📄 মানবতার ভাষা
তার কর্কশ গলায় এত রূঢ়তা ছিল যে মুহূর্তে সে পবিত্র পরিবেশ পাল্টে গেল সম্পূর্ণ। আলোকিত মধ্যাহ্নে অকস্মাৎ নেমে এল রাতের অন্ধকার। সীমাহীন ক্রোধে অনবরত কাঁপছিল সে ইহুদী। আর কেবলই চিৎকার করছিল। তার মুখে ছিল অশ্রাব্য ভাষা। সে ভাষা কটু। সে ভাষা অশ্লীল। এমন অশালীন, যে শুনবে রক্ত গরম হয়ে উঠবে তার।
সাহাবীদের মধ্যে বসেছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। বসে বসে দ্বীনের কথা আলোচনা করছিলেন। আর সে যালিম এমন পবিত্র মানুষটি প্রতি এসব ইতর ভাষা প্রয়োগ করছিল। অবিরাম করেই যাচ্ছিল। গরম কড়াইতে ফুটন্ত পানি যেমন লাফায়, চিৎকারের সাথে সাথে তেমনি লাফাচ্ছিল সে। এমনি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে ইহুদী, এমনি ক্রুদ্ধ। অথচ এতটা বাড়াবাড়ি করার কোন সঙ্গত কারণ ছিল না।
এ লোকটির কাছে থেকে একটি বাচ্চা উট ধার নিয়েছিলেন রাসূল (স)। বিশেষ প্রয়োজন পড়েছিল তাই। হয়তো কাউকে দেবেন। কোন ইয়াতীমকে, কোন আতুরকে। আর সে ঋণের তাগাদায় এসে এত কাণ্ড করে বসল লোকটা। একেবারে মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ভীষণ রকম কঠোর হয়ে উঠল সে। তার ব্যবহার এমনই উত্তেজক ছিল যে এর ক্রমাগত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সমবেত সাহাবীগণও ধীরে ধীরে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন এক সময় এবং অবশেষে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন তাঁরাও। রাসূল (স)-এর প্রতি এমন আচরণকে তাঁরা কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তৎপর হলেন সকলেই। এমন কি কয়েকজন সাহাবী উদ্যত হলেন তাকে হত্যা করার জন্য। যে অপরাধ সে করেছে কতলই এর একমাত্র শাস্তি, এছাড়া দ্বিতীয় কোন প্রতিশোধ খুঁজে পেলেন না তাঁরা।
হত্যায় উদ্যত সাহাবীদের দিকে তাকালেন রাসূল (স)। ক্ষণিক। পরমুহূর্তেই তাঁর পবিত্র দুটি বাহু উপরে তুলে থামিয়ে দিলেন। তাঁদের হত্যামুখী হাতগুলো থেমে গেল। কিন্তু অসম্ভব উত্তেজনায় তাঁদের চোখ মুখ থর থর করছিল। সীমাহীন ক্রোধ জমেছিল সেখানে। তাঁরা সকলে একযোগে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকালেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাকিয়েছিলেন তাঁদের দিকে। এরপর যেন অসম্ভব ব্যথিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন : কি আশ্চর্য! তোমরাও ধৈর্যহারা? তোমরা কি জাননা পাওনাদারের কড়া কথা বলার হক আছে। সুতরাং লোকটিকে এমন কথা বলতে দাও।
সমবেত সকল সাহাবী যেন অকস্মাৎ চাবুকের আঘাতে শিহরিত হয়ে উঠলেন। চমকিত হল। এ কি কথা বললেন রাসূল (স)? সাহাবীগণ অপলকে তাকিয়ে রইলেন সে পবিত্র মুখের দিকে। এমন বিপরীত বিবেকের কথা শোনার জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না।
অবাক চাউনি মেলে তাকিয়ে আছে সে ইহুদীও। সে কঠোরভাষী পাওনাদার! রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংযত মহান ব্যবহার তার অন্তরের গভীরকে স্পর্শ করে গেল। সে নির্বাক। কোন কথা আর বলতে পারল না। মুহূর্তে তার মুখের কঠোর ভাষা যেন কোথায় হারিয়ে গেল। ফুরিয়ে গেল।
লোকটির ঋণ এখনই মিটিয়ে দাও তোমরা। যাও। বিনম্র কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন নবী (স)।
কয়েকজন সাহাবী এক সাথে চলে গেল চারণভূমির দিকে। যেখানে বায়তুলমালের উটগুলো চরে ঘাস খাচ্ছিল। বেশ কিছু পরে ফিরে এলেন তাঁরা। এসে নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! লোকটির উটের মত কোন ছোট উট পাওয়া যাচ্ছে না। আপনার উটগুলো অনেক বড়, অনেক ভাল অনেক দামী।
এতটুকু দ্বিধা করলেন না, লাভ-লোকসান ভাবলেন না, বললেন: যাও সে উট দিয়েই ঋণ পরিশোধ কর। এখনই। একটু থেমে ধীর স্থির গলায় বললেন, আল্লাহ্র কাছে সে ব্যক্তি উত্তম, যে উত্তম ব্যবহারের সাথে উত্তম জিনিস দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে।
প্রায় দ্বিগুণ মূল্যের উটের রশি হাতে নিয়ে সে কটুভাষী লোকটি মরমে মরে যাচ্ছিল। লজ্জায় দ্বিধায় সংকোচে শ্রদ্ধায় আর নবী (স)-এর দিকে ঠিক মত চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছিল না। তার পা উঠছিল না যেন। জীবনে এমন দোল জাগান কথা সে আর শোনেনি কোন দিন। হেজাজের রুক্ষ্ম মাটিতে এমনতর মধুর ব্যবহার কোনদিন তার সাথে আর করেনি কেউ। তার মনের দমবদ্ধ অমানিশার গুমোট আকাশে আজ উদার হওয়ার ঝাপটা লেগেছে। সে ঝাপটায় সরে যাচ্ছে পুঞ্জীভূত ঘনকাল মেঘের স্তর। আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে চেতনার দ্বাদশী। সে অলৌকিক আলোয় ভরে উঠছে মনের অলিগলি। ধীরে ধীরে অলোকিক হচ্ছে বোধ। ভালবাসায় ভরে উঠছে চেতনা। দীপ্তিময় হচ্ছে আত্মা।
উটের রশি ধরে যেতে যেতে প্রায় রুদ্ধস্বরে সে বলল, হে মুহাম্মদ (স)! অশ্রুতে ভিজে গেল। সে কঠোর কণ্ঠ। এখন ভোরের শিশিরের মত কোমল! শুকতারার মত নিষ্পাপ। জ্যোৎস্নার মত জ্যোতির্ময়।
তার কর্কশ গলায় এত রূঢ়তা ছিল যে মুহূর্তে সে পবিত্র পরিবেশ পাল্টে গেল সম্পূর্ণ। আলোকিত মধ্যাহ্নে অকস্মাৎ নেমে এল রাতের অন্ধকার। সীমাহীন ক্রোধে অনবরত কাঁপছিল সে ইহুদী। আর কেবলই চিৎকার করছিল। তার মুখে ছিল অশ্রাব্য ভাষা। সে ভাষা কটু। সে ভাষা অশ্লীল। এমন অশালীন, যে শুনবে রক্ত গরম হয়ে উঠবে তার।
সাহাবীদের মধ্যে বসেছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। বসে বসে দ্বীনের কথা আলোচনা করছিলেন। আর সে যালিম এমন পবিত্র মানুষটি প্রতি এসব ইতর ভাষা প্রয়োগ করছিল। অবিরাম করেই যাচ্ছিল। গরম কড়াইতে ফুটন্ত পানি যেমন লাফায়, চিৎকারের সাথে সাথে তেমনি লাফাচ্ছিল সে। এমনি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে ইহুদী, এমনি ক্রুদ্ধ। অথচ এতটা বাড়াবাড়ি করার কোন সঙ্গত কারণ ছিল না।
এ লোকটির কাছে থেকে একটি বাচ্চা উট ধার নিয়েছিলেন রাসূল (স)। বিশেষ প্রয়োজন পড়েছিল তাই। হয়তো কাউকে দেবেন। কোন ইয়াতীমকে, কোন আতুরকে। আর সে ঋণের তাগাদায় এসে এত কাণ্ড করে বসল লোকটা। একেবারে মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ভীষণ রকম কঠোর হয়ে উঠল সে। তার ব্যবহার এমনই উত্তেজক ছিল যে এর ক্রমাগত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সমবেত সাহাবীগণও ধীরে ধীরে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন এক সময় এবং অবশেষে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন তাঁরাও। রাসূল (স)-এর প্রতি এমন আচরণকে তাঁরা কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তৎপর হলেন সকলেই। এমন কি কয়েকজন সাহাবী উদ্যত হলেন তাকে হত্যা করার জন্য। যে অপরাধ সে করেছে কতলই এর একমাত্র শাস্তি, এছাড়া দ্বিতীয় কোন প্রতিশোধ খুঁজে পেলেন না তাঁরা।
হত্যায় উদ্যত সাহাবীদের দিকে তাকালেন রাসূল (স)। ক্ষণিক। পরমুহূর্তেই তাঁর পবিত্র দুটি বাহু উপরে তুলে থামিয়ে দিলেন। তাঁদের হত্যামুখী হাতগুলো থেমে গেল। কিন্তু অসম্ভব উত্তেজনায় তাঁদের চোখ মুখ থর থর করছিল। সীমাহীন ক্রোধ জমেছিল সেখানে। তাঁরা সকলে একযোগে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকালেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাকিয়েছিলেন তাঁদের দিকে। এরপর যেন অসম্ভব ব্যথিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন : কি আশ্চর্য! তোমরাও ধৈর্যহারা? তোমরা কি জাননা পাওনাদারের কড়া কথা বলার হক আছে। সুতরাং লোকটিকে এমন কথা বলতে দাও।
সমবেত সকল সাহাবী যেন অকস্মাৎ চাবুকের আঘাতে শিহরিত হয়ে উঠলেন। চমকিত হল। এ কি কথা বললেন রাসূল (স)? সাহাবীগণ অপলকে তাকিয়ে রইলেন সে পবিত্র মুখের দিকে। এমন বিপরীত বিবেকের কথা শোনার জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না।
অবাক চাউনি মেলে তাকিয়ে আছে সে ইহুদীও। সে কঠোরভাষী পাওনাদার! রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংযত মহান ব্যবহার তার অন্তরের গভীরকে স্পর্শ করে গেল। সে নির্বাক। কোন কথা আর বলতে পারল না। মুহূর্তে তার মুখের কঠোর ভাষা যেন কোথায় হারিয়ে গেল। ফুরিয়ে গেল।
লোকটির ঋণ এখনই মিটিয়ে দাও তোমরা। যাও। বিনম্র কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন নবী (স)।
কয়েকজন সাহাবী এক সাথে চলে গেল চারণভূমির দিকে। যেখানে বায়তুলমালের উটগুলো চরে ঘাস খাচ্ছিল। বেশ কিছু পরে ফিরে এলেন তাঁরা। এসে নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! লোকটির উটের মত কোন ছোট উট পাওয়া যাচ্ছে না। আপনার উটগুলো অনেক বড়, অনেক ভাল অনেক দামী।
এতটুকু দ্বিধা করলেন না, লাভ-লোকসান ভাবলেন না, বললেন: যাও সে উট দিয়েই ঋণ পরিশোধ কর। এখনই। একটু থেমে ধীর স্থির গলায় বললেন, আল্লাহ্র কাছে সে ব্যক্তি উত্তম, যে উত্তম ব্যবহারের সাথে উত্তম জিনিস দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে।
প্রায় দ্বিগুণ মূল্যের উটের রশি হাতে নিয়ে সে কটুভাষী লোকটি মরমে মরে যাচ্ছিল। লজ্জায় দ্বিধায় সংকোচে শ্রদ্ধায় আর নবী (স)-এর দিকে ঠিক মত চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছিল না। তার পা উঠছিল না যেন। জীবনে এমন দোল জাগান কথা সে আর শোনেনি কোন দিন। হেজাজের রুক্ষ্ম মাটিতে এমনতর মধুর ব্যবহার কোনদিন তার সাথে আর করেনি কেউ। তার মনের দমবদ্ধ অমানিশার গুমোট আকাশে আজ উদার হওয়ার ঝাপটা লেগেছে। সে ঝাপটায় সরে যাচ্ছে পুঞ্জীভূত ঘনকাল মেঘের স্তর। আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে চেতনার দ্বাদশী। সে অলৌকিক আলোয় ভরে উঠছে মনের অলিগলি। ধীরে ধীরে অলোকিক হচ্ছে বোধ। ভালবাসায় ভরে উঠছে চেতনা। দীপ্তিময় হচ্ছে আত্মা।
উটের রশি ধরে যেতে যেতে প্রায় রুদ্ধস্বরে সে বলল, হে মুহাম্মদ (স)! অশ্রুতে ভিজে গেল। সে কঠোর কণ্ঠ। এখন ভোরের শিশিরের মত কোমল! শুকতারার মত নিষ্পাপ। জ্যোৎস্নার মত জ্যোতির্ময়।
📄 আল্লাহ্ যার সহায় হন
ফেলে আসা ঘটনাগুলো মুছে যায় নি মন থেকে। বিলীন হয়নি। চোখ বন্ধ করলই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছবির মত ভাসতে থাকে। পরপর। নিষ্ঠুর উমাইয়ার হাতে বেত, বাতাসে সে বেতের শব্দ যেন আজো শোনা যায়। আর বুকে পাঁজর-ভাঙা প্রকাণ্ড পাথর! গলায় রশি বেঁধে মক্কার ইতর ছেলেদের পশুর মত টানাটানি আর চারদিক থেকে পাথর বৃষ্টি! জঙ্গল থেকে তুলে আনা কাঁটায় সারা দেহ ক্ষতবিক্ষত! অত্যাচারে যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া!
ঝড় বাড়ে। অত্যাচারের ঝড়। ঝড় যত বাড়ে আল্লাহ্ নামের চাদরখানা ততই শক্ত করে গায় জড়িয়ে নেয় হযরত বেলাল (রা)। ইসলামে আরো সুদৃঢ় হন তিনি। থাকেন ধর্মে অটল।
এসব ঘটনা স্মরণ করে শিউরে ওঠেন হযরত বেলাল (রা)। কাল কদাকার কাফ্রি। কিন্তু হৃদয়টা জ্যোতির্ময়। সে আলোর প্রাণ মসজিদ নববীর প্রাঙ্গনে বসে অতীতটা দেখছিলেন। জরিপ করেছিলেন। বীভৎস সে দিনগুলো আর নেই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভালবাসা পেয়েছেন আর জয় করেছেন সকল মুসলমানের স্নেহ। মধুর মহব্বত। আজ তিনি মুসলিম জাহানের সম্মানিত মুয়াজ্জিন।
সব কথা মনে হল পলকে। শুকরিয়ায় মাথা নত হয়ে এল তাঁর। আজ তিনি আনন্দিত। আজ তিনি তৃপ্ত।
আরো একটি সম্মান দিয়েছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)। তিনি তাঁকে বড় ভালবাসেন। বড় বিশ্বাস করেন। তাই পারিবারিক কাজকর্মের দায়দায়িত্ব নিযুক্ত করেছেন তাঁকে। দিনার দিরহাম, খাদ্য-শস্য, ধনসম্পদ যা আসে জমা হয় তাঁর কাছেই। তিনিই সঞ্চয় করেন। জমিয়ে রাখেন। খরচও করেন। আবার অভাব-অনটনের সময় ঋণ করেন তিনিই। নিজ দায়িত্বে। মিটিয়েও দেন সময় মত। এসব দায়িত্ব তাঁর।
তিনিই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মানিত খাজানি।
একদিন বাজারে যাচ্ছিলেন হযরত বেলাল (রা)। দেখা হল এক ইহুদীর সাথে। বাজারে দোকান আছে তার। নিজে থেকেই বলল, দেখুন-আপনি ধারেই মালপত্র কেন। তা আমার দোকান থেকেও নিতে পারেন।
ধারে মাল দেয়া সুবিধা আছে কিছু। দাম বেশী পাওয়া যায়। তা ছাড়া সে ইহুদী ভালভাবেই জানে, এখানে টাকা মার যাবার কোন ভয় নেই। নির্ভয়ে মাল দেয়া যায়। সে মাল দিচ্ছে হযরত মুহাম্মদকে। বেলাল মারফত। ইহুদীদের মনে আর একটি গোপন বাসনাও কাজ করত। সময় সুযোগ পেলেই তারা অপদস্থ করত মুসলমানদের। করতে পারলে খুশি হত। দারুন খুশি। এ অপমান যদি কোন করমে করতে পারত হযরত মুহাম্মদ (স)-কে তা হলে সেদিন উৎসব পড়ে যেত তাদের। নিদেন পক্ষে হযরত বেলালের মত লোককেও অপদস্থ করতে পারাটা কম নয়। তাই সুযোগের সন্ধানে থাকত তারা সব সময়ই। সুযোগ পেলেই সদ্ব্যবহার করত। পূর্ণ সদ্ব্যবহার।
কথামত ইহুদীর দোকান থেকে কিছু মাল ধারে আনলেন হযরত বেলাল (রা)। বেশ কিছু দিনের মেয়াদে।
সেদিন মসজিদ নববীর চত্বরে বসে অতীতের কথা ভাবছিলেন তিনি। ভাবতে ভাবতে আযানের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। নামাযের সময় হয়ে এল বলে। উঠতে যাবে, এমন সময় এল সে ব্যবসায়ী। একা নয়-সাথে বাজারের আরো কয়েকজন দোকানদার। প্রয়োজন হলে তাদের সাহায্য নেবে। তারাও তার হয়ে কথা বলবে।
সে এসেই কর্কশকণ্ঠে ডাক দিল, হে হাবশী গোলাম!
হযরত বেলাল (রা) শুনলেন কথাগুলো। এ ধৃষ্ঠতায় বিরক্ত হলেন না। উত্তেজিতও না। শান্ত কণ্ঠে বললেন, লাব্বায়েক। আমি হাজির। এরপর বেরিয়ে এলেন। এসে দাঁড়ালেন। তাদের সামনে।
অত্যন্ত কঠোর কণ্ঠে দোকানী বলতে শুরু করল, এখনো যে ঋণ শোধ দেয়ার নাম নিশানা নেই। ব্যাপারটা কি? আর মাত্র চার দিন। এ চারদিনের মধ্যে যদি শোধ না পাই তা হলে তোকে রাখাল বানাব। মদীনার মাঠে বকরী চরিয়ে ছাড়ব।
আরো কিছু বিষোদগার করল দোকানদার। মওকা যখন মিলেছে। এরপর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে চলে গেল গজগজ করতে করতে।
ইশার নামায শেষ হলে হযরত বেলাল (রা) গেলেন নবীজীর দরবারে। গিয়ে বললেন সব কথা। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনলেন রাসূলুল্লাহ (স)। কিন্তু একটি কথাও বললেন না। বেলালের প্রতি সহানুভূতি জানালেন না। অভয়ও দিলেন না তাঁকে। সমর্থনেরও কোন চেষ্টা করলেন না। নীরব হয়ে গেলেন একেবারেই।
এটা সপ্তম হিজরীর ঘটনা। মক্কা-বিজয়ের ঠিক আগে ঘটে ছিল ব্যাপারটি। ইসলাম তখন বহুব্যাপ্ত। মুসলমানের সংখ্যা হাজার হাজার। রাসূলুল্লাহ (স) তখন মদীনার হর্তাকর্তা। তাঁর সামান্য ইংগিতই যথেষ্ট। মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে দোকানীর শির। কিন্তু অসীম ধৈর্যে নবীজী নীরব। নিশ্চল। সবরের জীবন্ত নীরবতায় নিজেকে সমর্পণ করলেন আল্লাহ্র কাছে। পরমপ্রভুর কাছে। মানসম্মানের মালিকের কাছে। জীবিকাদাতার কাছে। পরিপূর্ণ রূপে।
হযরত মুহাম্মদ (স)-কে নীরব থাকতে দেখে কিছুটা বিচলিত হলেন হযরত বেলাল (রা)। নিজে একটা কিছু উপায় ভেবেছেন এতক্ষণ। ভেবে একটা পথ বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অনুমতির প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতি। সম্মতি নেয়ার জন্যই বললেন, এ চার দিনের মধ্যে ঋণ শোধ দেয়ার কোন পথ দেখি না। যদি অনুমতি দেন। আমি না হয় কিছুদিন আত্মগোপন করি কোথাও। সেখান থেকেই চেষ্টা করি ঋণ শোধ করার।
এবারেও রাসূলুল্লাহ (স) শুনলেন কেবল। কিছু বললেন না। একটি কথাও না। কম কথার মানুষ রাসূলুল্লাহ (স)। যেমন নীরব ছিলেন তেমনি নীরব রইলেন।
রাতে আর ঠিক মত শুতেই পারলেন না হযরত বেলাল (রা)। যা কিছু অতি সামান্য সম্বল ছিল, একটা পুঁটলিতে বাঁধলেন। বেঁধে বসে রইলেন প্রভাতের অপেক্ষায়। নামায শেষ করেই বেরিয়ে পড়বেন। অজানার পথে। ভাগ্যের অন্বেষণে। এরপর আল্লাহ্ ভরসা।
ফযরের নামায শেষ হয়েছে এ মাত্র। আপনার সম্বলটি হাতে করে পথে নামতে যাব এমন সময় এক লোক এল বেলালের কাছে। এসে বলল, রাসূলুল্লাহ (স) আপনাকে ডাকছেন।
তাড়াতাড়ি করে ছুটে গেলেন হযরত বেলাল (রা)। রাসূলুল্লাহ (স) বসে ছিলেন। বললেন, মোবারক হোক। চিন্তা করনা বেলাল। ঋণ শোধের একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আল্লাহ্। ঐ দেখ-
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনের দিকে তাকালেন হযরত বেলাল (রা)। চারটি উট সামনে দাঁড়িয়ে। শস্য বোঝাই। নবীজী (স) বললেন, ফাদাক-এর সর্দার পাঠিয়েছেন এ চারটি উট। শস্য বোঝাই করে। এগুলো এখনি নিয়ে যাও বাজারে। বিক্রি করে ঋণ শোধ কর।
মাথার উপর থেকে যেন পাহাড় নেমে গেল হযরত বেলাল। ভীষণ খুশি হলেন তিনি। আল্লাহ্র রহমতের কথা চিন্তা করে চোখ ভিজে আসছিল তাঁর। বার বার। উটগুলোকে তাড়িয়ে বাজারের পথে চলে গেলেন তিনি। আর রাসূলুল্লাহ (স) উঠে দাঁড়ালেন। যাবেন মসজিদে। সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন এখনি। শুকরিয়া জানাবেন আল্লাহ্। সুখে দুখে তিনিই সব। তাঁর ইংগিত ছাড়া কিছুই হয় না। হতে পারে না। পর্বতের মত অটল বিশ্বাস। বিশ্বাসই ঈমান।
অটল বিশ্বাসে বলীয়ান রাসূলুল্লাহ (স) স্থির পদক্ষেপে মসজিদের পথে এগিয়ে গেলেন।
ফেলে আসা ঘটনাগুলো মুছে যায় নি মন থেকে। বিলীন হয়নি। চোখ বন্ধ করলই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছবির মত ভাসতে থাকে। পরপর। নিষ্ঠুর উমাইয়ার হাতে বেত, বাতাসে সে বেতের শব্দ যেন আজো শোনা যায়। আর বুকে পাঁজর-ভাঙা প্রকাণ্ড পাথর! গলায় রশি বেঁধে মক্কার ইতর ছেলেদের পশুর মত টানাটানি আর চারদিক থেকে পাথর বৃষ্টি! জঙ্গল থেকে তুলে আনা কাঁটায় সারা দেহ ক্ষতবিক্ষত! অত্যাচারে যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া!
ঝড় বাড়ে। অত্যাচারের ঝড়। ঝড় যত বাড়ে আল্লাহ্ নামের চাদরখানা ততই শক্ত করে গায় জড়িয়ে নেয় হযরত বেলাল (রা)। ইসলামে আরো সুদৃঢ় হন তিনি। থাকেন ধর্মে অটল।
এসব ঘটনা স্মরণ করে শিউরে ওঠেন হযরত বেলাল (রা)। কাল কদাকার কাফ্রি। কিন্তু হৃদয়টা জ্যোতির্ময়। সে আলোর প্রাণ মসজিদ নববীর প্রাঙ্গনে বসে অতীতটা দেখছিলেন। জরিপ করেছিলেন। বীভৎস সে দিনগুলো আর নেই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভালবাসা পেয়েছেন আর জয় করেছেন সকল মুসলমানের স্নেহ। মধুর মহব্বত। আজ তিনি মুসলিম জাহানের সম্মানিত মুয়াজ্জিন।
সব কথা মনে হল পলকে। শুকরিয়ায় মাথা নত হয়ে এল তাঁর। আজ তিনি আনন্দিত। আজ তিনি তৃপ্ত।
আরো একটি সম্মান দিয়েছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)। তিনি তাঁকে বড় ভালবাসেন। বড় বিশ্বাস করেন। তাই পারিবারিক কাজকর্মের দায়দায়িত্ব নিযুক্ত করেছেন তাঁকে। দিনার দিরহাম, খাদ্য-শস্য, ধনসম্পদ যা আসে জমা হয় তাঁর কাছেই। তিনিই সঞ্চয় করেন। জমিয়ে রাখেন। খরচও করেন। আবার অভাব-অনটনের সময় ঋণ করেন তিনিই। নিজ দায়িত্বে। মিটিয়েও দেন সময় মত। এসব দায়িত্ব তাঁর।
তিনিই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মানিত খাজানি।
একদিন বাজারে যাচ্ছিলেন হযরত বেলাল (রা)। দেখা হল এক ইহুদীর সাথে। বাজারে দোকান আছে তার। নিজে থেকেই বলল, দেখুন-আপনি ধারেই মালপত্র কেন। তা আমার দোকান থেকেও নিতে পারেন।
ধারে মাল দেয়া সুবিধা আছে কিছু। দাম বেশী পাওয়া যায়। তা ছাড়া সে ইহুদী ভালভাবেই জানে, এখানে টাকা মার যাবার কোন ভয় নেই। নির্ভয়ে মাল দেয়া যায়। সে মাল দিচ্ছে হযরত মুহাম্মদকে। বেলাল মারফত। ইহুদীদের মনে আর একটি গোপন বাসনাও কাজ করত। সময় সুযোগ পেলেই তারা অপদস্থ করত মুসলমানদের। করতে পারলে খুশি হত। দারুন খুশি। এ অপমান যদি কোন করমে করতে পারত হযরত মুহাম্মদ (স)-কে তা হলে সেদিন উৎসব পড়ে যেত তাদের। নিদেন পক্ষে হযরত বেলালের মত লোককেও অপদস্থ করতে পারাটা কম নয়। তাই সুযোগের সন্ধানে থাকত তারা সব সময়ই। সুযোগ পেলেই সদ্ব্যবহার করত। পূর্ণ সদ্ব্যবহার।
কথামত ইহুদীর দোকান থেকে কিছু মাল ধারে আনলেন হযরত বেলাল (রা)। বেশ কিছু দিনের মেয়াদে।
সেদিন মসজিদ নববীর চত্বরে বসে অতীতের কথা ভাবছিলেন তিনি। ভাবতে ভাবতে আযানের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। নামাযের সময় হয়ে এল বলে। উঠতে যাবে, এমন সময় এল সে ব্যবসায়ী। একা নয়-সাথে বাজারের আরো কয়েকজন দোকানদার। প্রয়োজন হলে তাদের সাহায্য নেবে। তারাও তার হয়ে কথা বলবে।
সে এসেই কর্কশকণ্ঠে ডাক দিল, হে হাবশী গোলাম!
হযরত বেলাল (রা) শুনলেন কথাগুলো। এ ধৃষ্ঠতায় বিরক্ত হলেন না। উত্তেজিতও না। শান্ত কণ্ঠে বললেন, লাব্বায়েক। আমি হাজির। এরপর বেরিয়ে এলেন। এসে দাঁড়ালেন। তাদের সামনে।
অত্যন্ত কঠোর কণ্ঠে দোকানী বলতে শুরু করল, এখনো যে ঋণ শোধ দেয়ার নাম নিশানা নেই। ব্যাপারটা কি? আর মাত্র চার দিন। এ চারদিনের মধ্যে যদি শোধ না পাই তা হলে তোকে রাখাল বানাব। মদীনার মাঠে বকরী চরিয়ে ছাড়ব।
আরো কিছু বিষোদগার করল দোকানদার। মওকা যখন মিলেছে। এরপর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে চলে গেল গজগজ করতে করতে।
ইশার নামায শেষ হলে হযরত বেলাল (রা) গেলেন নবীজীর দরবারে। গিয়ে বললেন সব কথা। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনলেন রাসূলুল্লাহ (স)। কিন্তু একটি কথাও বললেন না। বেলালের প্রতি সহানুভূতি জানালেন না। অভয়ও দিলেন না তাঁকে। সমর্থনেরও কোন চেষ্টা করলেন না। নীরব হয়ে গেলেন একেবারেই।
এটা সপ্তম হিজরীর ঘটনা। মক্কা-বিজয়ের ঠিক আগে ঘটে ছিল ব্যাপারটি। ইসলাম তখন বহুব্যাপ্ত। মুসলমানের সংখ্যা হাজার হাজার। রাসূলুল্লাহ (স) তখন মদীনার হর্তাকর্তা। তাঁর সামান্য ইংগিতই যথেষ্ট। মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে দোকানীর শির। কিন্তু অসীম ধৈর্যে নবীজী নীরব। নিশ্চল। সবরের জীবন্ত নীরবতায় নিজেকে সমর্পণ করলেন আল্লাহ্র কাছে। পরমপ্রভুর কাছে। মানসম্মানের মালিকের কাছে। জীবিকাদাতার কাছে। পরিপূর্ণ রূপে।
হযরত মুহাম্মদ (স)-কে নীরব থাকতে দেখে কিছুটা বিচলিত হলেন হযরত বেলাল (রা)। নিজে একটা কিছু উপায় ভেবেছেন এতক্ষণ। ভেবে একটা পথ বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অনুমতির প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতি। সম্মতি নেয়ার জন্যই বললেন, এ চার দিনের মধ্যে ঋণ শোধ দেয়ার কোন পথ দেখি না। যদি অনুমতি দেন। আমি না হয় কিছুদিন আত্মগোপন করি কোথাও। সেখান থেকেই চেষ্টা করি ঋণ শোধ করার।
এবারেও রাসূলুল্লাহ (স) শুনলেন কেবল। কিছু বললেন না। একটি কথাও না। কম কথার মানুষ রাসূলুল্লাহ (স)। যেমন নীরব ছিলেন তেমনি নীরব রইলেন।
রাতে আর ঠিক মত শুতেই পারলেন না হযরত বেলাল (রা)। যা কিছু অতি সামান্য সম্বল ছিল, একটা পুঁটলিতে বাঁধলেন। বেঁধে বসে রইলেন প্রভাতের অপেক্ষায়। নামায শেষ করেই বেরিয়ে পড়বেন। অজানার পথে। ভাগ্যের অন্বেষণে। এরপর আল্লাহ্ ভরসা।
ফযরের নামায শেষ হয়েছে এ মাত্র। আপনার সম্বলটি হাতে করে পথে নামতে যাব এমন সময় এক লোক এল বেলালের কাছে। এসে বলল, রাসূলুল্লাহ (স) আপনাকে ডাকছেন।
তাড়াতাড়ি করে ছুটে গেলেন হযরত বেলাল (রা)। রাসূলুল্লাহ (স) বসে ছিলেন। বললেন, মোবারক হোক। চিন্তা করনা বেলাল। ঋণ শোধের একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আল্লাহ্। ঐ দেখ-
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনের দিকে তাকালেন হযরত বেলাল (রা)। চারটি উট সামনে দাঁড়িয়ে। শস্য বোঝাই। নবীজী (স) বললেন, ফাদাক-এর সর্দার পাঠিয়েছেন এ চারটি উট। শস্য বোঝাই করে। এগুলো এখনি নিয়ে যাও বাজারে। বিক্রি করে ঋণ শোধ কর।
মাথার উপর থেকে যেন পাহাড় নেমে গেল হযরত বেলাল। ভীষণ খুশি হলেন তিনি। আল্লাহ্র রহমতের কথা চিন্তা করে চোখ ভিজে আসছিল তাঁর। বার বার। উটগুলোকে তাড়িয়ে বাজারের পথে চলে গেলেন তিনি। আর রাসূলুল্লাহ (স) উঠে দাঁড়ালেন। যাবেন মসজিদে। সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন এখনি। শুকরিয়া জানাবেন আল্লাহ্। সুখে দুখে তিনিই সব। তাঁর ইংগিত ছাড়া কিছুই হয় না। হতে পারে না। পর্বতের মত অটল বিশ্বাস। বিশ্বাসই ঈমান।
অটল বিশ্বাসে বলীয়ান রাসূলুল্লাহ (স) স্থির পদক্ষেপে মসজিদের পথে এগিয়ে গেলেন।