📄 আর একটি পরিচয়
এতগুলো মানুষের একদল কণ্ঠ হঠাৎ যন্ত্রণায় কাত্রে উঠল, আহা! এত বড় পাথর কেউ চাপায়, এতটুকু বালকের মাথায়। ঘাড়টা ভাঙল বুঝি!
ছেলেটা কাত হয়ে পড়ে আছে বালুর ওপর। শ্বেত শুভ্র কুরাইশ বালক। যেন বাকল ছড়ান কলা গাছ। এরপর পায়ে পায়ে ছুটে আসছিল কেউ কেউ। ততক্ষণে সামলে নিয়ে উঠে বসেছে বালকটি। ঠিক আছে, বয়ে নিতে যেতে পারব আমি, তোমরা কেউ মাথায় তুলে দাও।
কণ্ঠ আহত হয়নি ছেলেটার, উল্লাস ঝরছিল বরং। কাবা ঘর ভাংচুর করে নতুন গাঁথা হচ্ছিল। সে পাথর বইছিলেন সকলে। এমন সৌভাগ্যের কাজে যদি অংশ নিতে না পারলাম! পানি তুলছিলেন কেউ কেউ। পাথর বইছিলেন অনেকেই। কাঠ ফাড়াই হচ্ছিল একদিকে। এ পবিত্র ঘরকে আরো মজবুত, আরো সুদৃঢ় করা হবে। সকল কণ্ঠের উল্লাসে, কাজের ব্যগ্রতায় একটা পবিত্র আকুলতা উপছে পড়ছিল।
আর এক যুবকের চলার ছন্দে এ পবিত্র বোধ যেন ফুল হয়ে ঝরছিল। তাঁর মুখে কোন কথা ছিল না। নবীবে কাজ করছিলেন তিনি। অথচ সকলেই তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন অসম্ভব রকম। সকলেই দেখছিলেন তাঁর ক্ষিপ্রগতি, তাঁর নিপুন শ্রম। অনেকেই নীরবে মেনে নিচ্ছিলেন তাঁর নির্দেশ। অথচ তাঁর উজালা মুখে বিশেষ কথা ছিল না। পূর্ণিমার চাঁদ যেমন নিশ্চুপ, কথা বলে না- শুধু আলো ছড়ায়-তেমনি। সে নিশ্চুপ আলোর দিকে তাকিয়ে কথা বলে আর সকলে। মনের কথা, প্রাণের কথা, জীবনের কথা।
অন্যকে ভাল কাজ করতে দেখলে অনেক সময় অনেকের ভাল হতে ইচ্ছা করে।
সে যুবকও ঘাড়ে তুলে নিয়েছিলেন একটা বড় পাথর। আল্লাহ্র ঘর গাঁথা হবে এ পাথরে। সুতরাং জীবন পণ! কিন্তু এবারের পাথরটা বুঝি প্রকাণ্ড ছিল। ভীষণ ভারি। পরণে একটি মাত্র কাপড়, আর কিছু নেই সারা অঙ্গে। অসমতল পাথরের সুচাঁলো কোনগুলো চামড়া কেটে বসে যেতে চাইছে। রক্ত বের হবে বোধ হয়। তবুও পাথরটা বয়ে আনছিলেন তিনি। ঘাড় কাঁপছিল, দেহটা যন্ত্রণায় নুয়ে পড়ছিল বার বার। লম্বা কলার পাতায় পাখি এসে বসলে যেমন নীরবে নুয়ে পড়ে-তেমনি নুয়ে পড়ছিল। তবুও শেষ চেষ্টা করছিলেন তিনি। অনেকেই বললেন, এত কষ্ট করার দরকার কি বাবা! পাথরটা রেখে একটু জিরিয়ে নাও না। পরে চেষ্টা কর আবার।
শেষ পর্যন্ত পাথরটা ফেলেই দিলেন তিনি। সারা দেহের রক্তে ভীষণ যন্ত্রণারা চিৎকার করছিল; কাঁধে হাত দিয়ে মুঠো করে সে যন্ত্রণাগুলোকে তিনি যেন ধরতে চাইলেন। না- কাঁধ রক্তাক্ত হয় নি, পাথরটা আর কয়েক মুহূর্ত ঘাড়ে থাকলে হয়ত হত। শুভ্র মুখ এখন ঘর্মাক্ত এবং রক্তাভ।
একজন এগিয়ে এসে বলল, আল্ আমীন! এত বড় পাথর কেন বইছ তুমি? আমরা ত আছি। ছোট দেখে নিয়ে এস।
আর একজন সমবেদনায় সিক্ত স্বরে গভীর গলায় বলল, মুহাম্মদ তুমি বস না বাবা। আমরা কিন্তু মরে যাইনি।
সকলের সকল কথা শুনছিলেন তিনি। তাঁর মুখে তখন যন্ত্রণা ছিল, হাসি ছিল। যেমন তারারা হাসে। মেঘে ঢাকা পড়লেও যেমন তাদের হাসি ফুরায় না। তেমনি। তবুও কারো কথা যে ভাল লাগে নি এমন একটা ভাব তাঁর নির্বাক কাতর মুখে ভাসছিল।
তাঁর চাচা হযরত আব্বাস ছিলেন সেখানে। সব ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিলেন তিনি। মুহাম্মদ-এর স্বভাব তিনি জানতেন। এ কাজ থেকে যে তাঁকে নিরস্ত করা যাবে না তাও তাঁর অজানা ছিল না। অথচ চোখের সামনে ছেলেটা কষ্ট পাবে! পাথর বলে কথা!
পাখি পালক ফুলিয়ে যেমন বাচ্চাকে কোলে টানে, অসম্ভব সমব্যথী আদরের গলায় তিনি ডাকলেন, মুহাম্মদ!
সে প্রশান্ত যুবকটি কাছে এলেন। তাঁর কাঁধে মমতার হাত রেখে স্নিগ্ধ কণ্ঠে আব্বাস বললেন, পরণের কাপড়টা কাঁধে দিয়ে নাও-তাহলে পাথর বইতে সুবিধা হবে।
তাঁর বয়সী অনেকেই যখন তখন উলঙ্গ হয়ে ঘোরা ফেরা করত মক্কার পথে। যুবক যুবতীরাও উলঙ্গ হয়ে তওয়াফ করত কাবাঘর। সুতরাং ....
একজন এসে মুহাম্মদ-এর পরণের কাপড়াটা টান মেরে খুলে নিলেন। এ কাপড়টাই এবার সে ভাঁজ করে তাঁর কাঁধে দেবে। এর উপর তুলে দেবে পাথর। কিন্তু ভালবাসার এ নির্বোধ পরিবেশন মারাত্মক হয়ে দেখা দিল প্রায় সাথে সাথে। আসার আগে কেউ বুঝতে পারে না যে এ ঝড় কতটা ওলট-পালট ঘটাবে, অথবা কটা জীবন-সংশয়ের কারণ হবে।
গুরুজনদের শত নিষেধকে উপেক্ষা করে চলে যায় অনেকে। সকল নিষেধের উপর থুতু ছিটিয়ে বুড়া আঙ্গুল দেখিয়ে নিজের পথে পা বাড়ায় কেউ কেউ। অনেকে আবার পাহাড় ভিঙাতে পারলেও গুরুজনদের চোখের পলককে অতিক্রম করতে পারে না। তাঁর বয়সী অনেক লোক যখন বিনা কাপড়ে ধেই ধেই করে নাচে, মুহাম্মদ তখন শরমের শুভ্র লেবাসে নিজেকে ঢেকে নিয়েছেন। তাই উলঙ্গ হবার সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন তিনি। কাপড়ে টান পড়ার সাথে সাথেই তাঁর গলায় যেন ফাঁস পড়ল। এতগুলো মানুষের সামনে উলঙ্গ হওয়া! কোথা থেকে এক আকাশ লজ্জা এসে তাঁর চেতনাকে গ্রাস করে ফেলল। পাহাড় সমান যন্ত্রণা ব্যথা আতঙ্ক তাঁর বোধকে রগড়ে পিষে একাকার করে দিল। ডালে ঘা পড়লে পাখিরা যেমন অকস্মাৎ ডাল শূন্য করে উড়ে যায়, কাপড়ে টান পাড়ার সাথে চেতনাবোধ সব কিছু যেন এক সাথে তাঁর দেহ ছেড়ে গিয়েছিল। খোলসের মত অত বড় দেহটা পড়ে থাকল বালির উপর। গোটান লজ্জাবতীর পাতার মত অত বড় দেহটা শরমে যেন এতটুকু হয়ে গেছে। চোখ দুটি আকাশের দিকে নিস্পন্দ।
ভীষণ ব্যগ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন সকলেই, মুহাম্মদ- অ মুহাম্মদ! বুকে ব্যাকুল হাতের স্পর্শ বুলিয়ে দেখলেন, না- স্পন্দন ঠিকই আছে।
কিন্তু?
হাতটা যেন বাড়িয়ে আছে না? একজন কাপড়টা ফেলে দিলেন তাঁর উলঙ্গ দেহের উপর। সুবাসের আন্দোলনে চারদিক থেকে মৌমাছি-প্রজাপতিরা যেমন বাতাসে ডানা মেলে ছুটে আসে পাপড়িতে, বোধ লজ্জা চেতনারা তেমনি ধীরে ধীরে ফিরে এলে মুহাম্মদ-এর চেতনাহীন দেহে। তাঁর চোখের পাতা নড়ল আবার, হাত দিয়ে কি যেন অন্বেষণ করলেন এর পরেই কাপড় পরে উঠে বসলেন।
মুহাম্মদ এর আল আমীন পরিচয় পূর্বেই পেয়েছিলেন সকলে, সমবেত কুরাইশরা আজ পেলেন তাঁর আর এক পরিচয়। তারা সকলেই দলবদ্ধ বিস্ময়ে ভাবতে শুরু করলেন, মানুষের এত লজ্জা।
📄 বিচারের কণ্ঠ
ওসামা শঙ্কিত। ওসামা দ্বিধাজড়িত। তুবও ওসামা রাসূলুল্লাহ (স) দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। মৃদু পায়ে এগুচ্ছেন। ধীরেধীরে। খুবই বিনীত ভাবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর পালিত পুত্র যায়েদ। সে মুক্তদাস যায়েদের পুত্র ওসামা। ওসামা তরুণ। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পরম আদরের। এ তরুণ ক্রীতদাস পুত্র ওসামাকে আপন উটের উপর বসিয়ে নিয়ে মক্কা-বিজয়ের দিন শহরে প্রবেশ করলন রাসূলুল্লাহ (স)। ওসামাকে তিনি এতই ভালবাসেন। এত গভীর ছিল তাঁর মমতা।
এ অসীম আন্তরিকতার জন্যই ওসামা আজ দ্বিধাগ্রস্ত। হযরতের কাছে আসতে গিয়ে আজ তাঁর মনটা দুলে উঠছে বার বার। তবুও ওসামা এগুচ্ছেন। এক-পা এক-পা করে এগুচ্ছেন। তাঁর সাথে আছে আরো কয়েকজন। মখযুম গোত্রের কয়েকজন লোক। কুরাইশদেরই একটা শাখা বনী মখযুম গোত্র। বড় সম্মানিত গোত্র। বড় সম্ভ্রান্ত। অন্য গোত্রের বিচার শালিশী করে তারা। খোলা মাঠের পিঠে যেমন রোদ চড়ে থাকে, যেমন তাকে ফেলা যায় না কোন মতেই তেমনি মখযুমদের কড়া দৃষ্টি শাসন করে অন্য গোত্রদের। কারো শক্তি নেই সে দৃষ্টিকে উপেক্ষা করার। অবহেলা বরার। এ মখযুম গোত্রের এক মহিলা ধরা পড়েছে চুরির দায়ে। আর ধরা পড়তেই শুরু হয়েছে যত গোলযোগ। আগে হলে অবশ্য কোন কথা ছিল না। বেকসুর খালাস হয়ে যেত। কিন্তু মক্কা-বিজয়ের পরে সকলেই মুসলমান হয়ে গেছে। আর তাতেই যত ফ্যাসাদ। এখন চুরির শাস্তি হাতকাটা। আর সে কম কথা নয়।
এতবড় একটা সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ের হাতকাটা যাবে, আর সে কাটা হাত নিয়ে চলবে ফিরবে- কি লজ্জা! কি লজ্জা!!
তার পরিবারের সকলেই তাই এসে ধরেছে ওসামাকে। ওসামা বললে হয়ত কথা রাখবেন রাসূলুল্লাহ (স)। হযত হাত কাটবেন না। হয়ত মাফ করে দেবেন।
তা ছাড়া- এত বড় একটা মানী গোত্র। সম্ভ্রান্ত ঘর। মান-ইজ্জতের একটা ব্যাপার আছে। এসব কথা নিশ্চয়ই বিবেচনা করব। বিচারক রাসূলুল্লাহ (স) দৃষ্টি থেকে এসব নিশ্চয়ই এড়িয়ে যাবে না।
ওসামা এগুচ্ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। তাঁর সাথে যেতে যেতে এমন সব কথা চিন্তা করছিলেন সকলেই। এমন সব ন্যায় আর বিবেচনার কথা ভাবছিলেন মখযুম গোত্রের লোকেরা।
মক্কা-বিজয়ের আনন্দ মেটেনি তখনো। সে উল্লাসের জের চলছে সাহাবাদের মধ্যে। ডুব দেবার পর দীঘির বুকে তরঙ্গরা যেমন দুলে ওঠে বৃত্তাকারে। রাসূলুল্লাহ (স) অবশ্য নীরব। কিন্তু চঞ্চল। বহু গোত্রের লোক আসছে দীক্ষা নিতে। তাদের কথা শুনছেন ধ্যানস্থ হয়ে। তাদের শোনাচ্ছেন আল্লাহ্ কথা। ইসলামের কথা। সত্যের কথা। তারা চলে যায়। আবার নতুন দল আসে।
রাসূলুল্লাহ ব্যস্ত।
ওসামা এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। নম্র আর বিনীত ভাবে। মুখযুমের লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে পিছনে। ওসামা বলল তাঁর কথা। কুণ্ঠার সাথে। ইয়া রাসূলুল্লাহ! এসব দিকগুলো বিবেচনা করে যদি ক্ষমা করেন, যদি-
প্রশস্ত ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখ। প্রশান্ত আর উজ্জল। একটা খুশির আলো ছড়িয়ে ছিল সারা মুখে। হঠাৎ যেন সে আলোটা নিভে গেল। সে খুশির ভাবটা কেউ যেন আলতো মুছে নিয়ে গেল মুখ থেকে। গম্ভীর হয়ে গেলেন তিনি। ভীষণ গম্ভীর। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ব্যঞ্জক স্বরে বললেন, ওসামা! আল্লাহ্ যে শাস্তি স্থির করে দিয়েছেন, তুমি কি আমাকে এর ব্যতিক্রম করতে বলছ?
মেষ শিশুটির মত ওসামার অবস্থা। মৃদু হাওয়ায় ঘাসের ডগা কাঁপছে। আর সে ডগা থেকে টোপ ধরা শবনম যেন এখুনি লুটিয়ে পড়বে মাটিতে। ওসামা পড়েই যেতেন। শেষ পর্যন্ত টাল সামলে বসে গেলেন।
কি বলতে এসে কি হয়ে গেল। দিশেহারা হয়ে গেল ওসামা। রাসূলের কদম মুবারকে লুটিয়ে তিনি কেবলই বলছেন, আমার জন্য ক্ষমার আবেদন করুন! আমার জন্য ..... প্রত্যয় দৃঢ় কণ্ঠে রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে সম্বোধন করে বললেন, তোমরা নিশ্চিতরূপে জেনে রাখ-বিচারে নিরপেক্ষতার অভাবে অতীতে বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। বড় লোকেরা কেউ কোন অন্যায় করলে নামমাত্র বিচার হত, বেকসুর খালাস হয়ে যেত। এরপর ঠিক একই অপরাধে কোন গরীব অপরাধী হলে কঠোর সাজা নেমে আসত তার ওপর। কেবল এ কারণে বনি ইসরাঈল জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।
সাহাবীরা নীরব। মখযুমেরা নীরব। নীরব ওসামা। তাদের চিন্তার জগতে যেন নতুন আলো ফেলছে এসব কথা। উপলব্ধি করল তারা, বৃষ্টি হলে যেমন তা পড়ে সব ঠাঁই, ধনীর অট্টালিকায় অর গরীবের জীর্ণ কুটিরে -বিচারের ঝড়ো হওয়া কেন শুধু উড়িয়ে নিয়ে যাবে দুঃখীর চাল-চুলা? কেন দোররার নির্মম আঘাতগুলো শুধু পড়বে কঙ্কালসার দেহুগুলোর ওপর?
তোমরা জেনে রাখ, বাতাস কম্পিত করে বললেন রাসূলুল্লাহ (স), যাঁর হাতে আমার জীবন সে আল্লাহ্র কসম! ইসলামে কখনো এমনটি হতে পারে না। আজ যদি আমার কন্যা ফাতিমাও এ অপরাধে লিপ্ত হত, সেও আল্লাহ্ নির্ধারিত সাজা থেকে রেহাই পেত না। আমি অবশ্যই তার হাত কাটতাম।
এত শুধু কথা নয়। এ একটা চেতনা। এ নতুন চেতনার ভিতর দিয়ে শুরু হল আত্মার জাগরণ। টলতে টলতে বাড়ির পথ ধরল মখযুম গোত্রের সকলেই। বাতাসের কম্পন তখনও যেন তাদের কানে কথা বলছে, জেনে রাখ- আমার কন্যা ফাতিমাও যদি ..... ।
📄 শত্রু হল মিত্র
ভীষণ কলরোলে মসজিদ নববীর প্রাঙ্গন আজ উচ্চকিত। অসংখ্য মানুষের জমায়েত। অসংখ্য মানুষ চারদিক থেকে ছুটে এসে যোগ দিচ্ছে সে সমাবেশে। জমায়েত আরো বড় হচ্ছে। ভারি হচ্ছে।
সকলেই বলছেন ‘কতল’। জানের দুষমণকে ছাড়া যায় না আর। কতলই সুমামা ইবনুল আদালের একমাত্র শাস্তি। ইসলামের দুষমণ। রাসূলের দুষমণ। আল্লাহ্র দুষমণ। সকল মানুষই বাতাসে চাপা তপ্ত উত্তেজনা ছাড়ল, সকল দুষমণির অবসান হোক আজ। এখনই।
সুমামা ইবনুল আদাল। দুর্ধর্ষ বনু হানিফা গোত্রের সর্দার। শয়তানী চালে বনু হানিফা গোত্র বহু খ্যাত। অনেক দুর্নাম তাদের। এ গোত্র থেকেই বেরিয়েছিল মুসাইলামাতুল কাযযাব-নবুয়তের দাবীদার মিথ্যুক নবী। তাই সব সম্ভব এ গোত্রের পক্ষে। সকলেই যখন সত্যকে গ্রহণ করেছে ব্যাপকভাবে এরা তখন যুদ্ধ করে যাচ্ছে রাসূলের বিরুদ্ধে। এমনই এক যুদ্ধে ধরা পড়েছে গোত্র-সর্দার সুমামা। এখন মসজিদ নববীর এক খুঁটির সাথে রজ্জবদ্দ। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশেই বাঁধা হয়েছে। খুব শক্ত করে বাঁধার কথা বলেছেন তিনি। সে শয়তানকে ঘিরেই জনতার ভিড়।
‘কতল’। চিৎকার উঠল কয়েকজন। কয়েকজন বলল, এখনও বেঁচে আছে আল্লাহ্ দুষমণ? তাদের সকলকে থামিয়ে দিলেন একজন সাহাবী বললেন, বিচার যা করার-রাসূলুল্লাহ (স)-ই করবেন। আপনারা অযথা মন্তব্য থেকে বিরত হোন।
সকলেই চুপ হয়ে গেল একেবারে। যেন সেখানে জনপ্রাণী নেই একজনও। এ নিস্তব্ধতার মধ্যে, কিছু পরে এলেন রাসূলুল্লাহ (স)। এখনুই বিচার হয়ে যাবে। নীরবতাটা পাথরের মত জমাট বেঁধে গেল অকস্মাৎ। সকলেই তাকিয়ে রইলেন ভীষণ ভাবে।
বন্দীর দিকে চোখ তুললেন রাসূলুল্লাহ (স)। এরপর স্থিরকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলার আছে তোমার?
সুমাম ইবনুল আদাল মিনিতিভরা চোখে তাকালেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। এরপর বলল :
মুহাম্মদ! আপনি যদি আমাকে কতল করেন তা হলে যথার্থ অপরাধী আর খুনীকে হত্যা করবেন।
আর যদি আমার প্রতি দয়া করেন, অনুগ্রহ করেন....তা হলে একজন সত্যিকার কৃতজ্ঞ ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করবেন।
আর যদি মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে চান তা হলে বলুন কত দিতে হবে।
সুমামার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলেন রাসূলুল্লাহ (স)। এরপর কোন রকম মন্তব্য না করেই উঠে চলে গেল।
দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনে মসজিদে এসে বন্দীর প্রতি ঠিক একই প্রশ্ন করলেন রাসূলুল্লাহ (স) আর সুমামা ঠিক একই কথা বলে গেল। এ দুদিনও চুপচাপ কেবল শুনে গেলেন তিনি।
সুমামা নিজেও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। কেননা সে যে অপরাধ করেছে এর একমাত্র দণ্ড কতল। সে নিজে বিচারক হলেও তাই করত। এ মৃত্যুর মুহূর্তে সে মুসলমানদের প্রতি যে অত্যাচার করেছে, যত খুন করেছে সবই মনে পড়ছিল তার। সে ক্রমাগত ম্রিয়মান হয়ে পিেছলেন। কলার সবুজপাতা যেমন রোদে কুঁকড়ে যায় তেমনি। আর অনবরত কাঁদছিল। এখন কেবলমাত্র একজনের নির্দেশের অপেক্ষা। নির্দেশের সাথে সাথে পার্থিব সকল লীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে তার।
অকস্মাৎ একজন সাহাবীকে ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (স)। ডেকে বললেন সুমামার সব বাঁধন খুলে দাও।
সুমামা ইবনুল আদাল বিস্মিত। সুমামা অবাক। এ আচরণ সুমামার ধারণার অতীত। একজন সাহাবী এসে সত্যিই তাঁকে মুক্ত করে দিলেন। মুক্ত হবার পর সে একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। পরাজিত সৈনিকের মত মসজিদ নববীর থেকে ধীরে, অতি ধীরে পথে নামল। এরপর মিলিয়ে গেল।
তাঁর চলার পথের দিকে তাকিয়ে কোন কোন সাহাবী ভাবলেন, সাপের মত হাঁটছে সুমামা। এখনই আপন গোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে নিশ্চয়ই আর একটা প্রচণ্ড আক্রমণের জন্য তৈরী হবে।
সাহাবীরা সেখানে বসে নানার কথা আলোচনা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)ও বসেছিলেন। একটি কথাও বলছিলেন না। একটু পরেই সে মজলিসে ফিরে এলেন সুমামা ইবনুল আদাল। মদীনার উপকণ্ঠে একটা কুপ থেকে গোসল সের পবিত্র হয়ে এসেছে। এসে রাসূলুল্লাহর সামনে দাঁড়ালেন।
মধুর কণ্ঠে হযরত জিজ্ঞেস করলেন, কি খবর সুমামা? অসম্ভব বিনীত কণ্ঠে সুমামা বলল, সত্য ধর্মে দীক্ষা দিন আমাকে। আমি আর অন্ধকারে ফিরে যাব না।
রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, ভাল করে চিন্তা করে দেখ। দরকার হলে আরো সময় নাও।
এর আর দরকার নেই ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)। আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে সুমামা বলল, একটু আগেও আপনার এ শহরের চাইতে ঘৃণা শহর আমার কাছে একটিও ছিল না, এখন আমার কাছে এ শহর হল প্রিয় জনপদ। কিছু পূর্বেও আপনার ধর্মের চেয়ে কোন জঘন্য ধর্ম আমার দৃষ্টিতে ছিল না, এখন এ ধর্মের চেয়ে উত্তম কোন ধর্ম আমার বিবেচনায় নেই। একটু আগে আপনার চেয়ে কোন ঘৃণ্য মানুষ ছিল না আমার চোখে, এখন এ বিশাল বিশ্বে আপনার চেয়ে অধিক প্রিয় আমার আর কেউ নেই।
এ কথা বলেই সুমামা ইবনুল আদাল হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর পা দুটি ধরে অবিরাম কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর কদম মুবারক দুটি ধরে সুমামা ইবনুল আদাল কাঁদতে থাকলেন। কাঁদতেই থাকলেন। অবিরাম।
ভীষণ কলরোলে মসজিদ নববীর প্রাঙ্গন আজ উচ্চকিত। অসংখ্য মানুষের জমায়েত। অসংখ্য মানুষ চারদিক থেকে ছুটে এসে যোগ দিচ্ছে সে সমাবেশে। জমায়েত আরো বড় হচ্ছে। ভারি হচ্ছে।
সকলেই বলছেন ‘কতল’। জানের দুষমণকে ছাড়া যায় না আর। কতলই সুমামা ইবনুল আদালের একমাত্র শাস্তি। ইসলামের দুষমণ। রাসূলের দুষমণ। আল্লাহ্র দুষমণ। সকল মানুষই বাতাসে চাপা তপ্ত উত্তেজনা ছাড়ল, সকল দুষমণির অবসান হোক আজ। এখনই।
সুমামা ইবনুল আদাল। দুর্ধর্ষ বনু হানিফা গোত্রের সর্দার। শয়তানী চালে বনু হানিফা গোত্র বহু খ্যাত। অনেক দুর্নাম তাদের। এ গোত্র থেকেই বেরিয়েছিল মুসাইলামাতুল কাযযাব-নবুয়তের দাবীদার মিথ্যুক নবী। তাই সব সম্ভব এ গোত্রের পক্ষে। সকলেই যখন সত্যকে গ্রহণ করেছে ব্যাপকভাবে এরা তখন যুদ্ধ করে যাচ্ছে রাসূলের বিরুদ্ধে। এমনই এক যুদ্ধে ধরা পড়েছে গোত্র-সর্দার সুমামা। এখন মসজিদ নববীর এক খুঁটির সাথে রজ্জবদ্দ। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশেই বাঁধা হয়েছে। খুব শক্ত করে বাঁধার কথা বলেছেন তিনি। সে শয়তানকে ঘিরেই জনতার ভিড়।
‘কতল’। চিৎকার উঠল কয়েকজন। কয়েকজন বলল, এখনও বেঁচে আছে আল্লাহ্ দুষমণ? তাদের সকলকে থামিয়ে দিলেন একজন সাহাবী বললেন, বিচার যা করার-রাসূলুল্লাহ (স)-ই করবেন। আপনারা অযথা মন্তব্য থেকে বিরত হোন।
সকলেই চুপ হয়ে গেল একেবারে। যেন সেখানে জনপ্রাণী নেই একজনও। এ নিস্তব্ধতার মধ্যে, কিছু পরে এলেন রাসূলুল্লাহ (স)। এখনুই বিচার হয়ে যাবে। নীরবতাটা পাথরের মত জমাট বেঁধে গেল অকস্মাৎ। সকলেই তাকিয়ে রইলেন ভীষণ ভাবে।
বন্দীর দিকে চোখ তুললেন রাসূলুল্লাহ (স)। এরপর স্থিরকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলার আছে তোমার?
সুমাম ইবনুল আদাল মিনিতিভরা চোখে তাকালেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। এরপর বলল :
মুহাম্মদ! আপনি যদি আমাকে কতল করেন তা হলে যথার্থ অপরাধী আর খুনীকে হত্যা করবেন।
আর যদি আমার প্রতি দয়া করেন, অনুগ্রহ করেন....তা হলে একজন সত্যিকার কৃতজ্ঞ ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করবেন।
আর যদি মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে চান তা হলে বলুন কত দিতে হবে।
সুমামার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলেন রাসূলুল্লাহ (স)। এরপর কোন রকম মন্তব্য না করেই উঠে চলে গেল।
দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনে মসজিদে এসে বন্দীর প্রতি ঠিক একই প্রশ্ন করলেন রাসূলুল্লাহ (স) আর সুমামা ঠিক একই কথা বলে গেল। এ দুদিনও চুপচাপ কেবল শুনে গেলেন তিনি।
সুমামা নিজেও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। কেননা সে যে অপরাধ করেছে এর একমাত্র দণ্ড কতল। সে নিজে বিচারক হলেও তাই করত। এ মৃত্যুর মুহূর্তে সে মুসলমানদের প্রতি যে অত্যাচার করেছে, যত খুন করেছে সবই মনে পড়ছিল তার। সে ক্রমাগত ম্রিয়মান হয়ে পিেছলেন। কলার সবুজপাতা যেমন রোদে কুঁকড়ে যায় তেমনি। আর অনবরত কাঁদছিল। এখন কেবলমাত্র একজনের নির্দেশের অপেক্ষা। নির্দেশের সাথে সাথে পার্থিব সকল লীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে তার।
অকস্মাৎ একজন সাহাবীকে ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (স)। ডেকে বললেন সুমামার সব বাঁধন খুলে দাও।
সুমামা ইবনুল আদাল বিস্মিত। সুমামা অবাক। এ আচরণ সুমামার ধারণার অতীত। একজন সাহাবী এসে সত্যিই তাঁকে মুক্ত করে দিলেন। মুক্ত হবার পর সে একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। পরাজিত সৈনিকের মত মসজিদ নববীর থেকে ধীরে, অতি ধীরে পথে নামল। এরপর মিলিয়ে গেল।
তাঁর চলার পথের দিকে তাকিয়ে কোন কোন সাহাবী ভাবলেন, সাপের মত হাঁটছে সুমামা। এখনই আপন গোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে নিশ্চয়ই আর একটা প্রচণ্ড আক্রমণের জন্য তৈরী হবে।
সাহাবীরা সেখানে বসে নানার কথা আলোচনা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)ও বসেছিলেন। একটি কথাও বলছিলেন না। একটু পরেই সে মজলিসে ফিরে এলেন সুমামা ইবনুল আদাল। মদীনার উপকণ্ঠে একটা কুপ থেকে গোসল সের পবিত্র হয়ে এসেছে। এসে রাসূলুল্লাহর সামনে দাঁড়ালেন।
মধুর কণ্ঠে হযরত জিজ্ঞেস করলেন, কি খবর সুমামা? অসম্ভব বিনীত কণ্ঠে সুমামা বলল, সত্য ধর্মে দীক্ষা দিন আমাকে। আমি আর অন্ধকারে ফিরে যাব না।
রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, ভাল করে চিন্তা করে দেখ। দরকার হলে আরো সময় নাও।
এর আর দরকার নেই ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)। আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে সুমামা বলল, একটু আগেও আপনার এ শহরের চাইতে ঘৃণা শহর আমার কাছে একটিও ছিল না, এখন আমার কাছে এ শহর হল প্রিয় জনপদ। কিছু পূর্বেও আপনার ধর্মের চেয়ে কোন জঘন্য ধর্ম আমার দৃষ্টিতে ছিল না, এখন এ ধর্মের চেয়ে উত্তম কোন ধর্ম আমার বিবেচনায় নেই। একটু আগে আপনার চেয়ে কোন ঘৃণ্য মানুষ ছিল না আমার চোখে, এখন এ বিশাল বিশ্বে আপনার চেয়ে অধিক প্রিয় আমার আর কেউ নেই।
এ কথা বলেই সুমামা ইবনুল আদাল হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর পা দুটি ধরে অবিরাম কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর কদম মুবারক দুটি ধরে সুমামা ইবনুল আদাল কাঁদতে থাকলেন। কাঁদতেই থাকলেন। অবিরাম।
📄 যে দৃষ্টান্তের তুলনা হয়না
দীর্ঘদিন একটানা বৃষ্টি বাদলে মনের অস্বস্তি যখন পীড়াদায়ক যন্ত্রণা, আকাশ আলো করা রোদ বড় কাঙ্খিত। সে আবেদনের তাজা রোদ এখন আরবের আকাশে। অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনেক দুর্ভোগ-দুর্যোগ অতিক্রান্ত। কত নিষ্ঠুর নিগ্রহ, কত পাশবিক রক্তপাত!
মানুষ এখন বুক ভরাট করে শ্বাস নিচ্ছে। আহার বিহার নিয়ন্ত্রিত। রীতি-নীতিতে শৃঙ্খলা। গভীর কৃতজ্ঞতায় সকলে এক আল্লাহকে সিজদানত। যে সব ইহুদি-খৃষ্টান-কুরাইশরা হাসাহাসি করত, তারা এখন নীরব। সে দল-ভারি দল এখন ভারহীন শীর্ণ, কৃষ্ণপক্ষ-চাঁদের মত লাগাতার ক্ষীয়মান। তাদের এখন অস্তিত্ব বাঁচানোর সংগ্রাম।
পথ চলতে চলতে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত হয়ে আসছিল রাসূলুল্লাহ (স)। সকল সাফল্যেই তিনি আল্লাহ্র অদৃশ্য মহাশক্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। পথ চলতে চলতে তিনি স্ফীত শ্বাস নিয়ে কৃতজ্ঞসিক্ত দীর্ঘ উচ্চারণে বললেন, আল্লাহু।
আকাশে উজ্জল রোদের সমারোহ। তবুও কোথাও কোথাও যেন মেঘের ছায়া। কাল আভাস। এতদিনের এত যুগের এত বদভ্যাস বুঝি নির্মূল হয় না এক সাথে! এক ক্ষেপে ধরা পড়ে না বুঝি সব কলঙ্ক।
চলতে চলতে এক বাগানের পাশে এসে থামলেন রাসূলুল্লাহ (স)। দেখলেন, একটা উটকে কে বেঁধে রেখে গেছে উঁচু ডালের সাথে। বসতে পারছে না, শুতে পারছে না। শাস্তির মত এক রকম ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটানা। এর উপর কতদিন খেতে পায় নি ঠিকমত। জীর্ণশীর্ণ। হাড়গুলো গুনে নেয়া যায়। চোখ দুটি ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে চোয়াল থেকে। চামড়ার উপর সারা দেহে জুড়ে পর্যাপ্ত বেদনা ছড়ান।
কষ্ট উটের নয়, যেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজের। বুকটা কাত্রে উঠল তাঁর। পায় পায় তিনি এগিয়ে এলেন উটের কাছে। আর কি আশ্চর্য, রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখতে পেয়েই উটটা ব্যথায় উল্লাসে অভিমানে সে এক রকম গলায় ডেকে উঠল। মাকে দেখে কথা না-ফোটা শিশু যেমন ডাকে, ডালে ফেরা মায়ের শব্দে নির্বাক শাবকেরা যেমন কাকলি মুখর হয়! ডাক ত নয়, যেন মজলুমের আর্তনাদ : দেখুন রাসূলুল্লাহ (স)-আমাকে এরা মেরেই ফেলছে। অনেক ক্রীতদাসকে আপনি উদ্ধার করেছেন জালিমের অত্যাচার থেকে, অতএব আমাকেও বাঁচান।
রাসূলুল্লাহ (স) এগিয়ে এসে এবার হাত রাখলেন উটের গায়। চোখে মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। মহব্বতের হাত। ভালবাসার হাত। আর সে কোমল পরশে উটের যন্ত্রণা যেন ঝরে পড়ল চোখ বেয়ে। আমার মত অগণিত উট ঘরে ঘরে উপবাসী। আপনি ও রাহমাতুল্লিল আলামীন, আমরা মুখ চেয়ে আছি আপনার।
আমার উটকে আমি খেতে দিই না দিই-তোমার কি? আমার দুম্বা মরে গেলে ফেলে দেব, তুমি বলার কে? এটাই ছিল জাহেলিয়াত যুগের নিয়ম। তাই চলছিল।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন উটটা একজন আনসারের। তাকে ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (স)। আনসার এল, সাথে আরো অনেকে। রীতিমত একটা জমায়েত হয়ে গেল দেখতে দেখতে। সকলেই উদগ্রীব, কি বলবেন রাসূলুল্লাহ (স)? মারবেন আনসারকে? সাজা দেবেন? কি করবেন?
জনতা নীরব দুবাহু মেলে মানুষকে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলে মানুষেরা যেমন চুপ করে, তেমনি নীরব। রাসূলুল্লাহ (স) ধীরে ধীরে সে জনতার দিকে মুখ তুলে তাকালেন। তাকিয়েই রইলেন-দীর্ঘক্ষণ। দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিক্ষেপে পরিবেশে পর্যাপ্ত গাম্ভীর্য আর মৃদু ভৎর্সনার স্বরে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, এসব নিরীহ আর বোবা প্রাণী সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর। অর্থাৎ-
'তোমারও প্রাণ আছে, উটেরও আছে। খেতে না পেলে তুমি কষ্ট পাও, উটও পায় না? সুতরাং সাবধান! সব কিছুর স্রষ্টা আল্লাহ্। কাকে কষ্ট দিচ্ছ আর কোন অবলা প্রাণে ব্যাথা দিচ্ছ সব দেখছেন তিনি। তোমাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্, আমাকেও আর এ উটকেও। প্রাণ আল্লাহ্র সৃষ্টি – তাই না? সুতরাং এর প্রতি বিবেচনা কর।'
দীর্ঘদিন একটানা বৃষ্টি বাদলে মনের অস্বস্তি যখন পীড়াদায়ক যন্ত্রণা, আকাশ আলো করা রোদ বড় কাঙ্খিত। সে আবেদনের তাজা রোদ এখন আরবের আকাশে। অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনেক দুর্ভোগ-দুর্যোগ অতিক্রান্ত। কত নিষ্ঠুর নিগ্রহ, কত পাশবিক রক্তপাত!
মানুষ এখন বুক ভরাট করে শ্বাস নিচ্ছে। আহার বিহার নিয়ন্ত্রিত। রীতি-নীতিতে শৃঙ্খলা। গভীর কৃতজ্ঞতায় সকলে এক আল্লাহকে সিজদানত। যে সব ইহুদি-খৃষ্টান-কুরাইশরা হাসাহাসি করত, তারা এখন নীরব। সে দল-ভারি দল এখন ভারহীন শীর্ণ, কৃষ্ণপক্ষ-চাঁদের মত লাগাতার ক্ষীয়মান। তাদের এখন অস্তিত্ব বাঁচানোর সংগ্রাম।
পথ চলতে চলতে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত হয়ে আসছিল রাসূলুল্লাহ (স)। সকল সাফল্যেই তিনি আল্লাহ্র অদৃশ্য মহাশক্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। পথ চলতে চলতে তিনি স্ফীত শ্বাস নিয়ে কৃতজ্ঞসিক্ত দীর্ঘ উচ্চারণে বললেন, আল্লাহু।
আকাশে উজ্জল রোদের সমারোহ। তবুও কোথাও কোথাও যেন মেঘের ছায়া। কাল আভাস। এতদিনের এত যুগের এত বদভ্যাস বুঝি নির্মূল হয় না এক সাথে! এক ক্ষেপে ধরা পড়ে না বুঝি সব কলঙ্ক।
চলতে চলতে এক বাগানের পাশে এসে থামলেন রাসূলুল্লাহ (স)। দেখলেন, একটা উটকে কে বেঁধে রেখে গেছে উঁচু ডালের সাথে। বসতে পারছে না, শুতে পারছে না। শাস্তির মত এক রকম ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটানা। এর উপর কতদিন খেতে পায় নি ঠিকমত। জীর্ণশীর্ণ। হাড়গুলো গুনে নেয়া যায়। চোখ দুটি ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে চোয়াল থেকে। চামড়ার উপর সারা দেহে জুড়ে পর্যাপ্ত বেদনা ছড়ান।
কষ্ট উটের নয়, যেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজের। বুকটা কাত্রে উঠল তাঁর। পায় পায় তিনি এগিয়ে এলেন উটের কাছে। আর কি আশ্চর্য, রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখতে পেয়েই উটটা ব্যথায় উল্লাসে অভিমানে সে এক রকম গলায় ডেকে উঠল। মাকে দেখে কথা না-ফোটা শিশু যেমন ডাকে, ডালে ফেরা মায়ের শব্দে নির্বাক শাবকেরা যেমন কাকলি মুখর হয়! ডাক ত নয়, যেন মজলুমের আর্তনাদ : দেখুন রাসূলুল্লাহ (স)-আমাকে এরা মেরেই ফেলছে। অনেক ক্রীতদাসকে আপনি উদ্ধার করেছেন জালিমের অত্যাচার থেকে, অতএব আমাকেও বাঁচান।
রাসূলুল্লাহ (স) এগিয়ে এসে এবার হাত রাখলেন উটের গায়। চোখে মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। মহব্বতের হাত। ভালবাসার হাত। আর সে কোমল পরশে উটের যন্ত্রণা যেন ঝরে পড়ল চোখ বেয়ে। আমার মত অগণিত উট ঘরে ঘরে উপবাসী। আপনি ও রাহমাতুল্লিল আলামীন, আমরা মুখ চেয়ে আছি আপনার।
আমার উটকে আমি খেতে দিই না দিই-তোমার কি? আমার দুম্বা মরে গেলে ফেলে দেব, তুমি বলার কে? এটাই ছিল জাহেলিয়াত যুগের নিয়ম। তাই চলছিল।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন উটটা একজন আনসারের। তাকে ডাকলেন রাসূলুল্লাহ (স)। আনসার এল, সাথে আরো অনেকে। রীতিমত একটা জমায়েত হয়ে গেল দেখতে দেখতে। সকলেই উদগ্রীব, কি বলবেন রাসূলুল্লাহ (স)? মারবেন আনসারকে? সাজা দেবেন? কি করবেন?
জনতা নীরব দুবাহু মেলে মানুষকে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলে মানুষেরা যেমন চুপ করে, তেমনি নীরব। রাসূলুল্লাহ (স) ধীরে ধীরে সে জনতার দিকে মুখ তুলে তাকালেন। তাকিয়েই রইলেন-দীর্ঘক্ষণ। দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিক্ষেপে পরিবেশে পর্যাপ্ত গাম্ভীর্য আর মৃদু ভৎর্সনার স্বরে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, এসব নিরীহ আর বোবা প্রাণী সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর। অর্থাৎ-
'তোমারও প্রাণ আছে, উটেরও আছে। খেতে না পেলে তুমি কষ্ট পাও, উটও পায় না? সুতরাং সাবধান! সব কিছুর স্রষ্টা আল্লাহ্। কাকে কষ্ট দিচ্ছ আর কোন অবলা প্রাণে ব্যাথা দিচ্ছ সব দেখছেন তিনি। তোমাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্, আমাকেও আর এ উটকেও। প্রাণ আল্লাহ্র সৃষ্টি – তাই না? সুতরাং এর প্রতি বিবেচনা কর।'