📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীসের দ্বিতীয় প্রকার শ্রেণী বিভাগ

📄 হাদীসের দ্বিতীয় প্রকার শ্রেণী বিভাগ


মুহাদ্দিছীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম ওনারা প্রধানতঃ হাদীস বা সুন্নাহ্ কে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথাঃ
(১) مَرْفُوْعٌ (মারফু')
(২) مَوْقُوْفٌ (মাওকুফ) ও
(৩) مَقْطُوْعُ (মাকতু')।
(১) مَرْفُوعُ (মারফু'): مَرْفُوعُ এর আভিধানিক অর্থ উঁচু, উত্তোলিত বস্তু ও উচ্চ শিখরে উন্নীত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত হাদীস সনদের সর্বশেষ ও উচ্চ শিখরে উন্নীত হয়, তাই এ প্রকার হাদীসকে মারফু' বলা হয়।
'মারফু'র পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে লেখক রাহিমাহুল্লাহ্ বলেনঃ “নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত কথা, অথবা কর্ম, অথবা সমর্থন, অথবা তার চারিত্রিক ও শারীরিক গঠনের বর্ণনা; হোক স্পষ্ট মারফু' কিংবা হুকমান মারফু'। সাহাবী তার সাথে সম্পৃক্ত করুক কিংবা তাবে'ঈ কিংবা তাদের পরবর্তী কেউ, সকল প্রকার মারফু'র অন্তর্ভুক্ত”।
অতএব মারফু'র সংজ্ঞায় মুত্তাসিল, মুরসাল, মুনকাতি', মু'দ্বাল ও মু'আল্লাক অন্তর্ভুক্ত, তবে মাওকুফ ও মাকতু' অন্তর্ভুক্ত নয়।
আল-খাতীব আল-বাগদাদী বলেনঃ "একটি মারফু' হাদীসের বর্ণনা একজন সাহাবী পর্যন্তই সীমাবদ্ধ; তার বাইরে নয়।"
সুতরাং, মারফু হাদীস বলা হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওনার কথা, কাজ, মৌন সম্মতিকে। অর্থাৎ যে হাদীস- এর সনদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকেই 'মারফু' হাদীস বলে।
মারফু হাদীসকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- (ক) مَرْفُوْعُ قَوْلِى (মারফু' ক্বওলী), (খ) مَرْفُوْعُ فِعْلِى (মারফু' ফে'লী) (গ) مَرْفُوْعُ تَقْرِيْرِی (মারফু' তাক্বরীরী)
নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ-
(ক) مَرْفُوعُ قَوْلِى (মারফু' ক্বওলী): উচ্ছ্বল শাস্ত্রবিদ ওনাদের মতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওনার মুখ মুবারক নিসৃত বাণী মুবারককে মারফু' ক্বওলী হাদীস বলে।
এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “শুধুমাত্র হযরত রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুখ মুবারক নিসৃত বানী মুবারককে মারফু’ ক্বওলী হাদীস বলে।” (উছুলুল আসার)।
যেমন, ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ
«إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهَجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ»
“নিশ্চয় সকল আমল নিয়তের সাথে গ্রহণযোগ্য হয়, আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই যা সে নিয়ত করেছে। অতএব যার হিজরত দুনিয়ার জন্য যা সে উপার্জন করবে, অথবা নারীর জন্য যাকে সে বিয়ে করবে, তাহলে সে যে জন্য হিজরত করেছে তার হিজরত সে জন্য গণ্য হবে। [তথ্যসূত্রঃ বুখারী: (১), মুসলিম: (৩৫৩৭)]¹⁵⁵。
বর্ণিত হাদীসটি যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওনার সরাসরি যবান মুবারক নিসৃত বাণী এবং এর ‘সনদ’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওনার পর্যন্ত পৌঁছেছে তাই উক্ত হাদীসটি মারফু কওলী হাদীস - এর অন্তর্ভুক্ত।
(খ) মারফু' ফে'লী (مَرْفُوْعُ فِعْلِي ): রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যা আমল করে বাস্তবে হযরত সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ওনাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছেন তাকে মারফু' ফে'লী হাদীস বলে। যেমন, আবদান (রঃ) ..... উমায়‍্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، قَالَ أَخْبَرَنَا الْأَوْزَاعِيُّ، عَنْ يَحْيَى، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ جَعْفَرِ بْنِ عَمْرِو ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَمْسَحُ عَلَى عِمَامَتِهِ وَخُفَّيْهِ. وَتَابَعَهُ مَعْمَرٌ عَنْ يَحْيَى عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ عَمْرٍو قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم.
"আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে তাঁর পাগড়ীর ওপর এবং উভয় মোজার ওপর মসেহ করতে দেখেছি।' মা'মার (রঃ) আমর (রঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেনঃ "আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে তা করতে দেখেছি।”¹⁵⁶ বর্ণিত হাদীসটি যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওনার সরাসরি ফে'ল বা আমল এবং এর 'সনদ' আখিরী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওনার পর্যন্ত পৌঁছেছে তাই উক্ত হাদীসদ্বয় মারফু' ফে'লী হাদীস এর অন্তর্ভুক্ত।
(গ) মারফু' তাক্বরীরী): আখিরী রসূল (সাঃ) তিনি যে ব্যাপারে কোন কথা বলেননি এবং নিজে কোন কাজও করেননি বরং হযরত সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ওনারা ওনার সামনে কোন কথাবার্তা বলেছেন কিংবা কোন কাজ-কর্ম করেছেন আর আখিরী রসূল (সাঃ) তিনি তাতে নিরবতা পালন কিংবা সম্মতি প্রদান করেছেন তাকে মারফু' তাক্বরীরী হাদীস বলে। যেমনঃ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক দাসীকে বলেনঃ
أَيْنَ اللَّهُ ؟ قَالَتْ: فِي السَّمَاءِ، قَالَ: مَنْ أَنَا ؟ قَالَتْ: أَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ، قَالَ: أَعْتِقْهَا، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ»
"আল্লাহ কোথায়? সে বলল: আসমানে। তিনি বলেন: আমি কে? সে বলল: আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি বলেনঃ তাকে মুক্ত কর, কারণ সে মুমিন"। এখানে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাঁদির কথা প্রত্যাখ্যান না করে সমর্থন করেছেন, তাই বাদীর কথা তার কথা হিসেবে গণ্য। এটা তার তাকরির বা সমর্থন।
(২) মাওকুফ): সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ওনাদের কথা, কাজ ও মৌন সম্মতিকে মাওকুফ হাদীস বলে। যা রাসূল (সাঃ) ওনার বরাত না দিয়ে হযরত সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ওনারা নিজেরাই বর্ণনা করেছেন।
অর্থাৎ যার 'সনদ' হযরত সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ওনাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ ধরনের হাদীসের উদাহরণ হল 'আলী ইবনু আবি তলিব (রাদ্বিআল্লাহু 'আনহু) এর এই কথাগুলো নিম্নরূপঃ-
"ভালবাসার মানুষকে ভালবাসতে গিয়ে চরমপন্থা অবলম্বন করবেন না; কারণ হতে পারে একদিন হয়ত আপনিই তাকে ঘৃণা করতে পারেন। আবার কাউকে ঘৃণা করার ক্ষেত্রেও চরমপন্থা অবলম্বন করবেন না; কারণ হতে পারে আপনিই একদিন তাকে ভালবাসতে পারেন।” [সহীহ্ আল-বুখারী; অধ্যায়ঃ আদাবুল মুফ্রাদ, হাদীস নং - ৪৪৭]¹⁵⁷。
আল হাকিম এর মত অনুযায়ী কোন হাদীস মাওকুফ বলে বিবেচিত হতে হলে হাদীসটিকে আরেকটি শর্ত পূরণ করতে হবে আর তা হল হাদীসটির ইসনাদ (হাদীসের মূল কথাটুকু যে সূত্র পরম্পরায় গ্রন্থ সংকলনকারী পর্যন্ত পৌঁছেছে; এতে হাদীস বর্ণনাকারীদের নাম একের পর এক সজ্জিত থাকে) সম্পূর্ণ হতে হবে এবং কোন ক্ষেত্রে তা বিঘ্নিত হওয়া যাবে না।
মাওকুফ পরিভাষাটি সাহাবাগণ ছাড়া অন্যান্যদের দ্বারা বর্ণিত হাদীসের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে উল্লেখ করতে
হবে যে, অমুক হাদীসটি মাওকূফ যার বর্ণনা আল-জুহরী কিংবা আল-'আতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ যারা দু'জনেই তাবিঈ ছিলেন বা তাবিঈদের অনুসরণ করেছিলেন। উল্লেখ্য, মারফু হাদীস এর ন্যায় মাওকুফ হাদীসও তিন প্রকার।
(ক) مَوْقُوْفُ قَوْلِى (মাওকুফ ক্বওলী): যা সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুম ওনারা বলেছেন।
(খ) مَوْقُوْفُ فِعْلِی (মাওকুফ ফে'লী): যা সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুম ওনারা আমল করেছেন।
(গ) مَوْقُوْفُ تَقْرِيْرِى (মাওকুফ তাক্বরীরী): সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুম ওনারা যে কাজে বা কথায় সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন।
(৩) مَقْطُوْعُ (মাক্কতু'): مقطوع এর আভিধানিক অর্থ কর্তিত, বলা হয়, العضو المقطوع 'কর্তিত বা বিচ্ছিন্ন অঙ্গ'। এ থেকে তাবে'ঈদের কথা ও কর্মকে মাকতু' বলা হয়, কারণ তাদের বাণী ও কর্ম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীদের কথা ও কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন।
হযরত তাবিয়ীন রহমতুল্লাহি আলাইহিম ওনাদের কথা-কাজ ও মৌন সম্মতিকে মাক্বতু' হাদীস বলে। অর্থাৎ যার 'সনদ' হযরত তাবিয়ীন
রহমতুল্লাহি আলাইহিম ওনাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকেই 'মাকতু' হাদীস বলে। উদাহরণস্বরূপ, মাস্ত্রক ইবনুল আজদা (রাহিমাহুল্লাহ্) এর কথাগুলো মাকতু' হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেনঃ "আল্লাহকে ভয় করার মত জ্ঞানই হল যথেষ্ট জ্ঞান আর নিজের কর্ম সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করাই হল যথেষ্ট মূর্খতা বা অজ্ঞতা।”
ইবনুল সালাহ্ (রাহিমাহুল্লাহ্) বলেনঃ “ইমাম আল শাফে'ঈ, আবুল কাশেম আল-তাবারানী এবং অন্যান্যদের ভাষ্য অনুযায়ী "মাকতু” পরিভাষাটিকে আমার কাছে "মুনকাত” (যে হাদীসের বর্ণনাকারীদের নাম ধারাবাহিকভাবে সুসজ্জিত নয় অর্থাৎ, বিঘ্নিত) পরিভাষাটির বিপরীত বলে মনে হয়েছে।” [মুকাদ্দিমাত ইবনুল সালাহ্ ফী 'উলুম আল-হাদীস; পৃষ্ঠা নং- ২৮] ¹⁵⁸ উল্লেখ্য, মারফু' ও মাওকুফ হাদীস - এর ন্যায় মাক্বতু' হাদীসও তিন প্রকার।
(ক) مَقْطُوْعُ قَوْلِى (মাক্বতু' ক্বওলী): যা তাবিয়ীন রহমতুল্লাহি আলাইহিম ওনারা বলেছেন।
(খ) مَقْطُوْعُ فِعْلِي (মাক্বতু' ফে'লী): যা তাবিয়ীন রহমতুল্লাহি আলাইহিম ওনারা আমল করেছেন।
(গ) (مَقْطُوْعُ تَقْرِيْرِي )মাক্কতু' তাক্বরীরী): তাবিয়ীন রহমতুল্লাহি আলাইহিম ওনারা যে কাজে বা কথায় সম্মতি প্রদান করেছেন। (উছুলুল আসার)।
উদাহরণস্বরূপ নিম্নোক্ত হাদীসটিও উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন, ইরশাদ হয়েছে,
عَنْ حَضَرَتْ سُلَيْمَانَ بْنِ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ رَحْمَةُ اللَّهِ عَلَيْهِ قَالَ أَدْرَكْتُ الْمُهَاجِرِيْنَ الْأَوَّلِيْنَ يَعْتَمُوْنَ بِعَمَائِمَ كَرَبِيْسَ ..... خضر
অর্থঃ "হযরত সুলাইমান ইবনে আবী আব্দুল্লাহ (তাবিয়ী) রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (ইসলামের) প্রথম দিকের সকল মুহাজিরীন (হিজরতকারী সাহাবী) রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ওনাদেরকে সবুজ রংয়ের সূতী কাপড়ের পাগড়ী পরিধান করতে দেখেছি।” (মুছান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ)।

টিকাঃ
¹⁵⁵ বুখারী: (১), মুসলিম: (৩৫৩৭)
¹⁵⁶ উজু অধ্যায় :: সহীহ বুখারী :: খন্ড ১ :: অধ্যায় ৪ :: হাদীস ২০৪
¹⁵⁷ সহীহ্ আল-বুখারী; অধ্যায়ঃ আদাবুল মুফ্রাদ, হাদীস নং ৪৪৭
¹⁵⁸ মুকাদ্দিমাত ইবনুল সালাহ্ ফী 'উলুম আল-হাদীস; পৃষ্ঠা নং- ২৮

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 রিওয়ায়েত বা সনদ অনুসারে হাদীস-এর প্রকারভেদ

📄 রিওয়ায়েত বা সনদ অনুসারে হাদীস-এর প্রকারভেদ


“উসূলুল আসার এবং মীযানুল আখবার” কিতাবে উল্লেখ আছে, "সনদ অনুসারে হাদীস দু'প্রকারঃ
(১) মুতাওয়াতির এবং (২) আহাদ।

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 মুতাওয়াতির (متواتر)

📄 মুতাওয়াতির (متواتر)


আর সনদ বলা হয়, "মতন তথা হাদীসের মূলভাষ্য পর্যন্ত পৌঁছার পরস্পর বর্ণনা সূত্রকেই সনদ বলে। (এক কথায়- হাদীসের মূল কথার বর্ণনার ধারাবাহিকতাকেই সনদ বলে।)"
)১( مُتَوَائِرُ )মুতাওয়াতির(: متواتر শব্দের উৎপত্তি تواتر ধাতু থেকে। আভিধানিক অর্থ تتابع বা লাগাতার, যেমন বলা হয়: تواتر المطر 'লাগাতার বৃষ্টি হয়েছে'। অনুরূপ বলা হয় : تواتر المصلون إلى المسجد 'লাগাতার মুসল্লি মসজিদে এসেছে'। এ থেকে লাগাতার অগণিত মানুষের বর্ণিত হাদীসকে মুতাওয়াতির বলা হয়। আভিধানিক অর্থ: متواتر )মুতাওয়াতির) শব্দটি ইসমে ফায়েল-এর সীগা, যা تواتر )তাওয়াতুর) শব্দমূল থেকে উৎকলিত। অর্থ একের পর এক বা অবিরামভাবে কোনো কিছু আসা, যেমন تواتر المطر
متواتر এর পারিভাষিক সংজ্ঞাঃ "বৃহৎ জনসংখ্যার বর্ণিত হাদীস, মিথ্যার উপর যাদের একাট্টা হওয়া অসম্ভব, সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ সংখ্যা বিদ্যমান থাকলে হাদীসকে মুতাওয়াতির বলা হয়। বস্তুতঃ যে সব হাদীস-এর বর্ণনাকারী এত অধিক যে, যাদের কাউকে মিথ্যা ও সন্দেহ পোষণ করা কখনও সমীচীন নয়, সে সব ঐ হাদীসকে মুতাওয়াতির হাদীস বলে। যেমন,
উসূলূশ শাশী কিতাবে উল্লেখ আছে, “মুতাওয়াতির ঐ হাদীসকে বলা হয় যা রাবীদের একটি জামায়াত অপর একটি জামায়াত থেকে বর্ণনা করেছেন। যাঁদের সংখ্যা অধিক হওয়ার কারণে মিথ্যার উপর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চিন্তাও করা যায় না।” অর্থাৎ মুতাওয়াতির হাদীস হলো যার বর্ণনা- পরম্পরার প্রতিটি স্তরেই রয়েছে এমন বহুল সংখ্যক বর্ণনাকারী (রাবী) যারা তাদের বর্ণিত হাদীসটি জাল করেছেন বলে কোনো সংশয় সৃষ্টি হতে পারে না, কারণ অভিন্ন শব্দ ও অর্থবোধক একটি হাদীস, বহুল সংখ্যক রাবী যার যার জায়গা থেকে জাল করে প্রচার করে দেবেন তা একটি অসম্ভব তথা অকল্পনীয় ব্যাপার। যেমনঃ হাদীস إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنَّيَّاتِ সকল আমলের মূল্যায়ন নিয়ত অনুযায়ীই হয়। এই হাদীসটি সাত শতেরও অধিক সনদসূত্রে বর্ণিত হইয়াছে। شرح النخبة ص] মুহাদ্দিসগণ সাধারণত 'মুতাওয়াতির' হাদীসকে এই পারিভাষিক নামে অভিহিত করেন না।
কেননা কোন হাদীসের 'মুতাওয়াতির' হওয়াটা সনদের আলোচনা পর্যায়ে গণ্য হয় না। তার কারণ এই যে, সনদশাস্ত্রে সাধারণত হাদীসের 'সহীহ' বা 'যয়ীফ' হওয়ার ব্যাপারটিই আলোচ্য- যেন হয় তদনুযায়ী আমল করা যায়, না হয় যেন তা ত্যাগ করা যায়।
উপরন্তু মুতাওয়াতির হাদীসের বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয় না। তদনুযায়ী আমল করা আলোচনা ব্যতিরেকেই
[ علوم الحديث ومصطله وشرح النخبة ج 3 ص - 150
(হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, পৃষ্ঠা নং - ৪৭) ¹⁵⁹。
মুতাওয়াতির হাদীস প্রসঙ্গে প্রখ্যাত আলেমদের সংজ্ঞাঃ মুতাওয়াতিরের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে হাফিয ইবন আসকালানী (রহঃ) বলেন, খবরে মুতাওয়াতির হল যে হাদীসের বর্ণনাকারীর সংখ্যা কোন নির্দিষ্ট সংখ্যায় সীমিত না হয়ে এত অধিক হবে, তাদের সবাই কোন একটি মিথ্যার উপর একত্রিত হওয়াকে স্বভাবত বিবেক বিরুদ্ধ মনে হবে। আল্লামা মোল্লা জিউন (রহঃ) বলেন, "যে হাদীসের সনদের ধারাবাহিকতায় বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন দিক থেকে সন্দেহ থাকে না, তাকে হাদীসে মুতাওয়াতির বলা হয়"।
মুহাদ্দীস দেহলভী (রঃ) বলেন, যদি রাবীর সংখ্যা অসংখ্য হয় এবং তাদের সকলের মিথ্যার উপর এক মত হওয়ার অসম্ভব হয় তাহলে তাদের বর্ণিত হাদীস হল মুতাওয়াতির।
আল্লামা আবুল বারকাত আব্দুল্লাহ ইবন আহমদ ইবন মাহমূদ (রঃ) বলেন, মুতাওয়াতির হল এমন হাদীস যেখানে এত অধিক সংখ্যক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন যে, তাদের সংখ্যা সীমিত নয় এবং
একটি মিথ্যার উপর তাদের সবারই একমত হওয়ার সন্দেহ করা যায় না।
তাদের সংখ্যাধিক্য প্রথম থেকে শুরু করে মাঝ পর্যন্ত এমন কি একেবারে শেষ পর্যন্ত সমান থাকবে"।
মুতাওয়াতিরের শর্তঃ
হাফিজ ইবন আসকালানীর উল্লিখিত সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, কোনো হাদীসকে মুতাওয়াতির বলতে হলে তাতে চারটি শর্ত পাওয়া যেতে হবেঃ
১. মুতাওয়াতির হাদীসটি বহুল সংখ্যক বর্ণনাকারীর দ্বারা বর্ণিত হতে হবে। বর্ণনাকারীদের সংখ্যা কত হলে 'বহুল সংখ্যক' বলা হবে, এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে।
ক। জমহুর ওলামার মতে এই সংখ্যার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। এর জন্য কেবল অধিক সংখ্যা হওয়া দরকার।
খ। কোন কোন মুহাদ্দিসের মতে এই সংখ্যাটি চার হওয়া উচিৎ। কারণ ব্যভিচারের সাক্ষ্য প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী থাকা দরকার। আল্লাহ বলেন,
তারা কেন এ ব্যাপারে চার জন সাক্ষী উপস্থিত করেনি; [সূরা নূর, আয়াত নং -১৩]
গ। কারও মতে এই সংখ্যাটি পাঁচ হওয়া দরকার। কারণ লিআন হওয়ার জন্য এই সংখ্যাটি ব্যবহৃত হয়।
ঘ। কারও কারও মতে এর সর্বনিম্ন সংখ্যা ৭ হওয়া দরকার। কারণ কারণ কুকুরে অপবিত্র পাত্র থেকে নিজেকে পবিত্র করার জন্য সাতবার ধোঁত করতে বলা হয়েছে। একটি সপ্তাহ সম্পন্ন হয় সাতদিনে আর আসমান ও যমীনের কথা সাত বলা হয়েছে।
ঙ। কারও মতে এই সংখ্যাটি দশ হওয়া উচিৎ। কারণ দশের নীচে কোন সংখ্যা গ্রহণযোগ্য হয় না।
চ। কারও মতে এর সংখ্যা ১২। কারণ ঈসা (আঃ) এর সাথে ১২ জন সংগী ছিলেন এবং আল্লাহ বলেনঃ-
আল্লাহ বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন এবং আমি তাদের মধ্য থেকে বার জন সর্দার নিযুক্ত করেছিলাম। [সূরা মায়িদা, আয়াত নং - ১২]
ছ। কারও মতে এই সর্বনিম্ন সংখ্যা ২০ হওয়া দরকার। যেমন আল্লাহ বলেন, তোমাদের মধ্যে যদি বিশ জন দৃঢ়পদ ব্যক্তি থাকে, তবে জয়ী হবে দু'শর মোকাবেলায় [সূরা আনফাল, আয়াত নং - ৬৫]
জ। কোন কোন হাদীসবিদগণের মতে এই সংখ্যা হল ৪০। কারণ আল্লাহ বলেন, হে নবী, আপনার জন্য এবং যেসব মুসলমান আপনার সাথে রয়েছে তাদের সবার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট। [সূরা আনফাল, আয়াত নং - ৬৪] আর এই আয়াত নাযিলের সময় মুমিনের সংখ্যা ছিল ৪০।
ঝ। কারও কারও মতে এই সংখ্যাটি নিম্নসীমা হল ৭০। কারণ আল্লাহ বলেন, মূসা বেছে নিলেন নিজের সম্প্রদায় থেকে সত্তর জন লোক আমার প্রতিশ্রুত সময়ের জন্য। [সূরা আরাফ, আয়াত নং - ১৫৫]
ঞ। আবার কোন কোন হাদীসবিদগণ বলে থাকেন যে, এই সংখ্যাটি হল ৩১৩। কারণ বদরের যুদ্ধের দিন সাহাবার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩১৩ জন। তবে এ ব্যাপারে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অভিমত হলো, নিদেন পক্ষে দশ ব্যক্তি কর্তৃক বর্ণিত হলে তবেই তাকে বলা হবে।
২. শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, বর্ণনা পরম্পরার সকল স্তরে, বর্ণনাকারীদের সংখ্যাগত এই বৈশিষ্ট্য অব্যাহত থাকতে হবে।
৩. বর্ণনাকারীগণ মিথ্যার উপর একত্র হতে পারেন, মানুষের আকল-বুদ্ধি ও স্বাভাবিক বাস্তবতার বিবেচনায় তা অসম্ভব হওয়া। যেমন বর্ণনাকারীদের বিভিন্ন দেশ ও এলাকার বাসিন্দা হওয়া, যাদের মধ্যে বিশেষ করে সে কালে পরস্পর যোগাযোগ ও যোগসাজশ
অসম্ভব থাকা। অথবা বর্ণনাকারীগণ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও যাদের প্রত্যেকের চিন্তার ধরন-ধারণ আলাদা। অতএব কোনো মিথ্যার ব্যাপারে এঁরা জোটবদ্ধ হতে পারেন, তা বাস্তবতা-রহিত অসম্ভব ব্যাপার।
৪. বর্ণনাকারীগণ ইন্দ্রীয় নুভূতির নির্ভরতায় হাদীসটি বর্ণনা করবেন। অর্থাৎ তারা বলবেন سمعنا )আমরা শুনেছি), অথবা رأينا )আমরা দেখেছি), অথবা لمسنا )আমরা স্পর্শ করেছি) এর বিপরীতে যদি বর্ণিত বিষয়টি বুদ্ধি-বিবেচনানির্ভর হয়, যেমন বলা হলো, 'মহাবিশ্ব অনাদি কাল থেকে বিরাজিত নয়, "তবে এ প্রকৃতির 'খবর' মুতাওয়াতির হিসেবে গণ্য হবে না"।
মুতাওয়াতির দু'প্রকারঃ
১. শব্দের তাওয়াতুরঃ যে হাদীস সকল রাবী একই শব্দে বর্ণনা করেন, কতক শব্দ ব্যতিক্রম হলেও অর্থ পরিবর্তন হয় না, তাই শব্দের মুতাওয়াতির, যেমনঃ
«مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ»
"আমার উপর যে মিথ্যা রচনা করল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়"¹⁶⁰। এ হাদীস নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম
থেকে ৭০ (সত্তর) থেকে অধিক সাহাবী বর্ণনা করেছেন, তাদের মধ্যে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবীও রয়েছেন, তাদের থেকে ক্রমানুসারে বিরাট এক জমাত বর্ণনা করেছেন। হাদীসের কোনো কিতাব পাওয়া যাবে না, যেখানে এ হাদীস নেই।
'শাব্দিক মুতাওয়াতির' হলো যা শব্দ ও অর্থ উভয় বিবেচনায় মুতাওয়াতির। যেমনঃ من كذب على متعمدا فليتبوأ مقعده من النار 'যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করল সে যেন জাহান্নামে তার স্থান তৈরি করে নেয়। হাদীসটি সত্তর-জনেরও অধিক সাহাবী বর্ণনা করেছেন।
২. অর্থের তাওয়াতুরঃ অনেক রাবী কর্তৃক বর্ণিত বিভিন্ন বিষয় সম্বলিত প্রচুর হাদীস বিদ্যমান, যাদের মিথ্যার উপর একাট্টা হয়ে এসব হাদীস রচনা করা অসম্ভব, তাদের একটি হাদীসও অন্যান্য হাদীসের সাথে অর্থ ও শব্দের মিল না-থাকার করণে মুতাওয়াতির পর্যায়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তবে একটি বিষয় রয়েছে, যা প্রত্যেক হাদীসে বিদ্যমান, তাই সে বিষয়টি মুতাওয়াতির। যেমন দো'আর সময় উভয় হাত উত্তোলন করার হাদীস। শতাধিক হাদীসে এসেছে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো'আর সময় উভয় হাত
উত্তোলন করেছেন, প্রত্যেকটি হাদীস খবরে ওয়াহেদ, এক হাদীসে যে ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, অপর হাদীসে তার বর্ণনা নেই, তবে সব হাদীসে রয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো'আর সময় উভয় হাত উঠিয়েছেন। অতএব দো'আর সময় উভয় হাত উঠানো মুতাওয়াতির বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। এটা অর্থগত মুতাওয়াতির।
অস্তিত্বঃ অত্যল্প হলেও মুতাওয়াতির হাদীসের অস্তিত্ব আছে। যেমন 'হাউজ' বিষয়ক হাদীস, চামড়ার মোজার ওপর মুসাহ করার হাদীস, ইত্যাদি। তবে আহাদ হাদীসের তুলনায় মুতাওয়াতির হাদীসের সংখ্যা অত্যল্প এতে কোনো বিতর্ক নেই। ইমাম সুয়ূতী এবং মুহাম্মদ ইবন জাফর আল-কাততানী মুতাওয়াতির হাদীস গ্রন্থের সংকলক।
হুকুমঃ মুতাওয়াতির শাব্দিক হোক বা অর্থের দিক থেকে হোক, তার উপর আমল করা ওয়াজিব। আরও বিস্তারিতভাবে বলা যায় যে, খবরে মুতাওয়াতিরের দ্বারা ইলমে জরুরী নাকি ইলমে নাজারী হয় তা নিয়ে আলেমদের ভিতর একাধিক মতামত রয়েছে। ইমামুল হারামাইন, আবুল হাসান আল বসরী (রঃ), আল্লামা কাবীর মতে এর দ্বারা ইলমে নাজারী প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে জমহুর উলামার মতে, মুতাওয়াতির দ্বারা একীনি ইলম তথা নিশ্চিত জ্ঞান অর্জিত হয়, ঠিক স্বচক্ষে দেখার মতোই। অর্থাৎ স্বচক্ষে
নিরাবরণভাবে কোনো কিছু দেখলে দৃষ্ট বস্তু সম্পর্কে যে ধরনের নিঃসংশয় বিশ্বাস তৈরি হয়, মুতাওয়াতিরের মাধ্যমেও অভিন্ন রকমের দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি হয়। এ কারণেই সমুদয় মুতাওয়াতির বর্ণনাই গ্রহণযোগ্য, এমন নয় যে কিছু মুতাওয়াতির হাদীস গ্রহণযোগ্য, আর কিছু অগ্রহণযোগ্য। সে হিসেবে মুতাওয়াতির হাদীস পেলে সঙ্গে সঙ্গে তা প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যায়, রবীদের অবস্থা ঘেঁটে দেখার অপেক্ষায় থাকতে হয় না। খবরে মুতাওয়াতিরের অস্বীকারকারী কাফির হিসেবে বিবেচিত হবে।
তাহলে এর দ্বারা ইলমে ইয়াকীন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উপর আমল করা ওয়াজিব। তা পরিত্যাগ করা যাবে না। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, 'যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করল সে যেন জাহান্নামে তার স্থান তৈরি করে নেয়। এই হাদীসের উপর আমল করা সকলের জন্য ওয়াজিব। মুতাযিলাগণ বলে থাকেন যে, খবরে মুতাওয়াতিরের দ্বারা প্রশান্তিমূলক জ্ঞান অর্জিত হয়। সেইসাথে তার দ্বারা ইলমে ইসতিদিলালী প্রতিষ্ঠিত হয়।

টিকাঃ
¹⁵⁹ হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, পৃষ্ঠা নং- ৪৭
¹⁶⁰ বুখারী: (১/২০০), হাদীস নং: (১০৭), আবু দাউদ: (৩/৩১৯-৩২০), ইবন মাজাহ: (১/৩২), হাদীস নং:
(৩৬), আহমদ: (১/১৬৫,১৬৭)

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 আহাদ (احاد)

📄 আহাদ (احاد)


মুতাওয়াতির হাদীস এর বিপরীত হাদীসকে আহাদ বলে। এটা আবার তিন প্রকার।
(ক) غَرِيبٌ (গরীব): غريب আরবী غربة শব্দ থেকে গৃহীত, অর্থ অপরিচিত, আগন্তুক ও বিদেশী। পরিবার ও স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন।
অপর দেশে অপরিচিত ব্যক্তিকে গরীব বলা হয়। অপরিচিত হওয়াকে গুরবত, আর ব্যক্তিকে গরীব বলা হয়।
পারিভষিক সংজ্ঞা যে সহীহ হাদীসের সনদের কোন এক স্তরে বা সম্পূর্ণ সনদের প্রত্যেক স্তরেই মাত্র একজন বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন তাকে গরীব হাদীস বলে। মাওলানা আব্দুর রহিম বলেন, কোন স্তরে যদি বর্ণনাকারীদের সংখ্যা মাত্র একজন হয় তবে সেই হাদীস হল হাদীসে গরীব।
ব্যাখ্যা অর্থাৎ, একজন রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীস হল গারীব হাদীস। সেটা যদি সনদের সকল স্তরে যদি একজন বর্ণনাকারী থাকে আর এমন কি যেকোন স্তরে একজন বর্ণনাকারী থাকলেও তা গরীব হবে।
গরীব হাদীসের অন্যান্য নামসমূহ কেউ কেউ খবরে গরীবের অন্য একটি নাম দিয়েছেন যা হল আল-ফারদ। হাফিয ইবন আসকালানীসহ অধিকাংশ ওলামাগণ এই শব্দদ্বয়কে আভিধানিক ও পারিভাষিকভাবে একই শব্দ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অবশ্য আবার স্বয়ং, এই হাফিয ইবন আসকালানী বলেছেন, কতিপয় আলিম-উলামাবৃন্দ এই দুইটি শব্দের ভিতর
ব্যবহারের আধিক্য ও স্বল্পতা বিবেচনা করে এই শব্দদ্বয়ের ভিতর পার্থক্য নিরূপূণ করেছেন। কারণ ফারদ ফারদে মুতলাক আর গারীব ফারদে নিসাবীর উপর ব্যবহৃত হয়।
গরীব সাধারণত তিন প্রকার
১. সনদ ও মতন উভয় গরিব, যেমন কোনো রাবীর একলা বর্ণিত মতন।
২. সনদ গরীব কিন্তু মতন গরিব নয়, যেমন কোনো রাবী স্বীয় সনদে কোনো মতন বর্ণনা করলেন, তার সাথীদের কেউ যা বর্ণনা করেনি, তবে অপর সনদে তা বর্ণিত আছে। এখানে সনদ গবির, কিন্তু মতন গরিব নয়।
৩. মতন গরীব কিন্তু সনদ গরীব নয়, এরূপ হতে পারে না। কেউ এরূপ কল্পনা করেছেন, যা সঠিক নয়, যেমন তারা নিয়তের হাদীসের সনদকে দু'ভাগ করেন: গরিব ও মাশহুর।
কারণ ১-ওমর ইবনুল খাত্তাব, ২-আলকামাহ, ৩-মুহাম্মদ ইব্‌ ইবরাহিম, ৪-ইয়াহইয়া ইন্ন সায়িদ পর্যন্ত সনদ গরিব, ইয়াহইয়াহ ইন্ন সায়িদ থেকে সনদ ও মতন উভয় মাশহুর। সনদের দ্বিতীয়াংশ
ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ থেকে গ্রন্থকার¹⁶¹ পর্যন্ত মাশহুর। তারা সনদের প্রথমাংশের বিবেচনায় মতন গরীব ও সনদের দ্বিতীয়াংশের বিবেচনায় সনদ মাশহুর বলেন। এরূপ বলা যথাযথ নয়; কারণ মতন যখন গরীব ছিল, সনদও তখন গরীব ছিল; মতন যখন প্রসিদ্ধ সনদও তখন প্রসিদ্ধ।
যে বিশুদ্ধ হাদীস - এর বর্ণনাকারী সর্বদা একজন থাকে তাকেই গরীব হাদীস বলে। যেমন- “বাইউলওয়ালা” তথা আযাদকৃত দাস-দাসীর ওয়ারিছত্ব ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ।” (মিয়ানুল আখবার)
এ হাদীসটি হযরত ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে শুধুমাত্র হযরত আব্দুল্লাহ বিন দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন।
গরীব হাদীসের হুকুমঃ ১. সহী, ২. হাসান ও ৩. যঈফ সবপ্রকার হতে পারে। দুর্বল হওয়া গরীব হাদীসের প্রকৃতি। তাই মুহাদ্দিসগণ গরীব হাদীসের প্রতি তেমন ভ্রুক্ষেপ করেন না। ইমাম মালিক গরীব সম্পর্কে বলেনঃ “সবচেয়ে খারাপ ইলম গরীব, আর সবচেয়ে উত্তম ইলম প্রকাশ্য ইলম, যা একাধিক রাবী বর্ণনা করে”। আব্দুর রায়্যাক বলেন: আমরা মনে করতাম গরীব ইলম ভালো, কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণিত হল নিরেট খারাপ”।
ইমাম আহমদ ইব্‌ন হাম্বল বলেনঃ "তোমরা এসব গরীব লিপিবদ্ধ কর না, কারণ এগুলো মুনকার, তার অধিকাংশ দুর্বল রাবিদের থেকে বর্ণিত"। তিনি আরো বলেনঃ "সবচেয়ে খারাপ ইলম গরীব, তার উপর আমল ও ভরসা করা যায় না"।
গরীব হাদীসসমূহের ভিতর প্রসিদ্ধ কিতাবঃ গরীব হাদীসসমূহের ভিতর প্রসিদ্ধ কিতাব হল আল-আফরাদ ও গারাইবু মালিক যা দারকুতনীকৃত। আর আবূ দাউদ আস-সিজিস্তানী এর উপর এক খানা কিতাব প্রণয়ন করেছেন।
(খ) عَزِيزٌ (আযীয): আযীয শব্দ عز থেকে সংগৃহীত, আভিধানিক অর্থ শক্তিশালী। কেউ শক্তিশালী হলে বলা হয়: عَزَّ فُلَانٌ একজন রাবীর কোনো সংবাদ দেওয়ার পর দ্বিতীয় বা তৃতীয় রাবী একই সংবাদ দিলে সংবাদটি 'আযীয' বা শক্তিশালী হয়। সংবাদদাতার সংখ্যা বেশী হলে সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। এ থেকে দু'জন বা তিনজন রাবীর বর্ণিত হাদীসকে 'আযীয' বলা হয়। মূলতঃ এটি সিফাতে মুশাব্বাহ। আযযা ইয়াইযযু থেকে। এর অর্থ স্বল্প ও বিরল। যেহেতু এই সকল হাদীসের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য কিংবা এখানে রাবীদের সংখ্যা মুতাওয়াতির ও মাশহুরের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে তাই একে আযীয বলা হয়। অথবা আযযা ইয়াআযযু। যার অর্থ হল শক্তিশালী ও মযবুত হওয়া। যেহেতু অন্য আরেকটি
সনদ দ্বারা এর শক্তি বৃদ্ধি পায় তাই এর এই নামকরণ হয়েছে। 'আযীয'-র পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলা যায় যে, 'দু'জন অথবা তিনজন রাবীর বর্ণিত হাদীস আযীয'। সনদের কোনো স্তরে যদি দু'জন অথবা তিনজন রাবি থাকে, অন্যান্য স্তরে রাবীর সংখ্যা দুই বা দু'য়ের অধিক থাকলে হাদীস আযীয।
যেমনঃ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّ أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلِدِهِ وَالنَّسِ أَجْمَعِيْنَ
অর্থঃ "তোমাদের মধ্যে কেউই কামিল মুমিন হতে পারবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত; যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার সন্তান-সন্ততি এবং পিতা-মাতা এমনকি সকল মানুষের চেয়ে আমাকে বেশী মুহব্বত না করবে।” রাসূল (সাঃ) ওনার থেকে এ হাদীসটি শুধু আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওনারা বর্ণনা করেছেন।
'আযীযে'র আরেকটি উদাহরণঃ قال الإمام البخاري -رحمه الله- حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ: أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو الزِّنَادِ، عَنِ الْأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَن رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ»
وَقَالَ الْإِمَامُ الْبُخَارِيُّ رَحِمَهُ اللهُ - حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ: حَدَّثَنَا ابْنُ عُلَيَّةَ، عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ صُهَيْبٍ، عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَحَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»
ইমাম বুখারী উক্ত হাদীস দু'জন সাহাবীঃ আবু হুরায়রা ও আনাস ইবন মালিক থেকে দু'টি সনদে বর্ণনা করেন। তাই এতে সাহাবীর স্তরে দু'জন রাবী বিদ্যমান। ¹⁶²
অতঃপর আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে দু'জন তাবে'ঈ বর্ণনা করেন: কাতাদাহ ও আব্দুল আযীয ইন্ন সুহাইব। অতএব তাবে'ঈর স্তরে দু'জন রাবী বিদ্যমান। অতঃপর কাতাদাহ থেকে দু'জন রাবী বর্ণনা করেন: শু'বা ও সায়িদ ইব্‌ন আবী 'আরুবাহ। আবার আব্দুল আযীয থেকে দু'জন রাবী বর্ণনা করেন: ইসমাইল ইবন 'উলাইয়্যাহ ও আব্দুল ওয়ারেস ইন্ন সায়িদ। অতঃপর তাদের প্রত্যেকের থেকে একদল রাবী বর্ণনা করেন। সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনায় বলা যায়
যে, যে সমস্ত হাদীস - এর বর্ণনাকারী সর্বযুগে কমপক্ষে দু'জন থাকে তাকে হাদীসে আযীয বলে।
খবর বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য আযীয হওয়া জরুরী কিনা
আবু যুবায়র বলেন, খবর শুদ্ধ হওয়ার জন্য বর্ণনাকারী দুইজন থাকা দরকার।
আবু আব্দুল্লাহ নিশাপুরী (রহঃ) বলেন, যেকোন হাদীস বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য কমপক্ষে দুইজন বর্ণনাকারী থাকা অত্যাবশ্যক।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মতে, হাদীস শুদ্ধ হওয়ার জন্য একজন বর্ণনাকারী হলেই হয়।
তাদের যুক্তি হল এই যে, যদি একজন বর্ণনাকারীর দ্বারা হাদীস অশুদ্ধ হয় তাহলে সহীহুল বুখারীর প্রথম হাদীস তথা "মানুষের কর্মফল তার নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল” এ হাদীসটি অশুদ্ধ হত। কারণ তা কেবলমাত্র উমার (রাঃ) প্রথমে বর্ণনা করেছেন এবং পরবর্তীতে তা অনেকে বর্ণনা করেছেন।
আযীযের হুকুমঃ সহী, হাসান ও দুর্বল সকল প্রকার হতে পারে।
আযীযের উপর কিতাবঃ ওলামাগণ এই গ্রন্থের উপর তেমন কোন কিতাব রচনা করেন নাই, কারণ এর উপর রচিত কিতাবের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।
)গ( مَنْهُورُ )মাশহুর(: "مشهور" এর আভিধানিক অর্থ প্রসিদ্ধ। এই শব্দটি শহুরাত থেকে এসেছে যার অর্থ হল সবার কাছে বেশী গ্রহণযোগ্য। এর বহুবচন হল মাশাহীর যার অর্থ হলঃ well known, widely known, famous known, wide spread ইত্যাদি। যে সমস্ত হাদীস - এর সর্বযুগে সর্বস্তরে কমপক্ষে দু'য়ের অধিক কিংবা তার চেয়ে আরো অধিক বর্ণনাকারী রয়েছে, তবে মুতাওয়াতিরের স্তরে পৌছেনা বরং তার চেয়ে বর্ণনাকারী কম হয়, সে সব হাদীসকে মাশহুর হাদীস বলে। যথা -
إِنَّ اللهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا
অর্থঃ "নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি হঠাৎ করে ইল্মকে একেবারেই উঠিয়ে নিবেন না।"
এ হাদীস - এর রাবী সর্বযুগে সর্বকালে দু'য়ের অধিক রয়েছে।
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় যে সব হাদীসের বর্ণনাকারী তিন বা তিনের অধিক হবে কিন্তু মুতওয়াতির পর্যন্ত পৌছাবেনা, এমন হাদীসকে মাশহুর হাদীস বলে।
উদাহরণ নবী করিম (সাঃ) এর বাণী, আল্লাহ বান্দাদের থেকে ইলম ছিনিয়ে নেন না বরং আলিমদের উঠিয়ে ইলম উঠিয়ে নিন। উসূলবিদগণ একে খবরে মুতাওয়াতির এবং আহাদের মাঝামাঝি পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাদের মতে এটি প্রথম যুগে খবরে আহাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২য় ও ৩য় যুগে এটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।
ফকীহগণের পরিভাষায় একে মুসতাফীয বলা হয়। মুসতাফীয শব্দটি ইসতিফায থেকে এটি ইসমে ফায়িল। আরবী প্রবচন ফাযাল মাউ থেকে এর উৎপত্তি। এখন এই মাশহুর ও মুস্তাফীয এক শব্দ কিনা তা নিয়ে ওলামাদের ভিতর মতবিরোধ রয়েছে। এই ব্যাপারে তিনটি অভিমত পাওয়া যায় যা হলঃ
১। কারও মতে এই দুটি একই শব্দ। তাদের মতে মাশহুর হাদীস মুস্তাফীয। মাশহুর হাদীসটি প্রসিদ্ধি লাভের কারণে তা মুস্তাফীয হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।
২। আবার কারও মতে তা কেবল মাত্র বর্ণনাকারীদের প্রতি স্তরে সংখ্যার তারতম্যের কারণে এর সংখ্যা ভিন্ন থেকে ভিন্ন হয়। যদি প্রত্যেক স্তরে রাবীর সংখ্যা ঠিক থাকে তাহলে তা মুস্তাফীয হবে। যেমনঃ সকল স্তরে তিন, আবার সকল স্তরে চার ইত্যাদি। আর
প্রত্যেকটি স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যার তারতাম্য থাকে তাহলে তা মাশহুর হিসেবে খ্যাত থাকবে। যেমন কোন স্তরে তিন, আবার কোন স্তরে চার আবার এভাবে করে পাঁচ আবার সাত ইত্যাদি।
৩। কতিপয় ফকীহগণের মতে, মুস্তাফীয সেই ধরনের হাদীস যার অনুসরণকারীগণ বর্ণনাকারীগর সংখ্যা গণনা না করে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে নেয়। আর মাশহুর হল এমন হাদীস যা অনুসারীগণ বর্ণনাকারীর সংখ্যার উপর গুরুত্বারোপ করে তা গ্রহণ করে থাকে।
মাশহুর প্রধানত দু'প্রকারঃ ক. সাধারণের নিকট মাশহুর এবং খ. আলেমদের নিকট মাশহুর।
ক. সাধারণের নিকট হাদীস মাশহুর হওয়ার কোনো মূল্য নেই। তাদের নিকট অনেক জাল হাদীসও মাশহুর, যেমনঃ
«حُبُّ الْوَطَنِ مِنَ الْإِيمَانِ»
"দেশ প্রেম ঈমানের অংশ"।
সাধারণ লোকেরা এ হাদীসকে সহি হিসেবে জানে, অথচ সহী নয়। তার অর্থও ভুল, কারণ দেশপ্রেম গোঁড়ামী ও সাম্প্রদায়িকতা। তাই
তাদের নিকট মাশহুর হাদীস মূল্যহীন। এ প্রকার হাদীসের উপর অনেক মুহাদ্দীস স্বতন্ত্র কিতাব লিখেছেন, যেমনঃ
"تمييز الطيب من الخبيث فيما يدور على ألسنة الناس من الحديث". "المقاصد الحسنة في الأحاديث المشتهرة كشف الخفا ومزيل الألباس فيما اشتهر من الأحاديث في ألسنة الناس"
খ. আলেমদের শ্রেণীভাগ হিসেবে তাদের নিকট প্রসিদ্ধ হাদীস বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়: মুহাদ্দিসদের নিকট মাশহুর, ফকিহদের নিকট মাশহুর, ভাষাবিদদের নিকট মাশহুর ইত্যাদি। যেমনঃ
«لَا يُقَادُ الْوَالِدُ بِالْوَلَدِ»
"সন্তানের কারণে পিতা থেকে কিসাস নেয়া হবে না"¹⁶³। এ হাদীস কুরআন বিরোধী। কারণ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ
) وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنفَ بِالْأَنفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصِ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةً لَّهُ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ ٤٥ ) [المائدة: ٤٥]
"আর আমি এতে তাদের উপর অবধারিত করেছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান ও দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমের বিনিময়ে সমপরিমাণ জখম। অতঃপর যে তা ক্ষমা করে দেবে, তার জন্য তা কাফফারা হবে। আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম"¹⁶⁴。
এ আয়াতে কিসাস থেকে পিতাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেনঃ
) يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنثَى بِالْأُنثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٍ فَاتَّبَاعُ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَنُ ذَلِكَ تَخْفِيفَ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةً فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ ۱۷۸ ) [البقرة: ۱۷৮]
“হে মুমিনগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের উপর 'কিসাস' ফরয করা হয়েছে। স্বাধীনের বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাস, নারীর বদলে নারী। তবে যাকে কিছুটা ক্ষমা করা হবে তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে, তাহলে সততার অনুসরণ করবে এবং সুন্দরভাবে তাকে
আদায় করে দেবে। এটি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে হালকাকরণ ও রহমত।
সুতরাং এরপর যে সীমালঙ্ঘন করবে, তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব"¹⁶⁵। এ হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত অপর সহী হাদীসেরও বিপরীত, যেমনঃ
«لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ زِنًا بَعْدَ إِحْصَانِ، أَوِ ارْتِدَادٍ بَعْدَ إِسْلَامٍ، أَوْ قَتْلِ نَفْسٍ بِغَيْرِ حَقٌّ، فَقُتِلَ بِهِ»
"তিনটি অপরাধের কোন একটি ব্যতীত মুসলিমের রক্ত হালাল নয়ঃ বিবাহের পর যেনা করা, অথবা ইসলামের পর মুরতাদ হওয়া, অথবা কাউকে বিনা অপরাধে হত্যা করা, এর বিনিময়ে হত্যা করা হবে"¹⁶⁶। এখানেও কিসাস থেকে পিতাকে মুক্ত রাখা হয়নি।
হুকুমঃ অতএব মাশহুর হাদীস কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী তাই গ্রহণীয় নয়।

টিকাঃ
¹⁶¹ নিয়তের হাদীস বর্ণনাকারী গ্রন্থকারগণ, যেমন বুখারী ও মুসলিম প্রমুখ।
¹⁶² হাদীসটি ইমাম বুখারী আবু হুরায়রা [হাদীস নং: ১৪] ও আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা [হাদীস নং: ১৫] থেকে দু'টি সনদে এবং ইমাম মুসলিম একটি সনদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী 'আনাস' থেকে দু'টি সনদ উল্লেখ করেছেন, তাই ইমাম মুসলিমের বর্ণনা উল্লেখ করেনি, কারণ মুসলিমও 'আনাসে'র ছাত্র কাতাদাহ, কাতাদার ছাত্র শু'বা সূত্রে বর্ণনা করেছেন। শু'বার ছাত্রদের থেকে বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা ভাগ হয়েছে। আনাস থেকে বর্ণিত মুসলিমের হাদীস নং: (৪৬)
¹⁶³ তিরমিযী: (১৪০০), দারা কুতনি: (৩২৫২)
¹⁶⁴ সূরা মায়েদা: (৪৫)
¹⁶⁵ সূরা বাকারা: (১৭৮)
¹⁶⁶ তিরমিযী: (২০৮৪)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00