিয়ে দিয়ে রাসূল (সাঃ) কে জব্দ করা। ছেলেটি জানতোই না যে, আবু জাহলের সাথে তার সম্পর্ক কী এবং তারা কোন্ উদ্দেশ্যে তাকে এই পরামর্শ দিচ্ছে। সে সরল মনে রাসূল (সাঃ) এর কাছে হাজির হলো এবং নিজের পুরো ঘটনা বর্ণনা করলো।
রাসূল (সাঃ) তৎক্ষণাত উঠলেন এবং তাঁর কট্টর দুশমন আবু জাহলের কাছে চলে গেলেন। তাঁকে দেখে আবু জাহল স্বাগত জানালো। তিনি যখন বললেন যে, এই ছেলেটার পাওনা দিয়ে দাও, তখন সে নির্বিবাদে মেনে নিল এবং তার পাওনা দিয়ে দিল। ওদিকে কোরায়েশ নেতারা অপেক্ষায় ছিল আবু জাহল ও মুহাম্মাদের (সাঃ) মধ্যে কী কান্ড ঘটে তা জানার জন্য। তারা একটা মজার সংঘর্ষ ঘটার খবরের আশায় প্রহর গুনছিল। কিন্তু যখন পুরো ঘটনার খবর পেল, তখন অবাক হয়ে গেল এবং আবু জাহলকে এসে ভর্ৎসনা করতে লাগলো যে, সে এমন সুযোগ হাতছাড়া করলো কেন এবং সেও ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে বলে চিৎকার দিতে লাগলো। আবু জাহল তাদেরকে বললোঃ "আল্লাহর কসম, আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করিনি। কিন্তু আমি দেখতে পেলাম যেন মুহাম্মদের ডানে ও বামে এক একটা বর্শা রয়েছে, আমি তার কথামত কাজ না করলে তা আমার বুকের মধ্যে ঢুকে যাবে।”
শিক্ষা : ইয়াতীম ও দুস্থ মানুষের ওপর কেউ অত্যাচার করলে তা নীরবে বরদাশত করা উচিত নয়। সমাজের প্রভাবশালী লোকদের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা করে যুলুম প্রতিরোধের চেষ্টা করা। যালেমদের সাধারণতঃ মনোবল কম থাকে। দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে তারা প্রায়ই হার মানে। এ কাজে একাকী অগ্রসর হলেও আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার আশা করা যায়।
📄 বীরে মাউনার হৃদয় বিদারক ঘটনা
চতুর্থ হিজরীর সফর মাসে নাজদ থেকে আবু বারা নামক এক ব্যক্তি মদীনায় আগমন করলো। সে রাসূল (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করলে রাসূল তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। সে দাওয়াত গ্রহণও করলোনা, প্রত্যাখ্যানও করলোনা। সে বললোঃ হে মুহাম্মদ! আপনি আমার সাথে কিছু সংখ্যক সাহাবীকে নাজদে পাঠালে ভালো হয়। তারা সেখানে গিয়ে ইসলাম প্রচার করলে অনেকে তা গ্রহণ করতে পারে। রাসূল (সাঃ) বললেন, নাজদবাসী যে তাদের ক্ষতি করবে না তার নিশ্চয়তা কী? আবু বারা বললো, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমিই নিচ্ছি।
রাসূল (সাঃ) মুনযির বিন আমরের (রাঃ) নেতৃত্বে চল্লিশজন সাহাবীকে নাজদে পাঠিয়ে দিলেন। তারা চলতে চলতে বীরে মাউনা নামক কুয়ার কিনারায় পৌছলেন। সেখানে সবাই অবস্থান গ্রহণ করে তাদের অন্যতম সংগী হারাম ইবনে মিলহান (রাঃ) কে রাসূল্লাহর পত্রসহ এলাকার বিশিষ্ট গোত্রপতি আমের বিন তোফায়েলের কাছে পাঠালেন। আমের রাসূল (সাঃ) এর চিঠি তো পড়ে দেখলই না. অধিকন্তু দূত হারাম ইবনে মিলহানকে হত্যা করে বসলো। এরপর বাদবাকীদেরকেও হত্যা করার জন্য বনু সুলাইম গোত্রের একাংশের সাহায্য নিয়ে তাদেরকে ঘেরাও করে ফেললো। সাহাবীগণ শত্রুদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করলেন এবং একজন ব্যতীত সবাই শহীদ হয়ে গেলেন।
আমের ইবনে তুফায়েল পরবর্তীকালে লোকদের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিল' যে, আমি নিহতদের মধ্যে একজনের লাশকে আকাশে উঠে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখেছি। এই লোকটি কে? লোকেরা বললোঃ আমের ইবনে ফুহাইয়া। (হযরত আবু বকর সিদ্দীকের মুক্ত সাবেক ক্রীতদাস এবং রাসূল (সাঃ) ও আবু বকরের মদীনায় হিজরতকালীন পথ প্রদর্শক।)
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন যে, আমের ইবনে তোফায়েলের সহযোগী জাবার পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তার ইসলাম গ্রহণের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেনঃ বীরে মাউনার ঘটনার সময় আমি বর্শা দিয়ে একজন সাহাবীর দু'কাঁধের মাঝখানে যখন আঘাত করলাম এবং বর্শা যখন তার বুক ভেদ করে বেরিয়ে গেল, তখন ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্তকে সে দু'হাতে মুখে মাখাচ্ছিল আর বলছিলঃ "ফুযতু ওয়া রব্বিল কা'বা।” অর্থাৎ কা'বার প্রভুর শপথ, আমি সফল হয়েছি। একথা শুনে আমি মনে মনে বললাম, যে ব্যক্তি আমার হাতে খুন হলো তার আবার সাফল্য এল কোথেকে? পরে আমি অনেকের কাছে এ কথার মর্ম জিজ্ঞাসা করি। তারা আমাকে জানায় যে, সে নিজের শহীদ হওয়াকেই সাফল্য বলে বিশ্বাস করতো। আর এ বিশ্বাস শুধু তার একার নয়, প্রত্যেক মুমিনেরই।
শিক্ষাঃ শাহাদাত বাহ্যতঃ ব্যর্থতা মনে হলেও আসলে তা মুমিনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কুরআনে আল্লাহ বলেছেনঃ "নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। ফলে হত্যা করে ও নিহত হয়।.....আর এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় সাফল্য।” (সুরা তাওবা)
📄 মুমিনের নামায
একবার রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন যে, নাজদে দুটি গোত্র মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি কালবিলম্ব না করে সাতশো সাহাবীকে সাথে নিয়ে যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে নাজদ অভিমুখে যাত্রা করলেন। হযরত উসমান ইবনে আফফানকে তিনি মদীনায় নিজের স্থলাভিস্থিক্ত রেখে গেলেন। যথাস্থানে পৌঁছে তিনি 'যাতুর রিকা' নামক পর্বতবেষ্টিত এক উপত্যকায় শিবির স্থাপন করলেন। এ কারণে এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে 'গাযওয়ায়ে যাতুর রিকা'।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর ত্বরিত উপস্থিতির ফলে শত্রুদল এতই ঘাবড়ে গেল যে, তারা রণে ভংগ দিয়ে চতুর্দিকে পালিয়ে গেল। ফলে যুদ্ধ না করেই রাসূল (সাঃ) সসৈন্যে মদীনায় ফিরে গেলেন। তবে এই অভিযানকালে এমন একটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে যা চিরদিন মুসলমানদের জন্য শিক্ষা ও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। এই অভিযানকালে রাসূল (সাঃ)-এর তাবু পাহারা দেয়ার জন্য প্রতি রাত্রে পালাক্রমে কয়েকজন করে সাহাবীকে নিয়োগ করা হয়। যেদিন হযরত আব্বাদ (রাঃ) ও আম্মার ইবনে ইয়াসার (রাঃ) কে পাহারার কাজে নিয়োগ করা হয়, সেই দিনই ঘটে এই মর্মস্পর্শী ঘটনা।
হযরত আব্বাদ ও হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসার পরস্পরে পুরো রাতটাকে এভাবে ভাগ করে নিয়েছিলেন যে, প্রথম ভাগে পাহারার দায়িত্ব হযরত আব্বাদের ওপর এবং শেষের অংশ হযরত আম্মারের ওপর পড়লো। হযরত আব্বাদের পাহারার পালা শুরু হলো। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নফল নামাযের ভক্ত। তাই ভাবলেন, এত দীর্ঘ সময় চুপচাপ থেকে লাভ কী? সময়টা নামায পড়ে কাটিয়ে দেয়া যাক। তাই তিনি নফল নামাযের নিয়ত করে নামাযে সূরা কাহাফ পড়া শুরু করে দিলেন। ওদিকে হযরত আম্মার ঘুমিয়ে পড়লেন। হযরত আব্বাদ যখন নামাযে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সূরা পাঠরত, তখন চারদিকে গাঢ় অন্ধকার। এক কাফের সন্তর্পনে সামনে এল। সে দূর থেকে স্পষ্ট দেখতে পেল না যে কোন পাহারাদার আছে কিনা। তবে দূর থেকে হযরত আব্বাদকে একটা গাছ মনে করলো। আবার তার মনে সন্দেহ হলো যে, ওটা গাছ না হয়ে একটা মানুষও হতে পারে। তাই সে নিজের সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য তাকে লক্ষ্য করে একটা তীর ছুঁড়লো। তীর হযরত আব্বাদের পিঠে গিয়ে ঢুকলো। কিন্তু নামায ছাড়লেন না। কাফেরটি সন্দেহমুক্ত হওয়ার জন্য একে একে তিনিটে তীর ছুঁড়লো। প্রত্যেকটি তীর তার গায়ে বিদ্ধ হয়ে প্রবল রক্তপাত ঘটালো। অগত্যা বাধ্য হয়ে তিনি নামায ছেড়ে দিয়ে হযরত আম্মারকে ডেকে ঘুম থেকে জাগালেন। ইত্যবসরে তার নড়াচড়া টের পেয়ে ও কথাবার্তা শুনে শত্রু সৈন্যটি নীরবে প্রস্থান করলো। হযরত আম্মার তাকে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি প্রথম তীরের সাথে সাথেই আমাকে ডাকলেন না কেন?"
হযরত আব্বাদ বললেনঃ আমি নামাযে সূরা কাহাফ পাঠ করছিলাম। এতে এত মজা লাগছিল যে সূরা শেষ না করে কিছুতেই নামায ছাড়তে ইচ্ছা হচ্ছিল না।
হযরত আব্বাদ (রাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে মুরতাদদের বিরুদ্ধেও জেহাদে অংশগ্রহণ করেন এবং ভন্ড নবী মুসাইলিমার বিরুদ্ধে জিহাদ করতে গিয়ে শহীদ হন।
শিক্ষা : (১) শত্রুর আক্রমণের প্রস্তুতির কথা জানার পর চুপ করে বসে না থেকে আক্রমণ প্রতিহত করার যথাসাধ্য প্রস্তুতি নেয়া উচিত। (২) নামাযে পঠিত কুরআনের অর্থের দিকে খেয়াল রাখলে নামাযে মনোনিবেশ করা সহজ হয়।
📄 মুমিনের আতিথেয়তা
একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললোঃ আমি অনাহারে আছি। রাসূল (সাঃ) তৎক্ষণাত অন্য এক ব্যক্তিকে নিজের এক স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে কিছু খাবার আনতে বললেন। কিন্তু রাসূল (সাঃ) এর ঐ স্ত্রী জানালেন যে, তাঁর কাছে পানি ছাড়া আর কিছু নেই। অতঃপর একে একে অন্য সকল স্ত্রীর কাছে খাবার চেয়ে পাঠালেন। কিন্তু প্রত্যেকের কাছ থেকে একই জবাব পেলেন যে, পানি ছাড়া আর কিছুই নেই।
অতঃপর রাসূল (সাঃ) তাঁর সাহাবীগণের কাছে জানতে চাইলেন যে, তোমাদের কারো এই ব্যক্তিকে আজকের রাতের জন্য আতিথেয়তা করার ক্ষমতা আছে কি? আনসারদের একজন বললেন: “হে রাসূল! আমি প্রস্তুত।” তিনি লোকটিকে নিয়ে নিজের পরিবারের কাছে গেলেন এবং তাঁর স্ত্রীকে বললেন: "আল্লাহর রাসূলের মেহমানকে যতন কর।" স্ত্রী বললেন: আমার ছেলেমেয়েদের খাবার ছাড়া আর কিছু নেই। সাহাবী বললেন: বেশ তো, ওদেরকে অন্য কোন বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট করে রাখ। তারপর রাতের খাবার চাইলে ঘুম পাড়িয়ে রাখ। আর আমাদের মেহমান খেতে আসলে আলো নিভিয়ে দাও এবং এরূপ ভান কর যেন আমরাও তার সাথে খাচ্ছি। অতঃপর তারা একত্রে বসলেন। কিন্তু শুধু মেহমান তৃপ্ত হয়ে আহার করলো। আর তারা উভয়ে এবং ছেলেমেয়েরা অনাহারে রাত কাটিয়ে দিলেন।
সকাল বেলা তিনি যখন রাসূল (সাঃ) এর নিকট এলেন, তখন দেখলেন, রাসূল (সাঃ) পুরো ঘটনা ওহীর মাধ্যমে জেনে ফেলেছেন। তিনি বললেনঃ তোমরা দু'জনে তোমাদের মেহমানের সাথে রাত্রে যে ব্যবহার করেছ, তাতে আল্লাহ তায়ালা মুগ্ধ হয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)
শিক্ষা: মেহমানের যত্ন করা ইসলামে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এমনকি প্রয়োজনে নিজেরা অভুক্ত থেকেও মেহমানকে আপ্যায়ন করানো উচিত।