📄 হাসান (حسن)
حسن এর আভিধানিক অর্থ সুন্দর। 'হাসান' এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যে হাদীসের সনদগুলো প্রসিদ্ধ, তবে সহী হাদীসের রাবীদের ন্যায় প্রসিদ্ধ নয়, তাই হাসান"। হাফেয ইব্ন হাজার আসকালানি রাহিমাহুল্লাহ্ হাসানের সবচেয়ে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ
وخبر الآحاد بنقل عدل تام الضبط متصل السند، غير معلل ولاشاذ هو الصحيح لذاته. ثم قال: فإن خف الضبط فالحسن لذاته النزهة (ص٩١)
"আদিল ও পরিপূর্ণ দ্বাবত সম্পন্ন রাবির মুত্তাসিল সনদে বর্ণিত, ইল্লত ও শায থেকে মুক্ত খবরে ওয়াহেদকে সহি লি-যাতিহি বলা হয়। অতঃপর তিনি বলেন: যদি দ্বাবত দুর্বল হয়, তাহলে হাসান লি-যাতিহি”¹⁷⁹। শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেনঃ "যে হাদীস দু'সনদে বর্ণিত, যার সনদে মিথ্যার অপবাদে দুষ্ট কোনো রাবি নেই এবং যা সহী হাদীসের বিপরীত শায
নয়, তিরমিযীর পরিভাষায় তাই হাসান। সুতরাং, যে হাদীসের বর্ণনাকারীর মধ্যে সকল গুণ বর্তমান থাকা সত্ত্বেও যদি স্মরণ শক্তির কিছুটা দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়, তবে সেই হাদীসকে 'হাদীসে হাসান' বলে। আরও বিস্তারিতভাবে বলা যায় যে, যে হাদীস এর রাবীর যত গুণে পরিপূর্ণতার অভাব রয়েছে সে হাদীসকে হাদীসে হাসান বলে। (ফক্বীহ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা সাধারণত এই দুই প্রকার হাদীস হতেই আইন প্রণয়ণে সাহায্য গ্রহণ করেন)।
টিকাঃ
¹⁷⁹ আন-নুযহাহ: (৯১)
📄 যঈফ (ضعيف)
ضعیف এর আভিধানিক অর্থ দুর্বল। 'যে হাদীসের মধ্যে হাসান হাদীসের শর্তগুলি অবিদ্যমান দেখা যায়, মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় তাকে যঈফ বা দুর্বল হাদীস বলে। এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও ইসহাক বিন রাহওয়াইহ বলেন, যে আলেম হাদীসের সহীহ-যঈফ ও নাসেখ-মানসূখ জানেন না, তাকে আলেমই বলা চলে না। (মারেফাতু উলুমুল হাদীস গ্রন্থের বরাতে সহীহ তারগীব তারহীবের ভূমিকা- পৃঃ- ১৩)¹⁸⁰。
'যঈফ' এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলা যায় যে, "যেসব হাদীস হাসান হাদীসের স্তর থেকে নিচু তাই য'ঈফ বা দুর্বল হাদীস, তার অনেক প্রকার রয়েছে"। অর্থাৎ -
১- রাবীর বিশ্বস্ততার ঘাটতি বা
২- তাঁর বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণনা বা স্মৃতির ঘাটতি, বা
৩- সনদের মধ্যে কোন একজন রাবী তাঁর ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে সরাসরি ও স্বকর্ণে শোনেননি বলে প্রমানিত হওয়া বা দৃঢ় সন্দেহ হওয়া, বা
৪- অন্যান্য প্রমানিত হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া, অথবা
৫- সূক্ষ্ম কোন সনদগত বা অর্থগত ত্রুটি থাকা ইত্যাদি যে কোন একটি বিষয় কোন হাদীসের মধ্যে থাকলে হাদীসটি যঈফ বলে গণ্য। কোন হাদীসকে 'যঈফ' বলে গণ্য করার অর্থ হল, হাদীসটি রাসুল (সাঃ) এর কথা নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। বিদ্বানগণ যঈফ হাদীসের বিভিন্ন প্রকার বর্ননা করেছেন। ইবনু হিব্বান বলেছেন, দুর্বল হাদীস ৪৯ প্রকার। হাফেয ইরাকী ৪২ প্রকার বলেছেন। আবার কেউ কেউ ১২৯ প্রকার বলেছেন। যঈফ হাদীস যত প্রকারেরই হোক না কেন শেষ পর্যন্ত এর কোন বাস্তব সম্মত গ্রহনযোগ্যতা আসে নি। তাই যঈফ হাদীসের উপর আমল না করার জন্য হাদীস বিদ্বানগণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন আর তাছাড়া শরীয়াতের বিধানাবলীতে তাকে প্রমান হিসেবে পেশ করা যাবে না আর এটাই
হাদীস বিদ্বানগণের অভিহিত ¹⁸¹। সুতরাং হাদীসের দ্বারা কোন রাবী হাসান হাদীস - এর রাবীর গুণসম্পন্ন নয় সে হাদীসকে হাদীসে যঈফ বলে। (রাবীর যু'ফ বা দুর্বলতার কারণেই হাদীসটিকে যঈফ বলা হয়)।
টিকাঃ
¹⁸⁰ মারেফাতু উলুমুল হাদীস গ্রন্থের বরাতে সহীহ তারগীব তারহীবের ভূমিকা- পৃঃ- ১৩
¹⁸¹ ইত্তেবায় সুন্নাহ – মুহাম্মাদ ইকবাল কিলানী, অনুবাদঃ মুহাম্মাদ হারুন আযীযী নদভী, পৃষ্ঠা নং- ৪৭
📄 যঈফ (ضعيف) হাদীস আমল করা প্রসঙ্গে
দ্বিতীয় পর্যায়ের একদল ফিকহ্বিদ যারা ফাযীলাতের ক্ষেত্রে যঈফ 'আমালের অনুমতি দিলেও তারা যঈফ হাদীস 'আমালের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তারোপ করেছেন। যেমন-
(১) যে সব যঈফ হাদীসের উপর 'আমাল করা হবে, তা যেন কোন মতেই আক্বীদা বা হুকুম সংক্রান্ত না হয়। যদি তা হয় তাহলে কোন ক্রমে যঈফ হাদীস 'আমাল করা যাবে না।
(২) যদি কেউ নিতান্ত বাধ্য হয়ে যঈফ হাদীস 'আমাল করতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, ঐ 'আমালটা যেন কোন মতেই দেশ ও সমাজের প্রচলিত সহীহ হাদীসের 'আমালের বিরোধী না হয়। যদি হয় তাহলে 'আমাল করা যাবে না।
(৩) উক্ত যঈফ হাদীসের সনদ বা সূত্র যেন অত্যন্ত দুর্বল না হয়।
(৪) পরিশেষে যঈফ হাদীস 'আমালকারীকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, হাদীসটি যঈফ বা সন্দেহযুক্ত। আর অন্যের নিকট বলার সময় তা যঈফ হিসাবেই উল্লেখ করতে হবে ২৩১। এ প্রসঙ্গে সত্য সন্ধানীদের নিকট আমার প্রশ্ন হলো, বর্তমান যারা ফাযীলাতের দোহাই দিয়ে হরহামেশা, যঈফ হাদীস বর্ণনা করেন, কিংবা যঈফ হাদীসের 'আমাল ছাড়তে রাযি থাকেন না। তারা কি আদৌ ফিকহ্বিদদের উক্ত চারটি শর্তের তোয়াক্কা করেন? ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে ইমাম মুসলিম বলেনঃ যঈফ হাদীস বর্ণনা করার সময় যঈফ জানা সত্ত্বেও যারা মানুষের সামনে হাদীসের ত্র"টি তুলে ধরে না, তারা গুনাহগার হবে। আর সাধারণ মুসলিমদের নিকট প্রতারক বলে গণ্য হবে। কারণ যারা যঈফ হাদীস শুনবে এবং সেগুলোর উপর 'আমাল করবে অথচ ঐসব হাদীস অধিকাংশ ভিত্তিহীন মিথ্যা বানোয়াট। ইমাম মুসলিম আরো বলেন যে, পৃথিবীতে নির্ভরযোগ্য ও আস্থাশীল বর্ণনাকারীদের বর্ণিত অসংখ্য নির্ভুল সহীহ হাদীসের বিরাট ভাণ্ডার আমাদের সামনে বিদ্যমান থাকতে কোন ক্রমেই যঈফ হাদীস গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না। এ সম্পর্কে ইমাম মুসলিম বলেন, আমি মনে করি, যে সব লোক যঈফ হাদীস অখ্যাত সনদে বর্ণনা করেন বা তার উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তাদের উদ্দেশ্য হল নিজেকে অপরের নিকট অধিক হাদীস বয়ানকারী হিসাবে জাহির করানো বা মানুষের বাহবা কুঁড়ানো।
'ইল্মে হাদীসের ক্ষেত্রে যারা এ নীতিতে পা বাড়ায় হাদীস শাস্ত্রে তাদের কোন স্থান নেই। বস্তুত এমন ব্যক্তি আলিম ও বক্তা (শাইখুল হাদীস) হিসাবে আখ্যায়িত না হয়ে বরং জাহিল মূর্খ হিসাবে আখ্যায়িত হবার যোগ্য। (সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দামা- ১ম খণ্ড, ৫০ পৃঃ, ই. ফা. বাং) 232 এখানে কেউ কেউ হয়তো বলতে চাইবেন যে, যঈফ হাদীস যদি 'আমালযোগ্যই না হবে তাহলে হাদীসের কিতাবে যঈফ হাদীস লিখা হল কেন? এরূপ প্রশ্নের জওয়াব ইমাম আবু ঈসা তিরমিযী (রহঃ) অত্যন্ত জোরালো ভাষায় দিয়েছেন। তিনি বলেন, মুহাদ্দিসগণ অনেক সময় যঈফ রাবীদের বর্ণিত দুর্বল হাদীসকে সনাক্ত করার জন্য কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মুঈন বলেন, আমি যঈফ ও জাল হাদীস এজন্য লিপিবদ্ধ করি যাতে ভবিষ্যতে এগুলোকে কেউ পরিবর্তন করে সহীহ হাদীস বানাতে না পারে। (শরহু ইলালিত তিরমিযী ৮৪ পৃঃ, জামে তিরমিযী মুখবন্ধ ১ম খণ্ড ৬০ পৃঃ, অনুবাদ- আবদুন নূর সালাফী) ২৩৩। আর জাল হাসিস আমল করার তো প্রশ্নই আসে না। আল্লাহ্ আমাদের সকলকে সহীহ হাদীসের উপর আমল করার তৈফিক দান করুন।
টিকাঃ
২৩১ ইমাম মহিউদ্দিন নাববীর সহীহ মুসলিমে শরাহ তাওজীহুন নজর কাওয়াছিদ্রুত তাহাদীস
232 সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দামা- ১ম খণ্ড, ৫০ পৃঃ, ই.ফা.বাং
২৩৩ শরহু ইলালিত তিরমিযী ৮৪ পৃঃ, জামে তিরমিযী মুখবন্ধ ১ম খণ্ড ৬০ পৃঃ, অনুবাদ- আবদুন নূর সালাফী
📄 যঈফ (ضعيف) হাদীসের উপর আমল কি গ্রহণযোগ্য?
অনেকে মনে করেন, যঈফ হাদীস ফযীলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, তাদের এ ধারণা সঠিক নয়। বরং ফযীলত ও আহকাম সর্ব ক্ষেত্রেই যঈফ হাদীস বর্জনীয়। এটিই অধিকাংশ ইমামগণের চূরান্ত ফায়সালা। আল্লামা জামালুদ্দীন ক্বাসেমী (রহঃ) এর 'কাওয়ায়েদুল হাদীস' এর পৃঃ ১১৩ -তে কতিপয় ইমামদের মতামত উল্লেখ করে তিনি বলেছেন যে ফযীলত কিংবা আহকাম কোন ক্ষেত্রেই যঈফ হাদীস আমলযোগ্য নয়। ইমামগণ হলেনঃ
■ ইমাম বুখারী,
■ ইমাম মুসলিম,
■ ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাঈন,
■ ইমাম ইবনুল আরাবী,
■ ইমাম ইবনু হাযম,
■ ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ সহ প্রমূখ মনিষীগণ।
যারা মনে করেন ফাজায়েলে ক্ষেত্রে জঈফ হাদীস আমল করা যায় তাদের কথার কোন দলিল নাই। তারা কেবল অনুমান ও ধারনা বসত এই কথা বলে থাকে যে জঈফ হাদীসও রাসুল (সাঃ) এর বানী হতে পারে। রাবী যদি সন্দেহযুক্ত হয়, তবে কিভাবে সেটা রাসূল (সাঃ) এর হাদীস হতে পারে? আল্লাহ বলেন, 'তারা কেবল অনুমান ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন'। [সূরা আন নাজম ২৩]।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেন, 'তোমরা অনুমান করা হতে নিজেদের রক্ষা কর, কারন অনুমানই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা মিথ্যা (হাদীস) কথা'। [সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলীম]।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আরও বলেন, 'এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমানের উপর চলে। অথচ সত্যের অনুমান মোটেই ফলপ্রসু নয়'। [সূরা আন নাজম ২৭-২৮]
জাল ও যঈফ হাদীস বর্জন প্রসঙ্গে ও ইমামদের অভিতমতঃ জাল ও যঈফ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত সকল প্রকার আমল নিঃসঙ্কোচে নিঃশর্তভাবে বর্জন করতে হবে। কারণ জাল ও যঈফ হাদীস দ্বারা কোন শারঈ বিধান প্রমাণিত হয় না। জাল হাদীসের উপর আমল করা পরিষ্কার হারাম। সে কারণ সাহাবায়ে কেরাম যঈফ ও জাল হাদীসের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। আস্থাহীন, ত্রুটিপূর্ণ, অভিযুক্ত, পাপাচারী, ফাসিক শ্রেণীর লোকের বর্ণনা তারা গ্রহণ করতেন না।
প্রসিদ্ধ চার ইমামসহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণও এর বিরুদ্ধে ছিলেন। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর চূড়ান্ত মূলনীতি ছিল যঈফ হাদীস ছেড়ে কেবল সহীহ হাদীসকে আঁকড়ে ধরা। তাই দ্ব্যর্থহীনভাবে তিনি ঘোষণা করেন,
إِذَا صَحَّ الْحَدِيْثُ فَهُوَ مَذْهَبِيْ
'যখন হাদীস সহীহ হবে সেটাই আমার মাযহাব'।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন,
إِنَّ الْعَالِمَ إِذَا لَمْ يَعْرِفِ الصَّحِيحَ وَالسَّقِيمَ وَالنَّاسِخَ وَالْمَنْسُوْخَ مِنَ الْحَدِيْثِ لَا يُسَمَّى عَالِمًا
'নিশ্চয়ই যে আলেম হাদীসের সহীহ-যঈফ ও নাসিখ-মানসূখ বুঝেন না তাকে আলেম বলা যাবে না'। ইমাম ইসহাক্ব ইবনু রাওয়াহাও একই কথা বলেছেন। ইমাম মালেক, শাফেঈ (রহঃ)-এর বক্তব্যও অনুরূপ।
মুহাদ্দিস যায়েদ বিন আসলাম বলেন, مَنْ عَمِلَ بِخَيْرٍ صَحٌ أَنَّهُ كَذَّبٌ فَهُوَ مِنْ خَدَمِ الشَّيْطَانِ
'হাদীস মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও যে তার উপর আমল করে সে শয়তানের খাদেম'। অতএব ইমাম হোন আর ফক্বীহ হোন বা অন্য যেই হোন শরী'আত সম্পর্কে কোন বক্তব্য পেশ করলে তা অবশ্যই সহীহ দলীলভিত্তিক হ'তে হবে।