📄 জাবালার ঔদ্ধত্য ও হযরত ওমর (রাঃ)
একবার হযরত ওমর (রাঃ) হজ্জ করতে মক্কায় এলেন। তিনি কা'বার চারপাশে তওয়াফ করছিলেন। তাঁর সাথে সাথে একই কাতারে তওয়াফ করছিলেন সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী প্রতিবেশী এক রাজা জাবালা ইবনে আইহাম। জাবালা কা'বার চারপাশ প্রদক্ষিণ করার সময় সহসা আরেক তওয়াফকারী জনৈক দরিদ্র আরব বেদুঈনের পায়ের তলে চাপা পড়ে জাবালার বহু মূল্যবান ইহরামের চাদরের এক কোণা। চাদরটি রাজার কাঁধের ওপর থেকে টান লেগে নীচে পড়ে যায়।
ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন জাবালা। লোকটির কোন ওজর আপত্তি না শুনে জাবালা তার গালে প্রবল জোরে এক চড় বসিয়ে দেন।
লোকটি তৎক্ষণাৎ খলিফার নিকট গিয়ে নালিশ করে এবং এই অন্যায়ের বিচার চায়। খলিফা জাবালাকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠান এবং জিজ্ঞাসা করেন যে, অভিযোগ সত্য কিনা। জাবালা উদ্ধত স্বরে জবাব দেন, "সম্পূর্ণ সত্য। এই পাজিটা আমার চাদর পদদলিত করে আল্লাহর ঘরের সামনে আমাকে প্রায় উলংগ করে দিয়েছে।"
খলিফা দৃঢ়তার সাথে জবাব দেন, "কিন্তু এটা ছিল একটা দুর্ঘটনা।" জাবালা স্পর্ধিত কন্ঠে বললেন, "আমি তার পরোয়া করিনে। কা'বা শরীফের সম্মানের খাতিরে ও কা'বার চত্তরে রক্তপাত নিষিদ্ধ থাকার কারণে আমি যথেষ্ট ক্রোধ সংবরণ করেছি। নচেত ওকে আমি চপেটাঘাত নয় হত্যাই করতাম।"
জাবালা হযরত ওমরের একজন শক্তিশালী মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। খলিফা তাই একটু থামলেন এবং কিছু চিন্তাভাবনা করলেন। অতঃপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "জাবালা, তুমি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছ। এখন বাদী ক্ষমা না করলে তোমাকে ইসলামী আইনের শাস্তি মাথা পেতে নিতে হবে এবং বাদীর হাতে পাল্টা একটা চপেটাঘাত খেতে হবে।”
স্তম্ভিত হয়ে জাবালা বললেন, "আমি একজন রাজা। আর ও হচ্ছে একজন সাধারণ কৃষক।”
হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, "তোমরা উভয়ে মুসলমান এবং আইনের চোখে সবাই সমান।"
জাবালা বললো, "যে ধর্মে রাজা ও একজন সাধারণ প্রজাকে সমান চোখে দেখা হয়, আমি তার আনুগত্য করতে পারিনে। ঐ চাষা যদি আমাকে চপেটাঘাত করে, তবে আমি ইসলাম ত্যাগ করবো।” (নাউযু বিল্লাহ)
হযরত ওমর ততোধিক কঠোর স্বরে জবাব দিলেন, "তোমার মত হাজার জাবালাও যদি ইসলাম ত্যাগ করে চলে যায়, তবে সেই ভয়ে ইসলামের একটি ক্ষুদ্রতম বিধিও লংঘিত হতে পারে না। তোমাকে এ শাস্তি পেতেই হবে। আর এ কথাও জেনে রেখ যে, ইসলাম কাউকে জোরপূর্বক মুসলমান বানায় না। তোমাকেও বানায়নি। কিন্তু ইসলাম ত্যাগ করা সহজ নয়। মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।”
হযরত ওমরের শেষোক্ত কথাটা শুনে জাবালা রাগে ও ভয়ে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে লাগলো। হযরত ওমরের নির্দেশে বাদী তৎক্ষণাত জাবালার মুখে ঠাস্ করে একটি চড় বসিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে নিল।
জাবালা ক্রোধে চক্ষু লাল করে বাদীর দিকে একবার তাকালো। অতঃপর রাগে গরগর করতে করতে কা'বার চত্তর ত্যাগ করে নীরবে চলে গেল। জানা যায়, এরপর জাবালা ইবনে আইহাম ইসলাম ত্যাগ করে প্রাণের ভয়ে সোজা রোম সম্রাটের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং সেখানেই জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো কাটায়।
একবার হযরত ওমর (রাঃ) হজ্জ করতে মক্কায় এলেন। তিনি কা'বার চারপাশে তওয়াফ করছিলেন। তাঁর সাথে সাথে একই কাতারে তওয়াফ করছিলেন সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী প্রতিবেশী এক রাজা জাবালা ইবনে আইহাম। জাবালা কা'বার চারপাশ প্রদক্ষিণ করার সময় সহসা আরেক তওয়াফকারী জনৈক দরিদ্র আরব বেদুঈনের পায়ের তলে চাপা পড়ে জাবালার বহু মূল্যবান ইহরামের চাদরের এক কোণা। চাদরটি রাজার কাঁধের ওপর থেকে টান লেগে নীচে পড়ে যায়।
ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন জাবালা। লোকটির কোন ওজর আপত্তি না শুনে জাবালা তার গালে প্রবল জোরে এক চড় বসিয়ে দেন।
লোকটি তৎক্ষণাৎ খলিফার নিকট গিয়ে নালিশ করে এবং এই অন্যায়ের বিচার চায়। খলিফা জাবালাকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠান এবং জিজ্ঞাসা করেন যে, অভিযোগ সত্য কিনা। জাবালা উদ্ধত স্বরে জবাব দেন, "সম্পূর্ণ সত্য। এই পাজিটা আমার চাদর পদদলিত করে আল্লাহর ঘরের সামনে আমাকে প্রায় উলংগ করে দিয়েছে।"
খলিফা দৃঢ়তার সাথে জবাব দেন, "কিন্তু এটা ছিল একটা দুর্ঘটনা।" জাবালা স্পর্ধিত কন্ঠে বললেন, "আমি তার পরোয়া করিনে। কা'বা শরীফের সম্মানের খাতিরে ও কা'বার চত্তরে রক্তপাত নিষিদ্ধ থাকার কারণে আমি যথেষ্ট ক্রোধ সংবরণ করেছি। নচেত ওকে আমি চপেটাঘাত নয় হত্যাই করতাম।"
জাবালা হযরত ওমরের একজন শক্তিশালী মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। খলিফা তাই একটু থামলেন এবং কিছু চিন্তাভাবনা করলেন। অতঃপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "জাবালা, তুমি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছ। এখন বাদী ক্ষমা না করলে তোমাকে ইসলামী আইনের শাস্তি মাথা পেতে নিতে হবে এবং বাদীর হাতে পাল্টা একটা চপেটাঘাত খেতে হবে।”
স্তম্ভিত হয়ে জাবালা বললেন, "আমি একজন রাজা। আর ও হচ্ছে একজন সাধারণ কৃষক।”
হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, "তোমরা উভয়ে মুসলমান এবং আইনের চোখে সবাই সমান।"
জাবালা বললো, "যে ধর্মে রাজা ও একজন সাধারণ প্রজাকে সমান চোখে দেখা হয়, আমি তার আনুগত্য করতে পারিনে। ঐ চাষা যদি আমাকে চপেটাঘাত করে, তবে আমি ইসলাম ত্যাগ করবো।” (নাউযু বিল্লাহ)
হযরত ওমর ততোধিক কঠোর স্বরে জবাব দিলেন, "তোমার মত হাজার জাবালাও যদি ইসলাম ত্যাগ করে চলে যায়, তবে সেই ভয়ে ইসলামের একটি ক্ষুদ্রতম বিধিও লংঘিত হতে পারে না। তোমাকে এ শাস্তি পেতেই হবে। আর এ কথাও জেনে রেখ যে, ইসলাম কাউকে জোরপূর্বক মুসলমান বানায় না। তোমাকেও বানায়নি। কিন্তু ইসলাম ত্যাগ করা সহজ নয়। মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।”
হযরত ওমরের শেষোক্ত কথাটা শুনে জাবালা রাগে ও ভয়ে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে লাগলো। হযরত ওমরের নির্দেশে বাদী তৎক্ষণাত জাবালার মুখে ঠাস্ করে একটি চড় বসিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে নিল।
জাবালা ক্রোধে চক্ষু লাল করে বাদীর দিকে একবার তাকালো। অতঃপর রাগে গরগর করতে করতে কা'বার চত্তর ত্যাগ করে নীরবে চলে গেল। জানা যায়, এরপর জাবালা ইবনে আইহাম ইসলাম ত্যাগ করে প্রাণের ভয়ে সোজা রোম সম্রাটের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং সেখানেই জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো কাটায়।
📄 হযরত খাব্বাব (রাঃ) এর ত্যাগ ও কুরবানী
হযরত ওমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে নগ্ন তরবারী হাতে নিয়ে যেদিন রাসূল (সাঃ) কে হত্যা করতে রওয়ানা হয়েছিলেন, সেইদিন পথিমধ্যে নিজের বোন ও ভগ্নিপতির ইসলাম গ্রহণের খবর পেয়ে সাময়িকভাবে গন্তব্য স্থান পরিবর্তন করেন এবং প্রথমে বোন ভগ্নিপতিকে ইসলাম গ্রহণের শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বোনের বাড়ীতে গিয়ে দেখতে পান তারা কুরআন পড়ছে। আর যে ব্যক্তি কুরআন পড়াচ্ছিল তিনি ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবী খাব্বাব ইবনুল আরত। হযরত ওমর বাড়ীতে প্রবেশ করা মাত্রই খাব্বাব প্রাণভয়ে আত্মগোপন করেন। কেননা বোন ভগ্নিপতি রক্তের টানে প্রাণে রক্ষা পেলেও সেদিন খাব্বাবের বাঁচার কোন আশা ছিলনা ওমরের নগ্ন তরবারী থেকে। সেদিন যা হবার তা হলো। প্রথম সাক্ষাতে বোন ভগ্নিপতি কিছু মার খেলেও কুরআনের আয়াত ক'টি পড়ে তাঁর আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং তিনি রাসূলের (সাঃ) কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। খাব্বাবের সাথে হযরত ওমরের সেইদিন হয়েছিল প্রথম সাক্ষাত। তারপর দরিদ্র খাব্বাবের ওপর মক্কার কোরেশদের আরো অনেক নির্যাতন হয়েছে। হযরত ওমর শুনেছেন, কিন্তু প্রতিকার করতে পারেননি।
কিন্তু আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে হযরত ওমরের সামনে বসে আছেন, মহান ত্যাগী সাহাবী খাব্বাব। আজ ইসলাম বিজয়ী আসনে অধিষ্ঠিত। হযরত ওমর আজ মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা। তাওহীদ ও রিসালাতের সাথে সংঘর্ষে কুফর ও শিরক চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর হয়ে ইসলামের আলোয় চারদিক উদ্ভাসিত। কিন্তু হযরত ওমরের (রাঃ) প্রবল ইচ্ছা, খাব্বাবের সেই নির্যাতনের কাহিনীগুলো শুনবেন। তাই জিজ্ঞাসা করলেন, "ইসলাম গ্রহণের পর আপনার ওপর কি ধরনের নির্যাতন হয়েছে, একটু বলবেন?"
হযরত ওমরের প্রশ্ন হযরত খাব্বাবকে আবার দূর অতীতে টেনে নিয়ে গেল এবং মক্কার ১৩ বছরের সেই রক্তক্ষরা দিনগুলোকে তার চোখের সামনে হাজির করলো। সে নির্যাতন ঈমান ও একীনে উজ্জীবিত মর্দে মুমিনরা ছাড়া আর কেউ তেরো বছর তো দূরের কথা, তেরো দিনও বরদাশত করতে পারতো না। হযরত খাব্বাব কোন্ কাহিনী দিয়ে শুরু করবেন এবং কোন্টা বাদ দিয়ে কোন্টা বলবেন। তাই ভেবে ভেবে কয়েক মুহূর্ত নিরবে কাটিয়ে দিলেন। শেষে বলতে চেয়েও বলতে পারলেন না। অবশেষে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নিজের জামা খুলে কোমরের একটি অংশ আমীরুল মুমিনীনকে দেখালেন। জায়গাটা ছিল যখমের চিহ্নে পরিপূর্ণ। আমীরুল মুমিনীন দেখা মাত্র চিৎকার করে বলে উঠলেন:
"আল্লাহু আকবার! এই নাকি আপনার কোমর। আমি তো আজ পর্যন্ত কোন মানুষের এমন কোমর দেখিনি।"
খাব্বাব বললেন, "জি, আমীরুল মুমিনীন, কতবার যে আমাকে লোহার বর্মসহ তপ্ত মরুভূমিতে টেনে হিচড়ে বেড়ানো হয়েছে এবং কতবার যে আমার কোমরের চর্বিতে ওদের আগুন নিভেছে, তা আমি স্মরণ করতে পারিনা। তারপর আল্লাহর শোকর যে, একদিন আমরা সমস্ত নির্যাতন থেকে মুক্তি পেলাম।"
সহসা হযরত খাব্বার কান্না শুরু করে দিলেন।
হযরত ওমর বললেন, "খাব্বাব, আজ কেন কাঁদছেন?"
হযরত খাব্বাব চোখের পানি ফেলতে ফেলতে জবাব দিলেন: "আমি কাঁদছি এজন্য যে, জেহাদের পর জেহাদ করে বিজয় অর্জন করার পর আল্লাহ আমাদের জন্য সুখ সমৃদ্ধি ও ধন দৌলতের দ্বার খুলে দিয়েছেন। আমাদের মাথার ওপর সম্মান ও মর্যাদার পতাকা উড়ছে। আমার আশংকা হয় যে আমাদের ক্ষুদ্র ও সৎ কাজগুলোর প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হচ্ছে কিনা এবং আখেরাতে আমাদের খালি হাতে উঠতে হবে কিনা।"
এই নিঃস্বার্থ ত্যাগী পুরুষ ইন্তিকালের সময় ওসিয়ত করেন, "আমাকে তোমরা লোকালয়ে নয়, কুফার জংগলে কবর দিও। জংগল আমাকে ডাকছে।"
তাঁর ইন্তিকালের পর একদিন হযরত আলী তাঁর কবরের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বললেন, "আল্লাহ খাব্বাবের ওপর রহমত করুন। তিনি সেচ্ছায় ও সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করেন, সানন্দে হিজরত করেন, জেহাদে জীবন কাটান এবং মুসিবতের পর মুসিবত বরদাশত করেন। অথচ নিজের প্রয়োজনের চেয়ে এক চুল পরিমাণও বেশী সম্পদ যোগাড় করেননি।"
📄 হযরত ওমরের (রাঃ) শাসনে প্রজাদের সম-অধিকার
মিশর বিজয়ী সেনাপতি আমর ইবনুল আস তখন মিশরের গভর্ণর। তাঁর শাসনে মিশরের জনগণ বেশ শান্তিতেই কাটাচ্ছিল। কিন্তু তাঁর একটা বেয়াড়া ছেলে তাঁর ন্যায়পরায়নতার সুনাম প্রায় নষ্ট করতে উদ্যত হয়েছিল। সে যখনই পথে বেরুত, সবাইকে নিজের চালচলন দ্বারা বুঝিয়ে দিত যে, সে কোন সাধারণ মানুষ নয়, বরং গভর্ণরের ছেলে।
একদিন সে জনৈক মিশরীয় খৃস্টানের ছেলেকে প্রহার করলো। দরিদ্র মিশরীয় গভর্ণরের কাছে তার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস পেল না। তাই নীরবে হজম করলো। কয়েকদিন পর তার জনৈক প্রতিবেশী মদীনা থেকে ফিরে এসে জানালো যে, খলিফা ওমর অত্যন্ত ন্যায়পরায়ন শাসক। তিনি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সম-অধিকার নিশ্চিত করেন এবং কেউ কারো ওপর যুলুম করেছে জানলে তাকে কঠোর শাস্তি দেন। এ কথা শুনে ঐ মিশরীয় খৃস্টান একটি উটের পিঠে চড়ে দীর্ঘ সতেরো দিন চলার পর মদীনায় খলিফার কাছে পৌ ছলো এবং গভর্ণরের ছেলের বিপক্ষে মোকদ্দমা দায়ের করলো। হযরত ওমর তৎক্ষণাৎ হযরত আমর ইবনুল আস ও তার ছেলেকে মদীনায় ডাকিয়ে আনলেন। অতঃপর বিচার বসলো।
সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা হযরত আমর ইবনুল আসের (রাঃ) ছেলে দোষী সাব্যস্ত হলো। খলিফা ওমর (রাঃ) অভিযোগকারীর ছেলেকে দেখিয়ে বললেন, সে তোমাকে যেভাবে যে কয়বার প্রহার করেছে তুমিও সেই কয়বার তদ্রুপ প্রহার কর। ছেলেটি যথাযথভাবে প্রতিশোধ নিল।
তারপর খলিফা বললেন, "প্রজারা শাসকের দাস নয়। শাসকরা প্রজাদের সেবক। প্রজারা ঠিক তেমনি স্বাধীন যেমন তাদের মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ট হবার সময় স্বাধীন ছিল।"
📄 হযরত ওমর (রাঃ) ও গভর্নর হরমুযান
পারস্যের নাহাওয়ান্দ্র প্রদেশের গভর্ণর হরমুযান ইসলামের এক কট্রর দুশমন ছিল। সে মুসলমানদের সাথে পারস্যের যুদ্ধ বাধানোর প্রধান হোতা ছিল। সে নিজেও খুবই শৌর্য বীর্যের সাথে যুদ্ধ করেছিল। অবশেষে হরমুযান মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে ও কারাবন্দী হয়। কারাবন্দী হবার পর সে ভেবেছিল, এবার আর তার রেহাই নেই। মুসলমানরা হয় তাকে দাস হিসাবে বিক্রী করে দেবে, নচেত মৃত্যুদন্ড দেবে। কারণ তার অতীত কার্যকলাপ দ্বারা সে মুসলমানদের সাথে নিজের সম্পর্ক খুবই খারাপ করে ফেলেছিল। কিন্তু তাকে এই দুই শাস্তির কোনটাই দেয়া হলো না। তাকে কিছু করের বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হলো। হরমুযান নিজের রাজধানীতে ফিরে এল, তৎক্ষণাৎ আরো দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে বিদ্রোহী তৎপরতা শুরু করলো এবং এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে ফিরে এলো। এবারও হরমুযান ধরা পরে বন্দী হলো। হরমুযানকে পাকড়াও করে যখন হযরত ওমরের কাছে আনা হলো তখন হযরত ওমর তাঁর উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করছিলেন। বন্দী এবার তার মৃত্যুদন্ড সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিত ছিল। প্রতি মুহূর্তে সে তাই মৃত্যুর আশংকা করছিল।
সহসা হযরত ওমর জিজ্ঞাসা করলেন: তুমিই নাহাওয়ান্দ্রের বিদ্রোহী গভর্ণর?
হরমুযান : জ্বী, আমিই।
হযরত ওমর: তুমিই কি সেই ব্যক্তি, যে বারবার মুসলমানদের সাথে চুক্তি ভংগ করে?
হরমুযান : জ্বী, আমিই।
হযরত ওমর : এ ধরনের অপরাধের শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড, তা তুমি জান?
হরমুযান : জ্বী, জানি।
হযরত ওমর: বেশ, তাহলে তুমি কি এই শাস্তি এক্ষুনি নিতে প্রস্তুত?
হরমুযান : আমি প্রস্তুত। তবে মৃত্যুর পূর্বে আপনার নিকট আমার একটি মাত্র আবেদন আছে।
হযরত ওমর: সেটি কী?
হরমুযান : আমি খুব পিপাসা বোধ করছি। আমি এক গ্লাস পানি চাইতে পারি?
হযরত ওমর: অবশ্যই।
এই সময় হযরত ওমরের নির্দেশে তাঁকে এক গ্লাস পানি দেয়া হলো।
হরমুযান : আমীরুল মু'মিনীন, আমি আশংকা করছি যে, আমি পানি খাওয়ার সময়েই আমার মস্তক ছিন্ন করা হতে পারে।
হযরত ওমর : কখনো নয়। তোমার এই পানি খাওয়া শেষ হবার আগে কেউ তোমার চুলও স্পর্শ করবে না।
হরমুযান : (একটু থেমে) আমীরুল মু'মিনীন, আপনি আমাকে কথা দিয়েছেন যে আমি এই পানি খাওয়া শেষ না করা পর্যন্ত আপনারা আমার চুলও স্পর্শ করবেন না। আমি পানি পান করবো না। (এই বলেই সে পানি ঢেলে ফেলে দিল।) এখন আপনি আমাকে হত্যা করতে পারেন না।
হযরত ওমর : (মুচকি হেসে) ওহে গভর্ণর, এটা তোমার চালাকী! যা হোক, ওমর যখন কথা দিয়েছে, তখন সে তার কথা রাখবেই। যাও, তুমি মুক্ত।
এর কিছুকাল পরে একদিন হরমুযান একদল সঙ্গী পরিবেষ্টিত হয়ে আবার মদীনায় এল এবং হযরত ওমরের সাথে সাক্ষাত করলো। সে বললো, "আমীরুল মুমিনীন, এবার আমি নতুন জীবনের সন্ধানে এসেছি। আমাদের সবাইকে ইসলামে দীক্ষিত করুন।"