📄 ‘মাউযূ’ বা হাদীসে জাল করণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
ইসলাম বিদ্বেষী চক্র কর্তৃক হাদীস জাল করনের যে ঘৃণ্য ও হীন চক্রান্ত শুরু হয় তা অবলোকন করে তৎকালীন প্রশাসক এবং হাদীস শাস্ত্র বিশারদগণ তৎপর হয়ে উঠেন। হাদীসকে এই অশুভ চক্র থেকে নির্ভুল রাখতে তাঁরা প্রশাসনিক ও যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাদের কঠোর প্রতিরোধের ফলে চক্রান্তকারী দল বেশীদূর অগ্রসর হতে পারেনি। অধিকন্তু তারা এমন কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ হাদীস জাল করার মতো দুঃসাহস করতে গেলে সহজেই ধরা পড়ে নাজেহাল হতে বাধ্য হয়।
ইসলাম বিদ্বেষী চক্র কর্তৃক হাদীস জাল করনের যে ঘৃণ্য ও হীন চক্রান্ত শুরু হয় তা অবলোকন করে তৎকালীন প্রশাসক এবং হাদীস শাস্ত্র বিশারদগণ তৎপর হয়ে উঠেন। হাদীসকে এই অশুভ চক্র থেকে নির্ভুল রাখতে তাঁরা প্রশাসনিক ও যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাদের কঠোর প্রতিরোধের ফলে চক্রান্তকারী দল বেশীদূর অগ্রসর হতে পারেনি। অধিকন্তু তারা এমন কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ হাদীস জাল করার মতো দুঃসাহস করতে গেলে সহজেই ধরা পড়ে নাজেহাল হতে বাধ্য হয়।
📄 যঈফ ও জাল হাদীস এবং মুসলিম সমাজে তার কুপ্রভাব
ইসলামী শরীয়তের দুটি মুল উৎস হচ্ছে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আমি তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ঐ দুটিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। সে দুটি হল আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত (আল-হাদীস)। (মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক, মিশকাত হা/১৮৬; আল-মুস্তাদরাক লিল হাকেম, সনদ হাসান)। যেহেতু উপরোক্ত দুটি উৎসই ইসলামী জীবন- যাপনের মূল হাতিয়ার এবং এর উপরেই মুসলমানদের হেদায়াত নির্ভরশীল, সেহেতু যুগ পরস্পরায় ইসলামের শত্রুরা এ দুটি মূল উৎসের মাঝেই ভেজাল ঢুকানোর চেষ্টা করেছে। কুরআন যেহেতু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়েই লিখিত আকারে সংরক্ষিত ছিল। কণ্ঠস্থ ছিল বহু সাহাবীর। কাজেই তারা কুরআনে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস ছিল এর কিছুটা ব্যতিক্রম। হাদীস তখন লিখিত আকারে ছিল না। ছিল বিভিন্ন সাহাবীর স্মৃতিপটে সংরক্ষিত। তাও আবার গচ্ছিত আকারে নয়। লিখিত আকারে খুব কমই সংরক্ষিত ছিল। এই সুযোগে ইসলামের চির শত্রুরা ও মুসলিম নামধারী বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল এই দ্বিতীয় উৎসের মধ্যে তাদের কালো হাত বসিয়েছে। হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম এবং যা শরীয়ত নয় তাকে শরীয়তে রূপ দেওয়ার জন্য বহু হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম দিয়ে জাল করেছে। কিন্তু মহান রাব্বুল আলামীন যুগে যুগে এমন পণ্ডিতদেরও আবির্ভাব ঘটিয়েছেন, যারা ঐ সমস্ত যঈফ ও জাল হাদীসগুলিকে ছাটাই বাছাই করতে সক্ষম হয়েছেন।
ইমাম ইবনুল জাওযী বলেন, যখন কারো পক্ষে কুরআন মজীদে অনুপ্রবেশ ঘটানো সম্ভব হয়নি, তখন কিছু সংখ্যক লোক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস বর্ণিত করতে শুরু করে এবং তিনি বলেননি এমন কথাও তাঁর নাম দিয়ে চালাতে শুরু করে। আর এর প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালা এমন আলেমদের আবির্ভাব ঘটালেন, যাঁরা মিথ্যা বর্ণনা অপসারণ করতে শুরু করেন এবং সহীহ হাদীস কোনটি তা স্পষ্ট করে দেন। আল্লাহ তায়ালা এরূপ পণ্ডিত ব্যক্তিদের থেকে কোন যুগকেই শূন্য রাখেননি। তবে এ ধরনের ব্যক্তিত্বদের অস্তিত্ব সাম্প্রতিককালে হ্রাস পেয়েছে। এমনকি বর্তমানে তাদের প্রাপ্তি পশ্চিমা ডলফিন প্রাপ্তির চেয়েও দুর্লভ হয়ে পড়েছে। (সিলসিলাতুল আহাদীস আয-যাঈফাহ ওয়াল মওযূআহ ১/৪১)২২৮। ইমাম ইবনুল জাওযীর যুগেই যখন হাদীসের মহা পন্ডিতদের এরূপ অভাব দেখা দিয়েছিল, সেখানে বর্তমান যুগে এ অভাব আরও তীব্র হওয়া স্বাভাবিক নয় কি? বাস্তব পরিস্থিতিও তাই। সারা বিশ্বে আজ যঈফ ও জাল হাদীসের ছড়াছড়ি। কি খতীব, কি ওয়ায়েয, কি প্রবন্ধকার, কি তথাকথিত মুহাদ্দিস সকলের মুখে শুধু যঈফ ও জাল হাদীস শুনা যায়। কিন্তু এগুলি থেকে সতর্ককারী রয়েছেন কজন? যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানীসহ হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তিত্ব ছাড়া? তাদের লেখনীও আবার আরবীতে। যা বাংলাভাষী মুসলমানদের জন্য বুঝা কষ্টকর।
এই ঘোলাটে পরিস্থিতি অনুধাবন করেই আমরা উভয় বাংলার মানুষকে যঈফ ও জাল হাদীস থেকে সতর্ক করার জন্য কলম হাতে নিয়েছি। আমরা বাংলার মুমিন সমাজকে জানিয়ে দিতে চাই যে, হাদীস বর্ণনায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। হাদীসের অবস্থা না জেনে তা দিয়ে দলীল পেশ করা যাবে না। আমরা আরও চাই বাংলার মানুষকে ঐ সমস্ত হাদীসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে, যেগুলিকে তারা অজ্ঞতা বশত: কিংবা ঐ রকম বই-কিতাব না থাকায় সহীহ হাদীস মনে করে আমল করে আসছে। অথচ তা নিতান্তই যঈফ বা জাল। বহুকাল আগে থেকেই হাদীস শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ এগুলোকে যঈফ ও জাল হাদীস বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং বর্তমান যুগের হাদীস শাস্ত্রবিদগণও ওগুলোর যঈফ ও জাল হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর মিথ্যা রোপ করার কঠিন গোনাহ হতে রক্ষা করা।
আল্লাহ আমাদের সকলকে যঈফ ও জাল হাদীস চিনার ও তা থেকে সতর্ক থাকার সাথে সাথে কুরআন ও সহীহ হাদীস ভিত্তিক আমল করার তাওফীক দিন-আমীন!
টিকাঃ
২২৮ সিলসিলাতুল আহাদীস আয-যাঈফাহ ওয়াল মওযূআহ ১/৪১
ইসলামী শরীয়তের দুটি মুল উৎস হচ্ছে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আমি তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ঐ দুটিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। সে দুটি হল আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত (আল-হাদীস)। (মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক, মিশকাত হা/১৮৬; আল-মুস্তাদরাক লিল হাকেম, সনদ হাসান)। যেহেতু উপরোক্ত দুটি উৎসই ইসলামী জীবন- যাপনের মূল হাতিয়ার এবং এর উপরেই মুসলমানদের হেদায়াত নির্ভরশীল, সেহেতু যুগ পরস্পরায় ইসলামের শত্রুরা এ দুটি মূল উৎসের মাঝেই ভেজাল ঢুকানোর চেষ্টা করেছে। কুরআন যেহেতু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়েই লিখিত আকারে সংরক্ষিত ছিল। কণ্ঠস্থ ছিল বহু সাহাবীর। কাজেই তারা কুরআনে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস ছিল এর কিছুটা ব্যতিক্রম। হাদীস তখন লিখিত আকারে ছিল না। ছিল বিভিন্ন সাহাবীর স্মৃতিপটে সংরক্ষিত। তাও আবার গচ্ছিত আকারে নয়। লিখিত আকারে খুব কমই সংরক্ষিত ছিল। এই সুযোগে ইসলামের চির শত্রুরা ও মুসলিম নামধারী বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল এই দ্বিতীয় উৎসের মধ্যে তাদের কালো হাত বসিয়েছে। হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম এবং যা শরীয়ত নয় তাকে শরীয়তে রূপ দেওয়ার জন্য বহু হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম দিয়ে জাল করেছে। কিন্তু মহান রাব্বুল আলামীন যুগে যুগে এমন পণ্ডিতদেরও আবির্ভাব ঘটিয়েছেন, যারা ঐ সমস্ত যঈফ ও জাল হাদীসগুলিকে ছাটাই বাছাই করতে সক্ষম হয়েছেন।
ইমাম ইবনুল জাওযী বলেন, যখন কারো পক্ষে কুরআন মজীদে অনুপ্রবেশ ঘটানো সম্ভব হয়নি, তখন কিছু সংখ্যক লোক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস বর্ণিত করতে শুরু করে এবং তিনি বলেননি এমন কথাও তাঁর নাম দিয়ে চালাতে শুরু করে। আর এর প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালা এমন আলেমদের আবির্ভাব ঘটালেন, যাঁরা মিথ্যা বর্ণনা অপসারণ করতে শুরু করেন এবং সহীহ হাদীস কোনটি তা স্পষ্ট করে দেন। আল্লাহ তায়ালা এরূপ পণ্ডিত ব্যক্তিদের থেকে কোন যুগকেই শূন্য রাখেননি। তবে এ ধরনের ব্যক্তিত্বদের অস্তিত্ব সাম্প্রতিককালে হ্রাস পেয়েছে। এমনকি বর্তমানে তাদের প্রাপ্তি পশ্চিমা ডলফিন প্রাপ্তির চেয়েও দুর্লভ হয়ে পড়েছে। (সিলসিলাতুল আহাদীস আয-যাঈফাহ ওয়াল মওযূআহ ১/৪১)২২৮। ইমাম ইবনুল জাওযীর যুগেই যখন হাদীসের মহা পন্ডিতদের এরূপ অভাব দেখা দিয়েছিল, সেখানে বর্তমান যুগে এ অভাব আরও তীব্র হওয়া স্বাভাবিক নয় কি? বাস্তব পরিস্থিতিও তাই। সারা বিশ্বে আজ যঈফ ও জাল হাদীসের ছড়াছড়ি। কি খতীব, কি ওয়ায়েয, কি প্রবন্ধকার, কি তথাকথিত মুহাদ্দিস সকলের মুখে শুধু যঈফ ও জাল হাদীস শুনা যায়। কিন্তু এগুলি থেকে সতর্ককারী রয়েছেন কজন? যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানীসহ হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তিত্ব ছাড়া? তাদের লেখনীও আবার আরবীতে। যা বাংলাভাষী মুসলমানদের জন্য বুঝা কষ্টকর।
এই ঘোলাটে পরিস্থিতি অনুধাবন করেই আমরা উভয় বাংলার মানুষকে যঈফ ও জাল হাদীস থেকে সতর্ক করার জন্য কলম হাতে নিয়েছি। আমরা বাংলার মুমিন সমাজকে জানিয়ে দিতে চাই যে, হাদীস বর্ণনায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। হাদীসের অবস্থা না জেনে তা দিয়ে দলীল পেশ করা যাবে না। আমরা আরও চাই বাংলার মানুষকে ঐ সমস্ত হাদীসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে, যেগুলিকে তারা অজ্ঞতা বশত: কিংবা ঐ রকম বই-কিতাব না থাকায় সহীহ হাদীস মনে করে আমল করে আসছে। অথচ তা নিতান্তই যঈফ বা জাল। বহুকাল আগে থেকেই হাদীস শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ এগুলোকে যঈফ ও জাল হাদীস বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং বর্তমান যুগের হাদীস শাস্ত্রবিদগণও ওগুলোর যঈফ ও জাল হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর মিথ্যা রোপ করার কঠিন গোনাহ হতে রক্ষা করা।
আল্লাহ আমাদের সকলকে যঈফ ও জাল হাদীস চিনার ও তা থেকে সতর্ক থাকার সাথে সাথে কুরআন ও সহীহ হাদীস ভিত্তিক আমল করার তাওফীক দিন-আমীন!
টিকাঃ
২২৮ সিলসিলাতুল আহাদীস আয-যাঈফাহ ওয়াল মওযূআহ ১/৪১
📄 ‘মাউযূ’ বা জাল হাদীসের প্রকারভেদ
এই موضوع 'মাউজু' বা জাল হাদীস কয়েক ধরনের হয়, যথাঃ
১. কোন ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে কোন বাক্য বানিয়ে রাসূল (সাঃ) সাহাবী (صحابی) অথবা তাবেয়ী (تابعی) এর নামে চালিয়ে দেয়া।
২. কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি, সাহাবী (صحابی), তাবেয়ী (تابعی), ছুফিয়ায়ে কেরাম অথবা অন্য কারো কথা নিয়ে রাসূল (সাঃ) এর নামে চালিয়ে দেয়া যাতে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়। (তথ্যসূত্রঃ আল- ইসরাইলিয়্যাত ওয়াল – মাউজুয়াত: ১৫) 229।
مَوْضُوْعٌ (মাওযু): যে হাদীস এর রাবী জীবনে কখনও রাসূল (সাঃ) ওনার নামে ইচ্ছা করে কোন মিথ্যা কথা রচনা করেছে বলে সাব্যস্ত হয়েছে- তার হাদীসকে হাদীসে মাওযু বলে। এরূপ ব্যক্তির কোন হাদীসই কখনও গ্রহণযোগ্য নয় যদিও তিনি অতঃপর খালিস তওবা করেন। (অত্র গ্রন্থে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, ২৫২ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।
مَتْرُوْكُ (মাতরূক): যে হাদীস এর রাবী হাদীসের ব্যাপারে নয় বরং সাধারণ কাজ-কারবারে মিথ্যা কথা বলেন বলে খ্যাত হয়েছেন- তার হাদীসকে হাদীসে মাতরূক বলে। এরূপ ব্যক্তিরও সমস্ত হাদীস পরিত্যাজ্য।
مُبْهَمْ (মুহাম): مُبْهَمَّ এর আভিধানিক অর্থঃ অস্পষ্ট। 'মুবহাম'-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেনঃ "যে হাদীসের সনদে কোনো একজন রাবীকে উল্লেখ করা হয়নি তাই মুবহাম"। যেমন, حدثني رجل، قال: حدثني خالد عن راشد কারণ এখানে একজন রাবীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। অনুরূপ কোনো রাবী যদি বলে حدثني الثقة 'আমাকে জনৈক সিকাহ বলেছে' তবুও তা মুবহাম। কারণ, 'সিকাহ' রাবী পরিচিত নয়। হয়তো তার নিকট সিকাহ, প্রকৃতপক্ষে সিকাহ নয়।
অনুরূপ কেউ যদি বলেঃ حدثني من أثق به 'এমন ব্যক্তি আমাকে বলেছে, যার উপর আমি আস্থাশীল', তবু হাদীস মুবহাম, কারণ মুবহাম ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো প্রশংসা গ্রহণীয় নয়। অনুরূপ কেউ যদি বলেঃ حدثني صاحب هذه الدار 'আমাকে এ বাড়িওয়ালা বলেছে', তবু হাদীস মুবহাব, যতক্ষণ না তার পরিচয় জানা যায়।
অর্থাৎ যে হাদীস - এর রাবীর উত্তমরূপে পরিচয় পাওয়া যায়নি- যাতে ওনার দোষ-গুণ বিচার করা যেতে পারে, ওনার হাদীসকে হাদীসে মুবহাম বলে। এরূপ ব্যক্তি সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু না হলে ওনার হাদীস গ্রহণ করা যায় না।
মুবহাম হাদীসের হুকুমঃ মুবহাম হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ মুবহাম রাবী সিকাহ না গায়রে সিকাহ জানা নেই, তবে তাবে'ঈ বা তাবে তাবে'ঈ মুবহাম হলে শাহেদ হওয়ার যোগ্য। কারণ, এ দুই তবকা সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণের সাক্ষ্য দিয়েছেন, পরবর্তী যুগে মিথ্যার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
টিকাঃ
229 আল- ইসরাইলিয়্যাত ওয়াল মাউজুয়াত: ১৫
এই موضوع 'মাউজু' বা জাল হাদীস কয়েক ধরনের হয়, যথাঃ
১. কোন ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে কোন বাক্য বানিয়ে রাসূল (সাঃ) সাহাবী (صحابی) অথবা তাবেয়ী (تابعی) এর নামে চালিয়ে দেয়া।
২. কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি, সাহাবী (صحابی), তাবেয়ী (تابعی), ছুফিয়ায়ে কেরাম অথবা অন্য কারো কথা নিয়ে রাসূল (সাঃ) এর নামে চালিয়ে দেয়া যাতে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়। (তথ্যসূত্রঃ আল- ইসরাইলিয়্যাত ওয়াল – মাউজুয়াত: ১৫) 229।
مَوْضُوْعٌ (মাওযু): যে হাদীস এর রাবী জীবনে কখনও রাসূল (সাঃ) ওনার নামে ইচ্ছা করে কোন মিথ্যা কথা রচনা করেছে বলে সাব্যস্ত হয়েছে- তার হাদীসকে হাদীসে মাওযু বলে। এরূপ ব্যক্তির কোন হাদীসই কখনও গ্রহণযোগ্য নয় যদিও তিনি অতঃপর খালিস তওবা করেন। (অত্র গ্রন্থে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, ২৫২ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।
مَتْرُوْكُ (মাতরূক): যে হাদীস এর রাবী হাদীসের ব্যাপারে নয় বরং সাধারণ কাজ-কারবারে মিথ্যা কথা বলেন বলে খ্যাত হয়েছেন- তার হাদীসকে হাদীসে মাতরূক বলে। এরূপ ব্যক্তিরও সমস্ত হাদীস পরিত্যাজ্য।
مُبْهَمْ (মুহাম): مُبْهَمَّ এর আভিধানিক অর্থঃ অস্পষ্ট। 'মুবহাম'-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেনঃ "যে হাদীসের সনদে কোনো একজন রাবীকে উল্লেখ করা হয়নি তাই মুবহাম"। যেমন, حدثني رجل، قال: حدثني خالد عن راشد কারণ এখানে একজন রাবীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। অনুরূপ কোনো রাবী যদি বলে حدثني الثقة 'আমাকে জনৈক সিকাহ বলেছে' তবুও তা মুবহাম। কারণ, 'সিকাহ' রাবী পরিচিত নয়। হয়তো তার নিকট সিকাহ, প্রকৃতপক্ষে সিকাহ নয়।
অনুরূপ কেউ যদি বলেঃ حدثني من أثق به 'এমন ব্যক্তি আমাকে বলেছে, যার উপর আমি আস্থাশীল', তবু হাদীস মুবহাম, কারণ মুবহাম ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো প্রশংসা গ্রহণীয় নয়। অনুরূপ কেউ যদি বলেঃ حدثني صاحب هذه الدار 'আমাকে এ বাড়িওয়ালা বলেছে', তবু হাদীস মুবহাব, যতক্ষণ না তার পরিচয় জানা যায়।
অর্থাৎ যে হাদীস - এর রাবীর উত্তমরূপে পরিচয় পাওয়া যায়নি- যাতে ওনার দোষ-গুণ বিচার করা যেতে পারে, ওনার হাদীসকে হাদীসে মুবহাম বলে। এরূপ ব্যক্তি সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু না হলে ওনার হাদীস গ্রহণ করা যায় না।
মুবহাম হাদীসের হুকুমঃ মুবহাম হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ মুবহাম রাবী সিকাহ না গায়রে সিকাহ জানা নেই, তবে তাবে'ঈ বা তাবে তাবে'ঈ মুবহাম হলে শাহেদ হওয়ার যোগ্য। কারণ, এ দুই তবকা সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণের সাক্ষ্য দিয়েছেন, পরবর্তী যুগে মিথ্যার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
টিকাঃ
229 আল- ইসরাইলিয়্যাত ওয়াল মাউজুয়াত: ১৫
📄 ফকীহগণের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীসের উপর আমল করা যাবে –এ সংক্রান্ত সংশয় নিরসন
ইবনুল আরাবী মালেকী (রহঃ) বলেনঃ দুর্বল হাদীসের উপর কোন অবস্থাতেই আমল করা যাবে না। ইমাম শাওকানী ও (রহঃ) একই মত দিয়েছেন। আর এটাই সঠিক।
হাফিয ইবনু হাজার (রহঃ) এর নিকট দুর্বল হাদীস-এর উপর আমল করার শর্তাবলীঃ
হাফিয সাখাবী (রহঃ) বলেনঃ আমি আমার শাইখকে বার বার বলতে শুনেছি দুর্বল হাদীসের উপর ৩ টি শর্ত সাপেক্ষে আমল করা যাবেঃ
১) হাদীস যেন বেশী দুর্বল না হয়। অতএব মিথ্যুক, মিথ্যার দোষে দোষী এবং অস্বাভাবিক ভুলকারীদের একক বর্ণনা গৃহীত হবে না এবং এরূপ বর্ণনাকারীর হাদীসের উপর আমল করা যাবে না।
২) যে আমলটির ফযীলত এসেছে সে আমলটির মূল সাব্যস্ত হতে হবে। অতএব, যে আমলটির আসলেই কোন ভিত্তি নেই; এরূপ আমলের ক্ষেত্রে (দুর্বল হাদীস দ্বারা) ফযীলত বর্ণিত হয়ে থাকলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না।
৩) কম দুর্বল হাদীসটির উপর আমল করার সময় এমন বিশ্বাস রাখা যাবে না যে, সেটি শরীয়তে সাব্যস্ত হয়েছে। কারণ সাব্যস্ত হয়েছে এরূপ বিশ্বাস রাখলে, তা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উদ্ধৃতিতে বলতে হবে। অর্থাৎ এমন বিশ্বাস রাখা যাবে না যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার উপর আমল করার জন্য বলেছেন।
শর্তগুলোর ব্যাখ্যাঃ
প্রথম শর্তে বলা হয়েছে ফযীলতের ক্ষেত্রে কম দুর্বল হাদীসের উপর আমল করা যাবে। এ ফযীলত অর্জনের বিষয়টি কোন আমল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে হতে পারে আবার কোন আমল ছেড়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও হতে পারে। তবে দুর্বল হাদীসগুলোর মধ্য হতে কোনটি কম দুর্বল আর কোনটি বেশী দুর্বল তা আগে নির্ণয় করতে হবে। অতঃপর যেটি কম দুর্বল সেটির উপর আমল করা যেতে পারে। কিন্তু কোনটি সহীহ, কোনটি দুর্বল, কোনটি কম দুর্বল এবং বেশী দুর্বল তা পার্থক্য করার দায়িত্ব কার?
সন্দেহ নেই; নিশ্চয়ই এ বিষয়ের যারা পন্ডিত ও বিজ্ঞ তাদেরকেই তা করতে হবে ২ টি কারণেঃ
১) পৃথক না করলে য'য়ীফকে সহীহ হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে মনে করে তার উপর আমল করলে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর মিথ্যারোপের ন্যায় বিপদেও পড়তে হতে পারে।
২) অনুরূপভাবে কম দুর্বলকে বেশী দুর্বল হতে পৃথক করতে হবে, যাতে কোন ব্যক্তি ফযীলতের ক্ষেত্রেও বেশী দুর্বল হাদীসের উপর আমল করে উল্লেখিত একই বিপদে না পড়ে। কিন্তু এরূপ পার্থক্যকারী বিজ্ঞ আলেমদের সংখ্যা অতীব নগণ্য।
দ্বিতীয় শর্তে বলা হয়েছে যে, যে কর্মটির ফযীলত বর্ণিত হয়েছে সে কর্মটির মূল থাকতে হবে। অর্থাৎ কর্মটি সহীহ দলীল দ্বারা সাব্যস্ত হতে হবে। অন্যথায় মূলহীন আমলের জন্য ফযীলতের ক্ষেত্রে কম দুর্বল হাদীসের উপরও আমল করা যাবে না।
উল্লেখ্য দুর্বল হাদীস দ্বারা আলেমদের ঐক্যমতে কোন আমলই সাব্যস্ত হয় না। যদিও সেটি মুস্তাহাব হয়। অতএব আমলই যদি সাব্যস্ত না হয়ে থাকে, তাহলে আমল এবং ফযীলত উভয়টি যে হাদীসের মধ্যে একই সাথে বর্ণিত হয়েছে, সে হাদীস দ্বারা কোন অবস্থাতেই ফযীলত সাব্যস্ত হতে পারে না। যদিও হাদীসটি কম দুর্বল হয়। কারণ এক্ষেত্রে মূলটি সহীহ দলীল দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে না।
তৃতীয় শর্তে বলা হয়েছে যে, কম দুর্বল হাদীসের উপর ফযীলতের ক্ষেত্রে আমল করা যাবে, তবে এই বিশ্বাস রাখা যাবে না যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে সাব্যস্ত হয়েছে। কারণ হতে পারে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুর্বল কথাটি বলেননি। ফলে তার উপর আমল করতে গিয়ে মিথ্যারোপ করার মত বিপদে পড়তে হতে পারে।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! যখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীস ভেবে কম দুর্বল হাদীসের উপরও আমল করা যাবে না, তখন তার উপর কোন স্বার্থে আমল করবেন? এটি কি ভেবে দেখার বিষয় নয়? এছাড়া সহীহ হাদীসের মধ্যে বর্ণিত ফযীলত সংক্রান্ত হাদীসগুলোর একচতুর্থাংশ হাদীসের উপরও কী আমরা আমল করতে সক্ষম হয়েছি? সবিনয়ে এ প্রশ্নটি আপনাদের সমীপে রাখছি।
পাঠক ভাই ও বোনেরা! পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমান সমাজে বহু লোক জাল হাদীসের উপর আমল করছেন। অথচ যখন তাদেরকে বলা হচ্ছে, এসব হাদীসের উপর আমল করা না জায়েয। কারণ এগুলো জাল (বানোয়াট) তখন তারা উত্তরে বলেছেন যে, ফযীলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীসের উপর আমল করা যায়।
অজ্ঞতা আমাদেরকে এমনভাবে ছেয়ে ফেলেছে যে; দুর্বল, খুবই দুর্বল ও জাল-এসবের মাঝে আমরা কোনরূপ পার্থক্য করতেই রাজি নই। জাল হাদীস যে হাদীসই নয় বরং তা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর মিথ্যারোপ-তাও আমরা বুঝার চেষ্টা করি না।
অনেকে আবার বলেন যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীস আবার কিভাবে জাল হয়? পাঠকবৃন্দ তারা ঠিকই বলেছেন। যেটি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীস সেটি জাল হতে পারে না। যে কথাটি আপনাদের ও আমাদের মত মানুষে তৈরী করে বলে দিচ্ছে যে, এটি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, সেটিই জাল এবং সেটিই জাল হাদীস হিসেবে আমাদের সমাজে পরিচিতি লাভ করেছে। এরূপ জালগুলোকেই আমরা পরিত্যাগ করে সহীহ সুন্নাহর দিকে আহ্বান করছি। আরো একটু ভেবে দেখুন! মিথ্যা (ভন্ড) নবী সাজা যদি সম্ভব হয় এবং বাস্তবে তার প্রমাণ মিলে, তাহলে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উদ্ধৃতিতে মিথ্যা হাদীস তৈরী করা কী এর চেয়ে বেশী সহজ নয়? এরূপ জাল হাদীসের প্রচলন বহু যুগ পূর্ব হতেই চলে আসছে। ফলে বিজ্ঞ-বিচক্ষণ আলেমগণ সেই সব জাল- বানোয়াট এবং দুর্বল হাদীসগুলোকে একত্রিত করে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। সাথে সাথে কেন জাল, কেন বেশী দুর্বল, কেন কম দুর্বল? এসবের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। অতএব আমাদেরকে একটু ভেবে দেখতে হবে দুর্বল হাদীসের উপর আমল করা যাবে কিনা? যদিও কোন কোন আলেম দুর্বল হাদীসের উপর শুধুমাত্র ফযীলতের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে আমল করা যাবে মর্মে মত পেশ করেছেন।
পাঠকবৃন্দ! আপনারা যদি দুর্বল হাদীসের উপর আমল করা যাবে মর্মে বর্ণিত ৩টি শর্ত একটু ভেবে দেখেন, তাহলে হয়তো আপনাদের নিকট "কম দুর্বল হাদীসের উপর আমল না করাই যুক্তিযুক্ত” এ মতটিই স্পষ্ট হবে।
আরো একটি সমস্যা বর্তমান সমাজে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সেটি হচ্ছে ফযীলত সম্পন্ন আর ফযীলত বিহীন সর্বক্ষেত্রেই একই মন্ত্র পাঠ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, যে কোন দুর্বল হাদীসের উপরই আমল করা যায়। ফযীলত কথাটি মুছে ফেলা হচ্ছে অথচ ফযীলত ব্যতীত অন্য ক্ষেত্রে কম দুর্বল হাদীসও গ্রহণযোগ্য নয়।
এছাড়া রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর যে মিথ্যারোপ করা হবে, জাল হাদীস তৈরী করা হবে-তার প্রমাণ বহন করছে স্বয়ং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণীঃ
১) রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ
" مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ "
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করবে সে জাহান্নামে তার স্থান বানিয়ে নিবে"। (বুখারী ও মুসলিম)
২) “যে ব্যক্তি আমার উদ্ধৃতিতে এমন ধরনের হাদীস বর্ণনা করল, ধারণা করা যাচ্ছে যে, সেটি মিথ্যা। সে ব্যক্তি মিথ্যুকদের একজন বা দু' মিথ্যুকদের একজন"। (মুসলিম)
৩) "আমার উপর মিথ্যারোপ করা তোমাদের পরস্পরের মাঝে মিথ্যারোপের মত নয়। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করবে সে যেন তার স্থান জাহান্নামে বানিয়ে নিল"। (মুসলিম)
৪) “যে ব্যক্তি আমার উপর (নামে) এমন কথা বলল যা আমি বলিনি, সে তার স্থান জাহান্নামে বানিয়ে নিল"। (ইবনু হিব্বান, হাদীসটি হাসান পর্যায়ের)
২নং ও ৪নং হাদীসটি প্রমাণ করছে যে, ইচ্ছাকৃত মিথ্যারোপ না করলেও হয় সে মিথ্যুক না হয় তার স্থান জাহান্নামে।
অতএব যে ব্যক্তি বলবেন যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীস আবার মিথ্যা হয় কিভাবে?-এর উত্তর উক্ত বাণীগুলোর মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। মিথ্যা হাদীস যদি তার উপর বানানোই না হতো তাহলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসগুলো উল্লেখ করে কঠিন শাস্তির কথা বলে সতর্ক করে দিতেন না।
মিথ্যুকদের দ্বারা তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উদ্ধৃতিতে মিথ্যা হাদীস বর্ণিত হবে জেনেই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উক্ত শাস্তির কথা বলেছেন। অন্যথায় তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাণীগুলো অর্থহীন হয়ে যেত।
এছাড়া যা কিছু শুনবেন আর তাই বর্ণনা করবেন এরূপ কাজ সহীহ হাদীস বিরোধী। কারণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ "মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ঠ যে,সে যা কিছু শুনবে তাই বর্ণনা করে বেড়াবে”। (ইমাম মুসলিমসহ আরো অনেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)।
"ফযীলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীসের উপর আমল করা যাবে – এ বিষয়ে শাইখ আলবানী (রহঃ) "সহীহ জামে' আস সাগীর" গ্রন্থের ভূমিকাতে যে বিবরণ দিয়েছেন তার সার সংক্ষেপ সহ আরো কিছু বিষয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
অনেকে এরূপ ধারণা পোষণ করেন যে, ফাযায়েলের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীসের উপর আমল করা যাবে এ মর্মে কোন মতভেদ নেই। বাস্তবিক পক্ষে তা সঠিক নয় বরং এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। যা "মুস্তালাহুল হাদীস” এর উপর রচিত গ্রন্থসমূহে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। যেমন شাইখ জামালুদ্দীন কাসেমী (রহঃ) তাঁর "কাওয়ায়েদুল হাদীস” (পৃঃ ১১৩) গ্রন্থের মধ্যে একদল ইমামের মতামত উল্লেখ করেছেন, যারা কোন অবস্থাতেই দুর্বল হাদীসের উপর আমল করাকে বৈধ মনে করেননি। তাদের মধ্য রয়েছেন ইবনু মা'ঈন, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, আবু বাক্ আল-আরাবী ও আরো অনেকে। তাদের দলে ইবনু হাযমও রয়েছেন।
হাফিয ইবনু রজব “শারহুত- তিরমিযী” (ক্বাফ ২/ ১১২) গ্রন্থে বলেনঃ- ইমাম মুসলিম কর্তৃক তার সহীহ গ্রন্থের ভূমিকাতে উল্লেখকৃত বাণীগুলোর বাহ্যিকতা প্রমাণ করছে যে, যাদের থেকে আহকামের হাদীসগুলো বর্ণনা করা হয়ে থাকে তাদের ন্যায় ব্যক্তিদের নিকট হতে তারগীব (উৎসাহমূলক) এবং তারহীবের (ভীতিমূলক) বর্ণনাও করা যাবে না।
আমি (আলবানী) বলছিঃ- আমি লোকদেরকে যে দিকে আহবান করছি তা হচ্ছে এই যে, দুর্বল হাদীসের উপর কোন অবস্থাতেই আমল করা যাবে না, চাই ফাযায়েলের ক্ষেত্রে হোক কিংবা অন্যকিছুর ক্ষেত্রে হোক।
যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা একাধিক আয়াতে অনুমানের উপর ভিত্তি করে আমল করাকে অপছন্দ করেছেন সেখানে কিভাবে বলা যায় দুর্বল হাদীসের উপর আমল করা যাবেঃ
"এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমানের উপর চলে। অথচ সত্যের ব্যাপারে অনুমান মোটেই ফলপ্রসূ নয়”। (সূরা আন্ নাজমঃ ২৮)
"তারা কেবল মাত্র অনুমান এবং প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে”। (আন্ নাজমঃ ২৩)
আর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “তোমরা অনুমান করা হতে নিজেদের রক্ষা কর, কারণ অনুমানই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা মিথ্যা কথা"। (হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন)। জেনে রাখুন! যারা দুর্বল হাদীসের উপর ফাযায়েলের ক্ষেত্রে আমল করা যাবে এরূপ কথা বলেছেন তাদের পক্ষে কুরআন ও হাদীসের কোনই দলীল নেই। দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য এমন ধরনের একটি দলীলও তাদের কোন আলেমের পক্ষে দেয়া সম্ভব হয় নি। শুধুমাত্র একে অপর হতে কতিপয় মত বা উক্তি উল্লেখ করেছেন। যা তর্কের স্থলে গ্রহণযোগ্য নয়। তদুপরি তাদের আলেমদের ভাষ্যের মধ্যেও মতদ্বন্দ লক্ষনীয়, যেমন ইবনুল হুমام বলেছেনঃ “দুর্বল হাদীস দ্বারা মুস্তাহাব সাব্যস্ত হয়, জাল হাদীস দ্বারা নয়।"
অতঃপর তিনি মুহাক্কেক জালালুদ্দীন আদ-দাওয়ানী হতে নকল করেছেন, তিনি বলেনঃ আলেমগণ একমত পোষণ করেছেন যে, দুর্বল হাদীস দ্বারা শরীয়তের পাঁচটি আহকাম (ফরয, মুস্তাহাব, মুবাহ, মাকরূহ ও হারাম) সাব্যস্ত হয় না, যে পাঁচটির মধ্যের একটি হচ্ছে মুস্তাহাব।
লক্ষ্য করুন! ইবনুল হুমাম বলেন দুর্বল হাদীস দ্বারা মুস্তাহাব সাব্যস্ত হয়, অথচ তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন যে, সকলের ঐক্যমতে ৫ টি আহকামের কোনটিই সাব্যস্ত হয় না, যার মধ্যে মুস্তাহাবও রয়েছে। অতএব তার কথায় দ্বন্দ স্পষ্ট। তিনি আদ-দাওয়ানী হতে যে বক্তব্য বর্ণনা করেছেন তাই সঠিক।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) "আল- কায়েদাতুল জালীলাহ ফিত তাওয়াসুলে ওয়াল ওয়াসীলা" (পৃঃ ৮২) গ্রন্থে বলেছেনঃ "শরীয়তের মধ্যে য'ঈফ হাদীসগুলোর উপর নির্ভর করা জায়েয হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো সহীহ বা হাসান পর্যায়ভুক্ত এরূপ প্রমাণিত না হবে। তবে ইমাম আহমাদ (রহঃ) ও কতিপয় আলেম ফযীলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীসকে বর্ণনা করা জায়েয বলেছেন যদি মূল আমলটি শার'ঈ সহীহ দলীল দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে প্রমাণিত হয় এবং উক্ত সাব্যস্ত হওয়া আমলটির ফযীলতে বর্ণিত দুর্বল হাদীসটি মিথ্যা নয় বলে জানা যায়। আর এরূপ হলে সওয়াবটি সত্য বলা জায়েয হতে পারে।
কোন ইমামই বলেননি যে, য'ঈফ হাদীস দ্বারা কোন বস্তুকে ওয়াজিব বা মুস্তাহাব হিসেবে সাব্যস্ত করা জায়েয, যে ব্যক্তি এরূপ বলবেন তিনি ইজমার বিপরীত কথা বলবেন।"
অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেনঃ “ইমাম আহমাদ (রহঃ) এবং তার ন্যায় কোন ইমাম শরীয়তের মধ্যে এ ধরনের হাদীসের উপর নির্ভর করেননি। যে ব্যক্তি ইমাম আহমাদ (রহঃ) হতে এরূপ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি দুর্বল হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন (যেটি সহীহ নয় আবার হাসান পর্যায়ভুক্তও নয়) তিনি ভুল করেছেন।"
অতএব আপনারা জেনেছেন যে, সকল ইমামের ঐক্যমতে কোন মুস্তাহাব য'ঈফ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয় না। যদিও কোন কোন ইমামের নিকট শর্তসাপেক্ষে ফযীলতভুক্ত য'ঈফ হাদীসের উপর আমল করা যাবে, তবুও এরূপ মতকে গ্রহণ করা মোটেই বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে না। শুধুমাত্র সহীহ হাদীস বর্ণনা করাই ওয়াজিব।
টিকাঃ
230 মূল - শাইখ নাসির উদ্দীন আল-আলবানী (রহঃ) অনুবাদ - আবু শিফা মুহাম্মদ আকমাল হুসাইন