📄 মুত্তাফাক
যে হাদীস এর মতন বা সনদকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রকারে গোলমাল করে বর্ণনা করেছেন। সে হাদীসকে হাদীসে মুদ্বতারাব বলে। যে পর্যন্ত না এটার কোনরূপ সমন্বয় সাধন সম্ভবপর হয় সে পর্যন্ত এটা সম্পর্কে তাওয়াক্কুফ (অপেক্ষা) করতে হবে। (অর্থাৎ এটাকে দলীল তথা প্রমাণে ব্যবহার করা চলবে না)।
📄 মুদ্রারাজ (مدرج)
مذرّج কর্মবাচক বিশেষ্য, অর্থ প্রবেশকৃত বস্তু। এক বস্তুকে অপর বস্তুর মাঝে প্রবেশ করানো হলে বলা হয়ঃ أدرجت الشيء في الشيء 'আমি এক বস্তুকে অপর বস্তুর মাঝে প্রবেশ করিয়েছি'¹⁷¹। ইদরাজ ক্রিয়া বিশেষ্য, অর্থ প্রবেশ করানো। যে হাদীস – এর মধ্যে রাবী উনার নিজের অথবা অপর কারো উক্তি ভ্রুক্ষেপ করেছেন সে হাদীসকে হাদীসে মুদ্রাজ বলে এবং এরূপ করাকে ইদ্রাজ বলে। ইদ্রাজ হারাম যদি না এটা কোন শব্দ বা বাক্যের অর্থ প্রকাশার্থে হয় এবং মুদ্রাজ বলে সহজে বুঝা যায়। মুদরাজের উদাহরণ দিয়েছেনঃ
أَنَا الْحَسَنُ بْنُ أَبِي بَكْرٍ ، أنا دَعْلَجُ بْنُ أَحْمَدَ، يَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ الأَزْدِيُّ، نَا الْحَسَنُ بْنُ مُحَمَّدٍ هُوَ الزَّعْفَرَانِيُّ، نا أَبُو قَطَن، نا شُعْبَةُ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ زِيَادٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ أَبُو الْقَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " أَسْبِغُوا الْوُضُوءَ وَيْلٌ لِلْأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ " قَرَأْتُ عَلَى أَبِي بَكْرِ الْبَرْقَانِيِّ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ عُمَرَ الْحَافِظِ أَنَا أَبَا بَكْرٍ النَّيْسَابُورِيُّ حَدَّثَهُمْ، قَالَ: نَا الْحَسَنُ بْنُ مُحَمَّدٍ، نَا شَبَابَةُ، نَا شُعْبَةُ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ زِيَادٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " أَسْبِغُوا الْوُضُوءَ وَيْلٌ لِلْأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ "
এখানে দু'টি সনদে একটি হাদীস রয়েছে। শু'বার দু'জন ছাত্রঃ আবু কাতান ও শাবাবাহ থেকে সনদ ভাগ হয়েছে। শু'বার শায়খ মুহাম্মদ ইবন যিয়াদ, তার শায়খ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ "তোমরা অজু পূর্ণ কর, টাখনুর জন্য জাহান্নামের আগুন"¹⁷²।
এ সনদে হাদীসের পুরো অংশ মারফু' হিসেবে বর্ণিত, অথচ পুরো অংশ মারফু' নয়, প্রথমাংশ মাওকুফ ও শেষাংশ মারফু'। এতে ইদরাজ হয়েছে হাদীসের শুরুতে। মারফু' অংশ «ويل للأعقاب من النار» 'টাখনুর জন্য জাহান্নামের আগুন'। মাওকুফ অংশ «أسبغوا الوضوء» 'তোমরা অজু পূর্ণ কর'। এ অংশ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর বাণী। মারফু' ও মাওকুফ অংশ পৃথক করা হয়নি বিধায় মুদরাজ।
টিকাঃ
¹⁷¹ তাজুল 'আরূস: (২/৩৯-৪০)
¹⁷² "আল-ফাসলু লিল ওয়াসলি আল-মুদরাজু ফিন নাকলি": (৫৮) ও (৫৯)
📄 মুসনাদ (مسند)
مُسْتَنَد কর্মবাচক বিশেষ্য, অর্থ সম্পৃক্ত ও মিলিত বস্তু। إسناد ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য থেকে উদ্গত। إسناد الشيء إلى الشيء অর্থ এক বস্তুকে অপর বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত করা। এ থেকে রাবী বা গ্রন্থকার থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মিলিত হাদীসকে 'মুসনাদ' বলা হয়।
কেউ বলেনঃ سند ধাতু থেকে مسند উদ্গত। سند শব্দের অর্থ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে উঁচু ভূমি। রাবি বা গ্রন্থকার যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সনদকে নিয়ে যান, তখন তিনি সনদকে উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেন, তাই তার বর্ণিত হাদীসকে মুসনাদ বলা হয়।
রাবীকে বলা হয় مسند "بكسر النون আর গ্রন্থকার থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত রাবিদের দীর্ঘ পরম্পরাকে বলা হয় সনদ। আরবদের প্রবাদ فلان سند 'অমুক ব্যক্তি গ্রহণযোগ্য' থেকেও مسند উদ্গত হতে পারে। مسند এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলা যায় যে, “রাবি থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মুত্তাসিল সনদে বর্ণিত হাদীস মুসনাদ, যার সনদে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট কোনো ছেদ বা ইনকিতা' নেই"। এটাই অধিকাংশ আলেমের সংজ্ঞা। এখানে زاویه দ্বারা উদ্দেশ্য হাদীস লিপিবদ্ধকারী গ্রন্থকার, যেমন বুখারী, মুসলিম প্রমুখগণ, সনদের যে কোনো রাবী নয়।
মুসনাদের দু'টি শর্তঃ
১. মারফুঃ মুসনাদ হওয়ার জন্য হাদীসটি মারফু' তথা হাদীসের মূল বক্তব্য (মতন) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হওয়া জরুরি। অতএব মাওকুফ ও মাকতু' মুসনাদ নয়। কারণ, 'মাওকুফে'র শেষ প্রান্ত সাহাবী, মাকতু'র শেষ প্রান্ত তাবে'ঈ।
২. মুত্তাসিলঃ মুসনাদ হওয়ার জন্য সনদ মুত্তাসিল হওয়া জরুরী। অতএব মুরসাল, মুনকাতি', মু'দ্বাল, মু'আল্লাক ও মুদাল্লাস মুসনাদ নয়। কারণ, এগুলোর সনদ মুত্তাসিল নয়। যে মারফু' হাদীস - এর কারো মতে যে কোন রকম হাদীস- এর সনদ সম্পূর্ণ মুত্তাসিল সে হাদীসকে হাদীসে মুসনাদ বলে।
📄 মাহফুয ও শায
شاذ শব্দটি شذوذ থেকে গৃহীত, যার অর্থ একাকী, বিচ্ছিন্ন, দলছুট ও নীতি মুক্ত।
মূলতঃ কোন সিক্কাহ রাবী ওনার হাদীস অপর কোন সিক্বাহ রাবী বা রাবীগণ ওনাদের হাদীস- এর বিরোধী হলে যে হাদীস- এর রাবীর যন্ত্র গুণ অধিক বা অপর কোন সূত্র দ্বারা যার হাদীস - এর সমর্থন পাওয়া অথবা যার হাদীস - এর শ্রেষ্ঠত্ব অপর কোন কারণে প্রতিপাদিত হয় উনার হাদীসটিকে হাদীসে মাহফুয এবং অপর রাবীর হাদীসটিকে হাদীসে শায বলে এবং এরূপ হওয়াকে শুযূয বলে। হাফেয ইব্ন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ শাযের সংজ্ঞায় বলেনঃ
"مخالفة المقبول لمن هو أولى منه" (النزهة: ص98)
“মাকবুল রাবীর তার চেয়ে উত্তম রাবীর বিরোধিতা করা শায”¹⁷³।
এখানে মাকবুল দ্বারা উদ্দেশ্য সহি ও হাসান হাদীসের রাবী, আর উত্তম দ্বারা উদ্দেশ্য এক বা একাধিক সেকাহ রাবি। অর্থাৎ মাকবুল রাবী একাধিক মাকবুল কিংবা অধিক সেকাহ রাবীর বিরোধিতা করলে তার হাদীস শায।
সাধারনতঃ হাদীস এর পক্ষে শুযূষ একটি মারাত্মক দোষ। শায হাদীস সহীহ রূপে গণ্য নয়।
'শায' এর হুকুমঃ শায শাহেদ ও মুতাবে' হওয়ার উপযুক্ত নয়।
টিকাঃ
¹⁷³ আন-নুযহাহ: (পৃ.৯৮)