📘 হাদিসের গল্প > 📄 পরশ পাথর

📄 পরশ পাথর


মক্কা বিজিত।
সাফা পর্বতের উপত্যকায় বসে আছেন রাসূলুল্লাহ (স)। দলে দলে পুরুষেরা এসে ইসলাম দীক্ষা নিচ্ছে। মিথ্যা ছেড়ে সত্য গ্রহণ করেছে। এখন দীক্ষা গ্রহণ চলেছে মহিলাদের! মক্কার মেয়েরা বেরিয়ে এসেছে। কাপড়ে মুখ ঢেকে হাজির হয়েছে নবীজির সামনে। কাল যারা ছিল অর্ধ উলঙ্গ, আজ তারা আবরু ফিরে পেয়েছে। ফিরে পেয়েছে সম্ভ্রম। কত পরিবর্তন এক দিনে! ভাবা যায় না!
মহিলাদের ভীড়ের মধ্যে কাপড়ে মুখ ঢেকে এল একজন। ভয়ে দুরু দুরু বুক। ভীষণ শংকিত সে। হযরত চিনতে পারলে তার কঠিন সাজা হয় যাবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। যে কোন মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে ঘটনাটা। কঠিন অপরাধে অপরাধী সে। এমন অপরাধ, যা কোন মহিলা করেনি আজ পর্যন্ত। যত দিন পৃথিবী থাকবে, হয়ত এমন ঘৃণ্য কাজ আর করবেও না কেউ।
ভীড়ের মধ্যে আত্মগোপন করে এগুতে এগুতে আজ কত কথাই না মনে পড়েছে তার। বদর যুদ্ধ। ওহুদ যুদ্ধ। আর এসব যুদ্ধে তার ভূমিকা, বিশেষ করে ওহুদ যুদ্ধে সে যে পাপ করেছে, পৃথিবীতে এর কোন দ্বিতীয় নজির নেই। সবই মনে পড়ছে তার। মুসলমান সৈনিকরা একে একে লুটিয়ে পড়ছে। হেরেই যাচ্ছে এরা। যুদ্ধ থেকে যেয়ে মাঠে নামল সে তার দলবল নিয়ে। মক্কা থেকে যত মহিলা এসেছিল সবাইকে সাথে নিল।
এরপর মাঠে নেমে শুরু করল তার পৈশাচিক কার্যকলাপ। আহত যে সব মুসলমান সৈনিক তখনও বেঁচেছিল, তরবারির আঘাতে হত্যা করল তাদের। এরপর সে মৃত সৈনিকদের কান কাটল। নাক কাটল। চোখ উঠাল। শেষে গেল শহীদ হামযার কাছে। এ হামযা (রা)-কে হত্যা করার জন্য এক হাবশী ক্রীতদাসকে নিযুক্ত করেছিল। নাম তার ওয়াশি। শহীদ হামযার কাছে গিয়ে তাঁরও নাক-কান কাটল। চোখ উঠাল। এরপর সেগুলো গেঁথে মালা বানাল। গলায় পরল এরপর। পায়ের মল করল। নিজে পরল। সঙ্গীদের পরাল। অবশেষে শহীদ হামযার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। পা দিয়ে নেড়ে-নেড়ে দেখল একটু। এরপর হঠাৎ মৃত হামযার বুকের ওপর চড়ে বসল সে। ঠিক যেন হিংস্র পশু। বন্য বাঘিনী।
উম্মাদিনীর মত চিৎকার করতে করতে সে হামযা (রা)-এর বুকটা চিরে দু ফাঁক করে ফেলল। ভিতরে হাত দিয়ে কলিজা টেনে বের করে আনল উম্মাদিনীর মত। সে কলিজা দুহাতে ধরে মুখে দিল। এরপর চিবুতে শুরু করল। প্রতিহিংসায় মেতে উঠল মৃত হামযা (রা)-কে নিয়ে। ঠিক জঙ্গলের জন্তুর মত। দাঁতাল শূকরের মত। বন্য বাঘিনীর মত।
হযরত হামযা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা। পরে এ বিকলাঙ্গ দেহ দেখে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছিলেন নবীজী। তিনি খুবই ব্যথা পেয়েছিলেন মনে। চোখ মুছতে মুছতে চলে এসেছিলেন।
আজ সে উন্মদিনী মহিলা চলছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে কাপড়ে মুখ ঢেকে। আত্মগোপন করে। না এসে উপায় নেই। মক্কা বিজিত। আজ তারা পরাজিত। বাঁচার শেষ চেষ্টা করতে এসেছে সে। ইসলামের দীক্ষা নিলে যদি রেহাই পায়। যদি বাঁচে। কিন্তু এর আগে যদি চিনতে পারে হযরত মুহাম্মদ (স) তা হলেই সর্বনাশ। সাথে-সাথে হত্যা। এতে কোন সন্দেহ নেই। অন্তত সে যা পাপ করেছে এ সাজাই হওয়া উচিত।
উতবার কন্যা সে। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী। নাম তার হিন্দা। কাপড়ে মুখ ঢেকে হিন্দা এগিয়ে চলল রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে। না গিয়ে উপায় নেই। দীক্ষা দান করেছিলেন হযরত উমর (রা)। কিন্তু ঘটনাগুলো ঘটছিল নবী (স)-এর সামনে। তিনি বসেছিলেন। হিন্দা ধীরে-ধীরে এগুচ্ছিল তাঁর দিকে। অত্যন্ত ভীত। অত্যন্ত শঙ্কাতুর। জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে! বাঁচা অথবা মরা। কি হবে সে নিজেও জানে না। কিন্তু এছাড়া আর কোন উপায় নেই। পথ নেই কোন। সবকিছুই নির্ভর করছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর। শেষ পর্যন্ত তাকে চিনেই ফেললেন হযরত মুহাম্মদ (স)। বললেন, আরে সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা না?
একেবারেই বাকহারা হয়ে গেল হিন্দা। কোন রকমে মাথা নেড়ে সায় দিল সে। এরপর চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। অবশেষে যেন নিতান্ত জীবনের তাগাদায় কিছু শক্তি সঞ্চয় করে আর্তনাদ করে উঠল, যার হবার হয়ে গেছে আপনি আমায় ........।
আর কিছু বলতে পারল না সে। দয়াল নবী (স) হিন্দার মনোভাব উপলব্ধি করলেন। এরপর মমতাভরা কণ্ঠে বললেন, কোন ভয় নেই-যাও তোমাকে আমি ক্ষমা করলাম।
সামান্য একটা কথা। কিন্তু তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করল তার অন্তরে। রাসূল (স) আমাকে ক্ষমা করলেন, আমার মত পাপিনীকে ক্ষমা করলেন তিনি? এক কথায়? কোন দ্বিধা না করেই? কাপড়ের আড়াল থেকে সে তাকাল রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখের দিকে। শান্ত আর স্নিগ্ধ সে মুখ। পবিত্র আর উজ্জ্বল সে মুখ। কোন দ্বেষ নেই। নেই কোন প্রতিহিংসা। পবিত্রতায় দীপ্তিময়। অনন্ত জ্যোতির্ময়!
তার মনের গভীর থেকে একটা প্রশ্ন বেরিয়ে এসে খাড়া হয়ে দাঁড়াল তার বিবেকের সামনে। এ মানুষটির সাথে শত্রুতা করে এসেছি এতকাল!
যতই ভাবে, ততই বিগলিত হতে থাকে। শিখায় মোম যেমন গলে-গলে পড়ে। কঠিন হৃদয় নারী তেমনি নরম হতে থাকে, মোমের মত গলতে থাকে। যন্ত্রণায় আর আত্ম-পীড়নে। ভিতরটা পরিষ্কার হতে থাকে ধীরে-ধীরে। সুবহি সাদিকের আলোয় পৃথিবীর অন্ধকার যেমন কেটে যায় তেমনি। পলকে পরিষ্কার। শত্রু এখন মিত্রে পরিণত হয়েছে। দুশমন এখন দোস্ত। সামান্য কিছু পরে গভীর আবেগ ফুটে উঠল হিন্দার গলায়।
আবেগের উচ্ছল কণ্ঠে সে বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত আপনার তাঁবুর চেয়ে কোন ঘৃণ্য তাঁবু আমার কাছে ছিল না। আর এখন পৃথিবীতে কোন তাঁবুই আপনার তাঁবুর চেয়ে আমার কাছে অধিকতর প্রিয় নয়। যারা শুনল, অবাক হয়ে গেল। এযে হিন্দার কণ্ঠস্বর? যেন জীবনের ওপার থেকে ভেসে আসছে এ স্বর। পবিত্র আযানের মত।
পরশ পাথরের ছোঁয়ায় হিন্দা এমন সোনায় পরিণত হয়েছে। এ ছোঁয়ায় সব কিছুই সোনা হয়। বেদুঈন, ইহুদী, কুরাইশ এবং তাবত মানুষ এবং হিন্দাও!

📘 হাদিসের গল্প > 📄 নামাযী

📄 নামাযী


যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। সূর্যের আলোয় শত্রুর খোলা তরবারি চিকচিক করে উঠল। মুসলিম সেনারাও তৈরী চলল যুদ্ধের জন্য। আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলল। যুদ্ধ শুরু হল। তুমুল যুদ্ধ।
মুসলমানরা লড়ছে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য। মিথ্যার অভিশাপকে দূরীভূত করার জন্য। রাজ্য জয়ের কোন লিপ্সা, সম্পদ আহরণের কোন লোভ তাঁদের নেই। মুসলমানরা জান-প্রাণ দিয়ে লড়ছে। সত্য-মিথ্যার এ যুদ্ধে তাঁদের জয়ী হতেই হবে।
উভয় দলে যুদ্ধ চলছে পুরোদমে। এরই মধ্যে এক অঘটন ঘটে গেল। কোথা থেকে এক তীর এসে বিঁধল হযরত আলী (রা)-এর পায়ে। ক্ষতস্থান দিয়ে দরদর করে রক্ত বের হতে লাগল। তীরটি বিষাক্ত। অসহ্য যন্ত্রণায় হযরত আলী (রা) চিৎকার করে উঠলেন। দূর থেকে সংগী-সাথীরা হযরত আলী (রা)-এর এ অবস্থা দেখলেন। তাঁরা ছুটে এলেন হযরত আলী (রা)-এর কাছে। কিন্তু কার সাধ্য আছে পা থেকে তীর টেনে বের করে। যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করেছেন। পায়ে একটু হাত লাগলেই শিউরে উঠেন যন্ত্রণায়। উঃ আঃ চীৎকার করে উঠেন। সাহাবাগণ পড়ে গেলেন মহা সমস্যায়। এখন তাঁরা কি করেন? তীর বের না করলে রক্ত বন্ধ হবে না। ব্যথাও যাবে না। এদিকে তাঁর যন্ত্রণা দেখে কেউ তীর বের করতেও সাহস পেলেন না।
মহানবী (স)-ও সেখানে উপস্থিত। তিনি সব কিছুই দেখছিলেন। তিনি বুঝলেন এভাবে তাঁর পা থেকে তীর বের করা যাবে না। তিনি কয়েকজন সাহাবাকে ডাকলেন। একটু দূরে নিয়ে আস্তে আস্তে বলল- নামাযের সময় হোক। নামাযে দাঁড়ালেই তোমরা তীরটা বের করে নেবে।
সাহাবাগণ রাসূলের পরামর্শ মেনে নিলেন। সবাই চলে গেলেন যার যার কাজে। নামাযের সময় হল। সবাই চলল নামাযের জন্য। হযরত আলী (রা)ও বসে নেই। মুয়াজ্জিনের আযান ধ্বনি শোনার সাথে সাথেই তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ভুলে গেলেন সমস্ত ব্যথার কথা। এখনি জামাত শুরু হবে। হযরত আলী (রা) তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে চললেন। অন্যান্য সাহাবীর সাথে একই কাতারে নামাযে শামিল হবেন।
অসহ্য যন্ত্রণায় এতক্ষণ যিনি উহঃ উহঃ আহঃ করছিলেন, আর এ মুহূর্তেই তিনি যেন একেবারে সুস্থ হয়ে উঠলেন। নামাযের প্রতি হযরত আলী (রা)-এর আকর্ষণ এতই ছিল প্রবল। নামাযের সময় তিনি যেন একেবারে অন্য জগতের মানুষ হয়ে যেতেন। ভুলে যেতেন সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণার কথা, দুনিয়ার কথা।
সবাই নামায পড়ছেন, শুধু মাত্র কয়েকজন সাহাবা দাঁড়িয়ে রয়েছেন পিছনে। তাঁদের মন তখন অস্থির চঞ্চল। ডর-ভয়ও রয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু উপায় নেই। এ সুযোগেই তীর বের করে নিতে হবে।
একজন সাহাবা ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন আলী (রা)-এর দিকে। বেশ শক্তভাবে তীরটা পায়ে বিঁধেছে। আস্তে ধীরে টান দিলে চলবে না। তীরের মাথা ধরে সাহাবী সজোরে মারলেন এক টান। টানের চোটে পায়ের মাংস ছিঁড়ে বেরিয়ে এল। ফিনকি দিয়ে ছুটল আবারো তাজা রক্ত।
হযরত আলী (রা) তখনও নামায পড়ছেন। উঃ-আঃ কোন শব্দই করলেন না। একটু নড়লেনও না। নামাযের মধ্যে যে এতসব কাণ্ড ঘটে গেছে, তিনি এর কিছুই টেরও পেলেন না।
হযরত আলী (রা)-এর এমন অবস্থা দেখে সাহাবাগণ অবাক হল। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন তাঁর দিকে। মনে মনে ভাবলেন, অদ্ভুত মানুষ হযরত আলী (রা)। একটু আগেও যন্ত্রণায় ছটফঠ করছিলেন। তীরে কেউ হাত দিলেই ভয়ে শিউরে উঠতেন। অথচ নামাযের সময় ব্যথা-বেদনার কথা একদম ভুলেই গেলেন। এমনকি তীর বের করার সময়কার যন্ত্রণাও অনুভব করলেন না। মানুষ কি এত আপন ভোলা হয়ে নামায পড়তে পারে? নিজের সুখ-দুঃখ ভাল-মন্দের কথা ভুলে গিয়ে নামাযে এত মনোযোগী হতে পারে? সাহাবাগণ ভাবছিলেন এমনি আরো অনেক কথা।
হযরত আলী (রা) নামায পড়া শেষ করলেন। ততক্ষণে রক্তে তাঁর জামা-কাপড় ভিজে গেছে। তিনি শরীরে একটু ভেজা অনুভব করলেন। তাকিয়ে দেখলেন তাঁর পায়ে তীর নেই। তিনি একটু অবাক হলেন। সংগী-সাথীগণকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
সাহাবাগণ বললেন, নামাযের সময় আপনার পা থেকে তীর বের করে নেয়া হয়েছে। তখন তাঁর মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল।

📘 হাদিসের গল্প > 📄 মহৎ জীবন

📄 মহৎ জীবন


মহানবী (স) ছিলেন আদর্শ মানুষ। তাঁর মহৎ চরিত্র ছিল সকল গুণের আধার। মানুষের সাথে কথাবার্তা ও আচার ব্যবহারে তিনি ছিলেন খুবই অমায়িক এবং উদার। কেউ মনে আঘাত পেতে পারে, এরূপ কোন কথা কখনো বলতেন না। মধুর ব্যবহারে তিনি সকলের মন জয় করতেন। এজন্য শত্রু-মিত্র সকলেই তাঁকে সম্মান করত।
মহানবী (স) দুনিয়ায় এসেছিলেন মানুষকে সৎপথ দেখাবার জন্য। কি করে মানুষ প্রকৃত ভাল মানুষ হয়ে চলতে পারে, সে শিক্ষা দেয়ার জন্যই আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। তাই তাঁর প্রত্যেকটি কাজ ও আচার ব্যবহারে আমরা অতুলনীয় শিক্ষালাভ করি এবং একেই আমরা সুন্নাত বা আদর্শরূপে গ্রহণ করি।
এখানে তাঁর জীবনের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করব। এ থেকে তাঁর মহত্ত্ব ও উদারতা সম্পর্কে তোমরা কিছুটা ধারণা করতে পারবে।
মদীনার কাছাকাছি জহীর নামে এক ব্যক্তি পল্লীতে বাস করত। গ্রাম থেকে সে তরি-তরকারী, শাক-সবজি কাঁধে করে বয়ে এনে মদীনায় এক রাস্তার পাশে দোকান করে বিক্রি করত। সে ছিল যেমন কাল, তেমনি কুৎসিত। সবাই তাকে ঘৃণা করত, কেউ তার কাছ ঘেঁষতে চাইত না। কিন্তু মহানবী (স) তার দোকান থেকে কেনাকাটা করতেন এবং অবসর সময়ে তার পাশে বসে নানান কথাবার্তা বলতেন। সবাই দেখে তাজ্জব হয়ে যেত। শুধু তাই নয়, জহীর যখন তার জিনিসপত্র বিক্রি করে বাড়ি যেত, তখন মহানবী (স) স্বয়ং সারা শহরে ঘুরে ঘুরে জহীরের জন্য সে সব জিনিস সংগ্রহ করতেন। এভাবে গ্রামের জিনিস এনে শহরে, আর শহরের জিনিস গ্রামে বেচাকেনা করে জহীর বেশ সম্পদের মালিক হল।
মহানবী (স) তাকে দেখিয়ে বলতেন: জহীর আমাদের গ্রাম আর আমি জহীরের শহর। এজন্য জহীরের আনন্দের কোন সীমা ছিল না। মহানবী (স)-এর ভালবাসা আর নেক সোহবত পেলে কার না আনন্দ হয়, বল! একদিন সে মহানবী (স)-কে জিজ্ঞেস করল: হে নবী (স)! আমি এত কুৎসিত যে, দুনিয়ায় সবাই আমাকে দেখে ঘৃণা করে অথচ আপনি আমাকে এত ভালবাসেন কেন?
মহানবী (স) হেসে বললেন: মানুষের চোখে তুমি কাল এবং কুৎসিত হতে পার, কিন্তু আল্লাহ্ চোখে তুমি সুন্দর এবং তুমি আল্লাহ্ প্রিয়।
অতএব, কাল কুৎসিত, অন্ধ-আতুর কাউকেই ঘৃণা করতে নেই। সকলকেই আল্লাহ্র বান্দা আর আল্লাহ্র রাসূল (স) সকল মানুষকেই ভালবাসার শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
যায়েদ ছিল প্রিয় নবী (স)-এর ভৃত্য। আমরা চাকর-বাকরদের যেমন ঘৃণার চোখে দেখি, তিনি কখনো তাদেরকে সেরূপ চোখে দেখতেন না। তিনি নিজের কাজ সব নিজেই করতেন। কাপড় ধোয়া, ঘর ঝাড় দেয়া, জুতা পরিস্কার করা, কাপড় সেলাই করা থেকে শুরু করে বড় বড় কাজ পর্যন্ত সবকিছুই তিনি নিজের হাতে করতেই পছন্দ করতেন। ভৃত্যকে তিনি কখনো চাকরের মত মনে করতেন না, তাকেও নিজের একজন ভাইয়ের মতই দেখতেন। কোন কোন সময় তিনি তাঁর ভৃত্যের সেবা যত্ন গ্রহণ করতেন। বিনিময়ে আবার তারও সেবা-যত্ন করতেন নিজ হাতে। কেননা, চাকরের সেবা-যত্ন পাওয়ার অধিকার যেমনি মনিবের রয়েছে, মানুষ হিসেবে চাকরের আবার তেমনই সেবাযত্ন পাওয়ার অধিকার আছে। বিদায় হজ্বের বাণীতে তিনি ঘোষণা করেছেন: "তোমরা যা খাবে, যা পরবে, তোমাদের দাস-দাসীকেও ঠিক তাই খেতে দেবে এবং তাই পরতে দেবে।"
মহানবী (স) তাঁর ভৃত্যের প্রতি কিরূপ ব্যবহার করতেন, তা তারই মুখ থেকে শোনা যাক। যায়েদ বলেছেন: আল্লাহ্র কসম, আমি মহানবী (স)-এর যতটুকু সেবা করেছি, মহানবী (স) আমার সেবা করেছেন এরও অধিক। দশ বছর কাল আমি তাঁর গোলাম ছিলাম। এ সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে একটি বারও তিনি আমার উপর রাগ করেন নাই এবং আমার কোন কাজে অসন্তোষও প্রকাশ করেন নাই।
কত মহৎ এবং উদার ছিলেন তিনি। চাকর বাকর এবং অন্য মানুষের প্রতি কিরূপ আচরণ করতে হবে এ থেকেই আমরা তাঁর শিক্ষা পেতে পারি।
খন্দকের যুদ্ধের সময়কার ঘটনা। মহানবী (স) খবর পেলেন, মক্কার কাফেরগণ বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে মদীনা আক্রমণ করতে আসছে। মহানবী (স) চিন্তিত হলেন। সকল মুসলমানকে নিয়ে তিনি আলোচনায় বসলেন। যুবকেরা সবাই অগ্রসর হয়ে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু যাঁরা বয়স্ক, তাঁরা মদীনায় থেকে চারদিকে পরিখা খনন করে শত্রুদের আক্রমণ প্রতিহত করার পরামর্শ দিলেন। মহানবী (স) তাঁদের কথাই মেনে নিলেন।
পরিখা খনন করার কাজ শুরু হল। মুসলমানরা প্রতি দশজনের এক একটি দলে বিভক্ত হয়ে মাটি কাটতে লাগলেন। হযরত বেলাল (রা)-এর দলে ছিল নয় ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁর কাছে গিয়ে বললেন : বেলাল, তোমার দলে কজন? হযরত বেলাল (রা) বললেন, নয় জন।
মহানবী (স) বললেন, আমাকে তোমাদের দশম ব্যক্তি করে নাও! হযরত বেলাল অসম্মতি জানালেন। না, তা কি করে হয়? মহানবী (স) মাটি কাটবেন এটা কি কখনো হতে পারে? কিন্তু মহানবী (স) নাছোড়বান্দা। তিনি কেবল মাটি কাটবেন না, মাটি বয়েও নেবেন। অগত্যা হযরত বেলাল (রা) তাঁকে দলে নিয়ে এক টুকরি মাটি তাঁর মাথায় তুলে দিলেন। মহানবী (স) বললেন : আরেক টুকরি দাও। হযরত বেলাল (রা) বললেন-তা কেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, সবাইতো এক টুকরি করে নিচ্ছে, আপনি কেন দুই টুকরি নেবেন?
মহানবী (স) বললেন, আমি তোমাদের মতই মানুষ, তাই এক টুকরি নিয়েছি, কিন্তু আমার উপরে নবুওয়তের দায়িত্ব রয়েছে, সে জন্য আমাকে অতিরিক্ত আর এক টুকরি নিতে হবে।
হযরত বেলাল (রা) আর কি করবেন! অতিরিক্ত আর এক টুকরি মাটি রাসূলুল্লাহ (স) মাথায় তুলে দিলেন। এক সাথে দুই টুকরি মাটি মাথায় নিয়ে হেঁটে চলেছেন মহানবী (স)।
দুনিয়ায় এমন দৃষ্টান্ত কোথাও লক্ষ্য করেছ? আমাদের প্রিয়নবী (স) অহংকার আর পদমর্যাদা কাকে বলে জানতেন না। অহংকার আর পর্দমযাদা মূলে কুঠারাঘাত করে জগতে সমান মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার উজ্জ্বল নিদর্শন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তিনি। এমন কি, নবী হিসেবেও তিনি কোন অতিরিক্ত মর্যাদা দাবী করেন নাই বরং নবী হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। এমন মহৎ আর তুলনাহীন চরিত্রের মানুষকে কে না শ্রদ্ধা করবে বল?

📘 হাদিসের গল্প > 📄 মহানুভবতা

📄 মহানুভবতা


"(আর) যারা আপন প্রতিশ্রুতি পূর্ণকারী হয় (যখন প্রতিজ্ঞা করে, আর যারা ধীরস্থির থাকে অভাব-অভিযোগে, অসুখে-বিসুখে এবং ধর্মযুদ্ধে, তারাই সত্যিকারের মানুষ এবং তারাই সত্যিকারের ধর্মভীরু।"
-(আল কুরআন) তাই যে মুসলমান আল্লাহ্ পথে চলে, যে আল্লাহকে ভয় করে আর সত্যিকারের মানুষের মত সুন্দর ও পবিত্র জীবন যাপন করতে চায়, সে সব সময়ই তার প্রতিশ্রুতি, তার ওয়াদা পূর্ণ করে। কথা দিয়ে কথা না রাখা হচ্ছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। পরম দয়ালু আল্লাহ্ তা'আলা কোনদিনও এটা পছন্দ করেন না। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (স) তাই জীবনে কোন দিনও নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হননি, কোন ও দিন তিনি ওয়াদার খেলাফ করেনি। শত দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা ও অত্যাচারের মাঝেও কোনদিন নিজের ওয়াদা, নিজের প্রতিশ্রুতি কথা ভোল নি, কথা যখন দিয়েছেন তখন সে কথা অনুযায়ীই কাজ করেছেন। তাঁর প্রতিশ্রুতির একচুলও নড়চড় হয়নি।
৬৩০ খৃষ্টাব্দের ঘটনা। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (স) তখনও জীবিত। তাঁর পবিত্র বাণী শোনার জন্য তখন মদীনায় রোজই অসংখ্য লোকের সমাগম হত। শত সহস্র লোক রোজই তাঁকে দেখতে আসে, তাঁর পবিত্র বাণী শোনার জন্য ধীরস্থিরভাবে অপেক্ষা করে আর শ্রোতাদের মধ্য থেকে অগণিত ব্যক্তি প্রায় রোজই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
মোজায়না বলে তখন আরব জাতির মধ্যে একটি গোত্র ছিল। তাঁদের অনেকেই মুসলমান হয়ে গেছিলেন। কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক লোক তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। অমুসলিমদের মধ্যে কাব ইবনে যুহাইর নামে একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন। কিন্তু কবিতা লেখার এ সুন্দর প্রতিভা তিনি বিশেষ কোন ভাল কাজে লাগাতেন না বরং মুসলমানদের হেয় করার জন্য এবং ইসলাম ধর্মকে অপমান করার জন্য, তুচ্ছ করার জন্য তিনি তার প্রতিভাকে ব্যবহার করতেন। স্বভাবতই মুসলমানদের সংখ্যা যখন প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেল, সমগ্র আরবে যখন ছড়িয়ে পড়ল ইসলামের পবিত্র আলো, সমগ্র আরব যখন মেনে নিল ইসলামের মাহাত্ম্য ও আধিপত্য, তখন ইসলামের এ শত্রুদের ঘৃণ্য প্রচার, অশ্লীল কবিতা রচনা সম্পূর্ণরূপেই বন্ধ করে দেয়া হল। ফলে কা'বও বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিলেন ইসলামবিরোধী কবিতা রচনা এবং যদিও মুসলমানেরা বিধর্মীদের ওপর কোনদিনও কোন অত্যাচার করেনি, তবুও কবি কিন্তু তাঁর অতীতের ঘৃণিত ইসলাম বিরোধী প্রচারের জন্য ভয়ে আত্মগোপন করে থাকতে লাগলেন।
কাবের ভাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কা'বকে বারবার অনুরোধ করতে লাগলেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে, আল্লাহ্র পথে এগিয়ে আসার জন্য। ভাইয়ের পুনঃ-পুনঃ অনুরোধ শুনে কাব একদিন রাসূল (স)-এর সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। দেখাই যাক না কেন লোকে তাঁর কথা শোনে, কেন এত শ্রদ্ধা করে, কেন এত সুনাম তাঁর! সকলের অজান্তে একদিন অত্যন্ত গোপনে কা'ব পবিত্র মদীনায় ঢুকে পড়লেন এবং হযরত মুহাম্মদ (স) যে মসজিদে ওয়াজ করতেন সরাসরি সেখানে পৌঁছে গেলেন। অজস্র লোক তখন শৃঙ্খলার সাথে নিঃশব্দে ধীরস্থিরভাবে রাসূল (স)-এর অমর বাণী শুনে যাচ্ছে। রাসূল (স)-এর মত দিব্যকান্তি জ্যোর্তিময় পুরুষকে ভিড়ের মাঝে খুঁজে বের করা কাবের পক্ষে মোটেই কষ্টকর হল না। ভিড় ঠেলে কাব সামনে এগিয়ে গেলেন এবং হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলেন, "হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি যদি আপনার সামনে মুসলমান হিসাবে বিধর্মী কা'বকে এখানে উপস্থিত করি, তাহলে আপনি কি তাঁকে ক্ষমা করবেন?"
রাসূল (স)-এর পবিত্র ও সুন্দর মুখে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। শান্তভাবে তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তাকে আমি ক্ষমা করব।” রাসূল (স)-এর এ মহানুভবতা দেখে আনন্দে, বিস্ময়ে, ভক্তি ও শ্রদ্ধায় অভিভূত কা'ব পুনরায় চীৎকার করে বললেন, "আমি হচ্ছি জুহরের পুত্র কা'ব, আপনার সামনে আজ দাঁড়িয়ে আছি।” শ্রোতাদের মধ্য থেকে বেশ কয়েক জন উগ্র ব্যক্তি চীৎকার করে উঠলেন এবং দাবী করলে কা'বকে যেন অবিলম্বে হত্যা করা হয় তাঁর ঘৃণিত ও জঘন্য ইসলামবিরোধী কবিতার জন্য। কিন্তু আল্লাহ্ রাসূলের মুখে ফুটে উঠল সে একটি স্নিগ্ধ ও পবিত্র হাসি, দয়া ও ক্ষমার এক অপূর্ব জ্যোতিতে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আগের মতই ধীরস্থিরভাবে তিনি স্নেহমাখা সুরে বললেন, 'না আমি তাকে ক্ষমা করেছি। মুসলমান কোনদিনও তার ওয়াদার খেলাপ করে না।" ভক্তি ও শ্রদ্ধায় কা'ব অভিভূত হয়ে পড়লেন এবং সবিনয়ে একটি "কাসিদা” (এক ধরনের কবিতা) পড়ার অনুমতি চাইলেন।
রাসূল (স)-এর অনুমতি পেয়ে অন্তরের সমস্ত ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা উজাড় করে দিয়ে কাব সেদিন যে কাসিদাটি পড়ে শোনালেন তা ছন্দমাধুর্য, ভাব-ঐশ্বর্য ও শব্দ চয়নের জন্য আরবী সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা বলে আজও বিবেচিত হয়। কবির সুললিত কণ্ঠস্বর ও ছন্দ-মাধুর্য রাসূল (স)-কে এতই মুগ্ধ ও অভিভূত করল যে পুরস্কার হিসাবে তাঁর নিজের পবিত্র "খিরকা” (সেকালের আরবেরা ঢোলা যে পোশাক পরতেন) খুলে তিনি কবিকে উপহার দিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00