📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি 📄 হাদীসে কুদসী (الحديث القدسي)

📄 হাদীসে কুদসী (الحديث القدسي)


হাদীসের আর এক প্রকার রহিয়াছে, যাহাকে 'হাদীসে কুদসী' حدیث قدسی বলা হয়। কুদসী' قدسی 'কুদস' قدس হতে গঠিত ইহার অর্থ الظهر পরিত্রতা, মাহনত্ব। আল্লাহর আর এক নাম 'কুদ্দুস' قدوس : মহান; পবিত্র। (তথ্যসূত্রঃ হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, পৃষ্ঠা নং- ৪০)২৪৩। قُدُس শব্দের আভিধানিক অর্থ পবিত্র। تقدیس শব্দের অর্থ আল্লাহর পবিত্রতা। ইরশাদ হচ্ছেঃ
(وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ٣٠ ) [البقرة: ٣٠]
"আমরা আপনার প্রশংসার তসবিহ পাঠ করি ও আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করি”। আল্লাহর এক নাম قُدُّوس অর্থ পবিত্র অথবা বরকতময় অথবা তিনি পবিত্র বৈপরীত্য, সমকক্ষ ও সৃষ্টিজীবের সাদৃশ্য থেকে। البيت المقدس অর্থ 'শির্ক থেকে পবিত্র ঘর'। হাদীসে কুদসী যেহেতু মহান আল্লাহর পবিত্র সত্ত্বার সাথে সম্পৃক্ত, তাই এ প্রকার হাদীসকে হাদীসে কুদসী (الحديث القدسي) বলা হয়। এই ধরনের হাদীসকে 'হাদীসে কুদসী' বল হয় এজন্য যে, এর মূল কথা সরাসরিভাবে আল্লাহর নিকট হতে প্রাপ্ত। হাদীসে কুদসী'র একটি উদাহরন দিলে এর বিষয়টির স্পষ্টতার প্রমান পাওয়া যায়।
যেমনঃ আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবীকে 'ইলহাম' কিংবা স্বপ্নযোগে যা জানিয়ে দিয়াছেন, নবী নিজ ভাষায় সে কথাটি বর্ণনা করেছেন। আর তা মূলতঃ কুরআন হতে পৃথক জিনিস।
কেননা কুরআনের কথা ও ভাষা উভয়ই আল্লাহর নিকট হতে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ। (তথ্যসূত্রঃ হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, পৃষ্ঠা নং - ৪১)244। হাদীসে কুদসীকে আবার হাদীসে ইলাহী বা আসারে ইলাহীও বলা হয়। [তথ্যসূত্রঃ হাদীসে কুদসী - আল্লামা মোঃ মাদানী (রহঃ), পৃষ্ঠা নং - ১০]২৪৫।
হাদীসের ভেতর সবচেয়ে গুরুত্বের দাবীদার এই হাদীসে কুদসী। এ হাদীসের মূল বক্তব্য সরাসরি আল্লাহর তরফ থেকে প্রাপ্ত।
কুদসী পদটি আরবী 'কুদুস' থেকে আগত, যার অর্থ হলো পবিত্রতা, মহানত্ম। যেমনঃ আলী ইবন খাশরাম (রঃ) ....... আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ خَشْرَم، أَخْبَرَنَا عِيسَى بْنُ يُونُسَ، عَنْ عِمْرَانَ بْنِ زَائِدَةَ بْنِ نَشِيطٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي خَالِدٍ الْوَالِبِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُولُ يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِي أَمْلاً صَدْرَكَ غِنِّى وَأَسُدَّ فَقْرَكَ وَإِلا تَفْعَلْ مَلأْتُ يَدَيْكَ شُغْلاً وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ " . قَالَ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ . وَأَبُو خَالِدٍ الْوَالِبِيُّ اسْمُهُ هُرْمُزُ .
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে আদম সন্তান, আমার ইবাদতের তুমি নিজেকে ফারেগ করে নাও আমি তোমার হৃদয়কে অভাব মুক্ততা দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিব এবং তোমার অভাব বন্ধ করে দিব। আর তা যদি না কর তবে তোমার দু' হাত আমি ব্যস্ততা দিয়ে ভরে দিব আর তোমার অভাব দূর করব না। এ হাদীসটি হাসান-গারীব। বর্ণনাকারী আবু খালিদ ওয়ালিবী (রঃ) এর নাম হল হুরমুয২৪৬।
সংজ্ঞাঃ যে হাদীসের মূল কথা সরাসরি আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে এসেছে সেই হাদীসকেই 'হাদীসে কুদসী' (الحديث القدسي) বলে। আল্লাহ তা'য়ালা তার নবীকে 'ইলহাম' কিংবা স্বপ্ন যোগে এই মূল কথাগুলি জানিয়ে দিয়েছেন।
প্রখ্যাত হাদীস ব্যাখ্যাতা মোল্লা আলী কারী হানাফী (রহঃ) 'হাদীসে কুদসী'র সংজ্ঞা দান প্রসংগে বলেছেন – “হাদীসে কুদসী' সে সব হাদীস যা শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল পরম নির্ভরযোগ্য হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর নিকট থেকে বর্ণনা করেন কখনো জিবরাইল (আঃ) এর মাধ্যমে জেনে কখনো সরাসরি অহী কিংবা ইলহাম বা স্বপ্ন যোগে লাভ করেন, যে কোন প্রকারের ভাষার সাহায্যে এটা প্রকাশ করার দায়িত্ব রাসূলের উপর অর্পিত হয়ে থাকে।” (তথ্যসূত্রঃ আল আতহাফুস সানিয়্যাহ, হাদীসের হিফাজাত ও সংকলন, পৃষ্ঠা নং - ৩৪)২৪৭। ডক্টর আদিব সালিহ লিখেছেনঃ হাদীসে কুদসী ঐ হাদীসকে বলে যা নবী করিম (সাঃ) আল্লাহর কালাম হিসাবে বর্ননা করেছেন। পরবর্তীতে তা বর্ননাকালে বর্ননাকারী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মধ্যস্থতায় বর্ননা করেছেন যার সূত্র পরম্পরা আল্লাহ তা'আলা পর্যন্ত পৌঁছেছে। আল্লামা বাকী তার 'কুল্লিয়াত' গ্রন্থে লিখেছেন, 'কুরআনের শব্দ, ভাষা, অর্থ, ভাব ও কথা সবই আল্লাহর নিকট থেকে সুস্পষ্ট ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ; আর 'হাদীসে কুদসীর'র শব্দ ও ভাষা রাসূলের; কিন্তু তার অর্থ, ভাব ও কথা, আল্লাহর নিকট হতে ইলহাম কিংবা স্বপ্ন যোগ প্রাপ্ত।”
আল্লামা তীবী বলেছেনঃ হাদীসে কুদসী হলো তাই যার মূলভাব আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার। আল্লাহ ইলহাম বা স্বপ্নযোগে তা মহানবী (সাঃ) কে জানিয়ে দিয়েছেন। মহানবী (সাঃ) নিজের ভাষায় তা উম্মতকে জানিয়ে দিয়েছেন। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য হাদীস (হাদীসে নববী) মহানবী (সাঃ) আল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করেন নি এবং তাঁর থেকে বর্ননা করেন নি। অতএব, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনুল কারিম ব্যতীত যে হাদীস তাঁর রবের পক্ষ থেকে সরাসরি বর্ণনা করেন, অথবা জিবরীলের মাধ্যমে তার পক্ষ থেকে বর্ণনা করেন তাই হাদীসে কুদসী।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু সংবাদ দিচ্ছেন, তাই এ প্রকারকে হাদীস বলা হয়। আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পৃক্ত করা হয় হিসেবে কুদসী বলে। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনায় বলা যায় যে, হাদীসে কুদসী ও কুরআনের মধ্যে পার্থক্য কি? তবুও কিছু অস্পষ্টতা থেকে যাচ্ছে, ছকের সাহায্য নিম্নে বিষয়টি আলোচনা করা হলোঃ-

টিকাঃ
২৪৩ হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, পৃষ্ঠা নং- ৪০
244 হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, পৃষ্ঠা নং- ৪১
২৪৫ হাদীসে কুদসী – আল্লামা মোঃ মাদানী (রহঃ), পৃষ্ঠা নং- ১০
২৪৬ সহীহ আত্ তিরমিযী :: কিয়ামত অধ্যায়, অধ্যায় ৩৭ :: হাদীস ২৪৬৬, ইবনু মাজাহ, হাদীস নং - ৪১০৭ – আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন
২৪৭ আল আতহাফুস সানিয়্যাহ, হাদীসের হিফাজাত ও সংকলন, পৃষ্ঠা নং - ৩৪

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি 📄 কুরআন ও হাদীসে কুদসীর পার্থক্য

📄 কুরআন ও হাদীসে কুদসীর পার্থক্য


কুরআন ও হাদীসে কুদসীর পার্থক্য নির্ণয় করতে যেয়ে প্রখ্যাত আলেমগণ যেসব মন্তব্য করেছেন তা নিম্নে উপস্থাপন করা হলোঃ-
আল্লামা আবুল বাকা তাঁহার 'কুল্লিয়াত' গ্রন্থে লিখেছেনঃ কুরআনের শব্দ, ভাষা, অর্থ, ভাব ও কথা সবই আল্লাহর নিকট হইতে সুস্পষ্ট ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ; আর 'হাদীসে কুদসী'র শব্দ ও ভাষা রাসূলের; কিন্তু উহার অর্থ, ভাব ও কথা আল্লাহর নিকট হইতে ইলহাম কিংবা স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত248। আল্লামা তাইয়্যেবী-ও এই কথা সমর্থন করেছেন। তিনি বলেছেনঃ কুরআনের শব্দ ও ভাষা লইয়া জিব্রাঈল (আঃ) রাসূলে করীমের নিকট নাযিল হয়েছেন। আর 'হাদীসে কুদসী'র মূল কথা ইলহাম বা স্বপ্নযোগে আল্লাহ তাহা জানিয়ে দিয়েছেন। (এজন্যই হাদীসে কুদসী আল্লাহর কথারূপে পরিচিত হয়েছে) কিন্তু এতদ্ব্যতীত অন্যান্য হাদীসকে আল্লাহর কথা বলে প্রচার করেন নাই এবং তাঁহার নামেও সে সবের বর্ণনা করেন নাই। নিম্নে কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে পার্থক্যসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলোঃ-
১. কুরআনুল কারিমের শব্দ ও অর্থ জিবরীলের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরে জাগ্রত অবস্থায় নাযিল করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَلَمِينَ ۱۹۲ نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ ۱۹۳ عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنذِرِينَ ١٩٤ بِلِسَانٍ عَرَبِيّ مُّبِينٍ ١٩٥ [الشعراء : [۱۹۵ ،۱۹۲
"আর নিশ্চয় এ কুরআন সৃষ্টিকুলের রবেরই নাযিলকৃত। বিশ্বস্ত আত্মা এটা নিয়ে অবতরণ করেছে। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়”। [সূরা শু'আরা: (১৯২-১৯৫)]249। তাই কুরআনুল কারিমের ভাবার্থ বর্ণনা করা বৈধ নয়, তার শব্দ মুজিযা, হ্রাস ও বৃদ্ধি থেকে সুরক্ষিত। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
( إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَفِظُونَ ٩ ) [الحجر: 9]
"নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি, আর আমিই তার হিফাজতকারী”250 অন্যত্র ইরশাদ করেনঃ
( قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَن يَأْتُواْ بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْءَانِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا ۸۸ ) [الاسراء: ۸۸]
“বল, ‘যদি মানুষ ও জিন এ কুরআনের অনুরূপ হাযির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ হাযির করতে পারবে না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়’।251 হাদীসে কুদসীর এসব বৈশিষ্ট্য নেই, হাদীসে কুদসীর ভাবার্থ বর্ণনা করা বৈধ।
২. সালাতে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা ফরয, সক্ষম ব্যক্তির কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত ব্যতীত সালাত শুদ্ধ হবে না। পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসী সালাতে পড়া নিষেধ, কুরআনের পরিবর্তে তার দ্বারা সালাত শুদ্ধ হবে না।
৩. কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা ইবাদত। প্রত্যেক শব্দের দশগুণ সাওয়াব। জমহুর আলেমের নিকট নাপাক ব্যক্তির জন্য কুরআন স্পর্শ করা বৈধ নয়, যেমন তিলাওয়াত বৈধ নয়।
পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসী তিলাওয়াত করে ইবাদত আঞ্জাম দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি, তার সাওয়াব কুরআনের সমপরিমাণ নয় এবং নাপাক ব্যক্তির পক্ষে হাদীসে কুদসি স্পর্শ করা কিংবা তিলাওয়াত করা হারাম নয়।
৪. কুরআনুল কারিমের শব্দ, বাক্য ও ক্রম বিন্যাস আমাদের নিকট মুতাওয়াতির পদ্ধতিতে পৌঁছেছে। কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং সূরা ফাতেহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত দুই মলাটের মাঝে সংরক্ষিত। কুরআন অস্বীকারকারী কাফের, তার তিলাওয়াত ও শিক্ষার জন্য সনদ প্রয়োজন নেই। পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসী আমাদের নিকট পৌঁছেছে কখনও একক সংবাদের ভিত্তিতে আবার কখনও মুতাওয়াতির হিসেবে। মুতাওয়াতির না হলে প্রমাণিত নয় মনে করার কারণে তার অস্বীকারকারীকে কাফের বলা যায় না। তার শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতার জন্য সনদ দেখা প্রয়োজন। তবে হাদীসে কুদসীর বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে সেটা অস্বীকারকারীও কাফের হয়ে যাবে।
৫. আল্লাহ ব্যতীত কারও সাথে কুরআন সম্পৃক্ত করা বৈধ নয়। কুরআনের একটি বাক্য কিংবা বাক্যাংশকে আয়াত বলা হয়। কয়েকটি আয়াতের সমষ্টিকে সূরা বলা হয়, যা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নির্ধারিত।
পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসী এরূপ নয়, বরং হাদীসে কুদসীকে: হাদীসে কুদসী, হাদীসে ইলাহী ও হাদীসে রাব্বানী বলা হয়। হাদীসে কুদসীকে কখনো নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়, কারণ তিনি স্বীয় রবের পক্ষ থেকে তা বলেছেন, তাই মুহাদ্দিসগণ হাদীসে কুদসীকে হাদীসে নববীর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
৬. হাদীসে কুদসী কুরআনের ন্যায় 'মুজিযা' নহে।
৭. হাদীসে কুদসী অমান্য করিলে লোক কাফির হয়ে যায় না - যেমন কাফির হয়ে যায় কুরআন অমান্য করিলে।
হাদীসে কুদসী যদিও রাসূল (সাঃ) ওহীর মাধ্যমে লাভ করেছেন যদিও রাসূল (সাঃ) তা আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ননা করেছেন, তবু হাদীসে কুদসী কুরআন বা কুরআনের সমতুল্য নয়। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা হলো, হাদীসে কুদসীও এক প্রকার হাদীসই মাত্র। যেহেতু হাদীসে কুদসীতে আল্লাহর বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে, সে কারনে কেউ যদি এরূপ হাদীসকে কুরআনের সমতুল্য মনে করেন তবে তিনি মারাত্মক ভুল করবেন। কুরআন এবং হাদীসে উপরোক্ত যে সকল পার্থক্যগুলো আলোচনা করা হয়েছে তাতে তা স্পষ্ট প্রমানিত হয়েছে। অতএব, বলা যায় যে, কুরআন ও হাদীসে কুদসীতে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে 252।
সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনায় আমরা বুঝতে পারলাম যে হাদীস প্রধানতঃ দু'ভাগে বিভক্ত-
১. হাদীসে নব্বী - রাসূলে করীম (সাঃ) এর হাদীস।
২. হাদীসে ইলাহী - আল্লাহ-হাদীস, আর এই হাদীসকেই হাদীসে কুদসী বলে।

টিকাঃ
248 হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, পৃষ্ঠা নং- ৩৯
249 সূরা শু'আরা: (১৯২-১৯৫)
250 সূরা হিজরঃ (৯)
251 সূরা আল-ইসরাঃ (৮৮)
252 সিহাহ সিত্তার হাদীসে কুদসী - আব্দুস শহীদ নাসিম, পৃষ্ঠা নং- ১৯

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি 📄 হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর পার্থক্য

📄 হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর পার্থক্য


শায়খ মুহাম্মদ আল-ফারুকী হাদীসকে দু'ভাগে ভাগ করেছেন। তিনি লিখেছেন - "হাদীসে কুদসী তাই, যা নবী করীম (সাঃ) তার আল্লাহ তা'আলার তরফ হতে বর্ণনা করেন। আর যা সেরূপ করেন না, তা হাদীসে নব্বী।" 253
নিম্নে হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নব্বীর পার্থক্যগুলো আলোচনা করা হলোঃ-
১. হাদীসে কুদসী আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট ওহীঃ স্পষ্ট ওহী, যেমন জিবরীলের মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদীস; অস্পষ্ট ওহী, যেমন ঘুম বা প্রত্যাদেশ যোগে প্রাপ্ত হাদীস।
পক্ষান্তরে হাদীসে নববী কতক ওহী ও কতক নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইজতিহাদ, তার ইজতিহাদ ওহী। কারণ, তার ইজতিহাদ ভুল হলে আল্লাহ সংশোধন করে দেন, ভুলের উপর তাকে স্থির রাখেন না।
২. হাদীসে কুদসী নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে বলেন, কিন্তু হাদীসে নববী তিনি নিজের পক্ষ থেকে সরাসরি বলেন।
৩. হাদীসে কুদসীতে সাধারণত আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা, গুণগান, কুদরত, রহমত, মাগফেরাত, জান্নাত, জাহান্নাম, ইবাদতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি ও পাপ থেকে সতর্ককারী বিষয়ের আধিক্য থাকে।
পক্ষান্তরে হাদীসে নববীতে অধিকহারে মুসলিমের দীনি ও দুনিয়াবি বিষয়ের বর্ণনা থাকে। (হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা – ১৩২) ২৫৪।

টিকাঃ
253 হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, পৃঃ ৩৬
২৫৪ হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা - ১৩২

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি 📄 হাদীসে কুদসীর উপর লিখিত গ্রন্থসমূহ

📄 হাদীসে কুদসীর উপর লিখিত গ্রন্থসমূহ


হাদীসে কুদসীর উপর কতক লিখিত গ্রন্থসমূহের উদাহরন নিম্নে দেওয়া হলোঃ-
১. আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইব্‌ন আলি ইব্‌ন আল-আরাবী আত-ত্বায়ি (মৃ.৬৩৮হি.), তাঁর রচিত গ্রন্থের নামঃ
مشكاة الأنوار فيما روي عن الله سبحانه من الأخبار
২. আল্লামা নুরুদ্দীন আলী ইব্‌ন মুহাম্মদ ইব্‌ন সুলতান (মৃঃ ১০১৪ হিঃ), যিনি 'মোল্লা আলী আল-কারী' নামে প্রসিদ্ধ, তিনি হাদীসের ছয় কিতাব থেকে চল্লিশটি হাদীসে কুদসী একসাথে জমা করেছেন এবং প্রত্যেক হাদীসের সূত্র উল্লেখ করেছেন। তাঁর রচিত কিতাবের নামঃ
الأحاديث القدسية الأربعينية
৩. শায়খ মুহাম্মদ ইবন সালেহ আল-মাদানী (মৃতঃ ১২০০হিঃ) হাদীসে কুদসীর উপর সর্ববৃহৎ কিতাব লিখেন, তার কিতাবের নামঃ
الإتحافات السنية في الأحاديث القدسية
এতে তিনি (৮৬৪) টি হাদীসে কুদসী জমা করেন, যার অধিকাংশ তিনি ইমাম সূয়ূতি রচিত جمع الجوامع গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছেন।
لجنة القرآن الكريم والحديث بالمجلس الأعلى للشؤون الإسلامية بمصر কর্তৃক নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে একদল লেখক হাদীসের ছয় কিতাব ও মুয়াত্তা ইমাম মালিক থেকে (৪০০) টি হাদীসে কুদসী বাছাই করেন, তাতে টিকা সংযোজন করেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা যুক্ত করেন, তাদের রচিত কিতাবের নাম: الأحاديث القدسية
৫. শায়খ মুস্তফা আদাবী (১৮৫)টি সহি ও হাসান হাদীসে কুদসী জমা করেন, তার কিতাবের নাম: الصحيح المسند من الأحاديث القدسية (তথ্যসূত্রঃ হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা নং – ১৩৯) 255।
হাদীসে কুদসীর হুকুমঃ হাদীসে কুদসী হাদীসে নববীর ন্যায় সহী, হাসান ও দুর্বল বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়। অতএব হাদীসে কুদসী বলা কিংবা তার উপর আমল করার পূর্বে শুদ্ধাশুদ্ধ যাচাই করা জরুরি। (তথ্যসূত্রঃ ঐ)।

টিকাঃ
255 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা নং- ১৩৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px