📄 মুসনাদ (مسند)
مُسْتَنَد কর্মবাচক বিশেষ্য, অর্থ সম্পৃক্ত ও মিলিত বস্তু। إسناد ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য থেকে উদ্গত। إسناد الشيء إلى الشيء অর্থ এক বস্তুকে অপর বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত করা। এ থেকে রাবী বা গ্রন্থকার থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মিলিত হাদীসকে 'মুসনাদ' বলা হয়।
কেউ বলেনঃ سند ধাতু থেকে مسند উদ্গত। سند শব্দের অর্থ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে উঁচু ভূমি। রাবি বা গ্রন্থকার যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সনদকে নিয়ে যান, তখন তিনি সনদকে উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেন, তাই তার বর্ণিত হাদীসকে মুসনাদ বলা হয়।
রাবীকে বলা হয় مسند "بكسر النون আর গ্রন্থকার থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত রাবিদের দীর্ঘ পরম্পরাকে বলা হয় সনদ। আরবদের প্রবাদ فلان سند 'অমুক ব্যক্তি গ্রহণযোগ্য' থেকেও مسند উদ্গত হতে পারে। مسند এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলা যায় যে, “রাবি থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মুত্তাসিল সনদে বর্ণিত হাদীস মুসনাদ, যার সনদে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট কোনো ছেদ বা ইনকিতা' নেই"। এটাই অধিকাংশ আলেমের সংজ্ঞা। এখানে زاویه দ্বারা উদ্দেশ্য হাদীস লিপিবদ্ধকারী গ্রন্থকার, যেমন বুখারী, মুসলিম প্রমুখগণ, সনদের যে কোনো রাবী নয়।
মুসনাদের দু'টি শর্তঃ
১. মারফুঃ মুসনাদ হওয়ার জন্য হাদীসটি মারফু' তথা হাদীসের মূল বক্তব্য (মতন) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হওয়া জরুরি। অতএব মাওকুফ ও মাকতু' মুসনাদ নয়। কারণ, 'মাওকুফে'র শেষ প্রান্ত সাহাবী, মাকতু'র শেষ প্রান্ত তাবে'ঈ।
২. মুত্তাসিলঃ মুসনাদ হওয়ার জন্য সনদ মুত্তাসিল হওয়া জরুরী। অতএব মুরসাল, মুনকাতি', মু'দ্বাল, মু'আল্লাক ও মুদাল্লাস মুসনাদ নয়। কারণ, এগুলোর সনদ মুত্তাসিল নয়। যে মারফু' হাদীস - এর কারো মতে যে কোন রকম হাদীস- এর সনদ সম্পূর্ণ মুত্তাসিল সে হাদীসকে হাদীসে মুসনাদ বলে।
📄 মাহফুয ও শায
شاذ শব্দটি شذوذ থেকে গৃহীত, যার অর্থ একাকী, বিচ্ছিন্ন, দলছুট ও নীতি মুক্ত।
মূলতঃ কোন সিক্কাহ রাবী ওনার হাদীস অপর কোন সিক্বাহ রাবী বা রাবীগণ ওনাদের হাদীস- এর বিরোধী হলে যে হাদীস- এর রাবীর যন্ত্র গুণ অধিক বা অপর কোন সূত্র দ্বারা যার হাদীস - এর সমর্থন পাওয়া অথবা যার হাদীস - এর শ্রেষ্ঠত্ব অপর কোন কারণে প্রতিপাদিত হয় উনার হাদীসটিকে হাদীসে মাহফুয এবং অপর রাবীর হাদীসটিকে হাদীসে শায বলে এবং এরূপ হওয়াকে শুযূয বলে। হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ শাযের সংজ্ঞায় বলেনঃ
"مخالفة المقبول لمن هو أولى منه" (النزهة: ص98)
“মাকবুল রাবীর তার চেয়ে উত্তম রাবীর বিরোধিতা করা শায”¹⁷³।
এখানে মাকবুল দ্বারা উদ্দেশ্য সহি ও হাসান হাদীসের রাবী, আর উত্তম দ্বারা উদ্দেশ্য এক বা একাধিক সেকাহ রাবি। অর্থাৎ মাকবুল রাবী একাধিক মাকবুল কিংবা অধিক সেকাহ রাবীর বিরোধিতা করলে তার হাদীস শায।
সাধারনতঃ হাদীস এর পক্ষে শুযূষ একটি মারাত্মক দোষ। শায হাদীস সহীহ রূপে গণ্য নয়।
'শায' এর হুকুমঃ শায শাহেদ ও মুতাবে' হওয়ার উপযুক্ত নয়।
টিকাঃ
¹⁷³ আন-নুযহাহ: (পৃ.৯৮)
📄 মা’রুফ ও মুনকার
منْکَرُ কর্মবাচক বিশেষ্য, অর্থ প্রত্যাখ্যাত, অস্বীকৃত ও অপরিচিত।
'মুনকার' এর পারিভাষিক সংজ্ঞাঃ "মুনকার সে ফারদ হাদীস, যা শুধু একজন রাবি বর্ণনা করেছে, যার একা আদালত গ্রহণযোগ্য নয়"। উদাহরণত ইবন মাজাহ বর্ণনা করেনঃ
قال ابن ماجة القزويني رحمه الله- حَدَّثَنَا أَبُو بِشَرِ بَكْرُ بْنُ خَلَفٍ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ قَيْسِ الْمَدَنِيُّ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " كُلُوا
الْبَلَحَ بِالتَّمْرِ، كُلُوا الْخَلَقَ بِالْجَدِيدِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَغْضَبٍ، وَيَقُولُ: بَقِيَ ابْنُ آدَمَ حَتَّى أَكَلَ الْخَلَقَ بِالْجَدِيدِ
এ সনদে ইয়াহইয়া ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন কায়েস আল-মাদানি দুর্বল, যার একলা বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়¹⁷⁴। অতএব মুনকার। হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেনঃ “দুর্বল রাবী যদি সেকাহ রাবীর বিরোধিতা করে, তাহলে সেকাহ রাবীর হাদীসকে মারূফ ও দুর্বল রাবির হাদীসকে মুনকার বলা হয়..."। অতএব হাফেয মুনকারের জন্য দু'টি শর্তারোপ করেনঃ
১. রাবীর দুর্বল হওয়া এবং
২. অধিক সেকাহ রাবির বিরোধিতা করা। এ দু'শর্ত যুক্ত হাদীস মুনকার।
সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনায় বলা যায় যে, কোন যঈফ রাবীর হাদীস অপর কোন যঈফ রাবীর হাদীস এর বিরোধী হলে অপেক্ষাকৃত কম যঈফ রাবীর হাদীসকে হাদীসে মা'রূফ এবং অপর রাবীর হাদীসটিকে হাদীসে মুনকার বলে এবং এরূপ হওয়াকে নাকারাৎ বলে। নাকারাৎ হাদীস এর পক্ষে একটা বড় দোষ।
টিকাঃ
¹⁷⁴ ইব্ন মাজাহ: (৩৩৩০), সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ: (৬৬৮৭)
📄 মুদাল্লাল
علة এর আভিধানিক অর্থ রোগ, عَلْ يَعِلُ থেকে مُعلّل অর্থ অসুস্থ ব্যক্তি। এ থেকে দোষণীয় ইল্লতযুক্ত হাদীসকে মু'আল্লাল বলা হয়, কারণ মু'আল্লাল হাদীসও অসুস্থ ব্যক্তির ন্যায় অক্ষম, সহি হাদীসের ন্যায় দলিল হতে পারে না।
সুতরাং, যে হাদীসের সনদে এমন কোন সূক্ষ্ম ত্রুটি রয়েছে যাকে কোন বড় হাদীস বিশেষজ্ঞ ব্যতীত ধরতে পারেন না, সে হাদীসকে হাদীসে মুয়াল্লাল বলে। আর এরূপ ত্রুটিকে ইল্লত বলে।
ইল্লত হাদীসের পক্ষে একটা মারাত্মক দোষ। মুয়াল্লাল হাদীস সহীহ্ হতে পারে না।