📄 সহীহ হাদীস (صحيح)
صحیح শব্দটি আরবী। বহুবচনে صحاح এর আভিধানিক অর্থ সুস্থ। সাধারণত মানুষের শারীরিক সুস্থতার জন্য 'সহীহ' ব্যবহৃত হয়, যেমন হাদীসে এসেছেঃ " وَأَنْتَ صَحِيحٌ " 'তুমি সুস্থাবস্থায়' এ থেকেই সনদ ও মতন দোষমুক্ত হলে হাদীসকে সহিহ বলা হয়।
যে মুত্তাসিল সনদের রাবীগণ প্রত্যেকেই উত্তম শ্রেণীর আদিল ও জাবিতরূপে পরিচিত অর্থাৎ সেকাহ হওয়ার শর্তাবলী তাদের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে বিরাজমান, মূল হাদীসটি সুক্ষ্ম দোষ ত্রুটি অথবা শা'জ বা দল ছাড়া হতে মুক্ত এরূপ হাদীসকে 'সহীহ হাদীস' বলে।
অন্যভাবে বলা যায় যে হাদীসের বর্ণনা সূত্র ধারাবাহিক রয়েছে, সনদের প্রত্যেক স্তরের বর্ণনাকারীর নাম সঠিকরূপে উল্লেখিত হয়েছে, বর্ণনাকারীগণ সর্বোতভাবে বিশ্বস্ত সেকাহ যাদের স্মরণ শক্তি অত্যন্ত প্রখর এবং যাদের সংখ্যা কোন স্তরেই মাত্র একজন হয়নি,
এরূপ হাদীসকে হাদীসে সহীহ বলে। অর্থাৎ যে মুত্তাসিল হাদীস - এর সনদের প্রত্যেক রাবীই পূর্ণ আদালত ও যন্ত গুণসম্পন্ন এবং হাদীসটি শুযুয ও ইল্লত হতে দোষমুক্ত সে হাদীসকে হাদীসে সহীহ্ বলে। অর্থাৎ যে হাদীসটি মুনকাতে নয় মু'দাল নয়, মুয়াল্লাক নয়, মুদাল্লাস নয়, কারো কারো মতে মুরসাল'ও নয়, মুবহাম অথবা প্রসিদ্ধ যঈফ রাবীর হাদীস নয়, স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার দরুণ অনেক ভুল করেন এমন মুগাফ্ফার বারীর হাদীস শরীফ নয় এবং হাদীসটি শাহ্ ও মুয়াল্লাল'ও নয় একমাত্র সে হাদীসকেই হাদীসে সহীহ্ বলে।
'সহীহ'-র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেনঃ
هو ما نقله العدل تام الضبط متصل السند غير معلل ولا شاذ
"যে হাদীস মুত্তাসিল সনদ তথা অবিচ্ছিন্ন সনদ পরম্পরায় বর্ণিত হয়, রাবী বা বর্ণনাকারী আদিল ও পূর্ণ আয়ত্বশক্তির অধিকারী হয়, এবং সনদটি শায কিংবা মুআল্লাল নয়; এমন হাদীস কে সহীহ বলে।
সহীহ হাদীসের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেন- "যে হাদীসের সনদ নির্ভরযোগ্য ও সঠিক রূপে সংরক্ষণকারী বর্ণনা
কারকদের সংযোজনে পরম্পরাপূর্ণ ও যাতে বিরল ও ত্রুটিযুক্ত বর্ণনাকারী একজনও নেই, তাই 'হাদীসে সহীহ'।
বস্তুতঃ কোন সহীহ হাদীসই কুরআন বিরোধী নয়ঃ তাবিয়ী ইয়াহ্ ইয়া ইবনে আবী কাসির বলেন, সুন্নাত বা হাদীস কুরআনের ওপর ফায়সালা দানকারী, কিন্তু হাদীসের ওপর কুরআন সিদ্ধান্ত দানকারী নয়। এ উক্তিটির ব্যাখ্যায় ইমাম বাইহাকী বলেন, কুরআনের ব্যাপারে হাদীস ব্যাখ্যাদানকারী পর্যায়ে পড়ে। তাই হাদীসের কোন তথ্যই কুরআনের বিরোধীতা করে না। এটাকে আরও ভেঙ্গে আল্লাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী বলেন, "কুরআন হাদীসের মুখাপেক্ষী” এ কথাটির ভাবার্থ এটা যে, হাদীস কুরআনেরই ব্যাখ্যাকারী এবং তার সংক্ষিপ্ত তথ্যাবলীকে বিশদভাবে বর্ননাকারী। এ অর্থই হচ্ছে হাদীস কুরআনের উপর সিদ্ধান্ত দানকারী উক্তির কিন্তু কুরআন হাদীসের ব্যাখ্যাদানকারী নয় এবং তা হাদীসের উপর ফায়সালা দানকারীও নয়। কারন, হাদীস তো নিজেই বিস্তারিত। যার ব্যাখ্যায় কুরআনের প্রয়োজনই হয় না।
আল্লামা আবু উবাইদ বলেন, কোন জিনিসকে আল্লাহর এবং তাঁর রাসূলের হালাল ও হারাম করার ব্যাপারে কোন পার্থক্যই নেই। আর রাসূলও এমন কোন বিধান দিতেন না যার বিপরীত বিধান কুরআন
দিতে পারে বরং সহীহ হাদীসই হচ্ছে কুরআনের ব্যাখ্যাদানকারী এবং কুরআনী-বিধিনিষেধ ও আইন কানুনের বিশ্লেষনকারী।
তাই কোন সহীহ হাদীসই যে কুরআনের বিরোধী হতে পারে না তার প্রমান পাওয়া যায় বিখ্যাত এক তাবিয়ী সায়ীদ ইবনে যুবাইরের বর্ননায়। তিনি বলেন, "আমি মনে করি না যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্নীত এমন হাদীস বর্ননা করছি যাতে তুমি কুরআনের দোহাই দিয়ে আপত্তি করতে পার? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তোমার থেকে কুরআনের বেশি জ্ঞানী ছিলেন¹⁷⁵।"
হাদীস সহীহ হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত রয়েছেঃ
১. সনদ মুত্তাসিল হওয়া।
২. রাবীর আদিল হওয়া।
৩. রাবীর দ্বাবিত হওয়া।
৪. শায না হওয়া।
৫. মু'আল্লাল না হওয়া।
প্রথম শর্তঃ اتصال السند বা সনদ মুত্তাসিল হওয়াঃ সনদ মুত্তাসিল হওয়ার অর্থ, হাদীসের সনদে বিদ্যমান প্রত্যেক রাবী (বর্ণনাকারী) তার শায়খ (শিক্ষক) থেকে সরাসরি হাদীস শ্রবণ করেছেন প্রমাণিত হওয়া। যেমন গ্রন্থকার মুহাদ্দিস বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (প্রথম উস্তাদ), তিনি বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (দ্বিতীয় উস্তাদ), তিনি বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (তৃতীয় উস্তাদ), তিনি বললেন: আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (চতুর্থ উস্তাদ)। এভাবে প্রত্যেক রাবী স্বীয় শায়খ থেকে শ্রবণ করেছে নিশ্চিত করলে সনদ মুত্তাসিল। শায়খের অনুমতি গ্রহণ করা, শায়খকে হাদীস শুনিয়ে সম্মতি নেওয়াকে সরাসরি শ্রবণ করা বলা হয়।
দ্বিতীয় শর্ত: عدالة الراوى বা রাবীর আদলঃ সহীহ হাদীসের দ্বিতীয় শর্ত রাবীর ‘আদল’ হওয়া। عدل ‘আদল’ শব্দের অর্থ সোজা ও বক্রতাহীন রাস্তা, যেমন বলা হয় طريق عدل ‘সোজা রাস্তা’। পাপ পরিহারকারী ও সুস্থরুচি সম্পন্ন ব্যক্তি ন্যায় ও সোজা রাস্তার অনুসরণ করে, তাই তাকে ‘আদল’ বা ‘আদিল’ বলা হয়। عادل কর্তাবাচক বিশেষ্য, অর্থ ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। হাদীসের পরিভাষায় দীনদারী ও সুস্থরুচিকে عدالة বলা হয়।
'আদিল' এর পারিভাষিক সংজ্ঞাঃ মুসলিম, বিবেকী, সাবালক, দীন বিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত ও সুস্থ রুচির অধিকারী ব্যক্তিকে উসুলে হাদীসের পরিভাষায় 'আদিল' বলা হয়। নিম্নে প্রত্যেকটি শর্ত প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হলোঃ
মুসলিমঃ রাবীর 'আদিল হওয়ার জন্য মুসলিম হওয়া জরুরী। অতএব কাফের 'আদিল' নয়, তার হাদীস সহীহ নয়। কাফের কুফরী অবস্থায় হাদীস শ্রবণ করে যদি মুসলিম হয়ে বর্ণনা করে, তাহলে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য। কারণ সে সংবাদ দেওয়ার সময় আদিল, যদিও গ্রহণ করার সময় আদিল ছিল না। যেমন জুবাইর ইবন মুতয়িম রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন:
«سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْرَأُ فِي الْمَغْرِبِ بِالطُّورِ»
"আমি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাগরিবের সালাতে সূরা তুর পড়তে শুনেছি”। তিনি শুনেছেন কাফের অবস্থায়, আর বর্ণনা করেছেন মুসলিম অবস্থায়। (বুখারী ও মুসলিম)
সাবালিগঃ রাবীর আদিল হওয়ার জন্য সাবালিগ হওয়া জরুরি। কেউ শৈশবে হাদীস শ্রবণ করে যদি সাবালিগ হয়ে বর্ণনা করে, তাহলে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য, সাবালিগ হওয়ার পূর্বে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। কতক সাহাবীর ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য নয়, যেমন
ইব্ন আব্বাস, ইব্ন যুবায়ের ও নুমান ইব্ন বাশির প্রমুখ, তাদের হাদীস শৈশাবস্থায় গ্রহণ করা হয়েছে।
বিবেকবানঃ রাবীর আদিল হওয়ার জন্য বিবেক সম্পন্ন হওয়া জরুরি। বিবেকহীন ও পাগল ব্যক্তির বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। পাগল দু'প্রকার: স্থায়ী পাগল ও অস্থায়ী পাগল। স্থায়ী পাগলের হাদীস কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। অস্থায়ী পাগলের মধ্যে যদি সুস্থাবস্থায় সহিহ্র অন্যান্য শর্ত বিদ্যমান থাকে, তাহলে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য, তবে শ্রবণ করা ও বর্ণনা করা উভয় অবস্থায় সুস্থ থাকা জরুরি।
দীনদারীঃ রাবীর 'আদিল হওয়ার জন্য দীনদার হওয়া জরুরি, তাই পাপের উপর অটল ব্যক্তি আদিল নয়। পাপ হলেই 'আদল বিনষ্ট হবে না, কারণ মুসলিম নিষ্পাপ নয়, তবে বারবার পাপ করা কিংবা কবিরা গুনাহ্য় লিপ্ত থাকা 'আদল পরিপন্থী। দীনের অপব্যাখ্যাকারী, তাতে সন্দেহ পোষণকারী ও বিদ'আতির হাদীস গ্রহণ করা সম্পর্কে আহলে ইলমগণ বিভিন্ন শর্তারোপ করেছেন।
সুস্থ রুচিবোধঃ রাবীর 'আদল হওয়ার জন্য সুস্থ রুচিবোধ সম্পন্ন হওয়া জরুরি। সুস্থ রুচিবোধের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই।
প্রত্যেক সমাজের নির্দিষ্ট প্রথা, সে সমাজের জন্য মাপকাঠি, যা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে নানা প্রকার হয়। সাধারণত সৌন্দর্য বিকাশ ও আভিজাত্য প্রকাশকারী কর্মসমূহ সম্পাদন করা এবং তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্নকারী কর্মসমূহ পরিত্যাগ করাকে সুস্থ রুচিবোধের পরিচায়ক বলা হয়। হাফেয ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ 'আদল' এর সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন, 'আদল' ব্যক্তির মধ্যে এমন যোগ্যতা, যা তাকে তাকওয়া ও রুচিবোধ আঁকড়ে থাকতে বাধ্য করে"। অতএব ফাসেক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী 'আদিল' নয়, যদিও সে সত্যবাদী। জামাত ত্যাগকারী 'আদিল' নয়, যদিও সে সত্যবাদী, সুতরাং তাদের বর্ণনাকৃত হাদীস সহীহ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ إِن جَاءَكُمْ فَاسِقُ بِنَيَا فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بجهالة فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَدِمِينَ ٦ [الحجرات: ٦
"হে ঈমানদারগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো কওমকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে"। ফাসেক ব্যক্তির সংবাদ যাচাই ব্যতীত গ্রহণ করা যাবে না, পক্ষান্তরে আদিল ব্যক্তির সংবাদ গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ বলেন,
الطلاق : [۲] وَأَشْهِدُوا ذَوَيْ عَدْلٍ مِّنكُمْ وَأَقِيمُوا الشَّهْدَةَ لِلَّهِ ۲
“আর তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দু'জন সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে।” এ আয়াতে আল্লাহ ‘আদিল’ ব্যক্তিদের সাক্ষীরূপে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সারাংশঃ ‘আদিল’ ব্যক্তির মধ্যে দু’টি গুণ থাকা জরুরি: দীনদারী ও সঠিক রুচিবোধ। এ দু’টি গুণকে ‘আদালত’ বলা হয়। কখনো ‘আদিল’ ব্যক্তির জন্য ক্রিয়াবিশেষ্য ‘আদল’ শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেমন: يرويه عدل এখানে ‘আদল’ অর্থ ‘আদিল’। অত্র গ্রন্থে আমরা আদিল, আদালত ও আদল শব্দগুলো অধিক ব্যবহার করব, তাই পাঠকবর্গ ভালো করে স্মরণ রাখুন।
তৃতীয় শর্তঃ ضبط الراوى রাবীর যবত বা সংরক্ষণঃ সহীহ হাদীসের দ্বিতীয় শর্ত রাবীর ‘যবত’। ضبط ক্রিয়াবিশেষ্য, আভিধানিক অর্থ নিয়ন্ত্রণ। এ থেকে যিনি শায়খ থেকে হাদীস শ্রবণ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন, তাকে ضابط বলা হয়। ‘যাবিত’ কর্তাবাচক বিশেষ্য, অর্থ সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণকারী। ضبط এর পারিভাষিক অর্থ: শায়খ থেকে শ্রবণ করা হাদীস হ্রাস, বৃদ্ধি ও বিকৃতি ব্যতীত অপরের নিকট পৌঁছে দেওয়াই ضبط।
ضبط দু’প্রকারঃ স্মৃতি শক্তির জাবত ও খাতায় লিখে জাবত। সাহাবী ও প্রথম যুগের তাবেয়ীগণ স্মৃতি শক্তির উপর নির্ভর করতেন, পরবর্তীতে লেখার ব্যাপক প্রচলন হয়। তখন থেকে স্মৃতি শক্তি
অপেক্ষা লেখার উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়, তবে লিখিত পাণ্ডুলিপি নিজ দায়িত্বে সংরক্ষণ করা জরুরি।
চতুর্থ শর্তঃ عدم الشذوذ বা 'শায'- না হওয়াঃ 'মাকবুল বা গ্রহণযোগ্য রাবি যদি তাদের চেয়ে উত্তম বা অধিক নির্ভরযোগ্য রাবিদের বিপরীত বর্ণনা করে, তাহলে তাদের বর্ণনাকে শায বলা হয়'। সুতরাং কোন হাদীস সহী হতে হলে এমন না হওয়া। মকবুল অর্থ গ্রহণযোগ্য রাবি, যার একা বর্ণিত হাদীস ন্যূনতম পক্ষে 'হাসানে'-র মর্যাদা রাখে। মকবুলের চেয়ে উত্তম রাবিকে সেকাহ বলা হয়, যার একা বর্ণিত হাদীস 'সহিহ'-র মর্যাদা রাখে।
পঞ্চম শর্তঃ عدم العلة কোন ধরনের ইল্লত না থাকাঃ
ইল্লত দ্বারা উদ্দেশ্য সুপ্ত ও গোপন ইল্লত বা ত্রুটি, বিজ্ঞ মুহাদ্দিস ব্যতীত যা কেউ বলতে পারে না। সনদ ও মতন উভয় স্থানে দোষণীয় ইল্লত হতে পারে।
সহীহ হাদীসের উদাহরণঃ
حدثنا الحميدي عبد الله بن الزبير قال حدثنا سفيان قال حدثنا يحيى بن سعيد الأنصاري قال أخبرني محمد بن إبراهيم التيمي أنه سمع علقمة بن وقاص الليثي يقول سمعت عمر بن الخطاب رضي الله عنه على المنبر قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول * إنما
الأعمال بالنيات وإنما لكل امرئ ما نوى فمن كانت هجرته إلى دنيا يصيبها أو إلى امرأة ينكحها فهجرته إلى ما هاجر إليه
হুমায়দী (রহঃ) 'আলকামা ইন্ন ওয়াক্কাস আল-লায়সী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছিঃ আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কে বলতে শুনেছিঃ প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে দুনিয়া লাভের অথবা নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে- সেই উদ্দেশ্যেই হবে তার হিজরতের প্রাপ্য। বর্ণিত হাদীসটির সনদে ইমাম বুখারী থেকে রাসুল (সাঃ) পর্যন্ত ৬ জন রাবী রয়েছে। যথাঃ
১. হুমাইদি (আবদুল্লাহ বিন জুবায়ের)
২. সুফিয়ান
৩. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল আনসারী
৪. মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহিম আত তাইমী
৫. আলকামাহ ইবনে ওয়াক্কাস আল লাইসি
৬. সাহাবী উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ)
উপরোক্ত প্রত্যেক রাবী নিজ শায়খ থেকে হাদীসটি শুনেছেন যা হাদীসটির সনদে স্পষ্ট উল্লেখ রছেছে। তাই সনদটি মুত্তাসিল। প্রত্যেক রাবী আদিল ও পূর্ণরুপে জাবিত ছিলেন। তাছাড়া বর্ণিত হাদীসটি শায বা মুয়াল্লাল নয়। এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর সহীহ বুখারীতে সর্বপ্রথম পেশ করেছেন। এতে সহিহ হাদীসের পাঁচটি শর্ত পূর্ণরুপে বিদ্যমান রয়েছে। তাই নিঃসন্দেহে এটি একটি সহিহ হাদীস।
সহির বিভিন্ন মান বা স্তরসমূহঃ সকল রাবীর দ্বাবত ও আদালত সমান নয়, তাই সকল সহি হাদীসের মান সমান নয়। দ্বাবত ও আদালতের তফাতের কারণে সহী হাদীস সাত ভাগে ভাগ হয়ঃ
১. বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীস।
২. শুধু বুখারীতে বর্ণিত হাদীস।
৩. শুধু মুসলিমে বর্ণিত হাদীস।
৪. বুখারী ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক হাদীস।
৫. শুধু বুখারীর শর্ত মোতাবেক হাদীস।
৬. শুধু মুসলিমের শর্ত মোতাবেক হাদীস।
৭. অন্যান্য মুহাদ্দিসের শর্ত মোতাবেক সহি।
উল্লেখ্য, সহি ইব্ন খুযাইমাহ সহি ইব্ন্ন হিব্বান অপেক্ষা অধিক বিশুদ্ধ। (তথ্যসূত্রঃ তাহক্কীক - বুলুগুল মারাম, মিন আদিল্লাতিল আহকাম, পৃষ্ঠা নং - ২৩)। বর্ণনাকারীর গুণ বিচার করে সহীহ হাদীসকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়ঃ
১) সহীহ লিজাতিহী (صَحِيحُ لِذَاتِهِ) : যে হাদীসের সনদ অবিচ্ছিন্ন হয়, বর্ণনাকারীরা ন্যায়পরায়ণ ও পূর্ণ আয়ত্ব শক্তির অধিকারী হন এবং সনদটি শা'য ও মু'আল্লাল না হয় সে হাদীসকে সহীহ বা সহীহ লিযাতিহী বলে। অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য হাদীসগুলোর মধ্যে সহীহ লিযাতিহী'র মর্যাদা সবচেয়ে বেশী।
এটা খবরে ওয়াহিদের এমন এক প্রকার হাদীস যার রাবী বা হাদীস বর্ণনাকারী ধারাবাহিকভাবে রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওনার পর্যন্ত পৌঁছেছে। যার রাবী প্রখর স্মরণশক্তি সম্পন্ন এবং ন্যায় পরায়ন। مُعَلَّل (মুয়াল্লাল) তথা কোন গোপন দোষত্রুটি থেকে মুক্ত এবং شَاذٌّ (শায) তথা অন্য রাবীর বিশুদ্ধ বর্ণনার বিপরীত বর্ণনা থেকে মুক্ত। যেমনঃ
حَدَّثَنَا حَضَرَتْ الْحُمَيْدِيُّ رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ قَالَ حَدَّثَنَا ....... إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بالنيات
অর্থঃ "হুমাইদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, [রাসূল (সাঃ) তিনি ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই কর্মের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।” (বুখারী, মিশকাত)]¹⁷⁶。
প্রখ্যাত আলেমদের সংজ্ঞাঃ
আল্লামা জুরজানী (রঃ) বলেন, যে হাদীসের শব্দ দূর্বলতা থেকে এবং অর্থ আয়াতের পরিপন্থী হওয়া থেকে মুক্ত কিংবা খবরে মুতাওয়াতির বা ইজমাকে সহীহ লি যতিহী বলা হয়। মুফতি আমিমুল ইহসান বলেন, সহীহ লি যাতিহী ঐ খবরে ওয়াহেদকে বলা হয় যার বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ, পূর্ণ সংরক্ষণের অধিকারী এবং যা মুআল্লাল বা শায নয়।
আল্লামা হাফিয বিন আসকালানী (রঃ) এই সহীহ লি যাতিহীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, যে খবরের বর্ণনাকারী ন্যায়নিষ্ঠাবান, পূর্ণ সংরক্ষণের অধিকারী, যে সনদের রাবী পরম্পরায় ধারাবাহিকতা বিদ্যমান যে খবর মুয়াল্লাল (বাঃ) শায নয় এরুপ খবর হল সহীহ লি যাতিহী।
হাফিয ইবন আসকালানীর সংজ্ঞা এখানে সহীহ লি যাতিহীর চারটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় যা হলঃ
১। আদল বা ন্যায়নিষ্ঠাবান হওয়াঃ বর্ণনাকারীর ভিতর খোদাভীরুতা এবং সৌজন্যবোধ থাকবে। এখানে তাকওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হল শিরক, ফাসিকী ও বিদআত থেকে নিজেকে হিফাযত করা। নিজেকে মিথ্যা বলা, মদ্যপান থেকে বিরত রাখার নাম।
২। পূর্ণ যবতের অধিকারীঃ এখানে বর্ণনাকারীকে পূর্ণ যবতের অধিকারী হতে হবে যাতে করে যে কোন কিছু সে সহজে মুখস্ত করতে পারে। এই গুণাবলী না থাকার ফলে তা সহীহ লি যাতিহীর মধ্যে গণ্য হবে না। যবত দুই প্রকার যা হলঃ
ক। স্মৃতিপটে সংরক্ষণঃ যে শ্রবণশক্তি কোন হাদীস শ্রবণমাত্র অন্তরে ধরে রাখতে সক্ষম হয় এবং যখন তা জানতে চাওয়া হবে হুবহু মুখস্ত বর্ণনা করবে।
খ। লিখিতভাবে সংরক্ষণঃ যদি শায়খের কাছে থেকে কোন হাদীস শ্রবণ করার পর যদি তা নিজের কাছে লিখে রাখে আর তা প্রয়োজন মত বর্ণনা করা হল লিখিতভাবে সংরক্ষণ।
৩। সনদের ধারাবাহিকতাঃ যে খবরের রাবীগণের ধারাবাহিকতা এমনভাবে বিদ্যমান যে এর কোন স্তর থেকে কোন রাবী বাদ পড়েন নাই এবং এমন অবস্থা যে প্রত্যেক রাবী তার পূর্ববর্তী রাবী হতে বর্ণনা শুনেছেন এবং তা সনদ উল্লেখ করা হয়েছে।
৪। হাদীস মুআল্লাল বা শায না হওয়াঃ মুআল্লাল ঐ সকল হাদীসসমূহকে বলা হয় যার ভিতর সত্যিকারভাবে কোন ধরনের অসুস্থতা আছে। এক হাদীস অন্য হাদীসের ভিতর অনুপ্রবশের দরুন হাদীস উলট-পালট হয়ে যেতে পারে যার ফলে অর্থ বের করা দুরুহ হতে পারে। হাদীস মুআল্লাল দুইভাবে হতে পারে যা হল সনদের ভিত্তিতে এবং মতনের ভিত্তিতে। শায হচ্ছে ঐ সকল হাদীসসমূহ যেখানে নির্ভরযোগ্য রাবী অপর একজন নির্ভরযোগ্য রাবীর বিপরীত হবেন যিনি যবত ও আদলের গুণে অপরের চেয়ে অধিক হবে। এভাবে দুই নির্ভরযোগ্য রাবী পরস্পর বিপরীত অর্থবোধক হাদীস বর্ণনা করলে, কম নির্ভরযোগ্য রাবী শায এবং অধিক নির্ভরযোগ্য রাবী মাহফুয হিসেবে বিবেচিত হবে।
উদাহরণঃ ইমাম বুখারী একটি রিওয়য়াতে বর্ণনা করেন, আমাদের নিকট আব্দুল্লাহ ইবন ইউসুফ হাদীস রিওয়য়াত করেছেন, তিনি বলেন, আমাদের কাছে মালিক ইবন শিহাব খবর দিয়েছেন, তিনি
মুহাম্মদ ইবন জুবায়রবিন মুতাউম থেকে এবং তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَرَأَ فِي الْمَغْرِبِ بِالطُّورِ
আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে মাগরিবের সময় সূরা তুর পাঠ করতে শুনেছি। এই হাদীসটি মুত্তাসিল সনদ বর্ণিত এবং এই হাদীসটি শায বা মুয়াল্লাল নয়।
হুকুমঃ হাদীস বিশেষজ্ঞদের মতে এর উপর আমল করা ওয়াজিব। ঊসূলবিদাণ ও ফকীহগণের মতে খবরে সহীহ শরীয়াতের দলীল হিসেবে স্বীকৃত।
২) সহীহ লিগাইরিহী (صَحِيحُ لِغَيْرِهِ) : এটি মূলত হাসান লিযাতিহী। যদি হাসান হাদীসের সনদ সংখ্যা অধিক হয় তাহলে এর দ্বারা হাসান বর্ণনাকারীর মধ্যে যে ঘাটতি ছিল তার পূরণ হয়ে যায়। এরুপ অধিক সনদে বর্ণিত হাসান হাদীসকে সহীহ লিগাইরিহী বলে। এটা হাসান লিযাতিহী হাদীস- এর অনুরূপ।
অর্থাৎ সহীহ হাদীস-এর কোন রাবীর মধ্যে স্মরণ শক্তি কিছুটা কম থাকে। তবে সেই অভাব বা ত্রুটিটুকু অন্যান্য উপায়ে এবং অধিক রিওয়ায়েত দ্বারা পুরণ হয়ে যায়। মোট কথা, তার সমর্থনে বহু রিওয়ায়েত বর্ণিত থাকায় তার ত্রুটির ক্ষতিপুরণ হয়ে গেছে। এরূপ হাদীসকে সহীহ লিগাইরিহী বলে।
যে খবরে ওয়াহিদের বর্ণনাকারী ন্যায়-নিষ্ঠাবান কিন্তু ঐ বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ের নয় এবং হাদীস পূর্ণভাবে সংরক্ষণেও সক্ষম নয় তবে ঐ হাদীসের বিভিন্ন সনদ রয়েছে এবং বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত রয়েছে যে তা এত অধিক শক্তিশালী ও জোড়দার সম্পন্ন যে, এর ত্রুটি তাতে পূর্ণ হয়ে যায় এবং হাদীসটিকে সহীহের পর্যায়ে নিয়ে যায়। এরূপ হাদীসকে সহীহ লি গায়রিহি বলা হয়।
এ প্রসঙ্গে ড. মুহাম্মদ ত্বাহান বলেন, সহীহ লিগাইরিহী প্রকৃতপক্ষে ঐ হাসান লিযাতিহী হাদীসকে বলা হয় যা অনুরুপ আরও একটি হাদীস আরও শক্তিশালী সূত্রে বর্ণিত।
তবে যেহেতু এটি সনদ হিসেবে নয়, বরং অন্য একটি রিওয়য়াতের কারণে সহীহ মানে উন্নীত হয়েছে যার ফলে একে সহীহ লিগায়রিহি বলা হয়। আব্দুল হক দেহলভী (রঃ) এ প্রসঙ্গে বলেন, যদি রাবীর ভিতর কোন দোষ-ত্রুটি না থাকে এবং তা যদি বহু সূত্রে বর্ণিত হয় তাহলে ঐ হাদীস হল হাসান লিগায়রিহী।
উদাহরণঃ আবু কুরায়ব (রহঃ) .......... হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
حَدَّثَنَا أَبُو كُرَيْبٍ، حَدَّثَنَا عَبْدَةُ بْنُ سُلَيْمَانَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَمْرٍو، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلَاةٍ ". قَالَ أَبُو عِيسَى وَقَدْ رَوَى هَذَا الْحَدِيثَ مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَحَدِيثُ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَزَيْدِ بْنِ خَالِدٍ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم كِلاهُمَا عِنْدِي صَحِيحٌ لأَنَّهُ قَدْ رُوِيَ مِنْ غَيْرِ وَجْهِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم هَذَا الْحَدِيثُ . وَحَدِيثُ أَبِي هُرَيْرَةَ إِنَّمَا صَحَ لِأَنَّهُ قَدْ رُوِيَ مِنْ غَيْرِ وَجْهِ . وَأَمَّا مُحَمَّدُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ فَزَعَمَ أَنَّ حَدِيثَ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ أَصَحُ . قَالَ أَبُو عِيسَى وَفِي الْبَابِ عَنْ أَبِي بَكْرِ الصِّدِّيقِ وَعَلِيٌّ وَعَائِشَةَ وَابْنِ عَبَّاسٍ وَحُذَيْفَةً وَزَيْدِ بْنِ خَالِدٍ وَأَنَسٍ وَعَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو وَابْنِ عُمَرَ وَأُمِّ حَبِيبَةً وَأَبِي أَمَامَةً وَأَبِي أَيُّوبَ وَتَمَّامِ بْنِ عَبَّاسٍ وَعَبْدِ اللَّهِ بْنِ حَنْظَلَةَ وَأُمِّ سَلَمَةَ وَوَائِلَةَ بْنِ الْأَسْقَعِ وَأَبِي مُوسَى
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আমার উম্মাতের জন্য কষ্টকর না হলে আমি প্রত্যেক সালাতের পূর্বে মিসওয়াকের নির্দেশ দিতাম। [সহীহ আত্ তিরমিজি :: মিসওয়াক করা বা দাঁত মাজা অনুচ্ছেদ, অধ্যায় ১ :: হাদীস ২২]¹⁷⁷
আবু 'ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক, তিনি মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম হতে, তিনি আবু সালামাহ হতে, তিনি যাইদ ইবনু খালিদ হতে তিনি নাবী (সাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।
আবু 'ঈসা বলেনঃ আবু হুরাইরাহ্ও যাইদ ইবনু খালিদ (রাঃ)-এর নিকট হতে আবু সালাম হতে বর্ণিত উভয় হাদীসই সহীহ্। কেননা এ হাদীসটি একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। সেমতে যাইদ ইবনু খালিদের নিকট হতে আবু সালাম হতে বর্ণিত হাদীসটি বেশি সহীহ্। এ অনুচ্ছেদে আবু বাক্র সিদ্দীক, 'আলী, 'আয়িশাহ্, ইবনু 'আব্বাস, হুযাইফা, যায়িদ ইবনু খালিদ, আনাস, 'আবদুল্লাহ্ইবনু 'আমর, উম্মি হাবীবা, ইবনু উমার, আবু উমামা, আবু আইয়ুব, তাম্মাম ইবনু 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ্ ইবনু হানযালা, উম্মি সালামা, ওয়াসিলা ও আবু মুসা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসও রয়েছে।
Abu Hurairah narrated that : Allah's Messenger said: "If it were not that it would be difficult on my nation, then I would have ordered them to use the Siwak for each prayer." (Sahih) - Grade: Sahih (Darussalam) [Jami at-Tirmidhi :: What Has Been Related About Siwak, Part 1 :: Hadith 22]¹⁷⁸
উল্লিখিত হাদীসটির সনদ দূর্বল হওয়া সত্ত্বেও ইমাম তিরমিযী (রঃ) তাকে সহীহ বলেছেন তা অন্যান্য সনদে স্মৃতিশক্তির দূর্বলতা বিদূরিত হয়েছে।
হুকুমঃ এই ধরনের হাদীসের উপর আমল করা অত্যাবশ্যকীয়। তবে তা পরস্পর বিরোধী হাদীস নিষ্পত্তি হওয়াতে তার স্থান ২য়।
টিকাঃ
¹⁷⁵ রাহে আমাল – আল্লামা জলীল আহসান নদভী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা নং- ৩৭
¹⁷⁶ বুখারী, মিশকাত
¹⁷⁷ সহিহ আত্ তিরমিজি :: মিসওয়াক করা বা দাঁত মাজা অনুচ্ছেদ, অধ্যায় ১ :: হাদীস ২২
¹⁷⁸ Jami at-Tirmidhi :: What Has Been Related About Siwak, Part 1 :: Hadith 22
📄 হাসান (حسن)
حسن এর আভিধানিক অর্থ সুন্দর। 'হাসান' এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন: “যে হাদীসের সনদগুলো প্রসিদ্ধ, তবে সহী হাদীসের রাবীদের ন্যায় প্রসিদ্ধ নয়, তাই হাসান"। হাফেয ইব্ন হাজার আসকালানি রাহিমাহুল্লাহ্ হাসানের সবচেয়ে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ
وخبر الآحاد بنقل عدل تام الضبط متصل السند، غير معلل ولاشاذ هو الصحيح لذاته. ثم قال: فإن خف الضبط فالحسن لذاته النزهة (ص٩١)
"আদিল ও পরিপূর্ণ দ্বাবত সম্পন্ন রাবির মুত্তাসিল সনদে বর্ণিত, ইল্লত ও শায থেকে মুক্ত খবরে ওয়াহেদকে সহি লি-যাতিহি বলা হয়। অতঃপর তিনি বলেন: যদি দ্বাবত দুর্বল হয়, তাহলে হাসান লি-যাতিহি”¹⁷⁹। শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ্ বলেনঃ "যে হাদীস দু'সনদে বর্ণিত, যার সনদে মিথ্যার অপবাদে দুষ্ট কোনো রাবি নেই এবং যা সহী হাদীসের বিপরীত শায
নয়, তিরমিযীর পরিভাষায় তাই হাসান। সুতরাং, যে হাদীসের বর্ণনাকারীর মধ্যে সকল গুণ বর্তমান থাকা সত্ত্বেও যদি স্মরণ শক্তির কিছুটা দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়, তবে সেই হাদীসকে 'হাদীসে হাসান' বলে। আরও বিস্তারিতভাবে বলা যায় যে, যে হাদীস এর রাবীর যত গুণে পরিপূর্ণতার অভাব রয়েছে সে হাদীসকে হাদীসে হাসান বলে। (ফক্বীহ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা সাধারণত এই দুই প্রকার হাদীস হতেই আইন প্রণয়ণে সাহায্য গ্রহণ করেন)।
টিকাঃ
¹⁷⁹ আন-নুযহাহ: (৯১)
📄 যঈফ (ضعيف)
ضعیف এর আভিধানিক অর্থ দুর্বল। 'যে হাদীসের মধ্যে হাসান হাদীসের শর্তগুলি অবিদ্যমান দেখা যায়, মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় তাকে যঈফ বা দুর্বল হাদীস বলে। এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও ইসহাক বিন রাহওয়াইহ বলেন, যে আলেম হাদীসের সহীহ-যঈফ ও নাসেখ-মানসূখ জানেন না, তাকে আলেমই বলা চলে না। (মারেফাতু উলুমুল হাদীস গ্রন্থের বরাতে সহীহ তারগীব তারহীবের ভূমিকা- পৃঃ- ১৩)¹⁸⁰。
'যঈফ' এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলা যায় যে, "যেসব হাদীস হাসান হাদীসের স্তর থেকে নিচু তাই য'ঈফ বা দুর্বল হাদীস, তার অনেক প্রকার রয়েছে"। অর্থাৎ -
১- রাবীর বিশ্বস্ততার ঘাটতি বা
২- তাঁর বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণনা বা স্মৃতির ঘাটতি, বা
৩- সনদের মধ্যে কোন একজন রাবী তাঁর ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে সরাসরি ও স্বকর্ণে শোনেননি বলে প্রমানিত হওয়া বা দৃঢ় সন্দেহ হওয়া, বা
৪- অন্যান্য প্রমানিত হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া, অথবা
৫- সূক্ষ্ম কোন সনদগত বা অর্থগত ত্রুটি থাকা ইত্যাদি যে কোন একটি বিষয় কোন হাদীসের মধ্যে থাকলে হাদীসটি যঈফ বলে গণ্য। কোন হাদীসকে 'যঈফ' বলে গণ্য করার অর্থ হল, হাদীসটি রাসুল (সাঃ) এর কথা নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। বিদ্বানগণ যঈফ হাদীসের বিভিন্ন প্রকার বর্ননা করেছেন। ইবনু হিব্বান বলেছেন, দুর্বল হাদীস ৪৯ প্রকার। হাফেয ইরাকী ৪২ প্রকার বলেছেন। আবার কেউ কেউ ১২৯ প্রকার বলেছেন। যঈফ হাদীস যত প্রকারেরই হোক না কেন শেষ পর্যন্ত এর কোন বাস্তব সম্মত গ্রহনযোগ্যতা আসে নি। তাই যঈফ হাদীসের উপর আমল না করার জন্য হাদীস বিদ্বানগণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন আর তাছাড়া শরীয়াতের বিধানাবলীতে তাকে প্রমান হিসেবে পেশ করা যাবে না আর এটাই
হাদীস বিদ্বানগণের অভিহিত ¹⁸¹। সুতরাং হাদীসের দ্বারা কোন রাবী হাসান হাদীস - এর রাবীর গুণসম্পন্ন নয় সে হাদীসকে হাদীসে যঈফ বলে। (রাবীর যু'ফ বা দুর্বলতার কারণেই হাদীসটিকে যঈফ বলা হয়)।
টিকাঃ
¹⁸⁰ মারেফাতু উলুমুল হাদীস গ্রন্থের বরাতে সহীহ তারগীব তারহীবের ভূমিকা- পৃঃ- ১৩
¹⁸¹ ইত্তেবায় সুন্নাহ – মুহাম্মাদ ইকবাল কিলানী, অনুবাদঃ মুহাম্মাদ হারুন আযীযী নদভী, পৃষ্ঠা নং- ৪৭
📄 যঈফ (ضعيف) হাদীস আমল করা প্রসঙ্গে
দ্বিতীয় পর্যায়ের একদল ফিকহ্বিদ যারা ফাযীলাতের ক্ষেত্রে যঈফ 'আমালের অনুমতি দিলেও তারা যঈফ হাদীস 'আমালের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তারোপ করেছেন। যেমন-
(১) যে সব যঈফ হাদীসের উপর 'আমাল করা হবে, তা যেন কোন মতেই আক্বীদা বা হুকুম সংক্রান্ত না হয়। যদি তা হয় তাহলে কোন ক্রমে যঈফ হাদীস 'আমাল করা যাবে না।
(২) যদি কেউ নিতান্ত বাধ্য হয়ে যঈফ হাদীস 'আমাল করতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, ঐ 'আমালটা যেন কোন মতেই দেশ ও সমাজের প্রচলিত সহীহ হাদীসের 'আমালের বিরোধী না হয়। যদি হয় তাহলে 'আমাল করা যাবে না।
(৩) উক্ত যঈফ হাদীসের সনদ বা সূত্র যেন অত্যন্ত দুর্বল না হয়।
(৪) পরিশেষে যঈফ হাদীস 'আমালকারীকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, হাদীসটি যঈফ বা সন্দেহযুক্ত। আর অন্যের নিকট বলার সময় তা যঈফ হিসাবেই উল্লেখ করতে হবে ২৩১। এ প্রসঙ্গে সত্য সন্ধানীদের নিকট আমার প্রশ্ন হলো, বর্তমান যারা ফাযীলাতের দোহাই দিয়ে হরহামেশা, যঈফ হাদীস বর্ণনা করেন, কিংবা যঈফ হাদীসের 'আমাল ছাড়তে রাযি থাকেন না। তারা কি আদৌ ফিকহ্বিদদের উক্ত চারটি শর্তের তোয়াক্কা করেন? ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে ইমাম মুসলিম বলেনঃ যঈফ হাদীস বর্ণনা করার সময় যঈফ জানা সত্ত্বেও যারা মানুষের সামনে হাদীসের ত্র"টি তুলে ধরে না, তারা গুনাহগার হবে। আর সাধারণ মুসলিমদের নিকট প্রতারক বলে গণ্য হবে। কারণ যারা যঈফ হাদীস শুনবে এবং সেগুলোর উপর 'আমাল করবে অথচ ঐসব হাদীস অধিকাংশ ভিত্তিহীন মিথ্যা বানোয়াট। ইমাম মুসলিম আরো বলেন যে, পৃথিবীতে নির্ভরযোগ্য ও আস্থাশীল বর্ণনাকারীদের বর্ণিত অসংখ্য নির্ভুল সহীহ হাদীসের বিরাট ভাণ্ডার আমাদের সামনে বিদ্যমান থাকতে কোন ক্রমেই যঈফ হাদীস গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না। এ সম্পর্কে ইমাম মুসলিম বলেন, আমি মনে করি, যে সব লোক যঈফ হাদীস অখ্যাত সনদে বর্ণনা করেন বা তার উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তাদের উদ্দেশ্য হল নিজেকে অপরের নিকট অধিক হাদীস বয়ানকারী হিসাবে জাহির করানো বা মানুষের বাহবা কুঁড়ানো।
'ইল্মে হাদীসের ক্ষেত্রে যারা এ নীতিতে পা বাড়ায় হাদীস শাস্ত্রে তাদের কোন স্থান নেই। বস্তুত এমন ব্যক্তি আলিম ও বক্তা (শাইখুল হাদীস) হিসাবে আখ্যায়িত না হয়ে বরং জাহিল মূর্খ হিসাবে আখ্যায়িত হবার যোগ্য। (সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দামা- ১ম খণ্ড, ৫০ পৃঃ, ই. ফা. বাং) 232 এখানে কেউ কেউ হয়তো বলতে চাইবেন যে, যঈফ হাদীস যদি 'আমালযোগ্যই না হবে তাহলে হাদীসের কিতাবে যঈফ হাদীস লিখা হল কেন? এরূপ প্রশ্নের জওয়াব ইমাম আবু ঈসা তিরমিযী (রহঃ) অত্যন্ত জোরালো ভাষায় দিয়েছেন। তিনি বলেন, মুহাদ্দিসগণ অনেক সময় যঈফ রাবীদের বর্ণিত দুর্বল হাদীসকে সনাক্ত করার জন্য কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মুঈন বলেন, আমি যঈফ ও জাল হাদীস এজন্য লিপিবদ্ধ করি যাতে ভবিষ্যতে এগুলোকে কেউ পরিবর্তন করে সহীহ হাদীস বানাতে না পারে। (শরহু ইলালিত তিরমিযী ৮৪ পৃঃ, জামে তিরমিযী মুখবন্ধ ১ম খণ্ড ৬০ পৃঃ, অনুবাদ- আবদুন নূর সালাফী) ২৩৩। আর জাল হাসিস আমল করার তো প্রশ্নই আসে না। আল্লাহ্ আমাদের সকলকে সহীহ হাদীসের উপর আমল করার তৈফিক দান করুন।
টিকাঃ
২৩১ ইমাম মহিউদ্দিন নাববীর সহীহ মুসলিমে শরাহ তাওজীহুন নজর কাওয়াছিদ্রুত তাহাদীস
232 সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দামা- ১ম খণ্ড, ৫০ পৃঃ, ই.ফা.বাং
২৩৩ শরহু ইলালিত তিরমিযী ৮৪ পৃঃ, জামে তিরমিযী মুখবন্ধ ১ম খণ্ড ৬০ পৃঃ, অনুবাদ- আবদুন নূর সালাফী