📘 হাদিসের গল্প > 📄 মানবতার অঙ্কুর

📄 মানবতার অঙ্কুর


মদীনার ধুলমাটিতে তখনো দলবদ্ধ নির্জন আঁধারেরা নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। আকাশে তারাগুলো তেমনি উজ্জল। খুর্মার শাখা দুলিয়ে রাত্রির একলা হাওয়া তেমনি বয়ে যায় ঝির ঝির করে। কেবল দু একটা পাখির ওড়া-উড়িতে অনুমান করা যায় রাত শেষ হয়ে আসছে। আর কিছু পরে, আঁধারের বুকে দোল জাগিয়ে, ছড়িয়ে পড়বে বেলালের আযানের স্বর। অন্ধকার বিদীর্ণ করে মধুর প্রবাহ ছুটবে চারদিকে। তখন সারা মদীনার চকিত পরশে জেগে উঠবে। এর কিছু পরেই জামাত শুরু হয়ে যাবে মসজিদ নববীতে, সামনে ইমাম-রাসূলুল্লাহ (স)।
বেলালের কণ্ঠস্বরে জেগে উঠছিলেন সকলেই।
ইয়া সাবাহাহ্! ইয়া সাবাহাহ্!! ইয়া সাবাহাহ্!!! হায় সকাল বেলার বিপদ! হায় সকাল বেলার বিপদ!! হায় সকাল বেলার বিপদ!!!
এত আযান নয়। দূর থেকে, মদীনার প্রান্তরের ওপার থেকে করুন হয়ে ভেসে আসছে এ স্বর। এ বিপদজ্ঞাপক ধ্বনি! একমাত্র আক্রমণোদ্যত কোন শত্রুদলকে দেখলে এ শব্দে সকলকে সর্তক করা হয়। আর এ শব্দেই শত্রুর বিরুদ্ধে সমবেত অস্ত্রধারণের আহ্বান জানানো হয়।
তা হলে আবার কি কোন.......
দুশ্চিন্তার আর দুর্ভাবনা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চারপাশে সমবেত হলেন সকলেই। কুরাইশরা তখন দুর্বার। ডাল নাড়া দিয়ে পাকা ফল বৃত্তচ্যুত করার মত মুসলমানদের সমূলে উৎখাত করতে চায় এরা। মদীনার উপকণ্ঠের মুশরিক ও ইহুদীরা দুরভিসন্ধিতে উন্মত্ত। সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে। সে ভয়স্কর পরিস্থিতিতে অন্ধকারের বুকে দোল খেয়ে খেয়ে ভেসে এল এ মারাত্মক পূর্বাভাস। সকলেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর চারপাশে গভীর উৎকণ্ঠায় নিশ্চুপ। অসম্ভব উদ্বেগে সে মুবারক মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সকলেই। নামায শেষ করে রাসূল (স) বললেন, সজ্জিত হও চল জলদি। দেখ কে আহ্বান করছে এমন করে।
আঁধার মাথায় নিয়েই পথে নেমেছিলেন সালামা (রা)। সালামা ইবনে আকওয়া (রা)। ফযরের আযানের বেশ দেরি ছিল তখন। বিশেষ পযোজনেই মদীনার উপকণ্ঠের এদিকে এসেছিলেন তিনি। বিখ্যাত তীরন্দাজ এ সাহাবী আঁধার ঠেলে ঠেলে আনমনেই পথ হাঁটছিলেন। হাঁফাতে হাঁফাতে প্রান্তরের ওপার থেকে ছুটে এলেন এক ক্রীতদাস। আবদুর রহমান ইবনে আওফের বিশ্বস্ত সে ক্রীতদাস ক্রন্দাকুল কণ্ঠে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে!
সর্বনাশ! অবাক গলায় শুধালেন সালামা।
হ্যাঁ সর্বনাশ! রাসূল (স)-এর দুধেল উটগুলো চরাচ্ছিলাম আমি, হঠাৎ একদল লুটেরা রাতের আঁধারে এসে লুট করে নিয়ে গেল সেগুলো।
ব্যাকুল কণ্ঠে সালামা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, কতক্ষণ? ক্রীতদাস বলল এ মাত্র। কাউকে চিনতে পেরেছ তাদের? হাঁ, তারা সকলেই গাতফান গোত্রের লোক।
আর মুহূর্তকাল সময় নষ্ট করলেন না সালামা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর উষ্ট্রী লুঠ! তাঁর দেহে তখন আগুন জলছে। সারা শরীরে জেগে উঠেছে প্রাচীন বেদুইন রক্ত। নিকটবর্তী টিলার শীর্ষে উঠে যতটা সম্ভব উচ্চস্বরে মদীনার আকাশ বাতাসে ছড়িয়ে দিলেন বিপদ জ্ঞাপক সংকেত ধ্বনি। এরপর একাই ঝাঁপিয়ে পড়লেন অজানা ভয়ঙ্কর সে বিপদের মধ্যে। যু-কারাদায় এসে সন্ধান পেলেন শত্রদলের। উটগুলোকে পানি পান করাচ্ছিল এরা। এরপর শুরু হল সে স্মরণীয় একক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। দলবদ্ধ সশস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে অকুতোভয় এক জিন্দাদিল মুজাহিদের জিহাদ। মুহূর্তেরও কম সময়, বজ্রঘাতের মত অকস্মাৎ সুতীক্ষ্ণ তীরের ফলাগুলো সমূহ দুশমনের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো ফালাফালা করে দিল। বিখ্যাত তীরন্দাজের এ বজ্রশেলগুলো থেকে কোন রকমেই আত্মরক্ষা করল পারল না এরা। তীর নিক্ষেপের সাথে সাথে চীৎকার করে উঠছিলেন সালামা (স) : "আমি আকওয়ার সুযোগ্য পুত্র আর আজকের দিনটি হল নিকৃষ্ট লোকদের নিশ্চিত ধ্বংসের দিন।"
অবিরাম তীর বর্ষণ করেই চললেন সালামা (রা)।
নিরুপায় গাতফানীরা পরাজিত কুকুরের মত কোনক্রমে পালিয়ে বাঁচল। পিছনে ফেলে গেল তাদের লালসা-কলুষিত দ্রব্যসামগ্রী, লুণ্ঠিত উটগুলো আর পরিধানের ত্রিশটি চাদর।
ক্লান্ত সালামা (রা) বিশ্রাম নিচ্ছেন। সেখানে এসে দাঁড়ালেন লোকজন সহ রাসূলুল্লাহ (স)। সালাম দিয়ে আনুপূর্বিক ঘটনা বিবৃতির পর সালামা (রা) আরয করলেন: পিপাসার্ত ছিল শয়তানগুলো পানি খাবারও সুযোগ দিই নি এদের। একটু থেমে বললেন, এরাই বার বার আমাদের চারণভূমিতে এসে আতংক ছড়াচ্ছে, লুটপাট করছে। মনে হয় এখনো বেশি দূর যেতে পারে নি, কেননা কম বেশি সকলেই আহত। সবাই মিলে পিছু ধাওয়া করে এখুনি এদের ধরে আনি, এরপর হাতকাটা বা কতল যে শাস্তি আপনি দেবেন।
ঠিক কথা। মাথা নাড়লেন অন্যান্য সাহাবীরাও। ঋণের শেষ, আগুনের শেষ আর শত্রুর শেষ রাখতে নেই। ধরে এনে কতল করে উচিত শিক্ষা দেয়াই উচিত। আতংক ছড়াবার জন্য আর যে সব হাত চোরাগোপ্তা উদ্যত হয়ে আছে; আপনা আপনি ভঙে গুঁড়িয়ে যাবে সেগুলো। আবার মস্তক আন্দোলিত করলেন সাহাবীগণ, আন্দোলিত করে নীরবে জোরাল সমর্থন জানালেন সালামার।
কিন্তু এরপরই সকলে নীরবে একযোগে তাকালেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। হাতকাটা বা কতল এটা তাঁরই নির্দেশ। তাঁরই ফরমান। এখন কি করবেন তিনি? ধরে এনে হাত কাটবেন না কতল? অথবা আরো কঠোর আরো নির্মম কিছু? অসম্ভব ব্যগ্রতায় সকলেই তাঁর নির্দেশ শোনার জন্য উৎকর্ণ।
হঠাৎ এক সময় সালমা (রা)-এর দিকে মুখ তুললেন রাসূলুল্লাহ (স)। অত্যন্ত প্রসন্ন সে মুখ। স্বচ্ছ সে দৃষ্টি পবিত্র আর পবিত্র। তাঁর মাসুম দৃষ্টিপাতে এক অপার্থিব ব্যঞ্জনা! কণ্ঠে যেন আর এক অন্য লোকের অস্তিত্ব। প্রিয় সাহাবীর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, সালামা! তুমি বিজয়ী। আল্লাহ্ তোমাকে বিজয়দান করেছেন। উটগুলোও ফিরে পেয়েছ। গনিমত হিসেবে পেয়েছ ত্রিশটি চাদর। সুতরাং-
একটু থামলেন রাসূলুল্লাহ (স)। চারপাশে জান্নাতী সৌরভ ঢেলে বললেন এরপর, সুতরাং এখন তাদের প্রতি বিনম্র হও।
অশ্রুত এ স্বর। হিজাজের মাটিতে নতুন। ঊষর মরুতে এমনতর বীজ ছড়ায় নি কেউ। এমতর বীজ এখানে অঙ্কুরিত হয়নি কোন দিন।

মদীনার ধুলমাটিতে তখনো দলবদ্ধ নির্জন আঁধারেরা নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। আকাশে তারাগুলো তেমনি উজ্জল। খুর্মার শাখা দুলিয়ে রাত্রির একলা হাওয়া তেমনি বয়ে যায় ঝির ঝির করে। কেবল দু একটা পাখির ওড়া-উড়িতে অনুমান করা যায় রাত শেষ হয়ে আসছে। আর কিছু পরে, আঁধারের বুকে দোল জাগিয়ে, ছড়িয়ে পড়বে বেলালের আযানের স্বর। অন্ধকার বিদীর্ণ করে মধুর প্রবাহ ছুটবে চারদিকে। তখন সারা মদীনার চকিত পরশে জেগে উঠবে। এর কিছু পরেই জামাত শুরু হয়ে যাবে মসজিদ নববীতে, সামনে ইমাম-রাসূলুল্লাহ (স)।
বেলালের কণ্ঠস্বরে জেগে উঠছিলেন সকলেই।
ইয়া সাবাহাহ্! ইয়া সাবাহাহ্!! ইয়া সাবাহাহ্!!! হায় সকাল বেলার বিপদ! হায় সকাল বেলার বিপদ!! হায় সকাল বেলার বিপদ!!!
এত আযান নয়। দূর থেকে, মদীনার প্রান্তরের ওপার থেকে করুন হয়ে ভেসে আসছে এ স্বর। এ বিপদজ্ঞাপক ধ্বনি! একমাত্র আক্রমণোদ্যত কোন শত্রুদলকে দেখলে এ শব্দে সকলকে সর্তক করা হয়। আর এ শব্দেই শত্রুর বিরুদ্ধে সমবেত অস্ত্রধারণের আহ্বান জানানো হয়।
তা হলে আবার কি কোন.......
দুশ্চিন্তার আর দুর্ভাবনা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চারপাশে সমবেত হলেন সকলেই। কুরাইশরা তখন দুর্বার। ডাল নাড়া দিয়ে পাকা ফল বৃত্তচ্যুত করার মত মুসলমানদের সমূলে উৎখাত করতে চায় এরা। মদীনার উপকণ্ঠের মুশরিক ও ইহুদীরা দুরভিসন্ধিতে উন্মত্ত। সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে। সে ভয়স্কর পরিস্থিতিতে অন্ধকারের বুকে দোল খেয়ে খেয়ে ভেসে এল এ মারাত্মক পূর্বাভাস। সকলেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর চারপাশে গভীর উৎকণ্ঠায় নিশ্চুপ। অসম্ভব উদ্বেগে সে মুবারক মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সকলেই। নামায শেষ করে রাসূল (স) বললেন, সজ্জিত হও চল জলদি। দেখ কে আহ্বান করছে এমন করে।
আঁধার মাথায় নিয়েই পথে নেমেছিলেন সালামা (রা)। সালামা ইবনে আকওয়া (রা)। ফযরের আযানের বেশ দেরি ছিল তখন। বিশেষ পযোজনেই মদীনার উপকণ্ঠের এদিকে এসেছিলেন তিনি। বিখ্যাত তীরন্দাজ এ সাহাবী আঁধার ঠেলে ঠেলে আনমনেই পথ হাঁটছিলেন। হাঁফাতে হাঁফাতে প্রান্তরের ওপার থেকে ছুটে এলেন এক ক্রীতদাস। আবদুর রহমান ইবনে আওফের বিশ্বস্ত সে ক্রীতদাস ক্রন্দাকুল কণ্ঠে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে!
সর্বনাশ! অবাক গলায় শুধালেন সালামা।
হ্যাঁ সর্বনাশ! রাসূল (স)-এর দুধেল উটগুলো চরাচ্ছিলাম আমি, হঠাৎ একদল লুটেরা রাতের আঁধারে এসে লুট করে নিয়ে গেল সেগুলো।
ব্যাকুল কণ্ঠে সালামা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, কতক্ষণ? ক্রীতদাস বলল এ মাত্র। কাউকে চিনতে পেরেছ তাদের? হাঁ, তারা সকলেই গাতফান গোত্রের লোক।
আর মুহূর্তকাল সময় নষ্ট করলেন না সালামা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর উষ্ট্রী লুঠ! তাঁর দেহে তখন আগুন জলছে। সারা শরীরে জেগে উঠেছে প্রাচীন বেদুইন রক্ত। নিকটবর্তী টিলার শীর্ষে উঠে যতটা সম্ভব উচ্চস্বরে মদীনার আকাশ বাতাসে ছড়িয়ে দিলেন বিপদ জ্ঞাপক সংকেত ধ্বনি। এরপর একাই ঝাঁপিয়ে পড়লেন অজানা ভয়ঙ্কর সে বিপদের মধ্যে। যু-কারাদায় এসে সন্ধান পেলেন শত্রদলের। উটগুলোকে পানি পান করাচ্ছিল এরা। এরপর শুরু হল সে স্মরণীয় একক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। দলবদ্ধ সশস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে অকুতোভয় এক জিন্দাদিল মুজাহিদের জিহাদ। মুহূর্তেরও কম সময়, বজ্রঘাতের মত অকস্মাৎ সুতীক্ষ্ণ তীরের ফলাগুলো সমূহ দুশমনের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো ফালাফালা করে দিল। বিখ্যাত তীরন্দাজের এ বজ্রশেলগুলো থেকে কোন রকমেই আত্মরক্ষা করল পারল না এরা। তীর নিক্ষেপের সাথে সাথে চীৎকার করে উঠছিলেন সালামা (স) : "আমি আকওয়ার সুযোগ্য পুত্র আর আজকের দিনটি হল নিকৃষ্ট লোকদের নিশ্চিত ধ্বংসের দিন।"
অবিরাম তীর বর্ষণ করেই চললেন সালামা (রা)।
নিরুপায় গাতফানীরা পরাজিত কুকুরের মত কোনক্রমে পালিয়ে বাঁচল। পিছনে ফেলে গেল তাদের লালসা-কলুষিত দ্রব্যসামগ্রী, লুণ্ঠিত উটগুলো আর পরিধানের ত্রিশটি চাদর।
ক্লান্ত সালামা (রা) বিশ্রাম নিচ্ছেন। সেখানে এসে দাঁড়ালেন লোকজন সহ রাসূলুল্লাহ (স)। সালাম দিয়ে আনুপূর্বিক ঘটনা বিবৃতির পর সালামা (রা) আরয করলেন: পিপাসার্ত ছিল শয়তানগুলো পানি খাবারও সুযোগ দিই নি এদের। একটু থেমে বললেন, এরাই বার বার আমাদের চারণভূমিতে এসে আতংক ছড়াচ্ছে, লুটপাট করছে। মনে হয় এখনো বেশি দূর যেতে পারে নি, কেননা কম বেশি সকলেই আহত। সবাই মিলে পিছু ধাওয়া করে এখুনি এদের ধরে আনি, এরপর হাতকাটা বা কতল যে শাস্তি আপনি দেবেন।
ঠিক কথা। মাথা নাড়লেন অন্যান্য সাহাবীরাও। ঋণের শেষ, আগুনের শেষ আর শত্রুর শেষ রাখতে নেই। ধরে এনে কতল করে উচিত শিক্ষা দেয়াই উচিত। আতংক ছড়াবার জন্য আর যে সব হাত চোরাগোপ্তা উদ্যত হয়ে আছে; আপনা আপনি ভঙে গুঁড়িয়ে যাবে সেগুলো। আবার মস্তক আন্দোলিত করলেন সাহাবীগণ, আন্দোলিত করে নীরবে জোরাল সমর্থন জানালেন সালামার।
কিন্তু এরপরই সকলে নীরবে একযোগে তাকালেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। হাতকাটা বা কতল এটা তাঁরই নির্দেশ। তাঁরই ফরমান। এখন কি করবেন তিনি? ধরে এনে হাত কাটবেন না কতল? অথবা আরো কঠোর আরো নির্মম কিছু? অসম্ভব ব্যগ্রতায় সকলেই তাঁর নির্দেশ শোনার জন্য উৎকর্ণ।
হঠাৎ এক সময় সালমা (রা)-এর দিকে মুখ তুললেন রাসূলুল্লাহ (স)। অত্যন্ত প্রসন্ন সে মুখ। স্বচ্ছ সে দৃষ্টি পবিত্র আর পবিত্র। তাঁর মাসুম দৃষ্টিপাতে এক অপার্থিব ব্যঞ্জনা! কণ্ঠে যেন আর এক অন্য লোকের অস্তিত্ব। প্রিয় সাহাবীর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, সালামা! তুমি বিজয়ী। আল্লাহ্ তোমাকে বিজয়দান করেছেন। উটগুলোও ফিরে পেয়েছ। গনিমত হিসেবে পেয়েছ ত্রিশটি চাদর। সুতরাং-
একটু থামলেন রাসূলুল্লাহ (স)। চারপাশে জান্নাতী সৌরভ ঢেলে বললেন এরপর, সুতরাং এখন তাদের প্রতি বিনম্র হও।
অশ্রুত এ স্বর। হিজাজের মাটিতে নতুন। ঊষর মরুতে এমনতর বীজ ছড়ায় নি কেউ। এমতর বীজ এখানে অঙ্কুরিত হয়নি কোন দিন।

📘 হাদিসের গল্প > 📄 বিনম্র বিনয়

📄 বিনম্র বিনয়


সাধারণত ইহুদীরা যে গলায় কথাবার্তা বলে এটা সে স্বর নয়, এ কণ্ঠ কেমন যেন বেদনাম্নান, কেমন যেন রোদনভরা। মসজিদ নববীর সামনে এসে বিনীত কণ্ঠে ডাক দিল, হে আবুল কাসেম!
রাসূলুল্লাহ (স)-কে আহ্বান করছে এক ইহুদী। তখন তিনি বসে বসে কথা বলছিলেন সাহাবীদের সাথে। সাড়া দিলেন সেখানে থেকেই। আসার অনুমতি দিলেন তাকে। ইহুদীর মুখটা লাল। কিছুটা ব্যথা কিছুটা অভিমান কিছুটা অভিযোগ যেন স্তব্ধ হয়ে আছে সে মুখে। নিকটস্থ হয়ে মুখ খুলল সে, হে আবুল কাসেম, আমি বিচারপ্রার্থী। ইনসাফ চাই।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে রাসূলুল্লাহ (স) তাকালেন তার দিকে।
স্বরে কিছুটা রূঢ়তা ঝরে পড়ল এবার। কিছুটা উচ্চ গলায় ইহুদী বলল, আপনার এক সাহাবী মুখে ঘুষি মেরেছে আমার।
রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞেস করলন, সে কে?
এক আনসার।
ডেকে আন তাকে।
নির্দেশ সাথে নিয়ে চলে গেল ইহুদী। রাসূলুল্লাহ (স) আবার মগ্ন হয়ে গেল কথাবার্তায়।
ভয়ানক একটা সোর গোল আর চিৎকার সাথে নিয়ে পাক দরবারে এসে থামল দুজন। কিছু পরেই। তখনো দুজনের কেশর ফোলা, সমান হিংস্র দুজনে এবং দুজনেই গর্জনক্ষুব্ধ। ঝড় থামে নি, ঝাপটা চলে গেছে কেবল। আর তাতেই ডাল পালা ভেঙেছে, প্রকৃতি বিপর্যয়। মুখ ফুলে উঠেছে ইহুদীর। প্রকৃতি দেখে বোঝা যায় ভাঙনমুখী তুফান আসন্ন।
স্থির কণ্ঠে আনাসরকে জিজ্ঞেস করলেন রাসূলুল্লাহ (স) একে মেরেছ- এ ইহুদীকে?
হে আল্লাহ্র রাসূল (স)! প্রায় সাথে সাথেই জবাব দিলেন সে আনাসর, হ্যাঁ মেরেছি। এমন কথা আবার বললে আবার মারব।
কি এমন অপরাধের কথা বলেছে সে? এক সাহাবী জানতে চাইলেন রাসূলুল্লাহ (স) উৎকর্ণ হয়ে শুনছিলেন সকলের কথাবার্তা।
আনাসার বলল, একটা বিষয় নিয়ে বাজারে ওর সাথে তর্ক হবার সময় আমি বললামঃ "আমার জীবন তাঁর নিয়ন্ত্রণে যিনি মুহাম্মদ (স)-কে নিখিল বিশ্বে মনোনীত ও মর্যাদাসম্পন্ন করেছেন।" এ কথা শুনে ইহুদী ক্ষেপে গিয়ে নবী (স)-কে হেয় করে বলতে শুরু করল, "তাঁর শপথ যিনি মুসাকে সারা বিশ্বে মনোনীত করেছেন ও বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।" এদের এত বড় দুঃসাহস! মদীনায় বাস করে আমাদের সামনে রাসূল (স)-কে ছোট করতে চায়, মূসার আসন উপরে তুলে রাসূলুল্লাহ (স)-কে অসম্মান করতে চায়!
ইহুদীর এমনতর মন্তব্যে সমবেত সাহাবীদের অনেকেই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। সত্যিই দিনে দিনে ইহুদীগুলো বড় বাড়ছে। এখন একটা বড় মাপের শিক্ষা দেয়ার সময় এসেছে। সকলের দেহে আদিম রক্ত জেগে উঠছিল ক্রমশ। তাঁরা অস্থির হয়ে উঠছিলেন।
একেবারে মগ্ন হয়ে এসব কথাবার্তা শুনছিলেন নবী (স)। হঠাৎ তিনি আনসারের দিকে চোখ তুলে তাকালেন। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ধীর স্থির কণ্ঠে বললেন, তোমরা এমন কথা বলবে না।
ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! অভিমানে ভেঙে পড়েন সে আনসার। ওরা আপনাকে 'মুজাম্মাম' বলে গালিগালাজ করে, 'আচ্ছামু আলাইকা' বলে অভিশম্পাত দেয় আবার এখন সুকৌশলে হেয় করার চেষ্টা করছে। এসব দেখেও নিশ্চুপ থাকব আমরা?
হ্যাঁ থাকবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-কে বড় করে কিছুটা বাহবা পেতে চেয়েছিলেন যে সাহাবী তিনি এখন অবাক! এ কি বলছেন নবী (স)? নিজকে অনায়াসে মূসা (আ)-এর কাছে বিকিয়ে দিচ্ছেন তিনি। একবার তাঁর মনে হল রাসূলুল্লাহ (স) সত্যি-সত্যিই মানুষ? না কি অতিমানব?
কিন্তু এ সাহাবীর বিস্মিত হবার অনেক কিছু বাকি ছিল তখনো। আস্তে আস্তে তিনি সে বিস্ময়ের মুখমুখী হলেন। বহুক্ষণ নীরব থাকার পর জবান মুবারক থেকে এর পর উচ্চারিত হল সে আশ্চর্য বাণী, সে অলৌকিক স্বর: আমাকে কোন নবীর উপর প্রাধান্য দেবে না।
অর্থাৎ- আমি ছোটও নই, বড়ও নই। আমি যা আমি তাই।
অন্যকে ছোট করে আমাকে বড় বল না। অন্যকে ছোট ভাবার অর্থই হচ্ছে অহমিকাকে প্রশ্রয় দেয়া। অহমিকা থেকেই অহংকার। আর সকল অহংকারই হারাম।
তা ছাড়া- কে ছোট কে বড় সে বিচারের ভার সর্বজ্ঞ আল্লাহ্। অন্ধ হয়ে চাঁদের সৌন্দর্য বর্ণনা কি সঙ্গত? যা তুমি জান না সে কথা কেন বল?

সাধারণত ইহুদীরা যে গলায় কথাবার্তা বলে এটা সে স্বর নয়, এ কণ্ঠ কেমন যেন বেদনাম্নান, কেমন যেন রোদনভরা। মসজিদ নববীর সামনে এসে বিনীত কণ্ঠে ডাক দিল, হে আবুল কাসেম!
রাসূলুল্লাহ (স)-কে আহ্বান করছে এক ইহুদী। তখন তিনি বসে বসে কথা বলছিলেন সাহাবীদের সাথে। সাড়া দিলেন সেখানে থেকেই। আসার অনুমতি দিলেন তাকে। ইহুদীর মুখটা লাল। কিছুটা ব্যথা কিছুটা অভিমান কিছুটা অভিযোগ যেন স্তব্ধ হয়ে আছে সে মুখে। নিকটস্থ হয়ে মুখ খুলল সে, হে আবুল কাসেম, আমি বিচারপ্রার্থী। ইনসাফ চাই।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে রাসূলুল্লাহ (স) তাকালেন তার দিকে।
স্বরে কিছুটা রূঢ়তা ঝরে পড়ল এবার। কিছুটা উচ্চ গলায় ইহুদী বলল, আপনার এক সাহাবী মুখে ঘুষি মেরেছে আমার।
রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞেস করলন, সে কে?
এক আনসার।
ডেকে আন তাকে।
নির্দেশ সাথে নিয়ে চলে গেল ইহুদী। রাসূলুল্লাহ (স) আবার মগ্ন হয়ে গেল কথাবার্তায়।
ভয়ানক একটা সোর গোল আর চিৎকার সাথে নিয়ে পাক দরবারে এসে থামল দুজন। কিছু পরেই। তখনো দুজনের কেশর ফোলা, সমান হিংস্র দুজনে এবং দুজনেই গর্জনক্ষুব্ধ। ঝড় থামে নি, ঝাপটা চলে গেছে কেবল। আর তাতেই ডাল পালা ভেঙেছে, প্রকৃতি বিপর্যয়। মুখ ফুলে উঠেছে ইহুদীর। প্রকৃতি দেখে বোঝা যায় ভাঙনমুখী তুফান আসন্ন।
স্থির কণ্ঠে আনাসরকে জিজ্ঞেস করলেন রাসূলুল্লাহ (স) একে মেরেছ- এ ইহুদীকে?
হে আল্লাহ্র রাসূল (স)! প্রায় সাথে সাথেই জবাব দিলেন সে আনাসর, হ্যাঁ মেরেছি। এমন কথা আবার বললে আবার মারব।
কি এমন অপরাধের কথা বলেছে সে? এক সাহাবী জানতে চাইলেন রাসূলুল্লাহ (স) উৎকর্ণ হয়ে শুনছিলেন সকলের কথাবার্তা।
আনাসার বলল, একটা বিষয় নিয়ে বাজারে ওর সাথে তর্ক হবার সময় আমি বললামঃ "আমার জীবন তাঁর নিয়ন্ত্রণে যিনি মুহাম্মদ (স)-কে নিখিল বিশ্বে মনোনীত ও মর্যাদাসম্পন্ন করেছেন।" এ কথা শুনে ইহুদী ক্ষেপে গিয়ে নবী (স)-কে হেয় করে বলতে শুরু করল, "তাঁর শপথ যিনি মুসাকে সারা বিশ্বে মনোনীত করেছেন ও বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।" এদের এত বড় দুঃসাহস! মদীনায় বাস করে আমাদের সামনে রাসূল (স)-কে ছোট করতে চায়, মূসার আসন উপরে তুলে রাসূলুল্লাহ (স)-কে অসম্মান করতে চায়!
ইহুদীর এমনতর মন্তব্যে সমবেত সাহাবীদের অনেকেই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। সত্যিই দিনে দিনে ইহুদীগুলো বড় বাড়ছে। এখন একটা বড় মাপের শিক্ষা দেয়ার সময় এসেছে। সকলের দেহে আদিম রক্ত জেগে উঠছিল ক্রমশ। তাঁরা অস্থির হয়ে উঠছিলেন।
একেবারে মগ্ন হয়ে এসব কথাবার্তা শুনছিলেন নবী (স)। হঠাৎ তিনি আনসারের দিকে চোখ তুলে তাকালেন। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ধীর স্থির কণ্ঠে বললেন, তোমরা এমন কথা বলবে না।
ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! অভিমানে ভেঙে পড়েন সে আনসার। ওরা আপনাকে 'মুজাম্মাম' বলে গালিগালাজ করে, 'আচ্ছামু আলাইকা' বলে অভিশম্পাত দেয় আবার এখন সুকৌশলে হেয় করার চেষ্টা করছে। এসব দেখেও নিশ্চুপ থাকব আমরা?
হ্যাঁ থাকবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-কে বড় করে কিছুটা বাহবা পেতে চেয়েছিলেন যে সাহাবী তিনি এখন অবাক! এ কি বলছেন নবী (স)? নিজকে অনায়াসে মূসা (আ)-এর কাছে বিকিয়ে দিচ্ছেন তিনি। একবার তাঁর মনে হল রাসূলুল্লাহ (স) সত্যি-সত্যিই মানুষ? না কি অতিমানব?
কিন্তু এ সাহাবীর বিস্মিত হবার অনেক কিছু বাকি ছিল তখনো। আস্তে আস্তে তিনি সে বিস্ময়ের মুখমুখী হলেন। বহুক্ষণ নীরব থাকার পর জবান মুবারক থেকে এর পর উচ্চারিত হল সে আশ্চর্য বাণী, সে অলৌকিক স্বর: আমাকে কোন নবীর উপর প্রাধান্য দেবে না।
অর্থাৎ- আমি ছোটও নই, বড়ও নই। আমি যা আমি তাই।
অন্যকে ছোট করে আমাকে বড় বল না। অন্যকে ছোট ভাবার অর্থই হচ্ছে অহমিকাকে প্রশ্রয় দেয়া। অহমিকা থেকেই অহংকার। আর সকল অহংকারই হারাম।
তা ছাড়া- কে ছোট কে বড় সে বিচারের ভার সর্বজ্ঞ আল্লাহ্। অন্ধ হয়ে চাঁদের সৌন্দর্য বর্ণনা কি সঙ্গত? যা তুমি জান না সে কথা কেন বল?

📘 হাদিসের গল্প > 📄 মানবতার ভাষা

📄 মানবতার ভাষা


তার কর্কশ গলায় এত রূঢ়তা ছিল যে মুহূর্তে সে পবিত্র পরিবেশ পাল্টে গেল সম্পূর্ণ। আলোকিত মধ্যাহ্নে অকস্মাৎ নেমে এল রাতের অন্ধকার। সীমাহীন ক্রোধে অনবরত কাঁপছিল সে ইহুদী। আর কেবলই চিৎকার করছিল। তার মুখে ছিল অশ্রাব্য ভাষা। সে ভাষা কটু। সে ভাষা অশ্লীল। এমন অশালীন, যে শুনবে রক্ত গরম হয়ে উঠবে তার।
সাহাবীদের মধ্যে বসেছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। বসে বসে দ্বীনের কথা আলোচনা করছিলেন। আর সে যালিম এমন পবিত্র মানুষটি প্রতি এসব ইতর ভাষা প্রয়োগ করছিল। অবিরাম করেই যাচ্ছিল। গরম কড়াইতে ফুটন্ত পানি যেমন লাফায়, চিৎকারের সাথে সাথে তেমনি লাফাচ্ছিল সে। এমনি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে ইহুদী, এমনি ক্রুদ্ধ। অথচ এতটা বাড়াবাড়ি করার কোন সঙ্গত কারণ ছিল না।
এ লোকটির কাছে থেকে একটি বাচ্চা উট ধার নিয়েছিলেন রাসূল (স)। বিশেষ প্রয়োজন পড়েছিল তাই। হয়তো কাউকে দেবেন। কোন ইয়াতীমকে, কোন আতুরকে। আর সে ঋণের তাগাদায় এসে এত কাণ্ড করে বসল লোকটা। একেবারে মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ভীষণ রকম কঠোর হয়ে উঠল সে। তার ব্যবহার এমনই উত্তেজক ছিল যে এর ক্রমাগত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সমবেত সাহাবীগণও ধীরে ধীরে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন এক সময় এবং অবশেষে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন তাঁরাও। রাসূল (স)-এর প্রতি এমন আচরণকে তাঁরা কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তৎপর হলেন সকলেই। এমন কি কয়েকজন সাহাবী উদ্যত হলেন তাকে হত্যা করার জন্য। যে অপরাধ সে করেছে কতলই এর একমাত্র শাস্তি, এছাড়া দ্বিতীয় কোন প্রতিশোধ খুঁজে পেলেন না তাঁরা।
হত্যায় উদ্যত সাহাবীদের দিকে তাকালেন রাসূল (স)। ক্ষণিক। পরমুহূর্তেই তাঁর পবিত্র দুটি বাহু উপরে তুলে থামিয়ে দিলেন। তাঁদের হত্যামুখী হাতগুলো থেমে গেল। কিন্তু অসম্ভব উত্তেজনায় তাঁদের চোখ মুখ থর থর করছিল। সীমাহীন ক্রোধ জমেছিল সেখানে। তাঁরা সকলে একযোগে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকালেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাকিয়েছিলেন তাঁদের দিকে। এরপর যেন অসম্ভব ব্যথিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন : কি আশ্চর্য! তোমরাও ধৈর্যহারা? তোমরা কি জাননা পাওনাদারের কড়া কথা বলার হক আছে। সুতরাং লোকটিকে এমন কথা বলতে দাও।
সমবেত সকল সাহাবী যেন অকস্মাৎ চাবুকের আঘাতে শিহরিত হয়ে উঠলেন। চমকিত হল। এ কি কথা বললেন রাসূল (স)? সাহাবীগণ অপলকে তাকিয়ে রইলেন সে পবিত্র মুখের দিকে। এমন বিপরীত বিবেকের কথা শোনার জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না।
অবাক চাউনি মেলে তাকিয়ে আছে সে ইহুদীও। সে কঠোরভাষী পাওনাদার! রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংযত মহান ব্যবহার তার অন্তরের গভীরকে স্পর্শ করে গেল। সে নির্বাক। কোন কথা আর বলতে পারল না। মুহূর্তে তার মুখের কঠোর ভাষা যেন কোথায় হারিয়ে গেল। ফুরিয়ে গেল।
লোকটির ঋণ এখনই মিটিয়ে দাও তোমরা। যাও। বিনম্র কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন নবী (স)।
কয়েকজন সাহাবী এক সাথে চলে গেল চারণভূমির দিকে। যেখানে বায়তুলমালের উটগুলো চরে ঘাস খাচ্ছিল। বেশ কিছু পরে ফিরে এলেন তাঁরা। এসে নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! লোকটির উটের মত কোন ছোট উট পাওয়া যাচ্ছে না। আপনার উটগুলো অনেক বড়, অনেক ভাল অনেক দামী।
এতটুকু দ্বিধা করলেন না, লাভ-লোকসান ভাবলেন না, বললেন: যাও সে উট দিয়েই ঋণ পরিশোধ কর। এখনই। একটু থেমে ধীর স্থির গলায় বললেন, আল্লাহ্র কাছে সে ব্যক্তি উত্তম, যে উত্তম ব্যবহারের সাথে উত্তম জিনিস দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে।
প্রায় দ্বিগুণ মূল্যের উটের রশি হাতে নিয়ে সে কটুভাষী লোকটি মরমে মরে যাচ্ছিল। লজ্জায় দ্বিধায় সংকোচে শ্রদ্ধায় আর নবী (স)-এর দিকে ঠিক মত চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছিল না। তার পা উঠছিল না যেন। জীবনে এমন দোল জাগান কথা সে আর শোনেনি কোন দিন। হেজাজের রুক্ষ্ম মাটিতে এমনতর মধুর ব্যবহার কোনদিন তার সাথে আর করেনি কেউ। তার মনের দমবদ্ধ অমানিশার গুমোট আকাশে আজ উদার হওয়ার ঝাপটা লেগেছে। সে ঝাপটায় সরে যাচ্ছে পুঞ্জীভূত ঘনকাল মেঘের স্তর। আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে চেতনার দ্বাদশী। সে অলৌকিক আলোয় ভরে উঠছে মনের অলিগলি। ধীরে ধীরে অলোকিক হচ্ছে বোধ। ভালবাসায় ভরে উঠছে চেতনা। দীপ্তিময় হচ্ছে আত্মা।
উটের রশি ধরে যেতে যেতে প্রায় রুদ্ধস্বরে সে বলল, হে মুহাম্মদ (স)! অশ্রুতে ভিজে গেল। সে কঠোর কণ্ঠ। এখন ভোরের শিশিরের মত কোমল! শুকতারার মত নিষ্পাপ। জ্যোৎস্নার মত জ্যোতির্ময়।

তার কর্কশ গলায় এত রূঢ়তা ছিল যে মুহূর্তে সে পবিত্র পরিবেশ পাল্টে গেল সম্পূর্ণ। আলোকিত মধ্যাহ্নে অকস্মাৎ নেমে এল রাতের অন্ধকার। সীমাহীন ক্রোধে অনবরত কাঁপছিল সে ইহুদী। আর কেবলই চিৎকার করছিল। তার মুখে ছিল অশ্রাব্য ভাষা। সে ভাষা কটু। সে ভাষা অশ্লীল। এমন অশালীন, যে শুনবে রক্ত গরম হয়ে উঠবে তার।
সাহাবীদের মধ্যে বসেছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। বসে বসে দ্বীনের কথা আলোচনা করছিলেন। আর সে যালিম এমন পবিত্র মানুষটি প্রতি এসব ইতর ভাষা প্রয়োগ করছিল। অবিরাম করেই যাচ্ছিল। গরম কড়াইতে ফুটন্ত পানি যেমন লাফায়, চিৎকারের সাথে সাথে তেমনি লাফাচ্ছিল সে। এমনি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে ইহুদী, এমনি ক্রুদ্ধ। অথচ এতটা বাড়াবাড়ি করার কোন সঙ্গত কারণ ছিল না।
এ লোকটির কাছে থেকে একটি বাচ্চা উট ধার নিয়েছিলেন রাসূল (স)। বিশেষ প্রয়োজন পড়েছিল তাই। হয়তো কাউকে দেবেন। কোন ইয়াতীমকে, কোন আতুরকে। আর সে ঋণের তাগাদায় এসে এত কাণ্ড করে বসল লোকটা। একেবারে মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ভীষণ রকম কঠোর হয়ে উঠল সে। তার ব্যবহার এমনই উত্তেজক ছিল যে এর ক্রমাগত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সমবেত সাহাবীগণও ধীরে ধীরে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন এক সময় এবং অবশেষে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন তাঁরাও। রাসূল (স)-এর প্রতি এমন আচরণকে তাঁরা কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তৎপর হলেন সকলেই। এমন কি কয়েকজন সাহাবী উদ্যত হলেন তাকে হত্যা করার জন্য। যে অপরাধ সে করেছে কতলই এর একমাত্র শাস্তি, এছাড়া দ্বিতীয় কোন প্রতিশোধ খুঁজে পেলেন না তাঁরা।
হত্যায় উদ্যত সাহাবীদের দিকে তাকালেন রাসূল (স)। ক্ষণিক। পরমুহূর্তেই তাঁর পবিত্র দুটি বাহু উপরে তুলে থামিয়ে দিলেন। তাঁদের হত্যামুখী হাতগুলো থেমে গেল। কিন্তু অসম্ভব উত্তেজনায় তাঁদের চোখ মুখ থর থর করছিল। সীমাহীন ক্রোধ জমেছিল সেখানে। তাঁরা সকলে একযোগে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকালেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাকিয়েছিলেন তাঁদের দিকে। এরপর যেন অসম্ভব ব্যথিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন : কি আশ্চর্য! তোমরাও ধৈর্যহারা? তোমরা কি জাননা পাওনাদারের কড়া কথা বলার হক আছে। সুতরাং লোকটিকে এমন কথা বলতে দাও।
সমবেত সকল সাহাবী যেন অকস্মাৎ চাবুকের আঘাতে শিহরিত হয়ে উঠলেন। চমকিত হল। এ কি কথা বললেন রাসূল (স)? সাহাবীগণ অপলকে তাকিয়ে রইলেন সে পবিত্র মুখের দিকে। এমন বিপরীত বিবেকের কথা শোনার জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না।
অবাক চাউনি মেলে তাকিয়ে আছে সে ইহুদীও। সে কঠোরভাষী পাওনাদার! রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংযত মহান ব্যবহার তার অন্তরের গভীরকে স্পর্শ করে গেল। সে নির্বাক। কোন কথা আর বলতে পারল না। মুহূর্তে তার মুখের কঠোর ভাষা যেন কোথায় হারিয়ে গেল। ফুরিয়ে গেল।
লোকটির ঋণ এখনই মিটিয়ে দাও তোমরা। যাও। বিনম্র কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন নবী (স)।
কয়েকজন সাহাবী এক সাথে চলে গেল চারণভূমির দিকে। যেখানে বায়তুলমালের উটগুলো চরে ঘাস খাচ্ছিল। বেশ কিছু পরে ফিরে এলেন তাঁরা। এসে নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! লোকটির উটের মত কোন ছোট উট পাওয়া যাচ্ছে না। আপনার উটগুলো অনেক বড়, অনেক ভাল অনেক দামী।
এতটুকু দ্বিধা করলেন না, লাভ-লোকসান ভাবলেন না, বললেন: যাও সে উট দিয়েই ঋণ পরিশোধ কর। এখনই। একটু থেমে ধীর স্থির গলায় বললেন, আল্লাহ্র কাছে সে ব্যক্তি উত্তম, যে উত্তম ব্যবহারের সাথে উত্তম জিনিস দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে।
প্রায় দ্বিগুণ মূল্যের উটের রশি হাতে নিয়ে সে কটুভাষী লোকটি মরমে মরে যাচ্ছিল। লজ্জায় দ্বিধায় সংকোচে শ্রদ্ধায় আর নবী (স)-এর দিকে ঠিক মত চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছিল না। তার পা উঠছিল না যেন। জীবনে এমন দোল জাগান কথা সে আর শোনেনি কোন দিন। হেজাজের রুক্ষ্ম মাটিতে এমনতর মধুর ব্যবহার কোনদিন তার সাথে আর করেনি কেউ। তার মনের দমবদ্ধ অমানিশার গুমোট আকাশে আজ উদার হওয়ার ঝাপটা লেগেছে। সে ঝাপটায় সরে যাচ্ছে পুঞ্জীভূত ঘনকাল মেঘের স্তর। আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে চেতনার দ্বাদশী। সে অলৌকিক আলোয় ভরে উঠছে মনের অলিগলি। ধীরে ধীরে অলোকিক হচ্ছে বোধ। ভালবাসায় ভরে উঠছে চেতনা। দীপ্তিময় হচ্ছে আত্মা।
উটের রশি ধরে যেতে যেতে প্রায় রুদ্ধস্বরে সে বলল, হে মুহাম্মদ (স)! অশ্রুতে ভিজে গেল। সে কঠোর কণ্ঠ। এখন ভোরের শিশিরের মত কোমল! শুকতারার মত নিষ্পাপ। জ্যোৎস্নার মত জ্যোতির্ময়।

📘 হাদিসের গল্প > 📄 আল্লাহ্ যার সহায় হন

📄 আল্লাহ্ যার সহায় হন


ফেলে আসা ঘটনাগুলো মুছে যায় নি মন থেকে। বিলীন হয়নি। চোখ বন্ধ করলই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছবির মত ভাসতে থাকে। পরপর। নিষ্ঠুর উমাইয়ার হাতে বেত, বাতাসে সে বেতের শব্দ যেন আজো শোনা যায়। আর বুকে পাঁজর-ভাঙা প্রকাণ্ড পাথর! গলায় রশি বেঁধে মক্কার ইতর ছেলেদের পশুর মত টানাটানি আর চারদিক থেকে পাথর বৃষ্টি! জঙ্গল থেকে তুলে আনা কাঁটায় সারা দেহ ক্ষতবিক্ষত! অত্যাচারে যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া!
ঝড় বাড়ে। অত্যাচারের ঝড়। ঝড় যত বাড়ে আল্লাহ্ নামের চাদরখানা ততই শক্ত করে গায় জড়িয়ে নেয় হযরত বেলাল (রা)। ইসলামে আরো সুদৃঢ় হন তিনি। থাকেন ধর্মে অটল।
এসব ঘটনা স্মরণ করে শিউরে ওঠেন হযরত বেলাল (রা)। কাল কদাকার কাফ্রি। কিন্তু হৃদয়টা জ্যোতির্ময়। সে আলোর প্রাণ মসজিদ নববীর প্রাঙ্গনে বসে অতীতটা দেখছিলেন। জরিপ করেছিলেন। বীভৎস সে দিনগুলো আর নেই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভালবাসা পেয়েছেন আর জয় করেছেন সকল মুসলমানের স্নেহ। মধুর মহব্বত। আজ তিনি মুসলিম জাহানের সম্মানিত মুয়াজ্জিন।
সব কথা মনে হল পলকে। শুকরিয়ায় মাথা নত হয়ে এল তাঁর। আজ তিনি আনন্দিত। আজ তিনি তৃপ্ত।
আরো একটি সম্মান দিয়েছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)। তিনি তাঁকে বড় ভালবাসেন। বড় বিশ্বাস করেন। তাই পারিবারিক কাজকর্মের দায়দায়িত্ব নিযুক্ত করেছেন তাঁকে। দিনার দিরহাম, খাদ্য-শস্য, ধনসম্পদ যা আসে জমা হয় তাঁর কাছেই। তিনিই সঞ্চয় করেন। জমিয়ে রাখেন। খরচও করেন। আবার অভাব-অনটনের সময় ঋণ করেন তিনিই। নিজ দায়িত্বে। মিটিয়েও দেন সময় মত। এসব দায়িত্ব তাঁর।
তিনিই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মানিত খাজানি।
একদিন বাজারে যাচ্ছিলেন হযরত বেলাল (রা)। দেখা হল এক ইহুদীর সাথে। বাজারে দোকান আছে তার। নিজে থেকেই বলল, দেখুন-আপনি ধারেই মালপত্র কেন। তা আমার দোকান থেকেও নিতে পারেন।
ধারে মাল দেয়া সুবিধা আছে কিছু। দাম বেশী পাওয়া যায়। তা ছাড়া সে ইহুদী ভালভাবেই জানে, এখানে টাকা মার যাবার কোন ভয় নেই। নির্ভয়ে মাল দেয়া যায়। সে মাল দিচ্ছে হযরত মুহাম্মদকে। বেলাল মারফত। ইহুদীদের মনে আর একটি গোপন বাসনাও কাজ করত। সময় সুযোগ পেলেই তারা অপদস্থ করত মুসলমানদের। করতে পারলে খুশি হত। দারুন খুশি। এ অপমান যদি কোন করমে করতে পারত হযরত মুহাম্মদ (স)-কে তা হলে সেদিন উৎসব পড়ে যেত তাদের। নিদেন পক্ষে হযরত বেলালের মত লোককেও অপদস্থ করতে পারাটা কম নয়। তাই সুযোগের সন্ধানে থাকত তারা সব সময়ই। সুযোগ পেলেই সদ্ব্যবহার করত। পূর্ণ সদ্ব্যবহার।
কথামত ইহুদীর দোকান থেকে কিছু মাল ধারে আনলেন হযরত বেলাল (রা)। বেশ কিছু দিনের মেয়াদে।
সেদিন মসজিদ নববীর চত্বরে বসে অতীতের কথা ভাবছিলেন তিনি। ভাবতে ভাবতে আযানের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। নামাযের সময় হয়ে এল বলে। উঠতে যাবে, এমন সময় এল সে ব্যবসায়ী। একা নয়-সাথে বাজারের আরো কয়েকজন দোকানদার। প্রয়োজন হলে তাদের সাহায্য নেবে। তারাও তার হয়ে কথা বলবে।
সে এসেই কর্কশকণ্ঠে ডাক দিল, হে হাবশী গোলাম!
হযরত বেলাল (রা) শুনলেন কথাগুলো। এ ধৃষ্ঠতায় বিরক্ত হলেন না। উত্তেজিতও না। শান্ত কণ্ঠে বললেন, লাব্বায়েক। আমি হাজির। এরপর বেরিয়ে এলেন। এসে দাঁড়ালেন। তাদের সামনে।
অত্যন্ত কঠোর কণ্ঠে দোকানী বলতে শুরু করল, এখনো যে ঋণ শোধ দেয়ার নাম নিশানা নেই। ব্যাপারটা কি? আর মাত্র চার দিন। এ চারদিনের মধ্যে যদি শোধ না পাই তা হলে তোকে রাখাল বানাব। মদীনার মাঠে বকরী চরিয়ে ছাড়ব।
আরো কিছু বিষোদগার করল দোকানদার। মওকা যখন মিলেছে। এরপর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে চলে গেল গজগজ করতে করতে।
ইশার নামায শেষ হলে হযরত বেলাল (রা) গেলেন নবীজীর দরবারে। গিয়ে বললেন সব কথা। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনলেন রাসূলুল্লাহ (স)। কিন্তু একটি কথাও বললেন না। বেলালের প্রতি সহানুভূতি জানালেন না। অভয়ও দিলেন না তাঁকে। সমর্থনেরও কোন চেষ্টা করলেন না। নীরব হয়ে গেলেন একেবারেই।
এটা সপ্তম হিজরীর ঘটনা। মক্কা-বিজয়ের ঠিক আগে ঘটে ছিল ব্যাপারটি। ইসলাম তখন বহুব্যাপ্ত। মুসলমানের সংখ্যা হাজার হাজার। রাসূলুল্লাহ (স) তখন মদীনার হর্তাকর্তা। তাঁর সামান্য ইংগিতই যথেষ্ট। মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে দোকানীর শির। কিন্তু অসীম ধৈর্যে নবীজী নীরব। নিশ্চল। সবরের জীবন্ত নীরবতায় নিজেকে সমর্পণ করলেন আল্লাহ্র কাছে। পরমপ্রভুর কাছে। মানসম্মানের মালিকের কাছে। জীবিকাদাতার কাছে। পরিপূর্ণ রূপে।
হযরত মুহাম্মদ (স)-কে নীরব থাকতে দেখে কিছুটা বিচলিত হলেন হযরত বেলাল (রা)। নিজে একটা কিছু উপায় ভেবেছেন এতক্ষণ। ভেবে একটা পথ বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অনুমতির প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতি। সম্মতি নেয়ার জন্যই বললেন, এ চার দিনের মধ্যে ঋণ শোধ দেয়ার কোন পথ দেখি না। যদি অনুমতি দেন। আমি না হয় কিছুদিন আত্মগোপন করি কোথাও। সেখান থেকেই চেষ্টা করি ঋণ শোধ করার।
এবারেও রাসূলুল্লাহ (স) শুনলেন কেবল। কিছু বললেন না। একটি কথাও না। কম কথার মানুষ রাসূলুল্লাহ (স)। যেমন নীরব ছিলেন তেমনি নীরব রইলেন।
রাতে আর ঠিক মত শুতেই পারলেন না হযরত বেলাল (রা)। যা কিছু অতি সামান্য সম্বল ছিল, একটা পুঁটলিতে বাঁধলেন। বেঁধে বসে রইলেন প্রভাতের অপেক্ষায়। নামায শেষ করেই বেরিয়ে পড়বেন। অজানার পথে। ভাগ্যের অন্বেষণে। এরপর আল্লাহ্ ভরসা।
ফযরের নামায শেষ হয়েছে এ মাত্র। আপনার সম্বলটি হাতে করে পথে নামতে যাব এমন সময় এক লোক এল বেলালের কাছে। এসে বলল, রাসূলুল্লাহ (স) আপনাকে ডাকছেন।
তাড়াতাড়ি করে ছুটে গেলেন হযরত বেলাল (রা)। রাসূলুল্লাহ (স) বসে ছিলেন। বললেন, মোবারক হোক। চিন্তা করনা বেলাল। ঋণ শোধের একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আল্লাহ্। ঐ দেখ-
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনের দিকে তাকালেন হযরত বেলাল (রা)। চারটি উট সামনে দাঁড়িয়ে। শস্য বোঝাই। নবীজী (স) বললেন, ফাদাক-এর সর্দার পাঠিয়েছেন এ চারটি উট। শস্য বোঝাই করে। এগুলো এখনি নিয়ে যাও বাজারে। বিক্রি করে ঋণ শোধ কর।
মাথার উপর থেকে যেন পাহাড় নেমে গেল হযরত বেলাল। ভীষণ খুশি হলেন তিনি। আল্লাহ্র রহমতের কথা চিন্তা করে চোখ ভিজে আসছিল তাঁর। বার বার। উটগুলোকে তাড়িয়ে বাজারের পথে চলে গেলেন তিনি। আর রাসূলুল্লাহ (স) উঠে দাঁড়ালেন। যাবেন মসজিদে। সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন এখনি। শুকরিয়া জানাবেন আল্লাহ্। সুখে দুখে তিনিই সব। তাঁর ইংগিত ছাড়া কিছুই হয় না। হতে পারে না। পর্বতের মত অটল বিশ্বাস। বিশ্বাসই ঈমান।
অটল বিশ্বাসে বলীয়ান রাসূলুল্লাহ (স) স্থির পদক্ষেপে মসজিদের পথে এগিয়ে গেলেন।

ফেলে আসা ঘটনাগুলো মুছে যায় নি মন থেকে। বিলীন হয়নি। চোখ বন্ধ করলই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছবির মত ভাসতে থাকে। পরপর। নিষ্ঠুর উমাইয়ার হাতে বেত, বাতাসে সে বেতের শব্দ যেন আজো শোনা যায়। আর বুকে পাঁজর-ভাঙা প্রকাণ্ড পাথর! গলায় রশি বেঁধে মক্কার ইতর ছেলেদের পশুর মত টানাটানি আর চারদিক থেকে পাথর বৃষ্টি! জঙ্গল থেকে তুলে আনা কাঁটায় সারা দেহ ক্ষতবিক্ষত! অত্যাচারে যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া!
ঝড় বাড়ে। অত্যাচারের ঝড়। ঝড় যত বাড়ে আল্লাহ্ নামের চাদরখানা ততই শক্ত করে গায় জড়িয়ে নেয় হযরত বেলাল (রা)। ইসলামে আরো সুদৃঢ় হন তিনি। থাকেন ধর্মে অটল।
এসব ঘটনা স্মরণ করে শিউরে ওঠেন হযরত বেলাল (রা)। কাল কদাকার কাফ্রি। কিন্তু হৃদয়টা জ্যোতির্ময়। সে আলোর প্রাণ মসজিদ নববীর প্রাঙ্গনে বসে অতীতটা দেখছিলেন। জরিপ করেছিলেন। বীভৎস সে দিনগুলো আর নেই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভালবাসা পেয়েছেন আর জয় করেছেন সকল মুসলমানের স্নেহ। মধুর মহব্বত। আজ তিনি মুসলিম জাহানের সম্মানিত মুয়াজ্জিন।
সব কথা মনে হল পলকে। শুকরিয়ায় মাথা নত হয়ে এল তাঁর। আজ তিনি আনন্দিত। আজ তিনি তৃপ্ত।
আরো একটি সম্মান দিয়েছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)। তিনি তাঁকে বড় ভালবাসেন। বড় বিশ্বাস করেন। তাই পারিবারিক কাজকর্মের দায়দায়িত্ব নিযুক্ত করেছেন তাঁকে। দিনার দিরহাম, খাদ্য-শস্য, ধনসম্পদ যা আসে জমা হয় তাঁর কাছেই। তিনিই সঞ্চয় করেন। জমিয়ে রাখেন। খরচও করেন। আবার অভাব-অনটনের সময় ঋণ করেন তিনিই। নিজ দায়িত্বে। মিটিয়েও দেন সময় মত। এসব দায়িত্ব তাঁর।
তিনিই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মানিত খাজানি।
একদিন বাজারে যাচ্ছিলেন হযরত বেলাল (রা)। দেখা হল এক ইহুদীর সাথে। বাজারে দোকান আছে তার। নিজে থেকেই বলল, দেখুন-আপনি ধারেই মালপত্র কেন। তা আমার দোকান থেকেও নিতে পারেন।
ধারে মাল দেয়া সুবিধা আছে কিছু। দাম বেশী পাওয়া যায়। তা ছাড়া সে ইহুদী ভালভাবেই জানে, এখানে টাকা মার যাবার কোন ভয় নেই। নির্ভয়ে মাল দেয়া যায়। সে মাল দিচ্ছে হযরত মুহাম্মদকে। বেলাল মারফত। ইহুদীদের মনে আর একটি গোপন বাসনাও কাজ করত। সময় সুযোগ পেলেই তারা অপদস্থ করত মুসলমানদের। করতে পারলে খুশি হত। দারুন খুশি। এ অপমান যদি কোন করমে করতে পারত হযরত মুহাম্মদ (স)-কে তা হলে সেদিন উৎসব পড়ে যেত তাদের। নিদেন পক্ষে হযরত বেলালের মত লোককেও অপদস্থ করতে পারাটা কম নয়। তাই সুযোগের সন্ধানে থাকত তারা সব সময়ই। সুযোগ পেলেই সদ্ব্যবহার করত। পূর্ণ সদ্ব্যবহার।
কথামত ইহুদীর দোকান থেকে কিছু মাল ধারে আনলেন হযরত বেলাল (রা)। বেশ কিছু দিনের মেয়াদে।
সেদিন মসজিদ নববীর চত্বরে বসে অতীতের কথা ভাবছিলেন তিনি। ভাবতে ভাবতে আযানের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। নামাযের সময় হয়ে এল বলে। উঠতে যাবে, এমন সময় এল সে ব্যবসায়ী। একা নয়-সাথে বাজারের আরো কয়েকজন দোকানদার। প্রয়োজন হলে তাদের সাহায্য নেবে। তারাও তার হয়ে কথা বলবে।
সে এসেই কর্কশকণ্ঠে ডাক দিল, হে হাবশী গোলাম!
হযরত বেলাল (রা) শুনলেন কথাগুলো। এ ধৃষ্ঠতায় বিরক্ত হলেন না। উত্তেজিতও না। শান্ত কণ্ঠে বললেন, লাব্বায়েক। আমি হাজির। এরপর বেরিয়ে এলেন। এসে দাঁড়ালেন। তাদের সামনে।
অত্যন্ত কঠোর কণ্ঠে দোকানী বলতে শুরু করল, এখনো যে ঋণ শোধ দেয়ার নাম নিশানা নেই। ব্যাপারটা কি? আর মাত্র চার দিন। এ চারদিনের মধ্যে যদি শোধ না পাই তা হলে তোকে রাখাল বানাব। মদীনার মাঠে বকরী চরিয়ে ছাড়ব।
আরো কিছু বিষোদগার করল দোকানদার। মওকা যখন মিলেছে। এরপর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে চলে গেল গজগজ করতে করতে।
ইশার নামায শেষ হলে হযরত বেলাল (রা) গেলেন নবীজীর দরবারে। গিয়ে বললেন সব কথা। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনলেন রাসূলুল্লাহ (স)। কিন্তু একটি কথাও বললেন না। বেলালের প্রতি সহানুভূতি জানালেন না। অভয়ও দিলেন না তাঁকে। সমর্থনেরও কোন চেষ্টা করলেন না। নীরব হয়ে গেলেন একেবারেই।
এটা সপ্তম হিজরীর ঘটনা। মক্কা-বিজয়ের ঠিক আগে ঘটে ছিল ব্যাপারটি। ইসলাম তখন বহুব্যাপ্ত। মুসলমানের সংখ্যা হাজার হাজার। রাসূলুল্লাহ (স) তখন মদীনার হর্তাকর্তা। তাঁর সামান্য ইংগিতই যথেষ্ট। মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে দোকানীর শির। কিন্তু অসীম ধৈর্যে নবীজী নীরব। নিশ্চল। সবরের জীবন্ত নীরবতায় নিজেকে সমর্পণ করলেন আল্লাহ্র কাছে। পরমপ্রভুর কাছে। মানসম্মানের মালিকের কাছে। জীবিকাদাতার কাছে। পরিপূর্ণ রূপে।
হযরত মুহাম্মদ (স)-কে নীরব থাকতে দেখে কিছুটা বিচলিত হলেন হযরত বেলাল (রা)। নিজে একটা কিছু উপায় ভেবেছেন এতক্ষণ। ভেবে একটা পথ বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অনুমতির প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতি। সম্মতি নেয়ার জন্যই বললেন, এ চার দিনের মধ্যে ঋণ শোধ দেয়ার কোন পথ দেখি না। যদি অনুমতি দেন। আমি না হয় কিছুদিন আত্মগোপন করি কোথাও। সেখান থেকেই চেষ্টা করি ঋণ শোধ করার।
এবারেও রাসূলুল্লাহ (স) শুনলেন কেবল। কিছু বললেন না। একটি কথাও না। কম কথার মানুষ রাসূলুল্লাহ (স)। যেমন নীরব ছিলেন তেমনি নীরব রইলেন।
রাতে আর ঠিক মত শুতেই পারলেন না হযরত বেলাল (রা)। যা কিছু অতি সামান্য সম্বল ছিল, একটা পুঁটলিতে বাঁধলেন। বেঁধে বসে রইলেন প্রভাতের অপেক্ষায়। নামায শেষ করেই বেরিয়ে পড়বেন। অজানার পথে। ভাগ্যের অন্বেষণে। এরপর আল্লাহ্ ভরসা।
ফযরের নামায শেষ হয়েছে এ মাত্র। আপনার সম্বলটি হাতে করে পথে নামতে যাব এমন সময় এক লোক এল বেলালের কাছে। এসে বলল, রাসূলুল্লাহ (স) আপনাকে ডাকছেন।
তাড়াতাড়ি করে ছুটে গেলেন হযরত বেলাল (রা)। রাসূলুল্লাহ (স) বসে ছিলেন। বললেন, মোবারক হোক। চিন্তা করনা বেলাল। ঋণ শোধের একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আল্লাহ্। ঐ দেখ-
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনের দিকে তাকালেন হযরত বেলাল (রা)। চারটি উট সামনে দাঁড়িয়ে। শস্য বোঝাই। নবীজী (স) বললেন, ফাদাক-এর সর্দার পাঠিয়েছেন এ চারটি উট। শস্য বোঝাই করে। এগুলো এখনি নিয়ে যাও বাজারে। বিক্রি করে ঋণ শোধ কর।
মাথার উপর থেকে যেন পাহাড় নেমে গেল হযরত বেলাল। ভীষণ খুশি হলেন তিনি। আল্লাহ্র রহমতের কথা চিন্তা করে চোখ ভিজে আসছিল তাঁর। বার বার। উটগুলোকে তাড়িয়ে বাজারের পথে চলে গেলেন তিনি। আর রাসূলুল্লাহ (স) উঠে দাঁড়ালেন। যাবেন মসজিদে। সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন এখনি। শুকরিয়া জানাবেন আল্লাহ্। সুখে দুখে তিনিই সব। তাঁর ইংগিত ছাড়া কিছুই হয় না। হতে পারে না। পর্বতের মত অটল বিশ্বাস। বিশ্বাসই ঈমান।
অটল বিশ্বাসে বলীয়ান রাসূলুল্লাহ (স) স্থির পদক্ষেপে মসজিদের পথে এগিয়ে গেলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00