📄 হযরত ওমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ
ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, কুরাইশ প্রতিনিধি আমর ইবনুল আ'স ও আবদুল্লাহ ইবনে রবীয়া' যখন আবিসিনিয়া থেকে ফিরে এল এবং সেখানে হিজরত করে যাওয়া মুসলমানদেরকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলো না, তার অল্প কয়েকদিন পরই ওমর বিন খাত্তাবের ন্যায় দুর্দান্ত সাহসী ও প্রতাপশালী ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ও হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণে রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীগণের মনোবল যথেষ্ট বেড়ে যায় এবং তারা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অনুভব করেন। এর আগে তাঁরা কাবার চত্তরে নামায পড়ারও সাহস পেতেন না। ইসলাম গ্রহণের পর ওমর ঝুঁকি নিয়ে কাবার চত্তরে নামায পড়েন এবং তাঁর সাথে অন্যান্য সাহাবীগণও নামায পড়েন।
উম্মে আবদুল্লাহ বিনতে আবি খাসয়ামা (রাঃ) বলেন যে, আমরা একে একে সবাই আবিসিনিয়ায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার স্বামী আমের তখন একটা পারিবারিক কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। সহসা ওমর ইবনুল খাত্তাব এসে আমার কাছে দাঁড়ালেন। তখনো তিনি মোশরেক। তার জুলুম অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ ছিলাম। ওমর বললেনঃ হে উম্মে আবদুল্লাহ! আপনারা বুঝি বিদায় হচ্ছেন? আমি বললামঃ হাঁ, আল্লাহর কসম। আল্লাহর পৃথিবীতে বেরিয়ে পড়বো। তোমরা আমাদেরকে অনেক কষ্ট দিয়েছ, অনেক নির্যাতন চালিয়েছ। আল্লাহ এ অবস্থা থেকে আমদেরকে উদ্ধার করবেন। ওমর বললেনঃ "আল্লাহ আপনাদের সাথী হোন।” তার কথায় এমন একটা সহানুভূতির ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল যা আর কখনো দেখিনি। এরপর ওমর ইবনুল খাত্তাব চলে গেলেন। তবে আমার মনে হচ্ছিল, আমাদের দেশ ত্যাগের খবরে তিনি মর্মাহত। কিছুক্ষণ পর আমের প্রয়োজন সেরে ঘরে ফিরে এলো। আমি তাকে বললামঃ "ওহে আবদুল্লাহর বাবা! এইমাত্র ওমর এসেছিল। আমাদের প্রতি তার সেকি সহানুভূতি ও উদ্বেগ, তা যদি তুমি দেখতে!" আমের বললেনঃ তুমি কি তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আশান্বিত? আমি বললামঃ হাঁ। সে বললোঃ খাত্তাবের গাধা ইসলাম গ্রহণ করলেও তুমি যাকে দেখেছ সে (খাত্তাবের ছেলে ওমর) ইসলাম গ্রহণ করবে না। ইসলামের প্রতি ওমরের যে প্রচন্ড বিদ্বেষ, হঠকারিতা ও একগুয়েমির প্রকাশ দেখা হচ্ছিল, তার দরুণ আমের হতাশ হয়েই অনুরূপ কথা বলেছিল।
হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণের কারণ: ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, 'ওমরের বোন ফামিতা বিনতে খাত্তাব ও তার স্বামী সাঈদ বিন যায়েদ বিন আমর বিন নুফায়েল ওমরের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা তাদের ইসলাম গ্রহণের কথা ওমরের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম বিন আবদুল্লাহ আন নাহহামও একইভাবে গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। ওমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনু আদি বিন কা'বের অন্তর্ভূক্ত এই ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেননি। খাব্বার ইরনুল আরাত (বনু তামীম বংশোদ্ভূত এই সাহাসী’ জাহেলিয়াতের যুগে তরবারী তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং বনু খোযায়া গোত্রের উম্মে আনমার নাম্মী মহিলার মুক্ত গোলাম ছিলেন) নামক অপর এক নওমুসলিম গোপনে ফাতিমা বিনতে খাত্তাবকে কুরআন পড়িয়ে যেতেন। একদিন ওমর ইবনুল খাত্তাব উন্মুক্ত তরবারী হাতে নিয়ে রাসূল (সাঃ) ও তাঁর একদল সাহাবীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, প্রায় ৪০ জন নারী ও পুরুষ সাহাবীসহ রাসূল (সাঃ) সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী একটা ঘরে সমবেত রয়েছেন। রাসূল (রাঃ) এর সাথে তাঁর চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুতালিব, আবু বকর সিদ্দীক বিন আবু কুহাফা ও আলী বিন আবু তালেবসহ এমন কিছু সংখ্যক মুসলমান ছিলেন যারা রাসূল (সাঃ) এর সাথে মক্কায় অবস্থান করছিলেন এবং আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের সাথে হিজরত করেননি। পথে নাঈম বিন আবদুল্লাহর সাথে ওমরের দেখা হলো। তিনি বললেন, কোথায় চলেছ ওমর? ওমর বললেন, “ধর্মচ্যুত মুহাম্মদের সন্ধানে চলেছি, যে কুরাইশ বংশে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, তাদের বুদ্ধিমানদেরকে বোকা সাব্যস্ত করেছে, তাদের অনুসৃত ধর্মের নিন্দা করেছে এবং তাদের দেবদেবীকে গালাগাল করেছে। আমি ওকে হত্যা করবো।" নাঈম বললেন, “ওহে ওমর, আল্লাহ্র কসম, তুমি আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হয়েছ। তুমি কি মনে কর, মুহাম্মদকে হত্যা করার পর বনু আবদ মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে আর তুমি পৃথিবীর ওপর অবাধে বিচরণ করে বেড়াতে পারবে? তোমার কি উচিত নয় আগে নিজের পরিবার পরিজনের দিকে মনোনিবেশ করা এবং তাদেরকে শোধরানো?” ওমর বললেন: "আমার পরিবার পরিজনের কি হলো?" নাঈম বললেন, "তোমার ভগ্নিপতি ও চাচাতো ভাই সাঈদ বিন যায়েদ বিন আমর এবং তোমার বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব। আল্লাহর কসম, তাঁরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুহাম্মদের ধর্ম অনুসরণ করছে। পারলে তাদেরকে সামলাও।” ওমর তৎক্ষণাৎ ফিরে গেলেন তার বোন ও ভগ্নিপতির বাড়ির দিকে। যখন তিনি তাদের কাছে রওনা হলেন তখন তাদের কাছে খাব্বাব ইবনুল আরাত ছিলেন। তিনি তাদেরকে পবিত্র কুরআনের একটি অংশ হাতে নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। এই অংশটিতে ছিল সূরা ত্বা-হা। ওমরের আওয়াজ শুনে খাব্বাব গা ঢাকা দিলেন। তিনি ঘরের কোন এক অংশে লুকিয়ে রইলেন। আর ফাতেমা কুরআনের অংশটি নিজের উরুর নিচে চাপা দিয়ে রাখলেন।
ঘরের কাছাকাছি পৌছার পর ওমর খাব্বাবের পড়ার আওয়াজ শুনেছিলেন। ঘরে ঢুকে তিনি বললেন, “একটা দুর্বোধ্য বাণী আবৃত্তি করার আওয়াজ শুনছিলাম। ওটা কি?” তারা উভয়ে বললেন, "না, আপনি কিছুই শোনেননি।” ওমর বললেন, "নিশ্চয়ই শুনেছি। আর আল্লাহর কসম, এটাও জেনেছি যে, তোমরা দু'জনে মুহাম্মাদের অনুসারী হয়ে গেছ।”
কথাটা বলে ভগ্নিপতি সাঈদকে প্রবলভাবে জাপটে ধরলেন। তার বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে গেলে তিনি তাকে মেরে জখম করে দিলেন। এই কান্ড ঘটানোর পর তার বোন ও ভগ্নিপতি একযোগে তাঁকে বললেন, “হাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। এখন যা করতে চান করুন।” ওমর' যখন দেখলেন তার বোনের শরীর রক্তাক্ত, তখন অনুতপ্ত হলেন।
তিনি স্বীয় বোনকে বললেন, "আমাকে এই পুস্তিকাটি দাও, যা এইমাত্র তোমাদেরকে পড়তে শুনলাম। আমি একটু দেখবো মুহাম্মাদ কি জিনিস নিয়ে এসেছে।" ওমর লেখাপড়া জানতেন। তিনি এ কথা বললে তাঁর বোন তাঁকে বললো, "আমার ভয় হয় আপনি নষ্ট করে ফেলেন কিনা। ওমর বললেন, "ভয় পেয়ো না!” অতঃপর তিনি নিজের দেবদেবীর শপথ করে বললেন, "ওটি আমি পড়েই তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবো।”
ওমরের এ কথাটা শুনে ফাতিমার মনে আশার সঞ্চার হলো যে, ওমর ইসলাম গ্রহণ করতে পারে। তিনি বললেন, "ভাইজান। আপনি যে অপবিত্র! কেননা আপনি এখনো মোশরেক। অথচ এই পবিত্র গ্রন্থকে পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া স্পর্শ করতে পারে না।” ওমর তৎক্ষণাৎ উঠে চলে গেলেন এবং গোসল করে এলেন। এবার ফাতিমা তাকে পুস্তিকাখানি দিলেন। তাতে সূরা ত্বা-হা লিখিত ছিল। তিনি তা পড়লেন। প্রথম অংশটি পড়েই বললেনঃ "আহ্! কি সুন্দর কথা! কী মহৎ বাণী!” তাঁর এ উক্তি শুনে খাব্বাব তাঁর সামনে বেরিয়ে এলেন। তিনি তাঁকে বললেন, "হে ওমর! আল্লাহর কসম, আমার মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে যে আল্লাহ হয়তো আপনাকে তাঁর নবীর দাওয়াত গ্রহণের জন্য মনোনীত করেছেন। আমি গতকাল শুনলাম রাসূল (সাঃ) দোয়া করছেন, “হে আল্লাহ! তুমি আবুল হিকাম বিন হিশাম অথবা ওমর ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি কর। অতএব, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হোন, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হোন হে ওমর।"
ওমর বললেন, "হে খাব্বাব! আমাকে মুহাম্মাদের সন্ধান দাও। আমি তাঁর কাছে যেয়ে ইসলাম গ্রহণ করবো।” খাব্বাব বললেন, "তিনি সাফা পাহাড়ের নিকট একটি বাড়িতে আছেন। সেখানে তাঁর সাথে তাঁর একদল সাহাবী রয়েছেন।” ওমর তাঁর তরবারী আগের মতই খোলা অবস্থায় ধরে নিয়ে রাসূল (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীদের কাছে চললেন। সেখানে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে তাঁর আওয়াজ শুনে রাসূল (সাঃ) এর জনৈক সাহাবী দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে তাকালেন। দেখলেন ওমর মুক্ত তরবারী হাতে দাঁড়িয়ে। তিনি শংকিত চিত্তে রাসূল (সাঃ) এর কাছে ফিরে গিয়ে বললেনঃ “হে রাসূলুল্লাহ! এ যে ওমর ইবনুল খাত্তাব একেবারে নগ্ন তরবারী হাতে!” হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব বললেন, “ওকে ভেতরে আসার অনুমতি দিন। সে যদি কোন শুভ কামনা নিয়ে এসে থাকে, আমরা তার প্রতি বদান্যতা দেখাবে। আর যদি কোন কু-বাসনা নিয়ে এসে থাকে তাহলে ওর তরবারী দিয়েই ওকে হত্যা করবো।” রাসূল (সাঃ) বললেন, "ওকে ভেতরে আসতে দাও।” উক্ত সাহাবী তাকে ভেতরে আসতে দিলেন। রাসূল (সাঃ) নিজে উঠে তার কাছে এগিয়ে গেলেন এবং নিজের কক্ষে নিয়ে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন।
রাসূল (সাঃ) তাঁর পাজামা বাঁধার জায়গা অথবা যেখানে চাদরের দুই কোণা মিলিত হয়, সেখানটা ধরে তাকে প্রবল জোরে আকর্ষণ করলেন এবং বললেন, "কি হে খাত্তাবের পুত্র! তোমার এখানে আগমন ঘটলো কিভাবে! আমার তো মনে হয়, আল্লাহ তোমার ওপর কোন বিপর্যয় না নামানো পর্যন্ত তুমি ফিরবে না।” ওমর বললেন, “হে রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার কাছে এসেছি আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের ওপর ও আপনার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু আসে তার ওপর ঈমান আনবার জন্য।” এ কথা শোনামাত্র রাসূল (সাঃ) এমন জোরে "আল্লাহু আকবার" বলে উঠলেন যে, ঐ ঘরের ভেতরে রাসূল (সাঃ) এর যে কয়জন সাহাবী ছিলেন সবাই বুঝলেন যে, ওমর ইসলাম গ্রহণ করেছে।
এরপর রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীগণ যার যার জায়গায় চলে গেলেন। হামযার পর ওমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণে তাদের মনোবল ও আত্মমর্যাদা বেড়ে গেল। তারা নিশ্চিত হলেন যে, ওঁরা দুজন রাসূল (সাঃ) এর প্রতিরক্ষায় অবদান রাখবেন এবং ইসলামের দুশমনদের মোকাবিলায় মুসলমানদের সহযোগিতা করবেন।
ওমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আতা ও মুজাহিদের বর্ণনা : ইবনে ইসহাক বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে আবি নুজাইহ আল মাক্কী স্বীয় শিষ্য আতা, মুজাহিদ অথবা অন্যান্য বর্ণনাকারীদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ওমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে যে তিনি স্বয়ং নিম্নরূপ বলতেনঃ "আমি ইসলামের কট্টর বিরোধী ছিলাম। জাহেলী যুগে আমি মদের খুব ভক্ত ছিলাম। মদ পেলে খুবই আনন্দিত হতাম। আমাদের একটা মজলিশ বসতো উমার বিন আবদ বিন ইমরান আল মাখযুমীর পারিবারিক বাসস্থানের নিকটস্থ খাজওয়ারা নামক স্থানে। সেখানে কুরাইশের বহু লোক সমবেত হতো। একদিন রাতে ঐ আসরে আমার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে গেলাম। কিন্তু তাদের কাউকেই পেলাম না। এরপর ভাবলাম, মক্কার অমুক মদ বিক্রেতার কাছে গেলে হয়তো মদ খেতে পারতাম। তার উদ্দেশ্যে গেলাম। কিন্তু তাকে পেলাম না। এরপর মনে মনে বললাম, কা'বা শরীফে গিয়ে যদি সাতবার অথবা সত্তুরবার তওয়াফ করতাম, মন্দ হতো না। অতঃপর কা'বা শরীফে তওয়াফ করার জন্য মসজিদুল হারামে উপনীত হলাম। সেখানে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তখনো সিরিয়ার দিকে মুখ করে নামায পড়তেন। নিজের ও সিরিয়ার মাঝখানে কা'বা শরীফকে রাখতেন। রূকনে আসওয়াদ ও রূকনে ইয়ামানীর মাঝে বসে তিনি নামায পড়তেন। তাঁকে দেখেই আপন মনে বললাম, আল্লাহর কসম, আজকের রাতটা যদি মুহাম্মাদের (সাঃ) আবৃত্তি শুনে কাটিয়ে দিতাম এবং সেকি বলে তা অবহিত হতাম, তাহলেও কাজ হতো। কিন্তু সেই সাথে এটাও ভাবলাম যে, মুহাম্মাদের (সাঃ) খুব কাছে গিয়ে যদি শুনি তাহলে তিনি ভয় পেয়ে যাবেন। তাই হাজরে আসওয়াদের দিক থেকে এলাম, কা'বা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম। রাসূল (সাঃ) তখনো যথারীতি দাঁড়িয়ে নামাযে কুরআন পাঠ করে যাচ্ছেন। অবশেষে আমি তাঁর ঠিক সামনে কা'বার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
যখন কুরআন শুনলাম, আমার মন নরম হয়ে গেল। আমি কেঁদে দিলাম। ইসলাম আমার মনমগজ দখল করে ফেললো। রাসূল (সাঃ) নামায শেষ করে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি ওখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি যখন কা'বা থেকে যেতেন, ইবনে আবি হুসাইনের বাড়ির কাছ দিয়ে যেতেন। এই বাড়ী ছিল তার সাফা ও মারওয়ার দৌ ড়েরও শেষ সীমা। সেখান থেকে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের বাড়ী এবং আজহার বিন আবদ আওফ আযযুহরীর বাড়ির মাঝখান দিয়ে, তারপর আখনাস বিন শুরাইকের বাড়ী হয়ে নিজের বাড়ীতে চলে যেতেন। দারুর রাকতাতে ছিল রাসূল (সাঃ) এর বাড়ী। এই জায়গাটি ছিল আবু সুফিয়ানের ছেলে মুয়াবীয়ার মালিকানাধীন। ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (সাঃ) এর পিছু পিছু চলতে লাগলাম। যখন তিনি আব্বাসের বাড়ী ও ইবনে আযহারের বাড়ীর মাঝখানে পৌছলেন, তখন তাঁকে গিয়ে ধরলাম। আমার আওয়ায শুনেই রাসূল (সাঃ) আমাকে চিনে ফেললেন। রাসূল (সাঃ) মনে করলেন আমি তাঁকে কষ্ট দিতে এসেছি। তাই তিনি আমাকে একটা ধমক দিলেন। ধমক দিয়েই আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ওহে খাত্তাবের পুত্র! এ মুহূর্তে তুমি কি উদ্দেশ্যে এসেছ?” আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং তাঁর কাছে যা কিছু আল্লাহর কাছ থেকে আসে, তার প্রতি ঈমান আনার উদ্দেশ্যে।” এ কথা শুনে রাসূল (সাঃ) আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন। তারপর বললেন, "হে ওমর! আল্লাহ তোমাকে হেদায়েত করেছেন।” তারপর তিনি আমার বুকে হাত বুলালেন এবং আমি যাতে ইসলামের ওপর অবিচল থাকি সে জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর রাসূল (সাঃ) এর কাছ থেকে বিদায় হলাম এবং তিনি নিজের বাড়ীতে প্রবেশ করলেন।"
ইবনে ইসহাক বলেনঃ ওমরের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে উপরোক্ত দুই ধরনের বিবরণের কোনটি সঠিক তা আল্লাহই ভালো জানেন।
ইসলামের ওপর ওমরের দৃঢ়তাঃ ইবনে ইসহাক বলেনঃ আবদুল্লাহ ইবনে উমারের মুক্ত গোলাম না'ফে ইবনে উমার থেকে বর্ণনা করেন যে, আমার পিতা ওমর যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন জিজ্ঞাসা করলেন যে, কুরাইশের কোন্ ব্যক্তি সর্বাধিক প্রচার মুখর? তাকে বলা হলো, জামীল বিন মুয়াম্মার আল-জুম্হী। তিনি তৎক্ষণাৎ তার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে উমার বলেনঃ আমি তাঁর পেছনে পেছনে ছুটলাম এবং তিনি কি করেন দেখতে লাগলাম। তখন আমি একজন বালক হলেও যা কিছু দেখি সবই বুঝতে পারি। ওমর (রাঃ) জামীলের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেনঃ "হে জামীল! তুমি জান, আমি ইসলাম গ্রহণ ও মুহাম্মাদের ধর্মে প্রবেশ করেছি।" ইবনে ওমর বলেনঃ জামীল তার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে চাদর গুটিয়ে হাটতে লাগলো। ওমর (রাঃ) তার পিছু পিছু চললেন। আমিও আমার পিতার পিছু পিছু চললাম। চলতে চলতে মসজিদুল হারামের দরজার ওপর পৌঁছে সে বিকট চিৎকার করে বললো, "হে কুরাইশ জনমন্ডলী! শুনে নাও, ওমর ধর্মচ্যুত হয়ে গেছে।” এ সময় কুরাইশ নেতৃবৃন্দ কা'বার চত্ত্বরে তাদের আড্ডায় বসেছিল। ওমর তার পেছনে দাঁড়িয়ে বললেনঃ "জামীল মিথ্যা বলেছে, আমি ধর্মচ্যুত হইনি, ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) তার বান্দা ও রাসূল।" সঙ্গে সঙ্গে সকলে তার দিকে মারমুখী হয়ে ছুটে গেল। ওমর ও কুরাইশ জনতার মধ্যে লড়াই চললো দুপুর পর্যন্ত। এক সময় ওমর ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে বসে পড়লো। মারমুখী জনতা তখনো তার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে। ওমর বলতে লাগলেনঃ তোমরা যা খুশী কর। আল্লাহর কসম, আমরা যদি তিনশো লোক হতাম, তাহলে আমরা তোমাদের জন্য রণাঙ্গন ছেড়ে দিতাম অথবা তোমরা ছেড়ে দিতে।” (অর্থাৎ মুসলমানদের সংখ্যা বেশি হলে তোমরা এত মারমুখো হতে না।) উভয় পক্ষ যখন এই পর্যায়ে, তখন সহসা সেখানে একজন প্রবীণ কুরাইশ সর্দারের আবির্ভাব ঘটলো। মূল্যবান ইয়ামানী চাদর ও নকশাদার আলখেল্লা পরিহিত এই বৃদ্ধ এসে তাদের কাছে দাঁড়ালেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের কি হয়েছে? তারা বললো, "ওমর ধর্মচ্যুত হয়ে গেছে।” বৃদ্ধ বললেনঃ "তাতে কি? থামো। একজন মানুষ নিজের ইচ্ছায় একটা জিনিস গ্রহণ করেছে। তোমরা তার কি করতে চাও? তোমরা কি ভেবেছ, বনু আদি বিন কা'ব [ওমর (রাঃ)-এর গোত্র] তাদের সদস্যকে তোমাদের হাতে এভাবেই ছেড়ে দেবে? ওকে ছেড়ে দাও।” ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ এ কথার পর তারা নিজেদের উত্তেজিত ভাবাবেগকে সংগত করলো। পরে মদীনায় হিজরত করার পর আমার পিতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলামঃ আব্বা, ঐ বৃদ্ধটি কে, যিনি আপনার ইসলাম গ্রহণের দিন মারমুখো জনতাকে ধমক দিয়ে আপনার কাছ থেকে হটিয়ে দিয়েছিলেন? তিনি বললেন, উনি আস ইবনে ওয়ায়েল আস্সাহমী।
ইবনে হিশাম বলেনঃ আমাকে কোন কোন বিদ্বান ব্যক্তি বলেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ও তাঁর পিতার কথোপকথনটি এ রকম ছিলঃ ইবনে ওমরঃ আব্বা! ঐ লোকটি কে, যিনি আপনার ইসলাম গ্রহণের দিন মক্কাতে যারা আপনার ওপর আক্রমণ করেছিল, তাদেরকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলেন? আল্লাহ উনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।”
হযরত ওমর (রাঃ)ঃ "হে বৎস! উনি আ'স ইবনে ওয়ায়েল। আল্লাহ তাঁকে কোনই উত্তম প্রতিদান যেন না দেন।" কারণ ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত ভালো, কাজের প্রতিদান পাওয়া যায় না। আ'স ইবনে ওয়ায়েল মোশরেক অবস্থায় এ কাজটি করেন এবং কখনো মুসলমান হননি।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেছেনঃ "সেই রাত্রে ইসলাম গ্রহণ করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম যে মক্কাবাসীর মধ্যে যে ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর সবচেয়ে কট্টর দুশমন, তার কাছে যাবো এবং তাকে জানাবো যে, আমি মুসলমান হয়ে গেছি। ভেবে দেখলাম, এই ব্যক্তিটি তো আবু জাহল ছাড়া আর কেউ নয়।” উল্লেখ্য যে, ওমর (রাঃ) আবু জাহলের আপন বোন খানতামা বিনতে হিশাম ইবনুল মুগীরার পুত্র ছিলেন। যাহোক, ওমর বলেনঃ আমি পরদিন সকালে তার কাছে গিয়ে তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়লাম। আবু জাহল আমার কাছে বেরিয়ে এলো এবং বললোঃ "আমার ভাগ্নেকে স্বাগত! তুমি কি খবর নিয়ে এসেছ ওমর?” আমি বললামঃ "মামা, আমি আপনাকে জানাতে এসেছি যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি ঈমান এনেছি। তিনি যে বিধান নিয়ে এসেছেন তাও সত্য বলে মেনে নিয়েছি।” এরপর তিনি আমার মুখের ওপর ঠাস্ করে দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং বললেনঃ "ধিক তোমাকে এবং ধিক তোমার বহন করে আনা সংবাদকে।"
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেনঃ হযরত ওমরের (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ ছিল একটি বিজয়, তাঁর মদীনায় হিজরত ছিল আল্লাহর সাহায্য স্বরূপ এবং তাঁর খিলাফাত ছিল আল্লাহর রহমত স্বরূপ।
শিক্ষাঃ (১) পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করেই হযরত ওমর (রাঃ) হেদায়াত লাভ করেছিলেন। তাই ইসলামের পুনরুজ্জীবন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যারাই কাজ করতে চায়, কেয়ামত পর্যন্ত তাদের এ কাজ সরাসরি কুরআন দিয়েই শুরু করতে হবে।
(২) রাসূল (সাঃ) হযরত ওমরের নাম ধরে দোয়া করতেন তাঁর হেদায়াতের জন্য। তাই রাসূল (সাঃ) এর পদানুসরণ করে আমাদেরও ইসলামের শত্রুদের হেদায়াতের জন্য নাম ধরে ধরে দোয়া করা উচিত। শুধু প্রচার ও শিক্ষা দান করেই ক্ষান্ত থাকা উচিত নয়। কেননা হেদায়াতের আসল চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে রয়েছে।
(৩) আবিসিনিয়ায় হিজরতের পর মক্কার অবস্থা ছিল চরম নৈরাশ্যজনক। কিন্তু এহেন পরিস্থিতিতেও আল্লাহ তায়ালা হযরত ওমরের (রাঃ) মত ব্যক্তিত্বকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সুতরাং কোন পরিস্থিতিতেই মুসলামানদের হতাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তায়ালা অকল্পনীয়ভাবে সাহায্য পাঠাতে পারেন।
ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, কুরাইশ প্রতিনিধি আমর ইবনুল আ'স ও আবদুল্লাহ ইবনে রবীয়া' যখন আবিসিনিয়া থেকে ফিরে এল এবং সেখানে হিজরত করে যাওয়া মুসলমানদেরকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলো না, তার অল্প কয়েকদিন পরই ওমর বিন খাত্তাবের ন্যায় দুর্দান্ত সাহসী ও প্রতাপশালী ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ও হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণে রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীগণের মনোবল যথেষ্ট বেড়ে যায় এবং তারা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অনুভব করেন। এর আগে তাঁরা কাবার চত্তরে নামায পড়ারও সাহস পেতেন না। ইসলাম গ্রহণের পর ওমর ঝুঁকি নিয়ে কাবার চত্তরে নামায পড়েন এবং তাঁর সাথে অন্যান্য সাহাবীগণও নামায পড়েন।
উম্মে আবদুল্লাহ বিনতে আবি খাসয়ামা (রাঃ) বলেন যে, আমরা একে একে সবাই আবিসিনিয়ায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার স্বামী আমের তখন একটা পারিবারিক কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। সহসা ওমর ইবনুল খাত্তাব এসে আমার কাছে দাঁড়ালেন। তখনো তিনি মোশরেক। তার জুলুম অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ ছিলাম। ওমর বললেনঃ হে উম্মে আবদুল্লাহ! আপনারা বুঝি বিদায় হচ্ছেন? আমি বললামঃ হাঁ, আল্লাহর কসম। আল্লাহর পৃথিবীতে বেরিয়ে পড়বো। তোমরা আমাদেরকে অনেক কষ্ট দিয়েছ, অনেক নির্যাতন চালিয়েছ। আল্লাহ এ অবস্থা থেকে আমদেরকে উদ্ধার করবেন। ওমর বললেনঃ "আল্লাহ আপনাদের সাথী হোন।” তার কথায় এমন একটা সহানুভূতির ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল যা আর কখনো দেখিনি। এরপর ওমর ইবনুল খাত্তাব চলে গেলেন। তবে আমার মনে হচ্ছিল, আমাদের দেশ ত্যাগের খবরে তিনি মর্মাহত। কিছুক্ষণ পর আমের প্রয়োজন সেরে ঘরে ফিরে এলো। আমি তাকে বললামঃ "ওহে আবদুল্লাহর বাবা! এইমাত্র ওমর এসেছিল। আমাদের প্রতি তার সেকি সহানুভূতি ও উদ্বেগ, তা যদি তুমি দেখতে!" আমের বললেনঃ তুমি কি তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আশান্বিত? আমি বললামঃ হাঁ। সে বললোঃ খাত্তাবের গাধা ইসলাম গ্রহণ করলেও তুমি যাকে দেখেছ সে (খাত্তাবের ছেলে ওমর) ইসলাম গ্রহণ করবে না। ইসলামের প্রতি ওমরের যে প্রচন্ড বিদ্বেষ, হঠকারিতা ও একগুয়েমির প্রকাশ দেখা হচ্ছিল, তার দরুণ আমের হতাশ হয়েই অনুরূপ কথা বলেছিল।
হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণের কারণ: ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, 'ওমরের বোন ফামিতা বিনতে খাত্তাব ও তার স্বামী সাঈদ বিন যায়েদ বিন আমর বিন নুফায়েল ওমরের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা তাদের ইসলাম গ্রহণের কথা ওমরের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম বিন আবদুল্লাহ আন নাহহামও একইভাবে গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। ওমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনু আদি বিন কা'বের অন্তর্ভূক্ত এই ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেননি। খাব্বার ইরনুল আরাত (বনু তামীম বংশোদ্ভূত এই সাহাসী’ জাহেলিয়াতের যুগে তরবারী তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং বনু খোযায়া গোত্রের উম্মে আনমার নাম্মী মহিলার মুক্ত গোলাম ছিলেন) নামক অপর এক নওমুসলিম গোপনে ফাতিমা বিনতে খাত্তাবকে কুরআন পড়িয়ে যেতেন। একদিন ওমর ইবনুল খাত্তাব উন্মুক্ত তরবারী হাতে নিয়ে রাসূল (সাঃ) ও তাঁর একদল সাহাবীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, প্রায় ৪০ জন নারী ও পুরুষ সাহাবীসহ রাসূল (সাঃ) সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী একটা ঘরে সমবেত রয়েছেন। রাসূল (রাঃ) এর সাথে তাঁর চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুতালিব, আবু বকর সিদ্দীক বিন আবু কুহাফা ও আলী বিন আবু তালেবসহ এমন কিছু সংখ্যক মুসলমান ছিলেন যারা রাসূল (সাঃ) এর সাথে মক্কায় অবস্থান করছিলেন এবং আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের সাথে হিজরত করেননি। পথে নাঈম বিন আবদুল্লাহর সাথে ওমরের দেখা হলো। তিনি বললেন, কোথায় চলেছ ওমর? ওমর বললেন, “ধর্মচ্যুত মুহাম্মদের সন্ধানে চলেছি, যে কুরাইশ বংশে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, তাদের বুদ্ধিমানদেরকে বোকা সাব্যস্ত করেছে, তাদের অনুসৃত ধর্মের নিন্দা করেছে এবং তাদের দেবদেবীকে গালাগাল করেছে। আমি ওকে হত্যা করবো।" নাঈম বললেন, “ওহে ওমর, আল্লাহ্র কসম, তুমি আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হয়েছ। তুমি কি মনে কর, মুহাম্মদকে হত্যা করার পর বনু আবদ মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে আর তুমি পৃথিবীর ওপর অবাধে বিচরণ করে বেড়াতে পারবে? তোমার কি উচিত নয় আগে নিজের পরিবার পরিজনের দিকে মনোনিবেশ করা এবং তাদেরকে শোধরানো?” ওমর বললেন: "আমার পরিবার পরিজনের কি হলো?" নাঈম বললেন, "তোমার ভগ্নিপতি ও চাচাতো ভাই সাঈদ বিন যায়েদ বিন আমর এবং তোমার বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব। আল্লাহর কসম, তাঁরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুহাম্মদের ধর্ম অনুসরণ করছে। পারলে তাদেরকে সামলাও।” ওমর তৎক্ষণাৎ ফিরে গেলেন তার বোন ও ভগ্নিপতির বাড়ির দিকে। যখন তিনি তাদের কাছে রওনা হলেন তখন তাদের কাছে খাব্বাব ইবনুল আরাত ছিলেন। তিনি তাদেরকে পবিত্র কুরআনের একটি অংশ হাতে নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। এই অংশটিতে ছিল সূরা ত্বা-হা। ওমরের আওয়াজ শুনে খাব্বাব গা ঢাকা দিলেন। তিনি ঘরের কোন এক অংশে লুকিয়ে রইলেন। আর ফাতেমা কুরআনের অংশটি নিজের উরুর নিচে চাপা দিয়ে রাখলেন।
ঘরের কাছাকাছি পৌছার পর ওমর খাব্বাবের পড়ার আওয়াজ শুনেছিলেন। ঘরে ঢুকে তিনি বললেন, “একটা দুর্বোধ্য বাণী আবৃত্তি করার আওয়াজ শুনছিলাম। ওটা কি?” তারা উভয়ে বললেন, "না, আপনি কিছুই শোনেননি।” ওমর বললেন, "নিশ্চয়ই শুনেছি। আর আল্লাহর কসম, এটাও জেনেছি যে, তোমরা দু'জনে মুহাম্মাদের অনুসারী হয়ে গেছ।”
কথাটা বলে ভগ্নিপতি সাঈদকে প্রবলভাবে জাপটে ধরলেন। তার বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে গেলে তিনি তাকে মেরে জখম করে দিলেন। এই কান্ড ঘটানোর পর তার বোন ও ভগ্নিপতি একযোগে তাঁকে বললেন, “হাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। এখন যা করতে চান করুন।” ওমর' যখন দেখলেন তার বোনের শরীর রক্তাক্ত, তখন অনুতপ্ত হলেন।
তিনি স্বীয় বোনকে বললেন, "আমাকে এই পুস্তিকাটি দাও, যা এইমাত্র তোমাদেরকে পড়তে শুনলাম। আমি একটু দেখবো মুহাম্মাদ কি জিনিস নিয়ে এসেছে।" ওমর লেখাপড়া জানতেন। তিনি এ কথা বললে তাঁর বোন তাঁকে বললো, "আমার ভয় হয় আপনি নষ্ট করে ফেলেন কিনা। ওমর বললেন, "ভয় পেয়ো না!” অতঃপর তিনি নিজের দেবদেবীর শপথ করে বললেন, "ওটি আমি পড়েই তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবো।”
ওমরের এ কথাটা শুনে ফাতিমার মনে আশার সঞ্চার হলো যে, ওমর ইসলাম গ্রহণ করতে পারে। তিনি বললেন, "ভাইজান। আপনি যে অপবিত্র! কেননা আপনি এখনো মোশরেক। অথচ এই পবিত্র গ্রন্থকে পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া স্পর্শ করতে পারে না।” ওমর তৎক্ষণাৎ উঠে চলে গেলেন এবং গোসল করে এলেন। এবার ফাতিমা তাকে পুস্তিকাখানি দিলেন। তাতে সূরা ত্বা-হা লিখিত ছিল। তিনি তা পড়লেন। প্রথম অংশটি পড়েই বললেনঃ "আহ্! কি সুন্দর কথা! কী মহৎ বাণী!” তাঁর এ উক্তি শুনে খাব্বাব তাঁর সামনে বেরিয়ে এলেন। তিনি তাঁকে বললেন, "হে ওমর! আল্লাহর কসম, আমার মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে যে আল্লাহ হয়তো আপনাকে তাঁর নবীর দাওয়াত গ্রহণের জন্য মনোনীত করেছেন। আমি গতকাল শুনলাম রাসূল (সাঃ) দোয়া করছেন, “হে আল্লাহ! তুমি আবুল হিকাম বিন হিশাম অথবা ওমর ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি কর। অতএব, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হোন, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হোন হে ওমর।"
ওমর বললেন, "হে খাব্বাব! আমাকে মুহাম্মাদের সন্ধান দাও। আমি তাঁর কাছে যেয়ে ইসলাম গ্রহণ করবো।” খাব্বাব বললেন, "তিনি সাফা পাহাড়ের নিকট একটি বাড়িতে আছেন। সেখানে তাঁর সাথে তাঁর একদল সাহাবী রয়েছেন।” ওমর তাঁর তরবারী আগের মতই খোলা অবস্থায় ধরে নিয়ে রাসূল (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীদের কাছে চললেন। সেখানে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে তাঁর আওয়াজ শুনে রাসূল (সাঃ) এর জনৈক সাহাবী দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে তাকালেন। দেখলেন ওমর মুক্ত তরবারী হাতে দাঁড়িয়ে। তিনি শংকিত চিত্তে রাসূল (সাঃ) এর কাছে ফিরে গিয়ে বললেনঃ “হে রাসূলুল্লাহ! এ যে ওমর ইবনুল খাত্তাব একেবারে নগ্ন তরবারী হাতে!” হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব বললেন, “ওকে ভেতরে আসার অনুমতি দিন। সে যদি কোন শুভ কামনা নিয়ে এসে থাকে, আমরা তার প্রতি বদান্যতা দেখাবে। আর যদি কোন কু-বাসনা নিয়ে এসে থাকে তাহলে ওর তরবারী দিয়েই ওকে হত্যা করবো।” রাসূল (সাঃ) বললেন, "ওকে ভেতরে আসতে দাও।” উক্ত সাহাবী তাকে ভেতরে আসতে দিলেন। রাসূল (সাঃ) নিজে উঠে তার কাছে এগিয়ে গেলেন এবং নিজের কক্ষে নিয়ে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন।
রাসূল (সাঃ) তাঁর পাজামা বাঁধার জায়গা অথবা যেখানে চাদরের দুই কোণা মিলিত হয়, সেখানটা ধরে তাকে প্রবল জোরে আকর্ষণ করলেন এবং বললেন, "কি হে খাত্তাবের পুত্র! তোমার এখানে আগমন ঘটলো কিভাবে! আমার তো মনে হয়, আল্লাহ তোমার ওপর কোন বিপর্যয় না নামানো পর্যন্ত তুমি ফিরবে না।” ওমর বললেন, “হে রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার কাছে এসেছি আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের ওপর ও আপনার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু আসে তার ওপর ঈমান আনবার জন্য।” এ কথা শোনামাত্র রাসূল (সাঃ) এমন জোরে "আল্লাহু আকবার" বলে উঠলেন যে, ঐ ঘরের ভেতরে রাসূল (সাঃ) এর যে কয়জন সাহাবী ছিলেন সবাই বুঝলেন যে, ওমর ইসলাম গ্রহণ করেছে।
এরপর রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীগণ যার যার জায়গায় চলে গেলেন। হামযার পর ওমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণে তাদের মনোবল ও আত্মমর্যাদা বেড়ে গেল। তারা নিশ্চিত হলেন যে, ওঁরা দুজন রাসূল (সাঃ) এর প্রতিরক্ষায় অবদান রাখবেন এবং ইসলামের দুশমনদের মোকাবিলায় মুসলমানদের সহযোগিতা করবেন।
ওমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আতা ও মুজাহিদের বর্ণনা : ইবনে ইসহাক বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে আবি নুজাইহ আল মাক্কী স্বীয় শিষ্য আতা, মুজাহিদ অথবা অন্যান্য বর্ণনাকারীদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ওমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে যে তিনি স্বয়ং নিম্নরূপ বলতেনঃ "আমি ইসলামের কট্টর বিরোধী ছিলাম। জাহেলী যুগে আমি মদের খুব ভক্ত ছিলাম। মদ পেলে খুবই আনন্দিত হতাম। আমাদের একটা মজলিশ বসতো উমার বিন আবদ বিন ইমরান আল মাখযুমীর পারিবারিক বাসস্থানের নিকটস্থ খাজওয়ারা নামক স্থানে। সেখানে কুরাইশের বহু লোক সমবেত হতো। একদিন রাতে ঐ আসরে আমার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে গেলাম। কিন্তু তাদের কাউকেই পেলাম না। এরপর ভাবলাম, মক্কার অমুক মদ বিক্রেতার কাছে গেলে হয়তো মদ খেতে পারতাম। তার উদ্দেশ্যে গেলাম। কিন্তু তাকে পেলাম না। এরপর মনে মনে বললাম, কা'বা শরীফে গিয়ে যদি সাতবার অথবা সত্তুরবার তওয়াফ করতাম, মন্দ হতো না। অতঃপর কা'বা শরীফে তওয়াফ করার জন্য মসজিদুল হারামে উপনীত হলাম। সেখানে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তখনো সিরিয়ার দিকে মুখ করে নামায পড়তেন। নিজের ও সিরিয়ার মাঝখানে কা'বা শরীফকে রাখতেন। রূকনে আসওয়াদ ও রূকনে ইয়ামানীর মাঝে বসে তিনি নামায পড়তেন। তাঁকে দেখেই আপন মনে বললাম, আল্লাহর কসম, আজকের রাতটা যদি মুহাম্মাদের (সাঃ) আবৃত্তি শুনে কাটিয়ে দিতাম এবং সেকি বলে তা অবহিত হতাম, তাহলেও কাজ হতো। কিন্তু সেই সাথে এটাও ভাবলাম যে, মুহাম্মাদের (সাঃ) খুব কাছে গিয়ে যদি শুনি তাহলে তিনি ভয় পেয়ে যাবেন। তাই হাজরে আসওয়াদের দিক থেকে এলাম, কা'বা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম। রাসূল (সাঃ) তখনো যথারীতি দাঁড়িয়ে নামাযে কুরআন পাঠ করে যাচ্ছেন। অবশেষে আমি তাঁর ঠিক সামনে কা'বার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
যখন কুরআন শুনলাম, আমার মন নরম হয়ে গেল। আমি কেঁদে দিলাম। ইসলাম আমার মনমগজ দখল করে ফেললো। রাসূল (সাঃ) নামায শেষ করে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি ওখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি যখন কা'বা থেকে যেতেন, ইবনে আবি হুসাইনের বাড়ির কাছ দিয়ে যেতেন। এই বাড়ী ছিল তার সাফা ও মারওয়ার দৌ ড়েরও শেষ সীমা। সেখান থেকে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের বাড়ী এবং আজহার বিন আবদ আওফ আযযুহরীর বাড়ির মাঝখান দিয়ে, তারপর আখনাস বিন শুরাইকের বাড়ী হয়ে নিজের বাড়ীতে চলে যেতেন। দারুর রাকতাতে ছিল রাসূল (সাঃ) এর বাড়ী। এই জায়গাটি ছিল আবু সুফিয়ানের ছেলে মুয়াবীয়ার মালিকানাধীন। ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (সাঃ) এর পিছু পিছু চলতে লাগলাম। যখন তিনি আব্বাসের বাড়ী ও ইবনে আযহারের বাড়ীর মাঝখানে পৌছলেন, তখন তাঁকে গিয়ে ধরলাম। আমার আওয়ায শুনেই রাসূল (সাঃ) আমাকে চিনে ফেললেন। রাসূল (সাঃ) মনে করলেন আমি তাঁকে কষ্ট দিতে এসেছি। তাই তিনি আমাকে একটা ধমক দিলেন। ধমক দিয়েই আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ওহে খাত্তাবের পুত্র! এ মুহূর্তে তুমি কি উদ্দেশ্যে এসেছ?” আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং তাঁর কাছে যা কিছু আল্লাহর কাছ থেকে আসে, তার প্রতি ঈমান আনার উদ্দেশ্যে।” এ কথা শুনে রাসূল (সাঃ) আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন। তারপর বললেন, "হে ওমর! আল্লাহ তোমাকে হেদায়েত করেছেন।” তারপর তিনি আমার বুকে হাত বুলালেন এবং আমি যাতে ইসলামের ওপর অবিচল থাকি সে জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর রাসূল (সাঃ) এর কাছ থেকে বিদায় হলাম এবং তিনি নিজের বাড়ীতে প্রবেশ করলেন।"
ইবনে ইসহাক বলেনঃ ওমরের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে উপরোক্ত দুই ধরনের বিবরণের কোনটি সঠিক তা আল্লাহই ভালো জানেন।
ইসলামের ওপর ওমরের দৃঢ়তাঃ ইবনে ইসহাক বলেনঃ আবদুল্লাহ ইবনে উমারের মুক্ত গোলাম না'ফে ইবনে উমার থেকে বর্ণনা করেন যে, আমার পিতা ওমর যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন জিজ্ঞাসা করলেন যে, কুরাইশের কোন্ ব্যক্তি সর্বাধিক প্রচার মুখর? তাকে বলা হলো, জামীল বিন মুয়াম্মার আল-জুম্হী। তিনি তৎক্ষণাৎ তার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে উমার বলেনঃ আমি তাঁর পেছনে পেছনে ছুটলাম এবং তিনি কি করেন দেখতে লাগলাম। তখন আমি একজন বালক হলেও যা কিছু দেখি সবই বুঝতে পারি। ওমর (রাঃ) জামীলের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেনঃ "হে জামীল! তুমি জান, আমি ইসলাম গ্রহণ ও মুহাম্মাদের ধর্মে প্রবেশ করেছি।" ইবনে ওমর বলেনঃ জামীল তার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে চাদর গুটিয়ে হাটতে লাগলো। ওমর (রাঃ) তার পিছু পিছু চললেন। আমিও আমার পিতার পিছু পিছু চললাম। চলতে চলতে মসজিদুল হারামের দরজার ওপর পৌঁছে সে বিকট চিৎকার করে বললো, "হে কুরাইশ জনমন্ডলী! শুনে নাও, ওমর ধর্মচ্যুত হয়ে গেছে।” এ সময় কুরাইশ নেতৃবৃন্দ কা'বার চত্ত্বরে তাদের আড্ডায় বসেছিল। ওমর তার পেছনে দাঁড়িয়ে বললেনঃ "জামীল মিথ্যা বলেছে, আমি ধর্মচ্যুত হইনি, ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) তার বান্দা ও রাসূল।" সঙ্গে সঙ্গে সকলে তার দিকে মারমুখী হয়ে ছুটে গেল। ওমর ও কুরাইশ জনতার মধ্যে লড়াই চললো দুপুর পর্যন্ত। এক সময় ওমর ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে বসে পড়লো। মারমুখী জনতা তখনো তার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে। ওমর বলতে লাগলেনঃ তোমরা যা খুশী কর। আল্লাহর কসম, আমরা যদি তিনশো লোক হতাম, তাহলে আমরা তোমাদের জন্য রণাঙ্গন ছেড়ে দিতাম অথবা তোমরা ছেড়ে দিতে।” (অর্থাৎ মুসলমানদের সংখ্যা বেশি হলে তোমরা এত মারমুখো হতে না।) উভয় পক্ষ যখন এই পর্যায়ে, তখন সহসা সেখানে একজন প্রবীণ কুরাইশ সর্দারের আবির্ভাব ঘটলো। মূল্যবান ইয়ামানী চাদর ও নকশাদার আলখেল্লা পরিহিত এই বৃদ্ধ এসে তাদের কাছে দাঁড়ালেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের কি হয়েছে? তারা বললো, "ওমর ধর্মচ্যুত হয়ে গেছে।” বৃদ্ধ বললেনঃ "তাতে কি? থামো। একজন মানুষ নিজের ইচ্ছায় একটা জিনিস গ্রহণ করেছে। তোমরা তার কি করতে চাও? তোমরা কি ভেবেছ, বনু আদি বিন কা'ব [ওমর (রাঃ)-এর গোত্র] তাদের সদস্যকে তোমাদের হাতে এভাবেই ছেড়ে দেবে? ওকে ছেড়ে দাও।” ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ এ কথার পর তারা নিজেদের উত্তেজিত ভাবাবেগকে সংগত করলো। পরে মদীনায় হিজরত করার পর আমার পিতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলামঃ আব্বা, ঐ বৃদ্ধটি কে, যিনি আপনার ইসলাম গ্রহণের দিন মারমুখো জনতাকে ধমক দিয়ে আপনার কাছ থেকে হটিয়ে দিয়েছিলেন? তিনি বললেন, উনি আস ইবনে ওয়ায়েল আস্সাহমী।
ইবনে হিশাম বলেনঃ আমাকে কোন কোন বিদ্বান ব্যক্তি বলেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ও তাঁর পিতার কথোপকথনটি এ রকম ছিলঃ ইবনে ওমরঃ আব্বা! ঐ লোকটি কে, যিনি আপনার ইসলাম গ্রহণের দিন মক্কাতে যারা আপনার ওপর আক্রমণ করেছিল, তাদেরকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলেন? আল্লাহ উনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।”
হযরত ওমর (রাঃ)ঃ "হে বৎস! উনি আ'স ইবনে ওয়ায়েল। আল্লাহ তাঁকে কোনই উত্তম প্রতিদান যেন না দেন।" কারণ ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত ভালো, কাজের প্রতিদান পাওয়া যায় না। আ'স ইবনে ওয়ায়েল মোশরেক অবস্থায় এ কাজটি করেন এবং কখনো মুসলমান হননি।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেছেনঃ "সেই রাত্রে ইসলাম গ্রহণ করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম যে মক্কাবাসীর মধ্যে যে ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর সবচেয়ে কট্টর দুশমন, তার কাছে যাবো এবং তাকে জানাবো যে, আমি মুসলমান হয়ে গেছি। ভেবে দেখলাম, এই ব্যক্তিটি তো আবু জাহল ছাড়া আর কেউ নয়।” উল্লেখ্য যে, ওমর (রাঃ) আবু জাহলের আপন বোন খানতামা বিনতে হিশাম ইবনুল মুগীরার পুত্র ছিলেন। যাহোক, ওমর বলেনঃ আমি পরদিন সকালে তার কাছে গিয়ে তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়লাম। আবু জাহল আমার কাছে বেরিয়ে এলো এবং বললোঃ "আমার ভাগ্নেকে স্বাগত! তুমি কি খবর নিয়ে এসেছ ওমর?” আমি বললামঃ "মামা, আমি আপনাকে জানাতে এসেছি যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি ঈমান এনেছি। তিনি যে বিধান নিয়ে এসেছেন তাও সত্য বলে মেনে নিয়েছি।” এরপর তিনি আমার মুখের ওপর ঠাস্ করে দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং বললেনঃ "ধিক তোমাকে এবং ধিক তোমার বহন করে আনা সংবাদকে।"
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেনঃ হযরত ওমরের (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ ছিল একটি বিজয়, তাঁর মদীনায় হিজরত ছিল আল্লাহর সাহায্য স্বরূপ এবং তাঁর খিলাফাত ছিল আল্লাহর রহমত স্বরূপ।
শিক্ষাঃ (১) পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করেই হযরত ওমর (রাঃ) হেদায়াত লাভ করেছিলেন। তাই ইসলামের পুনরুজ্জীবন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যারাই কাজ করতে চায়, কেয়ামত পর্যন্ত তাদের এ কাজ সরাসরি কুরআন দিয়েই শুরু করতে হবে।
(২) রাসূল (সাঃ) হযরত ওমরের নাম ধরে দোয়া করতেন তাঁর হেদায়াতের জন্য। তাই রাসূল (সাঃ) এর পদানুসরণ করে আমাদেরও ইসলামের শত্রুদের হেদায়াতের জন্য নাম ধরে ধরে দোয়া করা উচিত। শুধু প্রচার ও শিক্ষা দান করেই ক্ষান্ত থাকা উচিত নয়। কেননা হেদায়াতের আসল চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে রয়েছে।
(৩) আবিসিনিয়ায় হিজরতের পর মক্কার অবস্থা ছিল চরম নৈরাশ্যজনক। কিন্তু এহেন পরিস্থিতিতেও আল্লাহ তায়ালা হযরত ওমরের (রাঃ) মত ব্যক্তিত্বকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সুতরাং কোন পরিস্থিতিতেই মুসলামানদের হতাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তায়ালা অকল্পনীয়ভাবে সাহায্য পাঠাতে পারেন।
📄 স্বামী-স্ত্রীর আচরণে সহনশীলতা
বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে হযরত ওমর (রাঃ) এর নিকট নালিশ করতে ও তাঁর পরামর্শ নিতে এলো। এসে হযরত ওমরের (রাঃ) বাস ভবনের দরজায় দাঁড়াতেই শুনতে পেল তাঁর স্ত্রী অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় ও উচ্চস্বরে তাঁকে তিরষ্কার করছে, আর হযরত ওমর নিরবে তা শুনছেন। লোকটি তৎক্ষণাৎ ফিরে যেতে উদ্যত হলো। সে ভাবলো, হযরত ওমরের (রাঃ) মত কঠোর মেজাজের মানুষের যখন এই অবস্থা এবং তিনি খলীফা, তখন আমি আর কে? ঠিক এই সময়ে হযরত ওমর বাইরে বেরিয়ে দেখলেন এক ব্যক্তি তার দরজা থেকে ফিরে যাচ্ছে। তিনি তাকে ডেকে ফেরালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জন্য এসেছ? সে বললোঃ "আমীরুল মুমিনীন, আমি আপনার কাছে এসেছিলাম নিজের স্ত্রীর বদমেজাজ ও কঠোর ব্যবহার সম্পর্কে নালিশ করতে। কিন্তু এসে নিজ কানে যা শুনতে পেলাম, তাতে মনে হলো আপনার স্ত্রীরও একই অবস্থা। তাই এই সান্তনা নিয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম যে, খোদ্ আমীরুল মুমিনীনের যখন নিজের স্ত্রীর সাথে এরূপ অবস্থা, তখন আমি আর কোথাকার কে?
হযরত ওমর (রাঃ) বললেনঃ ওহে দ্বীনি ভাই, শোন। আমি আমার স্ত্রীর এরূপ আচরণ সহ্য করি দুটি কারণে- প্রথমতঃ আমার কাছে তার অনেক অধিকার পাওনা আছে। দ্বিতীয়তঃ সে আমার খাবার রান্না করে, রুটি বানায়, কাপড় ধোয় এবং আমার সন্তানকে দুধ খাওয়ায়। অথচ এর কোনটি তার কাছে আমার প্রাপ্য নয় এবং সে এগুলো করতে বাধ্য নয়। এ সবের কারণে আমার মনে শান্তি বিরাজ করে এবং আমি হারাম উপার্জন থেকে রক্ষা পাই। এ কারণেই আমি তাকে সহ্য করি। লোকটি বললোঃ হে আমীরুল মুমিনীন, আমার স্ত্রীও তদ্রুপ। হযরত ওমর (রাঃ) বললেনঃ তাহলে সহ্য করতে থাকো ভাই। দুনিয়ার জীবন তো অল্প কটা দিনের!
শিক্ষা : ইসলাম যে নারীর প্রতি কত উদার ও সহনশীল হওয়ার শিক্ষা দেয় তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনা থেকে শরীয়তের এই বিধিও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নিছক প্রথাগতভাবে আমাদের সমাজে মনে করা হয় যে, রান্না বান্না করা, কাপড় ধোয়া ও গৃহস্থালির যাবতীয় কাজ করা স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু আসলে তা তার কোন দায়িত্ব ও কর্তব্য নয়। এ সব কাজ করা স্ত্রীর ইচ্ছাধীন। শুধু স্বামী ও সন্তানের মঙ্গলাকাংখা থেকেই স্ত্রীরা নিজের ইচ্ছায় এ সব কাজ করে থাকে। এ সব কাজে কোন ত্রুটি হলে সে জন্য তাকে কোন শাস্তি বা বকাঝকা করা জায়েজ নয়। তবে স্বামীর সম্পদ ও সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান অবশ্যই স্ত্রীর দায়িত্ব।
বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে হযরত ওমর (রাঃ) এর নিকট নালিশ করতে ও তাঁর পরামর্শ নিতে এলো। এসে হযরত ওমরের (রাঃ) বাস ভবনের দরজায় দাঁড়াতেই শুনতে পেল তাঁর স্ত্রী অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় ও উচ্চস্বরে তাঁকে তিরষ্কার করছে, আর হযরত ওমর নিরবে তা শুনছেন। লোকটি তৎক্ষণাৎ ফিরে যেতে উদ্যত হলো। সে ভাবলো, হযরত ওমরের (রাঃ) মত কঠোর মেজাজের মানুষের যখন এই অবস্থা এবং তিনি খলীফা, তখন আমি আর কে? ঠিক এই সময়ে হযরত ওমর বাইরে বেরিয়ে দেখলেন এক ব্যক্তি তার দরজা থেকে ফিরে যাচ্ছে। তিনি তাকে ডেকে ফেরালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জন্য এসেছ? সে বললোঃ "আমীরুল মুমিনীন, আমি আপনার কাছে এসেছিলাম নিজের স্ত্রীর বদমেজাজ ও কঠোর ব্যবহার সম্পর্কে নালিশ করতে। কিন্তু এসে নিজ কানে যা শুনতে পেলাম, তাতে মনে হলো আপনার স্ত্রীরও একই অবস্থা। তাই এই সান্তনা নিয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম যে, খোদ্ আমীরুল মুমিনীনের যখন নিজের স্ত্রীর সাথে এরূপ অবস্থা, তখন আমি আর কোথাকার কে?
হযরত ওমর (রাঃ) বললেনঃ ওহে দ্বীনি ভাই, শোন। আমি আমার স্ত্রীর এরূপ আচরণ সহ্য করি দুটি কারণে- প্রথমতঃ আমার কাছে তার অনেক অধিকার পাওনা আছে। দ্বিতীয়তঃ সে আমার খাবার রান্না করে, রুটি বানায়, কাপড় ধোয় এবং আমার সন্তানকে দুধ খাওয়ায়। অথচ এর কোনটি তার কাছে আমার প্রাপ্য নয় এবং সে এগুলো করতে বাধ্য নয়। এ সবের কারণে আমার মনে শান্তি বিরাজ করে এবং আমি হারাম উপার্জন থেকে রক্ষা পাই। এ কারণেই আমি তাকে সহ্য করি। লোকটি বললোঃ হে আমীরুল মুমিনীন, আমার স্ত্রীও তদ্রুপ। হযরত ওমর (রাঃ) বললেনঃ তাহলে সহ্য করতে থাকো ভাই। দুনিয়ার জীবন তো অল্প কটা দিনের!
শিক্ষা : ইসলাম যে নারীর প্রতি কত উদার ও সহনশীল হওয়ার শিক্ষা দেয় তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনা থেকে শরীয়তের এই বিধিও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নিছক প্রথাগতভাবে আমাদের সমাজে মনে করা হয় যে, রান্না বান্না করা, কাপড় ধোয়া ও গৃহস্থালির যাবতীয় কাজ করা স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু আসলে তা তার কোন দায়িত্ব ও কর্তব্য নয়। এ সব কাজ করা স্ত্রীর ইচ্ছাধীন। শুধু স্বামী ও সন্তানের মঙ্গলাকাংখা থেকেই স্ত্রীরা নিজের ইচ্ছায় এ সব কাজ করে থাকে। এ সব কাজে কোন ত্রুটি হলে সে জন্য তাকে কোন শাস্তি বা বকাঝকা করা জায়েজ নয়। তবে স্বামীর সম্পদ ও সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান অবশ্যই স্ত্রীর দায়িত্ব।
📄 রাসূলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যানকারী এক মুরতাদের শাস্তি
হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, মদীনায় বিশর নামক একজন মুনাফিক বাস করতো। একবার জনৈক ইহুদীর সাথে তার বিবাদ বেধে যায়। ইহুদী বললোঃ চল, আমরা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কাছে গিয়ে এর মীমাংসা করিয়ে আসি। বিশর প্রথমে এ প্রস্তাবে সম্মত হলো না। সে ইহুদী নেতা কা'ব ইবনে আশরাফের কাছে মীমাংসার জন্য যাওয়ার প্রস্তাব করলো। কা'ব ইবনে আশরাফ ছিল মুসলমানদের কট্টর দুশমন। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এই ইহুদী নেতার কাছ থেকে মীমাংসা কামনা করছিল মুসলমান পরিচয় দানকারী বিশর। অথচ ইহুদী লোকটি স্বয়ং রাসূল এর ওপর এর বিচারের ভার অর্পণ করতে চাইছিল। আসলে এর কারণ ছিল এই যে, রাসূল (সাঃ) এর বিচার যে পুরোপুরি ন্যায়সংগত হবে তা উভয়েই জানতো। কিন্তু ন্যায়সংগত মীমাংসা হলে মুনাফিক হেরে যেত, আর ইহুদী জয়লাভ করতো। অনেক তর্ক বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত ইহুদীর মতই স্থির হলো। উভয়ে রাসূল (সাঃ) এর কাছে গিয়ে বিবাদটার মীমাংসার ভার তাঁর ওপর অর্পণ করলো। রাসূল (সাঃ) মামলার ব্যাপক তদন্ত চালিয়ে ইহুদীর পক্ষে রায় দিলেন এবং বিশর হেরে গেল। সে এ মীমাংসায় মনে মনে অসন্তুষ্ট হয় এবং ইহুদীকে এই মর্মে সম্মত করে যে, বিষয়টির চূড়ান্ত মীমাংসার জন্য তারা হযরত ওমরের নিকট যাবে। বিশর ভেবেছিল যে, হযরত ওমর যেহেতু কাফেরদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠিন, তাই তিনি ইহুদীর মুকাবিলায় তার পক্ষে রায় দেবেন।
দু'জনেই হযরত ওমরের নিকট উপস্থিত হলো। ইহুদী তাঁকে পুরো ঘটনা জানালো এবং বললো, এ ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) যে ফায়সালা করেছেন, তা আমার পক্ষে। কিন্তু এ লোকটি তাতে সম্মত নয়। তাই আমাকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছে।
হযরত ওমর বিশরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ঘটনা কি এরূপ? সে বললো, হাঁ। তখন হযরত ওমর বললেন, তাহলে একটু অপেক্ষা কর। এই বলে তিনি ঘরের ভেতর থেকে একখানা তলোয়ার নিয়ে এলেন এবং "যে লোক রাসূলের ফায়সালা মেনে নিতে রাযী হয় না, ওমরের কাছে তার ফায়সালা হলো এই......." এই বলে চোখের নিমেষে বিশরকে দ্বিখন্ডিত করে ফেললো।
এরপর বিশরের উত্তরাধিকারীরা রাসূল (সাঃ) এর নিকট হযরত ওমরের বিরুদ্ধে এই মর্মে অভিযোগ দায়ের করেন যে, তিনি শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত একজন মুসলমানকে হত্যা করেছেন। এ সময় রাসূল (সাঃ) এর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ কথা বেরিয়ে আসে যে, "ওমর কোন মুসলমানকে হত্যা করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারে এটা আমি মনে করি না।"
আসলে হযরত ওমর (রাঃ) তাকে এই মনে করে হত্যা করেছেন যে, সে যখন আল্লাহর রাসূলের ফায়সালা প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন সে স্পষ্টতই মুরতাদ ও কাফের হয়ে গেছে। ইসলামী শরীয়তে মুরতাদের সর্বসম্মত শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড সেটাই তিনি তাকে দিয়েছিলেন। আর এর অব্যবহিত পর সূরা নিসার ৬০ থেকে ৬৮ নং আয়াত নাযিল হয়ে হযরত ওমরের অভিমতকে সঠিক প্রমাণিত করে।
শিক্ষা: আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর আদেশ, নিষেধ বা সিদ্ধান্তকে যারা প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে, তাদেরকে মুসলমান বলে মনে করা বৈধ নয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকলে এ ধরনের লোকদের মৃত্যুদন্ড দেয়া অপরিহার্য। অন্যথায়, এ ধরনের মুরতাদদেরকে সমাজচ্যুত করা ও নিন্দা প্রতিবাদের মাধ্যমে কোনঠাসা করে রাখতে হবে, যাতে আর কেউ মুরতাদ হওয়ার ধৃষ্ঠতা না দেখায়।
হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, মদীনায় বিশর নামক একজন মুনাফিক বাস করতো। একবার জনৈক ইহুদীর সাথে তার বিবাদ বেধে যায়। ইহুদী বললোঃ চল, আমরা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কাছে গিয়ে এর মীমাংসা করিয়ে আসি। বিশর প্রথমে এ প্রস্তাবে সম্মত হলো না। সে ইহুদী নেতা কা'ব ইবনে আশরাফের কাছে মীমাংসার জন্য যাওয়ার প্রস্তাব করলো। কা'ব ইবনে আশরাফ ছিল মুসলমানদের কট্টর দুশমন। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এই ইহুদী নেতার কাছ থেকে মীমাংসা কামনা করছিল মুসলমান পরিচয় দানকারী বিশর। অথচ ইহুদী লোকটি স্বয়ং রাসূল এর ওপর এর বিচারের ভার অর্পণ করতে চাইছিল। আসলে এর কারণ ছিল এই যে, রাসূল (সাঃ) এর বিচার যে পুরোপুরি ন্যায়সংগত হবে তা উভয়েই জানতো। কিন্তু ন্যায়সংগত মীমাংসা হলে মুনাফিক হেরে যেত, আর ইহুদী জয়লাভ করতো। অনেক তর্ক বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত ইহুদীর মতই স্থির হলো। উভয়ে রাসূল (সাঃ) এর কাছে গিয়ে বিবাদটার মীমাংসার ভার তাঁর ওপর অর্পণ করলো। রাসূল (সাঃ) মামলার ব্যাপক তদন্ত চালিয়ে ইহুদীর পক্ষে রায় দিলেন এবং বিশর হেরে গেল। সে এ মীমাংসায় মনে মনে অসন্তুষ্ট হয় এবং ইহুদীকে এই মর্মে সম্মত করে যে, বিষয়টির চূড়ান্ত মীমাংসার জন্য তারা হযরত ওমরের নিকট যাবে। বিশর ভেবেছিল যে, হযরত ওমর যেহেতু কাফেরদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠিন, তাই তিনি ইহুদীর মুকাবিলায় তার পক্ষে রায় দেবেন।
দু'জনেই হযরত ওমরের নিকট উপস্থিত হলো। ইহুদী তাঁকে পুরো ঘটনা জানালো এবং বললো, এ ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) যে ফায়সালা করেছেন, তা আমার পক্ষে। কিন্তু এ লোকটি তাতে সম্মত নয়। তাই আমাকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছে।
হযরত ওমর বিশরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ঘটনা কি এরূপ? সে বললো, হাঁ। তখন হযরত ওমর বললেন, তাহলে একটু অপেক্ষা কর। এই বলে তিনি ঘরের ভেতর থেকে একখানা তলোয়ার নিয়ে এলেন এবং "যে লোক রাসূলের ফায়সালা মেনে নিতে রাযী হয় না, ওমরের কাছে তার ফায়সালা হলো এই......." এই বলে চোখের নিমেষে বিশরকে দ্বিখন্ডিত করে ফেললো।
এরপর বিশরের উত্তরাধিকারীরা রাসূল (সাঃ) এর নিকট হযরত ওমরের বিরুদ্ধে এই মর্মে অভিযোগ দায়ের করেন যে, তিনি শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত একজন মুসলমানকে হত্যা করেছেন। এ সময় রাসূল (সাঃ) এর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ কথা বেরিয়ে আসে যে, "ওমর কোন মুসলমানকে হত্যা করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারে এটা আমি মনে করি না।"
আসলে হযরত ওমর (রাঃ) তাকে এই মনে করে হত্যা করেছেন যে, সে যখন আল্লাহর রাসূলের ফায়সালা প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন সে স্পষ্টতই মুরতাদ ও কাফের হয়ে গেছে। ইসলামী শরীয়তে মুরতাদের সর্বসম্মত শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড সেটাই তিনি তাকে দিয়েছিলেন। আর এর অব্যবহিত পর সূরা নিসার ৬০ থেকে ৬৮ নং আয়াত নাযিল হয়ে হযরত ওমরের অভিমতকে সঠিক প্রমাণিত করে।
শিক্ষা: আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর আদেশ, নিষেধ বা সিদ্ধান্তকে যারা প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে, তাদেরকে মুসলমান বলে মনে করা বৈধ নয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকলে এ ধরনের লোকদের মৃত্যুদন্ড দেয়া অপরিহার্য। অন্যথায়, এ ধরনের মুরতাদদেরকে সমাজচ্যুত করা ও নিন্দা প্রতিবাদের মাধ্যমে কোনঠাসা করে রাখতে হবে, যাতে আর কেউ মুরতাদ হওয়ার ধৃষ্ঠতা না দেখায়।
📄 জাবালার ঔদ্ধত্য ও হযরত ওমর (রাঃ)
একবার হযরত ওমর (রাঃ) হজ্জ করতে মক্কায় এলেন। তিনি কা'বার চারপাশে তওয়াফ করছিলেন। তাঁর সাথে সাথে একই কাতারে তওয়াফ করছিলেন সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী প্রতিবেশী এক রাজা জাবালা ইবনে আইহাম। জাবালা কা'বার চারপাশ প্রদক্ষিণ করার সময় সহসা আরেক তওয়াফকারী জনৈক দরিদ্র আরব বেদুঈনের পায়ের তলে চাপা পড়ে জাবালার বহু মূল্যবান ইহরামের চাদরের এক কোণা। চাদরটি রাজার কাঁধের ওপর থেকে টান লেগে নীচে পড়ে যায়।
ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন জাবালা। লোকটির কোন ওজর আপত্তি না শুনে জাবালা তার গালে প্রবল জোরে এক চড় বসিয়ে দেন।
লোকটি তৎক্ষণাৎ খলিফার নিকট গিয়ে নালিশ করে এবং এই অন্যায়ের বিচার চায়। খলিফা জাবালাকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠান এবং জিজ্ঞাসা করেন যে, অভিযোগ সত্য কিনা। জাবালা উদ্ধত স্বরে জবাব দেন, "সম্পূর্ণ সত্য। এই পাজিটা আমার চাদর পদদলিত করে আল্লাহর ঘরের সামনে আমাকে প্রায় উলংগ করে দিয়েছে।"
খলিফা দৃঢ়তার সাথে জবাব দেন, "কিন্তু এটা ছিল একটা দুর্ঘটনা।" জাবালা স্পর্ধিত কন্ঠে বললেন, "আমি তার পরোয়া করিনে। কা'বা শরীফের সম্মানের খাতিরে ও কা'বার চত্তরে রক্তপাত নিষিদ্ধ থাকার কারণে আমি যথেষ্ট ক্রোধ সংবরণ করেছি। নচেত ওকে আমি চপেটাঘাত নয় হত্যাই করতাম।"
জাবালা হযরত ওমরের একজন শক্তিশালী মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। খলিফা তাই একটু থামলেন এবং কিছু চিন্তাভাবনা করলেন। অতঃপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "জাবালা, তুমি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছ। এখন বাদী ক্ষমা না করলে তোমাকে ইসলামী আইনের শাস্তি মাথা পেতে নিতে হবে এবং বাদীর হাতে পাল্টা একটা চপেটাঘাত খেতে হবে।”
স্তম্ভিত হয়ে জাবালা বললেন, "আমি একজন রাজা। আর ও হচ্ছে একজন সাধারণ কৃষক।”
হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, "তোমরা উভয়ে মুসলমান এবং আইনের চোখে সবাই সমান।"
জাবালা বললো, "যে ধর্মে রাজা ও একজন সাধারণ প্রজাকে সমান চোখে দেখা হয়, আমি তার আনুগত্য করতে পারিনে। ঐ চাষা যদি আমাকে চপেটাঘাত করে, তবে আমি ইসলাম ত্যাগ করবো।” (নাউযু বিল্লাহ)
হযরত ওমর ততোধিক কঠোর স্বরে জবাব দিলেন, "তোমার মত হাজার জাবালাও যদি ইসলাম ত্যাগ করে চলে যায়, তবে সেই ভয়ে ইসলামের একটি ক্ষুদ্রতম বিধিও লংঘিত হতে পারে না। তোমাকে এ শাস্তি পেতেই হবে। আর এ কথাও জেনে রেখ যে, ইসলাম কাউকে জোরপূর্বক মুসলমান বানায় না। তোমাকেও বানায়নি। কিন্তু ইসলাম ত্যাগ করা সহজ নয়। মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।”
হযরত ওমরের শেষোক্ত কথাটা শুনে জাবালা রাগে ও ভয়ে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে লাগলো। হযরত ওমরের নির্দেশে বাদী তৎক্ষণাত জাবালার মুখে ঠাস্ করে একটি চড় বসিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে নিল।
জাবালা ক্রোধে চক্ষু লাল করে বাদীর দিকে একবার তাকালো। অতঃপর রাগে গরগর করতে করতে কা'বার চত্তর ত্যাগ করে নীরবে চলে গেল। জানা যায়, এরপর জাবালা ইবনে আইহাম ইসলাম ত্যাগ করে প্রাণের ভয়ে সোজা রোম সম্রাটের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং সেখানেই জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো কাটায়।
একবার হযরত ওমর (রাঃ) হজ্জ করতে মক্কায় এলেন। তিনি কা'বার চারপাশে তওয়াফ করছিলেন। তাঁর সাথে সাথে একই কাতারে তওয়াফ করছিলেন সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী প্রতিবেশী এক রাজা জাবালা ইবনে আইহাম। জাবালা কা'বার চারপাশ প্রদক্ষিণ করার সময় সহসা আরেক তওয়াফকারী জনৈক দরিদ্র আরব বেদুঈনের পায়ের তলে চাপা পড়ে জাবালার বহু মূল্যবান ইহরামের চাদরের এক কোণা। চাদরটি রাজার কাঁধের ওপর থেকে টান লেগে নীচে পড়ে যায়।
ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন জাবালা। লোকটির কোন ওজর আপত্তি না শুনে জাবালা তার গালে প্রবল জোরে এক চড় বসিয়ে দেন।
লোকটি তৎক্ষণাৎ খলিফার নিকট গিয়ে নালিশ করে এবং এই অন্যায়ের বিচার চায়। খলিফা জাবালাকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠান এবং জিজ্ঞাসা করেন যে, অভিযোগ সত্য কিনা। জাবালা উদ্ধত স্বরে জবাব দেন, "সম্পূর্ণ সত্য। এই পাজিটা আমার চাদর পদদলিত করে আল্লাহর ঘরের সামনে আমাকে প্রায় উলংগ করে দিয়েছে।"
খলিফা দৃঢ়তার সাথে জবাব দেন, "কিন্তু এটা ছিল একটা দুর্ঘটনা।" জাবালা স্পর্ধিত কন্ঠে বললেন, "আমি তার পরোয়া করিনে। কা'বা শরীফের সম্মানের খাতিরে ও কা'বার চত্তরে রক্তপাত নিষিদ্ধ থাকার কারণে আমি যথেষ্ট ক্রোধ সংবরণ করেছি। নচেত ওকে আমি চপেটাঘাত নয় হত্যাই করতাম।"
জাবালা হযরত ওমরের একজন শক্তিশালী মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। খলিফা তাই একটু থামলেন এবং কিছু চিন্তাভাবনা করলেন। অতঃপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "জাবালা, তুমি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছ। এখন বাদী ক্ষমা না করলে তোমাকে ইসলামী আইনের শাস্তি মাথা পেতে নিতে হবে এবং বাদীর হাতে পাল্টা একটা চপেটাঘাত খেতে হবে।”
স্তম্ভিত হয়ে জাবালা বললেন, "আমি একজন রাজা। আর ও হচ্ছে একজন সাধারণ কৃষক।”
হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, "তোমরা উভয়ে মুসলমান এবং আইনের চোখে সবাই সমান।"
জাবালা বললো, "যে ধর্মে রাজা ও একজন সাধারণ প্রজাকে সমান চোখে দেখা হয়, আমি তার আনুগত্য করতে পারিনে। ঐ চাষা যদি আমাকে চপেটাঘাত করে, তবে আমি ইসলাম ত্যাগ করবো।” (নাউযু বিল্লাহ)
হযরত ওমর ততোধিক কঠোর স্বরে জবাব দিলেন, "তোমার মত হাজার জাবালাও যদি ইসলাম ত্যাগ করে চলে যায়, তবে সেই ভয়ে ইসলামের একটি ক্ষুদ্রতম বিধিও লংঘিত হতে পারে না। তোমাকে এ শাস্তি পেতেই হবে। আর এ কথাও জেনে রেখ যে, ইসলাম কাউকে জোরপূর্বক মুসলমান বানায় না। তোমাকেও বানায়নি। কিন্তু ইসলাম ত্যাগ করা সহজ নয়। মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।”
হযরত ওমরের শেষোক্ত কথাটা শুনে জাবালা রাগে ও ভয়ে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে লাগলো। হযরত ওমরের নির্দেশে বাদী তৎক্ষণাত জাবালার মুখে ঠাস্ করে একটি চড় বসিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে নিল।
জাবালা ক্রোধে চক্ষু লাল করে বাদীর দিকে একবার তাকালো। অতঃপর রাগে গরগর করতে করতে কা'বার চত্তর ত্যাগ করে নীরবে চলে গেল। জানা যায়, এরপর জাবালা ইবনে আইহাম ইসলাম ত্যাগ করে প্রাণের ভয়ে সোজা রোম সম্রাটের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং সেখানেই জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো কাটায়।