📄 হযরত আলীর (রাঃ) খোদাভীতি
হযরত আলী (রাঃ) তখন মুসলিম জাহানের খলিফা। একদিন তার ছোট ভাই আকীল তার কাছে এসে নিজের অনেক অভাব অভিযোগের কথা জানালেন এবং তাকে কিছু সাহায্য দেয়ার অনুরোধ করলেন। হযরত আলী বললেন, জনগণের সম্পদের কোষাগার বাইতুল মাল থেকে আমি তোমাকে এক কপর্দকও দিতে পারবো না। মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা কর। আমি বেতন পেলে তা থেকে তোমাকে কিছু দেয়া যাবে। হযরত আকীল বললেন, আপনি নিজের বেতন অগ্রিম নিয়ে নিন। হযরত আলী বললেন, আমার বেতন অন্য সকলের বেতনের সাথে আসবে। অগ্রিম নেয়ার কোন অধিকার আমার নেই। হযরত আকীল নাছোড় বান্দা। তিনি বললেন, একটা কিছু করুন। আমার সংসার চলছে না। যেভাবেই হোক আমাকে কিছু সাহায্য দিন। হযরত আলী বললেন, বাজারের কোন দোকান থেকে তালা ভেঙ্গে কিছু নিয়ে যাও। আকীল বললেন, ওটা তো চুরি বা ডাকাতি বলে গণ্য হবে। হযরত আলী (রাঃ) বললেন, এই মুহূর্তে আমি যদি তোমাকে বাইতুল মাল থেকে কিছু নিয়ে দেই তবে তাও চুরি বা ডাকাতি বলে গণ্য হবে। কেননা ওটা জনগণের সম্পদ এবং জনগণ আমাকে ওখান থেকে নেয়ার অনুমতি দেয়নি।
অগত্যা হযরত আকীল হযরত মোয়াবিয়ার নিকট গেলে তিনি তাকে একশো দিরহাম দিয়ে বললেন, তুমি মসজিদে দাঁড়িয়ে সকলকে জানাবে যে, আলীর কাছে সাহায্য চেয়ে পাইনি, কিন্তু মোয়াবিয়ার কাছে চেয়ে পেয়েছি। ইত্যবসরে আকীল হযরত আলীর বক্তব্যের যৌক্তিকতা বুঝতে পারলেন। তিনি মসজিদে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আলীর কাছে অন্যায়ভাবে সাহায্য চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি খোদভীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর মোয়াবিয়ার কাছে সাহায্য চাইলে তিনি খোদভীর পরিবর্তে আমাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
📄 অধিক সম্পদের মোহ ও কৃপণতার পরিণাম
একবার সালাবা ইবনে হাতেম আনসারী নামক এক সাহাবী রাসূল (সাঃ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ), আমার জন্য দোয়া করুন, যেন আমি অনেক বড় ধনী হতে পারি। রাসূল (সাঃ) বললেনঃ আমি যে নীতি অনুসরণ করে চলছি, তা কি তোমার পছন্দ নয়? আল্লাহর কসম, আমি ইচ্ছা করলে মদীনার পাহাড়গুলো সোনা হয়ে আমার সাথে সাথে ঘুরতো। কিন্তু এমন ধনী হওয়া আমার পছন্দ নয়। এ কথা শুনে লোকটি ফিরে গেল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এল। এবার সে বললোঃ হে রাসূল (সাঃ), আমি ওয়াদা করছি যে, আমি যদি ধনী হয়ে যাই তাহলে প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য পৌঁছে দেব। এ কথা শুনে রাসূল (সাঃ) তার বিপুল ধনসম্পদ হোক- এই মর্মে দোয়া করলেন। এর ফলে তার ছাগল ভেড়া ইত্যাদিতে অসাধারণ প্রবৃদ্ধি দেখা দিল। ফলে মদীনার যে জায়গায় সে বাস করতো তাতে তার আর স্থান সংকুলান হলো না। সে মদীনার বাইরে চলে গেল। তবে যোহর ও আসরের নামায মদীনার মসজিদে নববীতে পড়তো। আর অন্যান্য নামায সে নিজের বাসস্থানেই পড়তো।
এরপর তার গৃহপালিত পশুর সংখ্যা আরো বেড়ে গেল। এর ফলে নতুন জায়গাটিও তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে দাঁড়ালো। তাই সে মদীনা থেকে আরো দূরে যেয়ে থাকতে আরম্ভ করলো। সেখান থেকে সে শুধু জুমার নামায মদীনায় এসে পড়তে পারতো। অন্যান্য নামায নিজের বাসস্থানেই পড়তো। ক্রমে তার সম্পদ আরো বেড়ে গেলে তাকে আরো দূরে চলে যেতে হলো। সেখান থেকে সে জুমার নামাযেও মসজিদে আসতে পারতো না।
কিছুদিন পর রাসূল (সাঃ) সালাবা সম্পর্কে লোকদের কাছে খোঁজ-খবর জানতে চাইলেন। তাঁকে জানানো হলো যে, সালাবার সম্পদ এত বেশী হয়েছে যে, শহরের কাছে কোথাও তার স্থান সংকুলান হয়নি। তাই এখন সে আর এদিকে আসে না। এ কথা শুনে রাসূল (সাঃ) তিনবার বললেন, "ইয়া ওয়াইহা সালাবা!” অর্থাৎ সালাবার জন্য আফসোস।
ঠিক এই সময় যাকাতের আয়াত নাযিল হয়। তাতে রাসূল (সাঃ) কে মুসলমানদের কাছ থেকে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি যাকাত আদায়ের জন্য মুসলমানদের কাছে লোক পাঠালেন। কয়েকজন লোককে সালাবার কাছে পাঠালেন। আর কয়েকজনকে বনু সুলাইমের আর এক ধনীর কাছেও পাঠালেন।
যখন আদায়কারীরা সালাবার কাছে গিয়ে যাকাত চাইল এবং রাসূল (সাঃ) এর লিখিত ফরমান দেখালো; তখন সালাবা বলতে লাগলো, এতো জিযিয়া কর হয়ে গেল, যা অমুসলমানদের কাছ থেকে আদায় করা হয়। তারপর বললো, এখন আপনারা যান। ফেরার পথে আসবেন। তখন তারা চলে গেলেন।
পক্ষান্তরে বনু সুলাইমের ধনী লোকটি রাসূল (সাঃ) এর আদেশ শুনে নিজের গৃহপালিত পশুর মধ্য থেকে বেছে বেছে উৎকৃষ্ট মানের পশু যাকাত হিসেবে দিলেন। আদায়কারীরা বললেন, আমাদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে, উৎকৃষ্ট মানের পশু যেন না নেই। বনু সুলাইমের ধনী লোকটি বললো, আমি নিজের ইচ্ছায় দিচ্ছি। দয়া করে গ্রহণ করুন।
অতঃপর আদায়কারীগণ সালাবার কাছে গেলে সে বললোঃ "কই, দেখি যাকাতের আইন আমাকে দেখাও। তারপর তা দেখে আবার বলতে লাগলোঃ আমি তো মুসলমান। অমুসলমানদের মত জিযিয়া কেন দিতে যাবো? যা হোক, আপনারা এখন যান। আমি পরে ভেবে চিন্তে জানাবো।
যখন আদায়কারীরা রাসূল (সাঃ) এর কাছে ফিরে গেল। তখন সকল বৃত্তান্ত শুনে রাসূল (সাঃ) আবার তিনবার বললেন, 'সালাবার জন্য আক্ষেপ!' আর সুলাইমের জন্য দোয়া করতে লাগলেন। এরপর সালাবার প্রতি ইঙ্গিত করে সুরা তাওবার একটি আয়াত নাযিল হয়। তাতে এই ধরনের লোকদের নিন্দা করা হয়, যারা সম্পদশালী হলে হকদারদের হক দেবে বলে ওয়াদা করেছে, কিন্তু পরে সেই ওয়াদা ভুলে গিয়ে কৃপণতা করতে আরম্ভ করেছে। আয়াতে বলা হয় যে, এ ধরনের লোকদের মনে আল্লাহ মোনাফেকী গভীরভাবে বদ্ধমূল করে দিয়েছেন।
রাসূল (সাঃ) যখন সালাবার জন্য তিনবার আক্ষেপ প্রকাশ করলেন এবং কুরআনের আয়াতও নাযিল হলো, তখন সেখানে সালাবার একজন আত্মীয় ছিল। সে গিয়ে সালাবাকে সব জানালো এবং তাকে তার আচরণের জন্য তিরস্কার করলো। সালাবা ভীষণ ঘাবড়ে গেল এবং মদীনায় হাজির হয়ে বললো, 'হে রাসূল, আমার যাকাত গ্রহণ করুন। রাসূল (সাঃ) বললেন, আল্লাহ তোমার যাকাত গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। এ কথা শুনে সালাবা আফসোস করতে লাগলো।
রাসূল (সাঃ) বললেনঃ এটা তো তোমার নিজের কৃতকার্যের ফল। আমি তোমাকে হুকুম করেছিলাম। তুমি তা মাননি। এখন আর তোমার যাকাত কবুল হতে পারে না। তখন সালাবা অকৃতকার্য হয়ে ফিরে গেল। এর কিছুদিন পরই রাসূল (সাঃ) ইন্তেকাল করেন। এরপর সালাবা যথাক্রমে হযরত আবু বকর ও ওমর (রাঃ) কে যাকাত গ্রহণ করার আবেদন জানায়। কিন্তু তারা রাসূল (সাঃ) এর নীতি অনুসরণ করেন। হযরত ওসমানও তার যাকাত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। হযরত উসমানের খেলাফত আমলেই তার মৃত্যু হয়। (মায়া'রিফুল কুরআনের সৌ জন্যে)
শিক্ষাঃ হালাল সম্পদে ধনী হওয়ার আশা ও চেষ্টা করা যদিও বৈধ। তথাপি এত বেশি সম্পদের লোভ করা উচিত নয়, যা মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর প্রাপ্ত সম্পদের যাকাত ও সদকা দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করা উচিত নয়।
📄 হযরত আবু যার গিফারীর ইসলাম গ্রহণ
হযরত আবু যার গিফারী তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ আমি যখন জানতে পারলাম যে, মক্কায় এমন এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করেন, তখন আমি আমার ভাইকে ঐ ব্যক্তির (মুহাম্মাদ সাঃ) নিকট পাঠালাম এবং তাঁর সম্পর্কে সর্বস্তরে জেনে আসতে বললাম। সে গেল, তাঁর সাথে দেখা করলো এবং ফিরে এসে আমাকে জানালো যে, তিনি এমন এক ব্যক্তি যিনি সৎ কাজের আদেশ দেন এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করেন। কিন্তু আমি তার এই বিবরণে সন্তুষ্ট হতে পারলাম না।
অগত্যা আমি নিজে কিছু খাবার ও একটা লাঠি নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হলাম। মক্কায় পৌছে আমি এক বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলাম। আমি তাকে চিনতামও না, আবার কোরেশদের ভয়ে কাউকে তার কথা জিজ্ঞাসাও করতে পারছিলাম না। তাই আমি যমযমের পানি পান করে দিন কয়েক মসজিদুল হারামেই কাটিয়ে দিলাম।
একদিন আলী আমার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে বললেনঃ মনে হয় তুমি বহিরাগত। আমি বললামঃ সত্যিই তাই। তিনি বললেনঃ তবে আমার বাড়ী চল। আমি তার সাথে চললাম। পথে তিনিও আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না, আমিও তাকে কিছু বললাম না। আলীর বাড়ীতে রাত কাটিয়ে ভোর বেলা আবার মসজিদুল হারামে গিয়ে হাজির হলাম। ভাবলাম, সুযোগমত কাউকে জিজ্ঞাসা করবো। কিন্তু এদিনও তেমন সুযোগ হলো না।
আলী আজও আমার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ লোকটা কি থাকার কোন জায়গাই পেলনা যে, মসজিদুল হারামেই ক্রমাগত থাকতে আরম্ভ করেছে? আমি বললামঃ না ভাই, জায়গা পাইনি। তিনি বললেন, আমার সাথে চল। পথিমধ্যে তিনি বললেন, তোমার হয়েছেটা কী? কী চাও এখানে? আমি বললাম, আমার ব্যাপারটা যদি গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন তাহলে বলতে পারি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন। আমি তখন তাকে সমস্ত কথা খুলে বললাম। তিনি বললেন, ঠিক আছে। তুমি আমার সাথে চল। আমি সেই ব্যক্তির কাছেই যাচ্ছি। আমি যেখানে প্রবেশ করবো, তুমিও সেখানে প্রবেশ করবে। আর পথিমধ্যে যদি তোমার জন্য ক্ষতিকর কোন লোক দেখি, তাহলে আমি জুতো ঠিক করার ভান করে বসে পড়বো, তুমি চলতে থাকবে। তাহলে কেউ তোমাকে আমার সাথী বলে সন্দেহ করবে না।
এরপর আমি তাকে অনুসরণ করে চলতে লাগলাম। অবশেষে তিনি রাসূল (সাঃ) এর কাছে উপনীত হলেন এবং আমিও উপনীত হলাম। আমি নবীকে বললাম, আমার সামনে ইসলাম পেশ করুন। তিনি পেশ করলেন। আমি তৎক্ষণাত ইসলাম গ্রহণ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে আবু যার, তোমার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটা আপাততঃ কারো কাছে প্রকাশ না করে সরাসরি নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাও। তারপর আমাদের বিজয় হলে এসো। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, এই বাণী আমি নিশ্চয়ই লোক সমক্ষে প্রকাশ করবো। এই বলে মসজিদুল হারামে এসে কুরাইশদেরকে সম্বোধন করে বললামঃ হে কুরাইশগণ, শোন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
আর যায় কোথায়। আমাকে ধর্মত্যাগী বলে গাল দিয়ে সবাই ধর ধর বলে তেড়ে এলো এবং আমাকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেললো। আব্বাস এসে আমাকে রক্ষা করলেন। পরদিন আবার একইভাবে ঘোষণা করলাম এবং কুরাইশদের হাতে একইভাবে গণপিটুনি খেলাম। এই ছিল আমার ইসলাম গ্রহণের প্রথম অবস্থা।
শিক্ষা : অতিমাত্রায় বৈরী পরিবেশে নিজের ইসলামী পরিচয় প্রকাশ করে বিপদ ডেকে আনা অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার কাজ। হযরত আবু যার-এর সিদ্ধান্তটি ছিল নিতান্ত ব্যক্তিগত ও ব্যতিক্রমধর্মী। সাধারণ মানুষের পক্ষে এরূপ করা উচিত নয়।
📄 পিতামাতাকে অসন্তুষ্ট করার পরিণাম
ইমাম তাবরানী ও ইমাম আহমাদ একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সাঃ) এর যুগে আলকামা নামে মদীনায় এক যুবক বাস করতো। সে নামায, রোযা ও সদকার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত বন্দেগীতে অতিশয় অধ্যবসায় সহকারে লিপ্ত থাকতো। একবার সে কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে তার স্ত্রী রাসূল (সাঃ) এর কাছে খবর পাঠালো যে, "আমার স্বামী আলকামা মুমূর্ষ অবস্থায় আছে। হে রাসূল, আমি আপনাকে তার অবস্থা জানানো জরুরী মনে করছি।” রাসূল (সাঃ) তৎক্ষণাৎ হযরত আম্মার, সুহাইব ও বিলাল (রাঃ) কে তার কাছে পাঠালেন। তাদেরকে বলে দিলেন যে, "তোমরা তার কাছে গিয়ে তাকে কালেমায়ে শাহাদাত পড়াও।" তারা গিয়ে দেখলেন, আলকামা মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে। তাই তারা তাকে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু” পড়াতে চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু সে কোন মতেই কলেমা উচ্চারণ করতে পারছিল না।
অগত্যা তারা রাসূল (সাঃ) কে খবর পাঠালেন যে, আলকামার মুখে কলেমা উচ্চারিত হচ্ছে না। যে ব্যক্তি এই সংবাদ নিয়ে গিয়েছিল, তার কাছে রাসূল (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেনঃ "আলকামার পিতামাতার মধ্যে কেউ কি জীবিত আছে?” সে বললোঃ "হ্যাঁ রাসূল, তার কেবল বৃদ্ধা মা বেঁচে আছে।” রাসূল (সাঃ) তৎক্ষণাত তাকে আলকামার মায়ের কাছে পাঠালেন এবং বললেনঃ 'তাকে গিয়ে বল যে, তুমি যদি রাসূল (সাঃ) এর কাছে যেতে পার তবে চল, নচেত অপেক্ষা কর, তিনি তোমার সাথে সাক্ষাত করতে আসছেন।” দূত আলকামার মায়ের কাছে উপস্থিত হয়ে রাসূল (সাঃ) যা বলেছিলেন তা জানালে আলকামার মা বললেন: রাসূল (সাঃ) এর জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গ হোক। তার কাছে বরং আমিই যাবো।” বৃদ্ধা লাঠি ভর দিয়ে রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে সালাম করলেন। রাসূল (সাঃ) সালামের জবাব দিয়ে বললেনঃ “ওহে আলকামার মা, আমাকে আপনি সত্য কথা বলবেন। আর যদি মিথ্যা বলেন, তবে আল্লাহর কাছ থেকে আমার কাছে ওহি আসবে। বলুন তো, আপনার ছেলে আলকামার স্বভাব চরিত্র কেমন ছিল?” বৃদ্ধা বললেনঃ "হে আল্লাহর রাসূল, সে প্রচুর পরিমাণে নামায, রোযা ও সদকা আদায় করতো।” রাসূল (সাঃ) বললেনঃ তার প্রতি আপনার মনোভাব কী? বৃদ্ধা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট।” রাসূল (সাঃ) বললেনঃ “কেন?” বৃদ্ধা বললেনঃ “সে তার স্ত্রীকে আমার ওপর অগ্রাধিকার দিত এবং আমার আদেশ অমান্য করতো।” রাসূল (সাঃ) বললেনঃ "আলকামার মায়ের অসন্তোষ হেতু কলেমা উচ্চারণে আলকামার জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে গেছে।” তারপর রাসূল (সাঃ), বললেনঃ “হে বিলাল, যাও, আমার জন্য প্রচুর পরিমাণে কাষ্ঠ যোগাড় করে নিয়ে এস।”
বৃদ্ধা বললেনঃ "হে আল্লাহর রাসূল, কাষ্ঠ দিয়ে কী করবেন?” রাসূল (সাঃ) বললেনঃ "আমি ওকে আপনার সামনেই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেব।" বৃদ্ধা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল। আমার সামনেই আমার ছেলেকে আগুন দিয়ে পোড়াবেন। তা আমি সহ্য করতে পারবো না।" রাসূল (সাঃ) বললেনঃ “ওহে আলকামার মা, আল্লাহর আযাব এর চেয়েও কঠোর এবং দীর্ঘস্থায়ী। এখন আপনি যদি চান যে, আল্লাহ আপনার ছেলেকে মাফ করে দিক, তাহলে তাকে আপনি মাফ করে দিন এবং তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। নচেত যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ তার কসম, যতক্ষণ আপনি তার ওপর অসন্তুষ্ট থাকবেন, ততক্ষণ নামায-রোযা ও সদকা দিয়ে আলকামার কোন লাভ হবে না।” একথা শুনে আলকামার মা বললেনঃ "হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহকে, আল্লাহর ফেরেশতাদেরকে এবং এখানে যে সকল মুসলমান উপস্থিত তাদের সকলকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, আমি আমার ছেলে আলকামার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছি।” রাসূল (সাঃ) বললেনঃ “ওহে বিলাল, এবার আলকামার কাছে যাও। দেখ, সে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে পারে কিনা। কেননা, আমার মনে হয়, আলকামার মা আমার কাছে কোন লাজ-লজ্জা না রেখে যথার্থ কথাই বলেছে।” হযরত বিলাল (রাঃ) তৎক্ষণাত গেলেন। শুনতে পেলেন, ঘরের ভেতর থেকে আলকামা উচ্চস্বরে উচ্চারণ করছে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ"। অতঃপর বিলাল গৃহে প্রবেশ করে উপস্থিত জনতাকে বললেনঃ শুনে রাখ, আলকামার মা অসন্তুষ্ট থাকার কারণে সে প্রথমে কলেমা উচ্চারণ করতে পারেনি। পরে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার জিহ্বা কলেমা উচ্চারণে সক্ষম হয়েছে। অতঃপর, আলকামা সেই দিনই মারা যায় এবং রাসূল (সাঃ) নিজে উপস্থিত হয়ে তার গোসল ও কাফনের নির্দেশ দেন, জানাযার নামায পড়ান এবং দাফনে শরীক হন। অতঃপর তার কবরে দাঁড়িয়ে রাসূল (সাঃ) বলেনঃ "হে আনসার ও মুহাজেরগণ। যে ব্যক্তি মায়ের ওপর স্ত্রীকে অগ্রাধিকার দেয় তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও সকল মানুষের অভিসম্পাত! আল্লাহ তার পক্ষে কোন সুপারিশ কবুল করবেন না। কেবল তওবা করে ও মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করে তাকে সন্তুষ্ট করলেই নিস্তার পাওয়া যাবে। মনে রাখবে, মায়ের সন্তুষ্টিতেই আল্লাহর সন্তোষ এবং মায়ের অসন্তোষেই আল্লাহর অসন্তোষ।”
শিক্ষাঃ ১। আল্লাহর ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট রাখার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত এবং মৃত্যুর পূর্বে পিতা-মাতার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া উচিত।
২। মুমূর্ষ ব্যক্তিকে কালেমা পড়ানোর চেষ্টা করা ঘনিষ্ঠ লোকদের কর্তব্য।