📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর পার্থক্য

📄 হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর পার্থক্য


শায়খ মুহাম্মদ আল-ফারুকী হাদীসকে দু'ভাগে ভাগ করেছেন। তিনি লিখেছেন - "হাদীসে কুদসী তাই, যা নবী করীম (সাঃ) তার আল্লাহ তা'আলার তরফ হতে বর্ণনা করেন। আর যা সেরূপ করেন না, তা হাদীসে নব্বী।" 253
নিম্নে হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নব্বীর পার্থক্যগুলো আলোচনা করা হলোঃ-
১. হাদীসে কুদসী আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট ওহীঃ স্পষ্ট ওহী, যেমন জিবরীলের মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদীস; অস্পষ্ট ওহী, যেমন ঘুম বা প্রত্যাদেশ যোগে প্রাপ্ত হাদীস।
পক্ষান্তরে হাদীসে নববী কতক ওহী ও কতক নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইজতিহাদ, তার ইজতিহাদ ওহী। কারণ, তার ইজতিহাদ ভুল হলে আল্লাহ সংশোধন করে দেন, ভুলের উপর তাকে স্থির রাখেন না।
২. হাদীসে কুদসী নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে বলেন, কিন্তু হাদীসে নববী তিনি নিজের পক্ষ থেকে সরাসরি বলেন।
৩. হাদীসে কুদসীতে সাধারণত আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা, গুণগান, কুদরত, রহমত, মাগফেরাত, জান্নাত, জাহান্নাম, ইবাদতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি ও পাপ থেকে সতর্ককারী বিষয়ের আধিক্য থাকে।
পক্ষান্তরে হাদীসে নববীতে অধিকহারে মুসলিমের দীনি ও দুনিয়াবি বিষয়ের বর্ণনা থাকে। (হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা – ১৩২) ২৫৪।

টিকাঃ
253 হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, পৃঃ ৩৬
২৫৪ হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা - ১৩২

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীসে কুদসীর উপর লিখিত গ্রন্থসমূহ

📄 হাদীসে কুদসীর উপর লিখিত গ্রন্থসমূহ


হাদীসে কুদসীর উপর কতক লিখিত গ্রন্থসমূহের উদাহরন নিম্নে দেওয়া হলোঃ-
১. আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইব্‌ন আলি ইব্‌ন আল-আরাবী আত-ত্বায়ি (মৃ.৬৩৮হি.), তাঁর রচিত গ্রন্থের নামঃ
مشكاة الأنوار فيما روي عن الله سبحانه من الأخبار
২. আল্লামা নুরুদ্দীন আলী ইব্‌ন মুহাম্মদ ইব্‌ন সুলতান (মৃঃ ১০১৪ হিঃ), যিনি 'মোল্লা আলী আল-কারী' নামে প্রসিদ্ধ, তিনি হাদীসের ছয় কিতাব থেকে চল্লিশটি হাদীসে কুদসী একসাথে জমা করেছেন এবং প্রত্যেক হাদীসের সূত্র উল্লেখ করেছেন। তাঁর রচিত কিতাবের নামঃ
الأحاديث القدسية الأربعينية
৩. শায়খ মুহাম্মদ ইবন সালেহ আল-মাদানী (মৃতঃ ১২০০হিঃ) হাদীসে কুদসীর উপর সর্ববৃহৎ কিতাব লিখেন, তার কিতাবের নামঃ
الإتحافات السنية في الأحاديث القدسية
এতে তিনি (৮৬৪) টি হাদীসে কুদসী জমা করেন, যার অধিকাংশ তিনি ইমাম সূয়ূতি রচিত جمع الجوامع গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছেন।
لجنة القرآن الكريم والحديث بالمجلس الأعلى للشؤون الإسلامية بمصر কর্তৃক নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে একদল লেখক হাদীসের ছয় কিতাব ও মুয়াত্তা ইমাম মালিক থেকে (৪০০) টি হাদীসে কুদসী বাছাই করেন, তাতে টিকা সংযোজন করেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা যুক্ত করেন, তাদের রচিত কিতাবের নাম: الأحاديث القدسية
৫. শায়খ মুস্তফা আদাবী (১৮৫)টি সহি ও হাসান হাদীসে কুদসী জমা করেন, তার কিতাবের নাম: الصحيح المسند من الأحاديث القدسية (তথ্যসূত্রঃ হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা নং – ১৩৯) 255।
হাদীসে কুদসীর হুকুমঃ হাদীসে কুদসী হাদীসে নববীর ন্যায় সহী, হাসান ও দুর্বল বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়। অতএব হাদীসে কুদসী বলা কিংবা তার উপর আমল করার পূর্বে শুদ্ধাশুদ্ধ যাচাই করা জরুরি। (তথ্যসূত্রঃ ঐ)।

টিকাঃ
255 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা নং- ১৩৯

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীস বর্ণনায় সতর্কতা অবলম্বন

📄 হাদীস বর্ণনায় সতর্কতা অবলম্বন


হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নির্দোষ রাবীর হাদীস গ্রহণ করতে হবে। পক্ষান্তরে যে রাবী দোষী সাব্যস্ত হবে, তার বর্ণিত হাদীস প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
আল্লাহ বলেনঃ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوْا “হে ঈমানদারগণ! তোমাদেরকে কোন ফাসেক ব্যক্তি কোন খবর দিলে তা যাচাই কর।” (সূরা হুজুরাত-৬)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
) مَنْ حَدَّثَ عَنِّي بِحَدِيْثٍ يَرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبِينَ ) “যে ব্যক্তি আমার থেকে এমন হাদীস বর্ণনা করে যে, তার ধারণা হয় ওটা মিথ্যাও হতে পারে, তবে সে অন্যতম সেরা মিথ্যুক। (মুসলিম)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেনঃ
) كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِباً أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ ) “একজন ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই (পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে) বলে বেড়াবে।” (মুক্বাদ্দামা মুসলিম)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেনঃ
( مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَالْيَتَبَوَّعْ مَقْعَدَهُ مِنْ النَّارِ )
"যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার উপরে মিথ্যা রোপ করে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।” (বুখারী ও মুসলিম)।
উল্লেখিত আয়াত ও হাদীসগুলি দ্বারা এটাই প্রতিভাত হয় যে, হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং ঢালাওভাবে হাদীস বর্ণনা করা যাবে না। বরং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে হাদীসটি সত্যিকার অর্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস কি-না। যে ব্যক্তি শোনামাত্রই বর্ণনা করে সে অন্যতম সেরা মিথ্যুক এবং জেনে বুঝে মিথ্যা রোপ করলে তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম, এ বাক্যগুলো থেকে হাদীসের সহীহ-যঈফ যাচাই কতটুক আবশ্যক তা সহজেই অনুমেয় 256।

হাদীস বর্ণনায় সাহাবীদের সাবধানতার কয়েকটি নমুনা: রাসূল (সাঃ) এর কাছ থেকে এমন দিক-নির্দেশনা পেয়ে হাদীস বর্ণনায় সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করতেন। এ রকম সাবধানতা বিশ্ববাসী অন্য কোন জ্ঞানের ক্ষেত্রে আদৌ দেখেনি। একটা হাদীস মুখ দিয়ে বের করাকে তারা অত্যন্ত কঠিন মনে করতেন। হাদীস বর্ণনার সময় তারা ভয়ে থর থর করে কাঁপতেন; না জানি কোন ভুল করে ফেলেন, কোন কথা বৃদ্ধি করে ফেলেন; শেষে তার পরিণতি হবে জাহান্নাম। সেজন্য সাহাবাদের অনেকে রাসূলের (সাঃ) দীর্ঘ সময়ের সঙ্গী হওয়ার পরও খুব কম সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন।
যেমন- আবু বকর (রাঃ); অথচ সাহাবীদের মধ্যে তিনি রাসূল (সাঃ) কে সবচেয়ে বেশী সঙ্গ দিয়েছেন। আর যেসব সাহাবী হাদীস বর্ণনা করতেন তারা ঠিক যতটুকু শুনেছেন এবং তার যতটুকু মনে রাখতে পেরেছেন হুবহু ততটুকু বর্ণনা করতেন।
তারা নির্ভুলভাবে মনে রাখতে পেরেছেন এবং হুবহু বর্ণনা করেছেন এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকার পরও বর্ণনা শেষে বলতেন- 'অথবা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যেভাবে বলেছেন ঠিক ঐভাবে।' অথবা এই জাতীয় কোন বাক্য। নিম্নে সাহাবীদের হাদীসের ক্ষেত্রে তাদের সাবধানতা সংক্রান্ত কিছু বাণী তুলে ধরলাম।
১. ইবনে সিরীন বলেন, "আনাস (রাঃ) খুব কম হাদীস বর্ণনা করতেন। আর যখনি হাদীস বর্ণনা করতেন বর্ণনা শেষে বলতেন, "অথবা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যেভাবে বলেছেন ঠিক ঐভাবে।" [ইবনে মাজাহর ভূমিকা ১/১১, নং ২৪] প্রচণ্ড ভয় ও সাবধানতা রক্ষার্থে তিনি এ কথা বলতেন।
২. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, "যদি ভুল হওয়ার আশংকা না করতাম তবে তোমাদেরকে এমন কিছু বিষয় জানাতাম যা আমি রাসূলের (সাঃ) কাছ থেকে শুনেছি অথবা তিনি বলেছেন। কিন্তু কিভাবে বলি আমি তো তাঁর মুখে শুনেছি, "যে ইচ্ছা করে আমার নামে মিথ্যা বলে সে যেন তার স্থান জাহান্নামে ঠিক করে নেয়।" [সুনানু দারেমী, ১/৬৭]
৩. শা'বী ও ইবনে সিরীন থেকে বর্ণিত: ইবনে মাসউদ (রাঃ) যখন হাদীস বর্ণনা করতেন তখন তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেত। তিনি বলতেন, "ঠিক এভাবে অথবা অনুরূপ", ঠিক এভাবে অথবা অনুরূপ"। (অর্থ্যাৎ তিনি ভয়ে একথা বলতেন।) [সুনানু দারেমী, ১/৭২]
৪. শা'বী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: "আমি ইবনে উমারের সাথে এক বছর উঠা-বসা করেছি। এ সময়ে আমি তার কাছ থেকে একটি হাদীসে রাসূল (সাঃ) ও শুনিনি।"[ ইবনে মাজাহর ভূমিকা, ১/১১, নং২৬]
৫. আব্দুর রহমান বিন আবী লাইলা বলেন: " আমি রাসূলের (সাঃ) আনসারী সাহাবীদের মধ্যে ১২০ জনের সাক্ষাত পেয়েছি। তাদের যে কেউ যখনি কোন হাদীস বলতেন তখন কামনা করতেন যদি তার বদলে তার অন্য কোন সাথী হাদীসটা বলে দিতেন। তাদের কাউকে যখন কোন ফতুয়া জিজ্ঞেস করা হত তখন তিনি কামনা করতেন যদি তার বদলে তার অন্য কোন সাথী ফতুয়াটা দিতেন।" অন্য এক বর্ণনায় এসেছে- "তাদের কাউকে যখন কোন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করা হতো তখন তিনি অন্য কারো কাছে পাঠাতেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি আবার অন্যজনের কাছে পাঠাতেন। এভাবে প্রশ্নকারী আবার প্রথম ব্যক্তির কাছে ফিরে আসতেন।"[ ইবনে আব্দুল বারের "জামে বায়ানুল ইলম ওয়া ফাদলিহি" ২/১৬৩] সাহাবারা প্রশ্নকারীকে কষ্ট দেয়ার জন্য তা করতেন না। বরং ভুল ফতুয়া দিয়ে জাহান্নামবাসী হন কিনা এই ভয়ে তারা তা করতেন।
৬. আব্দুর রহমান বিন আবি লাইলা থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ "আমরা যায়েদ বিন আরকামকে বললাম, আমাদেরকে হাদীসে রাসূল (সাঃ) শুনান। তিনি বললেন, আমাদের বয়স ভারী হয়েছে। আমরা ভুলে গেছি। আর রাসূল (সাঃ) এর হাদীস বর্ণনা করা বড় কঠিন কাজ।" [ইবনে মাজাহর ভূমিকা, হাদীসে রাসূল (সাঃ) বর্ণনা থেকে বিরত থাকা শীর্ষক অধ্যায়]।
এই সমুদয় বাণী পড়ে আমরা উপলব্ধি করতে পারলাম- সাহাবীরা রাসূলের (সাঃ) হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কি পরিমান সতর্কতা অবলম্বন করতেন। সাহাবীরা রাসূলের (সাঃ) নামে কথা বলতেই ভয় করতেন থাকতো তাঁর নামে মিথ্যা বলবেন বা রাসূলের বাণীকে ওলট-পালট করবেন। কিভাবেই বা এহেন কাজ করবেন অথচ তারা ছিলেন সোনার মানুষ যাদের উপর স্বয়ং আল্লাহ পাক সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন। "মুমিনরা যখন বৃক্ষতলে তোমার নিকট বায়আত গ্রহন করলো তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন..." [সূরা ফাতহ ৪৮:১৮] "আর যেসব মুহাজির ও আনসার (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী এবং প্রথম, আর যেসব লোক সরল অন্তরে তাদের অনুগামী, আল্লাহ তাদের প্রতি রাজি হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি রাজি হয়েছেন। আর আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যানসমূহ প্রস্তুত করে রেখেছেন যার তলদেশে নহরসমূহ বইতে থাকবে, যার মধ্যে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, তা হচ্ছে বিরাট কৃতকার্যতা।" [সূরা তওবা ৯:১০০]
প্রত্যেক সাহাবী নিজস্ব অনুভূতিতে এত সাবধানী হওয়ার পরও কোন সাহাবী যখন কোন হাদীস বর্ণনা করতেন তখন প্রয়োজন অনুভব করলে শ্রোতা সাহাবীরা তার কাছ থেকে অন্য কোন সাহাবীর সমর্থন তলব করতেন। যেন অজান্তে, অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও কোন ভুল কথা প্রচার লাভ না করে এবং বর্ণনাকারীরা যেন আরো বেশী সাবধানী হন। যেমনটি ঘটেছে মুগীরা বিন শু'বার সাথে আবু বকরের (রাঃ)। হযরত ক্বাবিসা বিন যুওয়াইব বলেন, জনৈক (মৃতের) দাদী এসে আবু বকর (রাঃ) এর কাছে দাবী জানালেন তার নাতির উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে তার প্রাপ্য হক আদায় করে দেওয়ার জন্য। তখন আবু বকর (রাঃ) বললেন: আমি তো আল্লাহর কিতাবে ও রাসূলের সুন্নাহ তে দাদীর জন্য কোন অংশ দেখি না। আচ্ছা এখন যাও, আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করব। তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেন। তখন মুগীরা বিন শু'বা বললেন, আমার উপস্থিতিতে রাসূল (সাঃ) জনৈক দাদীকে এক ষষ্ঠাংশ দিয়েছিলেন। তখন আবু বকর (রাঃ) বললেন, তোমার পক্ষে কি আর কারো সমর্থন আছে? তখন মুহাম্মদ বিন মাসলামা দাঁড়িয়ে মুগীর বিন শু'বার অনুরূপ কথা ব্যক্ত করলেন। তখন আবু বকর (রাঃ) দাদীকে তার হক বন্টন করে দিলেন। [সুনানু তিরমিজী, দাদীর উত্তরাধিকারের ব্যাপারে যা এসেছে শীর্ষক অধ্যায়, নং২২৪৭; আবু দাউদ, দাদীর উত্তরাধিকার শীর্ষক অধ্যায়, ২৮৯৪।] এখানে বলে রাখা ভাল আবু বকর (রাঃ) শু'বা (রাঃ) মিথ্যা বলেছেন এ রকম কোন আশংকার কারণে সাক্ষ্য তলব করেননি, বরং সাক্ষ্য তলব করেছেন অধিক সাবধানতা অবলম্বনে। কারণ অন্য বর্ণনায় এসেছে সাহাবীরা একে অপরকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করতেন না। যেহেতু তারা মিথ্যা বলতেন না। এ ধরনের সাক্ষ্য তলবের ঘটনা উমর (রাঃ) এর সাথেও ঘটেছে। হযরত আবু মুসা আশআরী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: একবার উমরের (রাঃ) বাড়িতে গিয়ে আমি তিনবার অনুমতি চাইলাম। কোন উত্তর না পেয়ে আমি ফিরে আসলাম। এরপর উমর (রাঃ) আমার জন্য লোক পাঠালেন। (আমি তার সাথে দেখা করার পর) তিনি বললেন, হে আব্দুল্লাহ, আমার দরজাতে খানিক ক্ষণ দাঁড়ানোটাকে যদি তুমি কষ্ট মনে কর, তবে জেনে রাখো তোমার দরজাতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটাকেও মানুষ কষ্টকর মনে করবে।
আমি বললাম: কেন আমি তো তিনবার অনুমতি চাইলাম। অনুমতি না পেয়ে চলে আসলাম। (আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) পক্ষ থেকে তো) আমাদেরকে এই আদেশ দেয়া হত। তিনি বললেন (উমর রাঃ) তুমি এ কথা কার কাছে শুনেছ? আমি বললাম, নবী করিম (সাঃ) এর কাছে। তিনি বললেন, আমরা যে কথা শুনি নাই সে কথা তুমি শুনলে কোথা থেকে। তোমাকে অবশ্যই সাক্ষী আনতে হবে, না হয় আমি তোমাকে শান্তি দিব। আমি সেখান থেকে বের হয়ে মসজিদে সমবেত আনসারদের একটা দলের কাছে আসলাম। এবং তাদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তারা বলল: কেন, কেউ কি এ ব্যাপারে সন্দেহ করে। তখন উমর (রাঃ) যা বললেন আমি তাদেরকে তা জানালাম। তারা বললেন আমাদের একবারে ছোট্ট মানুষটি তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। তখন আবু সাঈদ খুদরী অথবা আবু মাসউদ আমার সাথে উমরের (রাঃ) কাছে গিয়ে বললেন: একবার রাসূল (সাঃ) সাদ বিন উবাদার উদ্দেশ্যে বের হলেন। তখন আমি তার সাথে ছিলাম। নবীজি তার বাড়ীতে পৌঁছে সালাম দিলেন, কোন জবাব আসল না। দ্বিতীয়বার আবার সালাম দিলেন কোন জবাব এল না। তৃতীয়বার আবার সালাম দিলেন। কোন জবাব আসল না। এরপর তিনি বললেন আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। এই বলে তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে সাদ এসে হাজির। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমি আপনার প্রতিটি সালাম শুনেছি এবং জবাব দিয়েছি। আমার কাছে ভাল লাগছিল আপনি আমাকে ও আমার পরিবারকে আরো সালাম দিতে থাকুন। তখন আবু মুসা (রাঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলের হাদীসের ব্যাপারে আমি সত্যবাদী ছিলাম। তখন উমর (রাঃ) বললেন, অবশ্যই। কিন্তু আমি চূড়ান্ত নিশ্চিয়তা পেতে চেয়েছি।"
আবার কখনো কখনো বর্ণনাকারী সাহাবীর মুখস্ত শক্তি ঠিক আছে কিনা তা পরখ করে দেখার জন্য সাহাবীরা দুটি ভিন্ন সময়ে একই হাদীস তার কাছ থেকে জানতে চাইতেন। তিনি যদি উভয় সময়ে ঠিক একইভাবে হাদীসটা বর্ণনা করেন তখন প্রমাণিত হত যে হাদীসটা তার মুখস্ত আছে। যেমন আয়েশা (রাঃ) আব্দুল্লাহ বিন আমরের সাথে করেছিলেন। হযরত উরউয়া বিন যুবাইর থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আয়েশা (রাঃ) বললেন; ভাগিনা, শুনেছি আব্দুল্লাহ বিন আমর আমাদের পথ দিয়ে হজ্জে যাচ্ছে। তার সাথে সাক্ষাত কর এবং তাকে হাদীস জিজ্ঞেস কর। কারণ তার কাছে নবুয়তী জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার আছে। উরউয়া বলেন, আমি তার সাথে সাক্ষাত করে তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলাম। তিনি রাসূল (সাঃ) থেকে অনেক কিছু বর্ণনা করলেন। এর মধ্যে একটা হাদীস এরকম বর্ণনা করেন যে, "আল্লাহ পাক সরাসরি ইলম উঠিয়ে নিবেন না। কিন্তু আলেমদের উঠিয়ে নিবেন। আলেমের মৃত্যুর সাথে ইলমেরও মৃত্যু হবে। এরপর কতগুলো মুর্খ সর্দার বেঁচে থাকবে, তারা ইলম ছাড়া ফতোয়া দিবে। এভাবে নিজেও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।" উরউয়া বলেন আমি যখন হাদীসটি আয়েশা (রাঃ) কে শুনালাম তিনি হাদীসটিকে বড় কঠিন মনে করলেন এবং মেনে নিতে পারছিলেন না। এমনকি (আমাকে) বললেন, তিনি (আব্দুল্লাহ বিন আমর) কি তোমাকে একথা বলেছেন যে, তিনি এ কথা রাসূল (সাঃ) থেকে শুনেছেন। পরের বছর যখন হজ্জের মওসুম এল তখন আয়েশা (রাঃ) উরউয়াকে বললেন: আব্দুল্লাহ বিন আমর তাশরীফ এনেছেন। তুমি তার সাথে সাক্ষাত করে আলাপ-সালাপ কর। আর এক ফাঁকে তাকে ইলম সংক্রান্ত ঐ হাদীসটির কথা জিজ্ঞেস করে নিও। (উরউয়া বলেন) আমি তার সাথে সাক্ষাত করলাম এবং হাদীসটি জিজ্ঞেস করলাম। তিনি প্রথমবার যেভাবে বর্ণনা করেছিলেন ঠিক সেভাবে বর্ণনা করলেন। উরউয়া বলেন, যখন আমি আয়েশা (রাঃ) কে তা জানালাম তখন তিনি বললেন: 'আমি মনে করি তিনি সত্য বলেছেন। দেখা যাচ্ছে তিনি (ইবনে আমর) একটুও কম-বেশী করেননি 257।
এভাবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরাম হাদীস গ্রহন করতেন। যদিও সাহাবীদের মধ্যে এমন একজনও ছিলেন না যিনি হাদীসকে বিকৃত করার দুঃসাহস দেখাবেন। তারপরেও অধিক সতর্কতা অবলম্বনে তারা তা করতেন।
এছাড়াও সাহাবীদের মধ্যে যারা হাদীস যাচাই-বাছাইয়ে খ্যাতি লাভ করেছেন তারা হলেন- হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমর (রাঃ), আলী বিন আবী তালেব (রাঃ), আনাস বিন মালেক (রাঃ), যায়েদ বিন ছাবেত (রাঃ) ও আয়েশা (রাঃ) প্রমুখ।

টিকাঃ
256 যঈফ ও জাল হাদীস এবং মুসলিম সমাজে তার কুপ্রভাব, সংকলন: আখতারুল আমান, জুবাইল দাওয়া এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, পো: ১৫৮০ সউদী আরব।
257 সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৬৮৭৭ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৯৭৪

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 সাহাবীদের পর থেকে হাদীস প্রচারিত হওয়া পর্যন্ত সময়ে হাদীস গ্রহণে আলেমদের সাবধানতা

📄 সাহাবীদের পর থেকে হাদীস প্রচারিত হওয়া পর্যন্ত সময়ে হাদীস গ্রহণে আলেমদের সাবধানতা


সাহাবায়ে কেরামের প্রজন্ম ছিল উম্মতের সবচেয়ে উত্তম প্রজন্ম। দ্বীনদারী ও পরহেজগারী ছিল তাদের সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু ইসলামের বিজয় অভিযানের সাথে সাথে বিজিত অঞ্চলের লোকেরা ইসলামে প্রবেশ শুরু করল। তাদের মধ্যে এমন লোকও ইসলাম গ্রহন করল যাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেকে মুসলিম হিসেবে জাহির করে ইসলামের ক্ষতি করা। যেমনটি করেছিল অগ্নি উপাসক "আব্দুলাহ বিন সাবা" ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা। এ শ্রেণীর লোকেরা তাদের অশুভ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কিছু কিছু বানোয়াট বাণী রাসূল (সাঃ) এর নামে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল। আর এই ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করার জন্য মুহাদ্দিসরা এক নতুন অস্ত্র গ্রহন করলেন। যখনি কোন ব্যক্তি বলত, রাসূল (সাঃ) হাদীসে এ কথা বলেছেন, সঙ্গে সঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করা হত তুমি কার কাছ থেকে শুনেছ। যদি সে কোন বর্ণনাসূত্র উল্লেখ করতে পারত এবং তার উল্লেখিত বর্ণনাকারীরা সত্যবাদী, দ্বীনদার ও সুন্নতের অনুসারী হতো তাহলে তার হাদীস গ্রহন করা হত। আর যদি তাকে বর্ণনাকারীরা মিথ্যাবাদী হত অথবা বিদআতী হত তখন তার হাদীস প্রত্যাখান করা হত। মুহাম্মদ ইবনে সিরীন বলেন, "সনদ হচ্ছে দ্বীনকে রক্ষাকারী। যদি সনদ জিজ্ঞেস করা না হত তাহলে যার যা ইচ্ছা সে ওটাকে দ্বীন বলে চালিয়ে দিত।" [সহীহ মুসলিমের ভূমিকা, ১/১৫]
অন্যদিকে সময়ের ব্যবধানে রাসূল (সাঃ) ও পরবর্তীতে আগত মুহাদ্দিসদের মাঝখানে সেতু স্থাপনকারী রাবীদের (বর্ণনাকারী) সংখ্যা বেড়ে গেল। আর মানুষ মাত্রই সকলের মুখস্ত শক্তি সমান নয়। বরং কারো কারো মুখস্ত শক্তি অত্যন্ত দূর্বল। সেজন্য হাদীসের সাথে সনদ উল্লেখ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যেন সংশ্লিষ্ট রাবীদের (বর্ণনাকারীদের) গুণাগুণ বিশ্লেষণ করা যায়। তারা কি দ্বীনদার, না দ্বীনদার নয়। তাদের মুখস্ত শক্তি কি মজবুত, না দূর্বল। এ কারণে ওসমান (রাঃ) নিহত হওয়ার পর থেকে সনদ ছাড়া কোন হাদীস গ্রহন করা হত না। যার ফলে মুহাদ্দিসদেরকে যেমন রাসূলের (সাঃ) বাণীটা মুখস্ত করতে হত ঠিক তেমনি বর্ণনাকারীদের নাম ও ক্রমধারা মুখস্ত করতে হত। বিশিষ্ট তাবেয়ী ইবনে সিরীন বলেন, "পূর্বে হাদীসের সনদ (বর্ণনাকারীদের সিলসিলা) জিজ্ঞেস করা হত না। আর যখন থেকে ফিতনা শুরু হল (ওসমান (রাঃ) হত্যার পর) তখন থেকে মুহাদ্দিসরা বলা শুরু করলেন, 'তোমাদের 'বর্ণনাকারীদের নাম বল।' তখন বর্ণনাকারীদের অবস্থা পর্যালোচনা করা হত যদি তারা সুন্নতের অনুসারী হতেন তাদের হাদীস গ্রহন করা হত। আর যদি তারা বিদআতী হতেন তখন তাদের হাদীস গ্রহন করা হত না।" [সহীহ মুসলিমের ভূমিকা, পৃষ্ঠা ১/১৫]
এভাবে হাদীসকে রক্ষা করার জন্য নতুন দুটি জ্ঞানের উদ্ভব হয়। একটিকে বলা হয় "ইলমুল রিজাল" (বর্ণনাকারীদের পরিচয় সংক্রান্ত) অন্যটিকে বলা হয় "আল জারহ ওয়াত তাদীল" (রাবীদের সমালোচনা বা তাদের গুণাবলী নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ)।
সনদ বলতে সেসব ব্যক্তিদের পরম্পরাকে বুঝানো হয় যাদের মাধ্যমে হাদীসটি রাসূল (সাঃ) থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী বর্ণনাকারীর কাছে এসে পৌঁছেছে।" হিজরী পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত, এমনকি এরপরেও হাদীসের যত মৌলিক গ্রন্থ রচিত হয় সবগুলোতে হাদীসের সাথে সনদ উল্লেখ করা হয়। কোন পাঠক হয়তো প্রশ্ন করবেন কোথায় আমরা তো অনুদিত সহীহ বোখারী ও সহীহ মুসলিম বা অন্য কোন হাদীসের গ্রন্থে বর্ণনাকারীদের কোন সিলসিলা দেখি না; শুধু সাহাবীর নাম দেখি। জবাব হল, আপনারা যদি আরবীতে মূল কিতাবগুলো দেখতেন তাতে সনদ দেখতেন পেতেন। যেমন আপনি যদি সহীহ বোখারীর মূল আরবী কিতাবে প্রথম হাদীসটা খোলেন, দেখতে পাবেন সেখানে লেখা আছে-
حَدَّثَنَا الْحُمَيْدِيُّ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الزُّبَيْرِ قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ الْأَنْصَارِيُّ قَالَ أَخْبَرَنِي مُحَمَّدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ التَّيْمِيُّ أَنَّهُ سَمِعَ عَلْقَمَةَ بْنَ وَقَاصِ اللَّيْثِيِّ يَقُولُ سَمِعْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ - رضي الله عنه - عَلَى الْمِنْبَرِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - يَقُولُ .......
অর্থঃ আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর আলহুমাইদী আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেনঃ সুফিয়ান আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল আনসারী আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: মুহাম্মদ বিন ইব্রাহীম তাইমী তাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি "আলকামা বিন ওক্কাছ লাইছিকে" বলতে শুনেছেন এবং তিনি (আলকামা) বলেন, আমি উমর (রাঃ) কে মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন: রাসূল (সাঃ) বলেছেন: "......" [সহীহ বুখারী, ১/৪]। কিন্তু বাংলা ও ইংরেজীতে অনুদিত অধিকাংশ গ্রন্থগুলোতে এ দীর্ঘ সনদ উল্লেখ করা হয়নি। শুধুমাত্র সাহাবীর নাম ও হাদীসের মূল কথাটা রাখা হয়েছে। যেন অনুদিত গ্রন্থের কলেবর বেড়ে না যায়। তার সাথে হয়তো প্রকাশকরা মনে করেন অনুবাদের পাঠকরা এ সনদ থেকে খুব বেশী উপকৃত হবেন না। কারণ অনুবাদের পাঠকের মূল উদ্দেশ্য থাকে রাসূলের বাণীটা জানা। আর যারা সনদ জানতে চায় তারা তো মূল কিতাব দেখতে পারেন। কিন্তু আমি মনে করি সনদ সহ অনুবাদ করাটাই শ্রেয় ছিল। যাতে অনুবাদের পাঠকরাও সনদের মাধ্যমে সুন্নাহকে হেফাযতের এ মহান বৈশিষ্ট্য জানতে পারতেন। যে বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র উম্মতে মুহাম্মদীর রয়েছে। অন্য কোন ধর্মাবলম্বীরা তাদের নবী পর্যন্ত তাদের ধর্ম গ্রন্থসমূহের একটা বর্ণনাসূত্রও বলতে পারবে না; যেখানে মুসলমানরা হাজার হাজার বর্ণনা সূত্র বলতে পারবে।
এভাবে "ইলমুল রিজাল" ও "জারহ ওয়া তাদীলের" এদুটি অস্ত্রকে ব্যবহার করে মুহাদ্দিসে কেরাম কোন বাণী কি "হাদীস", নাকি "হাদীস নয়" তা নির্ণয় করতে পারতেন। যখন কেউ বিশেষ কোন মুহাদ্দিসের কাছ থেকে কোন হাদীস বর্ণনা করতেন তখন রাবী বিশ্লেষকরা দেখতেন- এই ব্যক্তির জন্ম কবে এবং সে যার কাছ থেকে হাদীসটা বর্ণনা করছে তার মৃত্যু কবে।
যদি কোন অসামঞ্জস্যতা দেখতেন তখন প্রমাণ করে ফেলতেন যে এ ব্যক্তি আসলে হাদীসটা শুনেনি। অথবা কখনো দেখতেন এ ব্যক্তির অবস্থান কোথায় এবং সে কোন্ কোন্ দেশ ভ্রমন করেছে। আর যার কাছ থেকে বর্ণনা করছেন তিনি কোন দেশে অবস্থান করেছেন এবং কোন্ কোন্ দেশ ভ্রমন করেছেন। যদি দেখতেন এখানে কোন অসামঞ্জস্যতা আছে তখন স্পষ্ট হয়ে যেত যে এ ব্যক্তি হাদীসটা শুনেনি।
অনুরূপভাবে রাবীর মুখস্ত শক্তিও পরীক্ষা করতেন। কতগুলো হাদীসকে ওলট-পালট করে দিয়ে রাবীকে জিজ্ঞেস করতেন- এ হাদীসগুলো ঠিক আছে কিনা? ঠিক না থাকলে কিভাবে ঠিক হবে? যেমনটি বাগদাদবাসী ইমাম বোখারীর সাথে করছিলেন।
ইমাম বুখারী বাগদাদে আসলে তারা এক হাদীসের সনদকে আরেক হাদীসে লাগিয়ে একের পর এক একশটা হাদীস ইমাম বোখারীর কাছে পেশ করেন। পেশ করা শেষে ইমামকে জিজ্ঞেস করেন 'হাদীসগুলো ঠিক আছে কিনা?'
ইমাম বুখারী এত বেশী ধী শক্তির অধিকারী ছিলেন যে একবার মাত্র শুনে তাদের উল্লেখকৃত প্রতিটি হাদীস মুখস্ত করে ফেলেন। প্রথমে তারা যেভাবে উল্লেখ করেছে ঠিক সেভাবে হাদীসটি উল্লেখ করে বলতেন- 'আমরা এভাবে কোন হাদীস জানি না।' কিন্তু আমরা হাদীস জানি এইভাবে- তখন প্রত্যেক হাদীসের যে সনদ সে হাদীসের সে সনদটা দিয়ে হাদীসটা উল্লেখ করতেন। মুহাদ্দিসদের মধ্যে যারা অত্যন্ত পরহেযগার, মুত্তাকী ছিলেন তাদের একটা অংশ হাদীস গ্রন্থায়নের আগ পর্যন্ত "ইলমুল রিজাল" ও "জারহ ওয়াত তাদীল" এ দুটো বিষয়ে সবিশেষ গুরুত্ব দেন। তারা রাবীদের পরিচয়, তাদের জীবনী, তাদের দ্বীনদারী ও আখলাক ইত্যাদি সম্পর্কে গভীরভাবে তথ্য নিতেন এবং সে আলোকে রাবীদের উপর সিদ্ধান্ত দিতেন। কোন ব্যক্তি যদি জীবনে একটা মিথ্যা কথা বর্ণনা করত তার কাছ থেকে আর কখনো হাদীস গ্রহন করা হতো না।
কোন ব্যক্তি অতি দ্বীনদার, পরহেজগার হওয়ার পরও তার মুখস্ত শক্তিতে দূর্বলতা থাকার কারণে তার হাদীসের মান কমে যেত। এভাবে তাদের ছাত্ররা রাবীদের পরিচিতি ও গুণাগুণ তাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে শুনে মুখস্ত করতেন। পরবর্তীতে এ দুটো বিষয়ে স্বতন্ত্রভাবে বহু গ্রন্থ রচিত হয়। এ গ্রন্থসমূহে রাবীর পরিচয়, তিনি কোথায় কোথায় ভ্রমন করেছেন, কার কার কাছ থেকে হাদীস শুনেছেন এবং তার কাছ থেকে কে কে হাদীস শুনেছেন ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকত। সাথে সাথে একথারও উল্লেখ থাকত তিনি কোন মানের ও কোন স্তরের রাবী। নিম্নে রাবীদের একটা স্তর বিন্যাস তুলে ধরলামঃ-
এ বিন্যাসটি প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইবনে হাজার আসকালানী (মৃ ৮৫২হিঃ) উল্লেখ করেছেন। এ বিন্যাসে একেবারে প্রথমে স্থান দেয়া হয়েছে- সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাবীদের, আর একেবারে শেষে রাখা হয়েছে মিথ্যাবাদীদের, যাদের একটি কথাও মুহাদ্দিসরা গ্রহন করেননি। (অবশ্য কোন কোন মুহাদ্দিস এ স্তর বিন্যাসে সামান্য ব্যতিক্রম করেছেন)। এ প্রসঙ্গে ইবনে হাজার রাবীদের বারটি স্তর উল্লেখ করেন। সকল সাহাবী হলেন প্রথম মানের রাবী। দ্বিতীয় স্তরের রাবীদের বলা হত- ছিকাহ ছিকাহ (নির্ভরযোগ্য ২বার)।
তৃতীয় স্তরের রাবীদের বলা হত- ছিকাহ (নির্ভরযোগ্য ১বার)। চতুর্থ স্তরের রাবীদের বলা হত- সাদুক (সত্যবাদী), লা বা'স (কোন অসুবিধা নাই)। পঞ্চম স্তরের রাবীদের বলা হত- সাদুক সায়্যিউল হিফয (সত্যবাদী, কিন্তু মুখস্তে দূর্বল) ষষ্ঠ স্তরের রাবীদেরর বলা হত- মাকবুল (চলনসই)। সপ্তম স্তরের রাবীদের বলা হত- মাসতুর (তার গুণাগুণ অজ্ঞাত)। অষ্টম স্তরের রাবীদের বলা হত- যয়ীফ (দূর্বল)। নবম স্তরের রাবীদের বলা হত- মাজহুল (অজ্ঞাত পরিচয়)।
দশম স্তরের রাবীদের বলা হত- মাতরুক (পরিত্যাজ্য)। একাদশ স্তরের রাবীদের বলা হত- মুত্তাহাম বিল কাযিব (মিথ্যার অপবাদে দুষ্ট)। দ্বাদশ স্তরের রাবীদের বলা হত- কাজ্জাব, (মিথ্যাবাদী) ওযি' (জালকারী)।
যুগে যুগে যেসব হাদীস বিশারদের কথা "জারহ ওয়া তাদীল" (রাবীর সমালোচনা) শাস্ত্রে গ্রহনযোগ্যতা পায় তাদেরকে আলেমসমাজ সময়কাল অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে ভাগ করেছেন।
যেমন- প্রথম স্তরে রয়েছেন সাহাবীরা। তারা হলেন- হযরত উমর (রাঃ), আলী বিন আবী তালেব (রাঃ), আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), আনাস বিন মালেক (রাঃ) ও আয়েশা (রাঃ) প্রমুখ।
দ্বিতীয় স্তরে রয়েছেন- তাবেয়ীরা। তারা হলেন- সাঈদ বিন মুসায়্যিব (মৃ ৯৪হিঃ), সাঈদ বিন যুবায়ের (মৃ ৯৫হিঃ), উরউয়া বিন যুবাইর (মৃ ৯৪হিঃ), হাসান বসরী (মৃ ১১০হিঃ), আমের শাবী (মৃ ১০৩হিঃ) প্রমুখ।
তৃতীয় স্তরে রয়েছেন- তাবে তাবেয়ীরা। তারা হলেন- শুবা বিন হাজ্জাজ (মৃ ১৬০হিঃ), সুফিয়ান বিন সাঈদ ছাওরী (মৃ ১৬১হিঃ), আব্দুর রহমান বিন আমর আল আওযায়ী (মৃ ১৫৭হিঃ), মালেক বিন আনাস (মৃ ১৭৯হিঃ), আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (মৃ ১৮১হিঃ), এবং ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল কাত্তান (মৃ ১৯৮হিঃ) প্রমুখ।
চতুর্থ স্তরে রয়েছেন- তাবে তাবেয়ীদের আরেকটা স্তর। তারা হলেন- ওকী' বিন জাররাহ (মৃ ১৯৭হিঃ), আব্দুর রহমান বিন মাহদী (মৃ ১৯৮হিঃ), মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস শাফেয়ী (মৃ ২০৪হিঃ), এবং সাঈদ বিন মানসুর (মৃ ২২৮হিঃ) প্রমুখ।
পঞ্চম স্তরে রয়েছেন- তাবে তাবেয়ীদের পরের স্তর। তারা হলেন- আহমাদ বিন হাম্বল (মৃ ২৪১হিঃ), আলী বিন আব্দুল্লাহ বিন জাফর মাদিনী (মৃ ২৩৪হিঃ), ইয়াহইয়া বিন মায়ীন (মৃ ২৩৩হিঃ), ইসহাক বিন রাহুইয়া (মৃ ২৩৮হিঃ), আবু বকর বিন আবি শায়বা (মৃ ২৩৫হিঃ), আব্দুর রহমান বিন ইব্রাহীম দিমাসকী (মৃ ২৪৫হিঃ) এবং আমর বিন আলী আল ফাল্লাস (মৃ ২৪৯হিঃ) প্রমুখ।
ষষ্ঠ স্তরে রয়েছেন- এদের পরের স্তর। তারা হলেন- মুহাম্মদ বিন ইসামাইল বোখারী (মৃ ২৫৬হিঃ), আবু যুরআ (মৃ ২৬৪হিঃ), আবু হাতিম রাজী (মৃ ২৭৭হিঃ), মুহাম্মদ বিন মুসলিম (মৃ ২৭০হিঃ), আবু যুরআ' দিমাসকী (মৃ ২৮১হিঃ), সালেহ বিন মুহাম্মদ (মৃ ২৯৩হিঃ), মুসা বিনা হারুন (মৃ ২৯৫হিঃ) এবং আব্দুল্লাহ বিন আহমদ (মৃ ২৯০হিঃ) প্রমুখ।
সপ্তম স্তরে রয়েছেন- আহমাদ বিন শুয়াইব নাসাঈ (মৃ ৩০৩হিঃ), আবু আরুবা হাররানী (মৃ ৩১৮হিঃ) এবং আলী বিন সাদ (মৃ ২৯৭হিঃ) প্রমুখ
হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত "ইলমুল রিজাল" (রাবী পরিচিতি) নিয়ে যেসব গ্রন্থ রচিত হয়েছে তার কিছু নমুনা নিম্নে তুলে ধরছি-
১. হাইসাম বিন আদীর (মৃ ২০৭হিঃ) তাবাক্বাতু মান রাওয়া আনিন নাবী [নবীজি (সাঃ)] থেকে যারা বর্ণনা করেছেন তাদের নানা স্তর)।
২. আবু হাতেমের (মৃ ২৭৭হিঃ) তাবাক্বাতুত তাবেয়ীন (তাবেয়ীদের বিভিন্ন স্তর)
৩. ইমাম মুসলিমের (মৃ ২৬১হিঃ) তাবাক্বাতুস সাহাবা ওয়াত তাবেয়ীন (সাহাবী ও তাবেয়ীদের বিভিন্ন স্তর)
৪. ইবনে হায়‍্যানের (মৃ ৩৬৯হিঃ) তাবাক্বাতুল মুহাদ্দিসীন বি ইসবাহান (ইসবাহানের মুহাদ্দিসদের বিভিন্ন স্তর)
৫. ইবনে সাদের (মৃ ২৩০ হিঃ) আত তাবাক্বাতুল কুবরা।
৬. আলী বিন হুসাইনের (মৃ ৪২৯ হি) তাবাকাতুর রিজাল (মহাপুরুষদের স্তরগুলো)
শুধুমাত্র সাহাবীদের নিয়ে যেসব গ্রন্থ রচিত হয় সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-
১. আবু উবাইদের (মৃ ২০৭ হিঃ) আস সাবাহা (সাহাবা চরিত)
২. আলী বিন মাদিনী (মৃ ২৩৪ হিঃ) মান নাযালা মিলাস সাহাবা সায়েরাল বুলদান (সাহাবাদের যারা নানা দেশে অবস্থান করেছেন)
৩. আবু মানসুরের (মৃ ৩০১ হিঃ) আস সাহাবা (সাহাবা চরিত)
৪. আব্দুল্লাহ বিন আবু দাউদের (মৃ ৩১৬ হিঃ) আস সাহাবা (সাহাবা চরিত)
৫. মুহাম্মদ বিন মানদার (মৃ ৩৯৫ হিঃ) মারিফাতুস সাহাবা (সাহাবাদের পরিচয়)
৬. ইবনে আব্দুল বারের (মৃ ৪৬৩ হিঃ) আল ইসতিয়াব
৭. আবু নুআইমের (মৃ ৪৩০ হিঃ) মারিফাতুস সাহাবা (সাহাবাদের পরিচয়)
হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত "জারহ ওয়া তা'দীল" (রাবী সমালোচনা) বিষয়ে যেসব গ্রন্থ রচিত হয় সেগুলোকে আলেমরা তিনশ্রেণীতে বিভক্ত করেন।
প্রত্যেক শ্রেণীর গ্রন্থগুলোর কিছু নমুনা নিম্নে আলাদাভাবে তুলে ধরলাম-
নির্ভরযোগ্য-অনির্ভরযোগ্য উভয় ধরনের রাবীদের জীবনী নিয়ে লিখিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহঃ
১. লাইছ বিন সা'দের (মৃ ১৭৫ হিঃ) "আল জামউ বায়নাছ ছিকাত" (নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য রাবীদের জীবনী)
২. ইবনে মুবারকের (মৃ ১৮১ হিঃ) "আত তারিখ" (এই গ্রন্থেও নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য উভয় ধরনের রাবীদের আলোচনা স্থান পায়)
৩. আবু নুআইম (মৃ ২১৮ হিঃ) "আত তারিখ" (এই গ্রন্থেও নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য উভয় ধরনের রাবীদের আলোচনা স্থান পায়)
৪. ইয়াকুব বিন সুফিয়ান ফাসাবীর (মৃ ২৭৭ হিঃ) "আল মারিফ ওয়াত তারিখ"
৫. আবু হাতেমের (মৃ ৩২৭ হিঃ) "আল জারহ ওয়াত তাদীল"
৬. খলিলীর (মৃ ৪৪৬ হিঃ) "আল ইরশাদ"
শুধুমাত্র দূর্বল রাবীদের জীবনী নিয়ে লিখিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহঃ
১. ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল কাত্তান (মৃ ১৯৮ হিঃ) "আদ যুয়া'ফা" (এতে শুধু অনির্ভরযোগ্য বা দুর্বল রাবীদের আলোচনা স্থান পায়)
২. ইয়াহইয়া বিন মায়ীনের (মৃ ২৩৩ হিঃ) "আদ যুয়া'ফা" (এতে শুধুমাত্র দুর্বল রাবীদের আলোচনা স্থান পায়)
৩. ইবনে খুজাইমার (মৃ ৩১১ হিঃ) "আদ যুয়া'ফা"
৪. ইবনে আদীর (মৃ ৩৬৫ হিঃ) আল কামিল ফিদ যুয়া'ফা"
৫. হাকেমের (মৃ ৪০৫ হিঃ) "আদ যুয়া'ফা"
৬. খতীব বাগদাদীর (মৃ ৪৬৩ হিঃ) "আদ যুয়া'ফা" ইত্যাদি
শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্য রাবীদের জীবনী নিয়ে লিখিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহঃ
১. আলী বিন মাদিনীর (মৃ ২৩৪ হিঃ) "আছ ছিকাত ও তাছাব্বিতুন"
২. আহমাদ আলইজলীর (মৃ ২৬১ হিঃ) "আছ ছিকাত"
৩. ইবনে হিব্বানের (মৃ ৩৫৪ হিঃ) "আছ ছিকাত"
৪. ইবনে হিব্বানের "মাশাহিরু উলামায়িল আমসার"
৫. ইবনে শাহীনের (মৃ ৩৮৫ হিঃ) "তারিখু আসমাইছ ছিকাত" ইত্যাদি।
এছাড়াও "ইলমুল রিজাল" ও "জারহ ওয়াত তাদীলের" উপর রয়েছে আরো অগনিত, অসংখ্য গ্রন্থ। যেগুলোর উল্লেখে প্রবন্ধের কলেবর অনেক বেড়ে যাবে। "ইলমুল রিজাল" ও "জারহ ওয়াত তাদীল" এ দুটি ইলমকে পুঁজি করে হাদীস বিশারদরা হাদীসকে সম্পূর্ণ নির্ভেজালভাবে উম্মতের সামনে পেশ করেছেন। শুধুমাত্র সহীহ হাদীসগুলোকে সংকলিত করেই তারা ক্ষান্ত হননি, বরং যেগুলো হাদীস নামে সমাজে প্রচলিত আছে অথবা বিভিন্ন বই- পুস্তকে লেখা আছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেগুলো হাদীস নয় সে বানোয়াট কথাগুলোও তারা একত্র করে সংকলন বের করেছেন। যেন তাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় নবীর উম্মত বিভ্রান্ত না হয়, বিপথে না যায়। এ প্রবন্ধের প্রথম পর্বে "মাউজু হাদীস" বা বানোয়াট কথাগুলো নিয়ে সংকলিত অনেকগুলো গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ইচ্ছা করলে পাঠক প্রবন্ধের সে অংশ দেখে নিতে পারেন।
এত ত্যাগ-কুরবানী এবং এ পরিমাণ সাবধানতা পৃথিবীর আর কোন জ্ঞানের গ্রন্থগুলো সংকলনে গৃহীত হয়েছে বলে আমার জানা নাই।
যে এ্যরিস্টটল, সেক্সপিয়রের বাণী আমরা হর-হামেশা মুখে আওড়িয়ে থাকি যদি জিজ্ঞেস করা হয় এ্যরিস্টটল বা সেক্সপিয়র পর্যন্ত এ বাণীর একটা মাত্র বর্ণনাসূত্র আমাদেরকে দেন তো, কেউ কি দিতে পারবেন?! যে বিজ্ঞান নিয়ে আমরা গর্ব করি প্রাচীন বিজ্ঞানীদের বাণী বা থিওরীগুলো যে ঠিক ঐ বিজ্ঞানীর বাণী বা থিওরী তা কি বর্ণনাসূত্রের মাধ্যমে কেউ প্রমাণ করতে পারবেন? অনুরূপ কথা আমরা বলতে পারি জ্ঞানের প্রতিটি শাখার ক্ষেত্রে।
অথচ কোন প্রকার বাক্য ব্যয় ব্যতিরেকে পৃথিবীর সকল ধর্মের সকল মতের মানুষ প্রত্যেক জ্ঞানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাণীকে সংশ্লিষ্ট প্রবক্তার বলে মনে করে। কোন দিন তো শুনা যায় নাই "মধ্যাকর্ষন শক্তির" প্রবক্তা নিউটন না অন্য কেউ এ নিয়ে মাতামাতি করতে।
অথচ হাদীসে রাসূল (সাঃ) স্বাব্যস্তকরণে যে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে তাতো দূরে থাক এসব বাণীগুলোর প্রবক্তা যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তা সাব্যস্ত করার প্রয়োজনটুকু মনে করেননি ঐ সব জ্ঞানের গবেষকরা। যদি কেউ করে থাকে তবে সে জ্ঞানের ছাত্ররা আমাদেরকে লিখে জানাক। এমনকি পৃথিবীর অন্যসব ধর্মগ্রন্থগুলোরও কোন সনদ নাই। লোকমুখে শুনে বিশ্বাস করা হচ্ছে- এটা অমুকের বাণী।
বাস্তবে সে বাণী সংরক্ষণ ও মিশ্রনমুক্ত রাখার কোন চেষ্টা আদৌ কোন ধর্মের অনুসারীদের মাঝে নাই।
শুধুমাত্র ইঞ্জিলের কিছু সনদ আছে। তাও "পল" পর্যন্ত গিয়ে হারিয়ে গেছে। ঈসা (আঃ) পর্যন্ত পৌঁছেনি। আর হাদীসে রাসূলের (সাঃ) একজন ছাত্রকে আপনি জিজ্ঞেস করে দেখুন রাসূল (সাঃ) পর্যন্ত বর্ণনা সূত্র আপনাকে শুনিয়ে দিবে।
আধুনিক প্রিন্টিং পদ্ধতিতে ছাপা হওয়া হাদীসের মূল আরবী গ্রন্থগুলোর প্রতিও যদি আপনি নজর দেন তাহলে দেখতে পাবেন গ্রন্থের শুরুতে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির ছবি দেওয়া আছে। কত সালে কে পাণ্ডুলিপিটি তৈরী করেছেন তাও উল্লেখ আছে এবং এই গ্রন্থ যে ঐ লেখকের বা ঐ সংকলকের তাও প্রমাণ করা আছে সমকালীন অন্যান্য গ্রন্থাকারদের উক্তি দিয়ে বা অন্য কোন আলামত দিয়ে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00