📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 মাউযূ’ হাদীস বা বানোয়াট বা জাল হাদীস

📄 মাউযূ’ হাদীস বা বানোয়াট বা জাল হাদীস


মূলতঃ 'মাউজু' (موضوع) শব্দটি আরবী। 'ওয়ায' শব্দ হতে গঠিত। 'ওয়াযা' শব্দটি অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয়। موضوع কর্মবাচক বিশেষ্য وضع ক্রিয়া বিশেষ্য থেকে উদ্‌দ্গত, অর্থ বানোয়াট, তৈরিকৃত ও নির্মিত। 'মাওদু'র আরেক অর্থ الشيء المحطوط অর্থাৎ জমিনে পতিত বস্তু। যেমনঃ কোন বস্তুকে কোন স্থানে রাখা, স্থাপন করা, কারো মর্যাদাকে খাট করা, নির্ধারণ করা, নতুন করে কোন জিনিস বানানো, মিথ্যা উপাখ্যান করা ইত্যাদি। তবে হাদীস শাস্ত্রে 'ওয়াযা' বলা হয়, যা রাসূল (সাঃ) বলেননি, করেননি এবং সমর্থনও দেননি এমন কথা বা কাজকে রাসূল (সাঃ) এর দিকে মিথ্যা সম্বন্ধ করা।
অতএব, যে হাদীসের রাবী জীবনে কখনও ইচ্ছাকৃত ভাবে রাসুল (সাঃ) এর নামে বানোয়াট কথা সমাজে প্রচার করেছে অথবা, ইচ্ছাকৃত ভাবে হাদীসের সুত্র (সনদ) বা মূল বাক্যের মধ্যে কমবেশি করেছে বলে প্রমানিত হয়েছে, তার বর্ণিত হাদীসকে বানোয়াট বা মাউযু হাদীস বলে। এরূপ ব্যক্তির বর্ণিত হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়।
মওযু বা জাল হাদীস হচ্ছে সেই হাদীস যে হাদীসের মধ্যে সনদের বর্ণনাকারীদের সংখ্যা অন্তত কোন এক স্তরে একজন রাবী এমন আছে যাকে মিথ্যাবাদী বলে চিহ্নিত করা যায়। রাসূল (সাঃ) যে কথা বলেননি সে কথাকে তাঁর নামে চালিয়ে দেওয়া মারাত্মক অপরাধমূলক কাজ। এর পরকালীন পরিণাম নিশ্চিত জাহান্নাম। রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেনঃ
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ الْجَعْدِ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ، قَالَ أَخْبَرَنِي مَنْصُورٌ، قَالَ سَمِعْتُ رِبْعِيَّ بْنَ حِرَاشٍ، يَقُولُ سَمِعْتُ عَلِيًّا، يَقُولُ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " لاَ تَكْذِبُوا عَلَى، فَإِنَّهُ مَنْ كَذَبَ عَلَى فَلْيَلِجِ النَّارَ
অর্থঃ- আলী ইবনুল জা'দ (রহঃ)... 'আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী বলেছেনঃ তোমরা আমার উপর মিথ্যারোপ করো না। কারণ আমার উপর যে মিথ্যারোপ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (ইলম বা জ্ঞান অধ্যায় :: সহিহ বুখারী :: খন্ড ১ :: অধ্যায় ৩ :: হাদীস ১০৮) 182। রাসূল (সাঃ) আরও ইরশাদ করেছেনঃ
" مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا ، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ "
"যে আমার উপর মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়”। [মুসলিম। আন-নুযহাহ্ঃ (পৃষ্ঠা নং - ১২১-১২২)] 183
নিচে কতিপয় মুহাদ্দিসীনের 'মাউজু' বা জাল হাদীসের সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো। যেমনঃ
১. ইমাম নববী (রহঃ) (মৃঃ৬৭৬ হিঃ) বলেনঃ
الموضوع : هو المختلق المصنوع
'মাওজু' বলা হয় যা নতুন করে সৃষ্ট, বানানো। (আত-তাকরীব মা'আ তাদরীবির রাবীঃ ২৩৯) 184
২. শায়েখ নুরুদ্দীন আত্তার (রহঃ) এভাবেই সংজ্ঞা দিয়েছেন স্বীয় গ্রন্থে – মানহাজুন নাকদ ফি উলুমিল হাদীস ১/৩০১। এছাড়া – লিসানুল মুহাদ্দেসীন ৪/২১৬ এর মধ্যে এভাবেই সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
৩. শায়েখ জামালুদ্দিন কাসেমী (রহঃ) বলেনঃ
الموضوع : هو الكذب المختلق المصنوع
'মাওজু' বলা হয়, যা মিথ্যা, নতুন করে সৃষ্ট ও বানানো। (কাওয়ায়েদুত তাহদীস ১/২৭) 185
৪. হাফেজ সাখাভী (রহঃ) (মৃত: ৯০২হি:) বলেন,
الموضوع هو المكذوب على رسول الله صلى الله عليه وسلم
'মাউজু' বলা হয়, যা রাসূল (সাঃ) এর নামে মিথ্যা-মিথ্যি চালিয়ে দেয়া হয়েছে। (গায়াহ ফি শারহিল হিদায়াঃ ১/১৮)186
৫. শায়েখ তাহের জাযায়েরী (রহঃ) (মৃঃ) বলেনঃ
الموضوع هو الحديث المكذوب على رسول الله صلى الله عليه وسلم - سواء كان عمدا أو خطأ
'মাউজু' বলা হয়, ঐ হাদীস কে যা রাসূল (সাঃ) এর নামে মিথ্যা রচনা করা হয়েছে, তা ইচ্ছা কৃত হোক বা ভুল বসত। (তাওজিহুন নজরঃ ২/৫৭৪)187।
৬. শায়েখ হামযা মালিবারী (রহঃ) বলেনঃ
المضوع هو ما أضيف إلى النبي صلى الله عليه وسلم كذبا من قول أو فعل أو تقرير
علوم الحديث في ضوء تطبيقات المحدثين النقاد : 70/1
‘মাউজু’ বলা হয়, ঐ কথা, কাজ বা সমর্থনকে যা রাসূল (সাঃ) এর নামে মিথ্যা রচনা করে চালিয়ে দেয়া হয়েছে।
মূলতঃ এ কারনেই মুসলিম সহীহ্ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
«مَنْ حَدَّثَ عَنِّى بِحَدِيثٍ يُرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبِينَ»
"যে আমার থেকে কোন হাদীস বর্ণনা করল, অথচ দেখা যাচ্ছে তা মিথ্যা, তাহলে সেও মিথ্যাবাদীদের একজন"। অপর হাদীসে তিনি ইরশাদ করেনঃ
«وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ»
"আর আমার উপর যে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়"।
(৬) ড. মাহমুদ তাহহান তাঁর বিখ্যাত বই তাইসিরু মুত্তাসিল হাদীস নামক গ্রন্থে বলেনঃ
المضوع هو الكذب المختلق المصنوع المنسوب إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم
‘মাউজু’ বলা হয় ঐ মিথ্যা, নতুন সৃষ্ট বা বানানো কথাকে যা রাসূলের (সাঃ) নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। (তাইসিরু মুসতালাহিল হাদীস, পৃষ্ঠা নং- ৮৯) 188। তাছাড়া এ ব্যাপারে অন্যদের বক্তব্যও তথৈবচ। সারকথা, রাসূল (সাঃ) যা করেননি, বলেননি, বা সমর্থনও দেননি এমন বিষয়কে রাসূল (সাঃ) এর নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছে এগুলোই ‘মাউজু’ বা জাল হাদীস। শায়েখ মোহাম্মদ বিন মোহাম্মদ আবু শুহবাহ (রহঃ) বলেনঃ
الموضوع من حيث مادته و نصه نوعان
أن يضع الواضع كلاما من عند نفسه, ثم ينسبه إلى النبي صلى -1 الله عليه وسلم أو إلى الصحابي أو التابعي 7
أن يأخذ الواضع كلاما لبعض الصحابة أو التابعين أو الحكماء, أو 2 الصوفية, أو ما يروي في الإسرا إيليات, فينسبه " إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم, ليروج وينال القبول
সুতরাং যে কথা, কাজ বা মৌন সমথর্ন রাসূল (সাঃ) এর নামে মিথ্যা মিথ্যি চালিয়ে দেয়া হয়েছে তাকেই ‘মাউজু’ বা জাল হাদীস বলা হয়। তাছাড়া হাদীস বিশারদগণের যাঁরাই ‘মাউজু’ বা জাল হাদীসের সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাঁরা এমনই বলেছেন- যা রাসূল (সাঃ) বলেননি, করেননি এবং সমর্থনও দেননি এমন কথা বা কাজকে রাসূল সা. য়ের নামে চালিয়ে দেয়াকে 'মাউজু' বলা হয়।

টিকাঃ
181 ইত্তেবায় সুন্নাহ – মুহাম্মাদ ইকবাল কিলানী, অনুবাদঃ মুহাম্মাদ হারুন আযীযী নদভী, পৃষ্ঠা নং- ৪৭
182 ইলম বা জ্ঞান অধ্যায় :: সহিহ বুখারী :: খন্ড ১ :: অধ্যায় ৩:: হাদীস ১০৮
183 মুসলিম। আন-নুযহাহ্ঃ (পৃষ্ঠা নং - ১২১-১২২)
184 আত-তাকরীব মা'আ তাদরীবির রাবীঃ ২৩৯
185 কাওয়ায়েদুত তাহদীস ১/২৭
186 গায়াহ ফি শারহিল হিদায়াঃ ১/১৮
187 তাওজিহুন নজরঃ ২/৫৭৪
188 তাইসিরু মুসতালাহিল হাদীস, পৃষ্ঠা নং- ৮৯

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 যঈফ ও জাল হাদীসের সূত্রপাত

📄 যঈফ ও জাল হাদীসের সূত্রপাত


হিজরী চল্লিশ সন হলো সুন্নাতের অনাবিল বিশুদ্ধতা এবং এর মধ্যে মিথ্যার অনুপ্রবেশ ও জাল হাদীস রচনার একটি চিহ্নিত সীমারেখা। এরপর সুন্নতে চললো সংযোজন; সুন্নতকে করা হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার এবং অভ্যন্তরীন বিচ্ছিন্নতাবাদের মাধ্যম। অর্থাৎ হিজরী চল্লিশ সন পর্যন্ত সুন্নত ছিল পবিত্র। তারপর এ দুর্ঘটনাটি ঘটল তখন, যখন হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এর মধ্যকার বিরোধ যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করলো। রক্তক্ষয় হলো প্রচুর, অনেক লোক প্রাণ হারালো, মুসলমানরা হয়ে পড়লো বিভক্ত বিভিন্ন দলে। বেশিরভাগ লোকই ছিলো হযরত আলী (রাঃ) এর পক্ষে মুয়াবিয়া (রাঃ) এর বিপক্ষে। তারপর উদ্ভব হলো খারিজীদের। তারা প্রথমে ছিল হযরত আলী (রাঃ) এর একান্ত সমর্থক। তারপর তারা তাকে বর্জন করলো এবং দোষারোপ করতে থাকলো হযরত আলী (রাঃ) ও মুয়াবিয়া (রাঃ) উভয়কে। হযরত আলী (রাঃ) এর শাহাদাৎ এবং ও মুয়াবিয়া (রাঃ) এর খিলাফত গ্রহণের পর আল-ই-বায়ত খিলাফততাদের প্রাপ্য বলে দাবী করতে থাকলো। তারা উমাইয়্যা বংশের আনুগত্য স্বীকার করলো না। এ রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে মুসলমানগণ বহু বড় বড় ও ছোট ছোট দলেবিভক্ত হয়ে পড়লো। প্রতিটি দলই নিজ নিজ দলের পক্ষে কুর'আন ও হাদীসকে দাঁড় করাতে চেষ্টা করতে লাগলো। এটা অতীব সত্য কথা যে, প্রতিটি দল যা দাবী করবে, তার অনুকূলে কুর'আন ও সুন্নত থাকবে না। সুতরাং কোন কোন দল কুর'আনের অর্থকে বাদ দিয়ে বিরূপ বা বিকৃত ব্যাখ্যা শুরু করে দিল। আর সুন্নত যে অর্থ বহন করে, তা গ্রহণ না করে অপর অর্থ গ্রহণ করতে লাগলো। তাদের মধ্যে এমনও কোন কোন দল ছিল, যারা তাদের দলীয় সমর্থনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নামে হাদীস বর্ণনা শুরু করলো। তাদের পক্ষে অতি কঠিন ঠেকলো কুর'আনের বেলায় অনুরূপ কিছু করার; কারণ কুর'আন অতি সুরক্ষিত। মুসলমানদের বক্ষে বক্ষে কুর'আন, মুখে মুখে তিলাওয়াত। এখান থেকেই শুরু হলো জাল হাদীস রচনার আর বিশুদ্ধ হাদীসের সাথে জাল হাদীসের সংমিশ্রণ। জাল হাদীস রচনা কারীরা প্রথমে যে গুপ্ত পথ রচনা করল, তা হলো বিভিন্ন ব্যক্তির ফযীলত সম্পর্কে। তাদের ইমাম ও দল- উপদলের শীর্ষ স্থানীয় লোকদের ফযীলত সম্পর্কে তার বহু জাল হাদীস রচনা করলো। বলা হয়ে থাকে শিয়ারাই প্রথমে এর সূত্রপাত করলো। ইবনে আবদুল হাদীদ 'শরহে নাহজুল বালাগাহ তে অনুরূপ কথা লিখেছেন –
"তোমরা জেনে রেখ, ফযীলত সম্পর্কে যত মিথ্যা হাদীস রচিত হয়েছে, এর মূল হলো শিয়াগণ।”
ইরাক হলো জাল হাদীস রচনার আড্ডা খানা। হাদীসের ইমামগণও এর প্রতি ইংগিত করেছেন। ইমাম যুহরী (রাঃ) বলেছেনঃ "আমাদের নিকট হতে হাদীস বের হয়ে যেত এক বিঘত তারপর ইরাক হতে ফিরে আসত আমাদের নিকট এক হাত হয়ে।"
ইমাম মালেক (রাঃ) বলতেন "ইরাক হলো জাল হাদীসের টাকশাল।” যঈফ ও জাল হাদীস সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পর্যালোচনা মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী জাহান্নামী। সহীহ ও হাসান হাদীস ছাড়া জাল বা জঈফ হাদীস আমল করার জন্য বর্ণনা করা যাবে না। তবে বর্জন করার জন্য জঈফ ও জাল হাদীস জানা দরকার। জঈফ হাদীস রাসূলের সূন্নাহর ব্যাপারে কিছু অনুমান-ধারণার সৃষ্টি করে মাত্র। আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْدُبُ الْحَدِيث
তোমরা ধারণা-অনুমান থেকে বেঁচে থাক কারণ ধারণা-অনুমান সর্বাপেক্ষা মিথ্যা কথা। (সহীহুল বুখারী: ৬০৬৬, ৬৭২৪, সহিহ মুসলিম: ৬৪৩০) 189। আর জাল বা মিথ্যা হাদীস যা স্পষ্ট রাসূলের কথা নয়।
সুতরাং হাদীস যাচাই করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
কোন ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বলে বেড়ায়। (সহীহ মুসলিম) 190।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا مِينَ قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ
হে মু'মিনগণ! যদি কোন পাপাচারী তোমাদের নিকট কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য যেন অনুতপ্ত না হও। (হুজরাত, ৪৯/৬) 191।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِنَّ كَذِبًا عَلَيَّ لَيْسَ كَكَذِبٍ عَلَى أَحَدٍ مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فليتبوأ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
"নিশ্চয় আমার উপর মিথ্যা বলা, কারো উপর মিথ্যা বলার মত নয়, যে আমার উপর মিথ্যা বলল সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়"। বুখারী: ১২৯১
لا تَكْذِبُوا عَلَيَّ، فَإِنَّهُ مَنْ كَذِبَ عَلَيَّ فَلْيَلِجُ النَّارَ
তোমরা আমার উপর মিথ্যারোপ করো না কারণ যে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে জাহান্নামে যাবে। (সহীহুল বুখারীঃ ১০৬) 192।
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ فَلْيَتَبَوَا مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
যে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়। (বুখারী, হাদীস: ১০৭)193।
مَنْ تَعَمَّدَ عَلَى كَذِبًا فَلْيَتَبَوَا مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
যে ব্যাক্তি আমার উপর এমন কথা আরোপ করে যা আমি বলিনি, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।' (বুখারী, হাঃ ১০৯) 194।
قَالَ أَنَسٌ إِنَّهُ لَيَمْنَعُنِي أَنْ أُحَدِتْكُمْ حَدِيثًا كَثِيرًا أَنَّ النَّبِيَّ (ﷺ) قَالَ " مَنْ تَعَمَّدَ عَلَى كَذِبًا فَلْيَتَبَوا مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এ কথাটি তোমাদেরকে বহু হাদীস বর্ণনা করতে আমাকে বাধা দেয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেনঃ যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়। [বুখারীঃ ১০৮, মুসলিম] 195।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন- فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا لِيُضِلَّ النَّاسَ بِغَيْرِ عِلْمٍ إِنَّ اللهَ لا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
সুতরাং তার চেয়ে অধিক যালিম কে, যে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিনা দলিলে আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়? নিশ্চয় আল্লাহ যালিম লোকদেরকে হিদায়েত করেন না। আনআম, ৬/১৪৪
রাসূলের নামে মিথ্যা হাদীস মানুষ বর্ণনা করছে, সম্মানিত মুহাদ্দিসগণ কোনটি রাসূলের হাদীস আর কোনটি রাসূলের হাদীস নয়, তা পৃথক করেছেন। তাই মিথ্যা ও দুর্বল হাদীস ত্যাগ করে সহীহ ও হাসান হাদীসগুলো আমরা মানব।

টিকাঃ
189 সহীহুল বুখারী: ৬০৬৬, ৬৭২৪, সহিহ মুসলিম: ৬৪৩০
190 সহীহ মুসলিম
191 হুজরাত, ৪৯/৬
192 সহীহুল বুখারীঃ ১০৬
193 বুখারী, হাদীস: ১০৭
194 বুখারী, হাঃ ১০৯
195 বুখারীঃ ১০৮, মুসলিম

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 যঈফ ও জাল হাদীস বর্ণনার মূলনীতি

📄 যঈফ ও জাল হাদীস বর্ণনার মূলনীতি


১. সালাতের যাবতীয় আহকাম সহীহ দলীল ভিত্তিক হ'তে হবে। কারণ এটা ইবাদতে তাওক্বীফী যাতে দলীল বিহীন মনগড়া কোন কিছু করার সুযোগ নেই। প্রমাণহীন কোন বিষয় পাওয়া গেলে তা সঙ্গে সঙ্গে পরিত্যাগ করতে হবে। কত বড় ইমাম, বিদ্বান, পন্ডিত বা ফক্বীহ বলেছেন তা দেখার প্রয়োজন নেই। কারণ প্রমাণহীন কথার কোন মূল্য নেই। আল্লাহ তা'আলা তাই পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ
'সুতরাং তোমরা যদি না জান তাহ'লে স্পষ্ট দলীলসহ আহ'লে যিকিরদের জিজ্ঞেস কর' (সূরা নাহল ৪৩-৪৪) 196। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরام সর্বদাদলীলের ভিত্তিতেই মানুষকে আহবান জানাতেন 197। ইসলামের ইতিহাসে প্রসিদ্ধ চার ইমামসহ মুহাদ্দিস ওলামায়ে কেরামও দলীলের ভিত্তিতে মানুষকে আহবান জানিয়েছেন। ইমাম আবু হানীফা (৮০-১৫০ হিঃ) বলেন,
لا يَحِلُّ لِأَحَدٍ أَنْ يَأْخُذُ بقَوْلِنَا مَا لَمْ يَعْلَمُ مِنْ أَيْنَ أَخَذْنَاهُ
'ঐ ব্যক্তির জন্য আমাদের কোন বক্তব্য গ্রহণ করা হালাল নয়, যে জানে না আমরাউহা কোথা থেকে গ্রহণ করেছি' 198।
ইমাম শাফেঈ (১৫০-২০৪ হিঃ) বলেন,
إِذَا رَأَيْتَ كَلامِي يُخَالِفُ الحَدِيث فَاعْمَلُوا بِالْحَدِيْثِ وَاضْرِبُوا بكلامي الحَائِط
'যখন তুমি আমার কোন কথা হাদীসের বরখেলাফ দেখবে, তখন হাদীসের উপর আমল করবে এবং আমার কথাকে দেওয়ালে ছুঁড়ে মারবে' 199।
ইমাম মালেক (৯৩-১৭৯ হিঃ), ইমাম আহমাদ (১৬৪-২৪১ হিঃ) সহ অন্যান্য ইমামদের বক্তব্যও একই 200।
২. জাল ও যঈফ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত সকল প্রকার আমল নিঃসঙ্কোচে নিঃশর্তভাবে বর্জন করতে হবে। কারণ জাল ও যঈফ হাদীস দ্বারা কোনশারঈ বিধান প্রমাণিত হয় না। জাল হাদীসের উপর আমল করা পরিষ্কার হারাম 201। সে কারণ সাহাবায়ে কেরাম যঈফ ও জাল হাদীসের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। আস্থাহীন, ত্রুটিপূর্ণ, অভিযুক্ত, পাপাচারী, ফাসিক শ্রেণীর লোকের বর্ণনাতারা গ্রহণ করতেন না। প্রসিদ্ধ চার ইমামসহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণও এর বিরুদ্ধে ছিলেন।
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর চূড়ান্ত মূলনীতি ছিল যঈফ হাদীস ছেড়ে কেবল সহীহ হাদীসকে আঁকড়ে ধরা। তাই দ্ব্যর্থহীনভাবে তিনি ঘোষণা করেন,
إِذَا صَحَّ الْحَدِيثُ فَهُوَ مَذْهَبِي
'যখন হাদীস সহীহ হবে সেটাই আমার মাযহাব' 202।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন,
إِنَّ الْعَالِمَ إِذَا لَمْ يَعْرِفِ الصَّحِيحَ وَالسَّقِيمَ وَالنَّاسِخَ وَالْمَنْسُوخ مِنَ الْحَدِيثِ لَا يُسَمَّى عَالِمًا
'নিশ্চয়ই যে আলেম হাদীসের সহীহ-যঈফ ও নাসিখ- মানসূখ বুঝেন না তাকে আলেম বলা যাবে না'। ইমাম ইসহাক্ব ইবনু রাওয়াহাও একই কথা বলেছেন 203।
ইমাম মালেক, শাফেঈ (রহঃ)-এর বক্তব্যও অনুরূপ 204। মুহাদ্দিস যায়েদ বিন আসলাম বলেন,
مَنْ عَمِلَ بِخَيْرٍ صَحَ أَنَّهُ كَذَبَ فَهُوَ مِنْ خَدَمِ الشَّيْطَانِ
'হাদীস মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও যে তার উপর আমল করে সে শয়তানের খাদেম' 205।
অতএব ইমাম হোন আর ফক্বীহ হোন বা অন্য যেই হোন শরী'আত সম্পর্কে কোন বক্তব্যপেশ করলে তা অবশ্যই সহীহ দলীলভিত্তিক হ'তে হবে। (এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখুন 'যঈফ ও জাল হাদীস বর্জনের মূলনীতি' শীর্ষক বই – মুযাফফর বিন মুহসিন, আছ ছিরাত প্রকাশনী, রাজশাহী) 206।
৩. প্রচলিত কোন আমল শারঈ দৃষ্টিকোন থেকে ভুল প্রমাণিত হ'লে সাথে সাথে তা বর্জন করতে হবে এবং সঠিকটা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র গোঁড়ামী করা যাবে না। পূর্বপুরুষরা এবং বড় বড় আলেমগণ করেগেছেন, এখনো সমাজে চালু আছে, বেশীর ভাগ আলেম বলছেন এ সমস্ত জাহেলী কথা বলা যাবে না।
ভুল হওয়া মানুষের স্বভাবজাত। মানুষ মাত্রই ভুল করবে, কেউই ভুলের ঊর্ধ্বেনয়। তবে ভুল করার পর যে সংশোধন করে নেয় সেই সর্বোত্তম। আর যে সংশোধন করেনা সে শয়তানের বন্ধু।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَاءً وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُوْنَ
'প্রত্যেক আদম সন্তান ভুলকারী আর উত্তম ভুলকারী সে-ই যে তওবাকারী' ২০৭। সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) ও ভুল করেছেন এবং সংশোধন করে নিয়েছেন ২০৮। সাহো সিজদার বিধানও এখান থেকেই চালু হয়েছে। অনুরূপ চার খলীফাসহ অন্যান্য সাহাবীদেরও ভুল হয়েছে ২০৯। তাছাড়া অনেক সময় আল্লাহ তা'আলা এবং রাসূল (সাঃ) কোন বিধানকে রহিত করেছেন এবং তারস্থলে অন্যটি চালু করেছেন (সূরা বাক্বারাহ: ১০৬)। তখন সেটাই সকল সাহাবী গ্রহণ করেছেন।
অতএব বড় বড় আলেমের ভুল হয় না এই ধারণা চরম ভ্রান্তিপূর্ণ। তাই সংশোধনের ক্ষেত্রে কখনো গোঁড়ামী করা যাবে না। কারণ ভুল সংশোধন না করে বাপ-দাদা বা বড় আলেমদের দোহাই দেওয়া অমুসলিমদের স্বভাব (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত ১৭০; সূরা লোকমান, আয়াত ২১) 210।
৪. খুঁটিনাটি বলে কোন সুন্নাতকে অবজ্ঞা করা যাবে না: ইসলামের কোন বিধানই খুঁটিনাটি নয়। অনুরূপ কোন সুন্নাতই ছোট নয়। এ ধরনের ভ্রান্ত আক্বীদা থেকে বেরিয়ে এসে রাসূল (সাঃ) এর যে কোন সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হ'তে হবে। কেননা রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাতকে অবজ্ঞাকরা ও খুঁটিনাটি বলে তাচ্ছিল্য করা অমার্জনীয় অপরাধ। সেই সুন্নাত যতই সাধারণ বা হালকা হোক না কেন। রাসূল (সাঃ) ও সাহাবীগণ এই অবহেলাকে মুহূর্তের জন্যও বরদাশত করেননি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একদা বারা ইবনু আযেব (রাঃ) কে ঘুমানোর দো'আ শিক্ষা দিচ্ছিলেন। তার এক অংশে তিনি বলেন, '(হে আল্লাহ!) আপনার নবীর প্রতি ঈমান আনলাম যাকে আপনি প্রেরণ করেছেন'। আর বারা (রাঃ) বলেন, 'এবং আপনার রাসূলের প্রতি ঈমান আনলাম যাকে আপনি প্রেরণ করেছেন'।
উক্ত কথা শুনে রাসূল (সাঃ) তার হাত দ্বারা বারার বুকে আঘাত করে বলেন, বরং 'আপনার নবীর প্রতি ঈমান আনলাম যাকে আপনি প্রেরণ করেছেন'211। এখানে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) 'নবীর' স্থানে 'রাসূল' শব্দটিকে বরদাশত করলেন না। জনৈক সাহাবী সালাতের মধ্যে সামান্যতম ত্রুটি করলে তিনি তাকে ডেকে বলেন, হে অমুক! তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না। তুমি কি দেখ না কিভাবে সালাত আদায় করছ?212
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একদিন সালাতের জন্য তাকবীরে তাহরীমা বলতে শুরু করেছেন। এমতাবস্থায় দেখতে পেলেন যে, এক ব্যক্তির বুক কাতার থেকে সম্মুখে একটু বেড়ে গেছে তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর বান্দারা! হয় তোমরা কাতার সোজা করবে না হয় আল্লাহ তা'আলা তোমাদের চেহারা সমূহকে ভিন্নরূপ করে দিবেন213।
নবী (সাঃ) একদা এক ব্যক্তিকে ডান হাতের উপর বাম হাত রেখে সালাত আদায় করতে দেখে তিনি ডান হাতটাকে বাম হাতের উপর করে দেন 214। অতএব সালাতের যে কোন আহকামকে খুঁটিনাটি বলে অবজ্ঞা করা যাবে না। বরং সেগুলো পালনে বাহ্যিকভাবে যেমন নানাবিধ উপকার রয়েছে তেমনি অঢেল নেকীও রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, 'নিশ্চয়ই তোমাদের পিছনে রয়েছে ধৈর্যের যুগ। সে সময় যে ব্যক্তি সুন্নাতকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থাকবে সে তোমাদের সময়ের ৫০ জন শহীদের নেকী পাবে' 215।
বর্তমানে যুগের প্রত্যেক সুন্নাতের পাবন্দ ব্যক্তির জন্যই এই সুসংবাদ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি (কাতারের মধ্যে দু'জনের) ফাঁক বন্ধ করবে আল্লাহ তা'আলা এর দ্বারা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিবেন এবং তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করবেন'। ২৩ যে ব্যক্তি সালাতে স্বশব্দে আমীন বলবে এবং তা ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলেযাবে তা পূর্বের পাপ সমূহ ক্ষমা করা হবে 216। সবচেয়ে বড় বিষয় হ'ল, এই সুন্নাতগুলো সমাজে চালু করতে শত শত হকবপন্থী আলেমের রক্ত প্রবাহিত হয়েছে। ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হয়েছে, অন্ধ কারাগারে জীবন দিতে হয়েছে, দীপান্তরে কালা পানির ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে। যেমন বুকের উপর হাত বাঁধা, জোরে আমীন বলা, রাফউল ইয়াদায়েন করা ইত্যাদি। আর সেই সুন্নাত সমূহকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কত বড় অন্যায় তা ভাষায় প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই।
৫. সঠিক পদ্ধতিতে সালাত আদায় করতে গিয়ে দেখার প্রয়োজন নেই যে কতজন লোক তা করছে, কোন মাযহাবে চালু আছে, কোন ইমাম কী বলেছেন বা আমল করেছেন কিংবা কোন দেশের লোক করছে আর কোন দেশের লোক করছে না। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রেরিত সংবিধান চিরন্তন। যা নিজস্ব গতিতে চলমান। এই মহা সত্যকেই সর্বদা আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে একাকী হ'লেও। ইবরাহীম (আঃ) নানা যুলুম-অত্যাচার সহ্য করে একাই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাই তিনি বিশ্ব ইতিহাসে মহা সম্মানিত হয়েছেন (নাহল ১২০; বাক্বারাহ ১২৪)।
সমগ্র জগতের বিদ্রোহী মানুষরা তার সম্মান ছিনিয়ে নিতে পারেনি। সংখ্যা কোন কাজে আসেনি। মূলকথা হ'ল- ওহীর বিধান সংখ্যা, দেশ, অঞ্চল, বয়স, সময়, মেধা কোন কিছুকে তোয়াক্কা করে না। অনেকে বলতে চায় চার ইমামের পরে মুহাদ্দিসগণের জন্ম।
সুতরাং ইমামদের কথাই গ্রহণযোগ্য। অথচ সাহাবীরা সুন্নাতকে অগ্রাধিকার দিতে বয়স্ক ব্যক্তি উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৬/৭ বছরের বাচ্চাকে দিয়ে সালাত পড়িয়ে নিয়েছেন 217।
ওমর (রাঃ) কনিষ্ঠ সাহাবী আবু সাঈদ খুদরীর নিকট থেকে বাড়ীতে তিনবার সালাম দেওয়া সংক্রান্ত হাদীসের পক্ষে সাক্ষী গ্রহণ করেন। কারণ তিনি এই হাদীস জানতেন না 218।
অতএব মহা সত্যের উপর কোন কিছুর প্রাধান্য নেই। ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, 'হক-এর অনুসারী দলই হল জামা'আত যদি তুমি একাকী হও'219। অতএব হক পন্থী ব্যক্তি একাকী হ'লেও সেটাই জান্নাতী দল।
৬. কোন দল বা মাযহাবী স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য কৌশল করে কিংবা অপব্যাখ্যা করে ইলাহী বিধানকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে নাঃ উক্ত জঘন্য নীতির জয়জয়কার চলছে সহস্র বছর ধরে। এক শ্রেণীর মানুষ অণু পরিমাণ জ্ঞান নিয়ে আল্লাহর জ্ঞানের উপর প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করছে। এই অপকৌশলের যে কী শাস্তি তা তারা ভুলে গেছে। মূল শরী'আত কে উপেক্ষা করে দলীয় সিদ্ধান্ত ও মাযহাবী নীতি প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্য থাকলে বানী ইসরাঈলদের মত তাদের উপর আল্লাহর গযব নেমে আসা স্বাভাবিক।
দাউদ (আঃ) - এর সময় তারা মহা সত্যকে না মেনে মিথ্যা কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার কারণেই তারা বানর ও শূকরে পরিণত হয়েছিল এবং একই দিনে সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল ২২০। পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা করেমানুষকে যারা বিভ্রান্ত করবে তাদের পরিণাম এমনই হওয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, 'কুরআন তোমার পক্ষে দলীল হ'তে পারে আবার বিপক্ষেও দলীল হ'তে পারে' ২২1।
সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের জানা উচিত যে, শারঈ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমি যাই করি এবং যে উদ্দেশ্যেই করি অন্তরের খবর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সবই জানেন ২২২। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, অনেকেই আমাকে বলে বা প্রশ্ন করে যে, আমরা পূর্ব থেকে যে নিয়ম অনুসরন করে আসছি তা কি ভুল ছিল? এর উত্তরে বলব যে, হা অবশ্যই ভুল ছিল। কারন এটি পূর্ব থেকে চলে আসে নি বরং ভারতীয় উপমহাদেশে কতিপয় মাযহাবপন্থীরাই কেবল এইসব জাল ও যঈফ হাদীস কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য যার কারনে রাসূল (সা:) এর সঠিক নিয়ম অনুযায়ী এখন যাবতীয় সহীহ হাদীস কার্যক্রম গবেষনা করা হচ্ছে বিধায় সঠিকটাকে ভুল মনে হচ্ছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাই পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে বলেছেন: "তোমরা সেই লোকদের মত হয়ে যেয়ো না যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমান আসার পরেও বিভক্ত হয়েছে এবং মতভেদ করেছে এবং করছে এবং এই শ্রেনীর লোকদের জন্য আছে মহা শাস্তি তার রবের পক্ষ থেকে।" অতএব, আল্লাহ আমাদের সঠিক বিষয় বুঝার তৌফিক দান করুন, আমীন।

টিকাঃ
196 সূরা নাহল ৪৩-৪৪
197 সূরা ইউসুফ ১০৮; নাজম ৩-৪; সূরা হা-ক্বাহ ৪৪-৪৬; সহীহ বুখারী হা/৫৭৬৫, ২য় খন্ড, পৃঃ ৮৫৮, 'চিকিৎসা' অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৮; আহমাদ ইবনু শু'আইব আবু আব্দির রহমানআন-নাসাঈ, সুনানুন নাসাঈ আল-কুবরা (বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়াহ, ১৪১১/১৯৯১), হা/১১১৭৪, ৬/৩৪৩ পৃঃ; আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দির রহমান আবুমুহাম্মাদ আদ-দারেমী, সুনানুদ দারেমী (বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবী, ১৪০৭ হিঃ), হা/২০২; সনদ হাসান, মিশকাত হা/১৬৬; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৫৯, ১/১২৩পৃঃ; সহীহ বুখারী হা/১৪৬৫, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৯৮, 'যাকাত' অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৬; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫১৬২
198 ইবনুল ক্বাইয়িম, ই'লামুল মুআক্কেঈন আন রাবিবল আলামীন (বৈরুতঃ দারুল কুতুব আলইলমিয়াহ, ১৯৯৯৩/১৪১৪), ২য় খন্ড, পৃঃ ৩০৯; ইবনু আবেদীন, হাশিয়া বাহরুররায়েক ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃঃ ২৯৩; মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী, সিফাতুসালাতিন নাবী (সাঃ) মিনাত তাকবীরি ইলাত তাসলীম কাআন্নাকা তারাহু (রিয়াযঃ মাকতাবাতুল মা'আরিফ, ১৯৯১/১৪১১), পৃঃ ৪৬
199 আল-খুলাসাফী সবাবিল ইখতিলাফ, পৃঃ ১০৮; শাহ অলিউল্লাহ দেহলভী, ইক্কদুল জীদ ফীআহ কামিল ইজতিহাদ ওয়াত তাক্বলীদ (কায়রো: আল-মাতবাআতুস সালাফিয়াহ, ১৩৪৫ হিঃ), পৃঃ ২৭
200 শারহু মুখতাসার খলীল লিল কারখী ২১/২১৩ পৃঃ; ইক্কদুল জীদ ফী আহকামিল ইজতিহাদ ওয়াত তাক্বলীদ, পৃঃ ২৮
201 সূরা আন'আম ১৪৪; আ'রাফ ৩৩; হুজুরাত ৬; সহীহ বুখারী হা/৫১৪৩ ও৬০৬৪, ২/৮৯; ইমাম আবুল হুসাইন মুসলিম বিন হাজ্জাজ আল-কুশাইরী, সহীহ মুসলিম (দেওবন্দ: আছাহহুল মাতাবে ১৯৮৬), হা/৬৫৩৬, ২/৩১৬; মিশকাত হা/৫০২৮, পৃঃ ৪২৭)
202 আব্দুল ওয়াহহাব শা'রাণী, মীযানুল কুবরা (দিল্লীঃ ১২৮৬ হিঃ), ১ম খন্ড, পৃঃ ৩০
203 আলবানী, সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব (রিয়ায: মাকতাবাতুল মা'আরিফ, ২০০০/১৪২১), ১/৩৯, ভূমিকা দ্রঃ; আবু আব্দিল্লাহ আল-হাকিম, মা'রেফাতু উলুমিল হাদীস, পৃঃ ৬০
204 সহীহ মুসলিম, মুক্কাদ্দামাহ দ্রঃ, ১/১২ পৃঃ, 'যা শুনবে তাই প্রচার করা নিষিদ্ধ' অনুচ্ছেদ-৩; প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আল-খত্নীব, আস-সুন্নাহ ক্বাবলাত তাদবীন (রৈরুত: দারুল ফিকর, ১৯৮০/১৪০০), পৃঃ ২৩৭
205 মুহাম্মাদ তাহের পাট্টানী, তাযকিরাতুল মাওযূ'আত (বৈরুত: দারুল এহইয়াইত তুরাছআল-আরাবী, ১৯৯৫/১৪১৫), পৃঃ ৭; ড. ওমর ইবনু হাসান ফালাতাহ, আল-ওয়ায'উ ফিলহাদীস (দিমাস্ক: মাকতাবাতুল গাযালী, ১৯৮১/১৪০১), ১ম খন্ড, পৃঃ ৩৩৩
206 'যঈফ ও জাল হাদীস বর্জনের মূলনীতি' শীর্ষক বই – মুযাফফর বিন মুহসিন, আছ ছিরাত প্রকাশনী, রাজশাহী
২০৭ সহীহ তিরমিযী হা/২৪৯৯, ২/৭৬ পৃঃ; মিশকাত হা/২৩৪১; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/২২৩২, ৫/১০৪ পৃঃ
২০৮ মুত্তাফাক্ব আলাইহ, বুখারী হা/১২২৯; মিশকাত হা/১০১৭; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৯৫১, ৩/২৫পৃঃ
২০৯ ইবনুল ক্বাইয়িম, ই'লামুল মুআক্কেঈন ২/২৭০-২৭২
210 সূরা বাক্বারাহ, আয়াত ১৭০; সূরা লোকমান, আয়াত ২১
211 ونيتك الذي أَرْسَلْتَ قَالَ الْبَرَاءُ فَقُلْتُ آمَنْتُ بكتابك الذي أنزلت ونييك الَّذِي أَرْسَلْتَ قَالَ فَطَعَنَ بيده في صَدْرِيٌّ ثُمَّ قَالَ ونيتك الذي أَرْسَلْتَ - তিরমিযী হা/৩৩৯৪, ২/১৭৬-১৭৭, 'দো'আ সমূহ' অধ্যায়, 'ঘুমানোর জন্য বিছানায় গিয়ে দো'আ পড়া'অনুচ্ছেদ; সহীহ বুখারী হা/৬৩১১, 'দো'আ সমূহ'অধ্যায়-৮৩, অনুচ্ছেদ-৬; সহীহ মুসলিম হা/৭০৫৭
212 আহমাদ হা/৯৭৯০, সনদ সহীহ, মিশকাত হা/৮১১; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৭৫৫
213 خَرَجَ يَوْمًا فَقَامَ حَتى كاد يُكيرُ فَرَأَى رَجُلاً بَادِيًا صَدْرُهُ مِنَ الصَّف فَقَالَ عِبَادَ اللهِ لَتُسَوَّنَ صَفُوقَكُمْ أَوْ لِيُخَالِفَنَّ اللَّهُ بَيْنَ وجوهكم১/৮২ পৃঃ, 'সালাতে কাতার সোজা করা' অনুচ্ছেদ; মিশকাত হা/১০৮৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১০১৭
214 عَنْ جَابِرٍ قَالَ مَرَّ رَسُولُ اللهِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يرَجُلٍ وَهُوَ يُصَلِّي وَقَدْ وَضَعَ يَدَهُ الْيُسْرَى عَلَى الْيُمْنَى فَاتْتَزَعَهَا وَوَضَعَ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى - মুসনাদে আহমাদ হা/১৫১৩১; সহীহ আবু দাউদ হা/৭৫৫, সনদ হাসান
215 إِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ زَمَانَ صَبْرٍ لِلمُتمسك فِيهِ أَجْرُ خَمْسِينَ شَهِيدًا مِنْكُم فَقَالَ عُمَرُ يَا رَسُولَ اللهِ، مِنَّا أَوْ مِنْهُمْ؟ قَالَ مِنْكُم - তাবারাণী, আল-মু'জামুল কাবীর হা/১০২৪০; মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী, সিলসিলাতুল হাদীস আছ-ছহীহাহ ওয়াশাইয়ুন মিন ফিক্বহিহা ওয়া ফাওয়াইদিহা (বৈরুতঃ আল-মাকতাবাতুল ইসলামী, ১৯৮৫/১৪০৫), হা/৪৯৪; সনদ সহীহ, সহীহুল জামে' হা/২২৩৪
216 مَنْ سَدَّ فَرْجَةً فِي صَفٌ رَفَعَةُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَةً وَبَنَى لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ - তাবারাণী, আওসাত্ব হা/৫৭৯৭; সনদ সহীহ, সিলসিলা সহীহাহ হা/১৮৯২
217 সহীহ বুখারী, তা'লীক্ব ১/১০৭ পৃঃ, হা/৭৮০ ও ৭৮২; সহীহ মুসলিম হা/৯৪০, ৯৪২ ১/১৭৬
218 সহীহ মুসলিম হা/৫৬২৬, ২/২১০ পৃঃ, 'আদব' অধ্যায়, 'অনুমতি' অনুচ্ছেদ-৭; মিশকাত হা/৪৬৬৭; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৪৬২ ৯/১৯ পৃঃ
219 إِنَّ الْجَمَاعَةَ مَا وَافَقَ الْحَقِّ وَإِنْ كُنْتَ وَحْدَكَ - ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাস্ক ১৩/৩২২ পৃঃ; সনদ সহীহ, আলবানী, মিশকাত হা/১৭৩-এর টীকা দ্রঃ, ১/৬১ পৃঃ; ইমাম লালকাঈ, শারহু উদ্ধৃলিল ই'তিক্বাদ ১/১০৮ পৃঃ
২২০ সূরা বাক্বারাহ ৬৫; মায়েদা ৬০
২২১ সহীহ মুসলিম হা/৫৫৬, ১/১১৮ পৃঃ 'পবিত্রতা' অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১
২২২ মুলক ১৩; আলে ইমরান ১১৯

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীস জাল করার কারণ ও উদ্দেশ্য

📄 হাদীস জাল করার কারণ ও উদ্দেশ্য


ইসলাম বিদ্বেষী গোষ্ঠী ইসলামের মূলোচ্ছেদ করতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। মুসলমান নাম ও বেশ ধারনের ছদ্মাবরণে কতিপয় লোক জাল করনের মতো ঘৃণ্য ও হীন পন্থা বেছে নেয়। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার দৃষ্টিতে জালকারীদেরকে ৬টি স্তরে ভাগ করা যায়। এই ছয় শ্রেণীর লোক স্ব স্ব উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে হাদীস জালকরণে প্রবৃত্ত হয় 223।
নিম্নে হাদীস জাল করার কারন ও উদ্দেশ্য সমূহ আলোচনা করা হলোঃ-
১) মুনাফিকরা এবং কাফিররা মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য মুসলিম ছদ্মবেশে জাল হাদীস প্রচার করতো।
২) আলেমদের মধ্যে যারা নিজেরা যত বেশি হাদীস সংগ্রহ করেছে বলে দাবি করতে পারতো, সে তত বেশি সন্মান পেত। তাই সন্মানের লোভে অনেক আলেম, পীর, দরবেশ মিথ্যা হাদীস প্রচার করে গেছে।
"এই হাদীসটির ইসনাদ আমার কাছে একদম মুহাম্মাদ (ﷺ) থেকে এসে পৌঁছেছে"- এই ধরনের দাবী করতে পারাটা একটা বিরাট গৌরবের ব্যাপার ছিল, এখনও আছে।
৩) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আগেকার রাজা-বাদশা, শাসকরা আলেমদের ব্যবহার করে মিথ্যা হাদীস প্রচার করতো। জনতাকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হাদীসের চেয়ে মোক্ষম অস্ত্র আর কিছু ছিল না।
৪) ধর্মের প্রতি মানুষকে আরও অনুপ্রাণিত করার জন্য নানা চমকপ্রদ, অলৌকিক ঘটনায় ভরপুর জাল হাদীস প্রচার করা হত, যেগুলো শুনে সাধারণ মানুষ ভক্তিতে গদগদ হয়ে যেত।
৬) ধর্মীয় উপাসনালয় এবং বিশেষ স্থানগুলোতে মানুষের আনাগোনা বাড়ানো এবং তা থেকে ব্যবসায়িক লাভের জন্য জাল হাদীস ব্যবহার করে সেসব স্থানের অলৌকিকতা, বিশেষ ফজিলত প্রচার করা হত। সাধারণ মানুষ তখন ঝাঁকে ঝাঁকে সেই সব অলৌকিক, প্রসিদ্ধ স্থানে গিয়ে তাদের বিপুল পরিমাণের অর্থনৈতিক লাভ করে দিয়ে আসতো।
৭) জিন্দিকগণ পারসিক জিনদের ধর্মাবলম্বী একদল লোক বাহ্যত নিজেদেরকে মুসলমান বলে পরিচয় দিত, কিন্তু প্রচ্ছন্ন ভাবে ইসলামের ক্ষতি সাধনের চেষ্টায় থাকত। এ সমস্ত লোকেরা ইসলামের মূলনীতি ও বিশ্বাসের প্রতি মানুষকে শ্রদ্ধাহীন করার জন্য রাসুলের (সাঃ) নামে অযৌক্তিক হাজার হাজার হাদীস প্রচলন করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের অনিষ্ট সাধন। তাছাড়া সাধারন মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতঃ ইসলামের সৌন্দর্য নষ্ট করা ও অগ্রগতি ব্যাহত করাই তাদের উদ্দেশ্য। এরা ইসলাম বিদ্বেষী চরম শত্রু224। হাম্মাদ বিন যায়েদ বলেনঃ যিনদীকরা রাসূল (সাঃ) এর নামে ১৪ হাজার হাদীস জাল করে। আবদুল করীম ইবনে আবুল আওযা নামে এক যিনদীককে মাহদীর খেলাফত আমলে বসরার আমীর মুহাম্মদ বিন সুলাইমান আল আব্বাসী ১৬০ হিজরী সনে যিনদীক হওয়ার কারনে হত্যা করেন। হত্যা করার সময় সে বলেঃ "আমি তোমাদের মধ্যে চার (৪) হাজার হাদীস জাল করি যেগুলোর মাধ্যমে আমি হালালকে হারাম মনে করি আর হারামকে হালাল মনে করি।"
যিনদীক গোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বনী তামীমের কিনইয়ান ইবনে সাময়ান আন-নাহদী। খালিদ বিন আবদুল্লাহ আল কাসরী তাকে হত্যা করে আগুনে জ্বালিয়ে দেন। মুহাম্মদ বিন সায়ীদ ইবনে হাসান আল আসাদী নামীয় যিনদীককে আবু জাফর আল মানসুর হত্যা করেন। সে প্রায় চার হাজার জাল করে।
৮) অতি পরহেজগারগণ নিজেদেরকে সুফি প্রমানের লক্ষে জাল হাদীস তৈরি করত।
৯) সদুদ্দেশ্যে
১০) তর্কবিতর্কের ক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ)- এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের জন্য মনগড়া হাদীস বর্ণনা করে।
১১) যুদ্ধে উত্তেজিত করার জন্য।
১২) মুকাল্লিদগণঃ ভিবিন্ন ইমামদের অনুসারীরা নিজেদের ইমামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের জন্য জাল হাদীস রচনা করে।
১৩) মুসাহেবগণঃ রাজা-বাদশা ও আমীর উমরাহদের মুসাহেবগণ নিজেদের প্রভুকে খুশি করার জন্য জাল হাদীস বর্ণনা করত।
১৪) বক্তাগণ।
১৫) অসতর্কতা ও অন্ধভক্তি।
১৬) সুফিগণ।

টিকাঃ
223 যঈফ ও মওজু হাদীসের সংকলন (১ম, ২য় ও তৃতীয় খন্ড একত্রে) মূলঃ আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ), অনুবাদ অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল আযীয, পৃষ্ঠা নং - ৪৫, কাঁটাবন বুক কর্ণার।
224 যঈফ ও মওজু হাদীসের সংকলন - মূলঃ আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ), অনুবাদঃ অধ্যাপক মাওলান মোঃ আব্দুল আযীয। পৃষ্ঠা নং- ৪৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00