📄 পিতামাতাকে অসন্তুষ্ট করার পরিণাম
ইমাম তাবরানী ও ইমাম আহমাদ একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সাঃ) এর যুগে আলকামা নামে মদীনায় এক যুবক বাস করতো। সে নামায, রোযা ও সদকার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত বন্দেগীতে অতিশয় অধ্যবসায় সহকারে লিপ্ত থাকতো। একবার সে কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে তার স্ত্রী রাসূল (সাঃ) এর কাছে খবর পাঠালো যে, "আমার স্বামী আলকামা মুমূর্ষ অবস্থায় আছে। হে রাসূল, আমি আপনাকে তার অবস্থা জানানো জরুরী মনে করছি।” রাসূল (সাঃ) তৎক্ষণাৎ হযরত আম্মার, সুহাইব ও বিলাল (রাঃ) কে তার কাছে পাঠালেন। তাদেরকে বলে দিলেন যে, "তোমরা তার কাছে গিয়ে তাকে কালেমায়ে শাহাদাত পড়াও।" তারা গিয়ে দেখলেন, আলকামা মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে। তাই তারা তাকে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু” পড়াতে চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু সে কোন মতেই কলেমা উচ্চারণ করতে পারছিল না।
অগত্যা তারা রাসূল (সাঃ) কে খবর পাঠালেন যে, আলকামার মুখে কলেমা উচ্চারিত হচ্ছে না। যে ব্যক্তি এই সংবাদ নিয়ে গিয়েছিল, তার কাছে রাসূল (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেনঃ "আলকামার পিতামাতার মধ্যে কেউ কি জীবিত আছে?” সে বললোঃ "হ্যাঁ রাসূল, তার কেবল বৃদ্ধা মা বেঁচে আছে।” রাসূল (সাঃ) তৎক্ষণাত তাকে আলকামার মায়ের কাছে পাঠালেন এবং বললেনঃ 'তাকে গিয়ে বল যে, তুমি যদি রাসূল (সাঃ) এর কাছে যেতে পার তবে চল, নচেত অপেক্ষা কর, তিনি তোমার সাথে সাক্ষাত করতে আসছেন।” দূত আলকামার মায়ের কাছে উপস্থিত হয়ে রাসূল (সাঃ) যা বলেছিলেন তা জানালে আলকামার মা বললেন: রাসূল (সাঃ) এর জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গ হোক। তার কাছে বরং আমিই যাবো।” বৃদ্ধা লাঠি ভর দিয়ে রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে সালাম করলেন। রাসূল (সাঃ) সালামের জবাব দিয়ে বললেনঃ “ওহে আলকামার মা, আমাকে আপনি সত্য কথা বলবেন। আর যদি মিথ্যা বলেন, তবে আল্লাহর কাছ থেকে আমার কাছে ওহি আসবে। বলুন তো, আপনার ছেলে আলকামার স্বভাব চরিত্র কেমন ছিল?” বৃদ্ধা বললেনঃ "হে আল্লাহর রাসূল, সে প্রচুর পরিমাণে নামায, রোযা ও সদকা আদায় করতো।” রাসূল (সাঃ) বললেনঃ তার প্রতি আপনার মনোভাব কী? বৃদ্ধা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট।” রাসূল (সাঃ) বললেনঃ “কেন?” বৃদ্ধা বললেনঃ “সে তার স্ত্রীকে আমার ওপর অগ্রাধিকার দিত এবং আমার আদেশ অমান্য করতো।” রাসূল (সাঃ) বললেনঃ "আলকামার মায়ের অসন্তোষ হেতু কলেমা উচ্চারণে আলকামার জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে গেছে।” তারপর রাসূল (সাঃ), বললেনঃ “হে বিলাল, যাও, আমার জন্য প্রচুর পরিমাণে কাষ্ঠ যোগাড় করে নিয়ে এস।”
বৃদ্ধা বললেনঃ "হে আল্লাহর রাসূল, কাষ্ঠ দিয়ে কী করবেন?” রাসূল (সাঃ) বললেনঃ "আমি ওকে আপনার সামনেই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেব।" বৃদ্ধা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল। আমার সামনেই আমার ছেলেকে আগুন দিয়ে পোড়াবেন। তা আমি সহ্য করতে পারবো না।" রাসূল (সাঃ) বললেনঃ “ওহে আলকামার মা, আল্লাহর আযাব এর চেয়েও কঠোর এবং দীর্ঘস্থায়ী। এখন আপনি যদি চান যে, আল্লাহ আপনার ছেলেকে মাফ করে দিক, তাহলে তাকে আপনি মাফ করে দিন এবং তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। নচেত যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ তার কসম, যতক্ষণ আপনি তার ওপর অসন্তুষ্ট থাকবেন, ততক্ষণ নামায-রোযা ও সদকা দিয়ে আলকামার কোন লাভ হবে না।” একথা শুনে আলকামার মা বললেনঃ "হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহকে, আল্লাহর ফেরেশতাদেরকে এবং এখানে যে সকল মুসলমান উপস্থিত তাদের সকলকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, আমি আমার ছেলে আলকামার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছি।” রাসূল (সাঃ) বললেনঃ “ওহে বিলাল, এবার আলকামার কাছে যাও। দেখ, সে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে পারে কিনা। কেননা, আমার মনে হয়, আলকামার মা আমার কাছে কোন লাজ-লজ্জা না রেখে যথার্থ কথাই বলেছে।” হযরত বিলাল (রাঃ) তৎক্ষণাত গেলেন। শুনতে পেলেন, ঘরের ভেতর থেকে আলকামা উচ্চস্বরে উচ্চারণ করছে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ"। অতঃপর বিলাল গৃহে প্রবেশ করে উপস্থিত জনতাকে বললেনঃ শুনে রাখ, আলকামার মা অসন্তুষ্ট থাকার কারণে সে প্রথমে কলেমা উচ্চারণ করতে পারেনি। পরে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার জিহ্বা কলেমা উচ্চারণে সক্ষম হয়েছে। অতঃপর, আলকামা সেই দিনই মারা যায় এবং রাসূল (সাঃ) নিজে উপস্থিত হয়ে তার গোসল ও কাফনের নির্দেশ দেন, জানাযার নামায পড়ান এবং দাফনে শরীক হন। অতঃপর তার কবরে দাঁড়িয়ে রাসূল (সাঃ) বলেনঃ "হে আনসার ও মুহাজেরগণ। যে ব্যক্তি মায়ের ওপর স্ত্রীকে অগ্রাধিকার দেয় তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও সকল মানুষের অভিসম্পাত! আল্লাহ তার পক্ষে কোন সুপারিশ কবুল করবেন না। কেবল তওবা করে ও মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করে তাকে সন্তুষ্ট করলেই নিস্তার পাওয়া যাবে। মনে রাখবে, মায়ের সন্তুষ্টিতেই আল্লাহর সন্তোষ এবং মায়ের অসন্তোষেই আল্লাহর অসন্তোষ।”
শিক্ষাঃ ১। আল্লাহর ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট রাখার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত এবং মৃত্যুর পূর্বে পিতা-মাতার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া উচিত।
২। মুমূর্ষ ব্যক্তিকে কালেমা পড়ানোর চেষ্টা করা ঘনিষ্ঠ লোকদের কর্তব্য।
📄 কুরাইশ নেতাগণের গোপনে রাসূলুল্লাহর কুরআন পাঠ শ্রবণ
বর্ণিত আছে যে, একদিন রাতে আবু সুফিয়ান বিন হারব, আবু জাহল বিন হিশাম এবং আখনাস বিন শুরাইক-এই তিনজন শীর্ষস্থানীয় কুরাইশ নেতা রাসূল (সাঃ) এর কুরআন পাঠ শ্রবণের কৌতুহল কোনভাবেই চেপে রাখতে না পেরে গোপনে বেরিয়ে পড়লো। এ সময় তিনি নিজের বাড়ীতে তাহাজ্জুদের নামাযে কুরআন পড়ছিলেন। এই তিনজনের প্রত্যেকে এমন একটি জায়গা বেছে নিয়ে বসে পড়লো, যেখান থেকে সহজেই তেলাওয়াত শুনা যায়। অথচ নিজেদের অবস্থা গোপন থাকে। তারা এমন দূরত্বে অবস্থান করতে লাগলো যে, কে কোথায় বসেছে তা কেউ জানতে পারেনি। রাতভর তারা পরম আগ্রহ সহকারে কুরআন পাঠ শুনলো। সকালে বাড়ীর দিকে ফেরার পথে পরস্পরের সাক্ষাত হলো। প্রত্যেকে পরস্পরকে তিরস্কার করে বলতে লাগলোঃ "ছি, ছি, এমন কাজ আর কখনো করো না। তোমাদের বখাটে চেলা-চামুন্ডাদের কেউ যদি তোমাদের এভাবে দেখে ফেলে, তাহলে আর রক্ষা নেই। তারা একটা খারাপ ধারণা নিয়ে বসবে।" তারপর সবাই চলে গেল।
পরদিন রাতে আবার তিনজনই নিজ নিজ গোপন জায়গায় এসে বসলো এবং সারারাত ধরে রাসূল (সাঃ) এর কুরআন পড়া শুনলো। সকাল বেলা আবার পরস্পরে সাক্ষাত এবং একই ধরনের আলাপ বিনিময় হলো। তারপর সবাই চলে গেল। তৃতীয় দিনও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। এবার তারা চূড়ান্তভাবে অঙ্গীকার করলো যে, এমন কাজ আর কখনো করবো না। তারপর সবাই বিদায় নিলো।
পরদিন সকালে বৃদ্ধ আখনাস তার লাঠিটা ভর করে রওনা হলো। প্রথমে আবু সুফিয়ানের কাছে হাজির হলো। সে বললোঃ “ওহে হানযালার বাবা। মুহাম্মাদের কাছ থেকে যা শুনলে সে সম্পর্কে তোমার মতামত কি?” আবু সুফিয়ান বললোঃ "আল্লাহর কসম, আমি কিছু কথা এমন শুনেছি, যা আমি জানি এবং তার অর্থও বুঝি। আবার কিছু কথা এমনও শুনলাম যার অর্থ বুঝলাম না। আখনাস বললোঃ "আল্লাহর কসম, আমার অবস্থাও অদ্রুপ।"
এরপর তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে আবু জাহেলের কাছে গেল। আবু জাহলকে বললোঃ "ওহে আবুল হিকাম, মুহাম্মাদের কাছ থেকে যা শুনলে সে সম্পর্কে তোমার কি অভিমত?” সে বললোঃ "কি আর বলবো। আমরা আর বনু আবদ মানাফ-এ দুটি কুরাইশী গোত্র আবহমান কাল ধরে মান ইজ্জত নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এসেছি। আপ্যায়ন ও ভোজের আয়োজন তারাও করেছে, আমরা করছি। সামাজিক দায়দায়িত্ব তারাও বহন করেছে, আমরা করেছি। সব কিছুতে যখন আমরা সমানে সমানে টক্কর দিয়ে চলেছি, তখন হঠাৎ তারা বলে উঠলোঃ আমাদের ভেতর একজন নবী আছে, যার কাছে আকাশ থেকে ওহী আসে। এত বড় একটা জিনিসে আমরা তাদের সমকক্ষ হব কি করে? আল্লাহর কসম, আমরা তার ওপর কক্ষনো ঈমান আনবো না এবং কক্ষনো তাকে স্বীকৃতি দেবো না।” ও কথা শুনে তার কাছ থেকে বিদায় নিল। (সীরাতে ইবনে হিশাম)
শিক্ষাঃ এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আল্লাহর দ্বীনের বিরোধীতা যারাই করে, তারা তাকে (দ্বীনকে) সত্য জেনেই নিছক কায়েমী স্বার্থের কারণেই করে। তাছাড়া তাদের ভেতরে একটা হীনমন্যতা সক্রিয় থাকে। আবু জাহল প্রমুখ কুরাইশ নেতাদের মধ্যে হীনমন্যতার কারণ ছিল এই যে, ওহীর কারণে বনু হাশেমের সাথে তাদের সমকক্ষতা ও ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং বনু হাশেমের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয়। আর এ যুগে কোন ইসলামী আন্দোলনের বিরোধীরা হীনমন্যতায় ভুগবে এ জন্য যে, ইসলামী আন্দোলনের লোকেরা এত উন্নত মানের চরিত্র ও নিঃস্বার্থ জনসেবার নমুনা পেশ করে থাকে, যার সমকক্ষ তাঁরা কখনো হতে পারবে না। তাই ইসলামী চরিত্র সম্পন্ন লোকদের হাতে কখনো ক্ষমতা গেলে দেশবাসী দুর্নীতিমুক্ত শাসনের স্বাদ পাবে। ফলে ধর্মহীন শক্তিগুলোকে জনগণ আর কক্ষনো ক্ষমতায় আসতে দেবে না। এ কারণে এ যুগের প্রতিষ্ঠিত জাহেলী শক্তিও সর্বশক্তি দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করে থাকে। এ ঘটনা থেকে আরো জানা যায় যে, ইসলামের শত্রুদেরও সাধারণ মনস্তত্ব হলো ইসলামের তাত্বিক বিষয় তাদের জানার প্রচ্ছন্ন কৌতুহল থাকে। নেতৃস্থানীয় লোকেরা এ কৌতুহল পার্থিব স্বার্থের কারণে দমন করে থাকে। কিন্তু শত্রুতা যতই তীব্র হয়, তাদের প্রভাবাধীন সাধারণ মানুষের মনে ইসলামকে জানার আগ্রহ ততই প্রবল হয়ে থাকে।
📄 তাবুক অভিযানে অনুপস্থিত তিন সাহাবীর তওবার কাহিনী
হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেনাপতিত্বে যে কয়টি যুদ্ধ বা যুদ্ধাভিযান সংঘটিত হয়, তন্মধ্যে তাবুক যুদ্ধাভিযান অন্যতম। যদিও প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতির কারণে এ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সংঘটিত হয়নি। কিন্তু তথাপি যুদ্ধের নির্দ্ধারিত স্থান তাবুক-এ মুসলিম বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে ও সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সদলবলে যেতে হয়েছিল। মক্কা বিজয়ের পর এটাই ছিল ইসলামের সর্বশেষ বৃহত্তম যুদ্ধাভিযান। এই অভিযানের জন্য সাহাবায়ে কেরামের কারো শারীরিক অনুপস্থিতির অনুমতি তো ছিলই না, অধিকন্তু প্রত্যেক সাহাবীকে সাধ্যমত সর্বোচ্চ পরিমাণ আর্থিক সাহায্য দেয়ার আহবান জানানো হয়েছিল। তাবুক অভিযানের প্রাক্কালে যখন আর্থিক সাহায্য চাওয়া হয়, তখন হযরত ওমর (রাঃ) নিজের সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক আর হযরত আবু বকর (রাঃ) সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি দান করেছিলেন।
কিন্তু তিনজন সাহাবী এই যুদ্ধে অপ্রত্যাশিতভাবে বিনা ওজরে অনুপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন কা'ব বিন মালেক, হিলাল ইবনে উমাইয়া ও মুরারা বিন রাবী'। এই তিনজন সাহাবী সম্পর্কে অপর কোন সাহাবীর এমনকি স্বয়ং রাসূল (সাঃ)-এরও কখনো কোন অভিযোগ বা সংশয় ছিল না। তাঁদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় কখনো কোন খাদ ছিল না। তথাপি সর্বোচ্চ গুরুত্ববহ এই অভিযানে তারা সম্পূর্ণ বিনা ওজরে অনুপস্থিত থাকেন। এ সংক্রান্ত বিশদ ঘটনা স্বয়ং হযরত কা'ব ইবনে মালেক বর্ণনা করেছেন। এই বর্ণনা নিম্নরূপ:
কা'ব বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নেতৃত্বে যতগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তন্মধ্যে তাবুক ও বদর ছাড়া আর কোনটাতেই আমি অনুপস্থিত থাকিনি। তবে বদর যুদ্ধে যারা অনুপস্থিত ছিলেন তাদের কাউকে আল্লাহর আক্রোশের সম্মুখীন হতে হয়নি। কেননা বদর যুদ্ধে রাসূল (সাঃ) এর উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশদের কাফেলাকে ধাওয়া করা। এরূপ করতে গিয়ে হঠাৎ এক সময় যুদ্ধ বেঁধে যায়। আকাবার রাতে রাসূল (সাঃ) ইসলামের ওপর দৃঢ়ভাবে টিকে থাকা এবং ইসলাম ও রাসূল (সাঃ) কে সাহায্য করার জন্য মোট যে ৭০ জনের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। ঐ রাতটি আমার কাছে যুদ্ধের চেয়েও প্রিয় ছিল।
তাবুক যুদ্ধের সময় আমি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ও স্বচ্ছল অবস্থায় ছিলাম। এ সময় আমার কাছে দুটো সওয়ারী ছিল, যা এর আগে কখনো ছিল না। রাসূল (সাঃ)-এর নিয়ম ছিল, যখনই কোন যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতেন, কখনো পরিস্কারভাবে স্থান, এলাকা বা কোন্ দিকে যাওয়া হবে তাও পর্যন্ত জানাতেন না। কিন্তু তাবুক যুদ্ধের সময়টা ছিল ভীষণ গরমের সময়। পথও ছিল দীর্ঘ এবং তার কোথাও গাছপালা, লতাপাতা ও পানি ছিল না আর শত্রুর সংখ্যাও ছিল অত্যধিক। তাই রাসূল (সাঃ) মুসলমানদেরকে যুদ্ধের সকল প্রয়োজনীয় জ্ঞাতব্য বিষয় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, যাতে তারা ভালোভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। এ সময় রাসূল (সাঃ) এর সহযোদ্ধার সংখ্যা ছিল বিপুল। তবে তাদের নাম ধাম লেখার জন্য কোন খাতাপত্র বা রেজিষ্ট্রার ছিল না। এ যুদ্ধ থেকে অনুপস্থিত থাকতে চায় এমন লোক একজনও ছিল না। তবে সকল সাহাবী এও মনে করতেন যে, কেউ যদি অনুপস্থিত থাকে, তবে আল্লাহর ওহী না আসা পর্যন্ত রাসূল (সাঃ) তা জানতে পারতেন না।
রাসূল (সাঃ) যখন এ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন, তখন ফল পেকে গিয়েছিল এবং ছায়া খুবই ভালো লাগতো। রাসূল (সাঃ) ও তার সাথী মুসলমানগণ পূর্ণোদ্যমে যুদ্ধের প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। আমিও প্রতিদিন ভাবতাম প্রস্তুতি নিব। কিন্তু কোন প্রস্তুতিই নেয়া হতো না। এমনিই দিন কেটে যেত। আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতাম, আমি তো যে কোন সময় প্রস্তুতি নিতে পারবো। ব্যস্ত হওয়ার দরকার কি? এভাবে দিন গড়িয়ে যেতে থাকে। একদিন ভোরে তিনি মুসলমানদেরকে সাথে নিয়ে চলে গেলেন। তখনো আমার প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। আমি মনে মনে বললাম, ওরা চলে যায় যাক। আমি পথেই তাদেরকে ধরতে পারবো। তাদের রওনা হয়ে যাওয়ার পরের দিন আমি রওনা হতে চাইলাম। কিন্তু দিনটা কেটে গেল, আমার রওনা দেয়া হয়ে উঠলো না। পরদিন সকালে আবার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু এবারও পারলাম না রওনা দিতে। এভাবে গড়িমসির মধ্য দিয়ে দিনের পর দিন কেটে গেল। ততক্ষণে মুসলিম বাহিনী অনেক দূরে চলে গেছে। আমি কয়েকবার বেরিয়ে দ্রুত বেগে তাদেরকে ধরে ফেলার সংকল্প করেও পিছিয়ে থাকলাম। আফসোস তখনো যদি কাজটি করে ফেলতাম। কিন্তু আসলে তা বোধ হয় আমার ভাগ্যে ছিল না। রাসূল (সাঃ) ও মুসলমানদের চলে যাওয়ার পর আমি যখন মদীনায় জনসাধারণের মধ্যে বেরুতাম, তখন পথে ঘাটে মুনাফিক ও পিড়াব্যাধিগ্রস্ত লোক ছাড়া আর কাউকে দেখতাম না। এ পরিস্থিতিতে নিজেকে দেখে আমার খুবই দুঃখ লাগতো।
রাসূল (সাঃ) তাবুক যাওয়ার পথে আমার সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। তবে তাবুকে পৌ ছে জিজ্ঞেস করেন যে, কা'বের কি হয়েছে? বনু সালামার এক ব্যক্তি বললোঃ হে রাসূলুল্লাহ! নিজের সম্পদের মায়া ও আত্মাভিমানের কারণে সে আসেনি। মুয়াজ ইবনে জাবাল এ কথা শুনে বললেনঃ "ছি, কি একটা বাজে কথা তুমি বললে! আল্লাহর কসম, তার সম্পর্কে আমরা কখনো কোন খারাপ কথা শুনিনি।" রাসূল (সাঃ) উভয়ের বাক্য বিনিময়ের মধ্যে চুপ করে থাকলেন।
কা'ব ইবনে মালেক বলেনঃ যখন আমি জানতে পারলাম যে, রাসূল (সাঃ) ফিরে আসছেন, তখন ভাবলাম, এমন কোন মিথ্যে ওজর বাহানা করা যায় কিনা, যাতে আমি তাঁর অসন্তোষ থেকে রক্ষা পেতে পারি। কিন্তু পরক্ষণেই এসব চিন্তা আমার দূর হয়ে গেল। আমি মনে মনে বললাম যে, মিথ্যে ওজর দিয়ে আমি রেহাই পাব না। কারণ রাসূল (সাঃ) ওহীর মাধ্যমে জেনে ফেলবেন। কাজেই পুরোপুরি সত্য কথা বলবো বলে স্থির করলাম। রাসূল (সাঃ) পরদিন সকালে ফিরে এসে মসজিদে নববীতে বসলে তাবুক যুদ্ধে যারা যায়নি তারা একে একে আসতে লাগলো এবং প্রায় ৮০ জন (মতান্তরে ৮২ জন) নানা রকম ওজর বাহানা পেশ করে কসম খেতে লাগলো। রাসূল (সাঃ) তাদের ওজর মেনে নিলেন, তাদের কাছ থেকে পুনরায় বায়য়াত নিলেন, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন এবং তাদের গোপন বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করলেন। আমিও তাঁর কাছে এলাম। আমি সালাম দিলে তিনি ঈষৎ ক্রোধ মিশ্রিত মুচকি হাসিসহ জবাব দিলেন। তারপর বসতে বলে জিজ্ঞাসা করলেনঃ তোমার কি হয়েছিল যে তাবুকে যেতে পারলে না? তুমি না সওয়ারী কিনে নিয়েছিলে? আমি বললামঃ জি, সওয়ারী কিনে নিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি যদি আপনি ছাড়া অন্য কারো সামনে বসতাম, তাহলে তার আক্রোশ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মিথ্যে মিথ্যে ওজর পেশ করে চলে যেতাম। কারণ কথা বলার দক্ষতা আমারও আছে। কিন্তু আমি জানি, আজ আপনার কাছে মিথ্যা বলে আপনাকে খুশী করা গেলেও আল্লাহ তায়ালা কালই সব ফাঁস করে দিয়ে আপনাকে আমার ওপর অসন্তুষ্ট করে দেবেন। আর যদি সত্য বলি, তবে তাতে আপনি অসন্তুষ্ট হলেও আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা আছে। আল্লাহর কসম, আমার না যাওয়ার জন্য কোন ওজর ছিল না। আল্লাহর কসম, আমি এ সময়ে সর্ব প্রকারে সুস্থ, সবল ও সক্ষম ছিলাম।
রাসূল (সাঃ) আমার কথা শুনে বললেনঃ কা'ব সত্য কথা বলেছে। বেশ, তুমি এখন যাও। দেখ, আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত দেন।
আমি বিদায় নিলাম। বনু সালামার লোকেরাও আমার সাথে চলতে লাগলো তারা আমাকে বললোঃ "আমরা তো আজ পর্যন্ত তোমার কোন পাপ কাজের কথা শুনিনি। অন্যান্যদের মত তুমিও একটা ওজর পেশ করে দিলেই তো পারতে। তারপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তোমার জন্য ক্ষমা চাইতেন এবং তাতেই তোমার গুনাহ মাফ হয়ে যেত।" তারা এভাবে আমাকে ক্রমাগত তিরস্কার করতে লাগলো। ফলে এক পর্যায়ে মনে মনে স্থির করে ফেললাম, রাসূল (সাঃ) এর কাছে ফিরে যাই এবং আগে যা বলেছি তা ভুল প্রতিপন্ন করে আসি। সহসা আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ আচ্ছা, আমার মত অকপটে সত্য বলে ভুল স্বীকার করতে তোমরা কি আর কাউকে দেখেছ? তার বললোঃ হাঁ, হিলাল বিন উমাইয়া ও মুরারা বিন রবীও তোমার মতই কথা বলেছে। এই দুজনকে আমি ভালোভাবে জানতাম। তারা ছিলেন খুবই সৎ লোক এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী। তাদের দু'জনের কথা শুনে আমি আমার পূর্বের বক্তব্যে অবিচল থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।
এদিকে রাসূল (সাঃ) তাবুকে অনুপস্থিত থাকা লোকদের মধ্যে আমাদের তিনজনের সাথে কথা বলা সকল মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ করে দিলেন। তাই লোকেরা আমাদেরকে বয়কট করে চললো। যেন আমরা তাদের একেবারেই অচেনা মানুষ। দুনিয়াটাই যেন আমার কছে বদলে গেল। এভাবে পঞ্চাশ দিন কেটে গেল। অন্য দু'জন তো ঘরেই বসে রইল এবং কান্নাকাটি করতে লাগলো। কিন্তু আমি বাইরে বেরুতাম। মসজিদে নববীতে নামায পড়তাম ও বাজারে ঘুরতাম। কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলতো না। আমি রাসূল (সাঃ)-এর কাছে যেতাম। তিনি নামাযের পর মজলিসে বসলে সেখানেও তাকে সালাম দিতাম, আর দেখতাম, সালামের জবাবে তাঁর ঠোঁট নড়লো কিনা। আমি তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তাম। আমি বাঁকা দৃষ্টিতে তাঁকে দেখতাম আমি নামায পড়ার সময় তিনি আমার দিকে তাকাতেন, আর আমি তাকালেই মুখ ফিরিয়ে নিতেন। এ অবস্থায় অনেকদিন কেটে গেল। ক্রমে আমি অস্থির ও দিশাহারা হয়ে পড়লাম। একদিন আমার অতি প্রিয় চাচাতো ভাই আবু কাতাদাহকে সালাম করলাম। কিন্তু সে সালামের জবাব পর্যন্ত দিল না। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলামঃ হে আবু কাতাদাহ! আমি যে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে ভালোবাসি, তা কি তুমি স্বীকার কর না? সে এ কথার কোন জবাব দিল না। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করলেও জবাব দিল না। তৃতীয়বার আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলে সে শুধু বললোঃ আল্লাহ ও তার রাসূলই ভালো জানেন। আমার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আমি তার কাছ থেকে ফিরে এলাম। এই সময় একদিন মদীনার বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। এই সময় সিরিয়ার একজন খৃস্টান কৃষক মদীনার বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রী করতে এসেছিল। সে লোকজনের কাছে আমার ঠিকানা সন্ধান করছিল। লোকেরা আমাকে দেখিয়ে দিলে সে গাসসানের রাজার একটি চিঠি আমার হাতে দিল। চিঠিতে রাজা লিখেছেঃ আমি জানতে পেরেছি যে, আপনার নেতা আপনাকে খুব কষ্ট দিচ্ছেন। অথচ আল্লাহ আপনাকে লাঞ্চনা ও অবমাননার যোগ্য রাখেননি। আপনি আমাদের এখানে চলে আসুন। আমরা আপনাকে সম্মানের সাথে রাখবো। চিঠিটা পড়ার সাথে সাথে আমি মনে মনে বললাম, এ আর এক পরীক্ষা। আমি তৎক্ষণাত তা চুলোর মধ্যে নিক্ষেপ করলাম।
এভাবে আরো দশটি দিন কেটে গেলে একদিন ফজরের নামায পড়ে অত্যন্ত বিষন্ন মনে বসেছিলাম। সহসা কে একজন চিৎকার করে বলতে বলতে ছুটে আসতে লাগলোঃ কাব ইবনে মালেক! সুসংবাদ গ্রহণ কর। আমি তৎক্ষণাত সিজদায় পড়ে গেলাম। বুঝলাম, আমাদের মুসিবত কেটে গেছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঐদিন ফজরের পর ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, আল্লাহ আমাদের তওবা কবুল করে নিয়েছেন। লোকেরা দলে দলে এসে আমাকে অভিনন্দন জানাতে লাগলো। এরপর আমি রাসূল (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করতে গেলাম। আমি দেখলাম, তিনিও আমার সুসংবাদে আনন্দিত। আমি বললামঃ হে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)! আমার তওবা কবুলের জন্য শুকরিয়া স্বরূপ আমার সমস্ত ধনসম্পদ আল্লাহ ও রাসূলের পথে সদকা করে দিতে চাই। রাসূল (সাঃ) বললেনঃ সব নয়, কিছু অংশ নিচের জন্য রেখে দাও। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ এবার আমাকে সত্য কথা বলার কারণে ক্ষমা করেছেন। কাজেই এরপর বাকী জীবন আমি সর্বদা সত্য কথাই বলতে থাকবো। আল্লাহ যেন আমাকে মিথ্যা থেকে রক্ষা করেন।
শিক্ষাঃ (১) এ ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে, ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য কথা বলার নীতিতে অবিচল থাকতে হবে। চাই তাতে যত কঠিন পরীক্ষাই আসুক না কেন।
(২) আল্লাহ মোনাফেকদেরকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন না বরং মুমিনদেরকেই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। এই তিন মুমিন ব্যতিত বাকী ৮২ জন মিথ্যে ওজুহাত পেশ পরলেও তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়নি। কারণ তারা ছিল মুনাফিক। তাই আল্লাহ তাদেরকে পরিশুদ্ধ করতে চাননি।
(৩) ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্বের অধিকার রয়েছে কুরআন হাদীসের সীমার মধ্যে নিষ্টাবান কর্মীদেরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য পরীক্ষার সম্মুখীন করা বা গুরুতর ভুল কাজের জন্য শাস্তি দেয়ার। এ সব ক্ষেত্রে আনুগত্যের পরিচয় দিয়ে এবং কোন দিক থেকে কু-প্ররোরচনা এলে তা উপেক্ষা করে পরীক্ষায় কৃতকার্য হবার চেষ্টা করতে হবে।
(৪) ইসলামী আন্দোলনের কোন পর্যায়ে কারো কোন সাফল্য বা কৃতিত্ব প্রমাণিত হলে তার জন্য যাতে অন্তরে গর্ব ও অহমিকার সৃষ্টি না হয় সে জন্য সম্ভব হলে সদকা করা উত্তম। আর সেই সাথে তাওবা ইসতিগফারও অব্যাহত রাখা উচিত।
(৫) অলসতা ও সিদ্ধান্তহীনতা এই তিনজন মোজাহিদের জীবনে চরম সংকট সৃষ্টি করেছিল। কাজেই অলসতা, গড়িমসি ও সিদ্ধান্তহীনতা সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য।
📄 হযরত সালমান ফারসীর ইসলাম গ্রহণ
হযরত সালমান ফারসী প্রথম জীবনে একজন অগ্নি উপাসক ছিলেন। পরে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং সর্বশেষে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি পারস্যের ইসফাহান প্রদেশের অধিবাসী ছিলেন। তার পিতা ছিলেন একজন বিত্তশালী গ্রাম্য মোড়ল। তিনি তাকে এত বেশী স্নেহ করতেন যে, তাকে বাড়ী থেকে কোথাও যেতে দিতেন না। তিনি জানান যে, এই সময়ে তিনি অগ্নি উপাসকদের ধর্মে গভীর দক্ষতা অর্জন করেন। এক মুহুর্তের জন্যও যাতে আগুন নিভতে না পারে- এভাবে কুন্ডলী জ্বালিয়ে রাখতে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এ সময়ে ঘটনাক্রমে একটি জমি দেখাশুনার দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত হয়। সেই জমি দেখতে তিনি পিতার অনুমতিক্রমে বাড়ীর বাইরে যাওয়া আসা করতে লাগলেন। এই সময় তার যাওয়া আসার পথের পাশে একটি খৃস্টান গীর্জা তার নজরে পড়ে। লোকজনের হৈ চৈ শুনে কৌতুহলে বশতঃ তিনি সেই গীর্জার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সেখানে তাদের উপাসনা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান এবং মনে মনে বলেন, অগ্নি উপাসকদের ধর্মের চেয়ে এই ধর্ম অনেক ভাল। ঐ দিন তার আর জমি দেখতে যাওয়া হলো না। তিনি সারাদিন গীর্জায় কাটিয়ে দিলেন। গীর্জার লোকদের কাছে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, এই ধর্মের উৎস কোথায়? তারা জানালো যে, সিরিয়ায়। এরপর তিনি তাঁর পিতার কাজে ফিরে গেলেন? তাঁর পিতা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি সারাদিন কোথায় ছিলে? সালমান গীর্জার ঘটনা খুলে বলেদিলেন। সেই সাথে এ কথাও বললেন যে, ঐ ধর্ম তার কাছে ভালো লেগেছে। এতে তিনি তাঁকে নিয়ে ভীত হয়ে পড়লেন এবং তাঁর পায়ে শিকল পরিয়ে দিলেন। এই সময় সালমান গোপনে গীর্জায় খৃস্টানদের নিকট খবর পাঠান যে, আপনাদের কাছে সিরিয়া থেকে কোন কাফেলা এলে আমাকে জানাবেন। কিছুদিন পর সিরিয়া থেকে একটা কাফেলা এল। তারা যথাসময়ে সালমানকে সে খবর জানালো। সালমান বলে পাঠালেন যে, এই কাফেলার কাজ যখন শেষ হবে এবং তারা সিরিয়ায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেবে, তখন আমাকে জানাবেন। তারপর কাফেলার কাজ শেষে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করলে তা সালমানকে জানানো হলো। সালমান তৎক্ষণাত স্বীয় পিতার স্নেহের শিকল ভেংগে গোপনে তাদের সাথে সিরিয়ায় চলে গেলেন। সিরিয়ায় গিয়ে তিনি লোকদের কাছে জিজ্ঞাসা করলেনঃ এই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী কে? তারা তাকে জানালো যে, গীর্জার পাদ্রীই সবচেয়ে জ্ঞানী।
সালমান পাদ্রীর নিকট হাজির হয়ে বললেনঃ আমি এই ধর্মের প্রতি আগ্রহী। আমি আপনার সহচর হয়ে আপনার সেবা করতে চাই এবং আপনার কাছে থেকে ধর্ম শিখতে ও উপাসনা করতে চাই। পাদ্রী সালমানকে স্বীয় গীর্জায় থাকতে দিলেন এবং সালমান খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষা নিতে লাগলেন। এই সময় সালমান বুঝতে পারলেন যে, উক্ত পাদ্রী খুবই অসৎ। সে জনসাধারণের কাছ থেকে ছদকা আদায় করে এবং তা গরীবদের মধ্যে বিতরণ না করে নিজে আত্মসাৎ করে। এভাবে সে বিপুল সম্পদ সঞ্চয় করে। সালমান এরপর থেকে তাকে ঘৃণা করতে লাগলেন এবং ঐ স্থান ত্যাগ করার সুযোগ খুঁজতে লাগলেন।
এই পাদ্রী মারা গেলে খৃস্টানরা তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য সমবেত হলো। সালমান তাদেরকে বললেনঃ এই লোকটি চরম দুর্নীতিবাজ ছিল। সে তোমাদেরকে ছদকা দিতে উপদেশ দিত। কিন্তু নিজে তোমাদের দেয়া ছদকাগুলো আত্মসাৎ করতো। তারা সালমানকে বললোঃ তোমার এ সব অভিযোগ যে সত্য, তার প্রমাণ কী? তিনি এর প্রমাণ স্বরূপ তার জমা করা সাতটা সোনা রূপা ভর্তি কলসি বের করে দেখালেন। তা দেখে সমবেত জনতা ক্রুদ্ধ স্বরে বললোঃ আমরা এ নরাধমকে কবর দেব না। তারপর লাশকে তারা শূলে চড়ালো। তার ওপর পাথর ছুঁড়লো এবং তারপর একজন নতুন যাজক নিয়োগ করলো।
নতুন যাজক ছিল একজন নিরেট সৎ লোক। পৃথিবীর ধন-সম্পদের প্রতি তার কোন লালসা ছিল না। সালমান কিছুদিন তার কাছে থাকলেন। তারপর তার মৃত্যু কাছাকাছি হলে সালমান তাকে বললেনঃ জনাব, আমি তো এতদিন এখানে কাটালাম। এখন আপনার পর আমি কোথায় কার কাছে যাবো বলে দিন।
তিনি বললেনঃ বাবা! আমি যতটা খাঁটি ধর্মের অনুসারী ছিলাম, এখন তেমন আর কাউকে দেখি না। ভালো লোকেরা সব পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। এখন যারা আছে, তাদের অধিকাংশই ধর্মকে খানিকটা বিকৃত করেছে, আর খানিকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। তবে মুসেলে একজন আছে খাঁটি ধর্মের অনুসারী। তুমি তার কাছে চলে যাও।
সালমান মুসেলের যাজকের কাছে গেলেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর তিনিও মারা গেলেন। মারা যাওয়ার আগে তাকে নাসিবাইনের এক ব্যক্তির সন্ধান দিয়ে গেলেন। অতঃপর সালমান নাসিবাইনে গেলেন। সেখানকার পাদ্রীর কাছে কিছুদিন থাকার পর তিনিও মারা গেলেন। মারা যাওয়ার সময় আম্মুরিয়ার আর একজন যাজকের সন্ধান দিয়ে গেলেন। সালমান আম্মুরিয়ায় চলে গেলেন।
আম্মুরিয়ায় কিছুদিন থাকার পর সেখানকার যাজকও মারা গেলেন। মৃত্যুর প্রাক্কালে সালমান তার কাছে একজন সৎ যাজকের সন্ধান চাইলে তিনি বললেনঃ এখন আর আমার জানামতে সঠিক ধর্মের অনুসারী কোন যাজক পৃথিবীতে জীবিত নেই। তবে একজন নতুন নবীর আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তিনি ইবরাহীম (আঃ) এর দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। তিনি আরব ভূমিতে আবির্ভূত হবেন এবং দুই মরুর মাঝে খেজুরের বাগানে পরিপূর্ণ জায়গায় হিজরত করবেন। তিনি হাদিয়া নেবেন। কিন্তু ছদকা গ্রহণ করবেন না। তার দুই কাঁধের মাঝে নবুয়তের সীল থাকবে। তুমি যদি সেই দেশে যেতে পার তবে যেও।
আম্মুরিয়ায় হযরত সালমান অনেক ছাগল ভেড়া পুষতেন। তারই এক পাল ছাগল ভেড়া একদল আরব বণিককে দিয়ে তাদের সাথে তিনি আম্মুরিয়া থেকে আরব চলে গেলেন। ওয়াদিল কুরাতে তারা তাকে এক ইহুদীর নিকট বিক্রী করে দিল। সালমান এই ইহুদীর খেজুরের বাগানে কাজ করতে লাগলেন। ঐ খেজুরের বাগান দেখে তিনি ভেবেছিলেন, এটাই সেই আখেরী নবীর আবির্ভাব স্থান। তাই তিনি ইহুদীর কাছেই থাকতে লাগলেন।
হযরত সালমান বলেনঃ "এই সময় একদিন মদীনা থেকে আমার ইহুদী মনিবের এক আত্মীয় এল। বনু কুরায়যা গোত্রীয় ঐ ইহুদী আমাকে কিনে নিয়ে মদীনায় চলে গেল। মদীনাকে দেখেই আমি চিনতে পারলাম যেন ওটা অবিকল আমার আম্মুরিয়ার ওস্তাদের বর্ণিত জায়গা। তাই আমি ওখানেই থাকে লাগলাম। এই সময় মক্কায় রাসূল (সাঃ) নবুয়ত লাভ করেছেন বলে শুনলাম। তবে তার সম্পর্কে বিস্তারিত খবরাখবর জানতে পারলাম না। কিছুদিন পর তিনি মদীনায় হিজরত করে আসলেন।
একদিন আমি খেজুর ভর্তি গাছের মাথায় চড়ে আমার মনিবের জন্য কিছু কাজ করছি। মনিব তখন আমার নিচে বসা ছিলেন। সহসা তার এক চাচাতো ভাই এসে তাকে বললোঃ আল্লাহ কায়লার বংশধরকে ধ্বংস করুন। (আওস ও খাজরাজ এই দুই গোত্রের মায়ের নাম কায়লা। তাই কায়লার বংশধর বলতে ঐ দুই গোত্রকে বুঝানো হয়েছে।) ওরা এখন মক্কা থেকে আগত এক ব্যক্তির চারপাশে ভিড় জমিয়েছে। লোকটি আজই এসেছে। আওস ও খাজরাজ মনে করে সে নাকি এ যুগের নবী এবং সর্বশেষ নবী। হযরত সালমান বলেনঃ খেজুর গাছের ওপরে বসে আমি যখন এ খবর শুনলাম, তখন আনন্দে ও উত্তেজনায় এত বেসামাল হয়ে গিয়েছিলাম যে, আমি মনিবের ঘাড়ের ওপর পড়ে যাবো বলে আশংকা হচ্ছিল। অনেক কষ্টে ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে এসে ঐ লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম যে, আপনি কার কথা যেন বলছিলেন? অমনি আমার মনিব আমাকে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল। সে বললোঃ তোর তা দিয়ে কি দরকার? আমি বললামঃ কিছু না, কৌতুহল বশতঃ জিজ্ঞেস করেছিলাম।
হযরত সালমান বলেনঃ এরপর আমি নিজের কাছে সঞ্চিত কিছু খাবার জিনিস নিয়ে সন্ধ্যা বেলায় গোপনে কুবাতে রাসূল (সাঃ) এর কাছে উপস্থিত হলাম। তাকে বললামঃ আমি শুনেছি, আপনার সাথে অনেক দরিদ্র লোক রয়েছে। তাদের জন্য আমি কিছু ছদকা এনেছি। এই বলে উক্ত খাদ্য হাযির করলে তিনি সাহাবীদেরকে তা খেতে বললেন। কিন্তু নিজে খেলেন না। তখন আমি মনে মনে বললামঃ আম্মুরিয়ার যাজক যে তিনটে আলামতের কথা বলেছে, তার একটি পেয়ে গেলাম। অতঃপর আমি সেদিনকার মত চলে এলাম।
আর একদিন আরো কিছু খাবার নিয়ে তা হাদিয়া হিসাবে পেশ করলাম। রাসূল (সাঃ) তা নিজেও খেলেন এবং অন্যদেরকেও খাওয়ালেন। এরপর আমি দ্বিতীয় আলামতটিও পেয়ে গেলাম।
এরপর যখন তিনি বাকীউল গারকাদ নামক কবরস্থানে তাঁর জনৈক সাহাবীর দাফন সম্পন্ন করে ফিরে আসছিলেন, তখন আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম। সেই সময় রাসূল (সাঃ) এর গায়ে ঢিলেঢালা পোশাক ছিল। আমি নবুয়তের মোহরটি দেখার জন্য তার ঘাড়ের ওপর চোখ বুলাতে লাগলাম। রাসূল (সাঃ) আমার চাহনির হাবভাব দেখে বুঝে ফেললেন এবং তাঁর পিঠের ওপর থেকে চাদর উঠিয়ে ফেলে দিলেন। আমি তখন নবুয়তের মোহর দেখে চিনতে পারলাম। আমি মোহরটিতে চুমু খাওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়লাম এবং কাঁদতে লাগলাম। রাসূল (সাঃ) আমাকে বললেনঃ সামনে এস। আমি সামনে গিয়ে বসে পড়লাম। অতঃপর অতীতের সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম।
এরপর রাসূল (সাঃ) আমাকে ইহুদীর দাসত্ব থেকে মুক্ত হবার জন্য ৪০ আউন্স স্বর্ণ দিলেন। ঐ স্বর্ণ ইহুদীকে দিয়ে আমি মুক্তি লাভ করলাম। কিন্তু বদর ও ওহুদ যুদ্ধ আমার দাসত্বের আমলে সংঘটিত হয়। তাই আমি তাতে অংশগ্রহণ করতে পারিনি।
শিক্ষাঃ হযরত সামলান ফারসীর ইসলাম গ্রহণের এই ঘটনা অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। এর সর্ব প্রধান শিক্ষা এই যে, মুহাম্মদ (সাঃ) ছাড়া পৃথিবীতে আল্লাহর প্রেরিত আর কোন নবীর শরীয়ত অবিকৃত অবস্থায় নেই। তাই ইসলাম ছাড়া আর কোন ধর্ম সঠিক ও নির্ভুল নয়। এই সত্য ও সঠিক দ্বীনের সন্ধান লাভের জন্য হযরত সালমান ফারসী প্রথম দিন থেকেই অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। আল্লাহ তাঁর অক্লান্ত সাধনাকে সফল করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তায়ালা সত্যের সন্ধানরত প্রত্যেক মানুষকেই সত্যের সন্ধান দিয়ে থাকেন।