📄 ভক্তের পরীক্ষা
আরব দেশ। অন্ধকার যুগ।
মক্কার বিধর্মীদের মনে বড় দুশ্চিন্তা। তারা মহা ভাবনায় গেল। কত ঠাট্টা-বিদ্রুপ, কত ভয় দেখাল, তবু হযরত মুহাম্মদ (স) ইসলাম প্রচার বন্ধ করলেন না। মক্কার লোক অনেকে একে একে মুসলমান হয়ে যাচ্ছে। বিধর্মীদের মনে ক্রোধের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। হিংসা-বিদ্বেষ তাদের মনে আগুন জ্বালিয়ে দিল, তারা সকলে মিলে পরামর্শ করল। স্থির করল, যেই মুসলমান হবে, তারই উপর অত্যাচার করা হবে।
বিধর্মীদের অন্যতম নেতা উমাইয়া প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি। টাকা-পয়সা আছে প্রচুর। কুরাইশদের মাঝে তার প্রভাবও আছে। উমাইয়া বসে বসে ভাবছে ইসলামের প্রচার কি করে রোধ করা যায়। যুলুম নির্যাতন করেও তো কোন ফল হচ্ছে না।
এমন সময় তাঁর কানে এল, 'আল্লাহ্ এক। আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই।'
উমাইয়া চমকে উঠল। তার বাড়ির ভিতর থেকে কে যেন এ কথা বলছে। উমাইয়া দৌড়ে ঘরে গেল। ঘরের ভিতরে যা দেখল, তাতে উমাইয়ার চক্ষু স্থির। তারই এক ক্রীতদাস এক মনে বলছে, "আল্লাহ্ এক। আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই।'
কি স্পর্ধা। তার ঘরে থেকে, তার ক্রীতদাসের এত সাহস। উমাইয়া ক্রোধে অগ্নিশিখার মত জ্বলে উঠল।
কে শোনে কার কথা। ক্রীতদাস আপন মনে জপতেই থাকে "আল্লাহ্ এক।"
শুরু হল এবার অত্যচার। কিন্তু শত অত্যচারেও ক্রীতদাসকে নিস্তব্ধ করা গেল না। উমাইয়া নির্যাতনের নতুন পথ বের করল। সে ক্রীতদাসের গলায় পশুর দড়ি বাঁধা হল। এরপর তাকে মক্কার বালকদের হাতে ছেড়ে দিল। বালকেরা তার গলার বাঁধনধরে মক্কার পথে পথে ঘুরল, হৈ-হৈ শব্দে তামাশা করল, টেনে হেঁচড়িয়ে, মেরে-পিটিয়ে তাকে আধমরা করল। এরূপ রং-তামাশায় অত্যাচার করে সন্ধ্যার সময় তাকে উমাইয়ার বাড়িতে দিয়ে গেল।
উমাইয়া তখন তার কাছে গিয়ে বলল, "এখনো সময় আছে। মুহাম্মদের ধর্ম ছেড়ে দে।”
এরূপ অত্যাচারের পরও ক্রীতদাস বলল, 'আল্লাহ্ এক, আল্লাহ্ এক' পরের দিন আবারও সে একই ধরনের অত্যাচার উৎপীড়ন।
এত অত্যাচারের পরও ক্রীতদাস মুহাম্মদ (স)-এর প্রচারিত ধর্ম ছাড়েনি।
এবার উমাইয়া ক্রুদ্ধ হয়ে কঠোরতম অত্যাচার আরম্ভ করল। দুপুরবেলা আরবের মরুভূমি গরমে আগুন হয়ে উঠে। উমাইয়া সে তপ্ত বালুর উপর তাকে চিৎ করে শোয়াল। যাতে সে কোন পাশে ফিরতে না পারে, সে জন্য বুকের উপর ভারী পাথর রাখল।
পিঠের নীচে তপ্ত বালু আর চোখে মুখে দুপুরের রৌদ্র, পাশ ফিরবার কোন উপায় নেই। এমন অবস্থায় ক্রীতদাস যখন প্রায় চৈতন্য হারিয়েছে, তখন সেখানে উমাইয়া এল। বলল, "এখনও সময় আছে, মুহাম্মদ এর ধর্ম ছাড়, তোকে ছেড়ে দিই।'
সে অর্ধচেতন অবস্থাতেও ক্রতীদাসটি চিৎকার করে উঠল "আহাদ। আহাদ। আল্লাহ্ এক, আল্লাহ্ এক।"
উমাইয়া হতাশ হয়ে তার আহার বন্ধ করে দিল। তাকে একটা ছোট কামরাতে আবদ্ধ করে রাখল, সেখানে তার হাত পিঠ-মোড়া দিয়ে বেঁধে বেদম প্রহার করতে লাগল। নিদারুণ বেত্রাঘাতে তার গায়ের চামড়া ছিঁড়ে রক্ত বের হতে লাগল। তখনও সে বলেছে, "আহাদ। আহাদ।"
একদিন শেষ রাতে হযরত আবু বকর (রা) সে পথ দিয়ে চলেছেন। তিনি সে ক্রীতদাসের করুন ক্রন্দন শুনলেন। সে অসহায়ের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচারের কথা শুনে তিনি শিহরিয়ে উঠলেন। পরদিন সকাল বেলা তিনি উমাইয়ার সাথে দেখা করলেন। আরবে তখনও দাস ক্রয়-বিক্রয় হত। তিনি উমাইয়াকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে দাসটিকে কিনে আনলেন। বাড়ীতে এনে তিনি সে পরম সত্যনিষ্ঠ ক্রীতদাসটিকে মুক্তি দিলেন।
কে এ ক্রীতাদাস, যিনি এমন অমানুষিক অত্যাচারে পরও সত্য ধর্মকে ছাড়েন নাই! জগতের কোন বাধা-বিপত্তিই যাকে আল্লাহ্ পথ থেকে সরাতে পারে নাই? ইনি ভক্তকূল চূড়ামণি হযরত বেলাল (রা)। ইসলাম জগতের প্রথম মুয়াজ্জিন。
📄 নবী ও বিড়াল
বিড়াল বড় আদরের প্রাণী। খাওয়ার সময় সে আশে-পাশে ঘোরে। কিছু না পেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়, না হলে ম্যাও ম্যাও করে। আর পেলে তৃপ্তির সাথে খায় আর লেজ নাড়ে।
বিড়াল মানুষের কাছে কাছে থাকতে চায়। পোষা বিড়াল কোলে উঠে বসে। বিড়াল রাতে মানুষের সাথে ঘুমাতে খুবই ভালবাসে। প্রায় দেখা যায়, পায়ের কাছে শুয়ে আছে, লাথি খেয়েও সরে না; মিউ-মিউ করে কেঁদে কেঁদে আবার কাছে ভিড়ে।
ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বিড়ালকে খুবই আদর করে। অনেকে পোষা বিড়ালকে 'মিনি' বলেও ডাকে। আমাদের নবীজীও বিড়ালকে ভালবাসতেন। বিড়ালকে তিনি গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতেন, সামনে বসিয়ে খাওয়াতেন। তাঁকে দেখামাত্র বিড়াল ম্যাও ম্যাও করে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করত।
কেবল নবীজী কেন, তাঁর অনেক সাহাবীও বিড়ালকে ভালবাসতেন। হযরত আবু হোরায়রা ছিলেন রাসূল (স)-এর এক অন্যতম প্রিয় সাহাবী। তিনি কিছু শুনলে তা কখনো ভুলতেন না। রাসূলের কথা শোনা মাত্র তিনি মুখস্ত করতেন এবং লিখে রাখতেন। তিনি সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আবু হোরায়রার বাড়ী ছিল মদীনা থেকে অনেক দূরে। সত্যের ডাক সেখানে পৌঁছলে, তিনি মদীনায় এলেন। আসার সময় বাড়ির জিনিসপত্র প্রায় সব কিছুই ফেলে এলেন, সাথে শুধু নিয়ে এলেন একটি বিড়াল।
এ আবার কি রকম কাণ্ড? কিন্তু প্রাণে যাদের দরদ থাকে, তাঁরাই এমন কাজ করেন। ঘরের দামী দামী আসবাব তো প্রাণহীন -জড় পদার্থ। এগুলো ফেলে এলে এরা ব্যথা পাবে না। কিন্তু বিড়াল ত জড় পদার্থ নয়, এর প্রাণ আছে; আর তাই তার ব্যথাও আছে। তাকে ফেলে এলে দুঃখ পাবে, কাঁদবে। তাই আবু হোরায়রা একে সাথে নিয়ে এলেন।
বিড়ালের প্রতি তাঁর দরদ দেখে অনেকেই হাসি-ঠাট্টা করল। কিন্তু নবীজী একটি মূক প্রাণীর প্রতি আবু হোরায়রার দরদ দেখে খুশি হলেন।
আমাদের প্রিয়নবীর একটি মাত্র চাদর ছিল। রাতের বেলায় তিনি চাদরটি গায়ে দিয়ে ঘুমাতেন। আর দিনের বেলা এটিই গায়ে দিয়ে বের হতেন।
আরব দেশে দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম। রাতের বেলা ভীষণ শীত। শীতকালে রাতের বেলা হাড়-কাঁপানো শীত।
আমাদের নবীজী শেষ রাতে জেগে উঠতেন। নবী হওয়ার আগেও শেষ রাতে তিনি জেগে থাকতেন। তারার মেলা দেখতেন। গাছপালা আকাশ-বাতাস কি করে হল তা ভাবতেন।
খুব ভোরেই নবীজী মসজিদে আসতেন। তাহাজ্জুদ পড়তেন। সুবহি সাদিকের সময় মসজিদে যাওয়া ছিল তাঁর জীবনের অভ্যাস। একা নবীজী নন, তাঁর সাহাবারাও প্রায় সকলেই সুবহি সাদিকের সময় সমজিদে উপস্থিত হতেন। কারণ এটা ছিল ইবাদত কবুলের সময়।
কাফেররা কাজ করত নবীর উল্টা। তারা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকত, হৈ-চৈ করত, আর সকাল বেলা ঘুমাত। এ অভ্যাসটা এখন মুসলমান সমাজের মধ্যে প্রায় পরিবারেই ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়।
আমাদের নবী একদিন শেষ রাতে মসজিদে যাওয়ার জন্য তৈরি হলেন। গায়ে দেয়ার জন্য চাদরটি ধরলেন। কিন্তু দেখলেন, চাদরের এক কোণে শুয়ে আছে একটি বিড়াল।
চাদরটা তিনি অতি সহজেই টেনে নিতে পারতেন। কিন্তু তাতে হয়ত বিড়ালটির ঘুম ভেঙ্গে যেত। বিড়ালের ঘুম ভাঙাতে তাঁর ইচ্ছা হল না। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। এদিকে সুবহি সাদিক শেষ হয়ে ফযরের নামাযের সময় হয়ে এল। তখনও বিড়ালটির ঘুম ভাঙল না। ফযরের নামাযের সময় হয়ে এল। ফযরের নামাযের জন্য সাহাবারা তাঁরই অপেক্ষা করছেন। তিনি মসজিদে গেলে এক সাথে জামাত হবে। তাই না গেলেও নয়।
কিন্তু বিড়ালটা যে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। উঠার কোন লক্ষণই দেখা যায় না। রাসূল (স) কোন দিন কাউকে কোন কষ্ট দেননি। ঘুম ভাঙ্গাবার মত কষ্টও না। বিড়ালটার ঘুম নষ্ট করতেও তাঁর মন চাইল না।
বড় চিন্তায় পড়লেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তিনি কি করলন? এমন এক কাজ করলেন, যা শুনলে অবাক হতে হয়। তিনি একটি ছুরি হাতে নিলেন। চাদরের যে কোণে বিড়ালটি ঘুমিয়েছিল, এ কোণটাই কেটে ফেললেন। এরপর কাটা চাদরটা গায়ে দিয়ে মসজিদে গেলেন। কিন্তু তখনো বিড়ালটার ঘুম আর ভাঙালেন না。
📄 বিপদের বন্ধু
মুসলমানের অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে কোরাইশদের মনে এক নতুন চিন্তার উদয় হল। অচিরে তারা পরামর্শ সভা আহ্বান করল। মুহাম্মদকে এখন কি করা যায়, এটাই হল সভার আলোচনার বিষয়। আবু জাহেল উঠে প্রস্তাব করল : “আমি বিশেষ চিন্তা করে দেখলাম, মুহাম্মদকে হত্যা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাকে হত্যা করা হলেই ইসলামের প্রাণশক্তির উৎস-মুখ রুদ্ধ হয়ে যাবে। অন্যথায় কিছুতেই আমাদের কল্যাণ নেই।” সকলেই এক বাক্যে এ প্রস্তাব সমর্থন করল। কিন্তু কে মুহাম্মদকে হত্যা করবে? তখন আবু জাহেল পুনরায় প্রস্তাব করল : “প্রত্যেক গোত্র থেকে এক একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হবে এবং তারাই একযোগে মুহাম্মদকে হত্যা করবে।” এ প্রস্তাব সকলেরই মনঃপুত হল। প্রতিনিধি নির্বাচনও হয়ে গেল। স্থির হল, গভীর রাতে সকলে গিয়ে মুহাম্মদের বাড়ী ঘেরাও করে রাখবে; প্রত্যুষে মুহাম্মদ যেই বাইরে আসবে, অমনি সকলে একযোগে তাকে হত্যা করবে।
ওহীযোগে এদিকে হযরতের কিছুই জানতে বাকী রইল না। হযরত তাড়াতাড়ি আবু বকর (রা)-কে সাথে নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। স্থির হল, মক্কার তিন মাইল দূরবর্তী সওর পর্বতের গুহায় গিয়ে তাঁরা আত্মগোপন করবেন; এরপর সুযোগ ও সুবিধা মত সেখান হতে মদীনায় হিজরত করে রওয়ানা হবেন।
রাতে তারার আলোকে পথ দেখে উভয়েই অগ্রসর হলেন। প্রভাতকালে তাঁরা সওর পর্বতে উপনীত হলেন।
আবু বকর (রা) ও নূরনবী (স) সওর গিরিগুহায় প্রবেশ করামাত্রই দেখতে পেলেন কোরাইশগণ তাঁদের দিকে ছুটে আসছে। আবু বকর (রা) বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং বললেন, “হযরত এখন উপায়? শত্রুগণ সংখ্যায় অনেক; আমরা মাত্র দু'জন।” শুনে হযরত শান্তস্বরে বললেন, “তুমি ভুল করছো আবু বকর! আমরা দু'জন নই, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” আবু বকর (রা) অপ্রতিভ হলেন।
সে নিভৃত গুহার মধ্যে দুটি মানুষ। পলায়নের পথ নেই, ঘাতকদল পশ্চাদাবদ্ধন করছে, মৃত্যু একরূপ অবধারিত। কিন্তু সেখানেও হযরত সমুদ্রের মত গম্ভীর, পর্বতের মত অটল। তখনও তাঁর বিশ্বাস, আল্লাহ্র করুণা নিশ্চয় আসবে, নিশ্চয়ই তাঁরা রক্ষা পাবেন।
কার্যত হলও তাই, কোরেশগণ এদিক-ওদিক অনুসন্ধান করার পর যখন গুহায় মুখে এসে পড়ল, তখন দেখল, গুহায় মুখে একটি মাকড়সা প্রকাণ্ড এক জাল বুনে বসে আছে। তা দেখে তারা আর গুহামুখে প্রবেশ করল না; ভাবল, এ গুহায় নিশ্চয়ই কোন লোক প্রবেশ করেনি এটাই তাদের ধারণা হল। করলে মাকড়সার জাল এমন অক্ষত অবস্থায় থাকতে পারত না। এ ভেবে তারা অন্যদিকে চলে গেল।
আল্লাহ্ কি মহিমা! অশনি সম্পাত দ্বারা নয়, ভূমিকম্প দ্বারা নয়, সামান্য একটা মাকড়সার জালে আড়াল করে আল্লাহ্ তাঁর রাসূল (স)-কে পাষণ্ডদের হাত থেকে রক্ষা করলেন।
এ গুহায় মধ্যে হযরত সেদিন মানুষের জন্য সত্যিই এক চরম ভরসা রেখে গিয়েছেন। আল্লাহ্র করুণার উপর এমন ঐকান্তিক নির্ভরতার দৃষ্টান্ত আর কোথায় আমরা দেখতে পাই? বিশ্বের মানুষ সেদিন বুঝেছে, আল্লাহ্র করুণা থেকে কোন অবস্থাতেই নিরাশ হওয়া কারো পক্ষে উচিত নয়। বিপদে ধৈর্য ধরে থাকলে আল্লাহ্ যে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর ভক্তকে রক্ষা করতে পারেন, এ সত্যিই সেদিন প্রতিপন্ন হয়েছে।
📄 দুশমন
সামামা ছিল হোনায়ফিয়া কওমের এক অতি গুণ্ডা প্রকৃতির সর্দার। রাহমাতুল লিল-আলামীন হযরত মুহাম্মদ (স)-এর বহু নিরপরাধ সাহাবীকে সে নির্দয়ভাবে হত্যা করেছিল। হঠাৎ একদিন সে মুসলমানদের হাতে বন্দী হল। মুসলমানেরা তাকে বন্দী করে হযরত মুহাম্মদ (স)-এর কাছে হাজির করলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁর সাহাবীদেরকে ডেকে বললেন, বন্ধুগণ! সামামা আজ তোমাদের হাতে বন্দী। সামামার প্রতি তোমরা ভাল ব্যবহার কর। সামামা খুব বেশি ভোজন করতে পারত। একাকী সে দশবার জনের খাদ্য খেতে পারত।
হযরত (স) বাড়ী গিয়ে হযরত আয়েশা (রা)-কে বললেন, আজ একজন ভোজপটু মেহমান এসেছে। আমাদের সকলের খাবার একত্রিত করে তাকে দিতে হবে। যে উটটা বেশি দুধ দেয় তা দোহন করে সবটুকু দুধ তাকে দিয়ে দাও। সেদিন সামামা এত আহার করল যে, হযরতের ঘরে খাদ্যবস্তু কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না। আর সে রাতে হযরত (স) সপরিবারে সকলেই অনাহারে থেকে গেলেন। আহার শেষ হলে সামামা হযরত (স)-কে বলল, আমি আপনার বহু সাহাবীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছি। আপনি ইচছা করল আমাকে হত্যা করতে পারেন। হযরত (স) তার কথা শুনলেন, কিন্তু কোন উত্তর দিলেন না। অন্য এক দিন সামামা হযরতকে বলল, হে মুহাম্মদ! আপনি যদি আমাকে মুক্ত করে দেন তাহলে মুক্তিপণ স্বরূপ যত দিরহাম চাইবেন আমি ঠিক তত দিরহামই দেব, একটি দিরহাম কম দেব না। তবুও আমাকে মুক্তি দিয়ে দিন।
হযরত এ কথারও কোন উত্তর দিলেন না। এরও কয়েক দিন পর আখেরী নবী দয়ার সাগর হযরত মুহাম্মদ (স) বিনা শর্তে সামামাকে মুক্তি দিয়ে দিলেন। সামামা বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার সময় হযরত (স) তাকে বললেন, 'আমাদের ব্যবহারে যদি কোন দোষ-ত্রুটি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদেরকে ক্ষমা করে দিও।' সামামা চলে গেল।
বহুদূর চলে যাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে সে একটি গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম করতে লাগল এবং কিছুক্ষণ গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করার পর সে উঠে দাঁড়াল। পাশের একটি নহর থেকে গোসল করে সে পুনরায় হযরতের বাড়ির দিকে ফিরে চলল। হযরতের কাছে পৌঁছে সে ইসলাম গ্রহণ করল।
আরও কিছুদিন পর সে পবিত্র কাবা যিয়ারত করার জন্য মক্কায় রওয়ানা হল। কাবা শরীফে প্রবেশ করার সময় সে উচ্চকণ্ঠে তাকবীর বলতে বলতে সামনের দিকে এগিয়ে চলল।
এমতাবস্থায় মক্কার কোরায়েশরা চারদিক থেকে এসে তাকে ঘিরে ধরল এবং সামামার মাথার উপর তরবারী ঝলসে উঠল।
তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বলতে লাগল, সাবধান! সামামাকে কেউ হত্যা করবে না। কারণ এ লোকটি হোনায়ফিয়া কওমের সর্দার এবং ইয়ামামায় তার বাড়ি। ইয়ামামা থেকে আমরা সারা বছর খাদ্যশস্য পেয়ে থাকি, তাকে হত্যা করলে আমাদের আহার বন্ধ হয়ে যাবে। অনাহারে সকলেই মরতে হবে।
সামামা কোরাইশদের উদ্দেশ্য করে বলল, তোমরা হযরত মুহাম্মদ (স)-এর প্রতি এত বিরূপ হয়েছ কেন? অথচ তিনি অত্যন্ত দয়ালু আর ক্ষমাশীল মহাপুরুষ। আমি যতদিন তাঁর দুশমন ছিলাম, ততদিন তাঁর বহু সাহাবায়ে কিরামকে বিনা কারণে হত্যা করেছি। তাঁর হাতে বন্দী হবার পর তিনি আমাকে হত্যা করেনি, আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর তোমরা সে মহান ব্যক্তিকে দেশ ছাড়া করেছ! তোমরা তাঁর কাছে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাঁকে মক্কায় ফিরিয়ে আন।
কাবা শরীফ যিয়ারত করে সামামা দেশে ফিরে গিয়ে মক্কার খাদ্যশস্য রপ্তানি বন্ধ করে দিল। খাদ্যের অভাবে মক্কাবাসীরা উপবাসে দিন কাটাতে লাগল। সমগ্র দেশে হাহাকার পড়ে গেল।
ক্ষুধার তাড়নায় মক্কার লোকেরা হযরতের কাছে লোক পাঠিয়ে আবেদন জানাল যে, আমরা মক্কাবাসীরা আপনার আত্মীয়, খাদ্যের অভাবে আমরা আজ মৃত প্রায়। আমাদের জীবন রক্ষা করুন।
হযরত মুহাম্মদ (স) তৎক্ষণাৎ মক্কার খাদ্যশস্য প্রেরণের জন্য সামামার কাছে সংবাদ পাঠালেন। হযরতের মেহেরবাণীতে পুনরায় ইয়ামামা থেকে রসদ আসতে শুরু হল আর সে খাদ্য আহার করে মক্কার কোরায়েশরা পুনরায় হযরতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে লাগল।