📄 আলোকিত পথের সন্ধান
হিববারের চলায় আজ কোন অহংকার ছিল না। তার গমনে আজ সে দুর্বিনীত ভাব নেই। হাঁটা থেকে হিংস্রতা ঝরে গেছে। গতি শ্লথ। বিষণ্ণতায় স্নান। তিন লাফে যে রাস্তাটা পার হত, এখন তাতে সময় লাগছে প্রচুর। আস্তে আস্তে পথ হাঁটছিল সে। খুর্মা গাছের তলা দিয়ে তরমুজ ক্ষেত পেরিয়ে রাস্তায় উঠল। এক সময় এরপর ধীরে ধীরে সূর্যের দিকে তাকাল হিববার। হাত আড়াল করা সূর্যের চকিত ঝলকানিতে চোখ দুটি অন্ধ হয়ে যাবে বুঝি। সাথে সাথে মাথাটা নামিয়ে নিল সে। সকাল হতে না হতেই সূর্যটা এমন তেজে বেড়ে উঠেছে! মনের মধ্যে এমনতর কথাবার্তা আর জিজ্ঞাসারা চলাচল করছিল তার। সে ঝিমিয়ে পড়া বিমর্ষতার অকস্মাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা মনে হতেই সে প্রচুর চঞ্চলতা ফিলে পেল। ঠিক এ সূর্যের মত, ভাবল সে। সকাল হতে না হতেই হিজাজের একছত্র অধিপতি হয়ে বসেছেন! এ মাত্র আট বছর, মক্কা থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দিলাম লাঞ্ছিত করে। আর আজ? সে মক্কা তাঁর হাতের কজায়। তিনি মারলে আমরা মরব, বাঁচালে বাঁচব। আজ আমরা তাঁর দয়ার ভিখিরী।
ভিখারী? ভিক্ষা চাইব? কখনো না। অনড় প্রতিজ্ঞায় মনটাকে স্থির করতে চাইল হিববার। হিববার ইবনে আসোয়াদ। মক্কাবাসী এক মুশরিক। দেশ ছেড়ে ইরাণে যাব। সেখানে গিয়ে মানসম্মান নিয়ে বাঁচব আবার। তবুও মক্কার কুরাইশ-শত্রুর কাছে মাথা নত করব না।
দেশান্তরী হবার জন্য মরুর মাটিতে পা রাখল হিববার।
ভাবল পালিয়ে গেলেই কি বাঁচা যায়? দেহের কাল ছায়াটা দূরে সরিয়ে দিতে পারে মানুষ? ফেলে আসা অতীতটাকে ত্যাগ করতে পারে কেউ? তাঁর কলঙ্কিত কাল অতীতটা হিবারের মনে কাঁটার মত বিঁধছিল। পথ চলতে চলতে ফেলে আসা দিনগুলো জরিপ করে দেখল, শান্তি পাওয়ার মত একটি আশ্রয়ও নেই সেখানে। ফেলে আসা জীবনের সবটাই যেন রক্তাক্ত, সবটাই অভিশপ্ত। অথচ আশ্চর্য! এ বিষাক্ত আবহাওয়ায় একদিন সে উন্মাদ হয়ে ঘুরেছে। উৎসাহ ভরে কত মুসলমানের সর্বনাশ করেছে। অত্যাচারে নির্যাতনে অস্থির করে তুলেছে তাঁদের। যয়নাবের ঘটনাটি এখন সব চেয়ে আহত করছে তাকে। যয়নাবের যন্ত্রণা কাতর মুখটা যদি ভুলতে পারত সে!
বদর যুদ্ধের ঠিক এক মাস পর।
মক্কার তখন চলছে মাতম। পরাজয়ের যন্ত্রণা তখন আগুন হয়ে জ্বলছে প্রতিটি কুরাইশের পাঁজরে। এরই মধ্যে আবুল আস তার স্ত্রী যয়নাবকে মদীনায় যাবার অনুমতি দিল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা যয়নাব, আবুল আসের স্ত্রী। সতর্কতার সাথেই চলছিল সব কাজ তবুও কোন কিছুই গোপন থাকল না শেষ পর্যন্ত। হাওয়ার মত সংবাদটা ছড়িয়ে গেল মক্কার আশেপাশে।
লাফ দিয়ে উঠল কুরাইশরা, এতবড় কথা। বুকের উপর দিয়ে চরম শত্রুর মেয়ে নিরাপদে হিযরত করে যাবে মদীনায়? সাথে আরো কিছু কুরাইশ নিয়ে ছুটল হিববার। দীর্ঘ বর্শা হাতে মক্কায় উপকণ্ঠের কাফেলার গতিরোধ করে দাঁড়াল তারা। উটের পেটে সজোরে একটা খোঁচা মেরে রূঢ় গলায় চিৎকার করে উঠল হিববার, থাম। অকস্মাৎ খোঁচা খেয়ে ভীষণ জোরে লাফিয়ে উঠল সে উট। যয়নাব আসনচ্যুত হয়ে, বোঁটা ছেঁড়া পাকা ফলের মত সজোরে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে গেলেন। আসন্ন প্রসবা ছিলেন তিনি। সীমাহীন যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সেখানে, তিনি জনশূন্য মরুর মাঝে প্রসব হয়ে গেল তাঁর। দুঃসহ যন্ত্রণায় সে হাত-পা ছোড়া, ব্যথাভরা সে করুন মুখটা আজ যেন বড় ভয়ঙ্কর ভাবে তাড়া করে ফিরছে তাকে। ভাবনার কোলাহল থেকে সে মুখটাকে নির্বাসন দিতে পারলে বড়ই ভাল হত! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে আবার নীরব হয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত বিবেকের কাছে ভয়ানক ভাবে লাঞ্ছিত আর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল হিববার। তার পাপ ক্রমাগত তাকে আহত করছিল। বীভৎস একটা কাল ছায়া আতঙ্কিত ভাবে তাড়া করে ফিরছিল তাকে। স্ত্রী-পুত্র ছেড়ে অজানার পথে গিয়ে কি লাভ? এর চেয়ে তাঁর কাছেই যাই না কেন? এত মানুষকে ক্ষমা করেছেন আর আমি অধম ভিক্ষা থেকে বঞ্চিত হব? ক্ষমা পাব না তাঁর?
সর্বশেষ সিদ্ধান্তক্রমে ইরান নয়, ইয়ামান নয়, শেষ পর্যন্ত মদীনার পথেই পা বাড়াল হিববার।
গতি শ্লথ। বিষণ্ণতায় ক্লান্ত সে। মদীনার প্রবেশ মুখে যেন পা উঠছিল না তার। অনেক দ্বিধা মনে, অনেক সংশয়। ক্ষমা করবে ত ঠিক? না কি কতল? নিজের মনে অবিরামভাবে কথা বলছিল হিববার, যে পাপ করেছি- অবশ্য ক্ষমা নেই তার। তবে তিনি হিন্দাকেও ক্ষমা করেছেন। আবু জাহলের পুত্র ইকরামা- তাকেও। তা হলে কি আমি? পদ্মাপাতায় যেন শিশিরের টোপ। সংশয়ের ভীষণ দোলায় দুলছিল হিববার; ওরা ক্ষমা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু আমার উপরে কিন্তু কতলের নির্দেশ। তাহলে কি......। ইয়া রাসূলুল্লাহ!
হিববারের চোখে অশ্রুসজল। ধরা গলা। শ্রদ্ধার সম্ভ্রম স্বর বিনম্র। সাহাবা পরিবেষ্টিত হয়েছিলেন নবী (স)। অশ্রুসিক্ত স্বরে উৎকর্ণ হয়ে সকলেই এক সাথে ফিরে তাকালেন।
ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি হিববার।
সাথে সাথে গুঞ্জন উঠল চারদিক থেকে, কতল! কতল!! কোন কথা নয়, একমাত্র শাস্তি কতল। হে আল্লাহ্র রাসূল (স)! আদেশ করুন-এ মহাপাতকের গর্দান উড়িয়ে দিই।
কোন কথা না বলে শুভ্র হস্ত মুবারকটি উপরে তুললেন কেবল, অর্থাৎ থাম। কি বলতে চায়, একে বলতে দাও।
নির্জন নীরবতায় চারপাশটা ডুবে গেল আবার।
সে স্নিগ্ধ হাতে ছিল ভোরের শান্ত হাওয়া, ছিল অগাধ মমতা। আর তাতেই হিবাবারের ব্যাকুলতা বেড়ে গেল বহুগুণ। সে আকুলি বিকুলি হয়ে কাঁদতে থাকল। যেমন কখনো কখনো ভালবাসার স্পর্শে আমরা অনায়াসে অশ্রুপাত করি।
ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার সম্পর্কে যা শুনেছেন তা সত্য, সম্পূর্ণ সত্য। এ হাত দিয়ে আমি অনেক মুসলমানকে রক্তাক্ত করেছি, নির্মম নির্যাতনে অতিষ্ঠ করেছি তাঁদের। আর এ হাত দিয়েই যয়নাবকে ......
হিববার ডুকরে কেঁদে উঠল। কথা শেষ করা হল না আর। করতে পারল না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হিববার কাঁদতে থাকল।
দাঁতের বদলে দাঁত। খুনের বদলে খুন। কতলে কতল। এ নিয়মই চলে আসছিল হিজাজে। আবাহমানকাল থেকে।
তখন সকলে ভীষণ ব্যগ্রভাবে তাকিয়ে আছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। কি করবেন তিনি? বন্দী? নির্মম প্রহার? অথবা কতল?
কয়েকটি মুহর্ত মাত্র। বিস্ময়কর অবাক চাউনি মেলে সকলে দেখলেন: নবী (স) আপনার রহমতের বাহু দুটি প্রসারিত করে দিয়েছেন হিববারের দিকে। তার কলঙ্কিত হাত দুটি ধরে ধীরে ধীরে টেনে তুলছেন।
সকলের মনে হল: ঘন অন্ধকার ঠেলে ভোরের সূর্যের উঠে আসার মত একটি অন্ধকার হৃদয় যেন আলোর দিকে উঠে আসছে। আঁধার রাতের ম্রিয়মান পদ্মের নিষ্প্রভ দলগুলো সুবহি সাদিকের স্নিগ্ধ আলোর আবার চোখ মেলছে। অগাধ আলোর স্পর্শের তার বিষণ্ণ দলগুলো আবার খুলে যাচ্ছে। আবার সুরভিত হচ্ছে। আলোকিত হচ্ছে।
হিববারের চলায় আজ কোন অহংকার ছিল না। তার গমনে আজ সে দুর্বিনীত ভাব নেই। হাঁটা থেকে হিংস্রতা ঝরে গেছে। গতি শ্লথ। বিষণ্ণতায় স্নান। তিন লাফে যে রাস্তাটা পার হত, এখন তাতে সময় লাগছে প্রচুর। আস্তে আস্তে পথ হাঁটছিল সে। খুর্মা গাছের তলা দিয়ে তরমুজ ক্ষেত পেরিয়ে রাস্তায় উঠল। এক সময় এরপর ধীরে ধীরে সূর্যের দিকে তাকাল হিববার। হাত আড়াল করা সূর্যের চকিত ঝলকানিতে চোখ দুটি অন্ধ হয়ে যাবে বুঝি। সাথে সাথে মাথাটা নামিয়ে নিল সে। সকাল হতে না হতেই সূর্যটা এমন তেজে বেড়ে উঠেছে! মনের মধ্যে এমনতর কথাবার্তা আর জিজ্ঞাসারা চলাচল করছিল তার। সে ঝিমিয়ে পড়া বিমর্ষতার অকস্মাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা মনে হতেই সে প্রচুর চঞ্চলতা ফিলে পেল। ঠিক এ সূর্যের মত, ভাবল সে। সকাল হতে না হতেই হিজাজের একছত্র অধিপতি হয়ে বসেছেন! এ মাত্র আট বছর, মক্কা থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দিলাম লাঞ্ছিত করে। আর আজ? সে মক্কা তাঁর হাতের কজায়। তিনি মারলে আমরা মরব, বাঁচালে বাঁচব। আজ আমরা তাঁর দয়ার ভিখিরী।
ভিখারী? ভিক্ষা চাইব? কখনো না। অনড় প্রতিজ্ঞায় মনটাকে স্থির করতে চাইল হিববার। হিববার ইবনে আসোয়াদ। মক্কাবাসী এক মুশরিক। দেশ ছেড়ে ইরাণে যাব। সেখানে গিয়ে মানসম্মান নিয়ে বাঁচব আবার। তবুও মক্কার কুরাইশ-শত্রুর কাছে মাথা নত করব না।
দেশান্তরী হবার জন্য মরুর মাটিতে পা রাখল হিববার।
ভাবল পালিয়ে গেলেই কি বাঁচা যায়? দেহের কাল ছায়াটা দূরে সরিয়ে দিতে পারে মানুষ? ফেলে আসা অতীতটাকে ত্যাগ করতে পারে কেউ? তাঁর কলঙ্কিত কাল অতীতটা হিবারের মনে কাঁটার মত বিঁধছিল। পথ চলতে চলতে ফেলে আসা দিনগুলো জরিপ করে দেখল, শান্তি পাওয়ার মত একটি আশ্রয়ও নেই সেখানে। ফেলে আসা জীবনের সবটাই যেন রক্তাক্ত, সবটাই অভিশপ্ত। অথচ আশ্চর্য! এ বিষাক্ত আবহাওয়ায় একদিন সে উন্মাদ হয়ে ঘুরেছে। উৎসাহ ভরে কত মুসলমানের সর্বনাশ করেছে। অত্যাচারে নির্যাতনে অস্থির করে তুলেছে তাঁদের। যয়নাবের ঘটনাটি এখন সব চেয়ে আহত করছে তাকে। যয়নাবের যন্ত্রণা কাতর মুখটা যদি ভুলতে পারত সে!
বদর যুদ্ধের ঠিক এক মাস পর।
মক্কার তখন চলছে মাতম। পরাজয়ের যন্ত্রণা তখন আগুন হয়ে জ্বলছে প্রতিটি কুরাইশের পাঁজরে। এরই মধ্যে আবুল আস তার স্ত্রী যয়নাবকে মদীনায় যাবার অনুমতি দিল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা যয়নাব, আবুল আসের স্ত্রী। সতর্কতার সাথেই চলছিল সব কাজ তবুও কোন কিছুই গোপন থাকল না শেষ পর্যন্ত। হাওয়ার মত সংবাদটা ছড়িয়ে গেল মক্কার আশেপাশে।
লাফ দিয়ে উঠল কুরাইশরা, এতবড় কথা। বুকের উপর দিয়ে চরম শত্রুর মেয়ে নিরাপদে হিযরত করে যাবে মদীনায়? সাথে আরো কিছু কুরাইশ নিয়ে ছুটল হিববার। দীর্ঘ বর্শা হাতে মক্কায় উপকণ্ঠের কাফেলার গতিরোধ করে দাঁড়াল তারা। উটের পেটে সজোরে একটা খোঁচা মেরে রূঢ় গলায় চিৎকার করে উঠল হিববার, থাম। অকস্মাৎ খোঁচা খেয়ে ভীষণ জোরে লাফিয়ে উঠল সে উট। যয়নাব আসনচ্যুত হয়ে, বোঁটা ছেঁড়া পাকা ফলের মত সজোরে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে গেলেন। আসন্ন প্রসবা ছিলেন তিনি। সীমাহীন যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সেখানে, তিনি জনশূন্য মরুর মাঝে প্রসব হয়ে গেল তাঁর। দুঃসহ যন্ত্রণায় সে হাত-পা ছোড়া, ব্যথাভরা সে করুন মুখটা আজ যেন বড় ভয়ঙ্কর ভাবে তাড়া করে ফিরছে তাকে। ভাবনার কোলাহল থেকে সে মুখটাকে নির্বাসন দিতে পারলে বড়ই ভাল হত! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে আবার নীরব হয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত বিবেকের কাছে ভয়ানক ভাবে লাঞ্ছিত আর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল হিববার। তার পাপ ক্রমাগত তাকে আহত করছিল। বীভৎস একটা কাল ছায়া আতঙ্কিত ভাবে তাড়া করে ফিরছিল তাকে। স্ত্রী-পুত্র ছেড়ে অজানার পথে গিয়ে কি লাভ? এর চেয়ে তাঁর কাছেই যাই না কেন? এত মানুষকে ক্ষমা করেছেন আর আমি অধম ভিক্ষা থেকে বঞ্চিত হব? ক্ষমা পাব না তাঁর?
সর্বশেষ সিদ্ধান্তক্রমে ইরান নয়, ইয়ামান নয়, শেষ পর্যন্ত মদীনার পথেই পা বাড়াল হিববার।
গতি শ্লথ। বিষণ্ণতায় ক্লান্ত সে। মদীনার প্রবেশ মুখে যেন পা উঠছিল না তার। অনেক দ্বিধা মনে, অনেক সংশয়। ক্ষমা করবে ত ঠিক? না কি কতল? নিজের মনে অবিরামভাবে কথা বলছিল হিববার, যে পাপ করেছি- অবশ্য ক্ষমা নেই তার। তবে তিনি হিন্দাকেও ক্ষমা করেছেন। আবু জাহলের পুত্র ইকরামা- তাকেও। তা হলে কি আমি? পদ্মাপাতায় যেন শিশিরের টোপ। সংশয়ের ভীষণ দোলায় দুলছিল হিববার; ওরা ক্ষমা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু আমার উপরে কিন্তু কতলের নির্দেশ। তাহলে কি......। ইয়া রাসূলুল্লাহ!
হিববারের চোখে অশ্রুসজল। ধরা গলা। শ্রদ্ধার সম্ভ্রম স্বর বিনম্র। সাহাবা পরিবেষ্টিত হয়েছিলেন নবী (স)। অশ্রুসিক্ত স্বরে উৎকর্ণ হয়ে সকলেই এক সাথে ফিরে তাকালেন।
ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি হিববার।
সাথে সাথে গুঞ্জন উঠল চারদিক থেকে, কতল! কতল!! কোন কথা নয়, একমাত্র শাস্তি কতল। হে আল্লাহ্র রাসূল (স)! আদেশ করুন-এ মহাপাতকের গর্দান উড়িয়ে দিই।
কোন কথা না বলে শুভ্র হস্ত মুবারকটি উপরে তুললেন কেবল, অর্থাৎ থাম। কি বলতে চায়, একে বলতে দাও।
নির্জন নীরবতায় চারপাশটা ডুবে গেল আবার।
সে স্নিগ্ধ হাতে ছিল ভোরের শান্ত হাওয়া, ছিল অগাধ মমতা। আর তাতেই হিবাবারের ব্যাকুলতা বেড়ে গেল বহুগুণ। সে আকুলি বিকুলি হয়ে কাঁদতে থাকল। যেমন কখনো কখনো ভালবাসার স্পর্শে আমরা অনায়াসে অশ্রুপাত করি।
ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার সম্পর্কে যা শুনেছেন তা সত্য, সম্পূর্ণ সত্য। এ হাত দিয়ে আমি অনেক মুসলমানকে রক্তাক্ত করেছি, নির্মম নির্যাতনে অতিষ্ঠ করেছি তাঁদের। আর এ হাত দিয়েই যয়নাবকে ......
হিববার ডুকরে কেঁদে উঠল। কথা শেষ করা হল না আর। করতে পারল না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হিববার কাঁদতে থাকল।
দাঁতের বদলে দাঁত। খুনের বদলে খুন। কতলে কতল। এ নিয়মই চলে আসছিল হিজাজে। আবাহমানকাল থেকে।
তখন সকলে ভীষণ ব্যগ্রভাবে তাকিয়ে আছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। কি করবেন তিনি? বন্দী? নির্মম প্রহার? অথবা কতল?
কয়েকটি মুহর্ত মাত্র। বিস্ময়কর অবাক চাউনি মেলে সকলে দেখলেন: নবী (স) আপনার রহমতের বাহু দুটি প্রসারিত করে দিয়েছেন হিববারের দিকে। তার কলঙ্কিত হাত দুটি ধরে ধীরে ধীরে টেনে তুলছেন।
সকলের মনে হল: ঘন অন্ধকার ঠেলে ভোরের সূর্যের উঠে আসার মত একটি অন্ধকার হৃদয় যেন আলোর দিকে উঠে আসছে। আঁধার রাতের ম্রিয়মান পদ্মের নিষ্প্রভ দলগুলো সুবহি সাদিকের স্নিগ্ধ আলোর আবার চোখ মেলছে। অগাধ আলোর স্পর্শের তার বিষণ্ণ দলগুলো আবার খুলে যাচ্ছে। আবার সুরভিত হচ্ছে। আলোকিত হচ্ছে।
📄 মানবতার অঙ্কুর
মদীনার ধুলমাটিতে তখনো দলবদ্ধ নির্জন আঁধারেরা নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। আকাশে তারাগুলো তেমনি উজ্জল। খুর্মার শাখা দুলিয়ে রাত্রির একলা হাওয়া তেমনি বয়ে যায় ঝির ঝির করে। কেবল দু একটা পাখির ওড়া-উড়িতে অনুমান করা যায় রাত শেষ হয়ে আসছে। আর কিছু পরে, আঁধারের বুকে দোল জাগিয়ে, ছড়িয়ে পড়বে বেলালের আযানের স্বর। অন্ধকার বিদীর্ণ করে মধুর প্রবাহ ছুটবে চারদিকে। তখন সারা মদীনার চকিত পরশে জেগে উঠবে। এর কিছু পরেই জামাত শুরু হয়ে যাবে মসজিদ নববীতে, সামনে ইমাম-রাসূলুল্লাহ (স)।
বেলালের কণ্ঠস্বরে জেগে উঠছিলেন সকলেই।
ইয়া সাবাহাহ্! ইয়া সাবাহাহ্!! ইয়া সাবাহাহ্!!! হায় সকাল বেলার বিপদ! হায় সকাল বেলার বিপদ!! হায় সকাল বেলার বিপদ!!!
এত আযান নয়। দূর থেকে, মদীনার প্রান্তরের ওপার থেকে করুন হয়ে ভেসে আসছে এ স্বর। এ বিপদজ্ঞাপক ধ্বনি! একমাত্র আক্রমণোদ্যত কোন শত্রুদলকে দেখলে এ শব্দে সকলকে সর্তক করা হয়। আর এ শব্দেই শত্রুর বিরুদ্ধে সমবেত অস্ত্রধারণের আহ্বান জানানো হয়।
তা হলে আবার কি কোন.......
দুশ্চিন্তার আর দুর্ভাবনা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চারপাশে সমবেত হলেন সকলেই। কুরাইশরা তখন দুর্বার। ডাল নাড়া দিয়ে পাকা ফল বৃত্তচ্যুত করার মত মুসলমানদের সমূলে উৎখাত করতে চায় এরা। মদীনার উপকণ্ঠের মুশরিক ও ইহুদীরা দুরভিসন্ধিতে উন্মত্ত। সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে। সে ভয়স্কর পরিস্থিতিতে অন্ধকারের বুকে দোল খেয়ে খেয়ে ভেসে এল এ মারাত্মক পূর্বাভাস। সকলেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর চারপাশে গভীর উৎকণ্ঠায় নিশ্চুপ। অসম্ভব উদ্বেগে সে মুবারক মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সকলেই। নামায শেষ করে রাসূল (স) বললেন, সজ্জিত হও চল জলদি। দেখ কে আহ্বান করছে এমন করে।
আঁধার মাথায় নিয়েই পথে নেমেছিলেন সালামা (রা)। সালামা ইবনে আকওয়া (রা)। ফযরের আযানের বেশ দেরি ছিল তখন। বিশেষ পযোজনেই মদীনার উপকণ্ঠের এদিকে এসেছিলেন তিনি। বিখ্যাত তীরন্দাজ এ সাহাবী আঁধার ঠেলে ঠেলে আনমনেই পথ হাঁটছিলেন। হাঁফাতে হাঁফাতে প্রান্তরের ওপার থেকে ছুটে এলেন এক ক্রীতদাস। আবদুর রহমান ইবনে আওফের বিশ্বস্ত সে ক্রীতদাস ক্রন্দাকুল কণ্ঠে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে!
সর্বনাশ! অবাক গলায় শুধালেন সালামা।
হ্যাঁ সর্বনাশ! রাসূল (স)-এর দুধেল উটগুলো চরাচ্ছিলাম আমি, হঠাৎ একদল লুটেরা রাতের আঁধারে এসে লুট করে নিয়ে গেল সেগুলো।
ব্যাকুল কণ্ঠে সালামা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, কতক্ষণ? ক্রীতদাস বলল এ মাত্র। কাউকে চিনতে পেরেছ তাদের? হাঁ, তারা সকলেই গাতফান গোত্রের লোক।
আর মুহূর্তকাল সময় নষ্ট করলেন না সালামা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর উষ্ট্রী লুঠ! তাঁর দেহে তখন আগুন জলছে। সারা শরীরে জেগে উঠেছে প্রাচীন বেদুইন রক্ত। নিকটবর্তী টিলার শীর্ষে উঠে যতটা সম্ভব উচ্চস্বরে মদীনার আকাশ বাতাসে ছড়িয়ে দিলেন বিপদ জ্ঞাপক সংকেত ধ্বনি। এরপর একাই ঝাঁপিয়ে পড়লেন অজানা ভয়ঙ্কর সে বিপদের মধ্যে। যু-কারাদায় এসে সন্ধান পেলেন শত্রদলের। উটগুলোকে পানি পান করাচ্ছিল এরা। এরপর শুরু হল সে স্মরণীয় একক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। দলবদ্ধ সশস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে অকুতোভয় এক জিন্দাদিল মুজাহিদের জিহাদ। মুহূর্তেরও কম সময়, বজ্রঘাতের মত অকস্মাৎ সুতীক্ষ্ণ তীরের ফলাগুলো সমূহ দুশমনের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো ফালাফালা করে দিল। বিখ্যাত তীরন্দাজের এ বজ্রশেলগুলো থেকে কোন রকমেই আত্মরক্ষা করল পারল না এরা। তীর নিক্ষেপের সাথে সাথে চীৎকার করে উঠছিলেন সালামা (স) : "আমি আকওয়ার সুযোগ্য পুত্র আর আজকের দিনটি হল নিকৃষ্ট লোকদের নিশ্চিত ধ্বংসের দিন।"
অবিরাম তীর বর্ষণ করেই চললেন সালামা (রা)।
নিরুপায় গাতফানীরা পরাজিত কুকুরের মত কোনক্রমে পালিয়ে বাঁচল। পিছনে ফেলে গেল তাদের লালসা-কলুষিত দ্রব্যসামগ্রী, লুণ্ঠিত উটগুলো আর পরিধানের ত্রিশটি চাদর।
ক্লান্ত সালামা (রা) বিশ্রাম নিচ্ছেন। সেখানে এসে দাঁড়ালেন লোকজন সহ রাসূলুল্লাহ (স)। সালাম দিয়ে আনুপূর্বিক ঘটনা বিবৃতির পর সালামা (রা) আরয করলেন: পিপাসার্ত ছিল শয়তানগুলো পানি খাবারও সুযোগ দিই নি এদের। একটু থেমে বললেন, এরাই বার বার আমাদের চারণভূমিতে এসে আতংক ছড়াচ্ছে, লুটপাট করছে। মনে হয় এখনো বেশি দূর যেতে পারে নি, কেননা কম বেশি সকলেই আহত। সবাই মিলে পিছু ধাওয়া করে এখুনি এদের ধরে আনি, এরপর হাতকাটা বা কতল যে শাস্তি আপনি দেবেন।
ঠিক কথা। মাথা নাড়লেন অন্যান্য সাহাবীরাও। ঋণের শেষ, আগুনের শেষ আর শত্রুর শেষ রাখতে নেই। ধরে এনে কতল করে উচিত শিক্ষা দেয়াই উচিত। আতংক ছড়াবার জন্য আর যে সব হাত চোরাগোপ্তা উদ্যত হয়ে আছে; আপনা আপনি ভঙে গুঁড়িয়ে যাবে সেগুলো। আবার মস্তক আন্দোলিত করলেন সাহাবীগণ, আন্দোলিত করে নীরবে জোরাল সমর্থন জানালেন সালামার।
কিন্তু এরপরই সকলে নীরবে একযোগে তাকালেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। হাতকাটা বা কতল এটা তাঁরই নির্দেশ। তাঁরই ফরমান। এখন কি করবেন তিনি? ধরে এনে হাত কাটবেন না কতল? অথবা আরো কঠোর আরো নির্মম কিছু? অসম্ভব ব্যগ্রতায় সকলেই তাঁর নির্দেশ শোনার জন্য উৎকর্ণ।
হঠাৎ এক সময় সালমা (রা)-এর দিকে মুখ তুললেন রাসূলুল্লাহ (স)। অত্যন্ত প্রসন্ন সে মুখ। স্বচ্ছ সে দৃষ্টি পবিত্র আর পবিত্র। তাঁর মাসুম দৃষ্টিপাতে এক অপার্থিব ব্যঞ্জনা! কণ্ঠে যেন আর এক অন্য লোকের অস্তিত্ব। প্রিয় সাহাবীর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, সালামা! তুমি বিজয়ী। আল্লাহ্ তোমাকে বিজয়দান করেছেন। উটগুলোও ফিরে পেয়েছ। গনিমত হিসেবে পেয়েছ ত্রিশটি চাদর। সুতরাং-
একটু থামলেন রাসূলুল্লাহ (স)। চারপাশে জান্নাতী সৌরভ ঢেলে বললেন এরপর, সুতরাং এখন তাদের প্রতি বিনম্র হও।
অশ্রুত এ স্বর। হিজাজের মাটিতে নতুন। ঊষর মরুতে এমনতর বীজ ছড়ায় নি কেউ। এমতর বীজ এখানে অঙ্কুরিত হয়নি কোন দিন।
মদীনার ধুলমাটিতে তখনো দলবদ্ধ নির্জন আঁধারেরা নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। আকাশে তারাগুলো তেমনি উজ্জল। খুর্মার শাখা দুলিয়ে রাত্রির একলা হাওয়া তেমনি বয়ে যায় ঝির ঝির করে। কেবল দু একটা পাখির ওড়া-উড়িতে অনুমান করা যায় রাত শেষ হয়ে আসছে। আর কিছু পরে, আঁধারের বুকে দোল জাগিয়ে, ছড়িয়ে পড়বে বেলালের আযানের স্বর। অন্ধকার বিদীর্ণ করে মধুর প্রবাহ ছুটবে চারদিকে। তখন সারা মদীনার চকিত পরশে জেগে উঠবে। এর কিছু পরেই জামাত শুরু হয়ে যাবে মসজিদ নববীতে, সামনে ইমাম-রাসূলুল্লাহ (স)।
বেলালের কণ্ঠস্বরে জেগে উঠছিলেন সকলেই।
ইয়া সাবাহাহ্! ইয়া সাবাহাহ্!! ইয়া সাবাহাহ্!!! হায় সকাল বেলার বিপদ! হায় সকাল বেলার বিপদ!! হায় সকাল বেলার বিপদ!!!
এত আযান নয়। দূর থেকে, মদীনার প্রান্তরের ওপার থেকে করুন হয়ে ভেসে আসছে এ স্বর। এ বিপদজ্ঞাপক ধ্বনি! একমাত্র আক্রমণোদ্যত কোন শত্রুদলকে দেখলে এ শব্দে সকলকে সর্তক করা হয়। আর এ শব্দেই শত্রুর বিরুদ্ধে সমবেত অস্ত্রধারণের আহ্বান জানানো হয়।
তা হলে আবার কি কোন.......
দুশ্চিন্তার আর দুর্ভাবনা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চারপাশে সমবেত হলেন সকলেই। কুরাইশরা তখন দুর্বার। ডাল নাড়া দিয়ে পাকা ফল বৃত্তচ্যুত করার মত মুসলমানদের সমূলে উৎখাত করতে চায় এরা। মদীনার উপকণ্ঠের মুশরিক ও ইহুদীরা দুরভিসন্ধিতে উন্মত্ত। সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে। সে ভয়স্কর পরিস্থিতিতে অন্ধকারের বুকে দোল খেয়ে খেয়ে ভেসে এল এ মারাত্মক পূর্বাভাস। সকলেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর চারপাশে গভীর উৎকণ্ঠায় নিশ্চুপ। অসম্ভব উদ্বেগে সে মুবারক মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সকলেই। নামায শেষ করে রাসূল (স) বললেন, সজ্জিত হও চল জলদি। দেখ কে আহ্বান করছে এমন করে।
আঁধার মাথায় নিয়েই পথে নেমেছিলেন সালামা (রা)। সালামা ইবনে আকওয়া (রা)। ফযরের আযানের বেশ দেরি ছিল তখন। বিশেষ পযোজনেই মদীনার উপকণ্ঠের এদিকে এসেছিলেন তিনি। বিখ্যাত তীরন্দাজ এ সাহাবী আঁধার ঠেলে ঠেলে আনমনেই পথ হাঁটছিলেন। হাঁফাতে হাঁফাতে প্রান্তরের ওপার থেকে ছুটে এলেন এক ক্রীতদাস। আবদুর রহমান ইবনে আওফের বিশ্বস্ত সে ক্রীতদাস ক্রন্দাকুল কণ্ঠে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে!
সর্বনাশ! অবাক গলায় শুধালেন সালামা।
হ্যাঁ সর্বনাশ! রাসূল (স)-এর দুধেল উটগুলো চরাচ্ছিলাম আমি, হঠাৎ একদল লুটেরা রাতের আঁধারে এসে লুট করে নিয়ে গেল সেগুলো।
ব্যাকুল কণ্ঠে সালামা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, কতক্ষণ? ক্রীতদাস বলল এ মাত্র। কাউকে চিনতে পেরেছ তাদের? হাঁ, তারা সকলেই গাতফান গোত্রের লোক।
আর মুহূর্তকাল সময় নষ্ট করলেন না সালামা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর উষ্ট্রী লুঠ! তাঁর দেহে তখন আগুন জলছে। সারা শরীরে জেগে উঠেছে প্রাচীন বেদুইন রক্ত। নিকটবর্তী টিলার শীর্ষে উঠে যতটা সম্ভব উচ্চস্বরে মদীনার আকাশ বাতাসে ছড়িয়ে দিলেন বিপদ জ্ঞাপক সংকেত ধ্বনি। এরপর একাই ঝাঁপিয়ে পড়লেন অজানা ভয়ঙ্কর সে বিপদের মধ্যে। যু-কারাদায় এসে সন্ধান পেলেন শত্রদলের। উটগুলোকে পানি পান করাচ্ছিল এরা। এরপর শুরু হল সে স্মরণীয় একক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। দলবদ্ধ সশস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে অকুতোভয় এক জিন্দাদিল মুজাহিদের জিহাদ। মুহূর্তেরও কম সময়, বজ্রঘাতের মত অকস্মাৎ সুতীক্ষ্ণ তীরের ফলাগুলো সমূহ দুশমনের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো ফালাফালা করে দিল। বিখ্যাত তীরন্দাজের এ বজ্রশেলগুলো থেকে কোন রকমেই আত্মরক্ষা করল পারল না এরা। তীর নিক্ষেপের সাথে সাথে চীৎকার করে উঠছিলেন সালামা (স) : "আমি আকওয়ার সুযোগ্য পুত্র আর আজকের দিনটি হল নিকৃষ্ট লোকদের নিশ্চিত ধ্বংসের দিন।"
অবিরাম তীর বর্ষণ করেই চললেন সালামা (রা)।
নিরুপায় গাতফানীরা পরাজিত কুকুরের মত কোনক্রমে পালিয়ে বাঁচল। পিছনে ফেলে গেল তাদের লালসা-কলুষিত দ্রব্যসামগ্রী, লুণ্ঠিত উটগুলো আর পরিধানের ত্রিশটি চাদর।
ক্লান্ত সালামা (রা) বিশ্রাম নিচ্ছেন। সেখানে এসে দাঁড়ালেন লোকজন সহ রাসূলুল্লাহ (স)। সালাম দিয়ে আনুপূর্বিক ঘটনা বিবৃতির পর সালামা (রা) আরয করলেন: পিপাসার্ত ছিল শয়তানগুলো পানি খাবারও সুযোগ দিই নি এদের। একটু থেমে বললেন, এরাই বার বার আমাদের চারণভূমিতে এসে আতংক ছড়াচ্ছে, লুটপাট করছে। মনে হয় এখনো বেশি দূর যেতে পারে নি, কেননা কম বেশি সকলেই আহত। সবাই মিলে পিছু ধাওয়া করে এখুনি এদের ধরে আনি, এরপর হাতকাটা বা কতল যে শাস্তি আপনি দেবেন।
ঠিক কথা। মাথা নাড়লেন অন্যান্য সাহাবীরাও। ঋণের শেষ, আগুনের শেষ আর শত্রুর শেষ রাখতে নেই। ধরে এনে কতল করে উচিত শিক্ষা দেয়াই উচিত। আতংক ছড়াবার জন্য আর যে সব হাত চোরাগোপ্তা উদ্যত হয়ে আছে; আপনা আপনি ভঙে গুঁড়িয়ে যাবে সেগুলো। আবার মস্তক আন্দোলিত করলেন সাহাবীগণ, আন্দোলিত করে নীরবে জোরাল সমর্থন জানালেন সালামার।
কিন্তু এরপরই সকলে নীরবে একযোগে তাকালেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। হাতকাটা বা কতল এটা তাঁরই নির্দেশ। তাঁরই ফরমান। এখন কি করবেন তিনি? ধরে এনে হাত কাটবেন না কতল? অথবা আরো কঠোর আরো নির্মম কিছু? অসম্ভব ব্যগ্রতায় সকলেই তাঁর নির্দেশ শোনার জন্য উৎকর্ণ।
হঠাৎ এক সময় সালমা (রা)-এর দিকে মুখ তুললেন রাসূলুল্লাহ (স)। অত্যন্ত প্রসন্ন সে মুখ। স্বচ্ছ সে দৃষ্টি পবিত্র আর পবিত্র। তাঁর মাসুম দৃষ্টিপাতে এক অপার্থিব ব্যঞ্জনা! কণ্ঠে যেন আর এক অন্য লোকের অস্তিত্ব। প্রিয় সাহাবীর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, সালামা! তুমি বিজয়ী। আল্লাহ্ তোমাকে বিজয়দান করেছেন। উটগুলোও ফিরে পেয়েছ। গনিমত হিসেবে পেয়েছ ত্রিশটি চাদর। সুতরাং-
একটু থামলেন রাসূলুল্লাহ (স)। চারপাশে জান্নাতী সৌরভ ঢেলে বললেন এরপর, সুতরাং এখন তাদের প্রতি বিনম্র হও।
অশ্রুত এ স্বর। হিজাজের মাটিতে নতুন। ঊষর মরুতে এমনতর বীজ ছড়ায় নি কেউ। এমতর বীজ এখানে অঙ্কুরিত হয়নি কোন দিন।
📄 বিনম্র বিনয়
সাধারণত ইহুদীরা যে গলায় কথাবার্তা বলে এটা সে স্বর নয়, এ কণ্ঠ কেমন যেন বেদনাম্নান, কেমন যেন রোদনভরা। মসজিদ নববীর সামনে এসে বিনীত কণ্ঠে ডাক দিল, হে আবুল কাসেম!
রাসূলুল্লাহ (স)-কে আহ্বান করছে এক ইহুদী। তখন তিনি বসে বসে কথা বলছিলেন সাহাবীদের সাথে। সাড়া দিলেন সেখানে থেকেই। আসার অনুমতি দিলেন তাকে। ইহুদীর মুখটা লাল। কিছুটা ব্যথা কিছুটা অভিমান কিছুটা অভিযোগ যেন স্তব্ধ হয়ে আছে সে মুখে। নিকটস্থ হয়ে মুখ খুলল সে, হে আবুল কাসেম, আমি বিচারপ্রার্থী। ইনসাফ চাই।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে রাসূলুল্লাহ (স) তাকালেন তার দিকে।
স্বরে কিছুটা রূঢ়তা ঝরে পড়ল এবার। কিছুটা উচ্চ গলায় ইহুদী বলল, আপনার এক সাহাবী মুখে ঘুষি মেরেছে আমার।
রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞেস করলন, সে কে?
এক আনসার।
ডেকে আন তাকে।
নির্দেশ সাথে নিয়ে চলে গেল ইহুদী। রাসূলুল্লাহ (স) আবার মগ্ন হয়ে গেল কথাবার্তায়।
ভয়ানক একটা সোর গোল আর চিৎকার সাথে নিয়ে পাক দরবারে এসে থামল দুজন। কিছু পরেই। তখনো দুজনের কেশর ফোলা, সমান হিংস্র দুজনে এবং দুজনেই গর্জনক্ষুব্ধ। ঝড় থামে নি, ঝাপটা চলে গেছে কেবল। আর তাতেই ডাল পালা ভেঙেছে, প্রকৃতি বিপর্যয়। মুখ ফুলে উঠেছে ইহুদীর। প্রকৃতি দেখে বোঝা যায় ভাঙনমুখী তুফান আসন্ন।
স্থির কণ্ঠে আনাসরকে জিজ্ঞেস করলেন রাসূলুল্লাহ (স) একে মেরেছ- এ ইহুদীকে?
হে আল্লাহ্র রাসূল (স)! প্রায় সাথে সাথেই জবাব দিলেন সে আনাসর, হ্যাঁ মেরেছি। এমন কথা আবার বললে আবার মারব।
কি এমন অপরাধের কথা বলেছে সে? এক সাহাবী জানতে চাইলেন রাসূলুল্লাহ (স) উৎকর্ণ হয়ে শুনছিলেন সকলের কথাবার্তা।
আনাসার বলল, একটা বিষয় নিয়ে বাজারে ওর সাথে তর্ক হবার সময় আমি বললামঃ "আমার জীবন তাঁর নিয়ন্ত্রণে যিনি মুহাম্মদ (স)-কে নিখিল বিশ্বে মনোনীত ও মর্যাদাসম্পন্ন করেছেন।" এ কথা শুনে ইহুদী ক্ষেপে গিয়ে নবী (স)-কে হেয় করে বলতে শুরু করল, "তাঁর শপথ যিনি মুসাকে সারা বিশ্বে মনোনীত করেছেন ও বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।" এদের এত বড় দুঃসাহস! মদীনায় বাস করে আমাদের সামনে রাসূল (স)-কে ছোট করতে চায়, মূসার আসন উপরে তুলে রাসূলুল্লাহ (স)-কে অসম্মান করতে চায়!
ইহুদীর এমনতর মন্তব্যে সমবেত সাহাবীদের অনেকেই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। সত্যিই দিনে দিনে ইহুদীগুলো বড় বাড়ছে। এখন একটা বড় মাপের শিক্ষা দেয়ার সময় এসেছে। সকলের দেহে আদিম রক্ত জেগে উঠছিল ক্রমশ। তাঁরা অস্থির হয়ে উঠছিলেন।
একেবারে মগ্ন হয়ে এসব কথাবার্তা শুনছিলেন নবী (স)। হঠাৎ তিনি আনসারের দিকে চোখ তুলে তাকালেন। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ধীর স্থির কণ্ঠে বললেন, তোমরা এমন কথা বলবে না।
ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! অভিমানে ভেঙে পড়েন সে আনসার। ওরা আপনাকে 'মুজাম্মাম' বলে গালিগালাজ করে, 'আচ্ছামু আলাইকা' বলে অভিশম্পাত দেয় আবার এখন সুকৌশলে হেয় করার চেষ্টা করছে। এসব দেখেও নিশ্চুপ থাকব আমরা?
হ্যাঁ থাকবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-কে বড় করে কিছুটা বাহবা পেতে চেয়েছিলেন যে সাহাবী তিনি এখন অবাক! এ কি বলছেন নবী (স)? নিজকে অনায়াসে মূসা (আ)-এর কাছে বিকিয়ে দিচ্ছেন তিনি। একবার তাঁর মনে হল রাসূলুল্লাহ (স) সত্যি-সত্যিই মানুষ? না কি অতিমানব?
কিন্তু এ সাহাবীর বিস্মিত হবার অনেক কিছু বাকি ছিল তখনো। আস্তে আস্তে তিনি সে বিস্ময়ের মুখমুখী হলেন। বহুক্ষণ নীরব থাকার পর জবান মুবারক থেকে এর পর উচ্চারিত হল সে আশ্চর্য বাণী, সে অলৌকিক স্বর: আমাকে কোন নবীর উপর প্রাধান্য দেবে না।
অর্থাৎ- আমি ছোটও নই, বড়ও নই। আমি যা আমি তাই।
অন্যকে ছোট করে আমাকে বড় বল না। অন্যকে ছোট ভাবার অর্থই হচ্ছে অহমিকাকে প্রশ্রয় দেয়া। অহমিকা থেকেই অহংকার। আর সকল অহংকারই হারাম।
তা ছাড়া- কে ছোট কে বড় সে বিচারের ভার সর্বজ্ঞ আল্লাহ্। অন্ধ হয়ে চাঁদের সৌন্দর্য বর্ণনা কি সঙ্গত? যা তুমি জান না সে কথা কেন বল?
সাধারণত ইহুদীরা যে গলায় কথাবার্তা বলে এটা সে স্বর নয়, এ কণ্ঠ কেমন যেন বেদনাম্নান, কেমন যেন রোদনভরা। মসজিদ নববীর সামনে এসে বিনীত কণ্ঠে ডাক দিল, হে আবুল কাসেম!
রাসূলুল্লাহ (স)-কে আহ্বান করছে এক ইহুদী। তখন তিনি বসে বসে কথা বলছিলেন সাহাবীদের সাথে। সাড়া দিলেন সেখানে থেকেই। আসার অনুমতি দিলেন তাকে। ইহুদীর মুখটা লাল। কিছুটা ব্যথা কিছুটা অভিমান কিছুটা অভিযোগ যেন স্তব্ধ হয়ে আছে সে মুখে। নিকটস্থ হয়ে মুখ খুলল সে, হে আবুল কাসেম, আমি বিচারপ্রার্থী। ইনসাফ চাই।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে রাসূলুল্লাহ (স) তাকালেন তার দিকে।
স্বরে কিছুটা রূঢ়তা ঝরে পড়ল এবার। কিছুটা উচ্চ গলায় ইহুদী বলল, আপনার এক সাহাবী মুখে ঘুষি মেরেছে আমার।
রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞেস করলন, সে কে?
এক আনসার।
ডেকে আন তাকে।
নির্দেশ সাথে নিয়ে চলে গেল ইহুদী। রাসূলুল্লাহ (স) আবার মগ্ন হয়ে গেল কথাবার্তায়।
ভয়ানক একটা সোর গোল আর চিৎকার সাথে নিয়ে পাক দরবারে এসে থামল দুজন। কিছু পরেই। তখনো দুজনের কেশর ফোলা, সমান হিংস্র দুজনে এবং দুজনেই গর্জনক্ষুব্ধ। ঝড় থামে নি, ঝাপটা চলে গেছে কেবল। আর তাতেই ডাল পালা ভেঙেছে, প্রকৃতি বিপর্যয়। মুখ ফুলে উঠেছে ইহুদীর। প্রকৃতি দেখে বোঝা যায় ভাঙনমুখী তুফান আসন্ন।
স্থির কণ্ঠে আনাসরকে জিজ্ঞেস করলেন রাসূলুল্লাহ (স) একে মেরেছ- এ ইহুদীকে?
হে আল্লাহ্র রাসূল (স)! প্রায় সাথে সাথেই জবাব দিলেন সে আনাসর, হ্যাঁ মেরেছি। এমন কথা আবার বললে আবার মারব।
কি এমন অপরাধের কথা বলেছে সে? এক সাহাবী জানতে চাইলেন রাসূলুল্লাহ (স) উৎকর্ণ হয়ে শুনছিলেন সকলের কথাবার্তা।
আনাসার বলল, একটা বিষয় নিয়ে বাজারে ওর সাথে তর্ক হবার সময় আমি বললামঃ "আমার জীবন তাঁর নিয়ন্ত্রণে যিনি মুহাম্মদ (স)-কে নিখিল বিশ্বে মনোনীত ও মর্যাদাসম্পন্ন করেছেন।" এ কথা শুনে ইহুদী ক্ষেপে গিয়ে নবী (স)-কে হেয় করে বলতে শুরু করল, "তাঁর শপথ যিনি মুসাকে সারা বিশ্বে মনোনীত করেছেন ও বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।" এদের এত বড় দুঃসাহস! মদীনায় বাস করে আমাদের সামনে রাসূল (স)-কে ছোট করতে চায়, মূসার আসন উপরে তুলে রাসূলুল্লাহ (স)-কে অসম্মান করতে চায়!
ইহুদীর এমনতর মন্তব্যে সমবেত সাহাবীদের অনেকেই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। সত্যিই দিনে দিনে ইহুদীগুলো বড় বাড়ছে। এখন একটা বড় মাপের শিক্ষা দেয়ার সময় এসেছে। সকলের দেহে আদিম রক্ত জেগে উঠছিল ক্রমশ। তাঁরা অস্থির হয়ে উঠছিলেন।
একেবারে মগ্ন হয়ে এসব কথাবার্তা শুনছিলেন নবী (স)। হঠাৎ তিনি আনসারের দিকে চোখ তুলে তাকালেন। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ধীর স্থির কণ্ঠে বললেন, তোমরা এমন কথা বলবে না।
ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! অভিমানে ভেঙে পড়েন সে আনসার। ওরা আপনাকে 'মুজাম্মাম' বলে গালিগালাজ করে, 'আচ্ছামু আলাইকা' বলে অভিশম্পাত দেয় আবার এখন সুকৌশলে হেয় করার চেষ্টা করছে। এসব দেখেও নিশ্চুপ থাকব আমরা?
হ্যাঁ থাকবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-কে বড় করে কিছুটা বাহবা পেতে চেয়েছিলেন যে সাহাবী তিনি এখন অবাক! এ কি বলছেন নবী (স)? নিজকে অনায়াসে মূসা (আ)-এর কাছে বিকিয়ে দিচ্ছেন তিনি। একবার তাঁর মনে হল রাসূলুল্লাহ (স) সত্যি-সত্যিই মানুষ? না কি অতিমানব?
কিন্তু এ সাহাবীর বিস্মিত হবার অনেক কিছু বাকি ছিল তখনো। আস্তে আস্তে তিনি সে বিস্ময়ের মুখমুখী হলেন। বহুক্ষণ নীরব থাকার পর জবান মুবারক থেকে এর পর উচ্চারিত হল সে আশ্চর্য বাণী, সে অলৌকিক স্বর: আমাকে কোন নবীর উপর প্রাধান্য দেবে না।
অর্থাৎ- আমি ছোটও নই, বড়ও নই। আমি যা আমি তাই।
অন্যকে ছোট করে আমাকে বড় বল না। অন্যকে ছোট ভাবার অর্থই হচ্ছে অহমিকাকে প্রশ্রয় দেয়া। অহমিকা থেকেই অহংকার। আর সকল অহংকারই হারাম।
তা ছাড়া- কে ছোট কে বড় সে বিচারের ভার সর্বজ্ঞ আল্লাহ্। অন্ধ হয়ে চাঁদের সৌন্দর্য বর্ণনা কি সঙ্গত? যা তুমি জান না সে কথা কেন বল?
📄 মানবতার ভাষা
তার কর্কশ গলায় এত রূঢ়তা ছিল যে মুহূর্তে সে পবিত্র পরিবেশ পাল্টে গেল সম্পূর্ণ। আলোকিত মধ্যাহ্নে অকস্মাৎ নেমে এল রাতের অন্ধকার। সীমাহীন ক্রোধে অনবরত কাঁপছিল সে ইহুদী। আর কেবলই চিৎকার করছিল। তার মুখে ছিল অশ্রাব্য ভাষা। সে ভাষা কটু। সে ভাষা অশ্লীল। এমন অশালীন, যে শুনবে রক্ত গরম হয়ে উঠবে তার।
সাহাবীদের মধ্যে বসেছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। বসে বসে দ্বীনের কথা আলোচনা করছিলেন। আর সে যালিম এমন পবিত্র মানুষটি প্রতি এসব ইতর ভাষা প্রয়োগ করছিল। অবিরাম করেই যাচ্ছিল। গরম কড়াইতে ফুটন্ত পানি যেমন লাফায়, চিৎকারের সাথে সাথে তেমনি লাফাচ্ছিল সে। এমনি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে ইহুদী, এমনি ক্রুদ্ধ। অথচ এতটা বাড়াবাড়ি করার কোন সঙ্গত কারণ ছিল না।
এ লোকটির কাছে থেকে একটি বাচ্চা উট ধার নিয়েছিলেন রাসূল (স)। বিশেষ প্রয়োজন পড়েছিল তাই। হয়তো কাউকে দেবেন। কোন ইয়াতীমকে, কোন আতুরকে। আর সে ঋণের তাগাদায় এসে এত কাণ্ড করে বসল লোকটা। একেবারে মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ভীষণ রকম কঠোর হয়ে উঠল সে। তার ব্যবহার এমনই উত্তেজক ছিল যে এর ক্রমাগত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সমবেত সাহাবীগণও ধীরে ধীরে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন এক সময় এবং অবশেষে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন তাঁরাও। রাসূল (স)-এর প্রতি এমন আচরণকে তাঁরা কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তৎপর হলেন সকলেই। এমন কি কয়েকজন সাহাবী উদ্যত হলেন তাকে হত্যা করার জন্য। যে অপরাধ সে করেছে কতলই এর একমাত্র শাস্তি, এছাড়া দ্বিতীয় কোন প্রতিশোধ খুঁজে পেলেন না তাঁরা।
হত্যায় উদ্যত সাহাবীদের দিকে তাকালেন রাসূল (স)। ক্ষণিক। পরমুহূর্তেই তাঁর পবিত্র দুটি বাহু উপরে তুলে থামিয়ে দিলেন। তাঁদের হত্যামুখী হাতগুলো থেমে গেল। কিন্তু অসম্ভব উত্তেজনায় তাঁদের চোখ মুখ থর থর করছিল। সীমাহীন ক্রোধ জমেছিল সেখানে। তাঁরা সকলে একযোগে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকালেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাকিয়েছিলেন তাঁদের দিকে। এরপর যেন অসম্ভব ব্যথিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন : কি আশ্চর্য! তোমরাও ধৈর্যহারা? তোমরা কি জাননা পাওনাদারের কড়া কথা বলার হক আছে। সুতরাং লোকটিকে এমন কথা বলতে দাও।
সমবেত সকল সাহাবী যেন অকস্মাৎ চাবুকের আঘাতে শিহরিত হয়ে উঠলেন। চমকিত হল। এ কি কথা বললেন রাসূল (স)? সাহাবীগণ অপলকে তাকিয়ে রইলেন সে পবিত্র মুখের দিকে। এমন বিপরীত বিবেকের কথা শোনার জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না।
অবাক চাউনি মেলে তাকিয়ে আছে সে ইহুদীও। সে কঠোরভাষী পাওনাদার! রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংযত মহান ব্যবহার তার অন্তরের গভীরকে স্পর্শ করে গেল। সে নির্বাক। কোন কথা আর বলতে পারল না। মুহূর্তে তার মুখের কঠোর ভাষা যেন কোথায় হারিয়ে গেল। ফুরিয়ে গেল।
লোকটির ঋণ এখনই মিটিয়ে দাও তোমরা। যাও। বিনম্র কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন নবী (স)।
কয়েকজন সাহাবী এক সাথে চলে গেল চারণভূমির দিকে। যেখানে বায়তুলমালের উটগুলো চরে ঘাস খাচ্ছিল। বেশ কিছু পরে ফিরে এলেন তাঁরা। এসে নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! লোকটির উটের মত কোন ছোট উট পাওয়া যাচ্ছে না। আপনার উটগুলো অনেক বড়, অনেক ভাল অনেক দামী।
এতটুকু দ্বিধা করলেন না, লাভ-লোকসান ভাবলেন না, বললেন: যাও সে উট দিয়েই ঋণ পরিশোধ কর। এখনই। একটু থেমে ধীর স্থির গলায় বললেন, আল্লাহ্র কাছে সে ব্যক্তি উত্তম, যে উত্তম ব্যবহারের সাথে উত্তম জিনিস দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে।
প্রায় দ্বিগুণ মূল্যের উটের রশি হাতে নিয়ে সে কটুভাষী লোকটি মরমে মরে যাচ্ছিল। লজ্জায় দ্বিধায় সংকোচে শ্রদ্ধায় আর নবী (স)-এর দিকে ঠিক মত চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছিল না। তার পা উঠছিল না যেন। জীবনে এমন দোল জাগান কথা সে আর শোনেনি কোন দিন। হেজাজের রুক্ষ্ম মাটিতে এমনতর মধুর ব্যবহার কোনদিন তার সাথে আর করেনি কেউ। তার মনের দমবদ্ধ অমানিশার গুমোট আকাশে আজ উদার হওয়ার ঝাপটা লেগেছে। সে ঝাপটায় সরে যাচ্ছে পুঞ্জীভূত ঘনকাল মেঘের স্তর। আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে চেতনার দ্বাদশী। সে অলৌকিক আলোয় ভরে উঠছে মনের অলিগলি। ধীরে ধীরে অলোকিক হচ্ছে বোধ। ভালবাসায় ভরে উঠছে চেতনা। দীপ্তিময় হচ্ছে আত্মা।
উটের রশি ধরে যেতে যেতে প্রায় রুদ্ধস্বরে সে বলল, হে মুহাম্মদ (স)! অশ্রুতে ভিজে গেল। সে কঠোর কণ্ঠ। এখন ভোরের শিশিরের মত কোমল! শুকতারার মত নিষ্পাপ। জ্যোৎস্নার মত জ্যোতির্ময়।
তার কর্কশ গলায় এত রূঢ়তা ছিল যে মুহূর্তে সে পবিত্র পরিবেশ পাল্টে গেল সম্পূর্ণ। আলোকিত মধ্যাহ্নে অকস্মাৎ নেমে এল রাতের অন্ধকার। সীমাহীন ক্রোধে অনবরত কাঁপছিল সে ইহুদী। আর কেবলই চিৎকার করছিল। তার মুখে ছিল অশ্রাব্য ভাষা। সে ভাষা কটু। সে ভাষা অশ্লীল। এমন অশালীন, যে শুনবে রক্ত গরম হয়ে উঠবে তার।
সাহাবীদের মধ্যে বসেছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। বসে বসে দ্বীনের কথা আলোচনা করছিলেন। আর সে যালিম এমন পবিত্র মানুষটি প্রতি এসব ইতর ভাষা প্রয়োগ করছিল। অবিরাম করেই যাচ্ছিল। গরম কড়াইতে ফুটন্ত পানি যেমন লাফায়, চিৎকারের সাথে সাথে তেমনি লাফাচ্ছিল সে। এমনি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে ইহুদী, এমনি ক্রুদ্ধ। অথচ এতটা বাড়াবাড়ি করার কোন সঙ্গত কারণ ছিল না।
এ লোকটির কাছে থেকে একটি বাচ্চা উট ধার নিয়েছিলেন রাসূল (স)। বিশেষ প্রয়োজন পড়েছিল তাই। হয়তো কাউকে দেবেন। কোন ইয়াতীমকে, কোন আতুরকে। আর সে ঋণের তাগাদায় এসে এত কাণ্ড করে বসল লোকটা। একেবারে মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ভীষণ রকম কঠোর হয়ে উঠল সে। তার ব্যবহার এমনই উত্তেজক ছিল যে এর ক্রমাগত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সমবেত সাহাবীগণও ধীরে ধীরে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন এক সময় এবং অবশেষে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন তাঁরাও। রাসূল (স)-এর প্রতি এমন আচরণকে তাঁরা কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তৎপর হলেন সকলেই। এমন কি কয়েকজন সাহাবী উদ্যত হলেন তাকে হত্যা করার জন্য। যে অপরাধ সে করেছে কতলই এর একমাত্র শাস্তি, এছাড়া দ্বিতীয় কোন প্রতিশোধ খুঁজে পেলেন না তাঁরা।
হত্যায় উদ্যত সাহাবীদের দিকে তাকালেন রাসূল (স)। ক্ষণিক। পরমুহূর্তেই তাঁর পবিত্র দুটি বাহু উপরে তুলে থামিয়ে দিলেন। তাঁদের হত্যামুখী হাতগুলো থেমে গেল। কিন্তু অসম্ভব উত্তেজনায় তাঁদের চোখ মুখ থর থর করছিল। সীমাহীন ক্রোধ জমেছিল সেখানে। তাঁরা সকলে একযোগে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকালেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাকিয়েছিলেন তাঁদের দিকে। এরপর যেন অসম্ভব ব্যথিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন : কি আশ্চর্য! তোমরাও ধৈর্যহারা? তোমরা কি জাননা পাওনাদারের কড়া কথা বলার হক আছে। সুতরাং লোকটিকে এমন কথা বলতে দাও।
সমবেত সকল সাহাবী যেন অকস্মাৎ চাবুকের আঘাতে শিহরিত হয়ে উঠলেন। চমকিত হল। এ কি কথা বললেন রাসূল (স)? সাহাবীগণ অপলকে তাকিয়ে রইলেন সে পবিত্র মুখের দিকে। এমন বিপরীত বিবেকের কথা শোনার জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না।
অবাক চাউনি মেলে তাকিয়ে আছে সে ইহুদীও। সে কঠোরভাষী পাওনাদার! রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংযত মহান ব্যবহার তার অন্তরের গভীরকে স্পর্শ করে গেল। সে নির্বাক। কোন কথা আর বলতে পারল না। মুহূর্তে তার মুখের কঠোর ভাষা যেন কোথায় হারিয়ে গেল। ফুরিয়ে গেল।
লোকটির ঋণ এখনই মিটিয়ে দাও তোমরা। যাও। বিনম্র কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন নবী (স)।
কয়েকজন সাহাবী এক সাথে চলে গেল চারণভূমির দিকে। যেখানে বায়তুলমালের উটগুলো চরে ঘাস খাচ্ছিল। বেশ কিছু পরে ফিরে এলেন তাঁরা। এসে নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! লোকটির উটের মত কোন ছোট উট পাওয়া যাচ্ছে না। আপনার উটগুলো অনেক বড়, অনেক ভাল অনেক দামী।
এতটুকু দ্বিধা করলেন না, লাভ-লোকসান ভাবলেন না, বললেন: যাও সে উট দিয়েই ঋণ পরিশোধ কর। এখনই। একটু থেমে ধীর স্থির গলায় বললেন, আল্লাহ্র কাছে সে ব্যক্তি উত্তম, যে উত্তম ব্যবহারের সাথে উত্তম জিনিস দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে।
প্রায় দ্বিগুণ মূল্যের উটের রশি হাতে নিয়ে সে কটুভাষী লোকটি মরমে মরে যাচ্ছিল। লজ্জায় দ্বিধায় সংকোচে শ্রদ্ধায় আর নবী (স)-এর দিকে ঠিক মত চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছিল না। তার পা উঠছিল না যেন। জীবনে এমন দোল জাগান কথা সে আর শোনেনি কোন দিন। হেজাজের রুক্ষ্ম মাটিতে এমনতর মধুর ব্যবহার কোনদিন তার সাথে আর করেনি কেউ। তার মনের দমবদ্ধ অমানিশার গুমোট আকাশে আজ উদার হওয়ার ঝাপটা লেগেছে। সে ঝাপটায় সরে যাচ্ছে পুঞ্জীভূত ঘনকাল মেঘের স্তর। আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে চেতনার দ্বাদশী। সে অলৌকিক আলোয় ভরে উঠছে মনের অলিগলি। ধীরে ধীরে অলোকিক হচ্ছে বোধ। ভালবাসায় ভরে উঠছে চেতনা। দীপ্তিময় হচ্ছে আত্মা।
উটের রশি ধরে যেতে যেতে প্রায় রুদ্ধস্বরে সে বলল, হে মুহাম্মদ (স)! অশ্রুতে ভিজে গেল। সে কঠোর কণ্ঠ। এখন ভোরের শিশিরের মত কোমল! শুকতারার মত নিষ্পাপ। জ্যোৎস্নার মত জ্যোতির্ময়।