📄 হযরত সালমান ফারসীর ইসলাম গ্রহণ
হযরত সালমান ফারসী প্রথম জীবনে একজন অগ্নি উপাসক ছিলেন। পরে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং সর্বশেষে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি পারস্যের ইসফাহান প্রদেশের অধিবাসী ছিলেন। তার পিতা ছিলেন একজন বিত্তশালী গ্রাম্য মোড়ল। তিনি তাকে এত বেশী স্নেহ করতেন যে, তাকে বাড়ী থেকে কোথাও যেতে দিতেন না। তিনি জানান যে, এই সময়ে তিনি অগ্নি উপাসকদের ধর্মে গভীর দক্ষতা অর্জন করেন। এক মুহুর্তের জন্যও যাতে আগুন নিভতে না পারে- এভাবে কুন্ডলী জ্বালিয়ে রাখতে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এ সময়ে ঘটনাক্রমে একটি জমি দেখাশুনার দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত হয়। সেই জমি দেখতে তিনি পিতার অনুমতিক্রমে বাড়ীর বাইরে যাওয়া আসা করতে লাগলেন। এই সময় তার যাওয়া আসার পথের পাশে একটি খৃস্টান গীর্জা তার নজরে পড়ে। লোকজনের হৈ চৈ শুনে কৌতুহলে বশতঃ তিনি সেই গীর্জার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সেখানে তাদের উপাসনা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান এবং মনে মনে বলেন, অগ্নি উপাসকদের ধর্মের চেয়ে এই ধর্ম অনেক ভাল। ঐ দিন তার আর জমি দেখতে যাওয়া হলো না। তিনি সারাদিন গীর্জায় কাটিয়ে দিলেন। গীর্জার লোকদের কাছে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, এই ধর্মের উৎস কোথায়? তারা জানালো যে, সিরিয়ায়। এরপর তিনি তাঁর পিতার কাজে ফিরে গেলেন? তাঁর পিতা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি সারাদিন কোথায় ছিলে? সালমান গীর্জার ঘটনা খুলে বলেদিলেন। সেই সাথে এ কথাও বললেন যে, ঐ ধর্ম তার কাছে ভালো লেগেছে। এতে তিনি তাঁকে নিয়ে ভীত হয়ে পড়লেন এবং তাঁর পায়ে শিকল পরিয়ে দিলেন। এই সময় সালমান গোপনে গীর্জায় খৃস্টানদের নিকট খবর পাঠান যে, আপনাদের কাছে সিরিয়া থেকে কোন কাফেলা এলে আমাকে জানাবেন। কিছুদিন পর সিরিয়া থেকে একটা কাফেলা এল। তারা যথাসময়ে সালমানকে সে খবর জানালো। সালমান বলে পাঠালেন যে, এই কাফেলার কাজ যখন শেষ হবে এবং তারা সিরিয়ায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেবে, তখন আমাকে জানাবেন। তারপর কাফেলার কাজ শেষে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করলে তা সালমানকে জানানো হলো। সালমান তৎক্ষণাত স্বীয় পিতার স্নেহের শিকল ভেংগে গোপনে তাদের সাথে সিরিয়ায় চলে গেলেন। সিরিয়ায় গিয়ে তিনি লোকদের কাছে জিজ্ঞাসা করলেনঃ এই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী কে? তারা তাকে জানালো যে, গীর্জার পাদ্রীই সবচেয়ে জ্ঞানী।
সালমান পাদ্রীর নিকট হাজির হয়ে বললেনঃ আমি এই ধর্মের প্রতি আগ্রহী। আমি আপনার সহচর হয়ে আপনার সেবা করতে চাই এবং আপনার কাছে থেকে ধর্ম শিখতে ও উপাসনা করতে চাই। পাদ্রী সালমানকে স্বীয় গীর্জায় থাকতে দিলেন এবং সালমান খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষা নিতে লাগলেন। এই সময় সালমান বুঝতে পারলেন যে, উক্ত পাদ্রী খুবই অসৎ। সে জনসাধারণের কাছ থেকে ছদকা আদায় করে এবং তা গরীবদের মধ্যে বিতরণ না করে নিজে আত্মসাৎ করে। এভাবে সে বিপুল সম্পদ সঞ্চয় করে। সালমান এরপর থেকে তাকে ঘৃণা করতে লাগলেন এবং ঐ স্থান ত্যাগ করার সুযোগ খুঁজতে লাগলেন।
এই পাদ্রী মারা গেলে খৃস্টানরা তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য সমবেত হলো। সালমান তাদেরকে বললেনঃ এই লোকটি চরম দুর্নীতিবাজ ছিল। সে তোমাদেরকে ছদকা দিতে উপদেশ দিত। কিন্তু নিজে তোমাদের দেয়া ছদকাগুলো আত্মসাৎ করতো। তারা সালমানকে বললোঃ তোমার এ সব অভিযোগ যে সত্য, তার প্রমাণ কী? তিনি এর প্রমাণ স্বরূপ তার জমা করা সাতটা সোনা রূপা ভর্তি কলসি বের করে দেখালেন। তা দেখে সমবেত জনতা ক্রুদ্ধ স্বরে বললোঃ আমরা এ নরাধমকে কবর দেব না। তারপর লাশকে তারা শূলে চড়ালো। তার ওপর পাথর ছুঁড়লো এবং তারপর একজন নতুন যাজক নিয়োগ করলো।
নতুন যাজক ছিল একজন নিরেট সৎ লোক। পৃথিবীর ধন-সম্পদের প্রতি তার কোন লালসা ছিল না। সালমান কিছুদিন তার কাছে থাকলেন। তারপর তার মৃত্যু কাছাকাছি হলে সালমান তাকে বললেনঃ জনাব, আমি তো এতদিন এখানে কাটালাম। এখন আপনার পর আমি কোথায় কার কাছে যাবো বলে দিন।
তিনি বললেনঃ বাবা! আমি যতটা খাঁটি ধর্মের অনুসারী ছিলাম, এখন তেমন আর কাউকে দেখি না। ভালো লোকেরা সব পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। এখন যারা আছে, তাদের অধিকাংশই ধর্মকে খানিকটা বিকৃত করেছে, আর খানিকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। তবে মুসেলে একজন আছে খাঁটি ধর্মের অনুসারী। তুমি তার কাছে চলে যাও।
সালমান মুসেলের যাজকের কাছে গেলেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর তিনিও মারা গেলেন। মারা যাওয়ার আগে তাকে নাসিবাইনের এক ব্যক্তির সন্ধান দিয়ে গেলেন। অতঃপর সালমান নাসিবাইনে গেলেন। সেখানকার পাদ্রীর কাছে কিছুদিন থাকার পর তিনিও মারা গেলেন। মারা যাওয়ার সময় আম্মুরিয়ার আর একজন যাজকের সন্ধান দিয়ে গেলেন। সালমান আম্মুরিয়ায় চলে গেলেন।
আম্মুরিয়ায় কিছুদিন থাকার পর সেখানকার যাজকও মারা গেলেন। মৃত্যুর প্রাক্কালে সালমান তার কাছে একজন সৎ যাজকের সন্ধান চাইলে তিনি বললেনঃ এখন আর আমার জানামতে সঠিক ধর্মের অনুসারী কোন যাজক পৃথিবীতে জীবিত নেই। তবে একজন নতুন নবীর আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তিনি ইবরাহীম (আঃ) এর দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। তিনি আরব ভূমিতে আবির্ভূত হবেন এবং দুই মরুর মাঝে খেজুরের বাগানে পরিপূর্ণ জায়গায় হিজরত করবেন। তিনি হাদিয়া নেবেন। কিন্তু ছদকা গ্রহণ করবেন না। তার দুই কাঁধের মাঝে নবুয়তের সীল থাকবে। তুমি যদি সেই দেশে যেতে পার তবে যেও।
আম্মুরিয়ায় হযরত সালমান অনেক ছাগল ভেড়া পুষতেন। তারই এক পাল ছাগল ভেড়া একদল আরব বণিককে দিয়ে তাদের সাথে তিনি আম্মুরিয়া থেকে আরব চলে গেলেন। ওয়াদিল কুরাতে তারা তাকে এক ইহুদীর নিকট বিক্রী করে দিল। সালমান এই ইহুদীর খেজুরের বাগানে কাজ করতে লাগলেন। ঐ খেজুরের বাগান দেখে তিনি ভেবেছিলেন, এটাই সেই আখেরী নবীর আবির্ভাব স্থান। তাই তিনি ইহুদীর কাছেই থাকতে লাগলেন।
হযরত সালমান বলেনঃ "এই সময় একদিন মদীনা থেকে আমার ইহুদী মনিবের এক আত্মীয় এল। বনু কুরায়যা গোত্রীয় ঐ ইহুদী আমাকে কিনে নিয়ে মদীনায় চলে গেল। মদীনাকে দেখেই আমি চিনতে পারলাম যেন ওটা অবিকল আমার আম্মুরিয়ার ওস্তাদের বর্ণিত জায়গা। তাই আমি ওখানেই থাকে লাগলাম। এই সময় মক্কায় রাসূল (সাঃ) নবুয়ত লাভ করেছেন বলে শুনলাম। তবে তার সম্পর্কে বিস্তারিত খবরাখবর জানতে পারলাম না। কিছুদিন পর তিনি মদীনায় হিজরত করে আসলেন।
একদিন আমি খেজুর ভর্তি গাছের মাথায় চড়ে আমার মনিবের জন্য কিছু কাজ করছি। মনিব তখন আমার নিচে বসা ছিলেন। সহসা তার এক চাচাতো ভাই এসে তাকে বললোঃ আল্লাহ কায়লার বংশধরকে ধ্বংস করুন। (আওস ও খাজরাজ এই দুই গোত্রের মায়ের নাম কায়লা। তাই কায়লার বংশধর বলতে ঐ দুই গোত্রকে বুঝানো হয়েছে।) ওরা এখন মক্কা থেকে আগত এক ব্যক্তির চারপাশে ভিড় জমিয়েছে। লোকটি আজই এসেছে। আওস ও খাজরাজ মনে করে সে নাকি এ যুগের নবী এবং সর্বশেষ নবী। হযরত সালমান বলেনঃ খেজুর গাছের ওপরে বসে আমি যখন এ খবর শুনলাম, তখন আনন্দে ও উত্তেজনায় এত বেসামাল হয়ে গিয়েছিলাম যে, আমি মনিবের ঘাড়ের ওপর পড়ে যাবো বলে আশংকা হচ্ছিল। অনেক কষ্টে ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে এসে ঐ লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম যে, আপনি কার কথা যেন বলছিলেন? অমনি আমার মনিব আমাকে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল। সে বললোঃ তোর তা দিয়ে কি দরকার? আমি বললামঃ কিছু না, কৌতুহল বশতঃ জিজ্ঞেস করেছিলাম।
হযরত সালমান বলেনঃ এরপর আমি নিজের কাছে সঞ্চিত কিছু খাবার জিনিস নিয়ে সন্ধ্যা বেলায় গোপনে কুবাতে রাসূল (সাঃ) এর কাছে উপস্থিত হলাম। তাকে বললামঃ আমি শুনেছি, আপনার সাথে অনেক দরিদ্র লোক রয়েছে। তাদের জন্য আমি কিছু ছদকা এনেছি। এই বলে উক্ত খাদ্য হাযির করলে তিনি সাহাবীদেরকে তা খেতে বললেন। কিন্তু নিজে খেলেন না। তখন আমি মনে মনে বললামঃ আম্মুরিয়ার যাজক যে তিনটে আলামতের কথা বলেছে, তার একটি পেয়ে গেলাম। অতঃপর আমি সেদিনকার মত চলে এলাম।
আর একদিন আরো কিছু খাবার নিয়ে তা হাদিয়া হিসাবে পেশ করলাম। রাসূল (সাঃ) তা নিজেও খেলেন এবং অন্যদেরকেও খাওয়ালেন। এরপর আমি দ্বিতীয় আলামতটিও পেয়ে গেলাম।
এরপর যখন তিনি বাকীউল গারকাদ নামক কবরস্থানে তাঁর জনৈক সাহাবীর দাফন সম্পন্ন করে ফিরে আসছিলেন, তখন আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম। সেই সময় রাসূল (সাঃ) এর গায়ে ঢিলেঢালা পোশাক ছিল। আমি নবুয়তের মোহরটি দেখার জন্য তার ঘাড়ের ওপর চোখ বুলাতে লাগলাম। রাসূল (সাঃ) আমার চাহনির হাবভাব দেখে বুঝে ফেললেন এবং তাঁর পিঠের ওপর থেকে চাদর উঠিয়ে ফেলে দিলেন। আমি তখন নবুয়তের মোহর দেখে চিনতে পারলাম। আমি মোহরটিতে চুমু খাওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়লাম এবং কাঁদতে লাগলাম। রাসূল (সাঃ) আমাকে বললেনঃ সামনে এস। আমি সামনে গিয়ে বসে পড়লাম। অতঃপর অতীতের সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম।
এরপর রাসূল (সাঃ) আমাকে ইহুদীর দাসত্ব থেকে মুক্ত হবার জন্য ৪০ আউন্স স্বর্ণ দিলেন। ঐ স্বর্ণ ইহুদীকে দিয়ে আমি মুক্তি লাভ করলাম। কিন্তু বদর ও ওহুদ যুদ্ধ আমার দাসত্বের আমলে সংঘটিত হয়। তাই আমি তাতে অংশগ্রহণ করতে পারিনি।
শিক্ষাঃ হযরত সামলান ফারসীর ইসলাম গ্রহণের এই ঘটনা অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। এর সর্ব প্রধান শিক্ষা এই যে, মুহাম্মদ (সাঃ) ছাড়া পৃথিবীতে আল্লাহর প্রেরিত আর কোন নবীর শরীয়ত অবিকৃত অবস্থায় নেই। তাই ইসলাম ছাড়া আর কোন ধর্ম সঠিক ও নির্ভুল নয়। এই সত্য ও সঠিক দ্বীনের সন্ধান লাভের জন্য হযরত সালমান ফারসী প্রথম দিন থেকেই অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। আল্লাহ তাঁর অক্লান্ত সাধনাকে সফল করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তায়ালা সত্যের সন্ধানরত প্রত্যেক মানুষকেই সত্যের সন্ধান দিয়ে থাকেন।
📄 মিথ্যা সকল পাপের জননী
একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে বললোঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার মধ্যে তিনটি বদ অভ্যাস রয়েছেঃ মিথ্যা বলা, চুরি করা ও মদ খাওয়া। আমি তিনটি বদ অভ্যাসই ছেড়ে দিতে চাই। কিন্তু এক সাথে এর সব ক'টি ছাড়তে পারছি না। আমাকে এক একটি করে এগুলো পরিত্যাগ করার সুযোগ দিন এবং কোনটি আগে ত্যাগ করবো, তা বলে দিন। রাসূল (সাঃ) একটু চিন্তা করে বললেনঃ তুমি প্রথমে মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস ত্যাগ কর। আর এই ত্যাগ করার ওপর বহাল আছ কিনা, তা জানানোর জন্য মাঝে মাঝে আমার কাছে এসো।
সে এতে রাজী হয়ে চলে গেল এবং কোন অবস্থাতেই মিথ্যা বলবে না বলে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করলো।
রাত্রে সে অভ্যাসমত চুরি করতে বেরিয়ে পড়লো। কেননা এটা সে বাদ দেওয়ার ওয়াদা করেনি। কিন্তু কিছুদূর গেলেই তার মনে হলোঃ রাসূল (সাঃ) এর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি যদি চুরি করেছি কিনা জিজ্ঞাসা করেন তা হলে মিথ্যা তো বলা যাবে না। কাজেও সত্য বলে স্বীকারোক্তি দিতে হবে। আর তাহলে রাসূলের (সাঃ) দরবারে অপমান তো সহ্য করতেই হবে। উপরন্তু হাতটাও কাটা যাবে। অনেক ভেবে চিন্তে সে ফিরে এল। চুরি করতে যাওয়া হলো না।
এরপর সে মদ খাওয়ার জন্য গ্লাস হাতে নিয়ে তাতে মদ ঢাললো। কিন্তু মুখে নিতে গিয়ে আবার ঐ একই প্রশ্ন তার মনে উদিত হলো। রাসূল (সাঃ) এর দরবারে তো আজ হোক কাল হোক যেতেই হবে। তিনি যদি জিজ্ঞেস করেন, মদ খাওয়া চলছে কিনা, তাহলে কি জবাব দেব? মিথ্যা তো বলা যাবে না। আর সত্য বললে অপমান ও ৮০ ঘা বেত্র দন্ড। অতএব, মদও সে ছেড়ে দিল।
এভাবে একমাত্র মিথ্যা ছেড়ে দিয়ে সে একে একে সব কয়টি চারিত্রিক দোষ থেকে মুক্তি পেল। রাসূল (সাঃ) সত্যই বলেছেনঃ মিথ্যা হলো সকল পাপের জননী।
শিক্ষাঃ এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষকে ইসলামে দীক্ষিত করার একটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত চমকপ্রদ কৌ শল শিক্ষা দেয়া হয়েছে। সেই শিক্ষাটি এই যে, ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ড ও চরিত্র যখন কারো অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, তখন তাকে রাতারাতি শুধরে পবিত্র করা সম্ভব হয় না। এজন্য ধীরে ধীরে ও পর্যায়ক্রমে চরিত্র সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। এতে সফলতা লাভ করা সহজতর হবে। এ কথা ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন সঠিক, জাতির ক্ষেত্রেও তেমনি অভ্রান্ত।
📄 মসজিদে যেরারের ঘটনা
মদীনায় আবু আমের নামে একজন খৃস্টান পাদ্রী বাস করতো। তার ছেলে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী হযরত হানযালা (রাঃ)। শহীদ হওয়ার পর ফেরেস্তারা তাঁকে গোসল দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পিতা খৃস্টধর্মের ওপর অবিচল ছিল।
রাসূল (সাঃ) হিজরত করে মদীনায় যাওয়ার পর আবু আমের তাঁর সাথে সাক্ষাত করে ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন আপত্তি ও সন্দেহ উত্থাপন করে। রাসূল (সাঃ) তার সকল আপত্তির জবাব দেন। কিন্তু তবু সে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সে বললোঃ আমাদের দু'জনের মধ্যে যে মিথ্যুক সে যেন অভিশপ্ত ও আত্মীয় স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন। সে রাসূল (সাঃ) কে একথাও জানিয়ে দিল যে, সে রাসূল (সাঃ) এর শত্রুদেরকে সব সময় সাহায্য করতে থাকবে। নিজের এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সে বদর থেকে হুনাইন পর্যন্ত সকল যুদ্ধে মুসলমানদের শত্রুদের পক্ষ অবলম্বন করে। হুনায়েনের যুদ্ধে যখন হাওয়াযেনের মত বিশালাকায় গোত্র মুসলমানদের কাছে হেরে গেল, তখন সে ভগ্ন হৃদয়ে তৎকালীন খৃস্টধর্মের ঘাটি সিরিয়ায় চলে যায় এবং আত্মীয় স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় সেখানেই মৃত্যুবরণ করে। এভাবে তার নিজের বদদোয়া ও অভিশাপ দ্বারা সে নিজেই ঘায়েল হয়।
জীবদ্দশায় আবু আমের পাদ্রী আজীবন ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুতা করে। এমনকি সে রোম সম্রাটকে মদীনায় আক্রমণ চালিয়ে মুসলমানদের নাম নিশানা মুছে ফেলার প্ররোচনাও দিয়েছিল।
মদীনার মুসলমানদের মধ্যে যারা বর্ণচোরা, ভন্ড ও মোনাফেক ছিল, সর্বকালের ও সর্বদেশের মোনাফেকদের মতই তারাও ইহুদী ও খৃস্টানদের ক্রীড়নক ছিল। বিশেষতঃ আবু আমেরের তারা খুবই ভক্ত ও অনুগত ছিল। আবু আমের এই মোনাফেকদের কাছে চিঠি লিখলো যে, আমি রোম সম্রাটকে মদীনা আক্রমণ করার অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু সম্রাটের বাহিনীকে সহযোগিতা করে এমন একটি দল মদীনাতেও সংগঠিত হওয়া জরুরী। এ জন্য তোমরা মদীনায় মসজিদের নাম দিয়ে একটি গৃহ নির্মাণ কর, যেন মদীনার মুসলমানদের মনে কোন সন্দেহ সৃষ্টি না হয়। সেই গৃহে নিজেরা সমবেত হও, কিছু অস্ত্র-শস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জাম তাতে সংগ্রহ করে রাখ।
তার এ চিঠির ভিত্তিতে বারোজন মোনাফেক মদীনার কোবা মহল্লায় একটি মসজিদ নির্মাণ করলো। এই মহল্লায় রাসূল (সাঃ) হিজরত করে এসে প্রথম অবস্থান করেছিলেন এবং একটি মসজিদ তৈরী করেছিলেন। অতঃপর তারা স্থির করলো যে, ঐ মসজিদে রাসূল (সাঃ) এর দ্বারা এক ওয়াক্ত নামায পড়াবে। এতে মুসলমানদের মনে আর কোন সন্দেহ থাকবে না। তারা বুঝবে এটাও অন্যান্য মসজিদের মতই একটা মসজিদ।
তাদের একটি প্রতিনিধি দল রাসূল (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করে বুঝালো যে, কোবার বর্তমান মসজিদটি অনেক দূরে অবস্থিত। দুর্বল ও অসুস্থ লোকেরা অত দূরে যেতে পারে না। তাছাড়া ওখানে সব লোকের সংকুলানও হয় না। তাই আমরা আর একটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। আপনি এতে এক ওয়াক্ত নামায পড়ে উদ্বোধন করে দিয়ে যান।
রাসূল (সাঃ) তখন তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। তাই ওয়াদা করলেন যে, যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি ওখানে নামায পড়বেন। কিন্তু তাবুক থেকে ফেরার পথে সূরা তাওবার সংশ্লিষ্ট আয়াত কয়টি নাযিল করে আল্লাহ তাতে নামায পড়তে নিষেধ করলেন এবং তাকে 'মসজিদে যেরার' (ক্ষতিকর মসজিদ) নামে আখ্যায়িত করলেন। রাসূল (সাঃ) এই নির্দেশ অনুসারে নামায তো পড়লেনই না, অধিকন্তু কতিপয় সাহাবীকে পাঠিয়ে দিয়ে মসজিদটি আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিলেন।
সূরা তাওবার সংশ্লিষ্ট আয়াতে এই মসজিদকে তিনটি কারণে মসজিদে যেরার বলা হয়েছেঃ এক, তা দ্বারা ইসলামের ক্ষতি সাধন ও কুফরী প্রতিষ্ঠার সংকল্প করা হয়েছিল। দুই, তা দ্বারা মুসলামনদের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। তিন, সেখানে ইসলামের শত্রুদেরকে আশ্রয় দেয়ার ফন্দি আটা হয়েছিল।
উল্লিখিত তিনটি উদ্দেশ্যে যখন যেখানেই কোন গৃহ নির্মাণ, কোন দল বা প্রতিষ্ঠান গঠন কিংবা আর কোন ধরনের স্থাপনার কাজ করা হবে, তখন তা মসজিদে যেরারেরই পর্যায়ভুক্ত হবে এবং মুসলমানদের কর্তব্য হবে তা প্রথম সুযোগেই ধ্বংস করা, চাই তা সমজিদ বা অন্য কোন আকারেই গঠিত হোক। এ কারণে হযরত ওমর (রাঃ) এক মসজিদের পার্শ্বে আর একটি মসজিদ নির্মাণ করতে নিষেধ করেন। অনুরূপভাবে কোন প্রতিষ্ঠিত ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় নিয়োজিত দল বা সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান গঠন করা বৈধ হবে না।
শিক্ষাঃ (১) মুসলমান নাম ধারন করেও ইসলামের চিহ্নিত শত্রুদের আনুগত্য করা সুস্পষ্ট মোনাফেকীর লক্ষণ। (২) অজ্ঞতা বা ভুলবশত কোন অন্যায় কাজের ওয়াদা করলে সেই ওয়াদা ভংগ করা শুধু জায়েজ নয় বরং ওয়াজিবও।
📄 মানুষের পরিণাম তার শেষ কর্মের ওপর নির্ভরশীল
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আমরা খয়বরের যুদ্ধে রাসূল (সাঃ)-এর সাথে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তখন ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে দাবী করতো এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বললেনঃ “এই ব্যক্তি দোজখবাসী।” তারপর যুদ্ধ শুরু হলে লোকটি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করলো এবং আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হলো। এক সময় আঘাতের চোটে সে অচল হয়ে পড়লো। তখন এক সাহাবী এসে রাসূল (সাঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রসূল! ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে আপনার মত কী? যে ব্যক্তিকে আপনি দোজখবাসী বলেছিলেন, সেতো প্রচন্ডভাবে যুদ্ধ করেছে এবং আহত হয়েছে।” নবী করিম (সাঃ) বললেনঃ “শুনে রাখোও, সে দোজখবাসী।" এতে কোন কোন মুসলমান সন্দেহ পোষণ করতে লাগলেন।
ইত্যবসরে লোকটি ক্ষত স্থানের তীব্র যন্ত্রনা অনুভব করলো। অতঃপর সে নিজের তীর হাতে নিয়ে তা দ্বারা নিজের গলা ফুঁড়ে আত্মহত্যা করলো। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে বহু সংখ্যক সাহাবী রাসূল (সাঃ)-এর নিকট ছুটে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনার কথাকে সত্যে পরিণত করেছেন। অমুক লোকটি তো নিজের গলা ফুঁড়ে আত্মহত্যা করেছে।” তখন রাসূল (সাঃ) বললেনঃ “ওহে বিলাল! ওঠো। জনগণের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, মুমিন ব্যতীত কেউ বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর পাপী লোক দ্বারাও আল্লাহ কখনো কখনো এ দ্বীনের সাহায্য করে থাকেন।"
অন্য রেওয়ায়েতে আছে, রাসূল (সাঃ) বললেনঃ কোন কোন বান্দা দোযখীর ন্যায় আমল করে, অথচ সে বেহেস্তবাসী। আবার কোন কোন বান্দা বেহেশতবাসীর ন্যায় কাজ করে, অথচ সে দোজখবাসী। আর মনে রাখবে, কর্মের ফলাফল শেষ কর্মের ওপর নির্ভরশীল।
শিক্ষাঃ আত্মহত্যা কবীরা গুনাহ তথা মহাপাপই শুধু নয়, বরং তা ঈমানকেও ধ্বংস করে দেয় এবং সকল কৃত সৎ কাজ বিনষ্ট করে দেয়। তাই আত্নহত্যাকারী শত ভালো কাজ করলেও দোজখবাসী হয়ে থাকে।