📘 হাদীসের কিসসা > 📄 বিশ্বনবীর একটি স্বপ্ন

📄 বিশ্বনবীর একটি স্বপ্ন


হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রীতি ছিল এই যে, প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর সাহাবীদের দিকে মুখ করে বসতেন এবং কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কিনা বা কারো কিছু জিজ্ঞাসা আছে কিনা জানতে চাইতেন। কেউ কিছু জানতে চাইলে তিনি তাকে যথাযথ পরামর্শ দিতেন।

একদিন এরূপ জিজ্ঞাসা করার পর কেউ কিছু বলছেনা দেখে তিনি নিজেই বলতে আরম্ভ করলেন। আজ আমি একটি অতি সুন্দর ও আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম, দুই ব্যক্তি আমার কাছে এসে আমার হাত ধরে আমাকে এক পবিত্র স্থানের দিকে নিয়ে চললো। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম, এক ব্যক্তি বসে আছে আর অপর এক ব্যক্তি তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়ানো লোকটির হাতে একখানা করাতের মত অস্ত্র রয়েছে। সেই করাত দিয়ে সে বসা লোকটির মাথা চিরে ফেলছে। একবার মুখের দিক দিয়ে করাত ঢুকিয়ে দিয়ে মাথার দিকে কেটে ফেলছে। আবার বিপরীত দিক দিয়েও তদ্রুপ করছে। এক দিক দিয়ে কাটার পর যখন অপর দিক দিয়ে কাটতে যায়, তখন আগের দিক জোড়া লেগে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ অবস্থা দেখে আমি আমার সঙ্গীদ্বয়কে জিজ্ঞাসা করলাম, এ কি ব্যাপার? তারা বললো, সামনে চলুন।

কিছুদুর গিয়ে দেখলাম, একজন লোক শুয়ে আছে। অপর একজন একখানা ভারী পাথর নিয়ে তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়ানো লোকটি ঐ পাথরের আঘাতে শোয়া লোকটির মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে। পাথরটি সে এত জোরে মারে যে, মাথাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে তা অনেক দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে। অতঃপর লোকটি যেই পাথর কুড়িয়ে আনতে যায়, অমনি ভাঙ্গা মাথা জোড়া লেগে ভালো হয়ে যায়। সে ঐ পাথর কুড়িয়ে এনে পুনরায় মাথায় আঘাত করে এবং মাথা আবার চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এভাবে ক্রমাগত ভাঙ্গা ও জোড়া লাগার পর্ব চলছে। এই লোমহর্ষক দৃশ্য দেখে আমি আতংকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপারটা কি আমাকে খুলে বলুন। তারা কোন জবাব না দিয়ে পুনরায় বললেন, আগে চলুন। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে দেখি, একটি প্রকাণ্ড গর্ত। গর্তটির মুখ সরু, কিন্তু অভ্যন্তর ভাগ অত্যন্ত গভীর ও প্রশস্ত। এ যেন একটি জ্বলন্ত চুলো, যার ভেতরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আর তার ভেতরে বহু সংখ্যক নর-নারী দগ্ধীভূত হচ্ছে। আগুনের তেজ এত বেশী যেন তাতে ঢেউ খেলছে। ঢেউয়ের সাথে যখন আগুন উচু হয়ে ওঠে, তখন ঐ লোকগুলো উথলে গর্তের মুখের কাছে চলে আসে। আবার যেই আগুন নীচে নেমে যায়, অমনি তারাও সাথে সাথে নীচে নেমে যায়। আমি আতংকিত হয়ে সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, বন্ধুগণ! এবার আমাকে বলুন ব্যাপারটা কি? কিন্তু এবারও তারা কোন জবাব না দিয়ে বললেন, আগে চলুন।

আমরা সামনে এগুতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম, একটি রক্তের নদী বয়ে চলছে। তীরে একটি লোক দাঁড়িয়ে। তার কাছে স্তুপীকৃত রয়েছে কিছু পাথর। নদীর মধ্যে একটি লোক হাবুডুবু খেয়ে অতি কষ্টে কিনারের দিকে আসার চেষ্টা করছে। কিনারের কাছাকাছি আসা মাত্রই তীরবর্তী লোকটি তার মুখে এত জোরে পাথর ছুঁড়ে মারছে যে, সে আবার নদীর মাঝখানে চলে যাচ্ছে। এভাবে ক্রমাগত তার হাবুডুবু খেতে খেতে কুলে আসার এবং কুল থেকে পাথর মেরে তাকে মাঝ নদীতে হটিয়ে দেয়ার কার্যক্রম চলছে। এমন নির্মম আচরণ দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে আমার সঙ্গীকে বললামঃ বলুন, এ কি ব্যাপার? কিন্তু এবারও তারা জবাব না দিয়ে বললেন, সামনে চলুন।

আমরা আবার এগুতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম একটি সুন্দর সবুজ উদ্যান। উদ্যানের মাঝখানে একটি উঁচু গাছ। তার নীচে একজন বৃদ্ধ লোক বসে আছে। বৃদ্ধকে বেষ্টন করে বসে আছে বহুসংখ্যক বালক বালিকা। গাছের অপর পারে আরো এক ব্যক্তি বসে রয়েছে। তার সামনে আগুন জ্বলছে। ঐ লোকটি আগুনের মাত্রা বাড়িয়ে চলেছে। সঙ্গীদ্বয় আমাকে গাছে উঠালেন। গাছের মাঝখানে গিয়ে দেখলাম একটা মনোরম প্রাসাদ। এত সুন্দর ভবন আমি আর কখনো দেখিনি। ঐ ভবনে বালক বালিকা ও স্ত্রী পুরুষ - সকল শ্রেণীর মানুষ বিদ্যমান। সঙ্গীদ্বয় আমাকে আরো ওপরে নিয়ে গেলেন। সেখানে আরো একটি মনোরম গৃহ দেখতে পেলাম। তার ভেতরে দেখলাম শুধু কিছু সংখ্যক যুবক ও বৃদ্ধ উপস্থিত। আমি সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, আপনারা আমাকে নানা জায়গা ঘুরিয়ে অনেক কিছু দেখালেন। এবার এ সবের রহস্য আমাকে খুলে বলুন।

সংগীদ্বয় বলতে লাগলেনঃ প্রথম যে লোকটির মাথা করাত দিয়ে চেরাই করতে দেখলেন, তার মিথ্যা বলার অভ্যাস ছিল। সে যে সব মিথ্যা রটাতো, তা সমগ্র সমাজে প্রসিদ্ধ হয়ে যেতো। কিয়ামত পর্যন্ত তার এরূপ শাস্তি হতে থাকবে।

তারপর যার মাথা পাথরের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হতে দেখলেন, সে ছিল একজন মস্ত বড় আলেম। নিজে কুরআন হাদীস শিখেছিল, কিন্তু তা অন্যকে শিখায়নি এবং নিজেও তদনুসারে আমল করেনি। হাশরের দিন পর্যন্ত তার এ রকম শাস্তি হতে থাকবে।

তারপর যাদেরকে আগুনের বদ্ধ চুলোয় জ্বলতে দেখলেন তারা ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের এই আযাৰ চলতে থাকবে।

রক্তের নদীতে হাবুডুবু খাওয়া লোকটি দুনিয়ায় সুদ ও ঘুষ খেতো এবং এতীম ও বিধবার সম্পদ আত্মসাৎ করতো।

গাছের নীচে যে বৃদ্ধকে বালক বালিকা বেষ্টিত দেখলেন, উনি হযরত ইবরাহীম এবং বালক বালিকারা হচ্ছে নাবালক অবস্থায় মৃত ছেলে মেয়ে। আর যাকে আগুন জ্বালাতে দেখলেন, তিনি দোজখের দারোগা মালেক। গাছের ওপর প্রথম যে ভবনটি দেখেছেন, ওটা সাধারণ ঈমানদারদের বেহেস্তের বাড়ীঘর। আর দ্বিতীয় যে প্রাসাদটি দেখেছেন, তা হচ্ছে ইসলামের জন্য আত্মদানকারী শহীদদের বাসস্থান। আর আমি জিবরীল এবং আমার সংগী ইনি মিকাইল। অতঃপর জিবরীল আমাকে বললেন, ওপরের দিকে তাকান। আমি ওপরের দিকে তাকিয়ে একখন্ড সাদা মেঘের মত দেখলাম। জিবরীল বললেন, ওটা আপনার বাসস্থান। আমি বললাম, আমাকে ঐ বাড়ীতে যেতে দিন। জিবরীল বললেন, এখনও সময় হয়নি। পৃথিবীতে এখনো আপনার আয়ুকাল বাকী রয়েছে। দুনিয়ার জীবন শেষ হলে আপনি ওখানে যাবেন।

শিক্ষা : এ হাদীসটিতে রাসূল (সাঃ) কে স্বপ্নের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধের পরকালীন শাস্তির নমুনা দেখানোর বিবরণ রয়েছে। নবীদের স্বপ্ন ওহীর অন্তর্ভুক্ত এবং অকাট্য সত্য। সুতরাং এ শাস্তির ব্যাপারে আমাদের সুদৃঢ় ঈমান রাখা এবং এগুলিকে স্বরণে রেখে এসব অপরাধ থেকে নিবৃত্ত থাকা উচিত। বিশেষতঃ এমন কয়েকটি অপরাধের ওপর এখানে আলোকপাত করা হয়েছে, যা সামাজিক অপরাধের পর্যায়ভূক্ত। অর্থাৎ যা গোটা সমাজকে অন্যায় ও অনাচারের কবলে নিক্ষেপ করে। যেমনঃ মিথ্যাচার, সুদ, ঘুষ ও পরের অর্থ আত্মসাৎ করা এবং ইসলামের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তা প্রচারে বিমুখ হওয়া ও সে অনুসারে আমল না করা। একজন মিথ্যাবাদী যেমন মিথ্যা গুজব, অপবাদ ও কুৎসা রটিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত, বিপথগামী ও গোটা দেশবাসীকে অন্যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করে থাকে। একজন আলেম তেমনি তার নিষ্ক্রীয়তা ও বদ আমলী দ্বারা অন্য যে কোন খারাপ লোকের চেয়ে সমাজকে অধিকতর অপকর্মে প্ররোচিত করে থাকে। আর পরের সম্পদ আত্মসাৎকারী এবং সুদখোর ও ঘুষখোর যে গোটা সমাজকে কিভাবে জুলুম, নিপীড়ন ও শোষণ করে তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখেনা।

হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রীতি ছিল এই যে, প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর সাহাবীদের দিকে মুখ করে বসতেন এবং কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কিনা বা কারো কিছু জিজ্ঞাসা আছে কিনা জানতে চাইতেন। কেউ কিছু জানতে চাইলে তিনি তাকে যথাযথ পরামর্শ দিতেন।

একদিন এরূপ জিজ্ঞাসা করার পর কেউ কিছু বলছেনা দেখে তিনি নিজেই বলতে আরম্ভ করলেন। আজ আমি একটি অতি সুন্দর ও আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম, দুই ব্যক্তি আমার কাছে এসে আমার হাত ধরে আমাকে এক পবিত্র স্থানের দিকে নিয়ে চললো। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম, এক ব্যক্তি বসে আছে আর অপর এক ব্যক্তি তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়ানো লোকটির হাতে একখানা করাতের মত অস্ত্র রয়েছে। সেই করাত দিয়ে সে বসা লোকটির মাথা চিরে ফেলছে। একবার মুখের দিক দিয়ে করাত ঢুকিয়ে দিয়ে মাথার দিকে কেটে ফেলছে। আবার বিপরীত দিক দিয়েও তদ্রুপ করছে। এক দিক দিয়ে কাটার পর যখন অপর দিক দিয়ে কাটতে যায়, তখন আগের দিক জোড়া লেগে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ অবস্থা দেখে আমি আমার সঙ্গীদ্বয়কে জিজ্ঞাসা করলাম, এ কি ব্যাপার? তারা বললো, সামনে চলুন।

কিছুদুর গিয়ে দেখলাম, একজন লোক শুয়ে আছে। অপর একজন একখানা ভারী পাথর নিয়ে তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়ানো লোকটি ঐ পাথরের আঘাতে শোয়া লোকটির মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে। পাথরটি সে এত জোরে মারে যে, মাথাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে তা অনেক দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে। অতঃপর লোকটি যেই পাথর কুড়িয়ে আনতে যায়, অমনি ভাঙ্গা মাথা জোড়া লেগে ভালো হয়ে যায়। সে ঐ পাথর কুড়িয়ে এনে পুনরায় মাথায় আঘাত করে এবং মাথা আবার চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এভাবে ক্রমাগত ভাঙ্গা ও জোড়া লাগার পর্ব চলছে। এই লোমহর্ষক দৃশ্য দেখে আমি আতংকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপারটা কি আমাকে খুলে বলুন। তারা কোন জবাব না দিয়ে পুনরায় বললেন, আগে চলুন। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে দেখি, একটি প্রকাণ্ড গর্ত। গর্তটির মুখ সরু, কিন্তু অভ্যন্তর ভাগ অত্যন্ত গভীর ও প্রশস্ত। এ যেন একটি জ্বলন্ত চুলো, যার ভেতরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আর তার ভেতরে বহু সংখ্যক নর-নারী দগ্ধীভূত হচ্ছে। আগুনের তেজ এত বেশী যেন তাতে ঢেউ খেলছে। ঢেউয়ের সাথে যখন আগুন উচু হয়ে ওঠে, তখন ঐ লোকগুলো উথলে গর্তের মুখের কাছে চলে আসে। আবার যেই আগুন নীচে নেমে যায়, অমনি তারাও সাথে সাথে নীচে নেমে যায়। আমি আতংকিত হয়ে সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, বন্ধুগণ! এবার আমাকে বলুন ব্যাপারটা কি? কিন্তু এবারও তারা কোন জবাব না দিয়ে বললেন, আগে চলুন।

আমরা সামনে এগুতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম, একটি রক্তের নদী বয়ে চলছে। তীরে একটি লোক দাঁড়িয়ে। তার কাছে স্তুপীকৃত রয়েছে কিছু পাথর। নদীর মধ্যে একটি লোক হাবুডুবু খেয়ে অতি কষ্টে কিনারের দিকে আসার চেষ্টা করছে। কিনারের কাছাকাছি আসা মাত্রই তীরবর্তী লোকটি তার মুখে এত জোরে পাথর ছুঁড়ে মারছে যে, সে আবার নদীর মাঝখানে চলে যাচ্ছে। এভাবে ক্রমাগত তার হাবুডুবু খেতে খেতে কুলে আসার এবং কুল থেকে পাথর মেরে তাকে মাঝ নদীতে হটিয়ে দেয়ার কার্যক্রম চলছে। এমন নির্মম আচরণ দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে আমার সঙ্গীকে বললামঃ বলুন, এ কি ব্যাপার? কিন্তু এবারও তারা জবাব না দিয়ে বললেন, সামনে চলুন।

আমরা আবার এগুতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম একটি সুন্দর সবুজ উদ্যান। উদ্যানের মাঝখানে একটি উঁচু গাছ। তার নীচে একজন বৃদ্ধ লোক বসে আছে। বৃদ্ধকে বেষ্টন করে বসে আছে বহুসংখ্যক বালক বালিকা। গাছের অপর পারে আরো এক ব্যক্তি বসে রয়েছে। তার সামনে আগুন জ্বলছে। ঐ লোকটি আগুনের মাত্রা বাড়িয়ে চলেছে। সঙ্গীদ্বয় আমাকে গাছে উঠালেন। গাছের মাঝখানে গিয়ে দেখলাম একটা মনোরম প্রাসাদ। এত সুন্দর ভবন আমি আর কখনো দেখিনি। ঐ ভবনে বালক বালিকা ও স্ত্রী পুরুষ - সকল শ্রেণীর মানুষ বিদ্যমান। সঙ্গীদ্বয় আমাকে আরো ওপরে নিয়ে গেলেন। সেখানে আরো একটি মনোরম গৃহ দেখতে পেলাম। তার ভেতরে দেখলাম শুধু কিছু সংখ্যক যুবক ও বৃদ্ধ উপস্থিত। আমি সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, আপনারা আমাকে নানা জায়গা ঘুরিয়ে অনেক কিছু দেখালেন। এবার এ সবের রহস্য আমাকে খুলে বলুন।

সংগীদ্বয় বলতে লাগলেনঃ প্রথম যে লোকটির মাথা করাত দিয়ে চেরাই করতে দেখলেন, তার মিথ্যা বলার অভ্যাস ছিল। সে যে সব মিথ্যা রটাতো, তা সমগ্র সমাজে প্রসিদ্ধ হয়ে যেতো। কিয়ামত পর্যন্ত তার এরূপ শাস্তি হতে থাকবে।

তারপর যার মাথা পাথরের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হতে দেখলেন, সে ছিল একজন মস্ত বড় আলেম। নিজে কুরআন হাদীস শিখেছিল, কিন্তু তা অন্যকে শিখায়নি এবং নিজেও তদনুসারে আমল করেনি। হাশরের দিন পর্যন্ত তার এ রকম শাস্তি হতে থাকবে।

তারপর যাদেরকে আগুনের বদ্ধ চুলোয় জ্বলতে দেখলেন তারা ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের এই আযাৰ চলতে থাকবে।

রক্তের নদীতে হাবুডুবু খাওয়া লোকটি দুনিয়ায় সুদ ও ঘুষ খেতো এবং এতীম ও বিধবার সম্পদ আত্মসাৎ করতো।

গাছের নীচে যে বৃদ্ধকে বালক বালিকা বেষ্টিত দেখলেন, উনি হযরত ইবরাহীম এবং বালক বালিকারা হচ্ছে নাবালক অবস্থায় মৃত ছেলে মেয়ে। আর যাকে আগুন জ্বালাতে দেখলেন, তিনি দোজখের দারোগা মালেক। গাছের ওপর প্রথম যে ভবনটি দেখেছেন, ওটা সাধারণ ঈমানদারদের বেহেস্তের বাড়ীঘর। আর দ্বিতীয় যে প্রাসাদটি দেখেছেন, তা হচ্ছে ইসলামের জন্য আত্মদানকারী শহীদদের বাসস্থান। আর আমি জিবরীল এবং আমার সংগী ইনি মিকাইল। অতঃপর জিবরীল আমাকে বললেন, ওপরের দিকে তাকান। আমি ওপরের দিকে তাকিয়ে একখন্ড সাদা মেঘের মত দেখলাম। জিবরীল বললেন, ওটা আপনার বাসস্থান। আমি বললাম, আমাকে ঐ বাড়ীতে যেতে দিন। জিবরীল বললেন, এখনও সময় হয়নি। পৃথিবীতে এখনো আপনার আয়ুকাল বাকী রয়েছে। দুনিয়ার জীবন শেষ হলে আপনি ওখানে যাবেন।

শিক্ষা : এ হাদীসটিতে রাসূল (সাঃ) কে স্বপ্নের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধের পরকালীন শাস্তির নমুনা দেখানোর বিবরণ রয়েছে। নবীদের স্বপ্ন ওহীর অন্তর্ভুক্ত এবং অকাট্য সত্য। সুতরাং এ শাস্তির ব্যাপারে আমাদের সুদৃঢ় ঈমান রাখা এবং এগুলিকে স্বরণে রেখে এসব অপরাধ থেকে নিবৃত্ত থাকা উচিত। বিশেষতঃ এমন কয়েকটি অপরাধের ওপর এখানে আলোকপাত করা হয়েছে, যা সামাজিক অপরাধের পর্যায়ভূক্ত। অর্থাৎ যা গোটা সমাজকে অন্যায় ও অনাচারের কবলে নিক্ষেপ করে। যেমনঃ মিথ্যাচার, সুদ, ঘুষ ও পরের অর্থ আত্মসাৎ করা এবং ইসলামের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তা প্রচারে বিমুখ হওয়া ও সে অনুসারে আমল না করা। একজন মিথ্যাবাদী যেমন মিথ্যা গুজব, অপবাদ ও কুৎসা রটিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত, বিপথগামী ও গোটা দেশবাসীকে অন্যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করে থাকে। একজন আলেম তেমনি তার নিষ্ক্রীয়তা ও বদ আমলী দ্বারা অন্য যে কোন খারাপ লোকের চেয়ে সমাজকে অধিকতর অপকর্মে প্ররোচিত করে থাকে। আর পরের সম্পদ আত্মসাৎকারী এবং সুদখোর ও ঘুষখোর যে গোটা সমাজকে কিভাবে জুলুম, নিপীড়ন ও শোষণ করে তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখেনা।

📘 হাদীসের কিসসা > 📄 মিরাজের ঘটনা

📄 মিরাজের ঘটনা


মিরাজ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর, অলৌকিক ও শিক্ষামূলক ঘটনা। রাত্রে সংঘটিত হওয়ায় অনেকে একে স্বপ্ন ভেবে বিভ্রান্ত হয়েছে। আসলে এটি একটি বাস্তব ঘটনা। রাসূল (সাঃ) সম্পূর্ণ জাগ্রত ও সচেতন অবস্থায় ফেরেশতাদের সাহচার্যে মক্কা শরীফ থেকে প্রথমে বাইতুল মাকদাস এবং পরে সেখান থেকে সাত আসমান ও তারও উর্দ্ধের জগত পরিভ্রমণ করেন। এই ঘটনা সম্পর্কে নিম্নে সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের বর্ণনা সমূহের সমন্বিত বিবরণ উদ্ধৃত করা হচ্ছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সকালে সাহাবায়ে কেরামের মজলিসে বললেন, “গত রাতে আমার প্রতিপ্রতিপালক আমাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছেন। গত রাতে আমি যখন মসজিদুল হারামে ঘুমিয়ে ছিলাম, তখন তিনজন ফেরেশতা আমার কাছে আসলেন। তারা আমাকে জাগিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে যমযম কুয়ার নিকট রাখলেন। অতঃপর জিবরীল আমার গলা থেকে বুক পর্যন্ত চিরে ফেললেন এবং আমার বুক ও পেটের ভেতর থেকে সমুদয় বস্তু বের করলেন। তারপর নিজ হাতে যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে আমার পেট পবিত্র করলেন। অতঃপর একটি সোনার পাত্র আনা হলো। ঐ পাত্র থেকে ঈমান ও হিকমত নিয়ে বুক ও গলার ধমনীগুলো পূর্ণ করলেন এবং জোড়া লাগিয়ে দিলেন। অতঃপর আমাকে মসজিদুল হারামের দরজায় আনা হলো। সেখানে জিবরীল আমাকে বহন করে নেয়ার জন্য খচ্চর সদৃশ বোরাক নামক একটি জন্তু পেশ করলেন। জন্তুটি ছিল শ্বেত বর্ণের। আমি যখন তাতে আরোহণ করলাম, তখন তা এত দ্রুত গতিতে চলতে লাগলো যে, তার পেছনের পা দু'টি যে স্থানে স্পর্শ করে, সেখান থেকে সামনের পা যেখানে পড়ে তার দূরত্ব দৃষ্টি সীমার দূরত্বের সমান। এভাবে তা আমাকে বিদ্যুৎবেগে নিয়ে বাইতুল মাকদাসে গিয়ে উপনীত হল। এখানে জিরবীলের ইংগিতে বোরাকটিকে মসজিদুল আকসার দরজার কাছে একটি বিশেষ জায়গায় বেঁধে রাখা হলো। বনী ইসরাইলের নবীগণ এই মসজিদে নামাজ পড়তে এসে তাদের বাহনকে ঐ জায়গায় বেঁধে রাখতেন।

অতঃপর আমি মসজিদুল আকসার ভিতরে প্রবেশ করে দু'রাকাত নামায পড়লাম। কোন কোন বর্ণনা অনুসারে, পূর্ববর্তী সকল নবীগনের ইমাম হয়ে জামায়াতে নামায পড়লাম। তারপর সেখান থেকে উর্ধ্বজগতে আরোহনের প্রস্তুতি শুরু হলো। প্রথমে জিবরীল আমার সামনে দু'টি পেয়ালা পেশ করলেন। এর একটিতে দুধ ও অপরটিতে মদ ছিল। আমি দুধের পেয়ালা গ্রহণ করলাম এবং মদের পেয়ালা ফেরত দিলাম। তা দেখে জিবরীল বললেন, আপনি দুধের পেয়ালা গ্রহণ করে স্বাভাবিক দ্বীনকে গ্রহণ করেছেন।

অতঃপর উর্ধ্বজগতের ভ্রমণ শুরু হলো। আমাকে ও জিবরী'কে নিয়ে বোরাক আকাশের দিকে উড়ে চললো। আমরা প্রথম আসমানে পৌছলে জিবরীল দ্বাররক্ষী ফেরেস্তাদেরকে দরজা খুলে দিতে বললেন। রক্ষী ফেরেস্তারা জিজ্ঞাসা করলেন, কে? জিবরীল উত্তর দিলেন, আমি জিবরীল। ফেরেস্তারা জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সংগে কে? জিবরীল উত্তর দিলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ফেরেস্তারা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কি আল্লাহ তায়ালার নিমন্ত্রণ পেয়ে এসেছেন? জিবরীল বললেন, অবশ্যই। ফেরেস্তারা দরজা খুলতে খুলতে বললেন, এমন ব্যক্তির আগমন মোবারক হোক। আমরা যখন প্রথম আকাশে প্রবেশ করলাম, প্রথমেই হযরত আদম (আঃ) এর সাথে দেখা হলো। জিবরীল আমাকে বললেন ইনি আপনার পিতা আদম আলাইহিস্ সালাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি আমার সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, স্বাগতম, হে সম্মানিত পুত্র ও সম্মানিত নবী।

অতঃপর দ্বিতীয় আসমান পর্যন্ত পৌছলাম। এখানে প্রথম আসমানের মত প্রশ্নোত্তরের পালা অতিক্রম করে দরজা দিয়ে প্রবেশ করলাম। সেখানে হযরত ইয়াহিয়া ও ঈশা (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত হলো। জিবরীল আমাকে তাঁদের উভয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং বললেন, আপনিই আগে সালাম করুন। আমি সালাম করলে তাঁরা উত্তর দিয়ে বললেন, "স্বাগতম, হে সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত নবী।"

অতঃপর তৃতীয় আসমানে পৌছলে পূর্বের মত ঘটনাই ঘটলো এবং সেখানে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাত হলো। জিবরীল আমাকে বললেন, আপনিই আগে সালাম করুন। আমি সালাম করলে ইউসুফ (আঃ) সালামের জবাব দিয়ে বললেন, "স্বাগতম, হে সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত নবী।" অতঃপর চতুর্থ আসমানে একই রকমের প্রশ্নোত্তরের পর্ব অতিক্রম করে হযরত ইদরীস আলাইহিস্ সালামের সাক্ষাত হলো।

অতঃপর পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন আলাইহিস সালাম এবং ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা (আঃ) এর সাথে একইভাবে সাক্ষাত অনুষ্ঠিত হলো। কিন্তু হযরত মূসার (আঃ) কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আপনার এই অসাধারণ মর্যাদার জন্য আমার ঈর্ষা হচ্ছে যে, আপনার ইম্মত আমার উম্মতের তুলনায় বহু গুণ বেশী বেহেস্তবাসী হবে।

অতঃপর পূর্বোক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব অতিক্রম করে আমরা যখন সপ্তম আকাশে পৌছলাম, তখন সেখানে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস্ সালামের সাথে সাক্ষাত হলো। তিনি সেখানে বাইতুল মা'মুরের দেয়ালের সাথে পিঠ লাগিয়ে বসেছিলেন। এই বাইতুল মা'মুরে প্রতিদিন সত্তর হাজার নতুন নতুন ফেরেস্তা প্রবেশ করেন। তিনি আমার সালামের জবাব দিয়ে বললেন, "স্বাগতম, হে আমার সম্মানিত সন্তান এবং সম্মানিত নবী।" অতঃপর সেখান থেকে আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় (শাব্দিক অর্থে 'সীমান্তের বরই গাছ' তবে এটি প্রকৃত পক্ষে কী গাছ, তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না) নিয়ে যাওয়া হলো।

অতঃপর আল্লাহ আমাকে সম্বোধন করে হুকুম দিলেন যে, আপনার ও আপনার উম্মতের ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হলো। অতঃপর আমি নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম। পথিমধ্যে হযরত মূসা (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত হলো। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই মিরাজের সফরে আপনি কি উপটৌ কন পেলেন? আমি বললাম, ৫০ ওয়াক্তের নামায। তিনি বললেন, আপনার উম্মত এই ভারী বোঝা বহন করতে পারবে না। সুতরাং আপনি আবার ফিরে যান এবং আরো কমিয়ে দেয়ার আবেদন জানান। কেননা আমি আপনার পূর্বে নিজের উম্মাতকে পরীক্ষা করেছি। এ কথা শুনে আমি আল্লাহর দরবারে ফিরে গেলাম এবং মিনতি জানানোর পর ৫ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হলো। অতঃপর মূসার কাছে আসলে তিনি পুনরায় বললেন, এখনো অনেক বেশী রয়েছে, আবার যান এবং আরো কমিয়ে আনুন। আমি আবার গেলাম। এবারও আরো ৫ ওয়াক্ত কমানো হলো। অতঃপর মূসার পীড়াপীড়িতে আবার যাই এবং আবার ৫ ওয়াক্ত কমিয়ে আনি। এভাবে কয়েকবার গিয়ে কমাতে কমাতে যখন মাত্র ৫ ওয়াক্ত বাকী রইল, তখনও মূসা আমাকে বললেন, আমি বনী ইসরাইলের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আপনার উম্মাত ৫ ওয়াক্তও সহ্য করতে পারবে না। সুতরাং আবার যান এবং কমিয়ে আনুন। কেননা প্রতিবার ৫ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। এবার গেলেও হয়তো ৫ ওয়াক্ত কমানো হবে। তখন আমার হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আমি এখন পুনরায় কমানোর আবেদন জানাতে লজ্জা বোধ করছি।"

বুখারী শরীফের রেওয়ায়েতে আরো বলা হয়েছে যে, শেষ বারেও রাসূল (সাঃ) আল্লাহর কাছে যান এবং বলেন, হে প্রতিপালক! আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি খুবই দুর্বল। অতএব আমার প্রতি এ নির্দেশকে আরো হালকা করে দিন। তখন আল্লাহ তায়ালা বললেনঃ হে মুহাম্মদ! রাসূল (সাঃ) জবাব দিলেন: হে প্রভু, আমি হাযির। আল্লাহ বললেনঃ আমার নির্দেশের কোন রদবদল হয় না। আমি তোমাদের প্রতি যা ফরয করেছিলাম, তা উম্মুল কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। প্রত্যেক সৎ কাজের নেকী দশগুণ। উম্মুল কিতাব বা লওহে মাহফুযে পঞ্চাশ ওয়াক্তই লেখা থাকলো। শুধু তোমার ও তোমার উম্মতের জন্য তা ৫ ওয়াক্ত করা হলো।

এরপর তিনি নেমে এলেন এবং নিজেকে জাগ্রত অবস্থায় মসজিদুল হারামে উপনীত দেখতে পেলেন।

শিক্ষা: মিরাজের ঘটনার শিক্ষা অনেক। এখানে তার মাত্র কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা তুলে ধরছিঃ
(১) নামায যে ইসলামী ইবাদাতগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা এই ঘটনা থেকে দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে গেছে। আল্লাহ অন্যান্য সকল ইবাদাত ফরয করার জন্য একটি ওহী নাযিল করাই যথেষ্ট মনে করেছেন। কিন্তু নামায ফরয করার জন্য কুরআনে ১১৩ বার নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও তাকে যথেষ্ট মনে করেননি। বিশেষভাবে দাওয়াত দিয়ে রাসূল (সাঃ) কে নিজের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে নিয়ে এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায এমন ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ফরয করলেন যে, প্রত্যেক ওয়াক্তের নামায দশটি ওয়াক্তের সমান বলে ধারণা দেয়া হলো। যাতে এর একটি ওয়াক্তও কেউ তরক করার সাহস না করে।
(২) রাসূল (সাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পূর্ববর্তী সকল নবীকে প্রথমে সালাম করেছেন। এ দ্বারা ইসলামের এই শিক্ষাই প্রতিফলিত হয়েছে যে, কোন জায়গায় আগে থেকে উপস্থিত ব্যক্তি এবং পরে আগত ব্যক্তির মধ্যে শেষোক্ত ব্যক্তিরই কর্তব্য প্রথমোক্ত ব্যক্তিকে সালাম করা, চাই মর্যাদার দিক দিয়ে যিনিই শ্রেষ্ঠ হোন না কেন।

মিরাজ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর, অলৌকিক ও শিক্ষামূলক ঘটনা। রাত্রে সংঘটিত হওয়ায় অনেকে একে স্বপ্ন ভেবে বিভ্রান্ত হয়েছে। আসলে এটি একটি বাস্তব ঘটনা। রাসূল (সাঃ) সম্পূর্ণ জাগ্রত ও সচেতন অবস্থায় ফেরেশতাদের সাহচার্যে মক্কা শরীফ থেকে প্রথমে বাইতুল মাকদাস এবং পরে সেখান থেকে সাত আসমান ও তারও উর্দ্ধের জগত পরিভ্রমণ করেন। এই ঘটনা সম্পর্কে নিম্নে সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের বর্ণনা সমূহের সমন্বিত বিবরণ উদ্ধৃত করা হচ্ছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সকালে সাহাবায়ে কেরামের মজলিসে বললেন, “গত রাতে আমার প্রতিপ্রতিপালক আমাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছেন। গত রাতে আমি যখন মসজিদুল হারামে ঘুমিয়ে ছিলাম, তখন তিনজন ফেরেশতা আমার কাছে আসলেন। তারা আমাকে জাগিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে যমযম কুয়ার নিকট রাখলেন। অতঃপর জিবরীল আমার গলা থেকে বুক পর্যন্ত চিরে ফেললেন এবং আমার বুক ও পেটের ভেতর থেকে সমুদয় বস্তু বের করলেন। তারপর নিজ হাতে যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে আমার পেট পবিত্র করলেন। অতঃপর একটি সোনার পাত্র আনা হলো। ঐ পাত্র থেকে ঈমান ও হিকমত নিয়ে বুক ও গলার ধমনীগুলো পূর্ণ করলেন এবং জোড়া লাগিয়ে দিলেন। অতঃপর আমাকে মসজিদুল হারামের দরজায় আনা হলো। সেখানে জিবরীল আমাকে বহন করে নেয়ার জন্য খচ্চর সদৃশ বোরাক নামক একটি জন্তু পেশ করলেন। জন্তুটি ছিল শ্বেত বর্ণের। আমি যখন তাতে আরোহণ করলাম, তখন তা এত দ্রুত গতিতে চলতে লাগলো যে, তার পেছনের পা দু'টি যে স্থানে স্পর্শ করে, সেখান থেকে সামনের পা যেখানে পড়ে তার দূরত্ব দৃষ্টি সীমার দূরত্বের সমান। এভাবে তা আমাকে বিদ্যুৎবেগে নিয়ে বাইতুল মাকদাসে গিয়ে উপনীত হল। এখানে জিরবীলের ইংগিতে বোরাকটিকে মসজিদুল আকসার দরজার কাছে একটি বিশেষ জায়গায় বেঁধে রাখা হলো। বনী ইসরাইলের নবীগণ এই মসজিদে নামাজ পড়তে এসে তাদের বাহনকে ঐ জায়গায় বেঁধে রাখতেন।

অতঃপর আমি মসজিদুল আকসার ভিতরে প্রবেশ করে দু'রাকাত নামায পড়লাম। কোন কোন বর্ণনা অনুসারে, পূর্ববর্তী সকল নবীগনের ইমাম হয়ে জামায়াতে নামায পড়লাম। তারপর সেখান থেকে উর্ধ্বজগতে আরোহনের প্রস্তুতি শুরু হলো। প্রথমে জিবরীল আমার সামনে দু'টি পেয়ালা পেশ করলেন। এর একটিতে দুধ ও অপরটিতে মদ ছিল। আমি দুধের পেয়ালা গ্রহণ করলাম এবং মদের পেয়ালা ফেরত দিলাম। তা দেখে জিবরীল বললেন, আপনি দুধের পেয়ালা গ্রহণ করে স্বাভাবিক দ্বীনকে গ্রহণ করেছেন।

অতঃপর উর্ধ্বজগতের ভ্রমণ শুরু হলো। আমাকে ও জিবরী'কে নিয়ে বোরাক আকাশের দিকে উড়ে চললো। আমরা প্রথম আসমানে পৌছলে জিবরীল দ্বাররক্ষী ফেরেস্তাদেরকে দরজা খুলে দিতে বললেন। রক্ষী ফেরেস্তারা জিজ্ঞাসা করলেন, কে? জিবরীল উত্তর দিলেন, আমি জিবরীল। ফেরেস্তারা জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সংগে কে? জিবরীল উত্তর দিলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ফেরেস্তারা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কি আল্লাহ তায়ালার নিমন্ত্রণ পেয়ে এসেছেন? জিবরীল বললেন, অবশ্যই। ফেরেস্তারা দরজা খুলতে খুলতে বললেন, এমন ব্যক্তির আগমন মোবারক হোক। আমরা যখন প্রথম আকাশে প্রবেশ করলাম, প্রথমেই হযরত আদম (আঃ) এর সাথে দেখা হলো। জিবরীল আমাকে বললেন ইনি আপনার পিতা আদম আলাইহিস্ সালাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি আমার সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, স্বাগতম, হে সম্মানিত পুত্র ও সম্মানিত নবী।

অতঃপর দ্বিতীয় আসমান পর্যন্ত পৌছলাম। এখানে প্রথম আসমানের মত প্রশ্নোত্তরের পালা অতিক্রম করে দরজা দিয়ে প্রবেশ করলাম। সেখানে হযরত ইয়াহিয়া ও ঈশা (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত হলো। জিবরীল আমাকে তাঁদের উভয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং বললেন, আপনিই আগে সালাম করুন। আমি সালাম করলে তাঁরা উত্তর দিয়ে বললেন, "স্বাগতম, হে সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত নবী।"

অতঃপর তৃতীয় আসমানে পৌছলে পূর্বের মত ঘটনাই ঘটলো এবং সেখানে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাত হলো। জিবরীল আমাকে বললেন, আপনিই আগে সালাম করুন। আমি সালাম করলে ইউসুফ (আঃ) সালামের জবাব দিয়ে বললেন, "স্বাগতম, হে সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত নবী।" অতঃপর চতুর্থ আসমানে একই রকমের প্রশ্নোত্তরের পর্ব অতিক্রম করে হযরত ইদরীস আলাইহিস্ সালামের সাক্ষাত হলো।

অতঃপর পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন আলাইহিস সালাম এবং ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা (আঃ) এর সাথে একইভাবে সাক্ষাত অনুষ্ঠিত হলো। কিন্তু হযরত মূসার (আঃ) কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আপনার এই অসাধারণ মর্যাদার জন্য আমার ঈর্ষা হচ্ছে যে, আপনার ইম্মত আমার উম্মতের তুলনায় বহু গুণ বেশী বেহেস্তবাসী হবে।

অতঃপর পূর্বোক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব অতিক্রম করে আমরা যখন সপ্তম আকাশে পৌছলাম, তখন সেখানে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস্ সালামের সাথে সাক্ষাত হলো। তিনি সেখানে বাইতুল মা'মুরের দেয়ালের সাথে পিঠ লাগিয়ে বসেছিলেন। এই বাইতুল মা'মুরে প্রতিদিন সত্তর হাজার নতুন নতুন ফেরেস্তা প্রবেশ করেন। তিনি আমার সালামের জবাব দিয়ে বললেন, "স্বাগতম, হে আমার সম্মানিত সন্তান এবং সম্মানিত নবী।" অতঃপর সেখান থেকে আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় (শাব্দিক অর্থে 'সীমান্তের বরই গাছ' তবে এটি প্রকৃত পক্ষে কী গাছ, তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না) নিয়ে যাওয়া হলো।

অতঃপর আল্লাহ আমাকে সম্বোধন করে হুকুম দিলেন যে, আপনার ও আপনার উম্মতের ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হলো। অতঃপর আমি নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম। পথিমধ্যে হযরত মূসা (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত হলো। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই মিরাজের সফরে আপনি কি উপটৌ কন পেলেন? আমি বললাম, ৫০ ওয়াক্তের নামায। তিনি বললেন, আপনার উম্মত এই ভারী বোঝা বহন করতে পারবে না। সুতরাং আপনি আবার ফিরে যান এবং আরো কমিয়ে দেয়ার আবেদন জানান। কেননা আমি আপনার পূর্বে নিজের উম্মাতকে পরীক্ষা করেছি। এ কথা শুনে আমি আল্লাহর দরবারে ফিরে গেলাম এবং মিনতি জানানোর পর ৫ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হলো। অতঃপর মূসার কাছে আসলে তিনি পুনরায় বললেন, এখনো অনেক বেশী রয়েছে, আবার যান এবং আরো কমিয়ে আনুন। আমি আবার গেলাম। এবারও আরো ৫ ওয়াক্ত কমানো হলো। অতঃপর মূসার পীড়াপীড়িতে আবার যাই এবং আবার ৫ ওয়াক্ত কমিয়ে আনি। এভাবে কয়েকবার গিয়ে কমাতে কমাতে যখন মাত্র ৫ ওয়াক্ত বাকী রইল, তখনও মূসা আমাকে বললেন, আমি বনী ইসরাইলের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আপনার উম্মাত ৫ ওয়াক্তও সহ্য করতে পারবে না। সুতরাং আবার যান এবং কমিয়ে আনুন। কেননা প্রতিবার ৫ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। এবার গেলেও হয়তো ৫ ওয়াক্ত কমানো হবে। তখন আমার হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আমি এখন পুনরায় কমানোর আবেদন জানাতে লজ্জা বোধ করছি।"

বুখারী শরীফের রেওয়ায়েতে আরো বলা হয়েছে যে, শেষ বারেও রাসূল (সাঃ) আল্লাহর কাছে যান এবং বলেন, হে প্রতিপালক! আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি খুবই দুর্বল। অতএব আমার প্রতি এ নির্দেশকে আরো হালকা করে দিন। তখন আল্লাহ তায়ালা বললেনঃ হে মুহাম্মদ! রাসূল (সাঃ) জবাব দিলেন: হে প্রভু, আমি হাযির। আল্লাহ বললেনঃ আমার নির্দেশের কোন রদবদল হয় না। আমি তোমাদের প্রতি যা ফরয করেছিলাম, তা উম্মুল কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। প্রত্যেক সৎ কাজের নেকী দশগুণ। উম্মুল কিতাব বা লওহে মাহফুযে পঞ্চাশ ওয়াক্তই লেখা থাকলো। শুধু তোমার ও তোমার উম্মতের জন্য তা ৫ ওয়াক্ত করা হলো।

এরপর তিনি নেমে এলেন এবং নিজেকে জাগ্রত অবস্থায় মসজিদুল হারামে উপনীত দেখতে পেলেন।

শিক্ষা: মিরাজের ঘটনার শিক্ষা অনেক। এখানে তার মাত্র কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা তুলে ধরছিঃ
(১) নামায যে ইসলামী ইবাদাতগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা এই ঘটনা থেকে দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে গেছে। আল্লাহ অন্যান্য সকল ইবাদাত ফরয করার জন্য একটি ওহী নাযিল করাই যথেষ্ট মনে করেছেন। কিন্তু নামায ফরয করার জন্য কুরআনে ১১৩ বার নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও তাকে যথেষ্ট মনে করেননি। বিশেষভাবে দাওয়াত দিয়ে রাসূল (সাঃ) কে নিজের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে নিয়ে এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায এমন ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ফরয করলেন যে, প্রত্যেক ওয়াক্তের নামায দশটি ওয়াক্তের সমান বলে ধারণা দেয়া হলো। যাতে এর একটি ওয়াক্তও কেউ তরক করার সাহস না করে।
(২) রাসূল (সাঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পূর্ববর্তী সকল নবীকে প্রথমে সালাম করেছেন। এ দ্বারা ইসলামের এই শিক্ষাই প্রতিফলিত হয়েছে যে, কোন জায়গায় আগে থেকে উপস্থিত ব্যক্তি এবং পরে আগত ব্যক্তির মধ্যে শেষোক্ত ব্যক্তিরই কর্তব্য প্রথমোক্ত ব্যক্তিকে সালাম করা, চাই মর্যাদার দিক দিয়ে যিনিই শ্রেষ্ঠ হোন না কেন।

📘 হাদীসের কিসসা > 📄 মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা

📄 মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা


হযরত জাবের থেকে বর্ণিত আছে যে, আমরা রাসূল (সাঃ) এর সঙ্গে যাতুর রিকাব অভিযানে গিয়েছিলাম। একটি ছায়াদার বৃক্ষ দেখে সেখানে রাসূল (সাঃ) বিশ্রাম করতে লাগলেন। আর আমরা কিছু দূরে অবস্থান করতে লাগলাম। সহসা শত্রুপক্ষীয় একজন মোশরেক রাসূল (সাঃ) এর কাছে এল। এ সময়ে রাসূল (সাঃ) ঘুমন্ত ছিলেন এবং তাঁর তরবারী গাছের সাথে ঝুলছিল। সে এসেই রাসূলুল্লাহর তরবারী হাতে নিয়ে বললো, হে মুহাম্মদ! এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? রাসূল (সাঃ) নির্ভীকভাকে দৃপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, আল্লাহ। এ কথা শোনামাত্র লোকটির হাত থেকে তরবারী খসে পড়লো। অমনি রাসূল (সাঃ) তরবারী তুলে নিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ বল, এখন কে তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে? সে বললোঃ আপনি মহানুভবতা প্রদর্শন করুন। রাসূল (সাঃ) বললেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত আছ যে, আল্লাহ ছাড়া, আর কোন মা'বুদ নেই এবং আমি তাঁর রাসূল? সে বললোঃ না। তবে আমি ওয়াদা করছি যে, আমি কখনো আপনার সাথে যুদ্ধ করবো না এবং আপনার শত্রুদের সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করতে আসবো না। রাসূল (সাঃ) তাকে মুক্ত করে দিলেন। সে চলে গেল। নিজ গোত্রের কাছে গিয়ে সে বললোঃ আমি মুহাম্মাদের (সাঃ) সাথে সাক্ষাত করে এলাম। পৃথিবীতে তার চেয়ে উত্তম মানুষ আর নেই।

শিক্ষা : (১) আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান, অবিচল নির্ভরতা ও সৎ সাহস মুমিন ব্যক্তির সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
(২) নাগালে পেয়েও শত্রুর প্রতি মহানুভবতা ও ক্ষমা প্রদর্শন ইসলামের দাওয়াত দাতাদের সবচেয়ে মূল্যবান গুণ। এ দ্বারা মানুষের হৃদয় জয় করা যায়।
(৩) শত্রুকে সব সময় স্বমতে দীক্ষিত করার আশা করা ঠিক নয়। কখনো কখনো তার শত্রুতার তীব্রতা হ্রাস পাওয়াকেই যথেষ্ট মনে করা উচিত। তাকে সংঘর্ষের পথ থেকে সরাতে পারাও একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

হযরত জাবের থেকে বর্ণিত আছে যে, আমরা রাসূল (সাঃ) এর সঙ্গে যাতুর রিকাব অভিযানে গিয়েছিলাম। একটি ছায়াদার বৃক্ষ দেখে সেখানে রাসূল (সাঃ) বিশ্রাম করতে লাগলেন। আর আমরা কিছু দূরে অবস্থান করতে লাগলাম। সহসা শত্রুপক্ষীয় একজন মোশরেক রাসূল (সাঃ) এর কাছে এল। এ সময়ে রাসূল (সাঃ) ঘুমন্ত ছিলেন এবং তাঁর তরবারী গাছের সাথে ঝুলছিল। সে এসেই রাসূলুল্লাহর তরবারী হাতে নিয়ে বললো, হে মুহাম্মদ! এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? রাসূল (সাঃ) নির্ভীকভাকে দৃপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, আল্লাহ। এ কথা শোনামাত্র লোকটির হাত থেকে তরবারী খসে পড়লো। অমনি রাসূল (সাঃ) তরবারী তুলে নিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ বল, এখন কে তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে? সে বললোঃ আপনি মহানুভবতা প্রদর্শন করুন। রাসূল (সাঃ) বললেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত আছ যে, আল্লাহ ছাড়া, আর কোন মা'বুদ নেই এবং আমি তাঁর রাসূল? সে বললোঃ না। তবে আমি ওয়াদা করছি যে, আমি কখনো আপনার সাথে যুদ্ধ করবো না এবং আপনার শত্রুদের সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করতে আসবো না। রাসূল (সাঃ) তাকে মুক্ত করে দিলেন। সে চলে গেল। নিজ গোত্রের কাছে গিয়ে সে বললোঃ আমি মুহাম্মাদের (সাঃ) সাথে সাক্ষাত করে এলাম। পৃথিবীতে তার চেয়ে উত্তম মানুষ আর নেই।

শিক্ষা : (১) আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান, অবিচল নির্ভরতা ও সৎ সাহস মুমিন ব্যক্তির সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
(২) নাগালে পেয়েও শত্রুর প্রতি মহানুভবতা ও ক্ষমা প্রদর্শন ইসলামের দাওয়াত দাতাদের সবচেয়ে মূল্যবান গুণ। এ দ্বারা মানুষের হৃদয় জয় করা যায়।
(৩) শত্রুকে সব সময় স্বমতে দীক্ষিত করার আশা করা ঠিক নয়। কখনো কখনো তার শত্রুতার তীব্রতা হ্রাস পাওয়াকেই যথেষ্ট মনে করা উচিত। তাকে সংঘর্ষের পথ থেকে সরাতে পারাও একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

📘 হাদীসের কিসসা > 📄 মহানবীর আখলাক

📄 মহানবীর আখলাক


[ক] একবার এক সফরে থাকাকালে রাসূল (সাঃ) সাহাবীগণকে একটি ছাগল জবাই করে রান্না করতে বললেন। জনৈক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ছাগলটি জবাই করবো। আর এক সাহাবী আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ছাগলটির চামড়া খসাবো ও গোশত বানাবো। তৃতীয় সাহাবী আবদার করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ছাগলটি রান্না করবো। রাসূল (সাঃ) বললেন, ঠিক আছে। আর আমি রান্নার জন্য জ্বালানী কাঠ কুড়িয়ে আনবো।

সকলে একযোগে বললো, ইয়া রাসূলুল্লাহ, ও কাজটি আমরাই করতে পারবো, আপনার কিছু করতে হবে না। রাসূল (সাঃ) বললেন, আমি জানি, ও কাজটি আমি না পারলেও তোমরা করতে পারবে। কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বসে থাকা পছন্দ করি না। আল্লাহও এটা পছন্দ করেন না যে, তার কোন বান্দা তার সাথীদের মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বসে থাকুক।

শিক্ষাঃ (ক) মহানবী (সাঃ) এর এই গুণটি পদমর্যাদা সম্পন্নসহ নির্বিশেষে সকল মুসলমানের আয়ত্ব করা উচিত। অফিস আদালতে বা ঘরোয়া জীবনে সর্বক্ষেত্রে প্রত্যেকের পরস্পরের সহযোগিতা করা উচিত।

[খ] জনৈক ইহুদীর কাছে রাসূল (সাঃ) এর কিছু ঋণ ছিল। লোকটি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধের জন্য তাড়া দিতে লাগলো। সে মদিনার এক রাস্তায় রাসূল (সাঃ) এর মুখোমুখী হয়ে বললো "তোমরা আব্দুল মুতালিবের বংশধরেরা সময়মত ঋণ পরিশোধ কর না।"

হযরত ওমর তার এই আচরণ দেখে রেগে গিয়ে বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি অনুমতি দিন, ওর গর্দান কেটে ফেলি।"

রাসূল (সাঃ) বললেন, "হে ওমর, আমার এই ইহুদীর জন্য অন্য রকম আচরণের প্রয়োজন ছিল। তুমি বরং ওকে উত্তম পন্থায় ঋণ ফেরত চাইতে বল, আর আমাকে উত্তম পন্থায় ঋণ পরিশোধ করতে বল.."

অতঃপর তিনি ইহুদীর দিকে ফিরে বললেন, তুমি কালকেই তোমার দেয়া ঋণ ফেরত পাবে।

এদিকে রাসূল (সাঃ) এর ব্যবহারে ইহুদীর মনে ভাবান্তর দেখা দিল। সে এগিয়ে এসে বললোঃ "আমি আসলে আপনার প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছিলাম। তাওরাতে শেষ নবীর এ রকম আলামতই লেখা আছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনিই আল্লাহর শেষ রাসূল।” এই বলে সে ইসলাম গ্রহণ করলো।

শিক্ষাঃ (ক) স্বচ্ছল ব্যক্তির কোন অস্বচ্ছল ব্যক্তিকে ঋণ দেয়া খুবই সওয়াবের কাজ। আর সময় মত ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে তাকে সময় বাড়িয়ে দেয়া আরো মহৎ কাজ। তবে সময় হওয়ার আগে ঋণ পরিশোধের জন্য তাড়া দেওয়া এবং কটুক্তি করায় ঋণ দেয়ার সওয়াব কমে যায়। (খ) কারো আচরণে সহসা উত্তেজিত হওয়া উচিত নয়। ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা কখনো কখনো অকল্পনীয় সুফল পাওয়া যায়।

[ক] একবার এক সফরে থাকাকালে রাসূল (সাঃ) সাহাবীগণকে একটি ছাগল জবাই করে রান্না করতে বললেন। জনৈক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ছাগলটি জবাই করবো। আর এক সাহাবী আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ছাগলটির চামড়া খসাবো ও গোশত বানাবো। তৃতীয় সাহাবী আবদার করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ছাগলটি রান্না করবো। রাসূল (সাঃ) বললেন, ঠিক আছে। আর আমি রান্নার জন্য জ্বালানী কাঠ কুড়িয়ে আনবো।

সকলে একযোগে বললো, ইয়া রাসূলুল্লাহ, ও কাজটি আমরাই করতে পারবো, আপনার কিছু করতে হবে না। রাসূল (সাঃ) বললেন, আমি জানি, ও কাজটি আমি না পারলেও তোমরা করতে পারবে। কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বসে থাকা পছন্দ করি না। আল্লাহও এটা পছন্দ করেন না যে, তার কোন বান্দা তার সাথীদের মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বসে থাকুক।

শিক্ষাঃ (ক) মহানবী (সাঃ) এর এই গুণটি পদমর্যাদা সম্পন্নসহ নির্বিশেষে সকল মুসলমানের আয়ত্ব করা উচিত। অফিস আদালতে বা ঘরোয়া জীবনে সর্বক্ষেত্রে প্রত্যেকের পরস্পরের সহযোগিতা করা উচিত।

[খ] জনৈক ইহুদীর কাছে রাসূল (সাঃ) এর কিছু ঋণ ছিল। লোকটি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধের জন্য তাড়া দিতে লাগলো। সে মদিনার এক রাস্তায় রাসূল (সাঃ) এর মুখোমুখী হয়ে বললো "তোমরা আব্দুল মুতালিবের বংশধরেরা সময়মত ঋণ পরিশোধ কর না।"

হযরত ওমর তার এই আচরণ দেখে রেগে গিয়ে বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি অনুমতি দিন, ওর গর্দান কেটে ফেলি।"

রাসূল (সাঃ) বললেন, "হে ওমর, আমার এই ইহুদীর জন্য অন্য রকম আচরণের প্রয়োজন ছিল। তুমি বরং ওকে উত্তম পন্থায় ঋণ ফেরত চাইতে বল, আর আমাকে উত্তম পন্থায় ঋণ পরিশোধ করতে বল.."

অতঃপর তিনি ইহুদীর দিকে ফিরে বললেন, তুমি কালকেই তোমার দেয়া ঋণ ফেরত পাবে।

এদিকে রাসূল (সাঃ) এর ব্যবহারে ইহুদীর মনে ভাবান্তর দেখা দিল। সে এগিয়ে এসে বললোঃ "আমি আসলে আপনার প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছিলাম। তাওরাতে শেষ নবীর এ রকম আলামতই লেখা আছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনিই আল্লাহর শেষ রাসূল।” এই বলে সে ইসলাম গ্রহণ করলো।

শিক্ষাঃ (ক) স্বচ্ছল ব্যক্তির কোন অস্বচ্ছল ব্যক্তিকে ঋণ দেয়া খুবই সওয়াবের কাজ। আর সময় মত ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে তাকে সময় বাড়িয়ে দেয়া আরো মহৎ কাজ। তবে সময় হওয়ার আগে ঋণ পরিশোধের জন্য তাড়া দেওয়া এবং কটুক্তি করায় ঋণ দেয়ার সওয়াব কমে যায়। (খ) কারো আচরণে সহসা উত্তেজিত হওয়া উচিত নয়। ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা কখনো কখনো অকল্পনীয় সুফল পাওয়া যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00