📄 দুশমন
সামামা ছিল হোনায়ফিয়া কওমের এক অতি গুণ্ডা প্রকৃতির সর্দার। রাহমাতুল লিল-আলামীন হযরত মুহাম্মদ (স)-এর বহু নিরপরাধ সাহাবীকে সে নির্দয়ভাবে হত্যা করেছিল। হঠাৎ একদিন সে মুসলমানদের হাতে বন্দী হল। মুসলমানেরা তাকে বন্দী করে হযরত মুহাম্মদ (স)-এর কাছে হাজির করলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁর সাহাবীদেরকে ডেকে বললেন, বন্ধুগণ! সামামা আজ তোমাদের হাতে বন্দী। সামামার প্রতি তোমরা ভাল ব্যবহার কর। সামামা খুব বেশি ভোজন করতে পারত। একাকী সে দশবার জনের খাদ্য খেতে পারত।
হযরত (স) বাড়ী গিয়ে হযরত আয়েশা (রা)-কে বললেন, আজ একজন ভোজপটু মেহমান এসেছে। আমাদের সকলের খাবার একত্রিত করে তাকে দিতে হবে। যে উটটা বেশি দুধ দেয় তা দোহন করে সবটুকু দুধ তাকে দিয়ে দাও। সেদিন সামামা এত আহার করল যে, হযরতের ঘরে খাদ্যবস্তু কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না। আর সে রাতে হযরত (স) সপরিবারে সকলেই অনাহারে থেকে গেলেন। আহার শেষ হলে সামামা হযরত (স)-কে বলল, আমি আপনার বহু সাহাবীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছি। আপনি ইচছা করল আমাকে হত্যা করতে পারেন। হযরত (স) তার কথা শুনলেন, কিন্তু কোন উত্তর দিলেন না। অন্য এক দিন সামামা হযরতকে বলল, হে মুহাম্মদ! আপনি যদি আমাকে মুক্ত করে দেন তাহলে মুক্তিপণ স্বরূপ যত দিরহাম চাইবেন আমি ঠিক তত দিরহামই দেব, একটি দিরহাম কম দেব না। তবুও আমাকে মুক্তি দিয়ে দিন।
হযরত এ কথারও কোন উত্তর দিলেন না। এরও কয়েক দিন পর আখেরী নবী দয়ার সাগর হযরত মুহাম্মদ (স) বিনা শর্তে সামামাকে মুক্তি দিয়ে দিলেন। সামামা বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার সময় হযরত (স) তাকে বললেন, 'আমাদের ব্যবহারে যদি কোন দোষ-ত্রুটি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদেরকে ক্ষমা করে দিও।' সামামা চলে গেল।
বহুদূর চলে যাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে সে একটি গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম করতে লাগল এবং কিছুক্ষণ গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করার পর সে উঠে দাঁড়াল। পাশের একটি নহর থেকে গোসল করে সে পুনরায় হযরতের বাড়ির দিকে ফিরে চলল। হযরতের কাছে পৌঁছে সে ইসলাম গ্রহণ করল।
আরও কিছুদিন পর সে পবিত্র কাবা যিয়ারত করার জন্য মক্কায় রওয়ানা হল। কাবা শরীফে প্রবেশ করার সময় সে উচ্চকণ্ঠে তাকবীর বলতে বলতে সামনের দিকে এগিয়ে চলল।
এমতাবস্থায় মক্কার কোরায়েশরা চারদিক থেকে এসে তাকে ঘিরে ধরল এবং সামামার মাথার উপর তরবারী ঝলসে উঠল।
তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বলতে লাগল, সাবধান! সামামাকে কেউ হত্যা করবে না। কারণ এ লোকটি হোনায়ফিয়া কওমের সর্দার এবং ইয়ামামায় তার বাড়ি। ইয়ামামা থেকে আমরা সারা বছর খাদ্যশস্য পেয়ে থাকি, তাকে হত্যা করলে আমাদের আহার বন্ধ হয়ে যাবে। অনাহারে সকলেই মরতে হবে।
সামামা কোরাইশদের উদ্দেশ্য করে বলল, তোমরা হযরত মুহাম্মদ (স)-এর প্রতি এত বিরূপ হয়েছ কেন? অথচ তিনি অত্যন্ত দয়ালু আর ক্ষমাশীল মহাপুরুষ। আমি যতদিন তাঁর দুশমন ছিলাম, ততদিন তাঁর বহু সাহাবায়ে কিরামকে বিনা কারণে হত্যা করেছি। তাঁর হাতে বন্দী হবার পর তিনি আমাকে হত্যা করেনি, আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর তোমরা সে মহান ব্যক্তিকে দেশ ছাড়া করেছ! তোমরা তাঁর কাছে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাঁকে মক্কায় ফিরিয়ে আন।
কাবা শরীফ যিয়ারত করে সামামা দেশে ফিরে গিয়ে মক্কার খাদ্যশস্য রপ্তানি বন্ধ করে দিল। খাদ্যের অভাবে মক্কাবাসীরা উপবাসে দিন কাটাতে লাগল। সমগ্র দেশে হাহাকার পড়ে গেল।
ক্ষুধার তাড়নায় মক্কার লোকেরা হযরতের কাছে লোক পাঠিয়ে আবেদন জানাল যে, আমরা মক্কাবাসীরা আপনার আত্মীয়, খাদ্যের অভাবে আমরা আজ মৃত প্রায়। আমাদের জীবন রক্ষা করুন।
হযরত মুহাম্মদ (স) তৎক্ষণাৎ মক্কার খাদ্যশস্য প্রেরণের জন্য সামামার কাছে সংবাদ পাঠালেন। হযরতের মেহেরবাণীতে পুনরায় ইয়ামামা থেকে রসদ আসতে শুরু হল আর সে খাদ্য আহার করে মক্কার কোরায়েশরা পুনরায় হযরতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে লাগল।
📄 রিযিকের মালিক আল্লাহ্
হাতে অনেক কাজ। কাজগুলো শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তি নেই। হযরত আলী (রা) কাজের মাঝে ডুবে গেলেন। ভুলে গেল ঘর-সংসারের কথা।
কিন্তু না খেয়ে কতক্ষণ কাজ করা যায়। হযরত আলী এক সময় বেশ ক্ষুধা অনুভব করেন। ক্ষুধায় পেট চো-চো করছে। কাজে আর মন বসছে না। পেটে কিছু দানাপানি না দিলেই নয়।
তাড়াতাড়ি বাড়ি ছুটে এলেন হযরত আলী (রা)। খেয়ে-দেয়ে আবার কাজে বসতে হবে। স্ত্রী ফাতিমার (রা) কাছে কিছু খাবার চাইলেন।
ফাতিমার কথা শুনে তো একেবারে হতবাক। ঘরে কোন খাবার নেই। হাড়ি-পাতিল সবই শূন্য। সবাই না খেয়ে চুপচাপ বসে আছে। আল্লাহকে ডাকছে মনে মনে।
আর দেরি করলন না হযরত আলী (রা)। কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। এদিক-ওদিক ঘোরাফিরা করলেন অনেকক্ষণ। কোথাও কোন কাজ পাওয়া গেল না। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এমন অসময়ে তিনি কোথায় কাজ পাবেন? কে তাঁকে কাজ দেবে? হতাশ হয়ে পড়লেন তিনি। বাড়িতে ফিরে যাওয়াই স্থির করলন। ভাবলেন-রিযিকের মালিক আল্লাহ্। তিনি যা করেন বান্দার ভালর জন্যই করেন। যদি তিনি খাওয়ান-তাতে আলহামদুলিল্লাহ আর যদি উপবাস রাখেন তাতেও আলহামদুলিল্লাহ।
তখন আর এক ঘটনা ঘটে গেল। বেলা শেষ তিনি বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছেন। এমন সময় সওদাগরের পণ্য বোঝাই এক কাফেলা মদীনায় এসে উপস্থিত। সওদাগরের একটু বিশ্রাম চাই। তিনি উট থেকে মালপত্র নামাবার আয়োজন করছেন।
উটের পিঠে অনেক মাল। হযরত আলী (রা) ভাবলেন এ মালামাল তিনি নামাবেন কি করে? নিশ্চয়ই তাঁর মজুরের প্রয়োজন হবে। হযরত আলী এগিয়ে গেলেন তাঁদের কাছে। মজুরের প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলেন।
কাফেলা হযরত আলী (রা)-কে চিনত না। তারা ভাবল, সম্ভবত লোকটি খেটে খাওয়া দিন মজুর। তাদের প্রস্তাবে হযরত আলী (রা) সম্মত হলেন।
বেলা শেষে ফিরতি পথে আল্লাহ্ তার কাজ জুটিয়ে দিলেন। হযরত আলী (রা) মালপত্র নামাতে শুরু করলেন। দুটা-একটা মাল তো নয়। অনেক মাল। মালপত্র নামাতে নামাতে বেশ অনেকটা রাত হয়ে গেল। মালপত্র নামানো শেষ। মুজরী হিসাবে পেলেন এক দিরহাম। সারা দিনের উপার্জন তাতেই তিনি আল্লাহ্র দরবারে জানালেন হাজার শুকরিয়া।
দিরহাম পেলেন। কিন্তু এত রাতে খাবার জিনিস পাবেন কোথায়? শহরের দোকানপাট এতক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। তবু উপায় নেই। তাঁকে চেষ্টা করে দেখতেই হবে। নইলে সবাইকে যে সারারাত উপবাস থাকতে হবে। প্রতিবেশী পরিচিত কারো কাছে থেকে সাহায্য নেবেন, ধার নেবেন, তাও সম্ভব নয়। দ্রুত পায়ে তিনি ছুটলেন বাজারের দিকে। না, দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে। সারা বাজারে নেমে এসেছে রাতের নীরবতা। কপালের ঘাম মুছতে-মুছতে তিনি ঘুরছেন বাজারের ভেতরে। ভাগ্যক্রমে দেখা গেল আশার ক্ষীণ আলো। বাজারের এক কোণে তখনও একটি দোকান খোলা ছিল। দোকান থেকে কিছু খাবার কিনলেন। সারা রাতের একমাত্র খাবার। তিনি তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন বাড়িতে। আর সকলেই মিলে পরম তৃপ্তিতে তাই খেয়ে নিলেন।
📄 নবীজীর দুঃখ
গাছের কি প্রাণ আছে? গাছ কি কথা বলতে পারে?
অবশ্যই গাছের প্রাণ আছে। প্রাণ না থাকলে গাছ মরে কিভাবে?
গাছ কেটে ঘরের আসবাবপত্র বানানো হয়। যে আকারের চেয়ার, টেবিল, খাট, পালং বানানো হয়, সব সময় তাই থাকে। এগুলো কি কখনও আস্তে আস্তে বড় হয়ে যায়? না হয়। কারণ এ গুলোর প্রাণ নেই। কিন্তু গাছ বড় হয়। গাছের পাতা শুকিয়ে যায়। নতুন পাতা গজায়। গাছ কি কথা বলতে পারে? গাছ তাও পারে। গাছের পাতা আল্লাহ্র যিকির করে। গাছ আল্লাহ্ ইবাদতও করে। আল্লাহ্ গাছের জন্য যে হুকুম করেছেন, গাছ সে হুকুম মানে। আল্লাহ্ গাছ বানিয়েছেন মানুষের উপকারের জন্য। শুধু গাছ কেন, আল্লাহ্ সব কিছুই বানিয়েছেন মানুষের উপকারের জন্য।
মানুষের জন্য আল্লাহ্র দুনিয়ার সব কিছু বানালেও কোন কিছুই নিজের ইচ্ছামত মানুষ ব্যবহার করতে পারে না। আল্লাহ্ জিনিস ব্যবহার করতে হলে আল্লাহ্ হুকুম মত ব্যবহার করতে হয়। বিনা দরকারে একটা পোকা মারতেও আল্লাহ্ নিষেধ আছে। শুধু পোকা কেন, আমাদের নবী (স) বিনা দরকারে এক ফোঁটা পানিও নষ্ট করতে মানা করেছেন। আমাদের দরকারে গাছের ডাল কাটা যায়। দরকার হলে গাছও কাটাতে হয়। অকারণে গাছের পাতা ছেঁড়া আমাদের নবী (স) পছন্দ করতেন না। এ সম্পর্কে একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত আছে।
নবী (স) তাঁর সাহাবীদের নিয়ে এক সফরে বের হলেন। এক জায়গায় গিয়ে তাঁরা তাঁবু গাড়েন। নবী (স) দেখলেন কিছু লোক একটি গাছের নীচে বসে আছে। আর একটি লোক মনের আনন্দে গাছের পাতা ছিঁড়ছে। এটা দেখে নবী দুঃখিত হলেন। তিনি লোকটিকে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেন তুমি অযথা গাছের পাতা ছিঁড়ছ? লোকটি বলল: এমনি, গাছের পাতা ছিঁড়লে দোষ কি? রাসূল (স) লোকটির আরো কাছে গিয়ে তার চুল ধরে একটু টান দিলেন। জিজ্ঞেস করলন: কেমন লাগল? লোকটি বলল: একটু ব্যথা পেলাম।
রাসূল (স) বললেন: যদি তোমার চুল ছিঁড়ে যেত কেমন ব্যথা পেতে? লোকটি বলল: আরও বেশী ব্যথা পেতাম। রাসূল (স) বললেন: গাছের পাতা ছিঁড়লে গাছও এমনি ব্যথা পায়। লোকটি বলল: কেন, গাছ ব্যথা পাবে কেন? গাছের কি প্রাণ আছে? রাসূল (স) বললেন: কেন থাকবে না! তুমি কি গাছ মরতে দেখনি? লোকটি বলল: দেখেছি।
রাসূল (স) বললেন: তা হলে তুমিই বল, গাছের জীবন নেই কি? যার জীবন থাকে সে কিন্তু মরে। তা নয় কি? লোকটি এবার লজ্জা পেল।
রাসূল (স) বললেন: অকারণে গাছের পাতা ছেঁড়া উচিত নয়। অবশ্য প্রয়োজনে তুমি গাছের পাতা ছিঁড়তে পার। এমনকি গোটা গাছটাই কাটতে পার।
ভাল কাজের জন্য একজন মুসলিম গাছের পাতা ছেঁড়া কেন, নিজের জীবনটাও দিয়ে দিতে পারে, জালিমের সাথে জিহাদ করে শহীদ হতে পারে। কিন্তু অকারণে কোন মুসলমান গাছের একটি পাতাও ছিঁড়তে পারে না।
📄 এক অভাবনীয় পরিবর্তন
গভীর অরণ্যে সাপেরা যেমন স্বাধীন, গুহায় যেমন বাঘেরা-আপন মহলে তেমনি স্বাধীন ইহুদীরা। তেমনি বিষমুখ। তেমনি হিংস্র। বিষে দেহ জরজর, মুখ ভর্তি বিষের থলি-তাই নিয়ে সাপেরা খেলা করে, বেড়ায়, খায়, ঘুমায়। ইহুদীরা বুঝি এরও অধিক। ক্রুর হিংস্রতা নিয়ে বেরিয়ে আসে গুহা থেকে, বাঘের মত। এরপর বুকে ভর দিয়ে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায় মদীনার পথে পথে। উদ্ধ্যত ফণা, কেবল সুযোগের অনুসন্ধান। এরপর নিশ্চিত ছোবল। এ ছোবল গিয়ে পড়ে মুসলমানদের উপর। রাসূলুল্লাহ (স)-কে পেলে কিন্তু আর কথাই নেই। তাঁকে অপমান করতে পারলে দলশুদ্ধ সকলেই খুশিতে মাতাল হয়ে ওঠে। তুফান বয়ে যায় আনন্দের!
কিন্তু কি আশ্চর্য-কিছুতেই কায়দা করা যাচ্ছে না মুহাম্মদ (স)-কে। দলবদ্ধ ইহুদীরা মাথা নাড়ে, না-কিছুতেই কায়দা করা যাচ্ছে না। বরং সে-ই কায়দা করে ফেলছে আমাদের। ধীরে ধীরে সকলেই মুসলমান হয়ে যাচ্ছে। দলে ছোট হয়ে যাচ্ছি আমরা। শক্তিহীন হয়ে পড়ছি।
লোকটা ঠিক যাদু জানে। বড় যাদুকর। বলল একজন। দ্বিতীয় জন উরুতে থাপপড় মেরে চিৎকার করে উঠল যাদু-ফাদু ওসব কিছুই নয়। এতদিন কিন্তু লোকের পাল্লায় পড়ে নি। বল-কি করে আসতে হবে, দুটি গাল দিয়ে এলে চলবে, অভিশাপ দিতে হবে- বল আর কি করতে হবে?
দলপতি বলল, পারবে অভিশাপ দিয়ে আসতে, তার বাড়িতে গিয়ে, তার মুখের উপর, আজকে?
বাঘের মতই গর্জন করে উঠল ইহুদী, আজকে কি-একখুনি। দাও আমার সাথে একজনকে, সে দেখে আসবে কি করে এলাম। শুনে আসবে সে, কি অভিশাপ দিলাম।
তার সাথে একজন লোক দিল দলপতি। এরপর দুজনে বেরিয়ে গেল সাপের মত নিঃশব্দে। বিষের থলি মুখে।
বাড়িতেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। একটু আগে নামায শেষ হয়েছে। সাহাবীরা চলে গেছেন যে যার আস্তানায়। অন্য কেউ সাথে ছিলেন না তখন।
দুরভিসন্ধি নিয়েই হাজির হল শয়তানের দল। সাপ যেমন এগিয়ে যায় শিকারের দিকে, নিশানা স্থির রেখে। লোকজন সঙ্গীসাথী কেউ নেই দেখে সাহস বেড়ে গেল তাদের। আস্তানায় তখন দলপতি সহ অন্যেরাও মহাখুশি। আজ একটা কাণ্ড করে আসবে বটে! কি কাণ্ড? নানান চিন্তা করে তারা। আর আনন্দে ফুলতে থাকে। ভাবনারাও দলছুট হয় না। ঘোড়ার সওয়ারের মত শঙ্খা তাদের পিঠে চড়ে থাকে, পারবে কি কিছু করতে?
দরজার কাছে এগিয়ে এল দলবদ্ধ শয়তান। মাথা উঁচু হয়েই ছিল, ফণা বিস্তারিত হল এবার, ছোবল পড়ল এরপর, আচ্ছামু আলাইকা। সালামকে বিকৃত করে বলল সে। অর্থাৎ তোমার মৃত্যু হোক, ধ্বংস হও তুমি। বলেই সে হেসে উঠল মিটিমিটি। ঠিক যেন সাপের হাসি। দাঁতের ফাঁক দিয়ে জিব বের হল ক্রুর আর কাল।
এর থেকে বড় অভিশাপ আর কি হতে পারে! বড় গালিগালাজ?
ইহুদী মহাখুশি। যাক- মুখের উপর একটা উচিত কথা শুনিয়ে দেয়া গেল এতদিন পর। খুশিতে যেন ভুরভুর করে উঠছে সে।
রাগে ফেটে পড়েন হযরত আয়েশা (রা)। এত বড় বুকের পাটা, বুকে বসে চোখে ঠোকর! বাড়িতে এসে উৎপীড়ন! সহ্য করতে পারলেন না তিনি। দোপটি ফুলের বীজ যেমন ফেটে চৌচির হয়ে যায়, তেমিন ফেটে পড়লেন হযরত আয়েশা (রা)। রাগে, সীমাহীন ক্রোধে। অল্প বয়স তাঁর! কঠোর ভাষায় তিনি ভৎর্সনা শুরু করলেন তাদের।
অস্থির হয়ে উঠলেন আল্লাহ্র রাসূল (স)। সাথে সাথেই বললেন; ছিঃ-এসব কি বলছ তুমি? এত কঠোর হচ্ছ কেন?
ইহুদীর হাসি এবার থেমে গেছে। থেমে গেছেন হযরত আয়েশা (রা)ও। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন হযরত মুহাম্মদ (স)। এরপর শান্ত কণ্ঠে আয়েশাকে বললেন, মানুষের সাথে নম্র ব্যবহার কর।
একটু ইতস্ততঃ করে হযরত আয়েশা (রা) বললেন কেউ আমাকে গালাগালি করে অভিশাপ দিলেও?
কথাগুলো শুনলেন রাসূলুল্লাহ (স)। তাঁর মুখমণ্ডলে এক অপূর্ব দীপ্তি ফুটে উঠল। জান্নাতী নূরের আভাস যেন! তাঁর কণ্ঠস্বর অধিকতর শান্ত আর গাঢ় হয়ে এল। হৃদয় বিগলিত করা স্বরে তিনি বললেন, হ্যাঁ-'অভিশাপ দিলেও মানুষের সাথে নম্র ব্যবহার করবে।'
মেঘ গলে যেমন পিপাসার শান্ত শীতল পানি ঝরে, তাঁর কণ্ঠ থেকে তেমনি শারাবান তহুরা ঝরে পড়ল : 'প্রত্যেক ব্যাপারে আল্লাহ্ কোমলতা পছন্দ করেন।'
হযরত আয়েশা (রা)-এর তপ্ত আর জলন্ত কণ্ঠ নিভে গেল। তিনি নিশ্চুপ হলেন। উদ্ধ্যত বিষমুখ শঙ্খচুড়ের ছোবল লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে পাথরে! বিষদাঁত ভেঙে গেছে। এবার মাথা নীচু হয়েছে ইহুদীর।
এ কি শুনলাম!
রাসূলুল্লাহ (স) শান্ত মুখটা মনে পড়েছে বারবার। এত বড় অভিশাপ শুনেও তিনি নিশ্চুপ! আর ভৎর্সনা করলেন স্ত্রীকে! একবারও কঠোর দৃষ্টিতে তাকালেন না পর্যন্ত!
ইহুদীর মনোরাজ্যে প্রবল তোলপাড় শুরু হল। হঠাৎ সে দেখল রাসূলুল্লাহ (স) উঠে আসছেন তার দিকে। ইহুদী এবার দেখল তাঁর হাতে কোন অস্ত্র আছে কিনা। না-কিছুই নেই শূন্য হাত।
ততক্ষণে রাসূলুল্লাহ (স) এসে পড়েছেন তার সামনে। কাছে দাঁড়িয়ে অধিকতর আন্তরিকতায় বললেন, লাব্বায়েক-আমি হাজির। বলুন আমি আপনাদের কি করতে পারি।
কোন কথা বলল না ইহুদী। রাসূলুল্লাহ (স) আরো ঘন হয়ে কাছে এলেন। ফুলের সুবাস যেমন তার পাপড়ির কেন্দ্রবিন্দুর গভীর থেকে বেরিয়ে আসে, হয়রতের সহানুভূতি তেমনি তাঁর পবিত্র হৃদয়ের গভীর থেকেই উৎসারিত হল। তিনি বললেন, কোন কাজ থাকলে বলুন করে দেব, কোন প্রয়োজন থাকে তাও বলুন-মিটিয়ে দেব।
এবারেও কোন কথা বলল না ইহুদী। বলতে পারল না। একটি বারের জন্য সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে তাকিয়েছিল, এরপর মাথাটা আপনিই নুয়ে গেল। লজ্জায় অনুশোচনায় সে মরে যাচ্ছিল। তার চলমান রক্তস্রোতে যেন অসংখ্য ঘুমন্ত সজারু হঠাৎ জেগে উঠে তীক্ষ্মাগ্র পালক ফুলিয়ে দাপটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ধমনী ছিঁড়ে যাচ্ছে। মন ক্ষতবিক্ষত। রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
হায়! এ মানুষকে অভিশাপ দিলাম!
মসজিদ নববীর পাশ দিয়ে আস্তানায় ফিরে যাচ্ছিল সে। চলতে আর যেন পারছিল না। সামনের মাটি যেন খাদের মত গর্ত হয়ে দেবে-দেবে যাচ্ছিল। চিরদিনের মত ফণা হারিয়ে ফেলেছে সে। আর চিরদিনের মত বিষও। চলতে চলতে তার মনে হল, সে যেন রিক্ত বৃক্ষ। হলুদ আর পোকায় খাওয়া পাতারা সব ঝরে পড়েছে। সে এখন শূন্য। চরমভাবেই শূন্য।
চলতে চলতে হঠাৎ পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল ইহুদী। দাঁড়িয়ে তাকাল হযরতের বাড়ীর দিকে। দেখল, হযরত তখনও দাঁড়িয়ে আছেন সেখানেই। তেমনি উজ্জ্বল মুখ প্রশান্ত ললাট। যেন আকাশের চাঁদ। দোস্ত-দুষমন সকলের উপরেই যার আলো পড়ে।
ইহুদীর মনে হল স্নিগ্ধ কিরণে তাঁর রিক্ত শাখায় কিশলয়ের আবেগ এসেছে। কিশলয় আর কুঁড়ি দোল খাচ্ছে শান্ত হাওয়ায়। কেঁপে কেঁপে উঠছে কচিপাতা। ভাবনার দুল উঠছে মনের মধ্যে। কচি পাতার মত কেঁপে কেঁপে উঠছে বারবার : ‘মানুষের সাথে নম্র ব্যবহার করবে! আল্লাহ্ কোমলতা ভালবাসেন! সর্ব ব্যাপারে আল্লাহ্।’
সমগ্র শাখা-প্রশাখা এ নতুন হাওয়ায় কেঁপে উঠছে। দুলে উঠছে। দুলিয়ে দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ (স)।
আত্মহারা উল্লাস থেমে গেছে। লুস্তব্ধ। আরবী বালিতে নতুন ঝড়ের সূচনা!