📘 হাদিসের গল্প > 📄 জীবন্ত কবর

📄 জীবন্ত কবর


তোমরা ইতিহাসের পাতায় আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের কত ঘটনাইনা পড়েছ। এ হৃদয় বিদারক ঘটনাটি ঘটেছিল মহানবী (স)-এর এক সাহাবীর ইসলাম পূর্ব জীবনে। মহানবী (স)-এর সান্নিধ্যে আসার পর এ ঘটনাটি তাঁর জীবনে এর অনুশোচনায় তাঁকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করেছিল।
একদিন মহানবী (স) তাঁর এক সাহাবীকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার ইসলাম গ্রহণ পূর্ব জীবনের কোন স্মরণীয় ঘটনা মনে আছে কি?” সাহাবী অত্যন্ত বিচলিত অবস্থায় বলল, “হ্যাঁ, মনে আছে, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! সে হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা মনে পড়লে এখন আমার বুক ফেটে যায়, অসহ্য যন্ত্রণা আর যাতনায় অস্থির হয়ে পড়ি, বেঁচে থাকার আর ইচ্ছা হয় না, দু'চোখ বেয়ে অনবরত পানি আসে আর ভাবি বিগত জীবনে আমি কি করলাম। মহানবী (স) বললেন তাহলে আমাকে বল সে ঘটনাটি। সাহাবী বলতে শুরু করলেন সে বিগত জীবনের বর্বোচিত ঘটনাটি। আমার সংসারে এগারটি মেয়ে শিশু জন্মেছিল। আমরা তখনকার সমাজে মেয়েদের জন্ম হওয়াটা খুবই খারাপ বলে ভাবতাম। ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার সান্নিধ্যে আসার পর ‘মেয়ে জন্ম হওয়া আল্লাহ্র রহমত' একথা তো অপনিই বলেছেন? আপনি আরো বলেছেন, 'যদি কারোর দু-তিনটি মেয়ে হয় তাদের ভালভাবে দ্বীনের কথা শেখায আর ভাল পাত্রের সাথে বিয়ে দেয়, তাহলে সে ব্যক্তি জান্নাতী হবে। ইয়া রাসূলুল্লাহ (স) আপনার মুখে একথা শোনার পর থেকেই বারবার আমার সে বাচ্চা মেয়েগুলোর কথা মনে পড়লে এক অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করি।” মহানবী সাহাবীকে বললেন এখন বল, তোমার সে এগারটি মেয়ে শিশুর কি হয়েছিল। সাহাবী বললেন “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমার জন্য দু'আ করুন, যেন এ অধমকে এর পাপের শাস্তি থেকে আল্লাহ্ মাফ করে দেন। এখন সে কথা মনে হলেই লোম খাড়া হয়ে যায়, কলিজা ফেটে যেতে চায়। আল্লাহ্ তোমাকে ক্ষমা করুন, ব্যাপারটা পরিষ্কার করে আমায় বল।" সাহাবী তাঁর বিগত দিনের ঘটনা আবারও বলতে লাগলেন "আমি এসব মেয়েগুলোকে এক এক করে জ্যান্ত মাটিতে কবর দিয়েছি। এ কাজগুলো যখন করেছিলাম; তখন আমি কাফের ছিলাম, আর এ যুলুম অত্যাচার করেছিলাম তখনই। ইস! এখন বুঝি কত উত্তম না হত, যদি আমার সে মেয়েগুলো থাকত। আমি তাদের ধর্মের কথা শিখাতাম। ভাল ছেলের সাথে বিয়ে দিতাম। বিনিময়ে পেয়ে যেতাম জান্নাত।” মহানবী (স)-সাহাবীকে জিজ্ঞেস করলেন, এ কাজগুলো করতে যেয়ে "কারোর উপর তখন তোমার কোন দয়ামায়ার উদয় হয়নি? সাহাবী বললেন না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কখনো কারোর উপর কোন দয়ামায়া আমার হয়নি। জ্যান্ত মেয়েদের মাটিতে পুঁতে দিতে আমার হাত একটুও কাঁপেনি আর বিবেকও কোন বাঁধা দেয়নি। কিন্তু মনে পড়ে, শেষ মেয়েটার জন্য কেমন যেন একটু মায়া হয়েছিল আমার মনে।" মহানবী (স) জিজ্ঞেস করলেন তা কি রকম?
"বিগত জীবনের সব কথাই এখন আমার চোখের সামনে ভাসছে বললেন সাহাবী। শেষ মেয়েটা যখন জন্মায়, তখন আমি সফরে ছিলাম আর সে সফরে এমনভাবে আটকে পড়েছিলাম যে, তাতে-সাত আট বছর কেটে যায়। সফর শেষে বাড়িতে ফিরে এসে দেখলাম, আমার ঘরে খেলা করছে খুবই সুন্দর ফুটফুটে এক শিশু কন্যা। একে দেখে আমি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এ মেয়েটা কে এবং কার?' স্ত্রী বলল, 'এটা আমাদের এক প্রতিবেশীর মেয়ে। আমি একে চেয়ে এনেছি'। .... এ ভয়ে সে আমায় মিথ্যা বলেছিল যে, 'আমার নিজেরই মেয়ে' একথা আমি জানতে পারলে তাকেও যদি আমি পূর্বেকার মেয়েগুলোর মত জ্যান্ত মাটিতে কবর দিয়ে দেই। মহানবী (স) সাহাবীকে প্রশ্ন করলেন এরপর তুমি কিভাবে জানালে যে মেয়েটি ছিল তোমারই? সাহাবী বললেন, “বেশ কিছুদিন পর একথা জানতে পেরেছিলাম আমারই স্ত্রীর মুখে। মেয়েটি ছিল বেশ আদুরে যেমনি দেখতে সুন্দর, তেমনি মিষ্টি স্বভাবের। সে আমাকে তার সান্নিধ্য থেকে কোন সময় হাত ছাড়া করতে চাইত না। সব সময় কাছে-কাছেই থাকত আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলত। আমার হাত-পা টিপে দিত, আমার জন্য পানি এনে দিত, পাখা দিয়ে বাতাস করত, কচি-কচি হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে চুমু এঁকে দিত মুখে, কপালে। ধীরে ধীরে বাচ্ছা মেয়েটির উপর আমারও মায়া বসে গেল। অর্থাৎ আমার স্নেহ তাকে পেয়ে বসল। তাকে ঘরে না দেখলে কেন কাজেই আমার মন বসত না। যখনই বাইরে থেকে আসতাম, তার জন্য নিয়ে আসতাম ভাল ভাল খাবার। তাকে খাওয়াতাম নিজে হাতে। বাচ্চাটির উপর আমার এমন টান দেখে একদিন স্ত্রী আমাকে বলল, ওগো, এটা যে আমাদেরই মেয়ে, তোমার ভয়ে এতদিন মিথ্যা বলে এসেছি।'.... এবার স্ত্রী সত্যি কথা বলল?' সে ভেবেছিল যে, মেয়েটির উপর আমার এখন খুব মায়া, ভালবাসা জন্মেছে। এখন তাকে আমি আর পূর্বেকার মেয়েগুলোর মত জ্যান্ত কবর দিব না এটাই ছিল আমার স্ত্রীর ধারণা।' কিন্তু কি বলব, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স) কথাটা শোনামাত্রই আমার সারা শরীর জ্বলে উঠল আর আমাদের সমাজের চিত্রটা চোখে ভেসে উঠল।
মেয়ে জন্ম হওয়াটা আমরা বরদাসত করতে পারতাম না। আর আমি এর ব্যতিক্রম হই কি করে। রক্ত চড়ে গেল আমার মাথায় .....।' মহানবী (স) বললেন, তুমি একটু আগেই বললে তোমার খুব মায়া হয়েছিল আর এখন অন্য কথা, কারণটা কি? কারণটা এটাই, আমি মেয়েটিকে জেনেছিলাম অন্যের বলে। সে যে আমারই মেয়ে এত জানতাম না। এখন যখন জানতে পারলাম আমরই মেয়ে আমি সমাজে মুখ দেখাব কি করে এ ভয়ে বিগড়ে গেলাম। মহানবী (স) বললেন তোমরা মেয়ে শিশুদের পছন্দ করতে না কেন?' সাহাবী বললেন 'কারণ ছিল এটাই যে, মেয়েরা তো আমাদের কিছু রোজগার করে এনে দিতে পারবে না। লড়াইয়ের সময় আমাদের সাথে শামিল হয়ে তলোয়ার চালাতেও পারবে না। আবার তাকে বিয়ে দিতে হবে। সারাজীবন তাকে থাকতে হবে স্বামীর অধীনে। তাছাড়া আমরা নিজেদেরকে স্বশুর বলে পরিচয় দিতে খুবই লজ্জা পেতাম। আমরা বড়ই নির্বোধ ছিলাম! মহানবী (স) সাহাবীকে বললেন, তুমি সত্য কথাই বলছ। আল্লাহ্ তোমাকে বিগত দিনের কৃতকর্ম জন্য ক্ষমা করুন। এরপর কি করলে বল? তাই একদিন আমি স্ত্রীর অজান্তে মেয়েটিকে সাথে নিয়ে বাড়ী থেকে বের হলাম। সারাটা পথ সে বড় আদুরে গলায় খুব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে বলতে আনন্দে চলল। তাকে নিয়ে আমি একটা জঙ্গলে ঢুকে শুরু করলাম গর্ত করতে। তা দেখে বাচ্চা মেয়েটি বলে উঠল, 'তুমি এখানে এসে গর্ত খুঁড়ছ কেন, আব্বা? আমি তার কথার জবাব দিলাম না। আপন মনে মাটি খুঁড়তেই থাকলাম। মেয়েটি গর্তের এক ধারে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। আর আমার গায়ে যখন ধুলা মাটি পড়ছিল, সে তখন তার কচি হাতে আমার গা থেকে মাটি ঝেড়ে দিচ্ছিল আর বলেছিল, 'আর মাটি খুঁড়বে না আব্বা। তোমার কষ্ট হচ্ছে। তোমার সারা গায়ে ঘাম ভরে গেছে। তোমার পিঠে মাটি পড়ছে। আব্বা, তুমি বরং আমাকে গর্তে নামিয়ে দাও। আমি খুঁড়ে দিচ্ছি।' সাহাবী বললেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! বাচ্চা মেয়েটির মুখে এমন কথা শুনে আমার অন্তরে একটু মায়া হল বটে কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য। আমি আপনাকে প্রকৃত পরিস্থিতির সত্যি কথাই বলছি, কাফের লোকেরা সাধারণত বড় কঠোর স্বভাবের হয়। আর আল্লাহ্ও তাদের অন্তরকে কঠোর করে দেন। পরকালের হিসেব-নিকেশের কথা বিশ্বাস করলে তো মনে আল্লাহ্র ভয় জাগবে, জাহান্নামের ভয় আসবে। আর আমিও যে তখন কাফের ছিলাম। আর এসব কথা মানার কোন প্রশ্নই উঠে না। কেবল পরিবারে, বংশে বা পাড়ায় যেসব রীতিনীতি চালু ছিল, সেগুলোই শুধু মেনে চলতাম।
এরপর শুনন কি হল। মেয়েটা কিছুক্ষণ পর আবার বলে উঠল, 'আব্বা, তুমি উঠে এস। তোমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তুমি বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছ। এবার আমাকে নামিয়ে দাও। আমি মাটি খুঁড়ে দিচ্ছি। আর, তুমি ততক্ষণ জিরিয়ে নাও, আব্বা!' ইতোমধ্যে গর্তে করণীয় কাজের সবটাই সমাধা করলাম অর্থাৎ চাপা দেয়ার মত হয়ে গেল। 'আমি তাকে বললাম, ঠিক আছে, ... এ বলে আমি উপরে উঠে এলাম আর তাকে নামিয়ে দিলাম গর্তের ভিতর। মেয়েটি গর্তের ভিতর নামা মাত্রই উপর থেকে খুব চালু হাতে মাটি ফেলতে শুরু করলাম।' তোমার এ অবস্থা দেখে মেয়েটি কাঁদেনি বা কোন চীৎকারও করেনি জিজ্ঞেস করলন মহানবী (স)? সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে আর এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। এবার কলিজা ফেটে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সাহাবী আবারো বলতে শুরু করলেন আমার সে প্রিয় বাচ্চাটি বারবার আকুল হয়ে বলতে লাগল- আব্বা? এ তুমি করছ কি, আমার সারা গায়ে মাটি যে ভরে যাচ্ছে। আব্বা, আমি যে দম আটকে মরে যাব, আমি দম আটকে মারা যাব ইত্যাদি। তখন আমাকে কোথায় পাবে, আব্বা! আমি যে তোমাকে খুব ভালবাসি, আব্বা!' 'মেয়েটি এসব কথা বলতে লাগল আর আমি উপর থেকে শুধু মাটি ফেলতেই থাকলাম। আর সে ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করতেই থাকল। এরপরও আমার মনে কোন দয়া-মায়া বা ভাবনার উদয় হল না। এমনই এক উন্মাদনায় আমাকে পেয়ে বসল। মাটিই চাপিয়ে দিলাম। এক সময় মাথাটাও চলে গেল মাটির নীচে। মেয়েটির আর কোন চিৎকার শুনতে পেলাম না। তখন আমি আমার কর্তব্য কাজ সমাধা করতে পেরে মনে মনে গর্ব অনুভব করলাম। -হায়, হায়! কত নিষ্ঠুর ছিলাম আমি। কত যুলুমই না করেছি। এখন আমার একটিও মেয়ে নেই। আমি কেমন করে জান্নাতে যাব, ইয়া রাসূলুল্লাহ আমাকে বলুন। আমার জন্য দু'আ করুন। আমি তওবা করছি। মহানবী (স) সাহাবীকে বললেন, আল্লাহ্ তোমাকে মা'ফ করুন। যাও, আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি কর। মহিলা ও শিশুকন্যাদের হক পুরোপুরি আদায় কর। তাদেরকে হিফাযত কর। যদি তারা দিনের মধ্য সত্তরবারও ভুল করে, তবুও তাদের ক্ষমা করে দাও。'

📘 হাদিসের গল্প > 📄 ভক্তের পরীক্ষা

📄 ভক্তের পরীক্ষা


আরব দেশ। অন্ধকার যুগ।
মক্কার বিধর্মীদের মনে বড় দুশ্চিন্তা। তারা মহা ভাবনায় গেল। কত ঠাট্টা-বিদ্রুপ, কত ভয় দেখাল, তবু হযরত মুহাম্মদ (স) ইসলাম প্রচার বন্ধ করলেন না। মক্কার লোক অনেকে একে একে মুসলমান হয়ে যাচ্ছে। বিধর্মীদের মনে ক্রোধের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। হিংসা-বিদ্বেষ তাদের মনে আগুন জ্বালিয়ে দিল, তারা সকলে মিলে পরামর্শ করল। স্থির করল, যেই মুসলমান হবে, তারই উপর অত্যাচার করা হবে।
বিধর্মীদের অন্যতম নেতা উমাইয়া প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি। টাকা-পয়সা আছে প্রচুর। কুরাইশদের মাঝে তার প্রভাবও আছে। উমাইয়া বসে বসে ভাবছে ইসলামের প্রচার কি করে রোধ করা যায়। যুলুম নির্যাতন করেও তো কোন ফল হচ্ছে না।
এমন সময় তাঁর কানে এল, 'আল্লাহ্ এক। আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই।'
উমাইয়া চমকে উঠল। তার বাড়ির ভিতর থেকে কে যেন এ কথা বলছে। উমাইয়া দৌড়ে ঘরে গেল। ঘরের ভিতরে যা দেখল, তাতে উমাইয়ার চক্ষু স্থির। তারই এক ক্রীতদাস এক মনে বলছে, "আল্লাহ্ এক। আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই।'
কি স্পর্ধা। তার ঘরে থেকে, তার ক্রীতদাসের এত সাহস। উমাইয়া ক্রোধে অগ্নিশিখার মত জ্বলে উঠল।
কে শোনে কার কথা। ক্রীতদাস আপন মনে জপতেই থাকে "আল্লাহ্ এক।"
শুরু হল এবার অত্যচার। কিন্তু শত অত্যচারেও ক্রীতদাসকে নিস্তব্ধ করা গেল না। উমাইয়া নির্যাতনের নতুন পথ বের করল। সে ক্রীতদাসের গলায় পশুর দড়ি বাঁধা হল। এরপর তাকে মক্কার বালকদের হাতে ছেড়ে দিল। বালকেরা তার গলার বাঁধনধরে মক্কার পথে পথে ঘুরল, হৈ-হৈ শব্দে তামাশা করল, টেনে হেঁচড়িয়ে, মেরে-পিটিয়ে তাকে আধমরা করল। এরূপ রং-তামাশায় অত্যাচার করে সন্ধ্যার সময় তাকে উমাইয়ার বাড়িতে দিয়ে গেল।
উমাইয়া তখন তার কাছে গিয়ে বলল, "এখনো সময় আছে। মুহাম্মদের ধর্ম ছেড়ে দে।”
এরূপ অত্যাচারের পরও ক্রীতদাস বলল, 'আল্লাহ্ এক, আল্লাহ্ এক' পরের দিন আবারও সে একই ধরনের অত্যাচার উৎপীড়ন।
এত অত্যাচারের পরও ক্রীতদাস মুহাম্মদ (স)-এর প্রচারিত ধর্ম ছাড়েনি।
এবার উমাইয়া ক্রুদ্ধ হয়ে কঠোরতম অত্যাচার আরম্ভ করল। দুপুরবেলা আরবের মরুভূমি গরমে আগুন হয়ে উঠে। উমাইয়া সে তপ্ত বালুর উপর তাকে চিৎ করে শোয়াল। যাতে সে কোন পাশে ফিরতে না পারে, সে জন্য বুকের উপর ভারী পাথর রাখল।
পিঠের নীচে তপ্ত বালু আর চোখে মুখে দুপুরের রৌদ্র, পাশ ফিরবার কোন উপায় নেই। এমন অবস্থায় ক্রীতদাস যখন প্রায় চৈতন্য হারিয়েছে, তখন সেখানে উমাইয়া এল। বলল, "এখনও সময় আছে, মুহাম্মদ এর ধর্ম ছাড়, তোকে ছেড়ে দিই।'
সে অর্ধচেতন অবস্থাতেও ক্রতীদাসটি চিৎকার করে উঠল "আহাদ। আহাদ। আল্লাহ্ এক, আল্লাহ্ এক।"
উমাইয়া হতাশ হয়ে তার আহার বন্ধ করে দিল। তাকে একটা ছোট কামরাতে আবদ্ধ করে রাখল, সেখানে তার হাত পিঠ-মোড়া দিয়ে বেঁধে বেদম প্রহার করতে লাগল। নিদারুণ বেত্রাঘাতে তার গায়ের চামড়া ছিঁড়ে রক্ত বের হতে লাগল। তখনও সে বলেছে, "আহাদ। আহাদ।"
একদিন শেষ রাতে হযরত আবু বকর (রা) সে পথ দিয়ে চলেছেন। তিনি সে ক্রীতদাসের করুন ক্রন্দন শুনলেন। সে অসহায়ের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচারের কথা শুনে তিনি শিহরিয়ে উঠলেন। পরদিন সকাল বেলা তিনি উমাইয়ার সাথে দেখা করলেন। আরবে তখনও দাস ক্রয়-বিক্রয় হত। তিনি উমাইয়াকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে দাসটিকে কিনে আনলেন। বাড়ীতে এনে তিনি সে পরম সত্যনিষ্ঠ ক্রীতদাসটিকে মুক্তি দিলেন।
কে এ ক্রীতাদাস, যিনি এমন অমানুষিক অত্যাচারে পরও সত্য ধর্মকে ছাড়েন নাই! জগতের কোন বাধা-বিপত্তিই যাকে আল্লাহ্ পথ থেকে সরাতে পারে নাই? ইনি ভক্তকূল চূড়ামণি হযরত বেলাল (রা)। ইসলাম জগতের প্রথম মুয়াজ্জিন。

📘 হাদিসের গল্প > 📄 নবী ও বিড়াল

📄 নবী ও বিড়াল


বিড়াল বড় আদরের প্রাণী। খাওয়ার সময় সে আশে-পাশে ঘোরে। কিছু না পেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়, না হলে ম্যাও ম্যাও করে। আর পেলে তৃপ্তির সাথে খায় আর লেজ নাড়ে।
বিড়াল মানুষের কাছে কাছে থাকতে চায়। পোষা বিড়াল কোলে উঠে বসে। বিড়াল রাতে মানুষের সাথে ঘুমাতে খুবই ভালবাসে। প্রায় দেখা যায়, পায়ের কাছে শুয়ে আছে, লাথি খেয়েও সরে না; মিউ-মিউ করে কেঁদে কেঁদে আবার কাছে ভিড়ে।
ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বিড়ালকে খুবই আদর করে। অনেকে পোষা বিড়ালকে 'মিনি' বলেও ডাকে। আমাদের নবীজীও বিড়ালকে ভালবাসতেন। বিড়ালকে তিনি গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতেন, সামনে বসিয়ে খাওয়াতেন। তাঁকে দেখামাত্র বিড়াল ম্যাও ম্যাও করে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করত।
কেবল নবীজী কেন, তাঁর অনেক সাহাবীও বিড়ালকে ভালবাসতেন। হযরত আবু হোরায়রা ছিলেন রাসূল (স)-এর এক অন্যতম প্রিয় সাহাবী। তিনি কিছু শুনলে তা কখনো ভুলতেন না। রাসূলের কথা শোনা মাত্র তিনি মুখস্ত করতেন এবং লিখে রাখতেন। তিনি সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আবু হোরায়রার বাড়ী ছিল মদীনা থেকে অনেক দূরে। সত্যের ডাক সেখানে পৌঁছলে, তিনি মদীনায় এলেন। আসার সময় বাড়ির জিনিসপত্র প্রায় সব কিছুই ফেলে এলেন, সাথে শুধু নিয়ে এলেন একটি বিড়াল।
এ আবার কি রকম কাণ্ড? কিন্তু প্রাণে যাদের দরদ থাকে, তাঁরাই এমন কাজ করেন। ঘরের দামী দামী আসবাব তো প্রাণহীন -জড় পদার্থ। এগুলো ফেলে এলে এরা ব্যথা পাবে না। কিন্তু বিড়াল ত জড় পদার্থ নয়, এর প্রাণ আছে; আর তাই তার ব্যথাও আছে। তাকে ফেলে এলে দুঃখ পাবে, কাঁদবে। তাই আবু হোরায়রা একে সাথে নিয়ে এলেন।
বিড়ালের প্রতি তাঁর দরদ দেখে অনেকেই হাসি-ঠাট্টা করল। কিন্তু নবীজী একটি মূক প্রাণীর প্রতি আবু হোরায়রার দরদ দেখে খুশি হলেন।
আমাদের প্রিয়নবীর একটি মাত্র চাদর ছিল। রাতের বেলায় তিনি চাদরটি গায়ে দিয়ে ঘুমাতেন। আর দিনের বেলা এটিই গায়ে দিয়ে বের হতেন।
আরব দেশে দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম। রাতের বেলা ভীষণ শীত। শীতকালে রাতের বেলা হাড়-কাঁপানো শীত।
আমাদের নবীজী শেষ রাতে জেগে উঠতেন। নবী হওয়ার আগেও শেষ রাতে তিনি জেগে থাকতেন। তারার মেলা দেখতেন। গাছপালা আকাশ-বাতাস কি করে হল তা ভাবতেন।
খুব ভোরেই নবীজী মসজিদে আসতেন। তাহাজ্জুদ পড়তেন। সুবহি সাদিকের সময় মসজিদে যাওয়া ছিল তাঁর জীবনের অভ্যাস। একা নবীজী নন, তাঁর সাহাবারাও প্রায় সকলেই সুবহি সাদিকের সময় সমজিদে উপস্থিত হতেন। কারণ এটা ছিল ইবাদত কবুলের সময়।
কাফেররা কাজ করত নবীর উল্টা। তারা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকত, হৈ-চৈ করত, আর সকাল বেলা ঘুমাত। এ অভ্যাসটা এখন মুসলমান সমাজের মধ্যে প্রায় পরিবারেই ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়।
আমাদের নবী একদিন শেষ রাতে মসজিদে যাওয়ার জন্য তৈরি হলেন। গায়ে দেয়ার জন্য চাদরটি ধরলেন। কিন্তু দেখলেন, চাদরের এক কোণে শুয়ে আছে একটি বিড়াল।
চাদরটা তিনি অতি সহজেই টেনে নিতে পারতেন। কিন্তু তাতে হয়ত বিড়ালটির ঘুম ভেঙ্গে যেত। বিড়ালের ঘুম ভাঙাতে তাঁর ইচ্ছা হল না। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। এদিকে সুবহি সাদিক শেষ হয়ে ফযরের নামাযের সময় হয়ে এল। তখনও বিড়ালটির ঘুম ভাঙল না। ফযরের নামাযের সময় হয়ে এল। ফযরের নামাযের জন্য সাহাবারা তাঁরই অপেক্ষা করছেন। তিনি মসজিদে গেলে এক সাথে জামাত হবে। তাই না গেলেও নয়।
কিন্তু বিড়ালটা যে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। উঠার কোন লক্ষণই দেখা যায় না। রাসূল (স) কোন দিন কাউকে কোন কষ্ট দেননি। ঘুম ভাঙ্গাবার মত কষ্টও না। বিড়ালটার ঘুম নষ্ট করতেও তাঁর মন চাইল না।
বড় চিন্তায় পড়লেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তিনি কি করলন? এমন এক কাজ করলেন, যা শুনলে অবাক হতে হয়। তিনি একটি ছুরি হাতে নিলেন। চাদরের যে কোণে বিড়ালটি ঘুমিয়েছিল, এ কোণটাই কেটে ফেললেন। এরপর কাটা চাদরটা গায়ে দিয়ে মসজিদে গেলেন। কিন্তু তখনো বিড়ালটার ঘুম আর ভাঙালেন না。

📘 হাদিসের গল্প > 📄 বিপদের বন্ধু

📄 বিপদের বন্ধু


মুসলমানের অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে কোরাইশদের মনে এক নতুন চিন্তার উদয় হল। অচিরে তারা পরামর্শ সভা আহ্বান করল। মুহাম্মদকে এখন কি করা যায়, এটাই হল সভার আলোচনার বিষয়। আবু জাহেল উঠে প্রস্তাব করল : “আমি বিশেষ চিন্তা করে দেখলাম, মুহাম্মদকে হত্যা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাকে হত্যা করা হলেই ইসলামের প্রাণশক্তির উৎস-মুখ রুদ্ধ হয়ে যাবে। অন্যথায় কিছুতেই আমাদের কল্যাণ নেই।” সকলেই এক বাক্যে এ প্রস্তাব সমর্থন করল। কিন্তু কে মুহাম্মদকে হত্যা করবে? তখন আবু জাহেল পুনরায় প্রস্তাব করল : “প্রত্যেক গোত্র থেকে এক একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হবে এবং তারাই একযোগে মুহাম্মদকে হত্যা করবে।” এ প্রস্তাব সকলেরই মনঃপুত হল। প্রতিনিধি নির্বাচনও হয়ে গেল। স্থির হল, গভীর রাতে সকলে গিয়ে মুহাম্মদের বাড়ী ঘেরাও করে রাখবে; প্রত্যুষে মুহাম্মদ যেই বাইরে আসবে, অমনি সকলে একযোগে তাকে হত্যা করবে।
ওহীযোগে এদিকে হযরতের কিছুই জানতে বাকী রইল না। হযরত তাড়াতাড়ি আবু বকর (রা)-কে সাথে নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। স্থির হল, মক্কার তিন মাইল দূরবর্তী সওর পর্বতের গুহায় গিয়ে তাঁরা আত্মগোপন করবেন; এরপর সুযোগ ও সুবিধা মত সেখান হতে মদীনায় হিজরত করে রওয়ানা হবেন।
রাতে তারার আলোকে পথ দেখে উভয়েই অগ্রসর হলেন। প্রভাতকালে তাঁরা সওর পর্বতে উপনীত হলেন।
আবু বকর (রা) ও নূরনবী (স) সওর গিরিগুহায় প্রবেশ করামাত্রই দেখতে পেলেন কোরাইশগণ তাঁদের দিকে ছুটে আসছে। আবু বকর (রা) বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং বললেন, “হযরত এখন উপায়? শত্রুগণ সংখ্যায় অনেক; আমরা মাত্র দু'জন।” শুনে হযরত শান্তস্বরে বললেন, “তুমি ভুল করছো আবু বকর! আমরা দু'জন নই, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” আবু বকর (রা) অপ্রতিভ হলেন।
সে নিভৃত গুহার মধ্যে দুটি মানুষ। পলায়নের পথ নেই, ঘাতকদল পশ্চাদাবদ্ধন করছে, মৃত্যু একরূপ অবধারিত। কিন্তু সেখানেও হযরত সমুদ্রের মত গম্ভীর, পর্বতের মত অটল। তখনও তাঁর বিশ্বাস, আল্লাহ্র করুণা নিশ্চয় আসবে, নিশ্চয়ই তাঁরা রক্ষা পাবেন।
কার্যত হলও তাই, কোরেশগণ এদিক-ওদিক অনুসন্ধান করার পর যখন গুহায় মুখে এসে পড়ল, তখন দেখল, গুহায় মুখে একটি মাকড়সা প্রকাণ্ড এক জাল বুনে বসে আছে। তা দেখে তারা আর গুহামুখে প্রবেশ করল না; ভাবল, এ গুহায় নিশ্চয়ই কোন লোক প্রবেশ করেনি এটাই তাদের ধারণা হল। করলে মাকড়সার জাল এমন অক্ষত অবস্থায় থাকতে পারত না। এ ভেবে তারা অন্যদিকে চলে গেল।
আল্লাহ্ কি মহিমা! অশনি সম্পাত দ্বারা নয়, ভূমিকম্প দ্বারা নয়, সামান্য একটা মাকড়সার জালে আড়াল করে আল্লাহ্ তাঁর রাসূল (স)-কে পাষণ্ডদের হাত থেকে রক্ষা করলেন।
এ গুহায় মধ্যে হযরত সেদিন মানুষের জন্য সত্যিই এক চরম ভরসা রেখে গিয়েছেন। আল্লাহ্র করুণার উপর এমন ঐকান্তিক নির্ভরতার দৃষ্টান্ত আর কোথায় আমরা দেখতে পাই? বিশ্বের মানুষ সেদিন বুঝেছে, আল্লাহ্র করুণা থেকে কোন অবস্থাতেই নিরাশ হওয়া কারো পক্ষে উচিত নয়। বিপদে ধৈর্য ধরে থাকলে আল্লাহ্ যে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর ভক্তকে রক্ষা করতে পারেন, এ সত্যিই সেদিন প্রতিপন্ন হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00