📄 নবীজীর দুঃখ
গাছের কি প্রাণ আছে? গাছ কি কথা বলতে পারে?
অবশ্যই গাছের প্রাণ আছে। প্রাণ না থাকলে গাছ মরে কিভাবে?
গাছ কেটে ঘরের আসবাবপত্র বানানো হয়। যে আকারের চেয়ার, টেবিল, খাট, পালং বানানো হয়, সব সময় তাই থাকে। এগুলো কি কখনও আস্তে আস্তে বড় হয়ে যায়? না হয়। কারণ এ গুলোর প্রাণ নেই। কিন্তু গাছ বড় হয়। গাছের পাতা শুকিয়ে যায়। নতুন পাতা গজায়। গাছ কি কথা বলতে পারে? গাছ তাও পারে। গাছের পাতা আল্লাহ্র যিকির করে। গাছ আল্লাহ্ ইবাদতও করে। আল্লাহ্ গাছের জন্য যে হুকুম করেছেন, গাছ সে হুকুম মানে। আল্লাহ্ গাছ বানিয়েছেন মানুষের উপকারের জন্য। শুধু গাছ কেন, আল্লাহ্ সব কিছুই বানিয়েছেন মানুষের উপকারের জন্য।
মানুষের জন্য আল্লাহ্র দুনিয়ার সব কিছু বানালেও কোন কিছুই নিজের ইচ্ছামত মানুষ ব্যবহার করতে পারে না। আল্লাহ্ জিনিস ব্যবহার করতে হলে আল্লাহ্ হুকুম মত ব্যবহার করতে হয়। বিনা দরকারে একটা পোকা মারতেও আল্লাহ্ নিষেধ আছে। শুধু পোকা কেন, আমাদের নবী (স) বিনা দরকারে এক ফোঁটা পানিও নষ্ট করতে মানা করেছেন। আমাদের দরকারে গাছের ডাল কাটা যায়। দরকার হলে গাছও কাটাতে হয়। অকারণে গাছের পাতা ছেঁড়া আমাদের নবী (স) পছন্দ করতেন না। এ সম্পর্কে একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত আছে।
নবী (স) তাঁর সাহাবীদের নিয়ে এক সফরে বের হলেন। এক জায়গায় গিয়ে তাঁরা তাঁবু গাড়েন। নবী (স) দেখলেন কিছু লোক একটি গাছের নীচে বসে আছে। আর একটি লোক মনের আনন্দে গাছের পাতা ছিঁড়ছে। এটা দেখে নবী দুঃখিত হলেন। তিনি লোকটিকে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেন তুমি অযথা গাছের পাতা ছিঁড়ছ? লোকটি বলল: এমনি, গাছের পাতা ছিঁড়লে দোষ কি? রাসূল (স) লোকটির আরো কাছে গিয়ে তার চুল ধরে একটু টান দিলেন। জিজ্ঞেস করলন: কেমন লাগল? লোকটি বলল: একটু ব্যথা পেলাম।
রাসূল (স) বললেন: যদি তোমার চুল ছিঁড়ে যেত কেমন ব্যথা পেতে? লোকটি বলল: আরও বেশী ব্যথা পেতাম। রাসূল (স) বললেন: গাছের পাতা ছিঁড়লে গাছও এমনি ব্যথা পায়। লোকটি বলল: কেন, গাছ ব্যথা পাবে কেন? গাছের কি প্রাণ আছে? রাসূল (স) বললেন: কেন থাকবে না! তুমি কি গাছ মরতে দেখনি? লোকটি বলল: দেখেছি।
রাসূল (স) বললেন: তা হলে তুমিই বল, গাছের জীবন নেই কি? যার জীবন থাকে সে কিন্তু মরে। তা নয় কি? লোকটি এবার লজ্জা পেল।
রাসূল (স) বললেন: অকারণে গাছের পাতা ছেঁড়া উচিত নয়। অবশ্য প্রয়োজনে তুমি গাছের পাতা ছিঁড়তে পার। এমনকি গোটা গাছটাই কাটতে পার।
ভাল কাজের জন্য একজন মুসলিম গাছের পাতা ছেঁড়া কেন, নিজের জীবনটাও দিয়ে দিতে পারে, জালিমের সাথে জিহাদ করে শহীদ হতে পারে। কিন্তু অকারণে কোন মুসলমান গাছের একটি পাতাও ছিঁড়তে পারে না।
📄 এক অভাবনীয় পরিবর্তন
গভীর অরণ্যে সাপেরা যেমন স্বাধীন, গুহায় যেমন বাঘেরা-আপন মহলে তেমনি স্বাধীন ইহুদীরা। তেমনি বিষমুখ। তেমনি হিংস্র। বিষে দেহ জরজর, মুখ ভর্তি বিষের থলি-তাই নিয়ে সাপেরা খেলা করে, বেড়ায়, খায়, ঘুমায়। ইহুদীরা বুঝি এরও অধিক। ক্রুর হিংস্রতা নিয়ে বেরিয়ে আসে গুহা থেকে, বাঘের মত। এরপর বুকে ভর দিয়ে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায় মদীনার পথে পথে। উদ্ধ্যত ফণা, কেবল সুযোগের অনুসন্ধান। এরপর নিশ্চিত ছোবল। এ ছোবল গিয়ে পড়ে মুসলমানদের উপর। রাসূলুল্লাহ (স)-কে পেলে কিন্তু আর কথাই নেই। তাঁকে অপমান করতে পারলে দলশুদ্ধ সকলেই খুশিতে মাতাল হয়ে ওঠে। তুফান বয়ে যায় আনন্দের!
কিন্তু কি আশ্চর্য-কিছুতেই কায়দা করা যাচ্ছে না মুহাম্মদ (স)-কে। দলবদ্ধ ইহুদীরা মাথা নাড়ে, না-কিছুতেই কায়দা করা যাচ্ছে না। বরং সে-ই কায়দা করে ফেলছে আমাদের। ধীরে ধীরে সকলেই মুসলমান হয়ে যাচ্ছে। দলে ছোট হয়ে যাচ্ছি আমরা। শক্তিহীন হয়ে পড়ছি।
লোকটা ঠিক যাদু জানে। বড় যাদুকর। বলল একজন। দ্বিতীয় জন উরুতে থাপপড় মেরে চিৎকার করে উঠল যাদু-ফাদু ওসব কিছুই নয়। এতদিন কিন্তু লোকের পাল্লায় পড়ে নি। বল-কি করে আসতে হবে, দুটি গাল দিয়ে এলে চলবে, অভিশাপ দিতে হবে- বল আর কি করতে হবে?
দলপতি বলল, পারবে অভিশাপ দিয়ে আসতে, তার বাড়িতে গিয়ে, তার মুখের উপর, আজকে?
বাঘের মতই গর্জন করে উঠল ইহুদী, আজকে কি-একখুনি। দাও আমার সাথে একজনকে, সে দেখে আসবে কি করে এলাম। শুনে আসবে সে, কি অভিশাপ দিলাম।
তার সাথে একজন লোক দিল দলপতি। এরপর দুজনে বেরিয়ে গেল সাপের মত নিঃশব্দে। বিষের থলি মুখে।
বাড়িতেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। একটু আগে নামায শেষ হয়েছে। সাহাবীরা চলে গেছেন যে যার আস্তানায়। অন্য কেউ সাথে ছিলেন না তখন।
দুরভিসন্ধি নিয়েই হাজির হল শয়তানের দল। সাপ যেমন এগিয়ে যায় শিকারের দিকে, নিশানা স্থির রেখে। লোকজন সঙ্গীসাথী কেউ নেই দেখে সাহস বেড়ে গেল তাদের। আস্তানায় তখন দলপতি সহ অন্যেরাও মহাখুশি। আজ একটা কাণ্ড করে আসবে বটে! কি কাণ্ড? নানান চিন্তা করে তারা। আর আনন্দে ফুলতে থাকে। ভাবনারাও দলছুট হয় না। ঘোড়ার সওয়ারের মত শঙ্খা তাদের পিঠে চড়ে থাকে, পারবে কি কিছু করতে?
দরজার কাছে এগিয়ে এল দলবদ্ধ শয়তান। মাথা উঁচু হয়েই ছিল, ফণা বিস্তারিত হল এবার, ছোবল পড়ল এরপর, আচ্ছামু আলাইকা। সালামকে বিকৃত করে বলল সে। অর্থাৎ তোমার মৃত্যু হোক, ধ্বংস হও তুমি। বলেই সে হেসে উঠল মিটিমিটি। ঠিক যেন সাপের হাসি। দাঁতের ফাঁক দিয়ে জিব বের হল ক্রুর আর কাল।
এর থেকে বড় অভিশাপ আর কি হতে পারে! বড় গালিগালাজ?
ইহুদী মহাখুশি। যাক- মুখের উপর একটা উচিত কথা শুনিয়ে দেয়া গেল এতদিন পর। খুশিতে যেন ভুরভুর করে উঠছে সে।
রাগে ফেটে পড়েন হযরত আয়েশা (রা)। এত বড় বুকের পাটা, বুকে বসে চোখে ঠোকর! বাড়িতে এসে উৎপীড়ন! সহ্য করতে পারলেন না তিনি। দোপটি ফুলের বীজ যেমন ফেটে চৌচির হয়ে যায়, তেমিন ফেটে পড়লেন হযরত আয়েশা (রা)। রাগে, সীমাহীন ক্রোধে। অল্প বয়স তাঁর! কঠোর ভাষায় তিনি ভৎর্সনা শুরু করলেন তাদের।
অস্থির হয়ে উঠলেন আল্লাহ্র রাসূল (স)। সাথে সাথেই বললেন; ছিঃ-এসব কি বলছ তুমি? এত কঠোর হচ্ছ কেন?
ইহুদীর হাসি এবার থেমে গেছে। থেমে গেছেন হযরত আয়েশা (রা)ও। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন হযরত মুহাম্মদ (স)। এরপর শান্ত কণ্ঠে আয়েশাকে বললেন, মানুষের সাথে নম্র ব্যবহার কর।
একটু ইতস্ততঃ করে হযরত আয়েশা (রা) বললেন কেউ আমাকে গালাগালি করে অভিশাপ দিলেও?
কথাগুলো শুনলেন রাসূলুল্লাহ (স)। তাঁর মুখমণ্ডলে এক অপূর্ব দীপ্তি ফুটে উঠল। জান্নাতী নূরের আভাস যেন! তাঁর কণ্ঠস্বর অধিকতর শান্ত আর গাঢ় হয়ে এল। হৃদয় বিগলিত করা স্বরে তিনি বললেন, হ্যাঁ-'অভিশাপ দিলেও মানুষের সাথে নম্র ব্যবহার করবে।'
মেঘ গলে যেমন পিপাসার শান্ত শীতল পানি ঝরে, তাঁর কণ্ঠ থেকে তেমনি শারাবান তহুরা ঝরে পড়ল : 'প্রত্যেক ব্যাপারে আল্লাহ্ কোমলতা পছন্দ করেন।'
হযরত আয়েশা (রা)-এর তপ্ত আর জলন্ত কণ্ঠ নিভে গেল। তিনি নিশ্চুপ হলেন। উদ্ধ্যত বিষমুখ শঙ্খচুড়ের ছোবল লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে পাথরে! বিষদাঁত ভেঙে গেছে। এবার মাথা নীচু হয়েছে ইহুদীর।
এ কি শুনলাম!
রাসূলুল্লাহ (স) শান্ত মুখটা মনে পড়েছে বারবার। এত বড় অভিশাপ শুনেও তিনি নিশ্চুপ! আর ভৎর্সনা করলেন স্ত্রীকে! একবারও কঠোর দৃষ্টিতে তাকালেন না পর্যন্ত!
ইহুদীর মনোরাজ্যে প্রবল তোলপাড় শুরু হল। হঠাৎ সে দেখল রাসূলুল্লাহ (স) উঠে আসছেন তার দিকে। ইহুদী এবার দেখল তাঁর হাতে কোন অস্ত্র আছে কিনা। না-কিছুই নেই শূন্য হাত।
ততক্ষণে রাসূলুল্লাহ (স) এসে পড়েছেন তার সামনে। কাছে দাঁড়িয়ে অধিকতর আন্তরিকতায় বললেন, লাব্বায়েক-আমি হাজির। বলুন আমি আপনাদের কি করতে পারি।
কোন কথা বলল না ইহুদী। রাসূলুল্লাহ (স) আরো ঘন হয়ে কাছে এলেন। ফুলের সুবাস যেমন তার পাপড়ির কেন্দ্রবিন্দুর গভীর থেকে বেরিয়ে আসে, হয়রতের সহানুভূতি তেমনি তাঁর পবিত্র হৃদয়ের গভীর থেকেই উৎসারিত হল। তিনি বললেন, কোন কাজ থাকলে বলুন করে দেব, কোন প্রয়োজন থাকে তাও বলুন-মিটিয়ে দেব।
এবারেও কোন কথা বলল না ইহুদী। বলতে পারল না। একটি বারের জন্য সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকিয়েছিল, এরপর মাথাটা আপনিই নুয়ে গেল। লজ্জায় অনুশোচনায় সে মরে যাচ্ছিল। তার চলমান রক্তস্রোতে যেন অসংখ্য ঘুমন্ত সজারু হঠাৎ জেগে উঠে তীক্ষ্মাগ্র পালক ফুলিয়ে দাপটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ধমনী ছিঁড়ে যাচ্ছে। মন ক্ষতবিক্ষত। রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
হায়! এ মানুষকে অভিশাপ দিলাম!
মসজিদ নববীর পাশ দিয়ে আস্তানায় ফিরে যাচ্ছিল সে। চলতে আর যেন পারছিল না। সামনের মাটি যেন খাদের মত গর্ত হয়ে দেবে-দেবে যাচ্ছিল। চিরদিনের মত ফণা হারিয়ে ফেলেছে সে। আর চিরদিনের মত বিষও। চলতে চলতে তার মনে হল, সে যেন রিক্ত বৃক্ষ। হলুদ আর পোকায় খাওয়া পাতারা সব ঝরে পড়েছে। সে এখন শূন্য। চরমভাবেই শূন্য।
চলতে চলতে হঠাৎ পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল ইহুদী। দাঁড়িয়ে তাকাল হযরতের বাড়ীর দিকে। দেখল, হযরত তখনও দাঁড়িয়ে আছেন সেখানেই। তেমনি উজ্জ্বল মুখ প্রশান্ত ললাট। যেন আকাশের চাঁদ। দোস্ত-দুষমন সকলের উপরেই যার আলো পড়ে।
ইহুদীর মনে হল স্নিগ্ধ কিরণে তাঁর রিক্ত শাখায় কিশলয়ের আবেগ এসেছে। কিশলয় আর কুঁড়ি দোল খাচ্ছে শান্ত হাওয়ায়। কেঁপে কেঁপে উঠছে কচিপাতা। ভাবনার দুল উঠছে মনের মধ্যে। কচি পাতার মত কেঁপে কেঁপে উঠছে বারবার : ‘মানুষের সাথে নম্র ব্যবহার করবে! আল্লাহ্ কোমলতা ভালবাসেন! সর্ব ব্যাপারে আল্লাহ্।’
সমগ্র শাখা-প্রশাখা এ নতুন হাওয়ায় কেঁপে উঠছে। দুলে উঠছে। দুলিয়ে দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ (স)।
আত্মহারা উল্লাস থেমে গেছে। লুস্তব্ধ। আরবী বালিতে নতুন ঝড়ের সূচনা!
📄 প্রতিশোধ
কুরাইশদের চোখে ঘুম নেই। মনে নেই শান্তি। নিজেদের গাত্রদাহে নিজেরাই ঝলসে যাচ্ছে। পুড়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য, কিছুতেই কায়দা করা যাচ্ছে না লোকটাকে। একটা নিঃসম্বল লোক। কেউ ছিল না যার, আস্তে আস্তে তারই লোকসংখ্যা বাড়ছে। আগে দীন-দরিদ্রগুলো যেত, এখন গোত্রপতিরাও আসছে। মুসলমান হচ্ছে। গত মাসে সুমামা পর্যন্তও মুসলমান হয়ে গেল! খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার ইয়ামামা, সে ধনী গোত্রের সর্দার সুমামাও মুসলমান! একি ভাবা যায়!
লোকটা ভেবেছে কি? মদীনায় পালিয়ে গিয়েও আমাদের জালাতে থাকবে এভাবে? আর আমরা সহ্য করব বসে বসে?
সঙ্গী সাথীরা গর্জে উঠল, কখনো নয়।
আবার একটা ভীষণ যুদ্ধের উত্তেজনায় উন্মত্ত হয়ে গেল সকলেই। কে, ওটা? দেখত ঠিক করে। সুমামা না?
হ্যাঁ, সুমামাই! ক্রুর হিংস্রতা মুখে মেখে এক রকম খুশি হয়ে উঠল কুরাইশগণ। সর্দার বলল, যা-ধরে নিয়ে আয় ওটাকে। একটু খেলান যাক।
একজন কুরাইশ ছুটে গিয়ে ব্যঙ্গ করে বলল, সেলাম। এরপর সুমামার পথরোধ করে দাঁড়াল। বলল, এদিকে নয়-ওদিকে। ওখানে আপনাকে অভ্যর্থনা করার জন্য বসে আছে সকলেই। যদি একটু দয়া করে তশরিফ আনেন।
সুমামাকে এক রকম ধরেই নিয়ে এল সে। আর দলের লোকেরা হৈ চৈ করে উঠল এক সাথে। বলল, এই যে সর্দার সাহেব, খুড়ি সদ্দার সাহেব- এখন আর অন্য কিছু বলা যাবে না- তা আছ কেমন আপনি?
একজন পাশ থেকে ছোট্ট একটা পাথরের টুকরা ছুড়ে মারল মাথায়। দলের একজন কপট প্রতিবাদে চিৎকার করে উঠল, কে রে ঢিল মারে। তার থেকে বরং ক্ষুরটা আন, মাথাটা কামিয়ে দেই। সে নিশ্চয় হজ্ব করে মাথা কামাবে-
পরপর কয়েকবার ঠিক একইভাবে সুমামাকে লাঞ্ছিত করল কুরাইশ দল। মক্কায় আসা তাঁর পক্ষে ভীষণ ব্যাপার হয়ে উঠল। ভীষন্ন মনে তিনি ফিরে গেল তাঁর দেশ ইয়ামামায়। ফিরে গিয়ে গোত্রের সকলকে ডেকে এ অপমানের বিষয় আলোচনা করলন। সেদিনই সকলে ঠিক করলন, মক্কায় আর কোন রকম খাদ্যশস্য পাঠাবে না তারা। কথা অনুযায়ী কাজ। সকল রকম লেনদেন বন্ধ হয়ে গেল সাথে সাথে। প্রমাদ গনল কুরাইশরা। আচমকা একটা দুর্যোগের মুখমুখী হয়ে গেল সকলেই। একটু ঠাট্টা একটু ইয়ার্কি করতে গিয়ে এখন জীবন নিয়ে টানাটানি। আতঙ্কিত হয়ে উঠল মক্কাবাসীরা। তাদের খাদ্য সরবরাহের প্রধান উৎস ছিল ইয়ামামা। অচিরেই হাহাকার পড়ে গেল মক্কায়। খাদ্যের জন্য সকলেই অস্থির।
একেবারেই দুর্ভিক্ষের অবস্থা! দেখতে দেখতে নতজানু হয়ে গেল কুরাইশরা। দলবদ্ধ হয়ে তাঁরা ছুটল ইয়ামামায়। গিয়ে জনসাধারণকে ধরল, অনুরোধ করল। বলল, আমরা ঠিক কাজ করিনি। এমন আর হবে না। তোমরা আবার খাদ্য পাঠাও মক্কায়। নইলে সকলেই মারা পড়ব। জনসাধারণ বলল, যাও সুমামার কাছে তাঁর হুকুম ছাড়া একটা দানাও পাবে না। অগত্যা কুরাইশরা গেল সুমামার কাছে। সুমামা অত্যাচারী কুরাইশদের প্রত্যেককে চিনলেন কিন্তু কিছুই বললেন না। খাদ্য পাঠানোর জন্য অনুরোধ করাতে সুমামা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললেন, ব্যাপারটা ত এখন আর আমার হাতে নেই। আপনারা সকলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে যান। সেখান থেকে অনুমতি আনতে পারলেই আবার খাদ্যশস্য পাবেন আগের মতই।
কথা শুনে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল কুরাইশদের মাথায়। বাবা উজ্জার দুষমন, বাবা হোবলের দুষমন-সে শত্রুর কাছে যেতে হবে! কিন্তু কি আর করা যাবে।
জীবনের থেকে আর বড় কিছু নেই। সুতরাং কুরাইশরা ইয়ামামা থেকে ছুটল মদীনার। পথে যেতে যেতে একজন বলল, কেন তোমরা সুমামার পিছনে লাগতে গেলে! আর একজন বলল, উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়ল সুমামা। যাকে মক্কা থেকে মেরে-ধরে তাড়ালাম সকলে, এখন গিয়ে তারই পায়ে ধরতে হবে। একজন বলল, মরে যেতে ইচ্ছা করছে। আর একজন বলল পাশ থেকে, এত করেও ফলাফল কি হবে কে জানে?
শেষ পর্যন্ত মদীনায় গিয়ে পৌঁছাল সকলে। পৌঁছে সকল কথা বলল রাসূলুল্লাহ (স)-কে। আতুর-ইয়াতীমের নবী, দীন-দুঃখীর নবী কথাগুলো শুনলেন কেবল। শুনেই ব্যথায় বিগলিত হয়ে গেলেন তিনি। সাথে সাথে সুমামাকে বলে পাঠালেন : কারও খাদ্য বন্ধ কর না। কারও মুখের গ্রাস কেড়ে নিও না। একজন মুসলমান ক্ষুধাতুরের খাদ্য কেড়ে নেয় না বরং ক্ষুধাতুরকে খাওয়ায়।
ফিরতি পথে কুরাইশগণ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল, তবে যে সকলে বলে মুহাম্মদ (স) ভাল নয়। লোকটা কঠোর! লোকটা নির্মম! লোকটা পাষাণ! তাদের গোপন মনে দোলা লাগে। তারা ভাবতে থাকে: এক কথায় যে লোক এভাবে রাজি হয়ে যায়....। সারা পথ এ নিয়ে তাদের মধ্যে ভীষণ আন্দোলন জেগে রইল। মক্কার কাছাকাছি এসে তাদের সর্দ্দার সকলকে উদ্দেশ্য করে বলল, আরে বুঝলি কিনা- মুহাম্মদ (স) আমাদের দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিল। তাই ভয় পেয়ে এমন নির্দেশ দিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু সর্দারের কথায় আর তেমন জোর ছিল না। তার কথায় সর্থনও কেউ দিল না। সে নিজেও উপলব্ধি করল, তার কথাগুলো তার নিজের কাছেই যেন উপহাসের মত শোনাচ্ছে। ইজ্জত রক্ষার্থে এছাড়া আর করারই বা কি ছিল? মানুষ অনেক সময় মিথ্যা অহমিকার দ্বারা আত্মপ্রসাদ লাভ করে। সর্দার নিজের মান-সম্মান রক্ষার্থেও তাই করে শান্তনা লাভ করেছিল।
ইয়ামামা থেকে খাদ্যশস্যের আমদানি শুরু হল ফের। মৃতমুখী মক্কা যেন বেঁচে উঠল। অর্ধ উপোসী মক্কাবাসীরা সে খাদ্য খেয়ে তাজা হয়ে উঠল ধীরে ধীরে। প্রাণ ফিরে পেল আবালবৃদ্ধবনিতা।
প্রাণ ফিরে পেয়ে প্রাণদানকারীর প্রাণ হরণের জন্য আবারো ভীষণ চক্রান্তে লিপ্ত হয়ে গেল সকলেই।
📄 আর এক যুদ্ধ
একটি যুদ্ধে বিরাট জয়লাভ করে সসৈন্যে মদীনায় ফিরলেন হযরত মুহাম্মদ (স)। মদীনা আজ আনন্দে উতরোল। মুসলিম জাহানে খুশির দোলা। খুশির হিল্লোল সকলের চোখে মুখে। কেবল স্থির হয়ে আছ রাসূলুল্লাহ (স)। অতিরিক্ত কোন হাসি নেই তাঁর মুখে। জয়-পরাজয় নিয়ে উল্লসিত নন তিনি। জয়-পরাজয় আল্লাহর কাছে। তাঁর বিবেচনার মধ্যে রয়েছে শুধু কাজ। নিরলস কর্তব্য সাধনা। আল্লাহ্ যে নির্দেশ দিয়েছেন, যেমন দিয়েছেন সেমত কাজটি সম্পূর্ণ হলেই তিনি খুশি। এর অন্যথা হলে ব্যথা পান। দুঃখিত হন।
মদীনায় এসে প্রথমেই তিনি গেলেন মসজিদ নববীতে। কৃতজ্ঞতায় সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন সেখানে। শুকরিয়ার সিজদা। আল্লাহ্ অসীম রহমতের কাছে মাথা নোয়ালেন তিনি। মহান প্রভুর কথা স্মরণ করে দু চোখ ভিজে আসছিল তাঁর। নামায থেকে উঠে অপেক্ষমান সাহাবীদের নিয়ে বসলেন। জরুরী কথাবার্তা ছিল কিছু। সে প্রয়োজনীয় কথাবার্তায় মগ্ন হয়ে গেলেন এরপর।
অন্দর মহলে সাগ্রহে অপেক্ষা করছেন হযরত আয়েশা (রা)। যুদ্ধজয়ের সংবাদে অন্তপুরেও আলোড়ন। এক আকাশ খুশি যেন দোল খেয়ে ফিরছে সেখানে। সে আন্দোলনের ঢেউ জেগেছে হযরত আয়েশা (রা)-এর বুকেও। তিনিও উল্লসিত। বিজয়ী বীর সেনাপতি, দুর্জয় সৈন্যাধ্যক্ষকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য তিনি প্রস্তুত। কখনো যা করেন নি, তাই করেছেন। রাসূলুল্লাহ (স)-কে চমকে দেয়ার জন্য তিনি আজ কদিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তাঁর বীর স্বামীকে অবাক করে দেবেন তিনি। নিশ্চয়ই এতে খুশি হবেন রাসূলুল্লাহ (স)।
হযরত আয়েশা (রা) বড় আনন্দিত আজ। স্বামীকে অভ্যর্থনা করার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষমান।
এটাই সে ঘর; সে পর্ণ কুটির-যে কুটির থেকে অনির্বান জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়ে সমগ্র জগতের অন্ধকার দূর করছে; আলোকিত করছে বিশ্ব নিখিলকে। অথচ সামান্য একটু তেলের অভাবে মাঝে মাঝে অন্ধকার হয়ে থাকে এ পবিত্র গৃহাঙ্গণে। খেজুর পাতার ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। সূর্যও আড়াল হয় না ঠিক মত।
সে কুটিরে আজ যেন আনন্দ ধরে না। খেজুর পাতাগুলো ঢাকা পড়েছে রঙিন কাপড়ের আড়ালে। ছাদে সুন্দর একটি সামিয়ানা টাঙিয়ে দিয়েছেন হযরত আয়েশা (রা)। দেয়ালগুলো ঢেকে দিয়েছেন ডুরিদার রঙিন কাপড়ের টুকরা দিয়ে। সবটা ঢাকা পড়েনি। টুকরাগুলো জুড়ে জুড়ে যতটা আড়াল করা যায়, নিজে হাতে করে দিয়েছেন। এটা তাঁর অনেক দিনের বাসনা। ছাদে সামান্য একটা সামিয়ানা আর দেয়ালে কয়েক টুকরা কাপড়। তাতেই ঝকঝক করছে। যুদ্ধজয়ের হাসি। বিজয়ীর হাসি।
নিশ্চয় খুব খুশি হবেন রাসূলুল্লাহ (স)। হযরত আয়েশা (রা) ভাবেন আর উল্লসিত হন। কতদিনের মনোবাঞ্ছা আজ তাঁর পূর্ণ হতে চলেছে। এমন ঘরে তিনি কখনো কোন দিন স্বামীকে অভ্যর্থনা করতে পারেন নি।
এসে কি বলবেন রাসূলুল্লাহ (স)? নিশ্চয়ই আনন্দিত কণ্ঠে বলবেন.....। কি বলবেন? তা জানে না হযরত আয়েশা (রা)। কেবল ভাবেন আর আবেগহারা আনন্দ ফুটে ওঠে তাঁর মুখে।
এমন সময় মসজিদ নববী থেকে হঠাৎ এসে দাঁড়ালেন রাসূলুল্লাহ। উঠে দাঁড়িয়ে খুশিতে বুঝি কাঁপতে থাকেন হযরত আয়েশা (রা)। রাসূলুল্লাহ (স) মুখের দিকে দৃষ্টি ছিল তাঁর। ঘরের দিকে তাকিয়ে কতখানি আনন্দ ঝলমলিয়ে ওঠে সে মুখে তাই দেখতে চাইলেন। কিন্তু এ কি? তিনি লক্ষ্য করলেন, ঘরের দিকে দৃষ্টি পাড়ায় হঠাৎ মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল রাসূলুল্লাহ (স)। বেশ বিরক্তির চিহ্ন ফুটে উঠেছে সে মুখে। হযরত আয়েশা (রা) বুঝতে পারলেন, তাঁর স্বামী ক্ষুন্ন হয়েছেন। অসন্তুষ্ট হয়েছেন। কিন্তু কারণ? কি অন্যায় তাঁর? জিজ্ঞেস করতে যাব এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স) তাকালেন তাঁর মুখের দিকে? হঠাৎ যেন অনেক গভীর হয়ে গেলেন। কিন্তু নীরবতার পর বলল, দেখ আয়েশা- ইট-পাথরকে পোশাক পরানোর জন্য আল্লাহ্ আমাদের দৌলত দেননি।
বলেই আশ্চর্য রকম নিশ্চুপ হয়ে গেলেন আবার।
মসজিদ নববীতে তখন অসংখ্য সাহাবীর কণ্ঠে যুদ্ধজয়ের উল্লাস। হযরত আয়েশা (রা)-এর ঘরে তখন আর এক যুদ্ধের সূচনা। এ যুদ্ধ আড়ম্বরের বিরুদ্ধে আত্মসংযমের, বিলাসিতা বিরুদ্ধ বর্জনের।
মানুষের নবী মুহাম্মদ (স) সারাজীবন মানুষকে এই না দেখা যুদ্ধের সৈনিক করে গেলেন।