📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 কয়েকটি মা’রুফ হাদীস বা জাল হাদীসের উদাহরণ

📄 কয়েকটি মা’রুফ হাদীস বা জাল হাদীসের উদাহরণ


১) “যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা আল-ওয়াক্বে’য়াহ পাঠ করবে, তাকে কখনও অভাব (ক্ষুধা) গ্রাস করবে না।” হাদীসটি দুর্বল। সূত্রঃ হাদীসটি হারিস ইবনু আবী উসামা তার "মুসনাদ” গ্রন্থে (১৭৮), ইবনুস সুন্নী "আমালুল ইয়াউম ওয়াল লাইলাহ” গ্রন্থে (৬৭৪), ইবনু লাল তার "হাদীস” গ্রন্থে (১/১১৬), ইবনু বিশরান "আল- আমালী" গ্রন্থে (২০/৩৮/১) বর্ণনা করেছেন আবূ শুযা' সূত্রে আবূ তায়বাহ হতে।
দুর্বল বলেছেনঃ ইমাম আহমাদ (রহঃ), আবু হাতিম (রহঃ), ইবনু আবী হাতিম (রহঃ), দারা কুতুনী (রহঃ), ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ)।
(ক) ইমাম মানাবী (রহঃ) বলেনঃ হাদীসটি মুনকার। (আত্- তায়সীর)
(খ) হাদীসটির রাবীদের সম্পর্কে ইমাম যাহাবী (রহঃ) বলেনঃ আবু শুযাকে চেনা যায় না এবং আবু তায়বাহ মাজহুল।
ইমাম যায়লাঈ (রহঃ) হাদীসটি দোষণীয় হওয়ার কারণ উল্লেখ করেছেনঃ-
(ক) এটির সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
(খ) হাদীসটির মতনে (ভাষায়) দুর্বোধ্যতা রয়েছে।
(গ) হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ দুর্বল।
(ঘ) এছাড়া ইযতিরাব রয়েছে।
২) “যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা আল-ওয়াকেয়াহ পাঠ করবে; তাকে কখনও অভাব গ্রাস করবে না। যে ব্যক্তি প্রতি রাতে লা-উকসিমু বি-ইয়াওমিল ক্বিয়ামাহ পাঠ করবে; সে কিয়ামত দিবসে আল্লাহর সাথে এমতাবস্থায় মিলিত হবে যে, তার চেহারা পূর্ণিমা রাতের চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল থাকবে।"
হাদীসটি জাল। সূত্রঃ এটি দায়লামী, আহমাদ ইবনু উমার ইয়ামানী সূত্রে নিজ সনদে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) "যায়লুল আহাদীসুল মাওযূ'আহ” গ্রন্থে (১৭৭) উল্লেখ করে বলেছেনঃ বর্ণনাকারী আহমাদ ইয়ামানী মিথ্যুক।
৩) "আমি সে সময়েও নবী ছিলাম যখন আদম পানি এবং মাটির মাঝে ছিলেন।"
নিম্নের হাদীসটিও এটির ন্যায়ঃ- "যখন আদম ছিলেন না, পানি ও মাটি ছিল না তখনও আমি নবী ছিলাম।" হাদীস দু' টি জাল।
হাদীসটি জাল বলেছেনঃ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) এবং ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) সহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সকল মুহাদ্দিস।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) "বাকরীর প্রতিবাদ" গ্রন্থের মধ্যে (পৃষ্ঠাঃ ৯) বলেছেনঃ "কুর'আন ও হাদীসের মধ্যে এমন কি সুস্থ বিবেকেও এটির কোন ভিত্তি নেই। কোন মুহাদ্দিসই এটি উল্লেখ করেননি। এটির অর্থও বাতিল। কারণ আদম (আলাইহিস সালাম) কখনও পানি এবং মাটির মাঝে ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন দেহ এবং রূহ এর মাঝে।"
৪) "চীন দেশে গিয়ে হলেও তোমরা জ্ঞান অন্বেষণ কর।" হাদীসটি বাতিল। সূত্রঃ এটি যেসব গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছেঃ "আখবারূ আসহাবান” (২/১০৬); "আল-ফাওয়াইদ” (২/২৪১); "আল-আরবা'য়ীন” (২/১৫১); "আত্-তারিখ” (৯/৩৬৪); "কিতাবুল রেহালা" (১/২); "আল-মাদখাল" (২৪১/৩২৪); "আল-মুনতাকা" (১/২৮)। উপরের প্রত্যেকটি গ্রন্থে জাল হাদীসটি হাসান ইবনু আতিয়া সূত্রে "আবূ আতিকা” হতে বর্ণিত হয়েছে।
হাদীসটির বর্ণনাকারী "আবু আতিকা” সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেনঃ এটি মুনকারূল হাদীস।
* ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বলেনঃ তিনি নির্ভরযোগ্য নন।
* ইমাম উকায়লী (রহঃ) বলেনঃ তিনি নিতান্তই দুর্বল।
* ইমাম আবু হাতিম (রহঃ) বলেনঃ তিনি যাহেবুল হাদীস।
* ইমাম ইবনুল জাওযী (রহঃ) ও ইমাম ইবনু হিব্বান (রহঃ) বলেনঃ হাদীসটি বাতিল।
* ইমাম সুলায়মানী (রহঃ) "আবু আতিকাকে” হাদীস জালকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
* ইমাম সাখাবী (রহঃ) তার "মাকাসীদুল হাসানা" গ্রন্থে উপরোক্ত মত সমর্থন করেন।
* ইমাম আহমাদ (রহঃ) এ হাদীসটিকে কঠোর ভাষায় ইনকার করেছেন।
* ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) “আল-লায়ালী " (১/১৯৩) গ্রন্থে বলেনঃ হাদীসটির আরো দু'টি সূত্র রয়েছেঃ-
১) একটির সনদে রয়েছেন ইয়াকুব ইবনু ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আসকালনী। এ ইয়াকূব সম্পর্কে ইমাম যাহাবী (রহঃ) বলেনঃ সে মিথ্যুক।
২) দ্বিতীয়টির সনদে রয়েছেন আহমাদ ইবনু আবদুল্লাহ যুওয়াইবারী। যুওয়াইবারী হাদীস জালকারী।
৫) "যে ব্যক্তি মাগরিবের পরে কথা বলার পূর্বেই ছয় রাকায়াত সালাত আদায় করবে; তা দ্বারা তার ৫০ বছরের গুণাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
হাদীসটি নিতান্তই দুর্বল। সূত্রঃ এটি ইবনু নাসর "কিয়ামুল্লাহ” গ্রন্থে (পৃঃ ৩৩) মুহাম্মদ ইবনু গাযওয়ান দামেস্কীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
হাদীসটি ইমাম ইবনু আবী হাতিম (রহঃ) তার "আল-ইলাল” গ্রন্থে এ সূত্রেই (১/১৭৮) উল্লেখ করেছেন, অতঃপর বলেছেনঃ-
ইমাম আবু যুর'য়াহ (রহঃ) বলেনঃ তোমরা এ হাদীসটিকে পরিহার কর। কারণ এটি বানোয়াট হাদীসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। মুহাম্মদ ইবনু গাযওয়ান দামেস্কী মুনকারুল হাদীস।
৬) যে শুক্রবার আমার প্রতি ৮০ বার দুরুদ পাঠাবে তার ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।
এই হাদীসটি আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত বলে দাবি করা হলেও এটি একটি জাল হাদীস। তাবলীগ জামাতের কিছু বইয়ে এই ধরণের হাদীস অনেক পাওয়া যায়, যেখানে দুরুদের নানা ধরণের মাত্রাতিরিক্ত সওয়াব, ফজিলত ইত্যাদি বর্ণনা করা থাকে। আল্লামা সাখায়ী একে দুর্বল এবং আলবানী একে জাল হাদীস বলে চিহ্নিত করেছেন।
এটি কু'রআনের পরিপন্থী কারণ আল্লাহ (ﷻ) স্পষ্ট ভাবে বলে দিয়েছেনঃ যে একটি ভালো কাজ নিয়ে আসবে, আল্লাহ তাকে তার দশ গুণ বেশি প্রতিদান দিবেন এবং যে একটি খারাপ কাজ নিয়ে আসবে, তাকে তার সমান প্রতিদান ছাড়া কম-বেশি দেওয়া হবে না। কারো সাথে বিন্দুমাত্র অবিচার করা হবে না। [৬:১৬০]।
সুতরাং যখনি কোন হাদীস পাবেন যে, অমুক করলে ১০ বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে, তমুক করলে ১০ বছর নফল নামায পড়ার সওয়াব পাওয়া যাবে, ধরে নিতে পারেন সেগুলো হয় দুর্বল হাদীস, না হয় জাল হাদীস।

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 ‘মাউযূ’ বা হাদীসে জাল করণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

📄 ‘মাউযূ’ বা হাদীসে জাল করণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা


ইসলাম বিদ্বেষী চক্র কর্তৃক হাদীস জাল করনের যে ঘৃণ্য ও হীন চক্রান্ত শুরু হয় তা অবলোকন করে তৎকালীন প্রশাসক এবং হাদীস শাস্ত্র বিশারদগণ তৎপর হয়ে উঠেন। হাদীসকে এই অশুভ চক্র থেকে নির্ভুল রাখতে তাঁরা প্রশাসনিক ও যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাদের কঠোর প্রতিরোধের ফলে চক্রান্তকারী দল বেশীদূর অগ্রসর হতে পারেনি। অধিকন্তু তারা এমন কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ হাদীস জাল করার মতো দুঃসাহস করতে গেলে সহজেই ধরা পড়ে নাজেহাল হতে বাধ্য হয়।

ইসলাম বিদ্বেষী চক্র কর্তৃক হাদীস জাল করনের যে ঘৃণ্য ও হীন চক্রান্ত শুরু হয় তা অবলোকন করে তৎকালীন প্রশাসক এবং হাদীস শাস্ত্র বিশারদগণ তৎপর হয়ে উঠেন। হাদীসকে এই অশুভ চক্র থেকে নির্ভুল রাখতে তাঁরা প্রশাসনিক ও যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাদের কঠোর প্রতিরোধের ফলে চক্রান্তকারী দল বেশীদূর অগ্রসর হতে পারেনি। অধিকন্তু তারা এমন কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ হাদীস জাল করার মতো দুঃসাহস করতে গেলে সহজেই ধরা পড়ে নাজেহাল হতে বাধ্য হয়।

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 যঈফ ও জাল হাদীস এবং মুসলিম সমাজে তার কুপ্রভাব

📄 যঈফ ও জাল হাদীস এবং মুসলিম সমাজে তার কুপ্রভাব


ইসলামী শরীয়তের দুটি মুল উৎস হচ্ছে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আমি তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ঐ দুটিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। সে দুটি হল আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত (আল-হাদীস)। (মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক, মিশকাত হা/১৮৬; আল-মুস্তাদরাক লিল হাকেম, সনদ হাসান)। যেহেতু উপরোক্ত দুটি উৎসই ইসলামী জীবন- যাপনের মূল হাতিয়ার এবং এর উপরেই মুসলমানদের হেদায়াত নির্ভরশীল, সেহেতু যুগ পরস্পরায় ইসলামের শত্রুরা এ দুটি মূল উৎসের মাঝেই ভেজাল ঢুকানোর চেষ্টা করেছে। কুরআন যেহেতু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়েই লিখিত আকারে সংরক্ষিত ছিল। কণ্ঠস্থ ছিল বহু সাহাবীর। কাজেই তারা কুরআনে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস ছিল এর কিছুটা ব্যতিক্রম। হাদীস তখন লিখিত আকারে ছিল না। ছিল বিভিন্ন সাহাবীর স্মৃতিপটে সংরক্ষিত। তাও আবার গচ্ছিত আকারে নয়। লিখিত আকারে খুব কমই সংরক্ষিত ছিল। এই সুযোগে ইসলামের চির শত্রুরা ও মুসলিম নামধারী বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল এই দ্বিতীয় উৎসের মধ্যে তাদের কালো হাত বসিয়েছে। হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম এবং যা শরীয়ত নয় তাকে শরীয়তে রূপ দেওয়ার জন্য বহু হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম দিয়ে জাল করেছে। কিন্তু মহান রাব্বুল আলামীন যুগে যুগে এমন পণ্ডিতদেরও আবির্ভাব ঘটিয়েছেন, যারা ঐ সমস্ত যঈফ ও জাল হাদীসগুলিকে ছাটাই বাছাই করতে সক্ষম হয়েছেন।
ইমাম ইবনুল জাওযী বলেন, যখন কারো পক্ষে কুরআন মজীদে অনুপ্রবেশ ঘটানো সম্ভব হয়নি, তখন কিছু সংখ্যক লোক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস বর্ণিত করতে শুরু করে এবং তিনি বলেননি এমন কথাও তাঁর নাম দিয়ে চালাতে শুরু করে। আর এর প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালা এমন আলেমদের আবির্ভাব ঘটালেন, যাঁরা মিথ্যা বর্ণনা অপসারণ করতে শুরু করেন এবং সহীহ হাদীস কোনটি তা স্পষ্ট করে দেন। আল্লাহ তায়ালা এরূপ পণ্ডিত ব্যক্তিদের থেকে কোন যুগকেই শূন্য রাখেননি। তবে এ ধরনের ব্যক্তিত্বদের অস্তিত্ব সাম্প্রতিককালে হ্রাস পেয়েছে। এমনকি বর্তমানে তাদের প্রাপ্তি পশ্চিমা ডলফিন প্রাপ্তির চেয়েও দুর্লভ হয়ে পড়েছে। (সিলসিলাতুল আহাদীস আয-যাঈফাহ ওয়াল মওযূআহ ১/৪১)২২৮। ইমাম ইবনুল জাওযীর যুগেই যখন হাদীসের মহা পন্ডিতদের এরূপ অভাব দেখা দিয়েছিল, সেখানে বর্তমান যুগে এ অভাব আরও তীব্র হওয়া স্বাভাবিক নয় কি? বাস্তব পরিস্থিতিও তাই। সারা বিশ্বে আজ যঈফ ও জাল হাদীসের ছড়াছড়ি। কি খতীব, কি ওয়ায়েয, কি প্রবন্ধকার, কি তথাকথিত মুহাদ্দিস সকলের মুখে শুধু যঈফ ও জাল হাদীস শুনা যায়। কিন্তু এগুলি থেকে সতর্ককারী রয়েছেন কজন? যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানীসহ হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তিত্ব ছাড়া? তাদের লেখনীও আবার আরবীতে। যা বাংলাভাষী মুসলমানদের জন্য বুঝা কষ্টকর।
এই ঘোলাটে পরিস্থিতি অনুধাবন করেই আমরা উভয় বাংলার মানুষকে যঈফ ও জাল হাদীস থেকে সতর্ক করার জন্য কলম হাতে নিয়েছি। আমরা বাংলার মুমিন সমাজকে জানিয়ে দিতে চাই যে, হাদীস বর্ণনায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। হাদীসের অবস্থা না জেনে তা দিয়ে দলীল পেশ করা যাবে না। আমরা আরও চাই বাংলার মানুষকে ঐ সমস্ত হাদীসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে, যেগুলিকে তারা অজ্ঞতা বশত: কিংবা ঐ রকম বই-কিতাব না থাকায় সহীহ হাদীস মনে করে আমল করে আসছে। অথচ তা নিতান্তই যঈফ বা জাল। বহুকাল আগে থেকেই হাদীস শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ এগুলোকে যঈফ ও জাল হাদীস বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং বর্তমান যুগের হাদীস শাস্ত্রবিদগণও ওগুলোর যঈফ ও জাল হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর মিথ্যা রোপ করার কঠিন গোনাহ হতে রক্ষা করা।
আল্লাহ আমাদের সকলকে যঈফ ও জাল হাদীস চিনার ও তা থেকে সতর্ক থাকার সাথে সাথে কুরআন ও সহীহ হাদীস ভিত্তিক আমল করার তাওফীক দিন-আমীন!

টিকাঃ
২২৮ সিলসিলাতুল আহাদীস আয-যাঈফাহ ওয়াল মওযূআহ ১/৪১

ইসলামী শরীয়তের দুটি মুল উৎস হচ্ছে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আমি তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ঐ দুটিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। সে দুটি হল আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত (আল-হাদীস)। (মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক, মিশকাত হা/১৮৬; আল-মুস্তাদরাক লিল হাকেম, সনদ হাসান)। যেহেতু উপরোক্ত দুটি উৎসই ইসলামী জীবন- যাপনের মূল হাতিয়ার এবং এর উপরেই মুসলমানদের হেদায়াত নির্ভরশীল, সেহেতু যুগ পরস্পরায় ইসলামের শত্রুরা এ দুটি মূল উৎসের মাঝেই ভেজাল ঢুকানোর চেষ্টা করেছে। কুরআন যেহেতু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়েই লিখিত আকারে সংরক্ষিত ছিল। কণ্ঠস্থ ছিল বহু সাহাবীর। কাজেই তারা কুরআনে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস ছিল এর কিছুটা ব্যতিক্রম। হাদীস তখন লিখিত আকারে ছিল না। ছিল বিভিন্ন সাহাবীর স্মৃতিপটে সংরক্ষিত। তাও আবার গচ্ছিত আকারে নয়। লিখিত আকারে খুব কমই সংরক্ষিত ছিল। এই সুযোগে ইসলামের চির শত্রুরা ও মুসলিম নামধারী বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল এই দ্বিতীয় উৎসের মধ্যে তাদের কালো হাত বসিয়েছে। হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম এবং যা শরীয়ত নয় তাকে শরীয়তে রূপ দেওয়ার জন্য বহু হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম দিয়ে জাল করেছে। কিন্তু মহান রাব্বুল আলামীন যুগে যুগে এমন পণ্ডিতদেরও আবির্ভাব ঘটিয়েছেন, যারা ঐ সমস্ত যঈফ ও জাল হাদীসগুলিকে ছাটাই বাছাই করতে সক্ষম হয়েছেন।
ইমাম ইবনুল জাওযী বলেন, যখন কারো পক্ষে কুরআন মজীদে অনুপ্রবেশ ঘটানো সম্ভব হয়নি, তখন কিছু সংখ্যক লোক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস বর্ণিত করতে শুরু করে এবং তিনি বলেননি এমন কথাও তাঁর নাম দিয়ে চালাতে শুরু করে। আর এর প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালা এমন আলেমদের আবির্ভাব ঘটালেন, যাঁরা মিথ্যা বর্ণনা অপসারণ করতে শুরু করেন এবং সহীহ হাদীস কোনটি তা স্পষ্ট করে দেন। আল্লাহ তায়ালা এরূপ পণ্ডিত ব্যক্তিদের থেকে কোন যুগকেই শূন্য রাখেননি। তবে এ ধরনের ব্যক্তিত্বদের অস্তিত্ব সাম্প্রতিককালে হ্রাস পেয়েছে। এমনকি বর্তমানে তাদের প্রাপ্তি পশ্চিমা ডলফিন প্রাপ্তির চেয়েও দুর্লভ হয়ে পড়েছে। (সিলসিলাতুল আহাদীস আয-যাঈফাহ ওয়াল মওযূআহ ১/৪১)২২৮। ইমাম ইবনুল জাওযীর যুগেই যখন হাদীসের মহা পন্ডিতদের এরূপ অভাব দেখা দিয়েছিল, সেখানে বর্তমান যুগে এ অভাব আরও তীব্র হওয়া স্বাভাবিক নয় কি? বাস্তব পরিস্থিতিও তাই। সারা বিশ্বে আজ যঈফ ও জাল হাদীসের ছড়াছড়ি। কি খতীব, কি ওয়ায়েয, কি প্রবন্ধকার, কি তথাকথিত মুহাদ্দিস সকলের মুখে শুধু যঈফ ও জাল হাদীস শুনা যায়। কিন্তু এগুলি থেকে সতর্ককারী রয়েছেন কজন? যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানীসহ হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তিত্ব ছাড়া? তাদের লেখনীও আবার আরবীতে। যা বাংলাভাষী মুসলমানদের জন্য বুঝা কষ্টকর।
এই ঘোলাটে পরিস্থিতি অনুধাবন করেই আমরা উভয় বাংলার মানুষকে যঈফ ও জাল হাদীস থেকে সতর্ক করার জন্য কলম হাতে নিয়েছি। আমরা বাংলার মুমিন সমাজকে জানিয়ে দিতে চাই যে, হাদীস বর্ণনায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। হাদীসের অবস্থা না জেনে তা দিয়ে দলীল পেশ করা যাবে না। আমরা আরও চাই বাংলার মানুষকে ঐ সমস্ত হাদীসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে, যেগুলিকে তারা অজ্ঞতা বশত: কিংবা ঐ রকম বই-কিতাব না থাকায় সহীহ হাদীস মনে করে আমল করে আসছে। অথচ তা নিতান্তই যঈফ বা জাল। বহুকাল আগে থেকেই হাদীস শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ এগুলোকে যঈফ ও জাল হাদীস বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং বর্তমান যুগের হাদীস শাস্ত্রবিদগণও ওগুলোর যঈফ ও জাল হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর মিথ্যা রোপ করার কঠিন গোনাহ হতে রক্ষা করা।
আল্লাহ আমাদের সকলকে যঈফ ও জাল হাদীস চিনার ও তা থেকে সতর্ক থাকার সাথে সাথে কুরআন ও সহীহ হাদীস ভিত্তিক আমল করার তাওফীক দিন-আমীন!

টিকাঃ
২২৮ সিলসিলাতুল আহাদীস আয-যাঈফাহ ওয়াল মওযূআহ ১/৪১

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 ‘মাউযূ’ বা জাল হাদীসের প্রকারভেদ

📄 ‘মাউযূ’ বা জাল হাদীসের প্রকারভেদ


এই موضوع 'মাউজু' বা জাল হাদীস কয়েক ধরনের হয়, যথাঃ
১. কোন ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে কোন বাক্য বানিয়ে রাসূল (সাঃ) সাহাবী (صحابی) অথবা তাবেয়ী (تابعی) এর নামে চালিয়ে দেয়া।
২. কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি, সাহাবী (صحابی), তাবেয়ী (تابعی), ছুফিয়ায়ে কেরাম অথবা অন্য কারো কথা নিয়ে রাসূল (সাঃ) এর নামে চালিয়ে দেয়া যাতে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়। (তথ্যসূত্রঃ আল- ইসরাইলিয়‍্যাত ওয়াল – মাউজুয়াত: ১৫) 229।
مَوْضُوْعٌ (মাওযু): যে হাদীস এর রাবী জীবনে কখনও রাসূল (সাঃ) ওনার নামে ইচ্ছা করে কোন মিথ্যা কথা রচনা করেছে বলে সাব্যস্ত হয়েছে- তার হাদীসকে হাদীসে মাওযু বলে। এরূপ ব্যক্তির কোন হাদীসই কখনও গ্রহণযোগ্য নয় যদিও তিনি অতঃপর খালিস তওবা করেন। (অত্র গ্রন্থে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, ২৫২ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।
مَتْرُوْكُ (মাতরূক): যে হাদীস এর রাবী হাদীসের ব্যাপারে নয় বরং সাধারণ কাজ-কারবারে মিথ্যা কথা বলেন বলে খ্যাত হয়েছেন- তার হাদীসকে হাদীসে মাতরূক বলে। এরূপ ব্যক্তিরও সমস্ত হাদীস পরিত্যাজ্য।
مُبْهَمْ (মুহাম): مُبْهَمَّ এর আভিধানিক অর্থঃ অস্পষ্ট। 'মুবহাম'-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেনঃ "যে হাদীসের সনদে কোনো একজন রাবীকে উল্লেখ করা হয়নি তাই মুবহাম"। যেমন, حدثني رجل، قال: حدثني خالد عن راشد কারণ এখানে একজন রাবীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। অনুরূপ কোনো রাবী যদি বলে حدثني الثقة 'আমাকে জনৈক সিকাহ বলেছে' তবুও তা মুবহাম। কারণ, 'সিকাহ' রাবী পরিচিত নয়। হয়তো তার নিকট সিকাহ, প্রকৃতপক্ষে সিকাহ নয়।
অনুরূপ কেউ যদি বলেঃ حدثني من أثق به 'এমন ব্যক্তি আমাকে বলেছে, যার উপর আমি আস্থাশীল', তবু হাদীস মুবহাম, কারণ মুবহাম ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো প্রশংসা গ্রহণীয় নয়। অনুরূপ কেউ যদি বলেঃ حدثني صاحب هذه الدار 'আমাকে এ বাড়িওয়ালা বলেছে', তবু হাদীস মুবহাব, যতক্ষণ না তার পরিচয় জানা যায়।
অর্থাৎ যে হাদীস - এর রাবীর উত্তমরূপে পরিচয় পাওয়া যায়নি- যাতে ওনার দোষ-গুণ বিচার করা যেতে পারে, ওনার হাদীসকে হাদীসে মুবহাম বলে। এরূপ ব্যক্তি সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু না হলে ওনার হাদীস গ্রহণ করা যায় না।
মুবহাম হাদীসের হুকুমঃ মুবহাম হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ মুবহাম রাবী সিকাহ না গায়রে সিকাহ জানা নেই, তবে তাবে'ঈ বা তাবে তাবে'ঈ মুবহাম হলে শাহেদ হওয়ার যোগ্য। কারণ, এ দুই তবকা সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণের সাক্ষ্য দিয়েছেন, পরবর্তী যুগে মিথ্যার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

টিকাঃ
229 আল- ইসরাইলিয়্যাত ওয়াল মাউজুয়াত: ১৫

এই موضوع 'মাউজু' বা জাল হাদীস কয়েক ধরনের হয়, যথাঃ
১. কোন ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে কোন বাক্য বানিয়ে রাসূল (সাঃ) সাহাবী (صحابی) অথবা তাবেয়ী (تابعی) এর নামে চালিয়ে দেয়া।
২. কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি, সাহাবী (صحابی), তাবেয়ী (تابعی), ছুফিয়ায়ে কেরাম অথবা অন্য কারো কথা নিয়ে রাসূল (সাঃ) এর নামে চালিয়ে দেয়া যাতে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়। (তথ্যসূত্রঃ আল- ইসরাইলিয়‍্যাত ওয়াল – মাউজুয়াত: ১৫) 229।
مَوْضُوْعٌ (মাওযু): যে হাদীস এর রাবী জীবনে কখনও রাসূল (সাঃ) ওনার নামে ইচ্ছা করে কোন মিথ্যা কথা রচনা করেছে বলে সাব্যস্ত হয়েছে- তার হাদীসকে হাদীসে মাওযু বলে। এরূপ ব্যক্তির কোন হাদীসই কখনও গ্রহণযোগ্য নয় যদিও তিনি অতঃপর খালিস তওবা করেন। (অত্র গ্রন্থে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, ২৫২ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।
مَتْرُوْكُ (মাতরূক): যে হাদীস এর রাবী হাদীসের ব্যাপারে নয় বরং সাধারণ কাজ-কারবারে মিথ্যা কথা বলেন বলে খ্যাত হয়েছেন- তার হাদীসকে হাদীসে মাতরূক বলে। এরূপ ব্যক্তিরও সমস্ত হাদীস পরিত্যাজ্য।
مُبْهَمْ (মুহাম): مُبْهَمَّ এর আভিধানিক অর্থঃ অস্পষ্ট। 'মুবহাম'-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক বলেনঃ "যে হাদীসের সনদে কোনো একজন রাবীকে উল্লেখ করা হয়নি তাই মুবহাম"। যেমন, حدثني رجل، قال: حدثني خالد عن راشد কারণ এখানে একজন রাবীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। অনুরূপ কোনো রাবী যদি বলে حدثني الثقة 'আমাকে জনৈক সিকাহ বলেছে' তবুও তা মুবহাম। কারণ, 'সিকাহ' রাবী পরিচিত নয়। হয়তো তার নিকট সিকাহ, প্রকৃতপক্ষে সিকাহ নয়।
অনুরূপ কেউ যদি বলেঃ حدثني من أثق به 'এমন ব্যক্তি আমাকে বলেছে, যার উপর আমি আস্থাশীল', তবু হাদীস মুবহাম, কারণ মুবহাম ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো প্রশংসা গ্রহণীয় নয়। অনুরূপ কেউ যদি বলেঃ حدثني صاحب هذه الدار 'আমাকে এ বাড়িওয়ালা বলেছে', তবু হাদীস মুবহাব, যতক্ষণ না তার পরিচয় জানা যায়।
অর্থাৎ যে হাদীস - এর রাবীর উত্তমরূপে পরিচয় পাওয়া যায়নি- যাতে ওনার দোষ-গুণ বিচার করা যেতে পারে, ওনার হাদীসকে হাদীসে মুবহাম বলে। এরূপ ব্যক্তি সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু না হলে ওনার হাদীস গ্রহণ করা যায় না।
মুবহাম হাদীসের হুকুমঃ মুবহাম হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ মুবহাম রাবী সিকাহ না গায়রে সিকাহ জানা নেই, তবে তাবে'ঈ বা তাবে তাবে'ঈ মুবহাম হলে শাহেদ হওয়ার যোগ্য। কারণ, এ দুই তবকা সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণের সাক্ষ্য দিয়েছেন, পরবর্তী যুগে মিথ্যার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

টিকাঃ
229 আল- ইসরাইলিয়্যাত ওয়াল মাউজুয়াত: ১৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00