📄 সুরাকার বিবেক জেগে উঠলো
সুরাকা ইবনে মালেক। কুরাইশ বংশের এক দুঃসাহসী যুবক। রাসূল (সাঃ) যেদিন হযরত আলীকে বিছানায় শুইয়ে রেখে হযরত আবু বকর (রাঃ) কে সাথে নিয়ে মদীনায় হিজরত করার জন্য মক্কা থেকে বেরুলেন, সেই দিনই কুরাইশ নেতারা ঘোষণা দিল যে, মুহাম্মদকে যে ব্যক্তি খুঁজে ধরে আনতে পারবে, তাকে একশো উট পুরস্কার দেয়া হবে। এই পুরস্কার লাভের নেশায় চারদিকে ঘোড়া ছুটাতে লাগালো দুর্ধর্ষ যুবক সুরাকা ইবনে মালেক এবং আরো অনেকে। রাসূল (সাঃ) ও আবু বকর (রাঃ) দিন কয়েক মক্কায় পার্শ্ববর্তী সূর পর্বত গুহায় কাটিয়েছিলেন। সে সময় অনেকেই তাদের ঘোড়ার পদচিহ্ন ধরে সুর পর্বত গুহার কাছে গিয়েছিল। কিন্তু গুহার মুখে আল্লাহ নিযুক্ত রক্ষী মাকড়সা জাল বুনে তাদের গতি রুখে দেয়। সবাই মনে করলো যে, তারা এই গুহার ভেতরে থাকলে মাকড়সার জাল ছিঁড়ে যেত। অগত্যা সবাই ওখান থেকে ফিরে যায়। এর পর মুহাম্মদ (সাঃ) ও আবু বকর (রাঃ) কে খোঁজার চেষ্টা থেকে সুরাকা ছাড়া আর সবাই বিরত হয়। একা সুরাকা মক্কার চারপাশের মরুভূমিতে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে।
যেদিন আল্লাহর হুকুমে হযরত আবু বকরকে সাথে নিয়ে রাসূল (সাঃ) সুর পর্বত গুহা থেকে বেরিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। সেদিন সহসা সূরাকার নজরে পড়ে গেলেন। তারা দু'জন যাচ্ছিলেন উটের পিঠে সওয়ার হয়ে। তাই সূরাকা ঘোড়া ছুটিয়ে খুব দ্রুত তাদের কাছে পৌছে গেল। পেছনে ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনে উভয়ে চমকে উঠলেন। দেখলেন পেছনে অতি নিকটেই যমদূতের মত ছুটে আসছে সূরাকা ইবনে মালেক। হযরত আবু বকর যিনি সুর পর্বতের গুহায় বসেও এক একবার কাফেরদের পদ শব্দে চমকে উঠে রাসূল (সাঃ) কে নিজের অজানা আশংকার কথা জানাচ্ছিলেন, তখন রাসূল (সাঃ) তাকে এই বলে প্রবোধ দিচ্ছিলেন যে, "আবু বকর চিন্তা করোনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” সেই প্রবোধ বাক্যে আবু বকর শান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন? সে সময় আর যা হোক, কাফেররা তাঁদেরকে সাক্ষাত দেখতে পায়নি। কিন্তু এখন কী হবে? এখন যে শত্রু তাদেরকে সরাসরি দেখতে পাচ্ছে, দিনের আলোয় দেখে চিনতেও পারবে এবং ঘোড়সওয়ারের পক্ষে উষ্ট্রারোহীকে ধরা একবারেই সহজ। ওদিকে সূরাকা বিকট শব্দে শাসাচ্ছে আর বলছে, আবু বকর, এখন তোমাদের আর নিস্তার নেই। ছুটাছুটি করে লাভ নেই। থামো। রাসূল (সাঃ) আবু বকরের বিহ্বল অবস্থা দেখে আবারও তাকে শান্ত হতে বললেন এবং বললেন "ভয় পেয়োনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন"।
আবু বকর যতটা দ্রুত সম্ভব উটকে হাঁকাতে লাগলেন। ওদিকে সূরাকা যখন একেবারে তাদের কাছে এসে পড়লো, অমনি ঘটে গেল এক অভাবনীয় ঘটনা। সূরাকার ঘোড়ার পা হাঁটু সমান মাটিতে ডেবে গেল। সূরাকা অনেক চেষ্টা করে তাকে ওঠালো। ইত্যবসরে রাসূল (সাঃ) ও আবু বকর আরো বেশ খানিকটা দূরে চলে গেলেন। সূরাকা আবার প্রবল জোরে ঘোড়া হাঁকালো। আবার কাছে এসে গেল। কিন্তু আবার সেই একই ঘটনা ঘটলো। আবারো সূরাকার ঘোড়ার পা হাঁটু সমান মাটিতে ডেবে গেল। সূরাকা আবার তাকে ওঠালো এবং আবারো হাঁকিয়ে কাছে গেল। আবারো একই ঘটনা ঘটলো। এভাবে ক্রমাগত কয়েকবার ঘটার পর সূরাকার বিবেক জেগে উঠলো। সে আর তাদের পদানুসরণ না করে ফিরে গেল আবু জাহলের কাছে। তখন আবু জাহলের নাম ছিল "আবুল হিকাম” অর্থাৎ বুদ্ধিমান বা প্রাজ্ঞ। আবু জাহল যখন তাকে তার অভিযান সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলো। সে একটি কবিতার মাধ্যমে পুরো ঘটনা বিবৃত করলো। কবিতাটির প্রথম কয়টি লাইন এরূপঃ “ওহে আবুল হিকাম, তুমি যদি আমার ঘোড়ার অবস্থা স্বচোখে দেখতে যে, কিভাবে তার পাগুলো মাটিতে দেবে যাচ্ছিল, তাহলে তুমি অবাক হতে এবং তোমার কোন সন্দেহ থাকতোনা যে, মুহাম্মদ (সাঃ) একজন নবী ও পথ প্রদর্শক, তাঁর মোকাবিলা করার ক্ষমতা কারো নেই।"
যতদূর জানা যায়, সূরাকা এরপর ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু নিজের মুসলমান হওয়ার কথা গোপন রাখেন এবং মক্কাতেই অবস্থান করেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি রাসূল (সাঃ) এর সাথে দেখা করেন এবং প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন।
শিক্ষাঃ সত্যকে উপলব্ধি করার পর সত্যের বিরোধীতা থেকে বিরত হলে আল্লাহর গযব থেকে রক্ষা পাওয়া ও হেদায়াত লাভ করার আশা করা যায়।
📄 হযরত খুবাইবের শাহাদাত
ওহুদ যুদ্ধের পর আফল ও কারাহ গোত্রের একদল লোক রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এসে বললোঃ হে রাসূল! আমাদের গোত্রে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই আপনার সাহাবীদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন। তারা আমাদেরকে কুরআন পড়াবেন এবং ইসলামের বিধিসমূহ শিখাবেন। রাসূল (সাঃ) তাদের কথামত সরল বিশ্বাসে আসেম ইবনে সাবেত, খুবাইব ইবনে আদী ও যায়েদ ইবনে দাখিনা সহ ছয়জন মতান্তরে দশজন সাহাবীকে পাঠিয়ে দিলেন। তারা মক্কা ও উসফানের মধ্যবর্তী হুদাত নামক স্থানে পৌছালে আযল ও কারাহ গোত্রের লোকেরা বিশ্বাস ঘাতকতা করে তরবারী সজ্জিত হয়ে সাহাবীদেরকে ঘেরাও করে ফেললো। সাহাবীগণ শত্রুদের এই আকস্মিক বিশ্বাস ঘাতকতায় হতবাক হলেও ঘাবড়ালেন না। তারা তাৎক্ষণিকভাবে তরবারী হাতে নিয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। শত্রুরা বললোঃ তোমরা নেমে এস। আল্লাহর কসম, আমরা তোমাদেরকে হত্যা করবো না।
আসেমসহ তিনজন তাদের এই প্রতিশ্রুতি অগ্রাহ্য করলেন। তারা বললেন, বিশ্বাসঘাতক কাফেরদের ওয়াদায় বিশ্বাস করা যায় না। তারা লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। শহীদ হবার পূর্বে তিনি দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ! আমাদের খবর রাসূল (সাঃ) কে জানিয়ে দিও।"
আসেমের শাহাদাতের পর শত্রুরা তার মাথা কেটে নিতে চাইল। ওহুদ যুদ্ধে তাদের দু'জন আসেমের হাতে নিহত হয়েছিল। তাই তারা প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, আসেমের মাথার খুলিতে মদ খাবে। কিন্তু এক ঝাঁক বোলতা এমনভাবে আসেমের মাথাটা ঘিরে রাখলো যে, তারা তার মাথা বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হলো না। কারণ মৃত্যুর পূর্বে তিনি এই দোয়াও করেছিলেন যে, কোন কাফের যেন তার দেহকে স্পর্শ করতে না পারে।
এরপর যায়েদ ইবনে দাখিনা, খুবাইব ইবনে আদী ও আব্দুল্লাহ ইবনে তারিক কিছুটা নমনীয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং শত্রুদের কাছে আত্মসমর্পন করলেন। তারা তাদেরকে বন্দী করে মক্কায় নিয়ে চললো। পথিমধ্যে হাজরানে গিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে তারিক রশি খুলে তরবারী নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। শত্রুরা তাকে পাথর মেরেই শহীদ করে ফেললো। অবশিষ্ট খুবাইব ও যায়েদকে তারা মক্কায় নিয়ে কুরায়েশদের কাছে বিক্রি করে দিল।
অতঃপর কুরায়েশরা খুবাইব ও যায়েদকে বদর ও ওহুদের প্রতিশোধ স্বরূপ হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। যায়েদকে হত্যা করার আগে আবু সুফিয়ান জিজ্ঞাসা করলো: হে যায়েদ। বল, তোমার জায়গায় যদি মুহাম্মদ থাকতো, তোমার পরিবর্তে আমরা তাকে হত্যা করতাম এবং তুমি নিরাপদে বাড়ী চলে যেতে, তাহলে কেমন হতো? যায়েদ বললেন, আল্লাহর কসম, 'তাঁর গায়ে একটা কাটাও যদি ফোটে, তবে আমি নিজের মুক্তির বিনিময়েও তা সহ্য করবো না। একথা শুনে আবু সুফিয়ান বললোঃ "মুহাম্মদের সংগীরা তাকে যেমন ভালোবাসে, এমন ভালোবাসতে আমি আর কাউকে দেখিনি।" অতঃপর তাকে শহীদ করে দেয়া হয়।
সবার শেষে খুবাইবের পালা। পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কুরাইশদের এমন এক দাসী মাবিয়া বলেনঃ খুবাইব আমার কাছে আমার একটি ঘরে বন্দী ছিলেন। আমি একদিন তার কাছে গেলাম। দেখলাম, বিরাট এক থোকা আঙ্গুর তার হাতে। তিনি তা থেকে আঙ্গুর ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছেন। অথচ ঐ সময় দেশের কোথাও আঙ্গুর ছিল না। হত্যার পূর্বে খুবাইব আমার কাছে একটা ক্ষুর চাইলেন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হবার জন্য। একটি ছেলের হাতে আমি ক্ষুর পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।
এরপর কাফেররা খুবাইবকে নিয়ে তানঈমে গেল। হত্যার পূর্বে তিনি তাদের কাছে দু'রাকাত নামায পড়ার অনুমতি চাইলে তারা অনুমতি দিল। খুবাইব সংক্ষেপে দু'রাকাত নামায পড়ে বললেনঃ তোমরা হয়তো ভাববে, আমি মৃত্যুর ভয়ে নামায লম্বা করছি। তা না হলে আরো লম্বা নামায পড়তাম। সেই থেকে শাহাদাতের পূর্বে সুযোগ পেলে দু'রাকাত নামায পড়া মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে গেছে।
এরপর তারা তাকে শূলে চড়ালো। শূলে চড়ার পূর্ব মুহূর্তে তিনি দোয়া করলেনঃ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার রাসূলের দাওয়াত পৌছে দিয়েছি। তবুও আমাদের সাথে এরা যে আচরণ করলো, সে খবর রাসূলের কাছে পৌঁছে দাও। হে আল্লাহ! এদের সকলকে গুণে গুণে এক এক করে খতম করে দিও। কাউকে রেহাই দিওনা।
শাহাদাতের পূর্বে খুবাইব একটি কবিতাও আবৃত্তি করেছিলেন। তার কয়েকটি লাইনের অনুবাদ নিম্নরূপঃ
"আমি যখন মুসলমান অবস্থায় নিহত হই, তখন কোন্ দিকে শুইয়ে আমাকে হত্যা করা হয়, তার আমি কোন পরোয়া করিনা। ওহে আরশের অধিপতি, আমার প্রতি তাদের যে অভিপ্রায়, তাতে আমাকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা দাও। তারা আমার গোশত টুকরো টুকরো করার সংকল্প করেছে। তখন আমার জীবনের আর কোন আশা নেই। এ সব তো আল্লাহরই উদ্দেশ্যে, তিনি চাইলে আমার ছিন্ন ভিন্ন দেহেও বরকত দিতে পারেন। তারা আমাকে কুফরী কিংবা মৃত্যু- এর যে কোন একটি বেছে নিতে বলেছে। আমার দু'চোখে যে অশ্রু বয়ে যাচ্ছে, তা মৃত্যুর ভয়ে নয় বরং আল্লাহর ভয়ে বইছে। আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। আমাকে মরতে তো একদিন হবেই। আমি কেবল জাহান্নামের লেলিহান শিখাকে ভয় করি। আমি শত্রুর সামনে কোন দুর্বলতা ও অস্থিরতা প্রকাশ করবো না। কেননা আল্লাহর কাছেই আমার প্রত্যাবর্তন।” এরপর তারা খুবাইবকে হত্যা করে।
শিক্ষাঃ হযরত খুবাইবের শাহাদাত আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকারীদের জন্য অত্যন্ত শিক্ষনীয় ও প্রেরণাদায়ক একটি ঘটনা। এমন লোমহর্ষক নির্যাতন ও হত্যার মুখে অবিচল থাকা অত্যন্ত মজুত ঈমানের পরিচায়ক যা আল্লাহর রহমত ছাড়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এই ঘটনার আরো একটি শিক্ষা এই যে, ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের শত্রুর দুরভিসন্ধি, চক্রান্ত ও ধাপ্পাবাজী সম্পর্কে সাবধান হতে হবে। আল্লাহর রাসূলের জীবদ্দশায় এরূপ ঘটনা ঘটিয়ে আল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
📄 আবু জাহলের যুলুম প্রতিরোধে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)
জাহেলিয়াত যুগে আবু জাহল জনৈক ইয়াতীমের অভিভাবক ছিল। সে ঐ ইয়াতীমের পৈতৃক সম্পত্তি দেখাশুনার নামে নিজেই ভোগ দখল করতো এবং ইয়াতীমকে তার কোন অংশই দিত না। একদিন সেই ইয়াতীম বালক তার কাছে এসে পিতার পরিত্যক্ত সম্পত্তির কিছু অংশ চাইল। তার গায়ে তখন কাপড় চোপড়ও ছিল না। কিন্তু পাষন্ড আবু জাহল তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করলো না, ছেলেটি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে হতাশ হয়ে ফিরে চললো। কোরায়েশ নেতাদের কয়েকজন দুষ্টামি করে তাঁকে বললোঃ "মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কাছে যেয়ে নালিশ করে দে। সে আবু জাহলের কাছ থেকে সুপারিশ করে তোর সম্পত্তি আদায় করে দেবে।” আসলে তাদের মতলব ছিল আবু জাহলের সাথে একটা টক্কর লাগিয়ে দিয়ে রাসূল (সাঃ) কে জব্দ করা। ছেলেটি জানতোই না যে, আবু জাহলের সাথে তার সম্পর্ক কী এবং তারা কোন্ উদ্দেশ্যে তাকে এই পরামর্শ দিচ্ছে। সে সরল মনে রাসূল (সাঃ) এর কাছে হাজির হলো এবং নিজের পুরো ঘটনা বর্ণনা করলো।
রাসূল (সাঃ) তৎক্ষণাত উঠলেন এবং তাঁর কট্টর দুশমন আবু জাহলের কাছে চলে গেলেন। তাঁকে দেখে আবু জাহল স্বাগত জানালো। তিনি যখন বললেন যে, এই ছেলেটার পাওনা দিয়ে দাও, তখন সে নির্বিবাদে মেনে নিল এবং তার পাওনা দিয়ে দিল। ওদিকে কোরায়েশ নেতারা অপেক্ষায় ছিল আবু জাহল ও মুহাম্মাদের (সাঃ) মধ্যে কী কান্ড ঘটে তা জানার জন্য। তারা একটা মজার সংঘর্ষ ঘটার খবরের আশায় প্রহর গুনছিল। কিন্তু যখন পুরো ঘটনার খবর পেল, তখন অবাক হয়ে গেল এবং আবু জাহলকে এসে ভর্ৎসনা করতে লাগলো যে, সে এমন সুযোগ হাতছাড়া করলো কেন এবং সেও ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে বলে চিৎকার দিতে লাগলো। আবু জাহল তাদেরকে বললোঃ "আল্লাহর কসম, আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করিনি। কিন্তু আমি দেখতে পেলাম যেন মুহাম্মদের ডানে ও বামে এক একটা বর্শা রয়েছে, আমি তার কথামত কাজ না করলে তা আমার বুকের মধ্যে ঢুকে যাবে।”
শিক্ষা : ইয়াতীম ও দুস্থ মানুষের ওপর কেউ অত্যাচার করলে তা নীরবে বরদাশত করা উচিত নয়। সমাজের প্রভাবশালী লোকদের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা করে যুলুম প্রতিরোধের চেষ্টা করা। যালেমদের সাধারণতঃ মনোবল কম থাকে। দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে তারা প্রায়ই হার মানে। এ কাজে একাকী অগ্রসর হলেও আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার আশা করা যায়।
📄 বীরে মাউনার হৃদয় বিদারক ঘটনা
চতুর্থ হিজরীর সফর মাসে নাজদ থেকে আবু বারা নামক এক ব্যক্তি মদীনায় আগমন করলো। সে রাসূল (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করলে রাসূল তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। সে দাওয়াত গ্রহণও করলোনা, প্রত্যাখ্যানও করলোনা। সে বললোঃ হে মুহাম্মদ! আপনি আমার সাথে কিছু সংখ্যক সাহাবীকে নাজদে পাঠালে ভালো হয়। তারা সেখানে গিয়ে ইসলাম প্রচার করলে অনেকে তা গ্রহণ করতে পারে। রাসূল (সাঃ) বললেন, নাজদবাসী যে তাদের ক্ষতি করবে না তার নিশ্চয়তা কী? আবু বারা বললো, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমিই নিচ্ছি।
রাসূল (সাঃ) মুনযির বিন আমরের (রাঃ) নেতৃত্বে চল্লিশজন সাহাবীকে নাজদে পাঠিয়ে দিলেন। তারা চলতে চলতে বীরে মাউনা নামক কুয়ার কিনারায় পৌছলেন। সেখানে সবাই অবস্থান গ্রহণ করে তাদের অন্যতম সংগী হারাম ইবনে মিলহান (রাঃ) কে রাসূল্লাহর পত্রসহ এলাকার বিশিষ্ট গোত্রপতি আমের বিন তোফায়েলের কাছে পাঠালেন। আমের রাসূল (সাঃ) এর চিঠি তো পড়ে দেখলই না. অধিকন্তু দূত হারাম ইবনে মিলহানকে হত্যা করে বসলো। এরপর বাদবাকীদেরকেও হত্যা করার জন্য বনু সুলাইম গোত্রের একাংশের সাহায্য নিয়ে তাদেরকে ঘেরাও করে ফেললো। সাহাবীগণ শত্রুদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করলেন এবং একজন ব্যতীত সবাই শহীদ হয়ে গেলেন।
আমের ইবনে তুফায়েল পরবর্তীকালে লোকদের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিল' যে, আমি নিহতদের মধ্যে একজনের লাশকে আকাশে উঠে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখেছি। এই লোকটি কে? লোকেরা বললোঃ আমের ইবনে ফুহাইয়া। (হযরত আবু বকর সিদ্দীকের মুক্ত সাবেক ক্রীতদাস এবং রাসূল (সাঃ) ও আবু বকরের মদীনায় হিজরতকালীন পথ প্রদর্শক।)
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন যে, আমের ইবনে তোফায়েলের সহযোগী জাবার পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তার ইসলাম গ্রহণের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেনঃ বীরে মাউনার ঘটনার সময় আমি বর্শা দিয়ে একজন সাহাবীর দু'কাঁধের মাঝখানে যখন আঘাত করলাম এবং বর্শা যখন তার বুক ভেদ করে বেরিয়ে গেল, তখন ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্তকে সে দু'হাতে মুখে মাখাচ্ছিল আর বলছিলঃ "ফুযতু ওয়া রব্বিল কা'বা।” অর্থাৎ কা'বার প্রভুর শপথ, আমি সফল হয়েছি। একথা শুনে আমি মনে মনে বললাম, যে ব্যক্তি আমার হাতে খুন হলো তার আবার সাফল্য এল কোথেকে? পরে আমি অনেকের কাছে এ কথার মর্ম জিজ্ঞাসা করি। তারা আমাকে জানায় যে, সে নিজের শহীদ হওয়াকেই সাফল্য বলে বিশ্বাস করতো। আর এ বিশ্বাস শুধু তার একার নয়, প্রত্যেক মুমিনেরই।
শিক্ষাঃ শাহাদাত বাহ্যতঃ ব্যর্থতা মনে হলেও আসলে তা মুমিনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কুরআনে আল্লাহ বলেছেনঃ "নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। ফলে হত্যা করে ও নিহত হয়।.....আর এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় সাফল্য।” (সুরা তাওবা)