📘 হাদিসের গল্প > 📄 বিচারের কণ্ঠ

📄 বিচারের কণ্ঠ


ওসামা শঙ্কিত। ওসামা দ্বিধাজড়িত। তুবও ওসামা রাসূলুল্লাহ (স) দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। মৃদু পায়ে এগুচ্ছেন। ধীরেধীরে। খুবই বিনীত ভাবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর পালিত পুত্র যায়েদ। সে মুক্তদাস যায়েদের পুত্র ওসামা। ওসামা তরুণ। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পরম আদরের। এ তরুণ ক্রীতদাস পুত্র ওসামাকে আপন উটের উপর বসিয়ে নিয়ে মক্কা-বিজয়ের দিন শহরে প্রবেশ করলন রাসূলুল্লাহ (স)। ওসামাকে তিনি এতই ভালবাসেন। এত গভীর ছিল তাঁর মমতা।
এ অসীম আন্তরিকতার জন্যই ওসামা আজ দ্বিধাগ্রস্ত। হযরতের কাছে আসতে গিয়ে আজ তাঁর মনটা দুলে উঠছে বার বার। তবুও ওসামা এগুচ্ছেন। এক-পা এক-পা করে এগুচ্ছেন। তাঁর সাথে আছে আরো কয়েকজন। মখযুম গোত্রের কয়েকজন লোক। কুরাইশদেরই একটা শাখা বনী মখযুম গোত্র। বড় সম্মানিত গোত্র। বড় সম্ভ্রান্ত। অন্য গোত্রের বিচার শালিশী করে তারা। খোলা মাঠের পিঠে যেমন রোদ চড়ে থাকে, যেমন তাকে ফেলা যায় না কোন মতেই তেমনি মখযুমদের কড়া দৃষ্টি শাসন করে অন্য গোত্রদের। কারো শক্তি নেই সে দৃষ্টিকে উপেক্ষা করার। অবহেলা বরার। এ মখযুম গোত্রের এক মহিলা ধরা পড়েছে চুরির দায়ে। আর ধরা পড়তেই শুরু হয়েছে যত গোলযোগ। আগে হলে অবশ্য কোন কথা ছিল না। বেকসুর খালাস হয়ে যেত। কিন্তু মক্কা-বিজয়ের পরে সকলেই মুসলমান হয়ে গেছে। আর তাতেই যত ফ্যাসাদ। এখন চুরির শাস্তি হাতকাটা। আর সে কম কথা নয়।
এতবড় একটা সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ের হাতকাটা যাবে, আর সে কাটা হাত নিয়ে চলবে ফিরবে- কি লজ্জা! কি লজ্জা!!
তার পরিবারের সকলেই তাই এসে ধরেছে ওসামাকে। ওসামা বললে হয়ত কথা রাখবেন রাসূলুল্লাহ (স)। হযত হাত কাটবেন না। হয়ত মাফ করে দেবেন।
তা ছাড়া- এত বড় একটা মানী গোত্র। সম্ভ্রান্ত ঘর। মান-ইজ্জতের একটা ব্যাপার আছে। এসব কথা নিশ্চয়ই বিবেচনা করব। বিচারক রাসূলুল্লাহ (স) দৃষ্টি থেকে এসব নিশ্চয়ই এড়িয়ে যাবে না।
ওসামা এগুচ্ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। তাঁর সাথে যেতে যেতে এমন সব কথা চিন্তা করছিলেন সকলেই। এমন সব ন্যায় আর বিবেচনার কথা ভাবছিলেন মখযুম গোত্রের লোকেরা।
মক্কা-বিজয়ের আনন্দ মেটেনি তখনো। সে উল্লাসের জের চলছে সাহাবাদের মধ্যে। ডুব দেবার পর দীঘির বুকে তরঙ্গরা যেমন দুলে ওঠে বৃত্তাকারে। রাসূলুল্লাহ (স) অবশ্য নীরব। কিন্তু চঞ্চল। বহু গোত্রের লোক আসছে দীক্ষা নিতে। তাদের কথা শুনছেন ধ্যানস্থ হয়ে। তাদের শোনাচ্ছেন আল্লাহ্ কথা। ইসলামের কথা। সত্যের কথা। তারা চলে যায়। আবার নতুন দল আসে।
রাসূলুল্লাহ ব্যস্ত।
ওসামা এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। নম্র আর বিনীত ভাবে। মুখযুমের লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে পিছনে। ওসামা বলল তাঁর কথা। কুণ্ঠার সাথে। ইয়া রাসূলুল্লাহ! এসব দিকগুলো বিবেচনা করে যদি ক্ষমা করেন, যদি-
প্রশস্ত ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখ। প্রশান্ত আর উজ্জল। একটা খুশির আলো ছড়িয়ে ছিল সারা মুখে। হঠাৎ যেন সে আলোটা নিভে গেল। সে খুশির ভাবটা কেউ যেন আলতো মুছে নিয়ে গেল মুখ থেকে। গম্ভীর হয়ে গেলেন তিনি। ভীষণ গম্ভীর। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ব্যঞ্জক স্বরে বললেন, ওসামা! আল্লাহ্ যে শাস্তি স্থির করে দিয়েছেন, তুমি কি আমাকে এর ব্যতিক্রম করতে বলছ?
মেষ শিশুটির মত ওসামার অবস্থা। মৃদু হাওয়ায় ঘাসের ডগা কাঁপছে। আর সে ডগা থেকে টোপ ধরা শবনম যেন এখুনি লুটিয়ে পড়বে মাটিতে। ওসামা পড়েই যেতেন। শেষ পর্যন্ত টাল সামলে বসে গেলেন।
কি বলতে এসে কি হয়ে গেল। দিশেহারা হয়ে গেল ওসামা। রাসূলের কদম মুবারকে লুটিয়ে তিনি কেবলই বলছেন, আমার জন্য ক্ষমার আবেদন করুন! আমার জন্য ..... প্রত্যয় দৃঢ় কণ্ঠে রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে সম্বোধন করে বললেন, তোমরা নিশ্চিতরূপে জেনে রাখ-বিচারে নিরপেক্ষতার অভাবে অতীতে বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। বড় লোকেরা কেউ কোন অন্যায় করলে নামমাত্র বিচার হত, বেকসুর খালাস হয়ে যেত। এরপর ঠিক একই অপরাধে কোন গরীব অপরাধী হলে কঠোর সাজা নেমে আসত তার ওপর। কেবল এ কারণে বনি ইসরাঈল জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।
সাহাবীরা নীরব। মখযুমেরা নীরব। নীরব ওসামা। তাদের চিন্তার জগতে যেন নতুন আলো ফেলছে এসব কথা। উপলব্ধি করল তারা, বৃষ্টি হলে যেমন তা পড়ে সব ঠাঁই, ধনীর অট্টালিকায় অর গরীবের জীর্ণ কুটিরে -বিচারের ঝড়ো হওয়া কেন শুধু উড়িয়ে নিয়ে যাবে দুঃখীর চাল-চুলা? কেন দোররার নির্মম আঘাতগুলো শুধু পড়বে কঙ্কালসার দেহুগুলোর ওপর?
তোমরা জেনে রাখ, বাতাস কম্পিত করে বললেন রাসূলুল্লাহ (স), যাঁর হাতে আমার জীবন সে আল্লাহ্র কসম! ইসলামে কখনো এমনটি হতে পারে না। আজ যদি আমার কন্যা ফাতিমাও এ অপরাধে লিপ্ত হত, সেও আল্লাহ্ নির্ধারিত সাজা থেকে রেহাই পেত না। আমি অবশ্যই তার হাত কাটতাম।
এত শুধু কথা নয়। এ একটা চেতনা। এ নতুন চেতনার ভিতর দিয়ে শুরু হল আত্মার জাগরণ। টলতে টলতে বাড়ির পথ ধরল মখযুম গোত্রের সকলেই। বাতাসের কম্পন তখনও যেন তাদের কানে কথা বলছে, জেনে রাখ- আমার কন্যা ফাতিমাও যদি ..... ।

📘 হাদিসের গল্প > 📄 শত্রু হল মিত্র

📄 শত্রু হল মিত্র


ভীষণ কলরোলে মসজিদ নববীর প্রাঙ্গন আজ উচ্চকিত। অসংখ্য মানুষের জমায়েত। অসংখ্য মানুষ চারদিক থেকে ছুটে এসে যোগ দিচ্ছে সে সমাবেশে। জমায়েত আরো বড় হচ্ছে। ভারি হচ্ছে।
সকলেই বলছেন ‘কতল’। জানের দুষমণকে ছাড়া যায় না আর। কতলই সুমামা ইবনুল আদালের একমাত্র শাস্তি। ইসলামের দুষমণ। রাসূলের দুষমণ। আল্লাহ্র দুষমণ। সকল মানুষই বাতাসে চাপা তপ্ত উত্তেজনা ছাড়ল, সকল দুষমণির অবসান হোক আজ। এখনই।
সুমামা ইবনুল আদাল। দুর্ধর্ষ বনু হানিফা গোত্রের সর্দার। শয়তানী চালে বনু হানিফা গোত্র বহু খ্যাত। অনেক দুর্নাম তাদের। এ গোত্র থেকেই বেরিয়েছিল মুসাইলামাতুল কাযযাব-নবুয়তের দাবীদার মিথ্যুক নবী। তাই সব সম্ভব এ গোত্রের পক্ষে। সকলেই যখন সত্যকে গ্রহণ করেছে ব্যাপকভাবে এরা তখন যুদ্ধ করে যাচ্ছে রাসূলের বিরুদ্ধে। এমনই এক যুদ্ধে ধরা পড়েছে গোত্র-সর্দার সুমামা। এখন মসজিদ নববীর এক খুঁটির সাথে রজ্জবদ্দ। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশেই বাঁধা হয়েছে। খুব শক্ত করে বাঁধার কথা বলেছেন তিনি। সে শয়তানকে ঘিরেই জনতার ভিড়।
‘কতল’। চিৎকার উঠল কয়েকজন। কয়েকজন বলল, এখনও বেঁচে আছে আল্লাহ্ দুষমণ? তাদের সকলকে থামিয়ে দিলেন একজন সাহাবী বললেন, বিচার যা করার-রাসূলুল্লাহ (স)-ই করবেন। আপনারা অযথা মন্তব্য থেকে বিরত হোন।
সকলেই চুপ হয়ে গেল একেবারে। যেন সেখানে জনপ্রাণী নেই একজনও। এ নিস্তব্ধতার মধ্যে, কিছু পরে এলেন রাসূলুল্লাহ (স)। এখনুই বিচার হয়ে যাবে। নীরবতাটা পাথরের মত জমাট বেঁধে গেল অকস্মাৎ। সকলেই তাকিয়ে রইলেন ভীষণ ভাবে।
বন্দীর দিকে চোখ তুললেন রাসূলুল্লাহ (স)। এরপর স্থিরকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলার আছে তোমার?
সুমাম ইবনুল আদাল মিনিতিভরা চোখে তাকালেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। এরপর বলল :
মুহাম্মদ! আপনি যদি আমাকে কতল করেন তা হলে যথার্থ অপরাধী আর খুনীকে হত্যা করবেন।
আর যদি আমার প্রতি দয়া করেন, অনুগ্রহ করেন....তা হলে একজন সত্যিকার কৃতজ্ঞ ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করবেন।
আর যদি মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে চান তা হলে বলুন কত দিতে হবে।
সুমামার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলেন রাসূলুল্লাহ (স)। এরপর কোন রকম মন্তব্য না করেই উঠে চলে গেল।
দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনে মসজিদে এসে বন্দীর প্রতি ঠিক একই প্রশ্ন করলেন রাসূলুল্লাহ (স) আর সুমামা ঠিক একই কথা বলে গেল। এ দুদিনও চুপচাপ কেবল শুনে গেলেন তিনি।
সুমামা নিজেও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। কেননা সে যে অপরাধ করেছে এর একমাত্র দণ্ড কতল। সে নিজে বিচারক হলেও তাই করত। এ মৃত্যুর মুহূর্তে সে মুসলমানদের প্রতি যে অত্যাচার করেছে, যত খুন করেছে সবই মনে পড়ছিল তার। সে ক্রমাগত ম্রিয়মান হয়ে পিেছলেন। কলার সবুজপাতা যেমন রোদে কুঁকড়ে যায় তেমনি। আর অনবরত কাঁদছিল। এখন কেবলমাত্র একজনের নির্দেশের অপেক্ষা। নির্দেশের সাথে সাথে পার্থিব সকল লীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে তার।
অকস্মাৎ একজন সাহাবীকে ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (স)। ডেকে বললেন সুমামার সব বাঁধন খুলে দাও।
সুমামা ইবনুল আদাল বিস্মিত। সুমামা অবাক। এ আচরণ সুমামার ধারণার অতীত। একজন সাহাবী এসে সত্যিই তাঁকে মুক্ত করে দিলেন। মুক্ত হবার পর সে একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। পরাজিত সৈনিকের মত মসজিদ নববীর থেকে ধীরে, অতি ধীরে পথে নামল। এরপর মিলিয়ে গেল।
তাঁর চলার পথের দিকে তাকিয়ে কোন কোন সাহাবী ভাবলেন, সাপের মত হাঁটছে সুমামা। এখনই আপন গোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে নিশ্চয়ই আর একটা প্রচণ্ড আক্রমণের জন্য তৈরী হবে।
সাহাবীরা সেখানে বসে নানার কথা আলোচনা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)ও বসেছিলেন। একটি কথাও বলছিলেন না। একটু পরেই সে মজলিসে ফিরে এলেন সুমামা ইবনুল আদাল। মদীনার উপকণ্ঠে একটা কুপ থেকে গোসল সের পবিত্র হয়ে এসেছে। এসে রাসূলুল্লাহর সামনে দাঁড়ালেন।
মধুর কণ্ঠে হযরত জিজ্ঞেস করলেন, কি খবর সুমামা? অসম্ভব বিনীত কণ্ঠে সুমামা বলল, সত্য ধর্মে দীক্ষা দিন আমাকে। আমি আর অন্ধকারে ফিরে যাব না।
রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, ভাল করে চিন্তা করে দেখ। দরকার হলে আরো সময় নাও।
এর আর দরকার নেই ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)। আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে সুমামা বলল, একটু আগেও আপনার এ শহরের চাইতে ঘৃণা শহর আমার কাছে একটিও ছিল না, এখন আমার কাছে এ শহর হল প্রিয় জনপদ। কিছু পূর্বেও আপনার ধর্মের চেয়ে কোন জঘন্য ধর্ম আমার দৃষ্টিতে ছিল না, এখন এ ধর্মের চেয়ে উত্তম কোন ধর্ম আমার বিবেচনায় নেই। একটু আগে আপনার চেয়ে কোন ঘৃণ্য মানুষ ছিল না আমার চোখে, এখন এ বিশাল বিশ্বে আপনার চেয়ে অধিক প্রিয় আমার আর কেউ নেই।
এ কথা বলেই সুমামা ইবনুল আদাল হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর পা দুটি ধরে অবিরাম কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর কদম মুবারক দুটি ধরে সুমামা ইবনুল আদাল কাঁদতে থাকলেন। কাঁদতেই থাকলেন। অবিরাম।

ভীষণ কলরোলে মসজিদ নববীর প্রাঙ্গন আজ উচ্চকিত। অসংখ্য মানুষের জমায়েত। অসংখ্য মানুষ চারদিক থেকে ছুটে এসে যোগ দিচ্ছে সে সমাবেশে। জমায়েত আরো বড় হচ্ছে। ভারি হচ্ছে।
সকলেই বলছেন ‘কতল’। জানের দুষমণকে ছাড়া যায় না আর। কতলই সুমামা ইবনুল আদালের একমাত্র শাস্তি। ইসলামের দুষমণ। রাসূলের দুষমণ। আল্লাহ্র দুষমণ। সকল মানুষই বাতাসে চাপা তপ্ত উত্তেজনা ছাড়ল, সকল দুষমণির অবসান হোক আজ। এখনই।
সুমামা ইবনুল আদাল। দুর্ধর্ষ বনু হানিফা গোত্রের সর্দার। শয়তানী চালে বনু হানিফা গোত্র বহু খ্যাত। অনেক দুর্নাম তাদের। এ গোত্র থেকেই বেরিয়েছিল মুসাইলামাতুল কাযযাব-নবুয়তের দাবীদার মিথ্যুক নবী। তাই সব সম্ভব এ গোত্রের পক্ষে। সকলেই যখন সত্যকে গ্রহণ করেছে ব্যাপকভাবে এরা তখন যুদ্ধ করে যাচ্ছে রাসূলের বিরুদ্ধে। এমনই এক যুদ্ধে ধরা পড়েছে গোত্র-সর্দার সুমামা। এখন মসজিদ নববীর এক খুঁটির সাথে রজ্জবদ্দ। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশেই বাঁধা হয়েছে। খুব শক্ত করে বাঁধার কথা বলেছেন তিনি। সে শয়তানকে ঘিরেই জনতার ভিড়।
‘কতল’। চিৎকার উঠল কয়েকজন। কয়েকজন বলল, এখনও বেঁচে আছে আল্লাহ্ দুষমণ? তাদের সকলকে থামিয়ে দিলেন একজন সাহাবী বললেন, বিচার যা করার-রাসূলুল্লাহ (স)-ই করবেন। আপনারা অযথা মন্তব্য থেকে বিরত হোন।
সকলেই চুপ হয়ে গেল একেবারে। যেন সেখানে জনপ্রাণী নেই একজনও। এ নিস্তব্ধতার মধ্যে, কিছু পরে এলেন রাসূলুল্লাহ (স)। এখনুই বিচার হয়ে যাবে। নীরবতাটা পাথরের মত জমাট বেঁধে গেল অকস্মাৎ। সকলেই তাকিয়ে রইলেন ভীষণ ভাবে।
বন্দীর দিকে চোখ তুললেন রাসূলুল্লাহ (স)। এরপর স্থিরকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলার আছে তোমার?
সুমাম ইবনুল আদাল মিনিতিভরা চোখে তাকালেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। এরপর বলল :
মুহাম্মদ! আপনি যদি আমাকে কতল করেন তা হলে যথার্থ অপরাধী আর খুনীকে হত্যা করবেন।
আর যদি আমার প্রতি দয়া করেন, অনুগ্রহ করেন....তা হলে একজন সত্যিকার কৃতজ্ঞ ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করবেন।
আর যদি মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে চান তা হলে বলুন কত দিতে হবে।
সুমামার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলেন রাসূলুল্লাহ (স)। এরপর কোন রকম মন্তব্য না করেই উঠে চলে গেল।
দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনে মসজিদে এসে বন্দীর প্রতি ঠিক একই প্রশ্ন করলেন রাসূলুল্লাহ (স) আর সুমামা ঠিক একই কথা বলে গেল। এ দুদিনও চুপচাপ কেবল শুনে গেলেন তিনি।
সুমামা নিজেও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। কেননা সে যে অপরাধ করেছে এর একমাত্র দণ্ড কতল। সে নিজে বিচারক হলেও তাই করত। এ মৃত্যুর মুহূর্তে সে মুসলমানদের প্রতি যে অত্যাচার করেছে, যত খুন করেছে সবই মনে পড়ছিল তার। সে ক্রমাগত ম্রিয়মান হয়ে পিেছলেন। কলার সবুজপাতা যেমন রোদে কুঁকড়ে যায় তেমনি। আর অনবরত কাঁদছিল। এখন কেবলমাত্র একজনের নির্দেশের অপেক্ষা। নির্দেশের সাথে সাথে পার্থিব সকল লীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে তার।
অকস্মাৎ একজন সাহাবীকে ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (স)। ডেকে বললেন সুমামার সব বাঁধন খুলে দাও।
সুমামা ইবনুল আদাল বিস্মিত। সুমামা অবাক। এ আচরণ সুমামার ধারণার অতীত। একজন সাহাবী এসে সত্যিই তাঁকে মুক্ত করে দিলেন। মুক্ত হবার পর সে একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। পরাজিত সৈনিকের মত মসজিদ নববীর থেকে ধীরে, অতি ধীরে পথে নামল। এরপর মিলিয়ে গেল।
তাঁর চলার পথের দিকে তাকিয়ে কোন কোন সাহাবী ভাবলেন, সাপের মত হাঁটছে সুমামা। এখনই আপন গোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে নিশ্চয়ই আর একটা প্রচণ্ড আক্রমণের জন্য তৈরী হবে।
সাহাবীরা সেখানে বসে নানার কথা আলোচনা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)ও বসেছিলেন। একটি কথাও বলছিলেন না। একটু পরেই সে মজলিসে ফিরে এলেন সুমামা ইবনুল আদাল। মদীনার উপকণ্ঠে একটা কুপ থেকে গোসল সের পবিত্র হয়ে এসেছে। এসে রাসূলুল্লাহর সামনে দাঁড়ালেন।
মধুর কণ্ঠে হযরত জিজ্ঞেস করলেন, কি খবর সুমামা? অসম্ভব বিনীত কণ্ঠে সুমামা বলল, সত্য ধর্মে দীক্ষা দিন আমাকে। আমি আর অন্ধকারে ফিরে যাব না।
রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, ভাল করে চিন্তা করে দেখ। দরকার হলে আরো সময় নাও।
এর আর দরকার নেই ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)। আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে সুমামা বলল, একটু আগেও আপনার এ শহরের চাইতে ঘৃণা শহর আমার কাছে একটিও ছিল না, এখন আমার কাছে এ শহর হল প্রিয় জনপদ। কিছু পূর্বেও আপনার ধর্মের চেয়ে কোন জঘন্য ধর্ম আমার দৃষ্টিতে ছিল না, এখন এ ধর্মের চেয়ে উত্তম কোন ধর্ম আমার বিবেচনায় নেই। একটু আগে আপনার চেয়ে কোন ঘৃণ্য মানুষ ছিল না আমার চোখে, এখন এ বিশাল বিশ্বে আপনার চেয়ে অধিক প্রিয় আমার আর কেউ নেই।
এ কথা বলেই সুমামা ইবনুল আদাল হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর পা দুটি ধরে অবিরাম কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর কদম মুবারক দুটি ধরে সুমামা ইবনুল আদাল কাঁদতে থাকলেন। কাঁদতেই থাকলেন। অবিরাম।

📘 হাদিসের গল্প > 📄 যে দৃষ্টান্তের তুলনা হয়না

📄 যে দৃষ্টান্তের তুলনা হয়না


দীর্ঘদিন একটানা বৃষ্টি বাদলে মনের অস্বস্তি যখন পীড়াদায়ক যন্ত্রণা, আকাশ আলো করা রোদ বড় কাঙ্খিত। সে আবেদনের তাজা রোদ এখন আরবের আকাশে। অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনেক দুর্ভোগ-দুর্যোগ অতিক্রান্ত। কত নিষ্ঠুর নিগ্রহ, কত পাশবিক রক্তপাত!
মানুষ এখন বুক ভরাট করে শ্বাস নিচ্ছে। আহার বিহার নিয়ন্ত্রিত। রীতি-নীতিতে শৃঙ্খলা। গভীর কৃতজ্ঞতায় সকলে এক আল্লাহকে সিজদানত। যে সব ইহুদি-খৃষ্টান-কুরাইশরা হাসাহাসি করত, তারা এখন নীরব। সে দল-ভারি দল এখন ভারহীন শীর্ণ, কৃষ্ণপক্ষ-চাঁদের মত লাগাতার ক্ষীয়মান। তাদের এখন অস্তিত্ব বাঁচানোর সংগ্রাম।
পথ চলতে চলতে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত হয়ে আসছিল রাসূলুল্লাহ (স)। সকল সাফল্যেই তিনি আল্লাহ্র অদৃশ্য মহাশক্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। পথ চলতে চলতে তিনি স্ফীত শ্বাস নিয়ে কৃতজ্ঞসিক্ত দীর্ঘ উচ্চারণে বললেন, আল্লাহু।
আকাশে উজ্জল রোদের সমারোহ। তবুও কোথাও কোথাও যেন মেঘের ছায়া। কাল আভাস। এতদিনের এত যুগের এত বদভ্যাস বুঝি নির্মূল হয় না এক সাথে! এক ক্ষেপে ধরা পড়ে না বুঝি সব কলঙ্ক।
চলতে চলতে এক বাগানের পাশে এসে থামলেন রাসূলুল্লাহ (স)। দেখলেন, একটা উটকে কে বেঁধে রেখে গেছে উঁচু ডালের সাথে। বসতে পারছে না, শুতে পারছে না। শাস্তির মত এক রকম ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটানা। এর উপর কতদিন খেতে পায় নি ঠিকমত। জীর্ণশীর্ণ। হাড়গুলো গুনে নেয়া যায়। চোখ দুটি ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে চোয়াল থেকে। চামড়ার উপর সারা দেহে জুড়ে পর্যাপ্ত বেদনা ছড়ান।
কষ্ট উটের নয়, যেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজের। বুকটা কাত্রে উঠল তাঁর। পায় পায় তিনি এগিয়ে এলেন উটের কাছে। আর কি আশ্চর্য, রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখতে পেয়েই উটটা ব্যথায় উল্লাসে অভিমানে সে এক রকম গলায় ডেকে উঠল। মাকে দেখে কথা না-ফোটা শিশু যেমন ডাকে, ডালে ফেরা মায়ের শব্দে নির্বাক শাবকেরা যেমন কাকলি মুখর হয়! ডাক ত নয়, যেন মজলুমের আর্তনাদ : দেখুন রাসূলুল্লাহ (স)-আমাকে এরা মেরেই ফেলছে। অনেক ক্রীতদাসকে আপনি উদ্ধার করেছেন জালিমের অত্যাচার থেকে, অতএব আমাকেও বাঁচান।
রাসূলুল্লাহ (স) এগিয়ে এসে এবার হাত রাখলেন উটের গায়। চোখে মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। মহব্বতের হাত। ভালবাসার হাত। আর সে কোমল পরশে উটের যন্ত্রণা যেন ঝরে পড়ল চোখ বেয়ে। আমার মত অগণিত উট ঘরে ঘরে উপবাসী। আপনি ও রাহমাতুল্লিল আলামীন, আমরা মুখ চেয়ে আছি আপনার।
আমার উটকে আমি খেতে দিই না দিই-তোমার কি? আমার দুম্বা মরে গেলে ফেলে দেব, তুমি বলার কে? এটাই ছিল জাহেলিয়াত যুগের নিয়ম। তাই চলছিল।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন উটটা একজন আনসারের। তাকে ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (স)। আনসার এল, সাথে আরো অনেকে। রীতিমত একটা জমায়েত হয়ে গেল দেখতে দেখতে। সকলেই উদগ্রীব, কি বলবেন রাসূলুল্লাহ (স)? মারবেন আনসারকে? সাজা দেবেন? কি করবেন?
জনতা নীরব দুবাহু মেলে মানুষকে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলে মানুষেরা যেমন চুপ করে, তেমনি নীরব। রাসূলুল্লাহ (স) ধীরে ধীরে সে জনতার দিকে মুখ তুলে তাকালেন। তাকিয়েই রইলেন-দীর্ঘক্ষণ। দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিক্ষেপে পরিবেশে পর্যাপ্ত গাম্ভীর্য আর মৃদু ভৎর্সনার স্বরে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, এসব নিরীহ আর বোবা প্রাণী সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর। অর্থাৎ-
'তোমারও প্রাণ আছে, উটেরও আছে। খেতে না পেলে তুমি কষ্ট পাও, উটও পায় না? সুতরাং সাবধান! সব কিছুর স্রষ্টা আল্লাহ্। কাকে কষ্ট দিচ্ছ আর কোন অবলা প্রাণে ব্যাথা দিচ্ছ সব দেখছেন তিনি। তোমাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্, আমাকেও আর এ উটকেও। প্রাণ আল্লাহ্র সৃষ্টি – তাই না? সুতরাং এর প্রতি বিবেচনা কর।'

দীর্ঘদিন একটানা বৃষ্টি বাদলে মনের অস্বস্তি যখন পীড়াদায়ক যন্ত্রণা, আকাশ আলো করা রোদ বড় কাঙ্খিত। সে আবেদনের তাজা রোদ এখন আরবের আকাশে। অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনেক দুর্ভোগ-দুর্যোগ অতিক্রান্ত। কত নিষ্ঠুর নিগ্রহ, কত পাশবিক রক্তপাত!
মানুষ এখন বুক ভরাট করে শ্বাস নিচ্ছে। আহার বিহার নিয়ন্ত্রিত। রীতি-নীতিতে শৃঙ্খলা। গভীর কৃতজ্ঞতায় সকলে এক আল্লাহকে সিজদানত। যে সব ইহুদি-খৃষ্টান-কুরাইশরা হাসাহাসি করত, তারা এখন নীরব। সে দল-ভারি দল এখন ভারহীন শীর্ণ, কৃষ্ণপক্ষ-চাঁদের মত লাগাতার ক্ষীয়মান। তাদের এখন অস্তিত্ব বাঁচানোর সংগ্রাম।
পথ চলতে চলতে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত হয়ে আসছিল রাসূলুল্লাহ (স)। সকল সাফল্যেই তিনি আল্লাহ্র অদৃশ্য মহাশক্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। পথ চলতে চলতে তিনি স্ফীত শ্বাস নিয়ে কৃতজ্ঞসিক্ত দীর্ঘ উচ্চারণে বললেন, আল্লাহু।
আকাশে উজ্জল রোদের সমারোহ। তবুও কোথাও কোথাও যেন মেঘের ছায়া। কাল আভাস। এতদিনের এত যুগের এত বদভ্যাস বুঝি নির্মূল হয় না এক সাথে! এক ক্ষেপে ধরা পড়ে না বুঝি সব কলঙ্ক।
চলতে চলতে এক বাগানের পাশে এসে থামলেন রাসূলুল্লাহ (স)। দেখলেন, একটা উটকে কে বেঁধে রেখে গেছে উঁচু ডালের সাথে। বসতে পারছে না, শুতে পারছে না। শাস্তির মত এক রকম ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটানা। এর উপর কতদিন খেতে পায় নি ঠিকমত। জীর্ণশীর্ণ। হাড়গুলো গুনে নেয়া যায়। চোখ দুটি ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে চোয়াল থেকে। চামড়ার উপর সারা দেহে জুড়ে পর্যাপ্ত বেদনা ছড়ান।
কষ্ট উটের নয়, যেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজের। বুকটা কাত্রে উঠল তাঁর। পায় পায় তিনি এগিয়ে এলেন উটের কাছে। আর কি আশ্চর্য, রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখতে পেয়েই উটটা ব্যথায় উল্লাসে অভিমানে সে এক রকম গলায় ডেকে উঠল। মাকে দেখে কথা না-ফোটা শিশু যেমন ডাকে, ডালে ফেরা মায়ের শব্দে নির্বাক শাবকেরা যেমন কাকলি মুখর হয়! ডাক ত নয়, যেন মজলুমের আর্তনাদ : দেখুন রাসূলুল্লাহ (স)-আমাকে এরা মেরেই ফেলছে। অনেক ক্রীতদাসকে আপনি উদ্ধার করেছেন জালিমের অত্যাচার থেকে, অতএব আমাকেও বাঁচান।
রাসূলুল্লাহ (স) এগিয়ে এসে এবার হাত রাখলেন উটের গায়। চোখে মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। মহব্বতের হাত। ভালবাসার হাত। আর সে কোমল পরশে উটের যন্ত্রণা যেন ঝরে পড়ল চোখ বেয়ে। আমার মত অগণিত উট ঘরে ঘরে উপবাসী। আপনি ও রাহমাতুল্লিল আলামীন, আমরা মুখ চেয়ে আছি আপনার।
আমার উটকে আমি খেতে দিই না দিই-তোমার কি? আমার দুম্বা মরে গেলে ফেলে দেব, তুমি বলার কে? এটাই ছিল জাহেলিয়াত যুগের নিয়ম। তাই চলছিল।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন উটটা একজন আনসারের। তাকে ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (স)। আনসার এল, সাথে আরো অনেকে। রীতিমত একটা জমায়েত হয়ে গেল দেখতে দেখতে। সকলেই উদগ্রীব, কি বলবেন রাসূলুল্লাহ (স)? মারবেন আনসারকে? সাজা দেবেন? কি করবেন?
জনতা নীরব দুবাহু মেলে মানুষকে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলে মানুষেরা যেমন চুপ করে, তেমনি নীরব। রাসূলুল্লাহ (স) ধীরে ধীরে সে জনতার দিকে মুখ তুলে তাকালেন। তাকিয়েই রইলেন-দীর্ঘক্ষণ। দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিক্ষেপে পরিবেশে পর্যাপ্ত গাম্ভীর্য আর মৃদু ভৎর্সনার স্বরে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, এসব নিরীহ আর বোবা প্রাণী সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর। অর্থাৎ-
'তোমারও প্রাণ আছে, উটেরও আছে। খেতে না পেলে তুমি কষ্ট পাও, উটও পায় না? সুতরাং সাবধান! সব কিছুর স্রষ্টা আল্লাহ্। কাকে কষ্ট দিচ্ছ আর কোন অবলা প্রাণে ব্যাথা দিচ্ছ সব দেখছেন তিনি। তোমাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্, আমাকেও আর এ উটকেও। প্রাণ আল্লাহ্র সৃষ্টি – তাই না? সুতরাং এর প্রতি বিবেচনা কর।'

📘 হাদিসের গল্প > 📄 সিপাহসালার

📄 সিপাহসালার


একদিকে আলো অন্যদিকে অন্ধকার "কদিকে সত্য অন্যদিকে মিথ্যা। একদিকে মুসলমান অন্যদিকে মুশরিক। মাঝে বিশাল বদর প্রান্তর জুড়ে রাতের অন্ধকার। একদিকে সমানে চলছে কোলাহল নাচ-গান, হৈ-হল্লা আর ফুর্তি-আনন্দ। বদরের এদিকে পুরা মক্কাটাই যেন উঠে এসেছে হঠাৎ। তার অমোদ-প্রমোদ, তার গর্ব-অহংকার আর সে উদ্ধত কোরাইশ নেতৃবৃন্দ। উট জবাই হচ্ছে, খানাপিনা চলছে, সাকিরা পরিবেশন করছে মদ। আনন্দের আয়োজন অঢেল। তারা মনে করছে, আসন্ন যুদ্ধে কুরাইশ শিবিরের দরজায় যেন চিরস্থায়ী সুদিন লটকে আছে।
আর একদিক একেবারেই নীরব। কোন সারা শব্দ নেই। গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন সকলেই। কেবল জেগে আছেন একজন। তিনি এ শিবিরের সর্বাধিনায়ক। কেবল ঘুম নেই তাঁর চোখে। তিন'শ তেরজন সৈনিকের সিপাহসালার তিনি। জেগে আছেন। জেগে জেগে পাহারা দিচ্ছ সকলের। লক্ষ্য রাখছেন প্রত্যেকের সুখ-সুবিধার। একটি সৈনিকের কষ্ট হলে সে কষ্ট তাঁরই। তারা ব্যথা পেলে সে ব্যথা তাঁর বুকেই বাজে। আর জয়পরাজয়ের মালিক যিনি, সকল শক্তির আধার যিনি, সিজদায় লুটিয়ে আছেন তাঁর কাছে। মাথা নত করে আছেন। কেঁদে কেঁদে শক্তি ভিক্ষা করছেন। সাহস চাইছেন। সাহায্য চাইছেনঃ ইয়া আল্লাহ্! এ মুষ্টিমেয় কজন মুসলমানকে আপনি রক্ষা করুন। এদের যেন কোন ক্ষতি না হয়। এ কজন মুসলমান পরাজিত হলে কিয়ামত পর্যন্ত আপনার নাম নেয়ার মত কেউ আর থাকবে না। সারা রাত জেগে তিনি কাঁদছেন আর কাঁদছেন। কখনো মাটিতে মাথা রেখে। কখনো দুটি পবিত্র হাত মেলে ধরে।
জীর্ণ একটি, খেজুর পাতার ছাউনি। সাহাবীরাই তৈরী করে দিয়েছেন। তাঁর সংগীরা। আন্তরিকতা দিয়ে। ভালবাসা দিয়ে। কখনো থাকেন এর মধ্যে, বাইরে আসেন কখনো কখনো। উপরে অসীম তারা ভরা নীলাকাশ। নীচে বদরের বিশাল প্রান্তর জুড়ে কঠিন নীরবতা। রাতের গভীরতায় এক রকম শোঁ শোঁ শব্দ অবিরাম কানে আসে তাঁর। ব্যথার শব্দ যেন। শোকের শব্দ। কাল এখানে কত রক্ত ঝরবে কে জানে। কতজন আহত হবে। কতজন চিরদিনের মত নীরব হয়ে যাবে এ জগত থেকে। রাতের নির্জনতায় যেন এরই হাহাকার মাতম ভেসে আসছে। সে আসন্ন শোকের চাপা গুঞ্জরণ। এ যুদ্ধ তিনি চাননি। দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চাপিয়ে দিয়েছে শত্রুরা। অথচ তিনি তাঁর সৈনিকদের উপর আস্থাশীল। আল্লাহ্ সহায় হলে এ অল্প কজনই যথেষ্ট। মমতার দৃষ্টি মেলে তিনি তাকান তাঁর সৈনিকদের দিকে। তাঁর শক্তি। তাঁর সাহস। তাঁর বাহুবল। গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন সকলে। আহা ঘুমাক! মদীনা থেকে এত পথ ভেঙে আসা সহজ কথা নয়। ক্লান্ত সকলেই। সকলেই পরিশ্রান্ত। বালিতে পানি শুষে নিয়ে তরতাজা করে দেবে। আহা ঘুমুক ওরা। অকাতরে ঘুমাতে দেখে অসম্ভব খুশি হলেন তিনি। আনন্দিত হলেন।
তিন শত তের জন সৈনিক। দরিদ্র প্রায় সকলেই। দীনহীন অবস্থা। জীর্ণ বসন কারো পরণে। কারো গায়ে মলিন আবরণ। অর্ধাহার চলছে কতদিন থেকে, ভুখা প্রায় সকলেই। অনেকের হাতে ঠিক মত অস্ত্রও তুলে দিতে পারেন নি তিনি। বাহনেরও অনটন। অথচ যুদ্ধে চলছেন। এমনতর এক দুর্বল বাহিনীর সিপাহসালার রাসূলুল্লাহ (স)। সকলের ব্যথায় তিনি ব্যথিত তাই। সকলেরই যন্ত্রণায় তিনি কাতর। তাঁর বুকের ভিতর একটা দুঃখের তুফান বইছে সব সময়। এ অসহায়দের মুখের দিকে তাকালে তিনি বিহ্বল হয়ে পড়েন। প্রতি মুহূর্তে চিন্তা তাঁর: কি করে এদের ভাল করা যায়। কি করলে উপশম হবে এদের বেদনা। মদীনা থেকে এক মাইল দূর। গিবতার কূপের পাশে বিশ্রাম শেষ। যাত্রা শুরুর জন্য সকলে প্রস্তুত আবার। সহসা দুই পবিত্র বাহু ঊর্ধ্বে তুলে আকুল ফরিয়াদে অশ্রু সিক্ত হয়ে তিনি বললেন: ইয়া আল্লাহ্! আমার এ সংগীরা দরিদ্র, আপনি এদের দারিদ্রতা মোচন করুন। এরা ক্ষুধার্থ এদের মুখে অন্ন দিন। এরা বস্ত্রহীন, এদের বস্ত্র দিন। এরা বাহনহীন, এদের বাহন দিন। পরম প্রভু আমার! সর্ববিধ মঙ্গল করুন।
সৈনিক নয়-সন্তান। সকল সময় তাদের জন্য চিন্তা। মঙ্গল চিন্তা। তারা সুখী হলে তিনিও সুখী। তারা আনন্দে থাকলে তিনিও আনন্দিত। আর ব্যথা পেলে? সে ব্যথাও তাঁরই। ঘুমন্ত সৈনিকদের প্রতি তৃপ্তির দৃষ্টিপাত করলেন তিনি। শেষবারের মত। এরপর ধীরে ধীরে এলেন আস্তানার মধ্যে।
আঁধার তরল হয়ে এল এক সময়। বদরের বিশাল পূর্ব দিগন্তে আলোর আভাস। আসন্ন ভোরের ইশারা। পবিত্র সুবহি সাদিকের উঁকি ঝুঁকি।
নিদ্রাহীন সিপাহসালার বাইরে এলেন। আর বললেন। এরপর: আল্লাহ্ বান্দাগণ! নামায! নামায!! বদরের প্রান্তেরে আন্দোলন জাগল সে ধ্বনির। মধুর এক জান্নাতী আওয়াজের মত ঘুমন্ত সৈনিকদের কানে গেল সে স্বর। গভীর ঘুমের পর ক্লান্তিহীন সকল জাগরণ। আল্লাহ্ জন্য সিপাহসালালের আহ্বান! ত্বরান্বিত সমবেত সকলেই। সকলেই এখন নামাযের কাতারে। সামনে ইমাম, সিপাহসালার- রাসূলুল্লাহ (স) তিনশ' তের জন সৈনিকের একচ্ছত্র অধিনায়ক, তাঁদের বন্ধু, তাঁদের পিতা।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে একটি তীর। নামায শেষ হলে সে তীর হাতে তিনি এলেন সৈন্যদলের মাঝে। সামনে বিস্তীর্ণ যুদ্ধের ময়দান। জিহাদ আসন্ন। সে জিহাদের জন্য সৈন্যদের শ্রেণী বিন্যাস শুরু করলেন তিনি। ব্যুহ রচনায় ব্যস্ত হলেন। তীরন্দাজ বাহিনী। বর্শা বাহিনী। পদাতিক বাহিনী। ছোট ছোট ব্যুহে বিভক্ত করলেন। কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন। এরপর আদেশ দিলেন এক সরল রেখায় দাঁড়াতে। এতটুকু যেন এদিক-ওদিক না হয়। আগু-পিছু না হয়। যেখানে গোলমাল দেখছেন, ঠিক করে দিচ্ছেন নিজ হাতে। যুদ্ধের একটা নিয়ম আছে, আক্রমণ প্রতিহত করার একটা কানুন আছে। আক্রমণ করারও একটা রীতি আছে। শৃঙ্খলা মেনে চললে আহত হবার সম্ভাবনা কম। অন্যথায় জীবন সংশয়। সুতরাং-
সাবধান! যেমন বলি, অনুসরণ কর। শ্রেণীবদ্ধও হও। কাতারবন্দীও হও। অথচ একজন সৈনিক কিছুতেই ঠিকমত দাঁড়াচ্ছিলেন না কাতারে। কাতার ভেঙে বাইরে আসছিলেন বার বার। নাম তাঁর সাওয়াদ। সিপাহসালার ছুটে এলেন তাঁর কাছে।
সকলের লক্ষ্য এখন তাঁর দিকে। সাওয়াদ এখন সকল লক্ষ্যের কেন্দ্র-বিন্দু। স্থির দৃষ্টিতে সকলেই তাকিয়ে আছে। এ মুহূর্তে আদেশ অমান্য কঠিন অপরাধ। এ অপরাধের শাস্তি ভয়ানক। সকলেই ভাবছেন কি হয়। এক ভয়ঙ্কর মুহূর্তের মুখমুখী সকলেই। নিঃশ্বাসকে মুঠো করে ধরে সকলে অসম্ভব নীরব। সকলের কাতর দৃষ্টির উপর দিয়ে সেনাপতি এসে দাঁড়ালেন সাওয়াদের সামনে। তিনশ' তের জন সৈনিকের সেনাধ্যক্ষ, সর্বাধিনায়ক। হাতে সে তীর। হঠাৎ সাওয়াদের পেটে একটি খোঁচা দিয়ে তিনি ধমক দিলেন, সোজা হয়ে দাঁড়াও।
না-তেমন কঠিন কিছু নয়। মারাত্মক ঘটল না কিছু। অঘটন নয়। সহজ হয়ে দাঁড়ালেন। ভাঙা কাতার সোজা করে দিলেন সেনাপতি। যাবার জন্য পা তুলেছেন, অঘটন ঘটালেন আহত সাওয়াদ (রা)। তীরের খোঁটায় কিছুটা আহত হয়েছিলেন তিনি। অকস্মাৎ জামা তুলে সে আহত জায়গাটা দেখালেন। এরপর বজ্রপাতের মত অঘটন ঘটিয়ে নির্বাক করে দিলেন সকলকে। প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আল্লাহ্ আপনাকে পাঠিয়েছেন মানুষকে পথ দেখানোর জন্য। পাঠিয়েছেন রহমত স্বরূপ। আশিস স্বরূপ। দয়া স্বরূপ। অথচ দয়ার বদলে আপনি আমাকে আঘাত দিলেন, ব্যথা দিলেন, আহত করলন। এরপরই বলল সে চমক দেয়া কথা: আমি এর প্রতিশোধ চাই।
এ মুহূর্তে সকলেই অবাক! সকলেই বিস্মিত। কি আস্পর্ধা সাওয়াদের? এত বড় অপরাধের পর কোথায় মাথা নীচু করবে, মাফ চাইবে-তা নয়, উল্টা চাপ!
স্পর্ধিত গলায় সে রাসূলুল্লাহ (স)-কেই দোষী করছে! কি সর্বনাশ! সে বড় অহংকারী হয়েছে। ছোট মুখে এতবড় কথা। তীর দিয়ে ভুঁড়িটা এ ফোঁড় ফোঁড় করে দেন নি এই ত ভাগ্য!
নিশ্চয়ই এ অপরাধের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। সাহাবীরা মনে মনে গর্জাচ্ছিলেন। বলতে যাচ্ছিলেন কেউ কেউ, এ ঔদ্ধত্যের শাস্তি কতল। বলতে গিয়ে বলতে পারছিলেন না। সকলেই ভয়ঙ্কর ভাবে নির্ভর করছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর। সে দিকে তাকিয়ে ছিলেন সকলেই।
কয়েকটি মাত্র মুহূর্ত! কাটল আশ্চর্য নীরবাতায়। রাসূলুল্লাহ (স) তাকালেন সাওয়াদের পেটের দিকে। সত্যিই আহত হয়েছে সে। ক্ষতস্থানে রক্ত দেখা দিয়েছে দু-এক ফোটা। তাই দেখেই যন্ত্রণায় আচমকা একটা ঝড়ো ধাক্কার বুকের হাড়গুলো চূর্ণ হয়ে যেতে চাইল রাসূলুল্লাহ (স)-এর। ঘাসের ডগায় টোপ ধরা শিশিরের মত কাতর চোখ দুটি ছলছল। হায় আমি আমার সন্তানকে আহত করলাম! এ অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে আমি আল্লাহ্ কাছে মুখ দেখাব কি করে!
অগণিত সৈনিকের নির্বাক দৃষ্টি স্থির। অকস্মাৎ রাসূলুল্লাহ (স) পরনের জামা উঁচু করলন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সাওয়াদকে বলল, এরপর, আমি প্রস্তুত। এ আমার উন্মুক্ত দেহ আর এ নাও তীর। প্রতিশোধ গ্রহণ কর। কথাগুলো ভয়ঙ্কর রকম বেদনা মলিন আর কাতর শোনাল।
তিন শ তের জন সৈন্য। ছশ ছাব্বিশটি নীরব চোখ এখন স্বপ্নাবিষ্ট। যেন একটা অপার্থিব দৃশ্য দেখলেন তাঁরা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ্র দেহ মুবারক সকলের সামনে দৃশ্যমান আর সে শুভ্র দেহের অধিকারী যে মানুষ তাঁর শুভ্রতর মনও। যা কোন অপরাধ নয়, যার জন্য কেউ কোনদিন অপরাধী হয়নি অন্যের গুরুতর অপরাধ ভুলে গিয়ে সে ত্রুটির জন্য রাসূলুল্লাহ (স) কাঁদছেন! সে অপরাধের জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী!! তিনি নতজানু! ভাবা যায় না।
আকাশ নির্বাক। জগত নির্বাক। নির্বাক বদর প্রান্তর। একজন সাধারণ সৈনিকের সামনে রাসূলুল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থী। রাসূলুল্লাহ (স) নতজানু। ভক্তিতে সম্ভ্রমে শ্রদ্ধায় প্রতিটি সৈনিকের অর্ন্তজগত প্লাবিত হয়ে গেল। এ হল তাঁদের সিপাহসালার! এ হল তাঁদের সর্বাধিনায়ক!
রাসূলুল্লাহ (স) এ সীমাহীন মহত্বের কাছে সকলে যেন বিগলিত হয়ে গেল। সমর্পিত হয়ে গেল। সে শুভ্রতার দিকে তাঁরা যত দৃষ্টিক্ষেপ করেন, ভালবাসা বেড়ে যায় তত। শেষে তাঁদের মনে হল, এ অলৌকিক দৃশ্যটি দেখে তাঁরাও যেন অলৌকিক হয়ে উঠেছেন। নিজের মধ্যে নিজেরা বহুগুণ মহৎ হয়েছেন। বহুগুন বীর্যবান হয়েছেন।
এ মহান সিপাহসালারের অধীনে অবশেষে বদরের বিশাল প্রান্তরের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করেন তাঁরা। সে দৃষ্টিতে ভীষণ প্রতীজ্ঞা। সে দৃষ্টিতে এখন যুদ্ধজয়ের ইশারা।

একদিকে আলো অন্যদিকে অন্ধকার "কদিকে সত্য অন্যদিকে মিথ্যা। একদিকে মুসলমান অন্যদিকে মুশরিক। মাঝে বিশাল বদর প্রান্তর জুড়ে রাতের অন্ধকার। একদিকে সমানে চলছে কোলাহল নাচ-গান, হৈ-হল্লা আর ফুর্তি-আনন্দ। বদরের এদিকে পুরা মক্কাটাই যেন উঠে এসেছে হঠাৎ। তার অমোদ-প্রমোদ, তার গর্ব-অহংকার আর সে উদ্ধত কোরাইশ নেতৃবৃন্দ। উট জবাই হচ্ছে, খানাপিনা চলছে, সাকিরা পরিবেশন করছে মদ। আনন্দের আয়োজন অঢেল। তারা মনে করছে, আসন্ন যুদ্ধে কুরাইশ শিবিরের দরজায় যেন চিরস্থায়ী সুদিন লটকে আছে।
আর একদিক একেবারেই নীরব। কোন সারা শব্দ নেই। গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন সকলেই। কেবল জেগে আছেন একজন। তিনি এ শিবিরের সর্বাধিনায়ক। কেবল ঘুম নেই তাঁর চোখে। তিন'শ তেরজন সৈনিকের সিপাহসালার তিনি। জেগে আছেন। জেগে জেগে পাহারা দিচ্ছ সকলের। লক্ষ্য রাখছেন প্রত্যেকের সুখ-সুবিধার। একটি সৈনিকের কষ্ট হলে সে কষ্ট তাঁরই। তারা ব্যথা পেলে সে ব্যথা তাঁর বুকেই বাজে। আর জয়পরাজয়ের মালিক যিনি, সকল শক্তির আধার যিনি, সিজদায় লুটিয়ে আছেন তাঁর কাছে। মাথা নত করে আছেন। কেঁদে কেঁদে শক্তি ভিক্ষা করছেন। সাহস চাইছেন। সাহায্য চাইছেনঃ ইয়া আল্লাহ্! এ মুষ্টিমেয় কজন মুসলমানকে আপনি রক্ষা করুন। এদের যেন কোন ক্ষতি না হয়। এ কজন মুসলমান পরাজিত হলে কিয়ামত পর্যন্ত আপনার নাম নেয়ার মত কেউ আর থাকবে না। সারা রাত জেগে তিনি কাঁদছেন আর কাঁদছেন। কখনো মাটিতে মাথা রেখে। কখনো দুটি পবিত্র হাত মেলে ধরে।
জীর্ণ একটি, খেজুর পাতার ছাউনি। সাহাবীরাই তৈরী করে দিয়েছেন। তাঁর সংগীরা। আন্তরিকতা দিয়ে। ভালবাসা দিয়ে। কখনো থাকেন এর মধ্যে, বাইরে আসেন কখনো কখনো। উপরে অসীম তারা ভরা নীলাকাশ। নীচে বদরের বিশাল প্রান্তর জুড়ে কঠিন নীরবতা। রাতের গভীরতায় এক রকম শোঁ শোঁ শব্দ অবিরাম কানে আসে তাঁর। ব্যথার শব্দ যেন। শোকের শব্দ। কাল এখানে কত রক্ত ঝরবে কে জানে। কতজন আহত হবে। কতজন চিরদিনের মত নীরব হয়ে যাবে এ জগত থেকে। রাতের নির্জনতায় যেন এরই হাহাকার মাতম ভেসে আসছে। সে আসন্ন শোকের চাপা গুঞ্জরণ। এ যুদ্ধ তিনি চাননি। দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চাপিয়ে দিয়েছে শত্রুরা। অথচ তিনি তাঁর সৈনিকদের উপর আস্থাশীল। আল্লাহ্ সহায় হলে এ অল্প কজনই যথেষ্ট। মমতার দৃষ্টি মেলে তিনি তাকান তাঁর সৈনিকদের দিকে। তাঁর শক্তি। তাঁর সাহস। তাঁর বাহুবল। গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন সকলে। আহা ঘুমাক! মদীনা থেকে এত পথ ভেঙে আসা সহজ কথা নয়। ক্লান্ত সকলেই। সকলেই পরিশ্রান্ত। বালিতে পানি শুষে নিয়ে তরতাজা করে দেবে। আহা ঘুমুক ওরা। অকাতরে ঘুমাতে দেখে অসম্ভব খুশি হলেন তিনি। আনন্দিত হলেন।
তিন শত তের জন সৈনিক। দরিদ্র প্রায় সকলেই। দীনহীন অবস্থা। জীর্ণ বসন কারো পরণে। কারো গায়ে মলিন আবরণ। অর্ধাহার চলছে কতদিন থেকে, ভুখা প্রায় সকলেই। অনেকের হাতে ঠিক মত অস্ত্রও তুলে দিতে পারেন নি তিনি। বাহনেরও অনটন। অথচ যুদ্ধে চলছেন। এমনতর এক দুর্বল বাহিনীর সিপাহসালার রাসূলুল্লাহ (স)। সকলের ব্যথায় তিনি ব্যথিত তাই। সকলেরই যন্ত্রণায় তিনি কাতর। তাঁর বুকের ভিতর একটা দুঃখের তুফান বইছে সব সময়। এ অসহায়দের মুখের দিকে তাকালে তিনি বিহ্বল হয়ে পড়েন। প্রতি মুহূর্তে চিন্তা তাঁর: কি করে এদের ভাল করা যায়। কি করলে উপশম হবে এদের বেদনা। মদীনা থেকে এক মাইল দূর। গিবতার কূপের পাশে বিশ্রাম শেষ। যাত্রা শুরুর জন্য সকলে প্রস্তুত আবার। সহসা দুই পবিত্র বাহু ঊর্ধ্বে তুলে আকুল ফরিয়াদে অশ্রু সিক্ত হয়ে তিনি বললেন: ইয়া আল্লাহ্! আমার এ সংগীরা দরিদ্র, আপনি এদের দারিদ্রতা মোচন করুন। এরা ক্ষুধার্থ এদের মুখে অন্ন দিন। এরা বস্ত্রহীন, এদের বস্ত্র দিন। এরা বাহনহীন, এদের বাহন দিন। পরম প্রভু আমার! সর্ববিধ মঙ্গল করুন।
সৈনিক নয়-সন্তান। সকল সময় তাদের জন্য চিন্তা। মঙ্গল চিন্তা। তারা সুখী হলে তিনিও সুখী। তারা আনন্দে থাকলে তিনিও আনন্দিত। আর ব্যথা পেলে? সে ব্যথাও তাঁরই। ঘুমন্ত সৈনিকদের প্রতি তৃপ্তির দৃষ্টিপাত করলেন তিনি। শেষবারের মত। এরপর ধীরে ধীরে এলেন আস্তানার মধ্যে।
আঁধার তরল হয়ে এল এক সময়। বদরের বিশাল পূর্ব দিগন্তে আলোর আভাস। আসন্ন ভোরের ইশারা। পবিত্র সুবহি সাদিকের উঁকি ঝুঁকি।
নিদ্রাহীন সিপাহসালার বাইরে এলেন। আর বললেন। এরপর: আল্লাহ্ বান্দাগণ! নামায! নামায!! বদরের প্রান্তেরে আন্দোলন জাগল সে ধ্বনির। মধুর এক জান্নাতী আওয়াজের মত ঘুমন্ত সৈনিকদের কানে গেল সে স্বর। গভীর ঘুমের পর ক্লান্তিহীন সকল জাগরণ। আল্লাহ্ জন্য সিপাহসালালের আহ্বান! ত্বরান্বিত সমবেত সকলেই। সকলেই এখন নামাযের কাতারে। সামনে ইমাম, সিপাহসালার- রাসূলুল্লাহ (স) তিনশ' তের জন সৈনিকের একচ্ছত্র অধিনায়ক, তাঁদের বন্ধু, তাঁদের পিতা।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে একটি তীর। নামায শেষ হলে সে তীর হাতে তিনি এলেন সৈন্যদলের মাঝে। সামনে বিস্তীর্ণ যুদ্ধের ময়দান। জিহাদ আসন্ন। সে জিহাদের জন্য সৈন্যদের শ্রেণী বিন্যাস শুরু করলেন তিনি। ব্যুহ রচনায় ব্যস্ত হলেন। তীরন্দাজ বাহিনী। বর্শা বাহিনী। পদাতিক বাহিনী। ছোট ছোট ব্যুহে বিভক্ত করলেন। কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন। এরপর আদেশ দিলেন এক সরল রেখায় দাঁড়াতে। এতটুকু যেন এদিক-ওদিক না হয়। আগু-পিছু না হয়। যেখানে গোলমাল দেখছেন, ঠিক করে দিচ্ছেন নিজ হাতে। যুদ্ধের একটা নিয়ম আছে, আক্রমণ প্রতিহত করার একটা কানুন আছে। আক্রমণ করারও একটা রীতি আছে। শৃঙ্খলা মেনে চললে আহত হবার সম্ভাবনা কম। অন্যথায় জীবন সংশয়। সুতরাং-
সাবধান! যেমন বলি, অনুসরণ কর। শ্রেণীবদ্ধও হও। কাতারবন্দীও হও। অথচ একজন সৈনিক কিছুতেই ঠিকমত দাঁড়াচ্ছিলেন না কাতারে। কাতার ভেঙে বাইরে আসছিলেন বার বার। নাম তাঁর সাওয়াদ। সিপাহসালার ছুটে এলেন তাঁর কাছে।
সকলের লক্ষ্য এখন তাঁর দিকে। সাওয়াদ এখন সকল লক্ষ্যের কেন্দ্র-বিন্দু। স্থির দৃষ্টিতে সকলেই তাকিয়ে আছে। এ মুহূর্তে আদেশ অমান্য কঠিন অপরাধ। এ অপরাধের শাস্তি ভয়ানক। সকলেই ভাবছেন কি হয়। এক ভয়ঙ্কর মুহূর্তের মুখমুখী সকলেই। নিঃশ্বাসকে মুঠো করে ধরে সকলে অসম্ভব নীরব। সকলের কাতর দৃষ্টির উপর দিয়ে সেনাপতি এসে দাঁড়ালেন সাওয়াদের সামনে। তিনশ' তের জন সৈনিকের সেনাধ্যক্ষ, সর্বাধিনায়ক। হাতে সে তীর। হঠাৎ সাওয়াদের পেটে একটি খোঁচা দিয়ে তিনি ধমক দিলেন, সোজা হয়ে দাঁড়াও।
না-তেমন কঠিন কিছু নয়। মারাত্মক ঘটল না কিছু। অঘটন নয়। সহজ হয়ে দাঁড়ালেন। ভাঙা কাতার সোজা করে দিলেন সেনাপতি। যাবার জন্য পা তুলেছেন, অঘটন ঘটালেন আহত সাওয়াদ (রা)। তীরের খোঁটায় কিছুটা আহত হয়েছিলেন তিনি। অকস্মাৎ জামা তুলে সে আহত জায়গাটা দেখালেন। এরপর বজ্রপাতের মত অঘটন ঘটিয়ে নির্বাক করে দিলেন সকলকে। প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! আল্লাহ্ আপনাকে পাঠিয়েছেন মানুষকে পথ দেখানোর জন্য। পাঠিয়েছেন রহমত স্বরূপ। আশিস স্বরূপ। দয়া স্বরূপ। অথচ দয়ার বদলে আপনি আমাকে আঘাত দিলেন, ব্যথা দিলেন, আহত করলন। এরপরই বলল সে চমক দেয়া কথা: আমি এর প্রতিশোধ চাই।
এ মুহূর্তে সকলেই অবাক! সকলেই বিস্মিত। কি আস্পর্ধা সাওয়াদের? এত বড় অপরাধের পর কোথায় মাথা নীচু করবে, মাফ চাইবে-তা নয়, উল্টা চাপ!
স্পর্ধিত গলায় সে রাসূলুল্লাহ (স)-কেই দোষী করছে! কি সর্বনাশ! সে বড় অহংকারী হয়েছে। ছোট মুখে এতবড় কথা। তীর দিয়ে ভুঁড়িটা এ ফোঁড় ফোঁড় করে দেন নি এই ত ভাগ্য!
নিশ্চয়ই এ অপরাধের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। সাহাবীরা মনে মনে গর্জাচ্ছিলেন। বলতে যাচ্ছিলেন কেউ কেউ, এ ঔদ্ধত্যের শাস্তি কতল। বলতে গিয়ে বলতে পারছিলেন না। সকলেই ভয়ঙ্কর ভাবে নির্ভর করছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর। সে দিকে তাকিয়ে ছিলেন সকলেই।
কয়েকটি মাত্র মুহূর্ত! কাটল আশ্চর্য নীরবাতায়। রাসূলুল্লাহ (স) তাকালেন সাওয়াদের পেটের দিকে। সত্যিই আহত হয়েছে সে। ক্ষতস্থানে রক্ত দেখা দিয়েছে দু-এক ফোটা। তাই দেখেই যন্ত্রণায় আচমকা একটা ঝড়ো ধাক্কার বুকের হাড়গুলো চূর্ণ হয়ে যেতে চাইল রাসূলুল্লাহ (স)-এর। ঘাসের ডগায় টোপ ধরা শিশিরের মত কাতর চোখ দুটি ছলছল। হায় আমি আমার সন্তানকে আহত করলাম! এ অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে আমি আল্লাহ্ কাছে মুখ দেখাব কি করে!
অগণিত সৈনিকের নির্বাক দৃষ্টি স্থির। অকস্মাৎ রাসূলুল্লাহ (স) পরনের জামা উঁচু করলন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সাওয়াদকে বলল, এরপর, আমি প্রস্তুত। এ আমার উন্মুক্ত দেহ আর এ নাও তীর। প্রতিশোধ গ্রহণ কর। কথাগুলো ভয়ঙ্কর রকম বেদনা মলিন আর কাতর শোনাল।
তিন শ তের জন সৈন্য। ছশ ছাব্বিশটি নীরব চোখ এখন স্বপ্নাবিষ্ট। যেন একটা অপার্থিব দৃশ্য দেখলেন তাঁরা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ্র দেহ মুবারক সকলের সামনে দৃশ্যমান আর সে শুভ্র দেহের অধিকারী যে মানুষ তাঁর শুভ্রতর মনও। যা কোন অপরাধ নয়, যার জন্য কেউ কোনদিন অপরাধী হয়নি অন্যের গুরুতর অপরাধ ভুলে গিয়ে সে ত্রুটির জন্য রাসূলুল্লাহ (স) কাঁদছেন! সে অপরাধের জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী!! তিনি নতজানু! ভাবা যায় না।
আকাশ নির্বাক। জগত নির্বাক। নির্বাক বদর প্রান্তর। একজন সাধারণ সৈনিকের সামনে রাসূলুল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থী। রাসূলুল্লাহ (স) নতজানু। ভক্তিতে সম্ভ্রমে শ্রদ্ধায় প্রতিটি সৈনিকের অর্ন্তজগত প্লাবিত হয়ে গেল। এ হল তাঁদের সিপাহসালার! এ হল তাঁদের সর্বাধিনায়ক!
রাসূলুল্লাহ (স) এ সীমাহীন মহত্বের কাছে সকলে যেন বিগলিত হয়ে গেল। সমর্পিত হয়ে গেল। সে শুভ্রতার দিকে তাঁরা যত দৃষ্টিক্ষেপ করেন, ভালবাসা বেড়ে যায় তত। শেষে তাঁদের মনে হল, এ অলৌকিক দৃশ্যটি দেখে তাঁরাও যেন অলৌকিক হয়ে উঠেছেন। নিজের মধ্যে নিজেরা বহুগুণ মহৎ হয়েছেন। বহুগুন বীর্যবান হয়েছেন।
এ মহান সিপাহসালারের অধীনে অবশেষে বদরের বিশাল প্রান্তরের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করেন তাঁরা। সে দৃষ্টিতে ভীষণ প্রতীজ্ঞা। সে দৃষ্টিতে এখন যুদ্ধজয়ের ইশারা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00