📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীস জাল করার কারণ ও উদ্দেশ্য

📄 হাদীস জাল করার কারণ ও উদ্দেশ্য


ইসলাম বিদ্বেষী গোষ্ঠী ইসলামের মূলোচ্ছেদ করতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। মুসলমান নাম ও বেশ ধারনের ছদ্মাবরণে কতিপয় লোক জাল করনের মতো ঘৃণ্য ও হীন পন্থা বেছে নেয়। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার দৃষ্টিতে জালকারীদেরকে ৬টি স্তরে ভাগ করা যায়। এই ছয় শ্রেণীর লোক স্ব স্ব উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে হাদীস জালকরণে প্রবৃত্ত হয় 223।
নিম্নে হাদীস জাল করার কারন ও উদ্দেশ্য সমূহ আলোচনা করা হলোঃ-
১) মুনাফিকরা এবং কাফিররা মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য মুসলিম ছদ্মবেশে জাল হাদীস প্রচার করতো।
২) আলেমদের মধ্যে যারা নিজেরা যত বেশি হাদীস সংগ্রহ করেছে বলে দাবি করতে পারতো, সে তত বেশি সন্মান পেত। তাই সন্মানের লোভে অনেক আলেম, পীর, দরবেশ মিথ্যা হাদীস প্রচার করে গেছে।
"এই হাদীসটির ইসনাদ আমার কাছে একদম মুহাম্মাদ (ﷺ) থেকে এসে পৌঁছেছে"- এই ধরনের দাবী করতে পারাটা একটা বিরাট গৌরবের ব্যাপার ছিল, এখনও আছে।
৩) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আগেকার রাজা-বাদশা, শাসকরা আলেমদের ব্যবহার করে মিথ্যা হাদীস প্রচার করতো। জনতাকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হাদীসের চেয়ে মোক্ষম অস্ত্র আর কিছু ছিল না।
৪) ধর্মের প্রতি মানুষকে আরও অনুপ্রাণিত করার জন্য নানা চমকপ্রদ, অলৌকিক ঘটনায় ভরপুর জাল হাদীস প্রচার করা হত, যেগুলো শুনে সাধারণ মানুষ ভক্তিতে গদগদ হয়ে যেত।
৬) ধর্মীয় উপাসনালয় এবং বিশেষ স্থানগুলোতে মানুষের আনাগোনা বাড়ানো এবং তা থেকে ব্যবসায়িক লাভের জন্য জাল হাদীস ব্যবহার করে সেসব স্থানের অলৌকিকতা, বিশেষ ফজিলত প্রচার করা হত। সাধারণ মানুষ তখন ঝাঁকে ঝাঁকে সেই সব অলৌকিক, প্রসিদ্ধ স্থানে গিয়ে তাদের বিপুল পরিমাণের অর্থনৈতিক লাভ করে দিয়ে আসতো।
৭) জিন্দিকগণ পারসিক জিনদের ধর্মাবলম্বী একদল লোক বাহ্যত নিজেদেরকে মুসলমান বলে পরিচয় দিত, কিন্তু প্রচ্ছন্ন ভাবে ইসলামের ক্ষতি সাধনের চেষ্টায় থাকত। এ সমস্ত লোকেরা ইসলামের মূলনীতি ও বিশ্বাসের প্রতি মানুষকে শ্রদ্ধাহীন করার জন্য রাসুলের (সাঃ) নামে অযৌক্তিক হাজার হাজার হাদীস প্রচলন করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের অনিষ্ট সাধন। তাছাড়া সাধারন মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতঃ ইসলামের সৌন্দর্য নষ্ট করা ও অগ্রগতি ব্যাহত করাই তাদের উদ্দেশ্য। এরা ইসলাম বিদ্বেষী চরম শত্রু224। হাম্মাদ বিন যায়েদ বলেনঃ যিনদীকরা রাসূল (সাঃ) এর নামে ১৪ হাজার হাদীস জাল করে। আবদুল করীম ইবনে আবুল আওযা নামে এক যিনদীককে মাহদীর খেলাফত আমলে বসরার আমীর মুহাম্মদ বিন সুলাইমান আল আব্বাসী ১৬০ হিজরী সনে যিনদীক হওয়ার কারনে হত্যা করেন। হত্যা করার সময় সে বলেঃ "আমি তোমাদের মধ্যে চার (৪) হাজার হাদীস জাল করি যেগুলোর মাধ্যমে আমি হালালকে হারাম মনে করি আর হারামকে হালাল মনে করি।"
যিনদীক গোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বনী তামীমের কিনইয়ান ইবনে সাময়ান আন-নাহদী। খালিদ বিন আবদুল্লাহ আল কাসরী তাকে হত্যা করে আগুনে জ্বালিয়ে দেন। মুহাম্মদ বিন সায়ীদ ইবনে হাসান আল আসাদী নামীয় যিনদীককে আবু জাফর আল মানসুর হত্যা করেন। সে প্রায় চার হাজার জাল করে।
৮) অতি পরহেজগারগণ নিজেদেরকে সুফি প্রমানের লক্ষে জাল হাদীস তৈরি করত।
৯) সদুদ্দেশ্যে
১০) তর্কবিতর্কের ক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ)- এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের জন্য মনগড়া হাদীস বর্ণনা করে।
১১) যুদ্ধে উত্তেজিত করার জন্য।
১২) মুকাল্লিদগণঃ ভিবিন্ন ইমামদের অনুসারীরা নিজেদের ইমামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের জন্য জাল হাদীস রচনা করে।
১৩) মুসাহেবগণঃ রাজা-বাদশা ও আমীর উমরাহদের মুসাহেবগণ নিজেদের প্রভুকে খুশি করার জন্য জাল হাদীস বর্ণনা করত।
১৪) বক্তাগণ।
১৫) অসতর্কতা ও অন্ধভক্তি।
১৬) সুফিগণ।

টিকাঃ
223 যঈফ ও মওজু হাদীসের সংকলন (১ম, ২য় ও তৃতীয় খন্ড একত্রে) মূলঃ আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ), অনুবাদ অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল আযীয, পৃষ্ঠা নং - ৪৫, কাঁটাবন বুক কর্ণার।
224 যঈফ ও মওজু হাদীসের সংকলন - মূলঃ আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ), অনুবাদঃ অধ্যাপক মাওলান মোঃ আব্দুল আযীয। পৃষ্ঠা নং- ৪৫

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 ইতিহাসের কিছু বিখ্যাত হাদীস জালকারী

📄 ইতিহাসের কিছু বিখ্যাত হাদীস জালকারী


খলিফা মাহদী আব্বাসীর শাসনামলে আব্দুল কারিম বিন আল আরযাকে যখন শাস্তি স্বরূপ হত্যা করার জন্য আনা হয় তখন সে প্রায় চার হাজার হাদীস জাল করার কথা স্বীকার করেছিল।
আবু আসমা নুহ বিন আবি মারিয়াম কু'রআনের প্রতিটি সূরার নানা ধরণের ফজিলত নিয়ে শত শত জাল হাদীস প্রচার করেছে, যখন সে লক্ষ করেছিল মানুষ কু'রআনের প্রতি বেশি মনোযোগ দিচ্ছিল না। যেমন, সূরা ইয়াসিন কু'রআনের দশ ভাগের একভাগ, অমুক সূরা পড়লে কু'রআন খতমের সওয়াব পাওয়া যায় ইত্যাদি। [কিতাব আল মাউজুয়াত - ইবন জাওযি, পৃষ্ঠা ১৪]২২৫।
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ নানা ধরণের ভালো কাজের বিভিন্ন ধরণের ফজিলত নিয়ে অনেক হাদীস জাল করেছে। সে একজন ইহুদী ছিল মুসলমান হবার আগে। [আল মাউজুয়াত] 226
আবু দাউদ নাখী একজন অত্যন্ত নিবেদিত প্রাণ ধার্মিক ছিলেন। তিনি রাতের বেশিরভাগ সময় নামায পরতেন এবং প্রায়ই দিনে রোজা রাখতেন। তিনিও নানা ধরণের বানানো হাদীস প্রচার করেছেন মানুষকে ধর্মীয় কাজে মাত্রাতিরিক্ত মগ্ন রাখার জন্য। [আল মাউজুয়াত - ৪১]227 এছাড়াও জাল হাদীসের পরিচয়ের ব্যাপারে হাদীস বিশারদগণ সূক্ষাতিসূক্ষ্ণ আলোচনা পর্যালোচনা করার পর তাদেরকে স্পষ্টরূপে চিহ্নিত করার জন্যে তাদের নামের বর্ণিত হাদীসের একটি বিরাট তালিকা তৈরী করেন। যার ফলে আমাদের নবীর অনুসৃত বাণীগুলো ভেজাল ও ভাইরাসে আক্রান্ত হতে রক্ষা পায়।
যাদের হাদীস গ্রহণ করা যাবে নাঃ-
১. রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি মিথ্যা আরোপকারী।
২. সাধারণ কথা বার্তায় যারা মিথ্যা কথা বলে।
৩. বিদয়াতী প্রবৃত্তির অনুসারী।
৪. জিন্দিক, পারসিক, অমনোযোগী ও অসতর্ক ব্যাক্তিবর্গ এবং যাদের মধ্যে আদালত, যাত ও ফাহাম (ন্যায় পরায়ণতা, বুদ্ধিমত্তা) ইত্যাদি গুণাবলীর অনুপস্থিতি থাকবে।
হাদীস জালকারীদের কয়েকজন/মুহাদ্দিসগনের নিকট মিথ্যাবাদী হিসেবে আধিক পরিচিত যারাঃ
১. আবান্ যাফার আন-নুমাইরীঃ এই ব্যক্তি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) - এর নামে তিন শতাধিক হাদীস ছড়িয়েছেন।
২. ইবরাহীম ইবনে যায়িদ আল-আসলামীঃ এ ব্যক্তি ইমাম মালিক (রহঃ) - এর নামে বহু হাদীস ছড়িয়েছেন।
৩. আহমদ ইবনে আবদিল্লাহ আ-জুওয়ায়বারীঃ সে সিয়াদের কাররামিয়া সম্প্রদায়ের নামে হজার হাজার হাদীস বর্ণনা করে।
৪. জাবির ইবনে ইয়াজিদ আল-যুফিঃ তাঁর সম্পর্কে সুফিয়ান বলেন, আমি জাবিরকে বলতে শুনেছি সে প্রায় ত্রিশ হাজার জাল হাদীস বর্ণনা করেছে।
৫. মহাম্মদ ইবনে সুজা আছ-ছালজীঃ সে সৃষ্ট বস্তুর সাথে আল্লাহর সম্পর্ক সাদৃশ্যমূলক বিষয়ে বহু হাদীস তৈরী করে মহাদ্দীসদের নামে ছড়িয়েছে।
৬. নুহ ইবনে আবি মারিয়ামঃ সে কুরআনের নানাবিধ ফজীলত ও বিভিন্ন সূরার সাহাত্ম্য ও মর্যাদা বিষয়ক বহু হাদীস তৈরী করে ছড়িয়েছে।
* ইমাম আন-নাসাঈ (রহঃ) বলেন- জাল হাদীস রচনার সাথে জড়িত মিথ্যাবাদী হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভকারী ব্যক্তি চারজনঃ
১. মদীনায় ইবনে আবি ইয়াহইয়া
২. বাগদাদে আল-ওয়াকিদী
৩. খুরাসানে মুকাতিল
৪. শামে মুহাম্মদ ইবনে সাইদ আল-মাসলুব।

টিকাঃ
২২৫ কিতাব আল মাউজুয়াত - ইবন জাওযি, পৃষ্ঠা ১৪
226 আল মাউজুয়াত
227 আল মাউজুয়াত - ৪১

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 জাল হাদীসের লক্ষণ

📄 জাল হাদীসের লক্ষণ


১. স্বীকারোক্তি
২. যে সকল হাদীসের প্রত্যক্ষ শর্তের বিপরীত কোন কিছু বর্ণিত হয় তা জাল হাদীস। যেমন বেগুন সকল রোগের ঔষধ।
৩. জীবনে একবারও হাদীস জাল করেছে বা জেনে শুনে জাল হাদীস প্রচার করেছে এমন ব্যাক্তির বর্ণিত হাদীস।
৪. যে হাদীসের বর্ণনা মূলের বিপরীত। যেমন- সূর্য তাপে তক্ত জ্বলে, স্নান করলে কুষ্ঠ রোগ হয়।
৫. খাজা-খিজির সম্মন্ধে বর্ণিত সকল হাদীস।
৬. যে হাদীসে কোন জঘন্য ভাবের সমাবেশ আছে।
৭. যে হাদীসের ভাষা অশোভনীয়।
৮. যে হাদীসে এমন ঘটনা উল্লেখ আছে যে,তা ঘটে থাকলে বহুলোক জানার কথা ছিল, অথচ মাত্র একজন রাবী তা বর্ণনা করেছে।
৯. যে হাদীসে অনর্থক মুল্যহীন কথা আছে।
১০. যা কুরআন, সহীহ হাদীস ও কাতয়ী ইজমার বিপরীত।
১১. যে সকল হাদীসে সামান্য কাজের জন্য বড় বড় সওয়াব এবং সামান্য অপরাধের জন্য কঠোর দন্ডের ওয়াদা করা হয়েছে।

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 কয়েকটি মা’রুফ হাদীস বা জাল হাদীসের উদাহরণ

📄 কয়েকটি মা’রুফ হাদীস বা জাল হাদীসের উদাহরণ


১) “যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা আল-ওয়াক্বে’য়াহ পাঠ করবে, তাকে কখনও অভাব (ক্ষুধা) গ্রাস করবে না।” হাদীসটি দুর্বল। সূত্রঃ হাদীসটি হারিস ইবনু আবী উসামা তার "মুসনাদ” গ্রন্থে (১৭৮), ইবনুস সুন্নী "আমালুল ইয়াউম ওয়াল লাইলাহ” গ্রন্থে (৬৭৪), ইবনু লাল তার "হাদীস” গ্রন্থে (১/১১৬), ইবনু বিশরান "আল- আমালী" গ্রন্থে (২০/৩৮/১) বর্ণনা করেছেন আবূ শুযা' সূত্রে আবূ তায়বাহ হতে।
দুর্বল বলেছেনঃ ইমাম আহমাদ (রহঃ), আবু হাতিম (রহঃ), ইবনু আবী হাতিম (রহঃ), দারা কুতুনী (রহঃ), ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ)।
(ক) ইমাম মানাবী (রহঃ) বলেনঃ হাদীসটি মুনকার। (আত্- তায়সীর)
(খ) হাদীসটির রাবীদের সম্পর্কে ইমাম যাহাবী (রহঃ) বলেনঃ আবু শুযাকে চেনা যায় না এবং আবু তায়বাহ মাজহুল।
ইমাম যায়লাঈ (রহঃ) হাদীসটি দোষণীয় হওয়ার কারণ উল্লেখ করেছেনঃ-
(ক) এটির সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
(খ) হাদীসটির মতনে (ভাষায়) দুর্বোধ্যতা রয়েছে।
(গ) হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ দুর্বল।
(ঘ) এছাড়া ইযতিরাব রয়েছে।
২) “যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা আল-ওয়াকেয়াহ পাঠ করবে; তাকে কখনও অভাব গ্রাস করবে না। যে ব্যক্তি প্রতি রাতে লা-উকসিমু বি-ইয়াওমিল ক্বিয়ামাহ পাঠ করবে; সে কিয়ামত দিবসে আল্লাহর সাথে এমতাবস্থায় মিলিত হবে যে, তার চেহারা পূর্ণিমা রাতের চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল থাকবে।"
হাদীসটি জাল। সূত্রঃ এটি দায়লামী, আহমাদ ইবনু উমার ইয়ামানী সূত্রে নিজ সনদে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) "যায়লুল আহাদীসুল মাওযূ'আহ” গ্রন্থে (১৭৭) উল্লেখ করে বলেছেনঃ বর্ণনাকারী আহমাদ ইয়ামানী মিথ্যুক।
৩) "আমি সে সময়েও নবী ছিলাম যখন আদম পানি এবং মাটির মাঝে ছিলেন।"
নিম্নের হাদীসটিও এটির ন্যায়ঃ- "যখন আদম ছিলেন না, পানি ও মাটি ছিল না তখনও আমি নবী ছিলাম।" হাদীস দু' টি জাল।
হাদীসটি জাল বলেছেনঃ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) এবং ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) সহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সকল মুহাদ্দিস।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) "বাকরীর প্রতিবাদ" গ্রন্থের মধ্যে (পৃষ্ঠাঃ ৯) বলেছেনঃ "কুর'আন ও হাদীসের মধ্যে এমন কি সুস্থ বিবেকেও এটির কোন ভিত্তি নেই। কোন মুহাদ্দিসই এটি উল্লেখ করেননি। এটির অর্থও বাতিল। কারণ আদম (আলাইহিস সালাম) কখনও পানি এবং মাটির মাঝে ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন দেহ এবং রূহ এর মাঝে।"
৪) "চীন দেশে গিয়ে হলেও তোমরা জ্ঞান অন্বেষণ কর।" হাদীসটি বাতিল। সূত্রঃ এটি যেসব গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছেঃ "আখবারূ আসহাবান” (২/১০৬); "আল-ফাওয়াইদ” (২/২৪১); "আল-আরবা'য়ীন” (২/১৫১); "আত্-তারিখ” (৯/৩৬৪); "কিতাবুল রেহালা" (১/২); "আল-মাদখাল" (২৪১/৩২৪); "আল-মুনতাকা" (১/২৮)। উপরের প্রত্যেকটি গ্রন্থে জাল হাদীসটি হাসান ইবনু আতিয়া সূত্রে "আবূ আতিকা” হতে বর্ণিত হয়েছে।
হাদীসটির বর্ণনাকারী "আবু আতিকা” সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেনঃ এটি মুনকারূল হাদীস।
* ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বলেনঃ তিনি নির্ভরযোগ্য নন।
* ইমাম উকায়লী (রহঃ) বলেনঃ তিনি নিতান্তই দুর্বল।
* ইমাম আবু হাতিম (রহঃ) বলেনঃ তিনি যাহেবুল হাদীস।
* ইমাম ইবনুল জাওযী (রহঃ) ও ইমাম ইবনু হিব্বান (রহঃ) বলেনঃ হাদীসটি বাতিল।
* ইমাম সুলায়মানী (রহঃ) "আবু আতিকাকে” হাদীস জালকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
* ইমাম সাখাবী (রহঃ) তার "মাকাসীদুল হাসানা" গ্রন্থে উপরোক্ত মত সমর্থন করেন।
* ইমাম আহমাদ (রহঃ) এ হাদীসটিকে কঠোর ভাষায় ইনকার করেছেন।
* ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) “আল-লায়ালী " (১/১৯৩) গ্রন্থে বলেনঃ হাদীসটির আরো দু'টি সূত্র রয়েছেঃ-
১) একটির সনদে রয়েছেন ইয়াকুব ইবনু ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আসকালনী। এ ইয়াকূব সম্পর্কে ইমাম যাহাবী (রহঃ) বলেনঃ সে মিথ্যুক।
২) দ্বিতীয়টির সনদে রয়েছেন আহমাদ ইবনু আবদুল্লাহ যুওয়াইবারী। যুওয়াইবারী হাদীস জালকারী।
৫) "যে ব্যক্তি মাগরিবের পরে কথা বলার পূর্বেই ছয় রাকায়াত সালাত আদায় করবে; তা দ্বারা তার ৫০ বছরের গুণাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
হাদীসটি নিতান্তই দুর্বল। সূত্রঃ এটি ইবনু নাসর "কিয়ামুল্লাহ” গ্রন্থে (পৃঃ ৩৩) মুহাম্মদ ইবনু গাযওয়ান দামেস্কীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
হাদীসটি ইমাম ইবনু আবী হাতিম (রহঃ) তার "আল-ইলাল” গ্রন্থে এ সূত্রেই (১/১৭৮) উল্লেখ করেছেন, অতঃপর বলেছেনঃ-
ইমাম আবু যুর'য়াহ (রহঃ) বলেনঃ তোমরা এ হাদীসটিকে পরিহার কর। কারণ এটি বানোয়াট হাদীসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। মুহাম্মদ ইবনু গাযওয়ান দামেস্কী মুনকারুল হাদীস।
৬) যে শুক্রবার আমার প্রতি ৮০ বার দুরুদ পাঠাবে তার ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।
এই হাদীসটি আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত বলে দাবি করা হলেও এটি একটি জাল হাদীস। তাবলীগ জামাতের কিছু বইয়ে এই ধরণের হাদীস অনেক পাওয়া যায়, যেখানে দুরুদের নানা ধরণের মাত্রাতিরিক্ত সওয়াব, ফজিলত ইত্যাদি বর্ণনা করা থাকে। আল্লামা সাখায়ী একে দুর্বল এবং আলবানী একে জাল হাদীস বলে চিহ্নিত করেছেন।
এটি কু'রআনের পরিপন্থী কারণ আল্লাহ (ﷻ) স্পষ্ট ভাবে বলে দিয়েছেনঃ যে একটি ভালো কাজ নিয়ে আসবে, আল্লাহ তাকে তার দশ গুণ বেশি প্রতিদান দিবেন এবং যে একটি খারাপ কাজ নিয়ে আসবে, তাকে তার সমান প্রতিদান ছাড়া কম-বেশি দেওয়া হবে না। কারো সাথে বিন্দুমাত্র অবিচার করা হবে না। [৬:১৬০]।
সুতরাং যখনি কোন হাদীস পাবেন যে, অমুক করলে ১০ বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে, তমুক করলে ১০ বছর নফল নামায পড়ার সওয়াব পাওয়া যাবে, ধরে নিতে পারেন সেগুলো হয় দুর্বল হাদীস, না হয় জাল হাদীস।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00