📄 যঈফ (ضعيف) হাদীস আমল করা প্রসঙ্গে
দ্বিতীয় পর্যায়ের একদল ফিকহ্বিদ যারা ফাযীলাতের ক্ষেত্রে যঈফ 'আমালের অনুমতি দিলেও তারা যঈফ হাদীস 'আমালের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তারোপ করেছেন। যেমন-
(১) যে সব যঈফ হাদীসের উপর 'আমাল করা হবে, তা যেন কোন মতেই আক্বীদা বা হুকুম সংক্রান্ত না হয়। যদি তা হয় তাহলে কোন ক্রমে যঈফ হাদীস 'আমাল করা যাবে না।
(২) যদি কেউ নিতান্ত বাধ্য হয়ে যঈফ হাদীস 'আমাল করতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, ঐ 'আমালটা যেন কোন মতেই দেশ ও সমাজের প্রচলিত সহীহ হাদীসের 'আমালের বিরোধী না হয়। যদি হয় তাহলে 'আমাল করা যাবে না।
(৩) উক্ত যঈফ হাদীসের সনদ বা সূত্র যেন অত্যন্ত দুর্বল না হয়।
(৪) পরিশেষে যঈফ হাদীস 'আমালকারীকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, হাদীসটি যঈফ বা সন্দেহযুক্ত। আর অন্যের নিকট বলার সময় তা যঈফ হিসাবেই উল্লেখ করতে হবে ২৩১। এ প্রসঙ্গে সত্য সন্ধানীদের নিকট আমার প্রশ্ন হলো, বর্তমান যারা ফাযীলাতের দোহাই দিয়ে হরহামেশা, যঈফ হাদীস বর্ণনা করেন, কিংবা যঈফ হাদীসের 'আমাল ছাড়তে রাযি থাকেন না। তারা কি আদৌ ফিকহ্বিদদের উক্ত চারটি শর্তের তোয়াক্কা করেন? ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে ইমাম মুসলিম বলেনঃ যঈফ হাদীস বর্ণনা করার সময় যঈফ জানা সত্ত্বেও যারা মানুষের সামনে হাদীসের ত্র"টি তুলে ধরে না, তারা গুনাহগার হবে। আর সাধারণ মুসলিমদের নিকট প্রতারক বলে গণ্য হবে। কারণ যারা যঈফ হাদীস শুনবে এবং সেগুলোর উপর 'আমাল করবে অথচ ঐসব হাদীস অধিকাংশ ভিত্তিহীন মিথ্যা বানোয়াট। ইমাম মুসলিম আরো বলেন যে, পৃথিবীতে নির্ভরযোগ্য ও আস্থাশীল বর্ণনাকারীদের বর্ণিত অসংখ্য নির্ভুল সহীহ হাদীসের বিরাট ভাণ্ডার আমাদের সামনে বিদ্যমান থাকতে কোন ক্রমেই যঈফ হাদীস গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না। এ সম্পর্কে ইমাম মুসলিম বলেন, আমি মনে করি, যে সব লোক যঈফ হাদীস অখ্যাত সনদে বর্ণনা করেন বা তার উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তাদের উদ্দেশ্য হল নিজেকে অপরের নিকট অধিক হাদীস বয়ানকারী হিসাবে জাহির করানো বা মানুষের বাহবা কুঁড়ানো।
'ইল্মে হাদীসের ক্ষেত্রে যারা এ নীতিতে পা বাড়ায় হাদীস শাস্ত্রে তাদের কোন স্থান নেই। বস্তুত এমন ব্যক্তি আলিম ও বক্তা (শাইখুল হাদীস) হিসাবে আখ্যায়িত না হয়ে বরং জাহিল মূর্খ হিসাবে আখ্যায়িত হবার যোগ্য। (সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দামা- ১ম খণ্ড, ৫০ পৃঃ, ই. ফা. বাং) 232 এখানে কেউ কেউ হয়তো বলতে চাইবেন যে, যঈফ হাদীস যদি 'আমালযোগ্যই না হবে তাহলে হাদীসের কিতাবে যঈফ হাদীস লিখা হল কেন? এরূপ প্রশ্নের জওয়াব ইমাম আবু ঈসা তিরমিযী (রহঃ) অত্যন্ত জোরালো ভাষায় দিয়েছেন। তিনি বলেন, মুহাদ্দিসগণ অনেক সময় যঈফ রাবীদের বর্ণিত দুর্বল হাদীসকে সনাক্ত করার জন্য কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মুঈন বলেন, আমি যঈফ ও জাল হাদীস এজন্য লিপিবদ্ধ করি যাতে ভবিষ্যতে এগুলোকে কেউ পরিবর্তন করে সহীহ হাদীস বানাতে না পারে। (শরহু ইলালিত তিরমিযী ৮৪ পৃঃ, জামে তিরমিযী মুখবন্ধ ১ম খণ্ড ৬০ পৃঃ, অনুবাদ- আবদুন নূর সালাফী) ২৩৩। আর জাল হাসিস আমল করার তো প্রশ্নই আসে না। আল্লাহ্ আমাদের সকলকে সহীহ হাদীসের উপর আমল করার তৈফিক দান করুন।
টিকাঃ
২৩১ ইমাম মহিউদ্দিন নাববীর সহীহ মুসলিমে শরাহ তাওজীহুন নজর কাওয়াছিদ্রুত তাহাদীস
232 সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দামা- ১ম খণ্ড, ৫০ পৃঃ, ই.ফা.বাং
২৩৩ শরহু ইলালিত তিরমিযী ৮৪ পৃঃ, জামে তিরমিযী মুখবন্ধ ১ম খণ্ড ৬০ পৃঃ, অনুবাদ- আবদুন নূর সালাফী
📄 যঈফ (ضعيف) হাদীসের উপর আমল কি গ্রহণযোগ্য?
অনেকে মনে করেন, যঈফ হাদীস ফযীলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, তাদের এ ধারণা সঠিক নয়। বরং ফযীলত ও আহকাম সর্ব ক্ষেত্রেই যঈফ হাদীস বর্জনীয়। এটিই অধিকাংশ ইমামগণের চূরান্ত ফায়সালা। আল্লামা জামালুদ্দীন ক্বাসেমী (রহঃ) এর 'কাওয়ায়েদুল হাদীস' এর পৃঃ ১১৩ -তে কতিপয় ইমামদের মতামত উল্লেখ করে তিনি বলেছেন যে ফযীলত কিংবা আহকাম কোন ক্ষেত্রেই যঈফ হাদীস আমলযোগ্য নয়। ইমামগণ হলেনঃ
■ ইমাম বুখারী,
■ ইমাম মুসলিম,
■ ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাঈন,
■ ইমাম ইবনুল আরাবী,
■ ইমাম ইবনু হাযম,
■ ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ সহ প্রমূখ মনিষীগণ।
যারা মনে করেন ফাজায়েলে ক্ষেত্রে জঈফ হাদীস আমল করা যায় তাদের কথার কোন দলিল নাই। তারা কেবল অনুমান ও ধারনা বসত এই কথা বলে থাকে যে জঈফ হাদীসও রাসুল (সাঃ) এর বানী হতে পারে। রাবী যদি সন্দেহযুক্ত হয়, তবে কিভাবে সেটা রাসূল (সাঃ) এর হাদীস হতে পারে? আল্লাহ বলেন, 'তারা কেবল অনুমান ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন'। [সূরা আন নাজম ২৩]।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেন, 'তোমরা অনুমান করা হতে নিজেদের রক্ষা কর, কারন অনুমানই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা মিথ্যা (হাদীস) কথা'। [সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলীম]।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আরও বলেন, 'এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমানের উপর চলে। অথচ সত্যের অনুমান মোটেই ফলপ্রসু নয়'। [সূরা আন নাজম ২৭-২৮]
জাল ও যঈফ হাদীস বর্জন প্রসঙ্গে ও ইমামদের অভিতমতঃ জাল ও যঈফ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত সকল প্রকার আমল নিঃসঙ্কোচে নিঃশর্তভাবে বর্জন করতে হবে। কারণ জাল ও যঈফ হাদীস দ্বারা কোন শারঈ বিধান প্রমাণিত হয় না। জাল হাদীসের উপর আমল করা পরিষ্কার হারাম। সে কারণ সাহাবায়ে কেরাম যঈফ ও জাল হাদীসের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। আস্থাহীন, ত্রুটিপূর্ণ, অভিযুক্ত, পাপাচারী, ফাসিক শ্রেণীর লোকের বর্ণনা তারা গ্রহণ করতেন না।
প্রসিদ্ধ চার ইমামসহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণও এর বিরুদ্ধে ছিলেন। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর চূড়ান্ত মূলনীতি ছিল যঈফ হাদীস ছেড়ে কেবল সহীহ হাদীসকে আঁকড়ে ধরা। তাই দ্ব্যর্থহীনভাবে তিনি ঘোষণা করেন,
إِذَا صَحَّ الْحَدِيْثُ فَهُوَ مَذْهَبِيْ
'যখন হাদীস সহীহ হবে সেটাই আমার মাযহাব'।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন,
إِنَّ الْعَالِمَ إِذَا لَمْ يَعْرِفِ الصَّحِيحَ وَالسَّقِيمَ وَالنَّاسِخَ وَالْمَنْسُوْخَ مِنَ الْحَدِيْثِ لَا يُسَمَّى عَالِمًا
'নিশ্চয়ই যে আলেম হাদীসের সহীহ-যঈফ ও নাসিখ-মানসূখ বুঝেন না তাকে আলেম বলা যাবে না'। ইমাম ইসহাক্ব ইবনু রাওয়াহাও একই কথা বলেছেন। ইমাম মালেক, শাফেঈ (রহঃ)-এর বক্তব্যও অনুরূপ।
মুহাদ্দিস যায়েদ বিন আসলাম বলেন, مَنْ عَمِلَ بِخَيْرٍ صَحٌ أَنَّهُ كَذَّبٌ فَهُوَ مِنْ خَدَمِ الشَّيْطَانِ
'হাদীস মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও যে তার উপর আমল করে সে শয়তানের খাদেম'। অতএব ইমাম হোন আর ফক্বীহ হোন বা অন্য যেই হোন শরী'আত সম্পর্কে কোন বক্তব্য পেশ করলে তা অবশ্যই সহীহ দলীলভিত্তিক হ'তে হবে।
📄 সহীহ হাদীস বনাম যঈফ হাদীস
আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কুরআনের আয়াত নাযিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা লেখাতেন এবং মুখস্থ করাতেন। তিনি কুরআন কারীমের ব্যাখ্যা হিসাবে যা বলতেন বা শেখাতেন সে সকল শিক্ষা অর্থাৎ হাদীস তিনি সাধারণত লিখতে নিষেধ করতেন। কারণ তাঁর জীবদ্দশায় কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছিল, যা মুসলিমগণ মুখস্থ করতেন এবং বিক্ষিপ্ত চামড়ার টুকরো, মাটির পাত, পাথর, খেজুর গাছের বাকল ইত্যাদিতে লিখে নিতেন। এ অবস্থায় হাদীস লেখা হলে ভুলবশত একজন মুসলিম কোনো হাদীসকে কুরআনের লিখিত পৃষ্ঠার সাথে মিশিয়ে ফেলতে পারেন এবং এভাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) - এর ইন্তেকালের পরে কুরআন নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। কুরআনের পরিপূর্ণ বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য তিনি মুসলিমদেরকে কুরআন মুখস্থ করতে ও লিখতে বলতেন। আর তাঁর বাণী ও কর্ম, অর্থাৎ হাদীস শুধমাত্র মুখস্থকরে বর্ণনা করতে ও মানুষদেরকে শেখাতে বলতেন। এক্ষেত্রে তিনি হাদীস মুখস্থ করা ও বর্ণনার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন কেউ তাঁর নামে মিথ্যা না বলে, বা এমন কথা তাঁর নামে না বলে যা তিনি বলেন নি। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ
لا تَكْتُبُوا عَنِّي وَمَنْ كَتَبَ عَنِّي غَيْرَ الْقُرْآنِ فَلْيَمْحُهُ وَحَدِّثُوا عَنِّي وَلَا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنْ النَّارِ حَرَجَ وَمَنْ كَذَّبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا
"তোমরা আমার কাছ থেকে কিছু লিখবে না। যদি কেউ কুরআন ছাড়া আর কিছু লিখে থাক তাহলে তা মুছে ফেলবে। তোমরা আমার হাদীস মৌখিকভাবে বর্ণনা কর, তাতে কোনো অসুবিধা নেই। যে ব্যক্তি আমার ব্যাপারে (ইচ্ছা করে) মিথ্যা কথা বলবে, সে ব্যক্তি অবশ্যই জাহান্নামের বাসিন্দ হবে।” (মুসলিম, আস-সহীহ ৪/২২৯৮)২৩৪। মাদানী জীবনের শেষ দিকে তিনি কোনো কোনো সাহাবীকে হাদীস লিপিবদ্ধ করার অনুমতি দেন। বিশেষত বিদায় হজ্জের সময় তিনি হাদীস লেখার অনুমতি দেন। তবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- এর যুগে সাধারণভাবে হাদীস লিপিবদ্ধ করা হয় নি।
কোনো কোনো সাহাবী কিছু হাদীস লিপিবদ্ধ করেন। অধিকাংশ সাহাবী তাঁর শিক্ষা, বাণী, কর্ম অত্যন্ত যত্নের সাথে মুখস্থ করতেন, পরস্পরে তা আলোচনা করতেন এবং সেভাবে জীবন পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর হাদীস হুবহু মুখস্থ করে তা প্রচার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। (তিরমিযী, আস-সুনান ৫/৩৩-৩৪; আবু দাউদ, আস-সুনান ৩/৩২২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৮৪-৮৬; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১/২৬৮, ২৭১, ৪৫৫; হাকিম নাইসাপূরী, আল-মুসতাদরাক ১/১৬২, ১৬৪; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৩৮-১৩৯)২৩৫। অপরদিকে কোনো মানবীয় কথা যেন তাঁর নামে প্রচারিত হতে না পারে সেজন্য তিনি তাঁদেরকে তাঁর নামে মিথ্যা বা অতিরিক্ত কথা বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে মিথ্যার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে তিনি বারংবার সতর্ক করেছেন। উপরের হাদীসে আমরা তা দেখেছি। 'আশারায়ে মুবাশশারাহ'-সহ প্রায় ১০০ জন সাহাবী এই মর্মে রাসূলুল্লাহ p-এর সাবধান বাণী বর্ণনা করেছেন। আর কোনো হাদীস এত বেশি সংখ্যক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়নি। (নববী, ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ (৬৭৬হি), শারহু সাহীহ মুসলিম ১/৬৮, ইবনুল জাউযী, আল-মাউযূ'আত ২৮-৫৬) 236।
উম্মাতের মধ্যে জালিয়াত ও জাল হাদীসের প্রাদুর্ভাব ঘটবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১২) 237। যাচাই না করে কোনো হাদীস গ্রহণ করতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিষেধ করেছেন। যদি কেউ যাচাই না করে যা শুনে তাই হাদীস বলে গ্রহণ করে ও বর্ণনা করে তাহলে হাদীস যাচাইয়ে তার অবহেলার জন্য সে হাদীসের নামে মিথ্যা বলার পাপে পাপী হবে। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১০) 238।
এ সকল নির্দেশনার ভিত্তিতে সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনা ও গ্রহণের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তাঁরা সাধারণত হাদীস বলতেন না। কখনো হাদীস বললে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বলতেন। অন্যের বলা হাদীস যাচাই বাছাই না করে গ্রহণ করতেন না। বর্ণনার নির্ভুলতা বা বিশুদ্ধতায় সন্দেহ হলে বর্ণনাকারীকে প্রশ্ন করে, অন্যান্য ব্যক্তিদেরকে প্রশ্ন করে বা বর্ণনাকারীকে শপথ করিয়ে বর্ণনার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। এরপরও সন্দেহ থাকলে তারা হাদীস গ্রহণ না করে প্রত্যাখ্যান করতেন। সাহাবী ছাড়া অন্য কেউ হাদীস বললে সনদ ছাড়া হাদীস গ্রহণ করতেন না। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি আমার লেখা 'হাদীসের নামে জালিয়াতি' গ্রন্থে।
সাহাবীগণের কর্মপদ্ধিতর অনুসরণে তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ী ও পরবর্তী যুগের আলিমগণ হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করেছেন। যাচাই-বাছাইয়ে বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হাদীসকে তারা 'সহীহ' বা 'হাসান' বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর অশুদ্ধ হাদীসকে যয়ীফ হাদীস বলে আখ্যায়িত করেছেন। যয়ীফ হাদীসের মধ্যে রয়েছে বানোয়াট বা জাল হাদীস। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় যে হাদীসের মধ্যে ৫টি শর্ত পূরণ হয়েছে তাকে সহীহ হাদীস বলা হয়ঃ
(১) 'আদালত': হাদীসের সকল রাবী (বর্ণনাকারী) পরিপূর্ণ সৎ ও বিশ্বস্ত বলে প্রমাণিত,
(২) 'যাবত': তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে সকল রাবীর 'নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা' পূর্ণরূপে বিদ্যমান বলে প্রমাণিত,
(৩) 'ইত্তিসাল': সনদের প্রত্যেক রাবী তাঁর ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে হাদীসটি শুনেছেন বলে প্রমাণিত,
(৪) 'শুযূষ মুক্তি': হাদীসটি অন্যান্য প্রামাণ্য বর্ণনার বিপরীত নয় বলে প্রমাণিত এবং
(৫) 'ইল্লাত মুক্তি': হাদীসটির মধ্যে সুক্ষ্ম কোনো সনদগত বা অর্থগত ত্রুটি নেই বলে প্রমাণিত।
প্রথম তিনটি শর্ত সনদ কেন্দ্রিক ও শেষের দুইটি শর্ত মূলত অর্থ কেন্দ্রিক।
দ্বিতীয় শর্তে সামান্য দুর্বলতা থাকলে হাদীসটি 'হাসান' বলে গণ্য হতে পারে। (বিস্তারিত দেখুন: ইরাকী, আত-তাকয়ীদ, পৃ: ২৩-২৫; ফাতহুল মুগীস, পৃ: ৭-৮; সাখাবী, ফাতহুল মুগীস ১/২৫-৩১; সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/৬৩-৭৪; মাহমূদ তাহহান, তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস, পৃ. ৩৪-৩৬, ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি, পৃ. ৫৬-১২৩)২৩৯।
এ সকল শর্তের অবর্তমানে হাদীসটি যয়ীফ বা দুর্বল অথবা বানোয়াট বা মাউযূ হাদীস বলে গণ্য হবে। এ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনার জন্য 'হাদীসের নামে জালিয়াতি' গ্রন্থটি দ্রষ্টব্য।
টিকাঃ
২৩৪ মুসলিম, আস-সহীহ ৪/২২৯৮
২৩৫ তিরমিযী, আস-সুনান ৫/৩৩-৩৪; আবু দাউদ, আস-সুনান ৩/৩২২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৮৪-৮৬; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১/২৬৮, ২৭১, ৪৫৫; হাকিম নাইসাপূরী, আল-মুসতাদরাক ১/১৬২, ১৬৪; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৩৮-১৩৯
236 নববী, ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ (৬৭৬হি), শারহু সাহীহ মুসলিম ১/৬৮, ইবনুল জাউযী, আল-মাউযূ'আত ২৮-৫৬
237 মুসলিম, আস-সহীহ ১/১২
238 মুসলিম, আস-সহীহ ১/১০
২৩৯ বিস্তারিত দেখুন: ইরাকী, আত-তাকয়ীদ, পৃ: ২৩-২৫; ফাতহুল মুগীস, পৃ: ৭-৮; সাখাবী, ফাতহুল মুগীস ১/২৫-৩১; সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/৬৩-৭৪; মাহমূদ তাহ্বান, তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস, পৃ. ৩৪-৩৬, ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি, পৃ. ৫৬-১২৩