📄 আসহাবে সুফ্ফা
যে সব সাহাবী সব সময় রাসূল (সাঃ)- এর সান্নিধ্যে থাকতেন অর্থাৎ রাসূলের (সাঃ)-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ছিলেন এবং তাঁর আদেশ নিষেধ শুনতেন এবং মুখস্থ করতেন এই স্বল্প সংখ্যক সাহাবীকে 'আসহাবে সুফফা' বলে¹³²। অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, রাসুল (সঃ) এর সাহাবীদের ভেতর ৭০ (সত্তর) জন সাহাবী ছিলেন যারা নিজেদের জীবনকে ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেন। তাদেরকে আসহাবে সুফফা বলা হতো। মসজিদে নববীর উঠোন ছাড়া তাদের মাথা গুজবার দ্বিতীয় কোন স্থান ছিল না। দুনিয়ায় তাদের মালিকানায় এক টুকরো কাপড় ছাড়া কিছুই ছিল না। এমন উৎসর্গিত প্রাণের কথা কল্পনাও করা যায়? তারা দিনের বেলা প্রয়োজনে জংগলে গিয়ে কাঠ কেটে আনতেন এবং তা বিক্রি করে নিজদের ভরণ পোষণ চালাতেন। এমন কি এ থেকে আল্লাহর পথেও ব্যয় করতেন।
আসহাবে সুফফার উল্লেখযোগ্য ২৪ জন সদস্য
১। আবু হুরায়রা (রাঃ) (মৃ ৫৭ হি)
২। আবু জর গিফারী (রাঃ) (মৃ ৩২ হি)
৩। কাব ইবনে মালেক আল আনসারী (রাঃ) (মৃ ৩৪ হি)
৪। সালমান ফারসী (রাঃ) (মৃ ৩৪ হি)
৫। হানজালা ইবনে আবু আমির (রাঃ)
৬। হারিসা ইবনে নুমান (রাঃ)
৭। হুজায়ফা ইবনুল য়ামান (রাঃ)
৮। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)
৯। সুহায়ব ইবনে সিনান রুমি (রাঃ)
১০। সালেম মাওলা আবি হুজায়ফা (রাঃ)
১১। বিলাল বিন রাবাহ (রাঃ)
১২। সা'দ বিন মালিক আবু সাইদ খুদরী (রাঃ)
১৩। আবু উবায়দাঃ 'আমির ইবনুল জাররাহ (রাঃ)
১৪। মিকদাদ ইবনে আমের (রাঃ)
১৫। আবু মারছাদ (রাঃ)
১৬। আবু লুবাবা (রাঃ)
১৭। কাব ইবনে আমর (রাঃ)
১৮। আবদুল্লাহ ইবনে উনায়স (রাঃ)
১৯। আবু দ্দারদা (রাঃ) (মৃ ৩২ হি)
২০। ছাওবান [মাওলা রাসুলিল্লাহ (সঃ)] (রাঃ)
২১। সালিম ইবনে উমায়ের (রাঃ)
২২। খাব্বাব ইবনে আরাও (রাঃ)
২৩। মিসতাহ ইবনে উছাছা (রাঃ)
২৪। ওয়াছিলা ইবনুল আসকা (রাঃ)। (তথ্যসূত্রঃ হাদীসের পরিচয়, জিলহজ্ব আলী, সুহৃদ প্রকাশন, পৃষ্ঠা নং - ৪২)¹³³。
টিকাঃ
¹³² হাদীসের পরিচয়, জিলহজ্ব আলী, সুহৃদ প্রকাশন, পৃষ্ঠা নং - ১৩
¹³³ হাদীসের পরিচয়, জিলহজ্ব আলী, সুহৃদ প্রকাশন, পৃষ্ঠা নং - ৪২
📄 মুহাদ্দিস (محدث)
'মুহাদ্দিস' আরবী শব্দ, বাংলা অর্থ বর্ণনাকারী বা বক্তা। 'মুহাদ্দিস' (مُحَدَّثُ) কর্তাবাচক বিশেষ্য, এ শব্দের আদেশসূচক
ক্রিয়া দ্বারা আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করেছেন। হাদীসের পঠন-পাঠনকে যারা পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন, তাদেরকে পরিভাষায় مُحَدّث 'মুহাদ্দিস' বলা হয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি হাদীস চর্চা করেন এবং বহু সংখ্যক হাদীসের সনদ ও মতন সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখেন তাঁকে মুহাদ্দিস বলে। অন্যভাবে বলা যায় যে, যিনি হাদীস শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ যিনি হাদীস চর্চা করেন এবং বহু সংখ্যক হাদীসের সনদ মতন সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখেন তাঁকেই মুহাদ্দিস বলে। মুহাদ্দিসগণ হাদীস শাস্ত্রের ওপর গবেষণায় নিয়োজিত থাকেন। যেহেতু 'মুহাদ্দিস' কর্তাবাচক বিশেষ্য, এ শব্দের আদেশসূচক ক্রিয়া দ্বারা আল্লাহ'র নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করেছেন। ইরশাদ হচ্ছেঃ
وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ ۱۱ ) [الضحى: ۱۱
"আর আপনার রবের অনুগ্রহ আপনি বর্ণনা করুন"।
অর্থাৎ রিসালাত ও নবুওয়ত সবচেয়ে বড় নিয়ামত, অতএব যে রিসালাত দিয়ে আপনাকে প্রেরণ করা হয়েছে তা পৌঁছে দিন, আর যে নবুওয়ত আপনাকে দেওয়া হয়েছে তা বর্ণনা করুন। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'মুহাদ্দিস', কারণ তিনি কুরআন ও হাদীস বর্ণনা করে রিসালাত ও নবুওয়তের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। পরবর্তীতে শুধু হাদীস বর্ণনাকারীদের মুহাদ্দিস বলা হয়। এ
পরিভাষা সাহাবীদের যুগেও ছিল, আব্দুল্লাহ ইন্ন ওমর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে বলেনঃ
وَقَدْ بَلَغَنِي أَنَّكَ مُحَدِّثُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ذَلِكَ
"আমার নিকট পৌঁছেছে যে, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অমুক বিষয়ে বর্ণনা করেন"?
অতএব সনদে বিদ্যমান সকল রাবী মুহাদ্দিস। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম, সমর্থন ও গুণগানকে যথাযথ সংরক্ষণ ও বর্ণনা করেন।
📄 শায়খ (شيخ)
'শায়খ' আরবী শব্দ, বাংলা অর্থ বৃদ্ধ ও বয়স্ক। সাধারণত পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স হলে শায়খ বলা হয়। তবে শায়খ দ্বারা হাদীসের উস্তাদ ও রাবি দ্বারা শায়খের ছাত্রকে বুঝিয়েছি。
শায়খ ও রাবী আপেক্ষিক শব্দ। মূলতঃ যিনি হাদীস শিক্ষা দেন সেই রাবীকে তার শাগরিদের তুলনায় 'শায়খ' বলে।
অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, হাদীস শিক্ষাদাতা রাবীকে উনার শাগরিদের তুলনায় উনাকে শায়খ বলা হয়ে থাকে।
শায়খ ও রাবীর সম্পর্ক: শায়খ ও রাবী আপেক্ষিক শব্দ। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন হিসেবে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু রাবি, তাবেয়ি আ'রাজ হিসেবে তিনি শায়খ।
শাইখুল হাদীস: হাদীস শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী, দীর্ঘ দিন হাদীসের পঠন ও পাঠনে নিরত শায়খকে কেউ 'শায়খুল হাদীস' বলেন। তবে আমাদের ভারত উপমহাদেশে বুখারী শরীফের পাঠদানকারীকে 'শায়খুল হাদীস' বলা হয়।
📄 হাফিয (حافظ)
যিনি সনদ ও মতনের বৃত্তান্ত সহ এক লক্ষ হাদীস আয়ত্ব করেছেন তাঁকে হাফিয বলা হয়।
বিশদভাবে বলা যায় যে, যিনি সনদ ও মতনের সমস্ত বৃত্তান্ত সহ প্রায় একলক্ষ হাদীস আয়ত্ত বা মুখস্ত করেছেন তাকে 'হাফিয' বা 'হাফিযে হাদীস' বলে।
হাদীসের প্রসিদ্ধ হাফিয (حافظ) গণঃ
(১) হজরত আবু হুরায়রা (রা.): (আবদুর রহমান): ৭৮ বছর বয়সে ৫৯ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তার বর্ণিত বা
রিওয়ায়াতকৃত হাদীসের সংখ্যা ৫৩৭৪ এবং তার ছাত্র সংখ্যা ৮০০ পর্যন্ত।
(২) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.): ৭১ বছর বয়সে ৬৮ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তার রিওয়ায়াতকৃত হাদীসের সংখ্যা ১৬৬০।
(৩) হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.): ৬৭ বছর বয়সে ৫৮ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তার রিওয়ায়াতকৃত হাদীসের সংখ্যা ২২১০।
(৪) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা.): ৭৪ বছর বয়সে ৭৩ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ১৬৩০।
(৫) হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.): ৯৪ বছর বয়সে ৭৮ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তার রিওয়ায়াতকৃত হাদীসের সংখ্যা ১৫৬০।
(৬) হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.): ১০৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তার রিওয়ায়াতকৃত হাদীসের সংখ্যা ১২৮৬।
(৭) হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.): ৮৪ বছর বয়সে ৭৪ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ১১৭০।
এই কজন মহান সাহাবীর প্রত্যেকেরই এক হাজারের অধিক হাদীস মুখস্থ ছিল। তাছাড়া হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (মৃঃ ৬৩ হিজরী), হজরত আলী (মৃঃ ৪০ হিজরী) এবং উমার ফারুক (মৃঃ ২৩ হিজরী) রাদিয়াল্লাহু আনহুম সেসব সাহাবীর অন্তর্ভুক্ত যাদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৫০০ থেকে এক হাজারের মধ্যে। অনুরূপভাবে হজরত আবু বকর (মৃঃ ১৩ হিজরী), হজরত উসমান (মৃঃ ৩৬ হিজরী), হজরত উম্মে সালমা (মৃঃ ৫৯ হিজরী), হজরত আবু মূসা আশআরী (মৃঃ ৫২ হিজরী), হজরত আবু যার গিফারি (মৃঃ ৩২ হিজরী), হজরত আবু আইয়ুব আনছারি (মৃঃ ৫১ হিজরী) রাদিআল্লাহু আনহুম থেকে একশতের অধিক এবং পাঁচশতের কম হাদীস বর্ণিত আছে।
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস ১৪শ' বছর পরও আমাদের মাঝে আলোকবিস্তার করছে হাদীসের মহান হাফেজদের কারণে। তাদের কাছ থেকে যারা হাদীস সংগ্রহ করেছেন তাদের ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এসব মহান ব্যক্তি হিকমাত ও হেদায়াতের এই উৎসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে মেহনত করেছেন তা অতুলনীয়।