📄 হযরত ওমর (রাঃ) ও গভর্নর হরমুযান
পারস্যের নাহাওয়ান্দ্র প্রদেশের গভর্ণর হরমুযান ইসলামের এক কট্রর দুশমন ছিল। সে মুসলমানদের সাথে পারস্যের যুদ্ধ বাধানোর প্রধান হোতা ছিল। সে নিজেও খুবই শৌর্য বীর্যের সাথে যুদ্ধ করেছিল। অবশেষে হরমুযান মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে ও কারাবন্দী হয়। কারাবন্দী হবার পর সে ভেবেছিল, এবার আর তার রেহাই নেই। মুসলমানরা হয় তাকে দাস হিসাবে বিক্রী করে দেবে, নচেত মৃত্যুদন্ড দেবে। কারণ তার অতীত কার্যকলাপ দ্বারা সে মুসলমানদের সাথে নিজের সম্পর্ক খুবই খারাপ করে ফেলেছিল। কিন্তু তাকে এই দুই শাস্তির কোনটাই দেয়া হলো না। তাকে কিছু করের বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হলো। হরমুযান নিজের রাজধানীতে ফিরে এল, তৎক্ষণাৎ আরো দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে বিদ্রোহী তৎপরতা শুরু করলো এবং এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে ফিরে এলো। এবারও হরমুযান ধরা পরে বন্দী হলো। হরমুযানকে পাকড়াও করে যখন হযরত ওমরের কাছে আনা হলো তখন হযরত ওমর তাঁর উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করছিলেন। বন্দী এবার তার মৃত্যুদন্ড সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিত ছিল। প্রতি মুহূর্তে সে তাই মৃত্যুর আশংকা করছিল।
সহসা হযরত ওমর জিজ্ঞাসা করলেন: তুমিই নাহাওয়ান্দ্রের বিদ্রোহী গভর্ণর?
হরমুযান : জ্বী, আমিই।
হযরত ওমর: তুমিই কি সেই ব্যক্তি, যে বারবার মুসলমানদের সাথে চুক্তি ভংগ করে?
হরমুযান : জ্বী, আমিই।
হযরত ওমর : এ ধরনের অপরাধের শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড, তা তুমি জান?
হরমুযান : জ্বী, জানি।
হযরত ওমর: বেশ, তাহলে তুমি কি এই শাস্তি এক্ষুনি নিতে প্রস্তুত?
হরমুযান : আমি প্রস্তুত। তবে মৃত্যুর পূর্বে আপনার নিকট আমার একটি মাত্র আবেদন আছে।
হযরত ওমর: সেটি কী?
হরমুযান : আমি খুব পিপাসা বোধ করছি। আমি এক গ্লাস পানি চাইতে পারি?
হযরত ওমর: অবশ্যই।
এই সময় হযরত ওমরের নির্দেশে তাঁকে এক গ্লাস পানি দেয়া হলো।
হরমুযান : আমীরুল মু'মিনীন, আমি আশংকা করছি যে, আমি পানি খাওয়ার সময়েই আমার মস্তক ছিন্ন করা হতে পারে।
হযরত ওমর : কখনো নয়। তোমার এই পানি খাওয়া শেষ হবার আগে কেউ তোমার চুলও স্পর্শ করবে না।
হরমুযান : (একটু থেমে) আমীরুল মু'মিনীন, আপনি আমাকে কথা দিয়েছেন যে আমি এই পানি খাওয়া শেষ না করা পর্যন্ত আপনারা আমার চুলও স্পর্শ করবেন না। আমি পানি পান করবো না। (এই বলেই সে পানি ঢেলে ফেলে দিল।) এখন আপনি আমাকে হত্যা করতে পারেন না।
হযরত ওমর : (মুচকি হেসে) ওহে গভর্ণর, এটা তোমার চালাকী! যা হোক, ওমর যখন কথা দিয়েছে, তখন সে তার কথা রাখবেই। যাও, তুমি মুক্ত।
এর কিছুকাল পরে একদিন হরমুযান একদল সঙ্গী পরিবেষ্টিত হয়ে আবার মদীনায় এল এবং হযরত ওমরের সাথে সাক্ষাত করলো। সে বললো, "আমীরুল মুমিনীন, এবার আমি নতুন জীবনের সন্ধানে এসেছি। আমাদের সবাইকে ইসলামে দীক্ষিত করুন।"
📄 হযরত ওমরের (রাঃ) ন্যায় বিচারের আর একটি উদাহরণ
একবার কিছু সুগন্ধী দ্রব্য বাহরাইন থেকে হযরত ওমরের নিকট পাঠানো হলো। তিনি সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে বললেন, "তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এই সুগন্ধী দ্রব্যটিকে মেপে সমান ভাগ করে মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করতে পারে?"
তাঁর স্ত্রী হযরত আতেকা বললেন, "আমিরুল মুমিনীন, আমি পারবো।"
হযরত ওমর বললেন, "আতেকা ছাড়া আর কেউ আছে কি?”
হযরত আতেকা বললেন, "আমীরুল মুমিনীন, আমি মেপে দিলে অসুবিধা কী?"
হযরত ওমর বললেন, "আমার আশংকা হয় যে, মাপার সময় জিনিসটা তুমি হাত দিয়ে ধরবে এবং তোমার হাত সুবাসিত হয়ে যাবে। অতঃপর সেই সুবাসিত হাত তুমি মুখে মেখে নেবে এবং সুগন্ধী উপভোগ করবে। অন্যদের চাইতে এতটুকু বাড়তি সুবিধাও তুমি পেয়ে যাও, তা আমি পছন্দ করি না।"
শিক্ষাঃ একজন সাধারণ মুসলমানের জন্য স্বীর স্ত্রী বা অধীনস্থদের ওপর এত কঠোরতা আরোপ না করলেও চলতো। কিন্তু খলীফা বা যে কোন স্তরের নেতৃবৃন্দের পক্ষে এরূপ কঠোর ও সূক্ষ্ম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। কারণ নেতামাত্রই আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তি। তার পক্ষে নিজেকে ও নিজের ঘনিষ্ঠজনদেরকে বিন্দুমাত্রও ছাড় দেয়ার অবকাশ নেই।
📄 হযরত ওমর কর্তৃক স্বীয় পুত্রের বিচার
একবার হযরত ওমরের নিকট একটা অভিযোগ এল যে, তার পুত্র আবু শাহমা মদ খেয়েছে। অভিযোগটা অন্যান্য লোকেরও কানে গেল। অনেকে ফিসফিসানি শুরু করে দিল যে, এবার দেখবো খলিফার আইনের শাসন নিজের ছেলের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হয়। কিন্তু তাদের ধারণাটা অচিরেই মাঠে মারা গেল। কেননা অন্যরা শৈথিল্য দেখাতে পারে এই আশংকায় হযরত ওমর তাঁর ছেলের মামলা আদালতে না পাঠিয়ে নিজের হাতে তুলে নিলেন।
ছেলের মদ খাওয়ার সত্যতা প্রমাণিত হলো। ইসলামী আইনে এর শাস্তি ৮০ ঘা বেত্রদন্ড। এবারও হযরত ওমর অন্যের ওপর নির্ভর করলেন না। কেননা অন্যরা দুর্বলতা দেখাতে পারে। তিনি নিজ হাতেই পুরো ৮০টা বেত্রাঘাত নিজের ছেলের পিঠে লাগালেন। আবু শাহমা এই শাস্তিতে মারা গেল। কিন্তু হযরত ওমর আল্লাহর শোকর আদায় করলেন যে, তিনি তাকে এমন কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করেছেন। কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে যে, ৮০টি বেত্রাঘাতের কয়েকটি বাকী থাকতেই ছেলে মারা গেলে হযরত ওমর তার কবরের ওপর বাকী বেত্রাঘাতগুলো করেন।
শিক্ষাঃ ইসলামী আইন ও নীতিমালা প্রয়োগের ব্যাপারে কোন আপোষের অবকাশ নেই। আল্লাহ বলেনঃ 'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর সাক্ষী হিসাবে ইনসাফ কায়েম কর, এমনকি তা যদি তোমাদের নিজেদের, পিতামাতার ও ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধেও যায়।'
📄 সততার পুরস্কার
রাত প্রায় দুপুর গড়িয়ে চলেছে। ঘুমন্ত মদীনা নগরী। এরই অলিগলি দিয়ে প্রতিদিনের মত ধীর পদে হেটে চলেছেন ছদ্মবেশী খলীফা হযরত ওমর। খোঁজ খবর নিচ্ছেন প্রজাদের। হঠাৎ একটি কুঁড়েঘর থেকে ফিসফিস করে একটি কথোপকথন তার কানে ভেসে এল। খলীফা দাঁড়িয়ে গেলেন পুরো কথোপকথন শুনতে। এক বৃদ্ধা মহিলা তার মেয়েকে বলছেঃ “দুধ বেঁচতে দেয়ার সময় একটু পানি মিশিয়ে দিসনে কেন? তুই তো জানিস, কী অভাব আমাদের। ঐটুকু দুধে আর ক'টা পয়সা হবে। একটু পানি মেশালে কিছুটা সচ্ছলতার মুখ দেখা যেত।”
"কিন্তু তুমি খলীফার আদেশ ভুলে গেল, আম্মী? তিনি যে বলেছেন কেউ যেন দুধের সাথে পানি না মেশায়।"
"বলেছেন, তাতে কী হয়েছে? খলীফা বা তার কোন কর্মচারী তো আর দেখতে আসছেন না আমরা কী করছি।”
"কিন্তু আম্মী, তিনি বা তার কোন কর্মচারী দেখুক বা না দেখুক, তার আদেশ তো প্রত্যেক মুসলমানের মেনে চলা দরকার। তা ছাড়া খলীফা যদি নাও জানেন, আল্লাহ তো জানবেন। তিনি তো সব কিছু দেখেন, শোনেন এবং জানেন।"
খলীফা নীরবে প্রস্থান করলেন। নিজের সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলেনঃ "শুনলে তো? এই মেয়েটাকে কী পুরস্কার দেয়া যায় তার সততার জন্য?"
"তাকে বেশ বড়সড় একটা পুরস্কার দেয়া উচিত। ধরুন, এক হাজার দিরহাম।"
"না, তা যথেষ্ট নয়। আমি তাকে সততার সর্বোচ্চ পুরস্কার দেব। আমি তাকে আপন করে নেব।"
খলীফার সঙ্গী অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো, খলীফা কী পুরস্কার দিতে চান?
পরদিন সকালে খলীফা মেয়েটাকে তার দরবারে ডেকে পাঠালেন। মেয়েটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এসে হাজির হলো মুসলিম সাম্রাজ্যের মহাশক্তিধর শাসকের সামনে।
খলীফা তাঁর ছেলেদের ডাকলেন। তাদেরকে শোনালেন গত রাতে তার শোনা আলাপচারিতার কথা। তারপর বললেনঃ "হে আমার ছেলেরা, আমি চাই তোমাদের কোন একজন এই মেয়েটিকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করুক। কেননা এর চেয়ে ভালো কোন পাত্রী আমি তোমাদের জন্য যোগাড় করতে পারবো বলে মনে হয় না।"
একটি ছেলে পিতার প্রস্তাবে রাজী হলো। মেয়েটিও সম্মতি দিল। আর সে খলীফার সম্মানিত পুত্রবধুতে পরিণত হলো। বর্ণিত আছে যে, পরবর্তীকালে দ্বিতীয় ওমর নামে পরিচিত ও পঞ্চম খলীফায়ে রাশেদ নামে আখ্যায়িত মহান শাসক ওমর বিন আবদুল আযীয এই মেয়েরই দৌহিত্র ছিলেন।
শিক্ষাঃ এই ঘটনাটি একদিকে যেমন প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের সততার এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরে, অপরদিকে তেমনি মুসলিম নেতৃবৃন্দ সততার কেমন মর্যাদা দিতেন ও কদর করতেন, তাও এ ঘটনা থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায়। মনে রাখতে হবে, গুণের কদর দিতে না পারলে সমাজে সদগুণের বিকাশ ঘটা সম্ভব নয়।