📘 হাদিসের গল্প > 📄 যে দৃষ্টান্তের তুলনা হয়না

📄 যে দৃষ্টান্তের তুলনা হয়না


দীর্ঘদিন একটানা বৃষ্টি বাদলে মনের অস্বস্তি যখন পীড়াদায়ক যন্ত্রণা, আকাশ আলো করা রোদ বড় কাঙ্খিত। সে আবেদনের তাজা রোদ এখন আরবের আকাশে। অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনেক দুর্ভোগ-দুর্যোগ অতিক্রান্ত। কত নিষ্ঠুর নিগ্রহ, কত পাশবিক রক্তপাত!
মানুষ এখন বুক ভরাট করে শ্বাস নিচ্ছে। আহার বিহার নিয়ন্ত্রিত। রীতি-নীতিতে শৃঙ্খলা। গভীর কৃতজ্ঞতায় সকলে এক আল্লাহকে সিজদানত। যে সব ইহুদি-খৃষ্টান-কুরাইশরা হাসাহাসি করত, তারা এখন নীরব। সে দল-ভারি দল এখন ভারহীন শীর্ণ, কৃষ্ণপক্ষ-চাঁদের মত লাগাতার ক্ষীয়মান। তাদের এখন অস্তিত্ব বাঁচানোর সংগ্রাম।
পথ চলতে চলতে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত হয়ে আসছিল রাসূলুল্লাহ (স)। সকল সাফল্যেই তিনি আল্লাহ্র অদৃশ্য মহাশক্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। পথ চলতে চলতে তিনি স্ফীত শ্বাস নিয়ে কৃতজ্ঞসিক্ত দীর্ঘ উচ্চারণে বললেন, আল্লাহু।
আকাশে উজ্জল রোদের সমারোহ। তবুও কোথাও কোথাও যেন মেঘের ছায়া। কাল আভাস। এতদিনের এত যুগের এত বদভ্যাস বুঝি নির্মূল হয় না এক সাথে! এক ক্ষেপে ধরা পড়ে না বুঝি সব কলঙ্ক।
চলতে চলতে এক বাগানের পাশে এসে থামলেন রাসূলুল্লাহ (স)। দেখলেন, একটা উটকে কে বেঁধে রেখে গেছে উঁচু ডালের সাথে। বসতে পারছে না, শুতে পারছে না। শাস্তির মত এক রকম ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটানা। এর উপর কতদিন খেতে পায় নি ঠিকমত। জীর্ণশীর্ণ। হাড়গুলো গুনে নেয়া যায়। চোখ দুটি ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে চোয়াল থেকে। চামড়ার উপর সারা দেহে জুড়ে পর্যাপ্ত বেদনা ছড়ান।
কষ্ট উটের নয়, যেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজের। বুকটা কাত্রে উঠল তাঁর। পায় পায় তিনি এগিয়ে এলেন উটের কাছে। আর কি আশ্চর্য, রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখতে পেয়েই উটটা ব্যথায় উল্লাসে অভিমানে সে এক রকম গলায় ডেকে উঠল। মাকে দেখে কথা না-ফোটা শিশু যেমন ডাকে, ডালে ফেরা মায়ের শব্দে নির্বাক শাবকেরা যেমন কাকলি মুখর হয়! ডাক ত নয়, যেন মজলুমের আর্তনাদ : দেখুন রাসূলুল্লাহ (স)-আমাকে এরা মেরেই ফেলছে। অনেক ক্রীতদাসকে আপনি উদ্ধার করেছেন জালিমের অত্যাচার থেকে, অতএব আমাকেও বাঁচান।
রাসূলুল্লাহ (স) এগিয়ে এসে এবার হাত রাখলেন উটের গায়। চোখে মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। মহব্বতের হাত। ভালবাসার হাত। আর সে কোমল পরশে উটের যন্ত্রণা যেন ঝরে পড়ল চোখ বেয়ে। আমার মত অগণিত উট ঘরে ঘরে উপবাসী। আপনি ও রাহমাতুল্লিল আলামীন, আমরা মুখ চেয়ে আছি আপনার।
আমার উটকে আমি খেতে দিই না দিই-তোমার কি? আমার দুম্বা মরে গেলে ফেলে দেব, তুমি বলার কে? এটাই ছিল জাহেলিয়াত যুগের নিয়ম। তাই চলছিল।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন উটটা একজন আনসারের। তাকে ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (স)। আনসার এল, সাথে আরো অনেকে। রীতিমত একটা জমায়েত হয়ে গেল দেখতে দেখতে। সকলেই উদগ্রীব, কি বলবেন রাসূলুল্লাহ (স)? মারবেন আনসারকে? সাজা দেবেন? কি করবেন?
জনতা নীরব দুবাহু মেলে মানুষকে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলে মানুষেরা যেমন চুপ করে, তেমনি নীরব। রাসূলুল্লাহ (স) ধীরে ধীরে সে জনতার দিকে মুখ তুলে তাকালেন। তাকিয়েই রইলেন-দীর্ঘক্ষণ। দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিক্ষেপে পরিবেশে পর্যাপ্ত গাম্ভীর্য আর মৃদু ভৎর্সনার স্বরে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, এসব নিরীহ আর বোবা প্রাণী সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর। অর্থাৎ-
'তোমারও প্রাণ আছে, উটেরও আছে। খেতে না পেলে তুমি কষ্ট পাও, উটও পায় না? সুতরাং সাবধান! সব কিছুর স্রষ্টা আল্লাহ্। কাকে কষ্ট দিচ্ছ আর কোন অবলা প্রাণে ব্যাথা দিচ্ছ সব দেখছেন তিনি। তোমাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্, আমাকেও আর এ উটকেও। প্রাণ আল্লাহ্র সৃষ্টি – তাই না? সুতরাং এর প্রতি বিবেচনা কর।'

দীর্ঘদিন একটানা বৃষ্টি বাদলে মনের অস্বস্তি যখন পীড়াদায়ক যন্ত্রণা, আকাশ আলো করা রোদ বড় কাঙ্খিত। সে আবেদনের তাজা রোদ এখন আরবের আকাশে। অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনেক দুর্ভোগ-দুর্যোগ অতিক্রান্ত। কত নিষ্ঠুর নিগ্রহ, কত পাশবিক রক্তপাত!
মানুষ এখন বুক ভরাট করে শ্বাস নিচ্ছে। আহার বিহার নিয়ন্ত্রিত। রীতি-নীতিতে শৃঙ্খলা। গভীর কৃতজ্ঞতায় সকলে এক আল্লাহকে সিজদানত। যে সব ইহুদি-খৃষ্টান-কুরাইশরা হাসাহাসি করত, তারা এখন নীরব। সে দল-ভারি দল এখন ভারহীন শীর্ণ, কৃষ্ণপক্ষ-চাঁদের মত লাগাতার ক্ষীয়মান। তাদের এখন অস্তিত্ব বাঁচানোর সংগ্রাম।
পথ চলতে চলতে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত হয়ে আসছিল রাসূলুল্লাহ (স)। সকল সাফল্যেই তিনি আল্লাহ্র অদৃশ্য মহাশক্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। পথ চলতে চলতে তিনি স্ফীত শ্বাস নিয়ে কৃতজ্ঞসিক্ত দীর্ঘ উচ্চারণে বললেন, আল্লাহু।
আকাশে উজ্জল রোদের সমারোহ। তবুও কোথাও কোথাও যেন মেঘের ছায়া। কাল আভাস। এতদিনের এত যুগের এত বদভ্যাস বুঝি নির্মূল হয় না এক সাথে! এক ক্ষেপে ধরা পড়ে না বুঝি সব কলঙ্ক।
চলতে চলতে এক বাগানের পাশে এসে থামলেন রাসূলুল্লাহ (স)। দেখলেন, একটা উটকে কে বেঁধে রেখে গেছে উঁচু ডালের সাথে। বসতে পারছে না, শুতে পারছে না। শাস্তির মত এক রকম ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটানা। এর উপর কতদিন খেতে পায় নি ঠিকমত। জীর্ণশীর্ণ। হাড়গুলো গুনে নেয়া যায়। চোখ দুটি ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে চোয়াল থেকে। চামড়ার উপর সারা দেহে জুড়ে পর্যাপ্ত বেদনা ছড়ান।
কষ্ট উটের নয়, যেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজের। বুকটা কাত্রে উঠল তাঁর। পায় পায় তিনি এগিয়ে এলেন উটের কাছে। আর কি আশ্চর্য, রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখতে পেয়েই উটটা ব্যথায় উল্লাসে অভিমানে সে এক রকম গলায় ডেকে উঠল। মাকে দেখে কথা না-ফোটা শিশু যেমন ডাকে, ডালে ফেরা মায়ের শব্দে নির্বাক শাবকেরা যেমন কাকলি মুখর হয়! ডাক ত নয়, যেন মজলুমের আর্তনাদ : দেখুন রাসূলুল্লাহ (স)-আমাকে এরা মেরেই ফেলছে। অনেক ক্রীতদাসকে আপনি উদ্ধার করেছেন জালিমের অত্যাচার থেকে, অতএব আমাকেও বাঁচান।
রাসূলুল্লাহ (স) এগিয়ে এসে এবার হাত রাখলেন উটের গায়। চোখে মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। মহব্বতের হাত। ভালবাসার হাত। আর সে কোমল পরশে উটের যন্ত্রণা যেন ঝরে পড়ল চোখ বেয়ে। আমার মত অগণিত উট ঘরে ঘরে উপবাসী। আপনি ও রাহমাতুল্লিল আলামীন, আমরা মুখ চেয়ে আছি আপনার।
আমার উটকে আমি খেতে দিই না দিই-তোমার কি? আমার দুম্বা মরে গেলে ফেলে দেব, তুমি বলার কে? এটাই ছিল জাহেলিয়াত যুগের নিয়ম। তাই চলছিল।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন উটটা একজন আনসারের। তাকে ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (স)। আনসার এল, সাথে আরো অনেকে। রীতিমত একটা জমায়েত হয়ে গেল দেখতে দেখতে। সকলেই উদগ্রীব, কি বলবেন রাসূলুল্লাহ (স)? মারবেন আনসারকে? সাজা দেবেন? কি করবেন?
জনতা নীরব দুবাহু মেলে মানুষকে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলে মানুষেরা যেমন চুপ করে, তেমনি নীরব। রাসূলুল্লাহ (স) ধীরে ধীরে সে জনতার দিকে মুখ তুলে তাকালেন। তাকিয়েই রইলেন-দীর্ঘক্ষণ। দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিক্ষেপে পরিবেশে পর্যাপ্ত গাম্ভীর্য আর মৃদু ভৎর্সনার স্বরে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, এসব নিরীহ আর বোবা প্রাণী সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর। অর্থাৎ-
'তোমারও প্রাণ আছে, উটেরও আছে। খেতে না পেলে তুমি কষ্ট পাও, উটও পায় না? সুতরাং সাবধান! সব কিছুর স্রষ্টা আল্লাহ্। কাকে কষ্ট দিচ্ছ আর কোন অবলা প্রাণে ব্যাথা দিচ্ছ সব দেখছেন তিনি। তোমাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্, আমাকেও আর এ উটকেও। প্রাণ আল্লাহ্র সৃষ্টি – তাই না? সুতরাং এর প্রতি বিবেচনা কর।'

📘 হাদিসের গল্প > 📄 সিপাহসালার

📄 সিপাহসালার


একদিকে আলো অন্যদিকে অন্ধকার "কদিকে সত্য অন্যদিকে মিথ্যা। একদিকে মুসলমান অন্যদিকে মুশরিক। মাঝে বিশাল বদর প্রান্তর জুড়ে রাতের অন্ধকার। একদিকে সমানে চলছে কোলাহল নাচ-গান, হৈ-হল্লা আর ফুর্তি-আনন্দ। বদরের এদিকে পুরা মক্কাটাই যেন উঠে এসেছে হঠাৎ। তার অমোদ-প্রমোদ, তার গর্ব-অহংকার আর সে উদ্ধত কোরাইশ নেতৃবৃন্দ। উট জবাই হচ্ছে, খানাপিনা চলছে, সাকিরা পরিবেশন করছে মদ। আনন্দের আয়োজন অঢেল। তারা মনে করছে, আসন্ন যুদ্ধে কুরাইশ শিবিরের দরজায় যেন চিরস্থায়ী সুদিন লটকে আছে।
আর একদিক একেবারেই নীরব। কোন সারা শব্দ নেই। গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন সকলেই। কেবল জেগে আছেন একজন। তিনি এ শিবিরের সর্বাধিনায়ক। কেবল ঘুম নেই তাঁর চোখে। তিন'শ তেরজন সৈনিকের সিপাহসালার তিনি। জেগে আছেন। জেগে জেগে পাহারা দিচ্ছ সকলের। লক্ষ্য রাখছেন প্রত্যেকের সুখ-সুবিধার। একটি সৈনিকের কষ্ট হলে সে কষ্ট তাঁরই। তারা ব্যথা পেলে সে ব্যথা তাঁর বুকেই বাজে। আর জয়পরাজয়ের মালিক যিনি, সকল শক্তির আধার যিনি, সিজদায় লুটিয়ে আছেন তাঁর কাছে। মাথা নত করে আছেন। কেঁদে কেঁদে শক্তি ভিক্ষা করছেন। সাহস চাইছেন। সাহায্য চাইছেনঃ ইয়া আল্লাহ্! এ মুষ্টিমেয় কজন মুসলমানকে আপনি রক্ষা করুন। এদের যেন কোন ক্ষতি না হয়। এ কজন মুসলমান পরাজিত হলে কিয়ামত পর্যন্ত আপনার নাম নেয়ার মত কেউ আর থাকবে না। সারা রাত জেগে তিনি কাঁদছেন আর কাঁদছেন। কখনো মাটিতে মাথা রেখে। কখনো দুটি পবিত্র হাত মেলে ধরে।
জীর্ণ একটি, খেজুর পাতার ছাউনি। সাহাবীরাই তৈরী করে দিয়েছেন। তাঁর সংগীরা। আন্তরিকতা দিয়ে। ভালবাসা দিয়ে। কখনো থাকেন এর মধ্যে, বাইরে আসেন কখনো কখনো। উপরে অসীম তারা ভরা নীলাকাশ। নীচে বদরের বিশাল প্রান্তর জুড়ে কঠিন নীরবতা। রাতের গভীরতায় এক রকম শোঁ শোঁ শব্দ অবিরাম কানে আসে তাঁর। ব্যথার শব্দ যেন। শোকের শব্দ। কাল এখানে কত রক্ত ঝরবে কে জানে। কতজন আহত হবে। কতজন চিরদিনের মত নীরব হয়ে যাবে এ জগত থেকে। রাতের নির্জনতায় যেন এরই হাহাকার মাতম ভেসে আসছে। সে আসন্ন শোকের চাপা গুঞ্জরণ। এ যুদ্ধ তিনি চাননি। দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চাপিয়ে দিয়েছে শত্রুরা। অথচ তিনি তাঁর সৈনিকদের উপর আস্থাশীল। আল্লাহ্ সহায় হলে এ অল্প কজনই যথেষ্ট। মমতার দৃষ্টি মেলে তিনি তাকান তাঁর সৈনিকদের দিকে। তাঁর শক্তি। তাঁর সাহস। তাঁর বাহুবল। গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন সকলে। আহা ঘুমাক! মদীনা থেকে এত পথ ভেঙে আসা সহজ কথা নয়। ক্লান্ত সকলেই। সকলেই পরিশ্রান্ত। বালিতে পানি শুষে নিয়ে তরতাজা করে দেবে। আহা ঘুমুক ওরা। অকাতরে ঘুমাতে দেখে অসম্ভব খুশি হলেন তিনি। আনন্দিত হলেন।
তিন শত তের জন সৈনিক। দরিদ্র প্রায় সকলেই। দীনহীন অবস্থা। জীর্ণ বসন কারো পরণে। কারো গায়ে মলিন আবরণ। অর্ধাহার চলছে কতদিন থেকে, ভুখা প্রায় সকলেই। অনেকের হাতে ঠিক মত অস্ত্রও তুলে দিতে পারেন নি তিনি। বাহনেরও অনটন। অথচ যুদ্ধে চলছেন। এমনতর এক দুর্বল বাহিনীর সিপাহসালার রাসূলুল্লাহ (স)। সকলের ব্যথায় তিনি ব্যথিত তাই। সকলেরই যন্ত্রণায় তিনি কাতর। তাঁর বুকের ভিতর একটা দুঃখের তুফান বইছে সব সময়। এ অসহায়দের মুখের দিকে তাকালে তিনি বিহ্বল হয়ে পড়েন। প্রতি মুহূর্তে চিন্তা তাঁর: কি করে এদের ভাল করা যায়। কি করলে উপশম হবে এদের বেদনা। মদীনা থেকে এক মাইল দূর। গিবতার কূপের পাশে বিশ্রাম শেষ। যাত্রা শুরুর জন্য সকলে প্রস্তুত আবার। সহসা দুই পবিত্র বাহু ঊর্ধ্বে তুলে আকুল ফরিয়াদে অশ্রু সিক্ত হয়ে তিনি বললেন: ইয়া আল্লাহ্! আমার এ সংগীরা দরিদ্র, আপনি এদের দারিদ্রতা মোচন করুন। এরা ক্ষুধার্থ এদের মুখে অন্ন দিন। এরা বস্ত্রহীন, এদের বস্ত্র দিন। এরা বাহনহীন, এদের বাহন দিন। পরম প্রভু আমার! সর্ববিধ মঙ্গল করুন।
সৈনিক নয়-সন্তান। সকল সময় তাদের জন্য চিন্তা। মঙ্গল চিন্তা। তারা সুখী হলে তিনিও সুখী। তারা আনন্দে থাকলে তিনিও আনন্দিত। আর ব্যথা পেলে? সে ব্যথাও তাঁরই। ঘুমন্ত সৈনিকদের প্রতি তৃপ্তির দৃষ্টিপাত করলেন তিনি। শেষবারের মত। এরপর ধীরে ধীরে এলেন আস্তানার মধ্যে।
আঁধার তরল হয়ে এল এক সময়। বদরের বিশাল পূর্ব দিগন্তে আলোর আভাস। আসন্ন ভোরের ইশারা। পবিত্র সুবহি সাদিকের উঁকি ঝুঁকি।
নিদ্রাহীন সিপাহসালার বাইরে এলেন। আর বললেন। এরপর: আল্লাহ্ বান্দাগণ! নামায! নামায!! বদরের প্রান্তেরে আন্দোলন জাগল সে ধ্বনির। মধুর এক জান্নাতী আওয়াজের মত ঘুমন্ত সৈনিকদের কানে গেল সে স্বর। গভীর ঘুমের পর ক্লান্তিহীন সকল জাগরণ। আল্লাহ্ জন্য সিপাহসালালের আহ্বান! ত্বরান্বিত সমবেত সকলেই। সকলেই এখন নামাযের কাতারে। সামনে ইমাম, সিপাহসালার- রাসূলুল্লাহ (স) তিনশ' তের জন সৈনিকের একচ্ছত্র অধিনায়ক, তাঁদের বন্ধু, তাঁদের পিতা।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে একটি তীর। নামায শেষ হলে সে তীর হাতে তিনি এলেন সৈন্যদলের মাঝে। সামনে বিস্তীর্ণ যুদ্ধের ময়দান। জিহাদ আসন্ন। সে জিহাদের জন্য সৈন্যদের শ্রেণী বিন্যাস শুরু করলেন তিনি। ব্যুহ রচনায় ব্যস্ত হলেন। তীরন্দাজ বাহিনী। বর্শা বাহিনী। পদাতিক বাহিনী। ছোট ছোট ব্যুহে বিভক্ত করলেন। কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন। এরপর আদেশ দিলেন এক সরল রেখায় দাঁড়াতে। এতটুকু যেন এদিক-ওদিক না হয়। আগু-পিছু না হয়। যেখানে গোলমাল দেখছেন, ঠিক করে দিচ্ছেন নিজ হাতে। যুদ্ধের একটা নিয়ম আছে, আক্রমণ প্রতিহত করার একটা কানুন আছে। আক্রমণ করারও একটা রীতি আছে। শৃঙ্খলা মেনে চললে আহত হবার সম্ভাবনা কম। অন্যথায় জীবন সংশয়। সুতরাং-
সাবধান! যেমন বলি, অনুসরণ কর। শ্রেণীবদ্ধও হও। কাতারবন্দীও হও। অথচ একজন সৈনিক কিছুতেই ঠিকমত দাঁড়াচ্ছিলেন না কাতারে। কাতার ভেঙে বাইরে আসছিলেন বার বার। নাম তাঁর সাওয়াদ। সিপাহসালার ছুটে এলেন তাঁর কাছে।
সকলের লক্ষ্য এখন তাঁর দিকে। সাওয়াদ এখন সকল লক্ষ্যের কেন্দ্র-বিন্দু। স্থির দৃষ্টিতে সকলেই তাকিয়ে আছে। এ মুহূর্তে আদেশ অমান্য কঠিন অপরাধ। এ অপরাধের শাস্তি ভয়ানক। সকলেই ভাবছেন কি হয়। এক ভয়ঙ্কর মুহূর্তের মুখমুখী সকলেই। নিঃশ্বাসকে মুঠো করে ধরে সকলে অসম্ভব নীরব। সকলের কাতর দৃষ্টির উপর দিয়ে সেনাপতি এসে দাঁড়ালেন সাওয়াদের সামনে। তিনশ' তের জন সৈনিকের সেনাধ্যক্ষ, সর্বাধিনায়ক। হাতে সে তীর। হঠাৎ সাওয়াদের পেটে একটি খোঁচা দিয়ে তিনি ধমক দিলেন, সোজা হয়ে দাঁড়াও।
না-তেমন কঠিন কিছু নয়। মারাত্মক ঘটল না কিছু। অঘটন নয়। সহজ হয়ে দাঁড়ালেন। ভাঙা কাতার সোজা করে দিলেন সেনাপতি। যাবার জন্য পা তুলেছেন, অঘটন ঘটালেন আহত সাওয়াদ (রা)। তীরের খোঁটায় কিছুটা আহত হয়েছিলেন তিনি। অকস্মাৎ জামা তুলে সে আহত জায়গাটা দেখালেন। এরপর বজ্রপাতের মত অঘটন ঘটিয়ে নির্বাক করে দিলেন সকলকে। প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আল্লাহ্ আপনাকে পাঠিয়েছেন মানুষকে পথ দেখানোর জন্য। পাঠিয়েছেন রহমত স্বরূপ। আশিস স্বরূপ। দয়া স্বরূপ। অথচ দয়ার বদলে আপনি আমাকে আঘাত দিলেন, ব্যথা দিলেন, আহত করলন। এরপরই বলল সে চমক দেয়া কথা: আমি এর প্রতিশোধ চাই।
এ মুহূর্তে সকলেই অবাক! সকলেই বিস্মিত। কি আস্পর্ধা সাওয়াদের? এত বড় অপরাধের পর কোথায় মাথা নীচু করবে, মাফ চাইবে-তা নয়, উল্টা চাপ!
স্পর্ধিত গলায় সে রাসূলুল্লাহ (স)-কেই দোষী করছে! কি সর্বনাশ! সে বড় অহংকারী হয়েছে। ছোট মুখে এতবড় কথা। তীর দিয়ে ভুঁড়িটা এ ফোঁড় ফোঁড় করে দেন নি এই ত ভাগ্য!
নিশ্চয়ই এ অপরাধের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। সাহাবীরা মনে মনে গর্জাচ্ছিলেন। বলতে যাচ্ছিলেন কেউ কেউ, এ ঔদ্ধত্যের শাস্তি কতল। বলতে গিয়ে বলতে পারছিলেন না। সকলেই ভয়ঙ্কর ভাবে নির্ভর করছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর। সে দিকে তাকিয়ে ছিলেন সকলেই।
কয়েকটি মাত্র মুহূর্ত! কাটল আশ্চর্য নীরবাতায়। রাসূলুল্লাহ (স) তাকালেন সাওয়াদের পেটের দিকে। সত্যিই আহত হয়েছে সে। ক্ষতস্থানে রক্ত দেখা দিয়েছে দু-এক ফোটা। তাই দেখেই যন্ত্রণায় আচমকা একটা ঝড়ো ধাক্কার বুকের হাড়গুলো চূর্ণ হয়ে যেতে চাইল রাসূলুল্লাহ (স)-এর। ঘাসের ডগায় টোপ ধরা শিশিরের মত কাতর চোখ দুটি ছলছল। হায় আমি আমার সন্তানকে আহত করলাম! এ অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে আমি আল্লাহ্ কাছে মুখ দেখাব কি করে!
অগণিত সৈনিকের নির্বাক দৃষ্টি স্থির। অকস্মাৎ রাসূলুল্লাহ (স) পরনের জামা উঁচু করলন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সাওয়াদকে বলল, এরপর, আমি প্রস্তুত। এ আমার উন্মুক্ত দেহ আর এ নাও তীর। প্রতিশোধ গ্রহণ কর। কথাগুলো ভয়ঙ্কর রকম বেদনা মলিন আর কাতর শোনাল।
তিন শ তের জন সৈন্য। ছশ ছাব্বিশটি নীরব চোখ এখন স্বপ্নাবিষ্ট। যেন একটা অপার্থিব দৃশ্য দেখলেন তাঁরা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ্র দেহ মুবারক সকলের সামনে দৃশ্যমান আর সে শুভ্র দেহের অধিকারী যে মানুষ তাঁর শুভ্রতর মনও। যা কোন অপরাধ নয়, যার জন্য কেউ কোনদিন অপরাধী হয়নি অন্যের গুরুতর অপরাধ ভুলে গিয়ে সে ত্রুটির জন্য রাসূলুল্লাহ (স) কাঁদছেন! সে অপরাধের জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী!! তিনি নতজানু! ভাবা যায় না।
আকাশ নির্বাক। জগত নির্বাক। নির্বাক বদর প্রান্তর। একজন সাধারণ সৈনিকের সামনে রাসূলুল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থী। রাসূলুল্লাহ (স) নতজানু। ভক্তিতে সম্ভ্রমে শ্রদ্ধায় প্রতিটি সৈনিকের অর্ন্তজগত প্লাবিত হয়ে গেল। এ হল তাঁদের সিপাহসালার! এ হল তাঁদের সর্বাধিনায়ক!
রাসূলুল্লাহ (স) এ সীমাহীন মহত্বের কাছে সকলে যেন বিগলিত হয়ে গেল। সমর্পিত হয়ে গেল। সে শুভ্রতার দিকে তাঁরা যত দৃষ্টিক্ষেপ করেন, ভালবাসা বেড়ে যায় তত। শেষে তাঁদের মনে হল, এ অলৌকিক দৃশ্যটি দেখে তাঁরাও যেন অলৌকিক হয়ে উঠেছেন। নিজের মধ্যে নিজেরা বহুগুণ মহৎ হয়েছেন। বহুগুন বীর্যবান হয়েছেন।
এ মহান সিপাহসালারের অধীনে অবশেষে বদরের বিশাল প্রান্তরের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করেন তাঁরা। সে দৃষ্টিতে ভীষণ প্রতীজ্ঞা। সে দৃষ্টিতে এখন যুদ্ধজয়ের ইশারা।

একদিকে আলো অন্যদিকে অন্ধকার "কদিকে সত্য অন্যদিকে মিথ্যা। একদিকে মুসলমান অন্যদিকে মুশরিক। মাঝে বিশাল বদর প্রান্তর জুড়ে রাতের অন্ধকার। একদিকে সমানে চলছে কোলাহল নাচ-গান, হৈ-হল্লা আর ফুর্তি-আনন্দ। বদরের এদিকে পুরা মক্কাটাই যেন উঠে এসেছে হঠাৎ। তার অমোদ-প্রমোদ, তার গর্ব-অহংকার আর সে উদ্ধত কোরাইশ নেতৃবৃন্দ। উট জবাই হচ্ছে, খানাপিনা চলছে, সাকিরা পরিবেশন করছে মদ। আনন্দের আয়োজন অঢেল। তারা মনে করছে, আসন্ন যুদ্ধে কুরাইশ শিবিরের দরজায় যেন চিরস্থায়ী সুদিন লটকে আছে।
আর একদিক একেবারেই নীরব। কোন সারা শব্দ নেই। গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন সকলেই। কেবল জেগে আছেন একজন। তিনি এ শিবিরের সর্বাধিনায়ক। কেবল ঘুম নেই তাঁর চোখে। তিন'শ তেরজন সৈনিকের সিপাহসালার তিনি। জেগে আছেন। জেগে জেগে পাহারা দিচ্ছ সকলের। লক্ষ্য রাখছেন প্রত্যেকের সুখ-সুবিধার। একটি সৈনিকের কষ্ট হলে সে কষ্ট তাঁরই। তারা ব্যথা পেলে সে ব্যথা তাঁর বুকেই বাজে। আর জয়পরাজয়ের মালিক যিনি, সকল শক্তির আধার যিনি, সিজদায় লুটিয়ে আছেন তাঁর কাছে। মাথা নত করে আছেন। কেঁদে কেঁদে শক্তি ভিক্ষা করছেন। সাহস চাইছেন। সাহায্য চাইছেনঃ ইয়া আল্লাহ্! এ মুষ্টিমেয় কজন মুসলমানকে আপনি রক্ষা করুন। এদের যেন কোন ক্ষতি না হয়। এ কজন মুসলমান পরাজিত হলে কিয়ামত পর্যন্ত আপনার নাম নেয়ার মত কেউ আর থাকবে না। সারা রাত জেগে তিনি কাঁদছেন আর কাঁদছেন। কখনো মাটিতে মাথা রেখে। কখনো দুটি পবিত্র হাত মেলে ধরে।
জীর্ণ একটি, খেজুর পাতার ছাউনি। সাহাবীরাই তৈরী করে দিয়েছেন। তাঁর সংগীরা। আন্তরিকতা দিয়ে। ভালবাসা দিয়ে। কখনো থাকেন এর মধ্যে, বাইরে আসেন কখনো কখনো। উপরে অসীম তারা ভরা নীলাকাশ। নীচে বদরের বিশাল প্রান্তর জুড়ে কঠিন নীরবতা। রাতের গভীরতায় এক রকম শোঁ শোঁ শব্দ অবিরাম কানে আসে তাঁর। ব্যথার শব্দ যেন। শোকের শব্দ। কাল এখানে কত রক্ত ঝরবে কে জানে। কতজন আহত হবে। কতজন চিরদিনের মত নীরব হয়ে যাবে এ জগত থেকে। রাতের নির্জনতায় যেন এরই হাহাকার মাতম ভেসে আসছে। সে আসন্ন শোকের চাপা গুঞ্জরণ। এ যুদ্ধ তিনি চাননি। দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চাপিয়ে দিয়েছে শত্রুরা। অথচ তিনি তাঁর সৈনিকদের উপর আস্থাশীল। আল্লাহ্ সহায় হলে এ অল্প কজনই যথেষ্ট। মমতার দৃষ্টি মেলে তিনি তাকান তাঁর সৈনিকদের দিকে। তাঁর শক্তি। তাঁর সাহস। তাঁর বাহুবল। গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন সকলে। আহা ঘুমাক! মদীনা থেকে এত পথ ভেঙে আসা সহজ কথা নয়। ক্লান্ত সকলেই। সকলেই পরিশ্রান্ত। বালিতে পানি শুষে নিয়ে তরতাজা করে দেবে। আহা ঘুমুক ওরা। অকাতরে ঘুমাতে দেখে অসম্ভব খুশি হলেন তিনি। আনন্দিত হলেন।
তিন শত তের জন সৈনিক। দরিদ্র প্রায় সকলেই। দীনহীন অবস্থা। জীর্ণ বসন কারো পরণে। কারো গায়ে মলিন আবরণ। অর্ধাহার চলছে কতদিন থেকে, ভুখা প্রায় সকলেই। অনেকের হাতে ঠিক মত অস্ত্রও তুলে দিতে পারেন নি তিনি। বাহনেরও অনটন। অথচ যুদ্ধে চলছেন। এমনতর এক দুর্বল বাহিনীর সিপাহসালার রাসূলুল্লাহ (স)। সকলের ব্যথায় তিনি ব্যথিত তাই। সকলেরই যন্ত্রণায় তিনি কাতর। তাঁর বুকের ভিতর একটা দুঃখের তুফান বইছে সব সময়। এ অসহায়দের মুখের দিকে তাকালে তিনি বিহ্বল হয়ে পড়েন। প্রতি মুহূর্তে চিন্তা তাঁর: কি করে এদের ভাল করা যায়। কি করলে উপশম হবে এদের বেদনা। মদীনা থেকে এক মাইল দূর। গিবতার কূপের পাশে বিশ্রাম শেষ। যাত্রা শুরুর জন্য সকলে প্রস্তুত আবার। সহসা দুই পবিত্র বাহু ঊর্ধ্বে তুলে আকুল ফরিয়াদে অশ্রু সিক্ত হয়ে তিনি বললেন: ইয়া আল্লাহ্! আমার এ সংগীরা দরিদ্র, আপনি এদের দারিদ্রতা মোচন করুন। এরা ক্ষুধার্থ এদের মুখে অন্ন দিন। এরা বস্ত্রহীন, এদের বস্ত্র দিন। এরা বাহনহীন, এদের বাহন দিন। পরম প্রভু আমার! সর্ববিধ মঙ্গল করুন।
সৈনিক নয়-সন্তান। সকল সময় তাদের জন্য চিন্তা। মঙ্গল চিন্তা। তারা সুখী হলে তিনিও সুখী। তারা আনন্দে থাকলে তিনিও আনন্দিত। আর ব্যথা পেলে? সে ব্যথাও তাঁরই। ঘুমন্ত সৈনিকদের প্রতি তৃপ্তির দৃষ্টিপাত করলেন তিনি। শেষবারের মত। এরপর ধীরে ধীরে এলেন আস্তানার মধ্যে।
আঁধার তরল হয়ে এল এক সময়। বদরের বিশাল পূর্ব দিগন্তে আলোর আভাস। আসন্ন ভোরের ইশারা। পবিত্র সুবহি সাদিকের উঁকি ঝুঁকি।
নিদ্রাহীন সিপাহসালার বাইরে এলেন। আর বললেন। এরপর: আল্লাহ্ বান্দাগণ! নামায! নামায!! বদরের প্রান্তেরে আন্দোলন জাগল সে ধ্বনির। মধুর এক জান্নাতী আওয়াজের মত ঘুমন্ত সৈনিকদের কানে গেল সে স্বর। গভীর ঘুমের পর ক্লান্তিহীন সকল জাগরণ। আল্লাহ্ জন্য সিপাহসালালের আহ্বান! ত্বরান্বিত সমবেত সকলেই। সকলেই এখন নামাযের কাতারে। সামনে ইমাম, সিপাহসালার- রাসূলুল্লাহ (স) তিনশ' তের জন সৈনিকের একচ্ছত্র অধিনায়ক, তাঁদের বন্ধু, তাঁদের পিতা।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে একটি তীর। নামায শেষ হলে সে তীর হাতে তিনি এলেন সৈন্যদলের মাঝে। সামনে বিস্তীর্ণ যুদ্ধের ময়দান। জিহাদ আসন্ন। সে জিহাদের জন্য সৈন্যদের শ্রেণী বিন্যাস শুরু করলেন তিনি। ব্যুহ রচনায় ব্যস্ত হলেন। তীরন্দাজ বাহিনী। বর্শা বাহিনী। পদাতিক বাহিনী। ছোট ছোট ব্যুহে বিভক্ত করলেন। কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন। এরপর আদেশ দিলেন এক সরল রেখায় দাঁড়াতে। এতটুকু যেন এদিক-ওদিক না হয়। আগু-পিছু না হয়। যেখানে গোলমাল দেখছেন, ঠিক করে দিচ্ছেন নিজ হাতে। যুদ্ধের একটা নিয়ম আছে, আক্রমণ প্রতিহত করার একটা কানুন আছে। আক্রমণ করারও একটা রীতি আছে। শৃঙ্খলা মেনে চললে আহত হবার সম্ভাবনা কম। অন্যথায় জীবন সংশয়। সুতরাং-
সাবধান! যেমন বলি, অনুসরণ কর। শ্রেণীবদ্ধও হও। কাতারবন্দীও হও। অথচ একজন সৈনিক কিছুতেই ঠিকমত দাঁড়াচ্ছিলেন না কাতারে। কাতার ভেঙে বাইরে আসছিলেন বার বার। নাম তাঁর সাওয়াদ। সিপাহসালার ছুটে এলেন তাঁর কাছে।
সকলের লক্ষ্য এখন তাঁর দিকে। সাওয়াদ এখন সকল লক্ষ্যের কেন্দ্র-বিন্দু। স্থির দৃষ্টিতে সকলেই তাকিয়ে আছে। এ মুহূর্তে আদেশ অমান্য কঠিন অপরাধ। এ অপরাধের শাস্তি ভয়ানক। সকলেই ভাবছেন কি হয়। এক ভয়ঙ্কর মুহূর্তের মুখমুখী সকলেই। নিঃশ্বাসকে মুঠো করে ধরে সকলে অসম্ভব নীরব। সকলের কাতর দৃষ্টির উপর দিয়ে সেনাপতি এসে দাঁড়ালেন সাওয়াদের সামনে। তিনশ' তের জন সৈনিকের সেনাধ্যক্ষ, সর্বাধিনায়ক। হাতে সে তীর। হঠাৎ সাওয়াদের পেটে একটি খোঁচা দিয়ে তিনি ধমক দিলেন, সোজা হয়ে দাঁড়াও।
না-তেমন কঠিন কিছু নয়। মারাত্মক ঘটল না কিছু। অঘটন নয়। সহজ হয়ে দাঁড়ালেন। ভাঙা কাতার সোজা করে দিলেন সেনাপতি। যাবার জন্য পা তুলেছেন, অঘটন ঘটালেন আহত সাওয়াদ (রা)। তীরের খোঁটায় কিছুটা আহত হয়েছিলেন তিনি। অকস্মাৎ জামা তুলে সে আহত জায়গাটা দেখালেন। এরপর বজ্রপাতের মত অঘটন ঘটিয়ে নির্বাক করে দিলেন সকলকে। প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আল্লাহ্ আপনাকে পাঠিয়েছেন মানুষকে পথ দেখানোর জন্য। পাঠিয়েছেন রহমত স্বরূপ। আশিস স্বরূপ। দয়া স্বরূপ। অথচ দয়ার বদলে আপনি আমাকে আঘাত দিলেন, ব্যথা দিলেন, আহত করলন। এরপরই বলল সে চমক দেয়া কথা: আমি এর প্রতিশোধ চাই।
এ মুহূর্তে সকলেই অবাক! সকলেই বিস্মিত। কি আস্পর্ধা সাওয়াদের? এত বড় অপরাধের পর কোথায় মাথা নীচু করবে, মাফ চাইবে-তা নয়, উল্টা চাপ!
স্পর্ধিত গলায় সে রাসূলুল্লাহ (স)-কেই দোষী করছে! কি সর্বনাশ! সে বড় অহংকারী হয়েছে। ছোট মুখে এতবড় কথা। তীর দিয়ে ভুঁড়িটা এ ফোঁড় ফোঁড় করে দেন নি এই ত ভাগ্য!
নিশ্চয়ই এ অপরাধের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। সাহাবীরা মনে মনে গর্জাচ্ছিলেন। বলতে যাচ্ছিলেন কেউ কেউ, এ ঔদ্ধত্যের শাস্তি কতল। বলতে গিয়ে বলতে পারছিলেন না। সকলেই ভয়ঙ্কর ভাবে নির্ভর করছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর। সে দিকে তাকিয়ে ছিলেন সকলেই।
কয়েকটি মাত্র মুহূর্ত! কাটল আশ্চর্য নীরবাতায়। রাসূলুল্লাহ (স) তাকালেন সাওয়াদের পেটের দিকে। সত্যিই আহত হয়েছে সে। ক্ষতস্থানে রক্ত দেখা দিয়েছে দু-এক ফোটা। তাই দেখেই যন্ত্রণায় আচমকা একটা ঝড়ো ধাক্কার বুকের হাড়গুলো চূর্ণ হয়ে যেতে চাইল রাসূলুল্লাহ (স)-এর। ঘাসের ডগায় টোপ ধরা শিশিরের মত কাতর চোখ দুটি ছলছল। হায় আমি আমার সন্তানকে আহত করলাম! এ অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে আমি আল্লাহ্ কাছে মুখ দেখাব কি করে!
অগণিত সৈনিকের নির্বাক দৃষ্টি স্থির। অকস্মাৎ রাসূলুল্লাহ (স) পরনের জামা উঁচু করলন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সাওয়াদকে বলল, এরপর, আমি প্রস্তুত। এ আমার উন্মুক্ত দেহ আর এ নাও তীর। প্রতিশোধ গ্রহণ কর। কথাগুলো ভয়ঙ্কর রকম বেদনা মলিন আর কাতর শোনাল।
তিন শ তের জন সৈন্য। ছশ ছাব্বিশটি নীরব চোখ এখন স্বপ্নাবিষ্ট। যেন একটা অপার্থিব দৃশ্য দেখলেন তাঁরা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ্র দেহ মুবারক সকলের সামনে দৃশ্যমান আর সে শুভ্র দেহের অধিকারী যে মানুষ তাঁর শুভ্রতর মনও। যা কোন অপরাধ নয়, যার জন্য কেউ কোনদিন অপরাধী হয়নি অন্যের গুরুতর অপরাধ ভুলে গিয়ে সে ত্রুটির জন্য রাসূলুল্লাহ (স) কাঁদছেন! সে অপরাধের জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী!! তিনি নতজানু! ভাবা যায় না।
আকাশ নির্বাক। জগত নির্বাক। নির্বাক বদর প্রান্তর। একজন সাধারণ সৈনিকের সামনে রাসূলুল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থী। রাসূলুল্লাহ (স) নতজানু। ভক্তিতে সম্ভ্রমে শ্রদ্ধায় প্রতিটি সৈনিকের অর্ন্তজগত প্লাবিত হয়ে গেল। এ হল তাঁদের সিপাহসালার! এ হল তাঁদের সর্বাধিনায়ক!
রাসূলুল্লাহ (স) এ সীমাহীন মহত্বের কাছে সকলে যেন বিগলিত হয়ে গেল। সমর্পিত হয়ে গেল। সে শুভ্রতার দিকে তাঁরা যত দৃষ্টিক্ষেপ করেন, ভালবাসা বেড়ে যায় তত। শেষে তাঁদের মনে হল, এ অলৌকিক দৃশ্যটি দেখে তাঁরাও যেন অলৌকিক হয়ে উঠেছেন। নিজের মধ্যে নিজেরা বহুগুণ মহৎ হয়েছেন। বহুগুন বীর্যবান হয়েছেন।
এ মহান সিপাহসালারের অধীনে অবশেষে বদরের বিশাল প্রান্তরের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করেন তাঁরা। সে দৃষ্টিতে ভীষণ প্রতীজ্ঞা। সে দৃষ্টিতে এখন যুদ্ধজয়ের ইশারা।

📘 হাদিসের গল্প > 📄 হৃদয়ের পরিবর্তন

📄 হৃদয়ের পরিবর্তন


তাকে দেখা মাত্রই বুক থেকে জলন্ত উত্তেজনা লাফিয়ে উঠে সারা অঙ্গে ছড়িয়ে গেল সকলের। উলঙ্গ তরবারি নিয়ে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলেন অনেকেই। বর্শা-বল্লমে আমূল বিদ্ধ করতে চাইলেন কেউ কেউ। এক আকাশ গর্জন গলায় নিয়ে দলবদ্ধভাবে চিৎকার করে উঠতে চাইলেন, তাঁরা কতল! কতল!!
অসম্ভব উত্তেজনার ফুটন্ত পানির মত কাঁপছিলেন সকলেই। কেবল সে মুবারক মুনাষটি সামনে ছিলেন তাই, আগাম আঁধার বাধা পেয়ে সরে গেল। নইলে মদীনার মাটিতে একটা রক্তাক্ত কাণ্ড ঘটে যেত এতক্ষণে।
বদরের বিজয়, এক স্বপ্নের বিজয়!
সে অলৌকিক বিজয়ের সত্তর জন যুদ্ধবন্দীকে সাথে নিয়ে বীর মুজাহিদগণ ফিরে এলেন মদীনায়। সারা মদীনা ভেঙে পল একযোগে। মাথায় ফেনপুঞ্জ নিয়ে উদ্দাম স্রোতধারা এগিয়ে আসে যেমন, উৎসাহ উদ্দীপনায় এমনি আন্দোলিত হচ্ছিলেন সকলেই। সম্বর্ধনার অভিসিক্ত মুসলিম সৈনিকদের দেহ থেকে ক্লান্তিগুলো জীর্ণ পাতার মত খসে পড়ছিল। প্রিয়জনদের সাথে একে একে মিলিত হচ্ছিলেন তাঁরা। সে উৎসব মুখর মজলিশে কেবল স্নানমুখ হয়েছিল যুদ্ধবন্দীরা। উদ্ধত কুরাইশ শিরগুলো এখন নতমুখ বিষণ্ণ এবং ম্লান। আতঙ্ক আর সংশয়ে ম্রিয়মান মুখগুলো ক্রমান্বয়ে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। অজানা তকদিরের চারপাশ ঘিরে চাপ চাপ কাল আঁধার। অনেক মুসলমানের নির্যাতন এবং হত্যায় তাদের রক্তাক্ত হাতগুলো ভয়ানক ভাবে কলঙ্কিত। নিজেদের অতীত কার্য তালিকাগুলোতে নিজেরা চোখ বুলিয়ে দেখল, সে কদর্য দিনগুলো বিষাক্ত সরীস্বপের মত ভয়ঙ্কর ভাবে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। এখনো যে বেঁচে আছে এটাই অনেকের কাছে আশ্বর্যবোধ হচ্ছে। তাদের হাতে মুসলমানেরা বন্দী হলে? মক্কা পর্যন্ত জামাই আদরে বয়ে নিয়ে যেত না নিশ্চয়ই। আবু জাহল বেঁচে থাকলে যুদ্ধের ময়দানেই তাদের রক্তে গোসল করত। তা হলে? মদীনার মাটিতে দাঁড়িয়ে কুরাইশ বন্দীরা আপনার মতেই প্রশ্ন রাখল, তা হলে এতক্ষণ যে আমরা বেঁচে আছি এটাই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়?
একে একে জাহান্নামের কীটগুলোকে রাসূলুল্লাহর সামনে হাজির করা হচ্ছিল। দলবদ্ধ সাহাবীরা ছিলেন চারপাশে। ঝড়ে ভেঙে পড়া নারকেল গাছের মত ভাঙা ঘাড় নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল এক এক শয়তান।
এক সময় এল আর এক মুশরিক-সোহাইল। সোহাইল ইবনে অমর। পানি যেখানে বেশি, সমুদ্র সেখানে ঘর কাল। কত বড় অপরাধী সে যে তার মুখটা এমন অস্বাভাবিক ভাবে বিবর্ণ? আতঙ্কিত সোহাইলের বিকৃত মুখ দেখে কোন মানুষের মুখ বলেই মনে হল না।
সোহাইল!
ঘৃণিত সে নামটা উচ্চারিত হবার সাথে সাথেই চারদিক থেকে একযোগে শব্দ উঠল, কতল! কতল!! সে ক্রোধের গুঞ্জন তরঙ্গের আকারে সমবেত সাহাবীদের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। নীরব রাসূলুল্লাহ (স) সকলের মুখের দিকে একবার চোখ তুলে তাকালেন কেবল।
সোহাইল সাহিত্যিক। মক্কার সীমানা ছাড়িয়ে তাই এ সাহিত্য খ্যাতি দূর বিস্তৃত হয়ে পিেছল। সে ছিল একজন ভাল বক্তা। তার এ অনর্গল বক্তৃতাবাজিতে মুগ্ধ হয়েছিল কুরাইশগণ, আকৃষ্ট হয়েছিল হেজাজের অনেক মানুষ। কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী এ নরাধম, তার এ মহৎ ক্ষমতাকে পুরোপুরি নিয়োগ করেছিল এক অসৎ কর্মতৎপরতায়। নবী (স)-এর কুৎসা রটনাই হয়ে উঠেছিল তার রাতদিনের ধ্যান ও জ্ঞানে। হাটে-মাটে গ্রামে-গঞ্জে শহরে-নগরে মেলায়-জলসায় যেখানেই জনসমাগম, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিন্দায় সেখানেই সোহাইল মুখর। কখনো রাসূল (স)-এর অবস্থান কখনো বংশের তাঁর আব্বা, আম্মার, কখনো তাঁর চরিত্রের, কখনো ইসলামের, কখনো নবুয়তের, এমন কি কখনো মহান আল্লাহ্ সম্পর্কে তার মনে যা আসত তাই বলত। বলে ক্ষণিকের জন্য নীলাকাশে রামধনুর নয়নাভিরাম মিথ্যা বর্ণনালীর মত মানুষের মনে প্রভাব ছড়িয়ে বাহবা কুড়াত। সবই মনগড়া, সবই বানানো, সবই মিথ্যা। কিন্তু সাহিত্যেকের ভাষায় রং চড়িয়ে সে এমনভাবে প্রকাশ করত, সমবেত মানুষেরা খুবই মজা পেত। তাই এ কুৎসা রটনা, এ গালি-গালাজ, এ নিন্দা প্রচার সকল সময়ই সীমা অতিক্রম করে যেত। কখনো কখনো নেমে আসত অশ্লীলতার পর্যায়ে। এ সব শুনতে শুনতে কুরাইশরা যখন মহানন্দে ঢলে পড়ে হাসি তামাশায়, তখন গভীর বিষাদে নীরব হয়ে যেতেন মুসলমানেরা। আর রাসূল (স) সে ভয়ঙ্কর অত্যাচারের দিনগুলোতে সে কটাক্ষ ও নির্যাতনের মুহূর্তগুলোতে পরিপূর্ণ রূপে সবর করে নীরব হয়ে থাকত আল্লাহ্ পাকের রহমতের আশায়।
সে ইবলিশ সোহাইল আজ যুদ্ধবন্দী। অসংখ্য মুসলমানের মধ্যে আজ সে অসহায় শয়তান আতঙ্কিত। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে শয়তানটিকে আনার সাথে সাথেই চারদিক থেকে ধ্বনি উঠল, কতল! কতল!!
অর্থাৎ- ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! এ দুষমনকে মুক্তিপন নিয়ে ছেড়ে দেবেন না। এর একমাত্র শাস্তি, কতল। এ বিনীত অনুরোধটুকু রাসূলুল্লাহ (স)-এর কদম মুবারকের কাছে রেখে বিশাল জনতা নীরব হয়ে গেল।
আল্লাহ্র রাসূল ধীরে ধীরে তাঁর উজ্জল মুখটা তুলে ধরে জনতার দিকে ফিরে তাকালেন। কোন কথা বলল না। হযরত উমর ছিলেন কাছেই। তিনি উপলব্ধি করলেন, জনতার এ নির্মম প্রস্তাব হয়ত রাসূল (স)-এর মনপুত হয়নি। তাই একটু নীরব থেকে আর একটু নমনীয় শাস্তির আরয করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! আদেশ করুন, আমি এ মুশরিকের সামনে দাঁত দুটি উপড়ে দিই। তাহলে আর ঠিক মত কথা বলতে পারবে না, নিন্দা রটনা বন্ধ হয়ে যাবে।
ধীরে ধীরে সকলেই সমর্থন করলেন কথাটার। সঙ্গত প্রস্তাব। উত্তম প্রস্তাব। এরপর হযরত উমর (রা) সহ সকলে একযোগে তাকালেন নবী (স)-এর দিকে।
কথাটা শুনেই চোখ বন্ধ করে নিয়েছিলেন তিনি। অনেক- অনেক পরে চোখ খুলে তাকালেন। সে চোখে রহমতের দৃষ্টি। নিশ্চুপ জনতা রায় শোনার জন্য ব্যাকুল আগ্রহে অধীর। সে পবিত্র মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাঁরা গুনছেন। সকলেই অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন কিছু বলার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঠোঁট দুটি যেন নড়ে উঠছে। অবাক বিস্ময়ে এরপর শুনলেন সকলে, তিনি বলছেন:
আমি নবী হয়েও যদি তার অঙ্গ বিকৃতি করি তা হলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ আমার অঙ্গ বিকৃত করে প্রতিশোধ নিতে পারেন।
তখনো তাকিয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। সে চোখে ঘৃণা নেই। প্রতিহিংসা নেই। বিদ্বেষ নেই। রহমতের অবিশ্রান্ত ধারায় যেন সব কিছু ভেসে যাচ্ছে।
অন্ধকারে বাস করে সরীসৃপ। আদমের জন্য চাই আলো। অন্ধকারে সে আলো জ্বালিয়ে দিলেন রাসূলুল্লাহ (স) প্রেমের আলো। ভালবাসার আলো। ক্ষমার আলো।

তাকে দেখা মাত্রই বুক থেকে জলন্ত উত্তেজনা লাফিয়ে উঠে সারা অঙ্গে ছড়িয়ে গেল সকলের। উলঙ্গ তরবারি নিয়ে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলেন অনেকেই। বর্শা-বল্লমে আমূল বিদ্ধ করতে চাইলেন কেউ কেউ। এক আকাশ গর্জন গলায় নিয়ে দলবদ্ধভাবে চিৎকার করে উঠতে চাইলেন, তাঁরা কতল! কতল!!
অসম্ভব উত্তেজনার ফুটন্ত পানির মত কাঁপছিলেন সকলেই। কেবল সে মুবারক মুনাষটি সামনে ছিলেন তাই, আগাম আঁধার বাধা পেয়ে সরে গেল। নইলে মদীনার মাটিতে একটা রক্তাক্ত কাণ্ড ঘটে যেত এতক্ষণে।
বদরের বিজয়, এক স্বপ্নের বিজয়!
সে অলৌকিক বিজয়ের সত্তর জন যুদ্ধবন্দীকে সাথে নিয়ে বীর মুজাহিদগণ ফিরে এলেন মদীনায়। সারা মদীনা ভেঙে পল একযোগে। মাথায় ফেনপুঞ্জ নিয়ে উদ্দাম স্রোতধারা এগিয়ে আসে যেমন, উৎসাহ উদ্দীপনায় এমনি আন্দোলিত হচ্ছিলেন সকলেই। সম্বর্ধনার অভিসিক্ত মুসলিম সৈনিকদের দেহ থেকে ক্লান্তিগুলো জীর্ণ পাতার মত খসে পড়ছিল। প্রিয়জনদের সাথে একে একে মিলিত হচ্ছিলেন তাঁরা। সে উৎসব মুখর মজলিশে কেবল স্নানমুখ হয়েছিল যুদ্ধবন্দীরা। উদ্ধত কুরাইশ শিরগুলো এখন নতমুখ বিষণ্ণ এবং ম্লান। আতঙ্ক আর সংশয়ে ম্রিয়মান মুখগুলো ক্রমান্বয়ে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। অজানা তকদিরের চারপাশ ঘিরে চাপ চাপ কাল আঁধার। অনেক মুসলমানের নির্যাতন এবং হত্যায় তাদের রক্তাক্ত হাতগুলো ভয়ানক ভাবে কলঙ্কিত। নিজেদের অতীত কার্য তালিকাগুলোতে নিজেরা চোখ বুলিয়ে দেখল, সে কদর্য দিনগুলো বিষাক্ত সরীস্বপের মত ভয়ঙ্কর ভাবে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। এখনো যে বেঁচে আছে এটাই অনেকের কাছে আশ্বর্যবোধ হচ্ছে। তাদের হাতে মুসলমানেরা বন্দী হলে? মক্কা পর্যন্ত জামাই আদরে বয়ে নিয়ে যেত না নিশ্চয়ই। আবু জাহল বেঁচে থাকলে যুদ্ধের ময়দানেই তাদের রক্তে গোসল করত। তা হলে? মদীনার মাটিতে দাঁড়িয়ে কুরাইশ বন্দীরা আপনার মতেই প্রশ্ন রাখল, তা হলে এতক্ষণ যে আমরা বেঁচে আছি এটাই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়?
একে একে জাহান্নামের কীটগুলোকে রাসূলুল্লাহর সামনে হাজির করা হচ্ছিল। দলবদ্ধ সাহাবীরা ছিলেন চারপাশে। ঝড়ে ভেঙে পড়া নারকেল গাছের মত ভাঙা ঘাড় নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল এক এক শয়তান।
এক সময় এল আর এক মুশরিক-সোহাইল। সোহাইল ইবনে অমর। পানি যেখানে বেশি, সমুদ্র সেখানে ঘর কাল। কত বড় অপরাধী সে যে তার মুখটা এমন অস্বাভাবিক ভাবে বিবর্ণ? আতঙ্কিত সোহাইলের বিকৃত মুখ দেখে কোন মানুষের মুখ বলেই মনে হল না।
সোহাইল!
ঘৃণিত সে নামটা উচ্চারিত হবার সাথে সাথেই চারদিক থেকে একযোগে শব্দ উঠল, কতল! কতল!! সে ক্রোধের গুঞ্জন তরঙ্গের আকারে সমবেত সাহাবীদের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। নীরব রাসূলুল্লাহ (স) সকলের মুখের দিকে একবার চোখ তুলে তাকালেন কেবল।
সোহাইল সাহিত্যিক। মক্কার সীমানা ছাড়িয়ে তাই এ সাহিত্য খ্যাতি দূর বিস্তৃত হয়ে পিেছল। সে ছিল একজন ভাল বক্তা। তার এ অনর্গল বক্তৃতাবাজিতে মুগ্ধ হয়েছিল কুরাইশগণ, আকৃষ্ট হয়েছিল হেজাজের অনেক মানুষ। কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী এ নরাধম, তার এ মহৎ ক্ষমতাকে পুরোপুরি নিয়োগ করেছিল এক অসৎ কর্মতৎপরতায়। নবী (স)-এর কুৎসা রটনাই হয়ে উঠেছিল তার রাতদিনের ধ্যান ও জ্ঞানে। হাটে-মাটে গ্রামে-গঞ্জে শহরে-নগরে মেলায়-জলসায় যেখানেই জনসমাগম, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিন্দায় সেখানেই সোহাইল মুখর। কখনো রাসূল (স)-এর অবস্থান কখনো বংশের তাঁর আব্বা, আম্মার, কখনো তাঁর চরিত্রের, কখনো ইসলামের, কখনো নবুয়তের, এমন কি কখনো মহান আল্লাহ্ সম্পর্কে তার মনে যা আসত তাই বলত। বলে ক্ষণিকের জন্য নীলাকাশে রামধনুর নয়নাভিরাম মিথ্যা বর্ণনালীর মত মানুষের মনে প্রভাব ছড়িয়ে বাহবা কুড়াত। সবই মনগড়া, সবই বানানো, সবই মিথ্যা। কিন্তু সাহিত্যেকের ভাষায় রং চড়িয়ে সে এমনভাবে প্রকাশ করত, সমবেত মানুষেরা খুবই মজা পেত। তাই এ কুৎসা রটনা, এ গালি-গালাজ, এ নিন্দা প্রচার সকল সময়ই সীমা অতিক্রম করে যেত। কখনো কখনো নেমে আসত অশ্লীলতার পর্যায়ে। এ সব শুনতে শুনতে কুরাইশরা যখন মহানন্দে ঢলে পড়ে হাসি তামাশায়, তখন গভীর বিষাদে নীরব হয়ে যেতেন মুসলমানেরা। আর রাসূল (স) সে ভয়ঙ্কর অত্যাচারের দিনগুলোতে সে কটাক্ষ ও নির্যাতনের মুহূর্তগুলোতে পরিপূর্ণ রূপে সবর করে নীরব হয়ে থাকত আল্লাহ্ পাকের রহমতের আশায়।
সে ইবলিশ সোহাইল আজ যুদ্ধবন্দী। অসংখ্য মুসলমানের মধ্যে আজ সে অসহায় শয়তান আতঙ্কিত। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে শয়তানটিকে আনার সাথে সাথেই চারদিক থেকে ধ্বনি উঠল, কতল! কতল!!
অর্থাৎ- ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! এ দুষমনকে মুক্তিপন নিয়ে ছেড়ে দেবেন না। এর একমাত্র শাস্তি, কতল। এ বিনীত অনুরোধটুকু রাসূলুল্লাহ (স)-এর কদম মুবারকের কাছে রেখে বিশাল জনতা নীরব হয়ে গেল।
আল্লাহ্র রাসূল ধীরে ধীরে তাঁর উজ্জল মুখটা তুলে ধরে জনতার দিকে ফিরে তাকালেন। কোন কথা বলল না। হযরত উমর ছিলেন কাছেই। তিনি উপলব্ধি করলেন, জনতার এ নির্মম প্রস্তাব হয়ত রাসূল (স)-এর মনপুত হয়নি। তাই একটু নীরব থেকে আর একটু নমনীয় শাস্তির আরয করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! আদেশ করুন, আমি এ মুশরিকের সামনে দাঁত দুটি উপড়ে দিই। তাহলে আর ঠিক মত কথা বলতে পারবে না, নিন্দা রটনা বন্ধ হয়ে যাবে।
ধীরে ধীরে সকলেই সমর্থন করলেন কথাটার। সঙ্গত প্রস্তাব। উত্তম প্রস্তাব। এরপর হযরত উমর (রা) সহ সকলে একযোগে তাকালেন নবী (স)-এর দিকে।
কথাটা শুনেই চোখ বন্ধ করে নিয়েছিলেন তিনি। অনেক- অনেক পরে চোখ খুলে তাকালেন। সে চোখে রহমতের দৃষ্টি। নিশ্চুপ জনতা রায় শোনার জন্য ব্যাকুল আগ্রহে অধীর। সে পবিত্র মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাঁরা গুনছেন। সকলেই অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন কিছু বলার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঠোঁট দুটি যেন নড়ে উঠছে। অবাক বিস্ময়ে এরপর শুনলেন সকলে, তিনি বলছেন:
আমি নবী হয়েও যদি তার অঙ্গ বিকৃতি করি তা হলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ আমার অঙ্গ বিকৃত করে প্রতিশোধ নিতে পারেন।
তখনো তাকিয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। সে চোখে ঘৃণা নেই। প্রতিহিংসা নেই। বিদ্বেষ নেই। রহমতের অবিশ্রান্ত ধারায় যেন সব কিছু ভেসে যাচ্ছে।
অন্ধকারে বাস করে সরীসৃপ। আদমের জন্য চাই আলো। অন্ধকারে সে আলো জ্বালিয়ে দিলেন রাসূলুল্লাহ (স) প্রেমের আলো। ভালবাসার আলো। ক্ষমার আলো।

📘 হাদিসের গল্প > 📄 আলোকিত পথের সন্ধান

📄 আলোকিত পথের সন্ধান


হিববারের চলায় আজ কোন অহংকার ছিল না। তার গমনে আজ সে দুর্বিনীত ভাব নেই। হাঁটা থেকে হিংস্রতা ঝরে গেছে। গতি শ্লথ। বিষণ্ণতায় স্নান। তিন লাফে যে রাস্তাটা পার হত, এখন তাতে সময় লাগছে প্রচুর। আস্তে আস্তে পথ হাঁটছিল সে। খুর্মা গাছের তলা দিয়ে তরমুজ ক্ষেত পেরিয়ে রাস্তায় উঠল। এক সময় এরপর ধীরে ধীরে সূর্যের দিকে তাকাল হিববার। হাত আড়াল করা সূর্যের চকিত ঝলকানিতে চোখ দুটি অন্ধ হয়ে যাবে বুঝি। সাথে সাথে মাথাটা নামিয়ে নিল সে। সকাল হতে না হতেই সূর্যটা এমন তেজে বেড়ে উঠেছে! মনের মধ্যে এমনতর কথাবার্তা আর জিজ্ঞাসারা চলাচল করছিল তার। সে ঝিমিয়ে পড়া বিমর্ষতার অকস্মাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা মনে হতেই সে প্রচুর চঞ্চলতা ফিলে পেল। ঠিক এ সূর্যের মত, ভাবল সে। সকাল হতে না হতেই হিজাজের একছত্র অধিপতি হয়ে বসেছেন! এ মাত্র আট বছর, মক্কা থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দিলাম লাঞ্ছিত করে। আর আজ? সে মক্কা তাঁর হাতের কজায়। তিনি মারলে আমরা মরব, বাঁচালে বাঁচব। আজ আমরা তাঁর দয়ার ভিখিরী।
ভিখারী? ভিক্ষা চাইব? কখনো না। অনড় প্রতিজ্ঞায় মনটাকে স্থির করতে চাইল হিববার। হিববার ইবনে আসোয়াদ। মক্কাবাসী এক মুশরিক। দেশ ছেড়ে ইরাণে যাব। সেখানে গিয়ে মানসম্মান নিয়ে বাঁচব আবার। তবুও মক্কার কুরাইশ-শত্রুর কাছে মাথা নত করব না।
দেশান্তরী হবার জন্য মরুর মাটিতে পা রাখল হিববার।
ভাবল পালিয়ে গেলেই কি বাঁচা যায়? দেহের কাল ছায়াটা দূরে সরিয়ে দিতে পারে মানুষ? ফেলে আসা অতীতটাকে ত্যাগ করতে পারে কেউ? তাঁর কলঙ্কিত কাল অতীতটা হিবারের মনে কাঁটার মত বিঁধছিল। পথ চলতে চলতে ফেলে আসা দিনগুলো জরিপ করে দেখল, শান্তি পাওয়ার মত একটি আশ্রয়ও নেই সেখানে। ফেলে আসা জীবনের সবটাই যেন রক্তাক্ত, সবটাই অভিশপ্ত। অথচ আশ্চর্য! এ বিষাক্ত আবহাওয়ায় একদিন সে উন্মাদ হয়ে ঘুরেছে। উৎসাহ ভরে কত মুসলমানের সর্বনাশ করেছে। অত্যাচারে নির্যাতনে অস্থির করে তুলেছে তাঁদের। যয়নাবের ঘটনাটি এখন সব চেয়ে আহত করছে তাকে। যয়নাবের যন্ত্রণা কাতর মুখটা যদি ভুলতে পারত সে!
বদর যুদ্ধের ঠিক এক মাস পর।
মক্কার তখন চলছে মাতম। পরাজয়ের যন্ত্রণা তখন আগুন হয়ে জ্বলছে প্রতিটি কুরাইশের পাঁজরে। এরই মধ্যে আবুল আস তার স্ত্রী যয়নাবকে মদীনায় যাবার অনুমতি দিল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা যয়নাব, আবুল আসের স্ত্রী। সতর্কতার সাথেই চলছিল সব কাজ তবুও কোন কিছুই গোপন থাকল না শেষ পর্যন্ত। হাওয়ার মত সংবাদটা ছড়িয়ে গেল মক্কার আশেপাশে।
লাফ দিয়ে উঠল কুরাইশরা, এতবড় কথা। বুকের উপর দিয়ে চরম শত্রুর মেয়ে নিরাপদে হিযরত করে যাবে মদীনায়? সাথে আরো কিছু কুরাইশ নিয়ে ছুটল হিববার। দীর্ঘ বর্শা হাতে মক্কায় উপকণ্ঠের কাফেলার গতিরোধ করে দাঁড়াল তারা। উটের পেটে সজোরে একটা খোঁচা মেরে রূঢ় গলায় চিৎকার করে উঠল হিববার, থাম। অকস্মাৎ খোঁচা খেয়ে ভীষণ জোরে লাফিয়ে উঠল সে উট। যয়নাব আসনচ্যুত হয়ে, বোঁটা ছেঁড়া পাকা ফলের মত সজোরে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে গেলেন। আসন্ন প্রসবা ছিলেন তিনি। সীমাহীন যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সেখানে, তিনি জনশূন্য মরুর মাঝে প্রসব হয়ে গেল তাঁর। দুঃসহ যন্ত্রণায় সে হাত-পা ছোড়া, ব্যথাভরা সে করুন মুখটা আজ যেন বড় ভয়ঙ্কর ভাবে তাড়া করে ফিরছে তাকে। ভাবনার কোলাহল থেকে সে মুখটাকে নির্বাসন দিতে পারলে বড়ই ভাল হত! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে আবার নীরব হয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত বিবেকের কাছে ভয়ানক ভাবে লাঞ্ছিত আর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল হিববার। তার পাপ ক্রমাগত তাকে আহত করছিল। বীভৎস একটা কাল ছায়া আতঙ্কিত ভাবে তাড়া করে ফিরছিল তাকে। স্ত্রী-পুত্র ছেড়ে অজানার পথে গিয়ে কি লাভ? এর চেয়ে তাঁর কাছেই যাই না কেন? এত মানুষকে ক্ষমা করেছেন আর আমি অধম ভিক্ষা থেকে বঞ্চিত হব? ক্ষমা পাব না তাঁর?
সর্বশেষ সিদ্ধান্তক্রমে ইরান নয়, ইয়ামান নয়, শেষ পর্যন্ত মদীনার পথেই পা বাড়াল হিববার।
গতি শ্লথ। বিষণ্ণতায় ক্লান্ত সে। মদীনার প্রবেশ মুখে যেন পা উঠছিল না তার। অনেক দ্বিধা মনে, অনেক সংশয়। ক্ষমা করবে ত ঠিক? না কি কতল? নিজের মনে অবিরামভাবে কথা বলছিল হিববার, যে পাপ করেছি- অবশ্য ক্ষমা নেই তার। তবে তিনি হিন্দাকেও ক্ষমা করেছেন। আবু জাহলের পুত্র ইকরামা- তাকেও। তা হলে কি আমি? পদ্মাপাতায় যেন শিশিরের টোপ। সংশয়ের ভীষণ দোলায় দুলছিল হিববার; ওরা ক্ষমা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু আমার উপরে কিন্তু কতলের নির্দেশ। তাহলে কি......। ইয়া রাসূলুল্লাহ!
হিববারের চোখে অশ্রুসজল। ধরা গলা। শ্রদ্ধার সম্ভ্রম স্বর বিনম্র। সাহাবা পরিবেষ্টিত হয়েছিলেন নবী (স)। অশ্রুসিক্ত স্বরে উৎকর্ণ হয়ে সকলেই এক সাথে ফিরে তাকালেন।
ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি হিববার।
সাথে সাথে গুঞ্জন উঠল চারদিক থেকে, কতল! কতল!! কোন কথা নয়, একমাত্র শাস্তি কতল। হে আল্লাহ্র রাসূল (স)! আদেশ করুন-এ মহাপাতকের গর্দান উড়িয়ে দিই।
কোন কথা না বলে শুভ্র হস্ত মুবারকটি উপরে তুললেন কেবল, অর্থাৎ থাম। কি বলতে চায়, একে বলতে দাও।
নির্জন নীরবতায় চারপাশটা ডুবে গেল আবার।
সে স্নিগ্ধ হাতে ছিল ভোরের শান্ত হাওয়া, ছিল অগাধ মমতা। আর তাতেই হিবাবারের ব্যাকুলতা বেড়ে গেল বহুগুণ। সে আকুলি বিকুলি হয়ে কাঁদতে থাকল। যেমন কখনো কখনো ভালবাসার স্পর্শে আমরা অনায়াসে অশ্রুপাত করি।
ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার সম্পর্কে যা শুনেছেন তা সত্য, সম্পূর্ণ সত্য। এ হাত দিয়ে আমি অনেক মুসলমানকে রক্তাক্ত করেছি, নির্মম নির্যাতনে অতিষ্ঠ করেছি তাঁদের। আর এ হাত দিয়েই যয়নাবকে ......
হিববার ডুকরে কেঁদে উঠল। কথা শেষ করা হল না আর। করতে পারল না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হিববার কাঁদতে থাকল।
দাঁতের বদলে দাঁত। খুনের বদলে খুন। কতলে কতল। এ নিয়মই চলে আসছিল হিজাজে। আবাহমানকাল থেকে।
তখন সকলে ভীষণ ব্যগ্রভাবে তাকিয়ে আছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। কি করবেন তিনি? বন্দী? নির্মম প্রহার? অথবা কতল?
কয়েকটি মুহর্ত মাত্র। বিস্ময়কর অবাক চাউনি মেলে সকলে দেখলেন: নবী (স) আপনার রহমতের বাহু দুটি প্রসারিত করে দিয়েছেন হিববারের দিকে। তার কলঙ্কিত হাত দুটি ধরে ধীরে ধীরে টেনে তুলছেন।
সকলের মনে হল: ঘন অন্ধকার ঠেলে ভোরের সূর্যের উঠে আসার মত একটি অন্ধকার হৃদয় যেন আলোর দিকে উঠে আসছে। আঁধার রাতের ম্রিয়মান পদ্মের নিষ্প্রভ দলগুলো সুবহি সাদিকের স্নিগ্ধ আলোর আবার চোখ মেলছে। অগাধ আলোর স্পর্শের তার বিষণ্ণ দলগুলো আবার খুলে যাচ্ছে। আবার সুরভিত হচ্ছে। আলোকিত হচ্ছে।

হিববারের চলায় আজ কোন অহংকার ছিল না। তার গমনে আজ সে দুর্বিনীত ভাব নেই। হাঁটা থেকে হিংস্রতা ঝরে গেছে। গতি শ্লথ। বিষণ্ণতায় স্নান। তিন লাফে যে রাস্তাটা পার হত, এখন তাতে সময় লাগছে প্রচুর। আস্তে আস্তে পথ হাঁটছিল সে। খুর্মা গাছের তলা দিয়ে তরমুজ ক্ষেত পেরিয়ে রাস্তায় উঠল। এক সময় এরপর ধীরে ধীরে সূর্যের দিকে তাকাল হিববার। হাত আড়াল করা সূর্যের চকিত ঝলকানিতে চোখ দুটি অন্ধ হয়ে যাবে বুঝি। সাথে সাথে মাথাটা নামিয়ে নিল সে। সকাল হতে না হতেই সূর্যটা এমন তেজে বেড়ে উঠেছে! মনের মধ্যে এমনতর কথাবার্তা আর জিজ্ঞাসারা চলাচল করছিল তার। সে ঝিমিয়ে পড়া বিমর্ষতার অকস্মাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা মনে হতেই সে প্রচুর চঞ্চলতা ফিলে পেল। ঠিক এ সূর্যের মত, ভাবল সে। সকাল হতে না হতেই হিজাজের একছত্র অধিপতি হয়ে বসেছেন! এ মাত্র আট বছর, মক্কা থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দিলাম লাঞ্ছিত করে। আর আজ? সে মক্কা তাঁর হাতের কজায়। তিনি মারলে আমরা মরব, বাঁচালে বাঁচব। আজ আমরা তাঁর দয়ার ভিখিরী।
ভিখারী? ভিক্ষা চাইব? কখনো না। অনড় প্রতিজ্ঞায় মনটাকে স্থির করতে চাইল হিববার। হিববার ইবনে আসোয়াদ। মক্কাবাসী এক মুশরিক। দেশ ছেড়ে ইরাণে যাব। সেখানে গিয়ে মানসম্মান নিয়ে বাঁচব আবার। তবুও মক্কার কুরাইশ-শত্রুর কাছে মাথা নত করব না।
দেশান্তরী হবার জন্য মরুর মাটিতে পা রাখল হিববার।
ভাবল পালিয়ে গেলেই কি বাঁচা যায়? দেহের কাল ছায়াটা দূরে সরিয়ে দিতে পারে মানুষ? ফেলে আসা অতীতটাকে ত্যাগ করতে পারে কেউ? তাঁর কলঙ্কিত কাল অতীতটা হিবারের মনে কাঁটার মত বিঁধছিল। পথ চলতে চলতে ফেলে আসা দিনগুলো জরিপ করে দেখল, শান্তি পাওয়ার মত একটি আশ্রয়ও নেই সেখানে। ফেলে আসা জীবনের সবটাই যেন রক্তাক্ত, সবটাই অভিশপ্ত। অথচ আশ্চর্য! এ বিষাক্ত আবহাওয়ায় একদিন সে উন্মাদ হয়ে ঘুরেছে। উৎসাহ ভরে কত মুসলমানের সর্বনাশ করেছে। অত্যাচারে নির্যাতনে অস্থির করে তুলেছে তাঁদের। যয়নাবের ঘটনাটি এখন সব চেয়ে আহত করছে তাকে। যয়নাবের যন্ত্রণা কাতর মুখটা যদি ভুলতে পারত সে!
বদর যুদ্ধের ঠিক এক মাস পর।
মক্কার তখন চলছে মাতম। পরাজয়ের যন্ত্রণা তখন আগুন হয়ে জ্বলছে প্রতিটি কুরাইশের পাঁজরে। এরই মধ্যে আবুল আস তার স্ত্রী যয়নাবকে মদীনায় যাবার অনুমতি দিল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা যয়নাব, আবুল আসের স্ত্রী। সতর্কতার সাথেই চলছিল সব কাজ তবুও কোন কিছুই গোপন থাকল না শেষ পর্যন্ত। হাওয়ার মত সংবাদটা ছড়িয়ে গেল মক্কার আশেপাশে।
লাফ দিয়ে উঠল কুরাইশরা, এতবড় কথা। বুকের উপর দিয়ে চরম শত্রুর মেয়ে নিরাপদে হিযরত করে যাবে মদীনায়? সাথে আরো কিছু কুরাইশ নিয়ে ছুটল হিববার। দীর্ঘ বর্শা হাতে মক্কায় উপকণ্ঠের কাফেলার গতিরোধ করে দাঁড়াল তারা। উটের পেটে সজোরে একটা খোঁচা মেরে রূঢ় গলায় চিৎকার করে উঠল হিববার, থাম। অকস্মাৎ খোঁচা খেয়ে ভীষণ জোরে লাফিয়ে উঠল সে উট। যয়নাব আসনচ্যুত হয়ে, বোঁটা ছেঁড়া পাকা ফলের মত সজোরে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে গেলেন। আসন্ন প্রসবা ছিলেন তিনি। সীমাহীন যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সেখানে, তিনি জনশূন্য মরুর মাঝে প্রসব হয়ে গেল তাঁর। দুঃসহ যন্ত্রণায় সে হাত-পা ছোড়া, ব্যথাভরা সে করুন মুখটা আজ যেন বড় ভয়ঙ্কর ভাবে তাড়া করে ফিরছে তাকে। ভাবনার কোলাহল থেকে সে মুখটাকে নির্বাসন দিতে পারলে বড়ই ভাল হত! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে আবার নীরব হয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত বিবেকের কাছে ভয়ানক ভাবে লাঞ্ছিত আর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল হিববার। তার পাপ ক্রমাগত তাকে আহত করছিল। বীভৎস একটা কাল ছায়া আতঙ্কিত ভাবে তাড়া করে ফিরছিল তাকে। স্ত্রী-পুত্র ছেড়ে অজানার পথে গিয়ে কি লাভ? এর চেয়ে তাঁর কাছেই যাই না কেন? এত মানুষকে ক্ষমা করেছেন আর আমি অধম ভিক্ষা থেকে বঞ্চিত হব? ক্ষমা পাব না তাঁর?
সর্বশেষ সিদ্ধান্তক্রমে ইরান নয়, ইয়ামান নয়, শেষ পর্যন্ত মদীনার পথেই পা বাড়াল হিববার।
গতি শ্লথ। বিষণ্ণতায় ক্লান্ত সে। মদীনার প্রবেশ মুখে যেন পা উঠছিল না তার। অনেক দ্বিধা মনে, অনেক সংশয়। ক্ষমা করবে ত ঠিক? না কি কতল? নিজের মনে অবিরামভাবে কথা বলছিল হিববার, যে পাপ করেছি- অবশ্য ক্ষমা নেই তার। তবে তিনি হিন্দাকেও ক্ষমা করেছেন। আবু জাহলের পুত্র ইকরামা- তাকেও। তা হলে কি আমি? পদ্মাপাতায় যেন শিশিরের টোপ। সংশয়ের ভীষণ দোলায় দুলছিল হিববার; ওরা ক্ষমা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু আমার উপরে কিন্তু কতলের নির্দেশ। তাহলে কি......। ইয়া রাসূলুল্লাহ!
হিববারের চোখে অশ্রুসজল। ধরা গলা। শ্রদ্ধার সম্ভ্রম স্বর বিনম্র। সাহাবা পরিবেষ্টিত হয়েছিলেন নবী (স)। অশ্রুসিক্ত স্বরে উৎকর্ণ হয়ে সকলেই এক সাথে ফিরে তাকালেন।
ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি হিববার।
সাথে সাথে গুঞ্জন উঠল চারদিক থেকে, কতল! কতল!! কোন কথা নয়, একমাত্র শাস্তি কতল। হে আল্লাহ্র রাসূল (স)! আদেশ করুন-এ মহাপাতকের গর্দান উড়িয়ে দিই।
কোন কথা না বলে শুভ্র হস্ত মুবারকটি উপরে তুললেন কেবল, অর্থাৎ থাম। কি বলতে চায়, একে বলতে দাও।
নির্জন নীরবতায় চারপাশটা ডুবে গেল আবার।
সে স্নিগ্ধ হাতে ছিল ভোরের শান্ত হাওয়া, ছিল অগাধ মমতা। আর তাতেই হিবাবারের ব্যাকুলতা বেড়ে গেল বহুগুণ। সে আকুলি বিকুলি হয়ে কাঁদতে থাকল। যেমন কখনো কখনো ভালবাসার স্পর্শে আমরা অনায়াসে অশ্রুপাত করি।
ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার সম্পর্কে যা শুনেছেন তা সত্য, সম্পূর্ণ সত্য। এ হাত দিয়ে আমি অনেক মুসলমানকে রক্তাক্ত করেছি, নির্মম নির্যাতনে অতিষ্ঠ করেছি তাঁদের। আর এ হাত দিয়েই যয়নাবকে ......
হিববার ডুকরে কেঁদে উঠল। কথা শেষ করা হল না আর। করতে পারল না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হিববার কাঁদতে থাকল।
দাঁতের বদলে দাঁত। খুনের বদলে খুন। কতলে কতল। এ নিয়মই চলে আসছিল হিজাজে। আবাহমানকাল থেকে।
তখন সকলে ভীষণ ব্যগ্রভাবে তাকিয়ে আছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। কি করবেন তিনি? বন্দী? নির্মম প্রহার? অথবা কতল?
কয়েকটি মুহর্ত মাত্র। বিস্ময়কর অবাক চাউনি মেলে সকলে দেখলেন: নবী (স) আপনার রহমতের বাহু দুটি প্রসারিত করে দিয়েছেন হিববারের দিকে। তার কলঙ্কিত হাত দুটি ধরে ধীরে ধীরে টেনে তুলছেন।
সকলের মনে হল: ঘন অন্ধকার ঠেলে ভোরের সূর্যের উঠে আসার মত একটি অন্ধকার হৃদয় যেন আলোর দিকে উঠে আসছে। আঁধার রাতের ম্রিয়মান পদ্মের নিষ্প্রভ দলগুলো সুবহি সাদিকের স্নিগ্ধ আলোর আবার চোখ মেলছে। অগাধ আলোর স্পর্শের তার বিষণ্ণ দলগুলো আবার খুলে যাচ্ছে। আবার সুরভিত হচ্ছে। আলোকিত হচ্ছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00