📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 আহাদ (احاد)

📄 আহাদ (احاد)


মুতাওয়াতির হাদীস এর বিপরীত হাদীসকে আহাদ বলে। এটা আবার তিন প্রকার।
(ক) غَرِيبٌ (গরীব): غريب আরবী غربة শব্দ থেকে গৃহীত, অর্থ অপরিচিত, আগন্তুক ও বিদেশী। পরিবার ও স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন।
অপর দেশে অপরিচিত ব্যক্তিকে গরীব বলা হয়। অপরিচিত হওয়াকে গুরবত, আর ব্যক্তিকে গরীব বলা হয়।
পারিভষিক সংজ্ঞা যে সহীহ হাদীসের সনদের কোন এক স্তরে বা সম্পূর্ণ সনদের প্রত্যেক স্তরেই মাত্র একজন বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন তাকে গরীব হাদীস বলে। মাওলানা আব্দুর রহিম বলেন, কোন স্তরে যদি বর্ণনাকারীদের সংখ্যা মাত্র একজন হয় তবে সেই হাদীস হল হাদীসে গরীব।
ব্যাখ্যা অর্থাৎ, একজন রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীস হল গারীব হাদীস। সেটা যদি সনদের সকল স্তরে যদি একজন বর্ণনাকারী থাকে আর এমন কি যেকোন স্তরে একজন বর্ণনাকারী থাকলেও তা গরীব হবে।
গরীব হাদীসের অন্যান্য নামসমূহ কেউ কেউ খবরে গরীবের অন্য একটি নাম দিয়েছেন যা হল আল-ফারদ। হাফিয ইবন আসকালানীসহ অধিকাংশ ওলামাগণ এই শব্দদ্বয়কে আভিধানিক ও পারিভাষিকভাবে একই শব্দ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অবশ্য আবার স্বয়ং, এই হাফিয ইবন আসকালানী বলেছেন, কতিপয় আলিম-উলামাবৃন্দ এই দুইটি শব্দের ভিতর
ব্যবহারের আধিক্য ও স্বল্পতা বিবেচনা করে এই শব্দদ্বয়ের ভিতর পার্থক্য নিরূপূণ করেছেন। কারণ ফারদ ফারদে মুতলাক আর গারীব ফারদে নিসাবীর উপর ব্যবহৃত হয়।
গরীব সাধারণত তিন প্রকার
১. সনদ ও মতন উভয় গরিব, যেমন কোনো রাবীর একলা বর্ণিত মতন।
২. সনদ গরীব কিন্তু মতন গরিব নয়, যেমন কোনো রাবী স্বীয় সনদে কোনো মতন বর্ণনা করলেন, তার সাথীদের কেউ যা বর্ণনা করেনি, তবে অপর সনদে তা বর্ণিত আছে। এখানে সনদ গবির, কিন্তু মতন গরিব নয়।
৩. মতন গরীব কিন্তু সনদ গরীব নয়, এরূপ হতে পারে না। কেউ এরূপ কল্পনা করেছেন, যা সঠিক নয়, যেমন তারা নিয়তের হাদীসের সনদকে দু'ভাগ করেন: গরিব ও মাশহুর।
কারণ ১-ওমর ইবনুল খাত্তাব, ২-আলকামাহ, ৩-মুহাম্মদ ইব্‌ ইবরাহিম, ৪-ইয়াহইয়া ইন্ন সায়িদ পর্যন্ত সনদ গরিব, ইয়াহইয়াহ ইন্ন সায়িদ থেকে সনদ ও মতন উভয় মাশহুর। সনদের দ্বিতীয়াংশ
ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ থেকে গ্রন্থকার¹⁶¹ পর্যন্ত মাশহুর। তারা সনদের প্রথমাংশের বিবেচনায় মতন গরীব ও সনদের দ্বিতীয়াংশের বিবেচনায় সনদ মাশহুর বলেন। এরূপ বলা যথাযথ নয়; কারণ মতন যখন গরীব ছিল, সনদও তখন গরীব ছিল; মতন যখন প্রসিদ্ধ সনদও তখন প্রসিদ্ধ।
যে বিশুদ্ধ হাদীস - এর বর্ণনাকারী সর্বদা একজন থাকে তাকেই গরীব হাদীস বলে। যেমন- “বাইউলওয়ালা” তথা আযাদকৃত দাস-দাসীর ওয়ারিছত্ব ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ।” (মিয়ানুল আখবার)
এ হাদীসটি হযরত ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে শুধুমাত্র হযরত আব্দুল্লাহ বিন দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন।
গরীব হাদীসের হুকুমঃ ১. সহী, ২. হাসান ও ৩. যঈফ সবপ্রকার হতে পারে। দুর্বল হওয়া গরীব হাদীসের প্রকৃতি। তাই মুহাদ্দিসগণ গরীব হাদীসের প্রতি তেমন ভ্রুক্ষেপ করেন না। ইমাম মালিক গরীব সম্পর্কে বলেনঃ “সবচেয়ে খারাপ ইলম গরীব, আর সবচেয়ে উত্তম ইলম প্রকাশ্য ইলম, যা একাধিক রাবী বর্ণনা করে”। আব্দুর রায়্যাক বলেন: আমরা মনে করতাম গরীব ইলম ভালো, কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণিত হল নিরেট খারাপ”।
ইমাম আহমদ ইব্‌ন হাম্বল বলেনঃ "তোমরা এসব গরীব লিপিবদ্ধ কর না, কারণ এগুলো মুনকার, তার অধিকাংশ দুর্বল রাবিদের থেকে বর্ণিত"। তিনি আরো বলেনঃ "সবচেয়ে খারাপ ইলম গরীব, তার উপর আমল ও ভরসা করা যায় না"।
গরীব হাদীসসমূহের ভিতর প্রসিদ্ধ কিতাবঃ গরীব হাদীসসমূহের ভিতর প্রসিদ্ধ কিতাব হল আল-আফরাদ ও গারাইবু মালিক যা দারকুতনীকৃত। আর আবূ দাউদ আস-সিজিস্তানী এর উপর এক খানা কিতাব প্রণয়ন করেছেন।
(খ) عَزِيزٌ (আযীয): আযীয শব্দ عز থেকে সংগৃহীত, আভিধানিক অর্থ শক্তিশালী। কেউ শক্তিশালী হলে বলা হয়: عَزَّ فُلَانٌ একজন রাবীর কোনো সংবাদ দেওয়ার পর দ্বিতীয় বা তৃতীয় রাবী একই সংবাদ দিলে সংবাদটি 'আযীয' বা শক্তিশালী হয়। সংবাদদাতার সংখ্যা বেশী হলে সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। এ থেকে দু'জন বা তিনজন রাবীর বর্ণিত হাদীসকে 'আযীয' বলা হয়। মূলতঃ এটি সিফাতে মুশাব্বাহ। আযযা ইয়াইযযু থেকে। এর অর্থ স্বল্প ও বিরল। যেহেতু এই সকল হাদীসের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য কিংবা এখানে রাবীদের সংখ্যা মুতাওয়াতির ও মাশহুরের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে তাই একে আযীয বলা হয়। অথবা আযযা ইয়াআযযু। যার অর্থ হল শক্তিশালী ও মযবুত হওয়া। যেহেতু অন্য আরেকটি
সনদ দ্বারা এর শক্তি বৃদ্ধি পায় তাই এর এই নামকরণ হয়েছে। 'আযীয'-র পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলা যায় যে, 'দু'জন অথবা তিনজন রাবীর বর্ণিত হাদীস আযীয'। সনদের কোনো স্তরে যদি দু'জন অথবা তিনজন রাবি থাকে, অন্যান্য স্তরে রাবীর সংখ্যা দুই বা দু'য়ের অধিক থাকলে হাদীস আযীয।
যেমনঃ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّ أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلِدِهِ وَالنَّسِ أَجْمَعِيْنَ
অর্থঃ "তোমাদের মধ্যে কেউই কামিল মুমিন হতে পারবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত; যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার সন্তান-সন্ততি এবং পিতা-মাতা এমনকি সকল মানুষের চেয়ে আমাকে বেশী মুহব্বত না করবে।” রাসূল (সাঃ) ওনার থেকে এ হাদীসটি শুধু আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওনারা বর্ণনা করেছেন।
'আযীযে'র আরেকটি উদাহরণঃ قال الإمام البخاري -رحمه الله- حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ: أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو الزِّنَادِ، عَنِ الْأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَن رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ»
وَقَالَ الْإِمَامُ الْبُخَارِيُّ رَحِمَهُ اللهُ - حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ: حَدَّثَنَا ابْنُ عُلَيَّةَ، عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ صُهَيْبٍ، عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَحَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»
ইমাম বুখারী উক্ত হাদীস দু'জন সাহাবীঃ আবু হুরায়রা ও আনাস ইবন মালিক থেকে দু'টি সনদে বর্ণনা করেন। তাই এতে সাহাবীর স্তরে দু'জন রাবী বিদ্যমান। ¹⁶²
অতঃপর আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে দু'জন তাবে'ঈ বর্ণনা করেন: কাতাদাহ ও আব্দুল আযীয ইন্ন সুহাইব। অতএব তাবে'ঈর স্তরে দু'জন রাবী বিদ্যমান। অতঃপর কাতাদাহ থেকে দু'জন রাবী বর্ণনা করেন: শু'বা ও সায়িদ ইব্‌ন আবী 'আরুবাহ। আবার আব্দুল আযীয থেকে দু'জন রাবী বর্ণনা করেন: ইসমাইল ইবন 'উলাইয়্যাহ ও আব্দুল ওয়ারেস ইন্ন সায়িদ। অতঃপর তাদের প্রত্যেকের থেকে একদল রাবী বর্ণনা করেন। সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনায় বলা যায়
যে, যে সমস্ত হাদীস - এর বর্ণনাকারী সর্বযুগে কমপক্ষে দু'জন থাকে তাকে হাদীসে আযীয বলে।
খবর বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য আযীয হওয়া জরুরী কিনা
আবু যুবায়র বলেন, খবর শুদ্ধ হওয়ার জন্য বর্ণনাকারী দুইজন থাকা দরকার।
আবু আব্দুল্লাহ নিশাপুরী (রহঃ) বলেন, যেকোন হাদীস বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য কমপক্ষে দুইজন বর্ণনাকারী থাকা অত্যাবশ্যক।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মতে, হাদীস শুদ্ধ হওয়ার জন্য একজন বর্ণনাকারী হলেই হয়।
তাদের যুক্তি হল এই যে, যদি একজন বর্ণনাকারীর দ্বারা হাদীস অশুদ্ধ হয় তাহলে সহীহুল বুখারীর প্রথম হাদীস তথা "মানুষের কর্মফল তার নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল” এ হাদীসটি অশুদ্ধ হত। কারণ তা কেবলমাত্র উমার (রাঃ) প্রথমে বর্ণনা করেছেন এবং পরবর্তীতে তা অনেকে বর্ণনা করেছেন।
আযীযের হুকুমঃ সহী, হাসান ও দুর্বল সকল প্রকার হতে পারে।
আযীযের উপর কিতাবঃ ওলামাগণ এই গ্রন্থের উপর তেমন কোন কিতাব রচনা করেন নাই, কারণ এর উপর রচিত কিতাবের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।
)গ( مَنْهُورُ )মাশহুর(: "مشهور" এর আভিধানিক অর্থ প্রসিদ্ধ। এই শব্দটি শহুরাত থেকে এসেছে যার অর্থ হল সবার কাছে বেশী গ্রহণযোগ্য। এর বহুবচন হল মাশাহীর যার অর্থ হলঃ well known, widely known, famous known, wide spread ইত্যাদি। যে সমস্ত হাদীস - এর সর্বযুগে সর্বস্তরে কমপক্ষে দু'য়ের অধিক কিংবা তার চেয়ে আরো অধিক বর্ণনাকারী রয়েছে, তবে মুতাওয়াতিরের স্তরে পৌছেনা বরং তার চেয়ে বর্ণনাকারী কম হয়, সে সব হাদীসকে মাশহুর হাদীস বলে। যথা -
إِنَّ اللهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا
অর্থঃ "নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি হঠাৎ করে ইল্মকে একেবারেই উঠিয়ে নিবেন না।"
এ হাদীস - এর রাবী সর্বযুগে সর্বকালে দু'য়ের অধিক রয়েছে।
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় যে সব হাদীসের বর্ণনাকারী তিন বা তিনের অধিক হবে কিন্তু মুতওয়াতির পর্যন্ত পৌছাবেনা, এমন হাদীসকে মাশহুর হাদীস বলে।
উদাহরণ নবী করিম (সাঃ) এর বাণী, আল্লাহ বান্দাদের থেকে ইলম ছিনিয়ে নেন না বরং আলিমদের উঠিয়ে ইলম উঠিয়ে নিন। উসূলবিদগণ একে খবরে মুতাওয়াতির এবং আহাদের মাঝামাঝি পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাদের মতে এটি প্রথম যুগে খবরে আহাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২য় ও ৩য় যুগে এটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।
ফকীহগণের পরিভাষায় একে মুসতাফীয বলা হয়। মুসতাফীয শব্দটি ইসতিফায থেকে এটি ইসমে ফায়িল। আরবী প্রবচন ফাযাল মাউ থেকে এর উৎপত্তি। এখন এই মাশহুর ও মুস্তাফীয এক শব্দ কিনা তা নিয়ে ওলামাদের ভিতর মতবিরোধ রয়েছে। এই ব্যাপারে তিনটি অভিমত পাওয়া যায় যা হলঃ
১। কারও মতে এই দুটি একই শব্দ। তাদের মতে মাশহুর হাদীস মুস্তাফীয। মাশহুর হাদীসটি প্রসিদ্ধি লাভের কারণে তা মুস্তাফীয হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।
২। আবার কারও মতে তা কেবল মাত্র বর্ণনাকারীদের প্রতি স্তরে সংখ্যার তারতম্যের কারণে এর সংখ্যা ভিন্ন থেকে ভিন্ন হয়। যদি প্রত্যেক স্তরে রাবীর সংখ্যা ঠিক থাকে তাহলে তা মুস্তাফীয হবে। যেমনঃ সকল স্তরে তিন, আবার সকল স্তরে চার ইত্যাদি। আর
প্রত্যেকটি স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যার তারতাম্য থাকে তাহলে তা মাশহুর হিসেবে খ্যাত থাকবে। যেমন কোন স্তরে তিন, আবার কোন স্তরে চার আবার এভাবে করে পাঁচ আবার সাত ইত্যাদি।
৩। কতিপয় ফকীহগণের মতে, মুস্তাফীয সেই ধরনের হাদীস যার অনুসরণকারীগণ বর্ণনাকারীগর সংখ্যা গণনা না করে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে নেয়। আর মাশহুর হল এমন হাদীস যা অনুসারীগণ বর্ণনাকারীর সংখ্যার উপর গুরুত্বারোপ করে তা গ্রহণ করে থাকে।
মাশহুর প্রধানত দু'প্রকারঃ ক. সাধারণের নিকট মাশহুর এবং খ. আলেমদের নিকট মাশহুর।
ক. সাধারণের নিকট হাদীস মাশহুর হওয়ার কোনো মূল্য নেই। তাদের নিকট অনেক জাল হাদীসও মাশহুর, যেমনঃ
«حُبُّ الْوَطَنِ مِنَ الْإِيمَانِ»
"দেশ প্রেম ঈমানের অংশ"।
সাধারণ লোকেরা এ হাদীসকে সহি হিসেবে জানে, অথচ সহী নয়। তার অর্থও ভুল, কারণ দেশপ্রেম গোঁড়ামী ও সাম্প্রদায়িকতা। তাই
তাদের নিকট মাশহুর হাদীস মূল্যহীন। এ প্রকার হাদীসের উপর অনেক মুহাদ্দীস স্বতন্ত্র কিতাব লিখেছেন, যেমনঃ
"تمييز الطيب من الخبيث فيما يدور على ألسنة الناس من الحديث". "المقاصد الحسنة في الأحاديث المشتهرة كشف الخفا ومزيل الألباس فيما اشتهر من الأحاديث في ألسنة الناس"
খ. আলেমদের শ্রেণীভাগ হিসেবে তাদের নিকট প্রসিদ্ধ হাদীস বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়: মুহাদ্দিসদের নিকট মাশহুর, ফকিহদের নিকট মাশহুর, ভাষাবিদদের নিকট মাশহুর ইত্যাদি। যেমনঃ
«لَا يُقَادُ الْوَالِدُ بِالْوَلَدِ»
"সন্তানের কারণে পিতা থেকে কিসাস নেয়া হবে না"¹⁶³। এ হাদীস কুরআন বিরোধী। কারণ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ
) وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنفَ بِالْأَنفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصِ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةً لَّهُ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ ٤٥ ) [المائدة: ٤٥]
"আর আমি এতে তাদের উপর অবধারিত করেছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান ও দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমের বিনিময়ে সমপরিমাণ জখম। অতঃপর যে তা ক্ষমা করে দেবে, তার জন্য তা কাফফারা হবে। আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম"¹⁶⁴。
এ আয়াতে কিসাস থেকে পিতাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেনঃ
) يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنثَى بِالْأُنثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٍ فَاتَّبَاعُ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَنُ ذَلِكَ تَخْفِيفَ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةً فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ ۱۷۸ ) [البقرة: ۱۷৮]
“হে মুমিনগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের উপর 'কিসাস' ফরয করা হয়েছে। স্বাধীনের বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাস, নারীর বদলে নারী। তবে যাকে কিছুটা ক্ষমা করা হবে তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে, তাহলে সততার অনুসরণ করবে এবং সুন্দরভাবে তাকে
আদায় করে দেবে। এটি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে হালকাকরণ ও রহমত।
সুতরাং এরপর যে সীমালঙ্ঘন করবে, তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব"¹⁶⁵। এ হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত অপর সহী হাদীসেরও বিপরীত, যেমনঃ
«لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ زِنًا بَعْدَ إِحْصَانِ، أَوِ ارْتِدَادٍ بَعْدَ إِسْلَامٍ، أَوْ قَتْلِ نَفْسٍ بِغَيْرِ حَقٌّ، فَقُتِلَ بِهِ»
"তিনটি অপরাধের কোন একটি ব্যতীত মুসলিমের রক্ত হালাল নয়ঃ বিবাহের পর যেনা করা, অথবা ইসলামের পর মুরতাদ হওয়া, অথবা কাউকে বিনা অপরাধে হত্যা করা, এর বিনিময়ে হত্যা করা হবে"¹⁶⁶। এখানেও কিসাস থেকে পিতাকে মুক্ত রাখা হয়নি।
হুকুমঃ অতএব মাশহুর হাদীস কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী তাই গ্রহণীয় নয়।

টিকাঃ
¹⁶¹ নিয়তের হাদীস বর্ণনাকারী গ্রন্থকারগণ, যেমন বুখারী ও মুসলিম প্রমুখ।
¹⁶² হাদীসটি ইমাম বুখারী আবু হুরায়রা [হাদীস নং: ১৪] ও আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা [হাদীস নং: ১৫] থেকে দু'টি সনদে এবং ইমাম মুসলিম একটি সনদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী 'আনাস' থেকে দু'টি সনদ উল্লেখ করেছেন, তাই ইমাম মুসলিমের বর্ণনা উল্লেখ করেনি, কারণ মুসলিমও 'আনাসে'র ছাত্র কাতাদাহ, কাতাদার ছাত্র শু'বা সূত্রে বর্ণনা করেছেন। শু'বার ছাত্রদের থেকে বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা ভাগ হয়েছে। আনাস থেকে বর্ণিত মুসলিমের হাদীস নং: (৪৬)
¹⁶³ তিরমিযী: (১৪০০), দারা কুতনি: (৩২৫২)
¹⁶⁴ সূরা মায়েদা: (৪৫)
¹⁶⁵ সূরা বাকারা: (১৭৮)
¹⁶⁶ তিরমিযী: (২০৮৪)

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 মুত্তাসিল (متصل)

📄 মুত্তাসিল (متصل)


১) مُتَّصِلٌ (মুত্তাসিল): مُتَّصِلٌ এর আভিধানিক অর্থ মিলিত। এক বস্তুর সাথে মিলিত অপর বস্তুকে মুত্তাসিল বলা হয়।
মুত্তাসিলের পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলা যায় যে, "যে হাদীসের সনদ প্রত্যেক রাবীর শ্রুতি দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত মিলিত তাই মুত্তাসিল।
যে হাদীস এর সনদের মধ্যে কোন স্তরের কোন রাবী বাদ পড়েননি। অর্থাৎ সকল স্তরের সকল রাবীর নামই যথাস্থানে উল্লেখ রয়েছে তাকে হাদীছে মুত্তাসিল বলে। আর এ বাদ না পড়াকে বলা হয় ইত্তিসাল।

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 মুনকাতে (منقطع)

📄 মুনকাতে (منقطع)


২) مُنْقَطِعُ (মুনকাতে): যে হাদীস এর সনদের মধ্যে কোন স্তরের কোন রাবীর নাম বাদ পড়েছে তাকে হাদীসে মুনকাতে বলে। আর এ বাদ পড়াকে বলা হয় ইনকিতা। এ হাদীস প্রধানত দুই প্রকার মুরসাল ও মুয়াল্লাক।
ক) مُرْسَلٌ (মুরসাল): مُرْسَلٌ এর আভিধানিক অর্থ মুক্ত করা ও ছেড়ে দেওয়া। মূলতঃ মুরসাল শব্দটি ইরসাল থেকে উদ্ভূত যার অর্থ
হল খুলে দেওয়া, ছেড়ে দেওয়া, মুক্ত করা এবং মুরসালের অর্থ হয় এই যে, মুক্ত, খোলা, পরিত্যক্ত, পরিত্যাজ্য ইত্যাদি। উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয় ঐ সকল হাদীসসমূহকে যার সনদের শেষের দিকে তাবিঈ এর পরবর্তী পর্যায়ের সাহাবীর নাম বাদ পড়েছে। এরুপ করাকে ইরসাল বলা হয়। যেমন কোন তাবিঈ তার শায়খের নাম উল্লেখ না করে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এমনটি করেছেন।
আল্লামা হাফিয বিন আসকালানী (রহঃ) বলেন, সনদের শেষ বর্ণনাকারী যদি বাদ পড়ে যায়, তথা তাবিঈর নাম যদি সনদ থেকে বাদ পড়ে তাহলে ঐ হাদীসটি মুরসাল হিসেবে গণ্য করা হবে। শায়খ আব্দুস সাত্তার আবু গুদ্দাহ সংজ্ঞায় বলেনঃ
ومرسل من فوق تابع سقط = وقل غريب ما روی راو فقط
"আর মুরসাল - তাবে'ঈর উপর থেকে যার রাবী বাদ পড়েছে। আর বল গরীব - যা শুধু একজন রাবী বর্ণনা করেছে"। এ সংজ্ঞানুসারে কোনো প্রশ্ন থাকে না, সাহাবীর সাথে তাবে'ঈ বাদ পড়ুক কিংবা সাহাবীর সনদ থেকে সাহাবী বাদ পড়ুক, সকল প্রকার তার অন্তর্ভুক্ত। অতএব নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি তাবে'ঈর বর্ণিত হাদীস মুরসাল। হোক তা বাণী, কিংবা কর্ম
কিংবা সমর্থন কিংবা কোনো বিশেষণ। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন,
ঐ হাদীস হল মুরসাল যা কোণ তাবিঈ, সাহাবীর মাধ্যম ছাড়া সরাসরি রাসূল পর্যন্ত সংবাদ দিয়েছেন।
উদাহরণঃ
وَحَدَّثَنِي أَبُو الطَّاهِرِ، وَحَرْمَلَةُ بْنُ يَحْيَى، - وَاللَّفْظُ لِحَرْمَلَةَ - قَالَا أَخْبَرَنَا ابْنُ وَهْبٍ أَخْبَرَنِي يُونُسُ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَخْبَرَنِي عَامِرُ بْنُ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصِ، أَنَّ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ نَهَانَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ بَيْعَتَيْنِ وَلِبْسَتَيْنِ نَهَى عَنِ الْمُلَامَسَةِ وَالْمُنَابَذَةِ فِي الْبَيْعِ وَالْمُلَامَسَةُ لَمْسُ الرَّجُلِ ثَوْبَ الْآخَرِ بِيَدِهِ بِاللَّيْلِ أَوْ بِالنَّهَارِ وَلَا يَقْلِبُهُ إِلَّا بِذَلِكَ وَالْمُنَابَدَّةُ أَنْ يَنْبِذُ الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ بِثَوْبِهِ وَيَنْبِذَ الْآخَرُ إِلَيْهِ ثَوْبَهُ وَيَكُونُ ذَلِكَ بَيْعَهُمَا مِنْ غَيْرِ نَظَرٍ وَلَا تَرَاضٍ
আবু সাঈদ খুদ্রী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'প্রকার ক্রয়-বিক্রয় এবং দু'ধরনের কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে মোলামাসা ওমোনাবাযা করতে নিষেধ করেছেন। ... মোলামাসা হচ্ছে এই যে, এক ব্যক্তি (ক্রেতা) অপর ব্যক্তির (বিক্রেতার) কাপড় রাত্রে অথবা দিনের বেলায় নিজ হাতে স্পর্শ করা এবং তা ভালোভাবে উল্টে-পাল্টে না দেখা। আর মোনাবাযা হচ্ছে এই যে, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির দিকে এবং অপর ব্যক্তি এই ব্যক্তির দিকে নিজ নিজ কাপড়
নিক্ষেপ করবে। এভাবে না দেখেই এবং পরস্পরের সম্মতি ব্যতিরেকেই ক্রয়-বিক্রয় উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে।
وَحَدَّثَنِيهِ عَمْرُو النَّاقِدُ، حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ بْنِ سَعْدٍ، حَدَّثَنَا أَبِي، عَنْ صَالِحٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، بِهَذَا الْإِسْنَادِ .
সহীহ মুসলিম :: খন্ড ১০ :: হাদীস ৩৬১৩, কিতাবুল বুয়ু (ব্যবসা-বানিজ্য) অধ্যায়¹⁶⁷। ইবনে শিহাব থেকে এই সনদ সূত্রে উপরের হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
সুতরাং, উপরোক্ত হাদীসটি ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত অধ্যায় হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন, আমাকে হাদীস বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবন রাবী, তিনি বলেন, আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন হুজাইন, তিনি লাইস, তিনি আকীল থেকে, তিনি ইবন শিহাব থেকে, তিনি সাঈদ ইবন মুসাইবি থেকে রিওয়ায়াত করে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের মুযবানা পদ্বতিতে ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। এই হাদীসে সাঈদ ইবন মুসাইবি একজন প্রবীণ তাবিঈ। তিনি এখানে সাহাবীর নাম উল্লেখ না করে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটি একটি মুরসাল হাদীস। সুতরাং, যে হাদীসে সনদের ইনকিতা শেষের দিকে হয়েছে অর্থাৎ সাহাবায়ে কিরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ওনাদের নাম
মুবারকই বাদ পড়েছে এবং স্বয়ং তাবিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওনার নাম মুবারক করে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাকে হাদীসে মুরসাল বলে।
মুরসাল বর্ণনার কয়েকটি কারণঃ
১. কখনো রাবী একাধিক মুহাদ্দিস থেকে হাদীস শ্রবণ করেন, যাদের আদালত ও যবত সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত, এরূপ অবস্থায় তিনি শায়খদের উপর নির্ভর করে মুরসাল বর্ণনা করেন। যেমন ইবরাহিম নাখঈ (রহঃ) ইবন মাসউদ (রাঃ) থেকে এভাবে বর্ণনা করতেন।
২. কখনো রাবী নিজ শায়খের নাম ভুলে যান, কিন্তু হাদীস স্মরণ থাকে, ফলে তিনি মুরসাল বর্ণনা করেন।
৩. কখনো রাবী উপদেশ হিসেবে, বা বিতর্কের সময় বা ফতোয়ার ক্ষেত্রে বা ওয়াজের মজলিসে হাদীস বর্ণনা করেন, তাই সনদের প্রতি বিশেষ নজর দেন না, মতন স্পষ্ট বলেন, বিশেষ করে শ্রোতাদের সামনে বক্তার শায়খ নির্দিষ্ট থাকলে এরূপ করা হয়।
৪. কখনো দুর্বল রাবীর কারণে মুরসাল বর্ণনা করা হয়।
৫. ক্ষতির আশঙ্কা কিংবা হাদীস গ্রহণ করা হবে না ভেবে মুরসাল বর্ণনা করা হয়।
৬. কখনো রাবীর সন্দেহ হয় যে, হাদীসটি মুসনাদ না মুরসাল, এমতাবস্থায় মুসনাদ হলেও তিনি মুরসাল বলেন, যেমন ইমাম মালিক প্রমুখ থেকে এরূপ শ্রুতি রয়েছে।
৭. ইমাম মুসলিম বলেনঃ কখনো রাবী নিজের মধ্যে আগ্রহের অভাবে সনদবিহীন মতন উল্লেখ করেন, আবার যখন উদ্যমতা ফিরে পান শায়খকে স্পষ্ট বলে দেন।
মুরসাল হাদীসের প্রকারভেদঃ এই ধরনের হাদীস পাঁচ ধরনের হয়ে থাকে যা হলঃ
১। সাহাবা কর্তৃক ইরসাল
২। তাবিঈ কর্তৃক ইরসাল
৩। তাবী-তাবিঈ কর্তৃক ইরসাল
৪। তাবী-তাবিঈ পরবর্তী যুগ কর্তৃক ইরসাল
৫। সনদের ভিন্নতা
এখানে সকল প্রাকারের মুরসাল হাদীসের বর্ণনা নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ
১। সাহাবা কর্তৃক ইরসালঃ এটি এই ধরনের ইরসাল যেখানে এক সাহাবা অন্য কোন সাহাবাদের থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছে। আর তারা হাদীসটিকে এমনভাবে বলেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরুপ বলেছেন অথবা এরুপ বলতে শুনেছি কিন্তু যেই সাহাবার কাছে থেকে বর্ণনা করেছেন তার নাম উল্লেখ করেন নাই। যেমন আবু হুরায়রা (রাঃ) হিজরীর ৬ষ্ঠ-৭ম সনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তার আগে হিজরতের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। হাফেয ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেনঃ "এ জাতীয় হাদীসগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, তাতে দেখা গেছে যে, কোনো সাহাবী আহকাম সংক্রান্ত কোনো হাদীস দুর্বল তাবে'ঈ থেকে গ্রহণ করেননি"¹⁶⁸。
হুকুমঃ উক্ত হাদীস সার্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য। কারণ শায়খ সাহাবী রাসূলুল্লহ (সাঃ) থেকে হাদীসটি শুনেছেন আর তাদেরকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে।
২। তাবীঈ কর্তৃক ইরসালঃ এই হাদীস বর্ণনা করার সময় কোন তাবীঈ সাহাবীর নাম উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছেন। এর কারণ হল এই যে, হাদীসটি এতটা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে এবং সেই সাহাবী এতটা জনপ্রিয় যে, তাই সাহাবার নাম আর উল্লেখ করতে প্রয়োজন হয় নাই। সেই তাবিঈ এই কথা এভাবে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরূপ বলেছেন অথবা এরূপ বলতে শুনেছি।
হুকুমঃ এই ধরনের মুরসাল হাদীস গ্রহণযোগ্য হবে কারণ তাবিঈগণ আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের নিকট অধিক মর্যাদাবান।
৩। তাবী-তাবীঈ কর্তৃক ইরসালঃ এখানে হাদীসটি সুপরিচিতি হওয়ার ফলে সাহাবী তাবীঈ এর নাম উল্লেখ করেন নাই।
হুকুমঃ এই ধরনের ইরসালের ব্যাপারে জুমহুর উলামাগণ নীরবতা অবলম্বন করেছেন। তবে যদি এটা জানা যায় যে, কোন নির্ভরযোগ্য রাবী থেকে তা বর্ণনা করেছে তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে অন্যথায় তা হবে না।
৪। তাবী-তাবীঈ পরবর্তী যুগ কর্তৃক ইরসালঃ যদি এই ইরসাল তা তাবি বা তাবিঈ পরবর্তী যুগে কেউ করে থাকে। তারা হাদীসটিকে
এভাবে বলবে, রাসূলুয়ল্লাহ (সাঃ) এরূপ বলেছেন অথবা এরূপ বলতে শুনেছি।
হুকুমঃ এই হাদীসের বিশুদ্ধতা নিয়ে ইমামদের ভিতর মতবিরোধ দেখা দেয়। কারও মতে তা গ্রহণযোগ্য আবার কারও মতে তা গ্রহণযোগ্য নয়। যেমনঃ ইমাম আবুল হাসান কারখী (রহঃ) বলেন, বর্ণনাকারীর ইরসালের দ্বারা এটি প্রতীয়মান হয় যে, তিনি হাদীসটির সনদের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত।
৫। সনদের ভিন্নতাঃ যে হাদীসে এক সনদে মুরসাল আর অন্য সনদে তা মুসনাদ এমন হতে পারে। যেমনঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিবাহ হয় না।
হুকুমঃ এই হাদীসের হুকুম হল তা গ্রহণযোগ্য হবে।
মুরসাল হাদীসের হুকুমঃ
ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন: "আমাদের ও আহলে ইলমদের দৃষ্টিতে মুরসাল দলিল নয়"¹⁶⁹। ইমাম শাফেঈ¹⁷⁰ (রহঃ) কয়েকটি শর্তে
মুরসাল গ্রহণ করেছেন, তন্মধ্যে কতক রাবী ও কতক মতনের সাথে সম্পৃক্ত।
রাবীর সাথে সম্পৃক্ত তিনটি শর্তঃ
১. ইরসালকারী রাবির সেকাহ হওয়া।
২. রাবীর বড় তাবে'ঈ থেকে বর্ণনা করা।
৩. ইরসালকারী রাবির সেকাহ শায়খ থেকে গ্রহণ করা।
মতনের সাথে সম্পৃক্ত চারটি শর্তঃ
১. মুরসাল মতন অপর কোনো সহী সনদে বর্ণিত হওয়া।
২. মুরসাল মতন অপর তাবে'ঈ থেকে মুরসাল বর্ণিত হওয়া।
৩. মুরসাল মতনের স্বপক্ষে কোনো সাহাবীর বাণী থাকা।
৪. সাধারণ আলেমের ফতোয়া মুরসাল মোতাবেক হওয়া।
)খ( مُعَلِّق )মুয়াল্লাক( : মু'আল্লাক এর আভিধানিক অর্থ ঝুলন্ত। কোনো বস্তু উপর থেকে ঝুলে নিচ থেকে মাটি স্পর্শ না করলে 'মু'আল্লাক' বলা
হয়। যে হাদীস - এর সনদের ইনকিতা প্রথম দিকে হয়েছে অর্থাৎ সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ওনাদের পর এক বা একাধিক নাম বাদ পড়েছে তাকে 'মুয়াল্লাক' বলে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। মু'আল্লাকের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে হাফেয ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ্ বলেনঃ "সনদের শুরু থেকে এক বা একাধিক রাবিকে অনুল্লেখ করা হলে মু'আল্লাক বলা হয়, সকল রাবি অনুল্লেখ থাকলেও মু'আল্লাক"।
কোন কোন গ্রন্থকার কোন কোন হাদীস - এর পূর্ণ সনদকে বাদ দিয়ে কেবল মূল হাদীসটিকেই বর্ণনা করেছেন। এরূপ করাকে তা'লীক বলে। কখনও কখনও তা'লীক রূপে বর্ণিত হাদীসকেও তা'লীক বলে।
ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবে এরূপ বহু তা'লীক রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি ওনার সমস্ত তা'লীকেরই মুত্তাসিল সনদ রয়েছে। অপর সংকলনকারী উনারা এই সমস্ত তা'লীক মুত্তাসিল সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন।
মু'আল্লাকের হুকুমঃ মু'আল্লাক একপ্রকার দুর্বল হাদীস।

টিকাঃ
¹⁶⁷ সহীহ মুসলিম :: খন্ড ১০ :: হাদীস ৩৬১৩, কিতাবুল বুয়ু (ব্যবসা-বানিজ্য) অধ্যায়
¹⁶⁸ জাওয়াহিরুস সুলাইমানিয়াহ: (২১৯)
¹⁶⁹ ইমাম নববির ব্যাখ্যা সম্বলিত মুসলিম: (১/১৩২)
¹⁷⁰ আর-রিসালাহ: (৪৬১-৪৭০), জাওয়াহিরুস সুলাইমানিয়া থেকে সংগৃহীত: (২২৩)

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 মুদাল্লাস (مدلس)

📄 মুদাল্লাস (مدلس)


)৩( مُدَلِّسٌ )মুদাল্লাস(: مُدَلِّسٌ শব্দটি تدليس থেকে গৃহীত, যার ধাতু دلسة অর্থ অন্ধকার। যে হাদীস এর রাবী নিজের প্রকৃত শায়খ (উস্তাদ) উনার নাম না করে উনার উপরস্থ শায়খ উনার নামে এভাবে হাদীস বর্ণনা করেছেন যাতে মনে হয় যে, তিনি নিজেই এটা উপরস্থ শায়খ উনার নিকট শুনেছেন অথচ তিনি নিজে এটা শুনেননি (বরং ওনার প্রকৃত উস্তাদ উনার নিকটই এটা শুনেছেন) সে হাদীসকে হাদীসে মুদাল্লাস বলে। এরূপ করাকে তাদলীস বলে। আর যিনি এরূপ করেছেন উনাকে মুদাল্লিস বলে। মুদাল্লিসের হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। যে পর্যন্ত না তিনি একমাত্র ছিকাহ রাবী হতেই তাল্লীস করেন বলে সাব্যস্ত হয় অথবা তিনি এটা আপন শায়খ উনার নিকট শুনেছেন বলে পরিস্কারভাবে বলে দেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00