📄 আদালত
মানুষের ভিতরের যে আদিম শক্তি তাকে 'তাকওয়া' ও 'মরুওত' অবলম্বন করতে (এবং মিথ্যা আচরণ থেকে বিরত রাখতে) উদ্বুদ্ধ করে তাকে 'আদালত' বলে। 'তাকওয়া' অর্থে এখানে শিরক, বিদাআত ফিছক ও প্রকৃতি কবীরা এবং বারবার করা সগীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাকে বুঝায়, 'মরুওত' সর্বপ্রকার
বদ রসম রেওয়াজ থেকে দূরে থাকাকে বুঝায়' যদিও তা মুবাহ হয়। যেমনঃ উদাহরণে পেশ করা মিসওয়াকের হাদীসে ইমাম বুখারীর উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইব্ন ইউসুফ, তার উস্তাদ মালিক, তার উস্তাদ আবুয যিনাদ এবং তার উস্তাদ আ'রাজ সবাই আদিল এবং একাধিক মুহাদ্দিস তাদের আদালত সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।
অতএব সনদে বিদ্যমান সকল রাবীর মধ্যে দ্বিতীয় শর্ত বিদ্যমান। উল্লেখ্য, সকল সাহাবী আদিল, কারণ তাদের আদালত প্রসঙ্গে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাক্ষী দিয়েছেন, তাদের সাক্ষীর পর কারো সাক্ষীর প্রয়োজন নেই। আরও বিস্তারিবত ভাবে বলা যায় যে, যে সুদৃঢ় শক্তি মানুষকে তাক্বওয়া ও মরুওওয়াত অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করে, তাকে আদালত বলে।
তাক্বওয়া অর্থে এখানে শিরক প্রভৃতি কবীরা গুণাহ্ এবং পুনঃ পুনঃ ছগীরা গুণাহ্ করা হতে, হাদীস শরীফ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলা থেকে, সাধারণ কাজ-কারবারে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়া থেকে, অপরিচিত হওয়া থেকে, বে-আমল-ফাসিক, বদ্ আক্বীদা ও বিদয়াতী আমল থেকেও বেঁচে থাকাকে বুঝায়। মরুওয়াত অর্থে অশোভন বা অভদ্রোচিত, অশালীন, অশ্লীল, কুরুচীসম্পন্ন এমনকি অপছন্দনীয় কথা ও কাজ হতে দূরে থাকাকে বুঝায়। যথা হাটে-বাজারে প্রকাশ্যে পানাহার করা বা রাস্তাঘাটে ইস্তিঞ্জা করা ইত্যাদি। এরূপ কার্য করেন এমন ব্যক্তির হাদীস সহীহ নয়।
📄 যব্ত (ضبط) ও যাবিত (ضابط)
ضبط ক্রিয়াবিশেষ্য, আভিধানিক অর্থ নিয়ন্ত্রণ। এ থেকে যিনি শায়খ থেকে হাদীস শ্রবণ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন, তাকে ضابط বলা হয়।
'যাবিত' কর্তাবাচক বিশেষ্য, অর্থ সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণকারী। যবত হলো সেই শক্তি যা মানুষের শ্রুত ও লিখিত জিনিসের বিন্যাস থেকে রক্ষা করে অর্থাৎ স্মৃতিপটে জাগরিত করে হুবহু যখন তখন অপরের নিকট পৌছাতে পারে।
যবত )ضبط( এর পারিভাষিক অর্থ: শায়খ থেকে শ্রবণ করা হাদীস হ্রাস, বৃদ্ধি ও বিকৃতি ব্যতীত অপরের নিকট পৌঁছে দেওয়াই যবত। যবত দুই অবস্থায় থাকা জরুরীঃ শ্রবণ করার সময় ও বর্ণনা করার সময়।
শ্রবণ করার সময় দ্বাবত যেমন, শায়খের হাদীস মনোযোগসহ শ্রবণ করা ও তার মুখ নিঃসৃত প্রতিটি শব্দ যথাযথ সংরক্ষণ করা। এ প্রকার যবতকে ضبط عند التحمل বলা হয়, অর্থাৎ হাদীস গ্রহণ করার সময় দ্বাবত। বর্ণনা করার সময় দ্বাবত যেমন, শায়খ থেকে শ্রবণকৃত হাদীস রাবির নিকট কোনো প্রকার হ্রাস, বৃদ্ধি ও বিকৃতি ব্যতীত বর্ণনা করা, ভুল হলেও কম। এ প্রকার যবতকে ضبط عند الأداء বলা হয়, তথা বর্ণনা করার সময় যবত। এ দুই অবস্থায়
দাবত সম্পন্ন রাবিকে যাবিত (ضابط) বলা হয়। বিষয়টি উদাহরনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা যেতে পারেঃ
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
( أَقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ١ خَلَقَ الْإِنسَنَ مِنْ عَلَقٍ ٢ أَقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ 3 الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ٤ ) [العلق: ١, ٤]
"পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়, আর তোমার রব মহামহিম। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন”। [সূরা আলাক: (১-৪)]
আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে প্রথম বলেছেন পড়, অতঃপর বলেছেনঃ "যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন”। অর্থাৎ তোমরা স্মৃতি শক্তি থেকে পড়, যদি স্মৃতি শক্তিতে না থাকে, তাহলে তোমার লিখনি থেকে পড়। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা 'যবত' ও 'যাবিত' দু'টি শব্দ বুঝতে পারলাম।
📄 সিকায় (ثقة)
যে ব্যক্তির মধ্যে আ'দল গুণ পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যাবে তাকে 'সিকাহ' বলে। অর্থাৎ যে ব্যক্তির মধ্যে আদালত ও যবত উভয় গুণ পূর্ণভাবে বিদ্যমান তাকে সিক্কাহ্ রাবী বলে।
উদাহরণে পেশকৃত মিসওয়াকের হাদীসে সকল রাবি সিকাহ। তাদের বিরোধিতা করে তাদের চেয়ে অধিক সেকাহ রাবি কোনো হাদীস বর্ণনা করেনি।
📄 আসহাবে সুফ্ফা
যে সব সাহাবী সব সময় রাসূল (সাঃ)- এর সান্নিধ্যে থাকতেন অর্থাৎ রাসূলের (সাঃ)-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ছিলেন এবং তাঁর আদেশ নিষেধ শুনতেন এবং মুখস্থ করতেন এই স্বল্প সংখ্যক সাহাবীকে 'আসহাবে সুফফা' বলে¹³²। অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, রাসুল (সঃ) এর সাহাবীদের ভেতর ৭০ (সত্তর) জন সাহাবী ছিলেন যারা নিজেদের জীবনকে ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেন। তাদেরকে আসহাবে সুফফা বলা হতো। মসজিদে নববীর উঠোন ছাড়া তাদের মাথা গুজবার দ্বিতীয় কোন স্থান ছিল না। দুনিয়ায় তাদের মালিকানায় এক টুকরো কাপড় ছাড়া কিছুই ছিল না। এমন উৎসর্গিত প্রাণের কথা কল্পনাও করা যায়? তারা দিনের বেলা প্রয়োজনে জংগলে গিয়ে কাঠ কেটে আনতেন এবং তা বিক্রি করে নিজদের ভরণ পোষণ চালাতেন। এমন কি এ থেকে আল্লাহর পথেও ব্যয় করতেন।
আসহাবে সুফফার উল্লেখযোগ্য ২৪ জন সদস্য
১। আবু হুরায়রা (রাঃ) (মৃ ৫৭ হি)
২। আবু জর গিফারী (রাঃ) (মৃ ৩২ হি)
৩। কাব ইবনে মালেক আল আনসারী (রাঃ) (মৃ ৩৪ হি)
৪। সালমান ফারসী (রাঃ) (মৃ ৩৪ হি)
৫। হানজালা ইবনে আবু আমির (রাঃ)
৬। হারিসা ইবনে নুমান (রাঃ)
৭। হুজায়ফা ইবনুল য়ামান (রাঃ)
৮। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)
৯। সুহায়ব ইবনে সিনান রুমি (রাঃ)
১০। সালেম মাওলা আবি হুজায়ফা (রাঃ)
১১। বিলাল বিন রাবাহ (রাঃ)
১২। সা'দ বিন মালিক আবু সাইদ খুদরী (রাঃ)
১৩। আবু উবায়দাঃ 'আমির ইবনুল জাররাহ (রাঃ)
১৪। মিকদাদ ইবনে আমের (রাঃ)
১৫। আবু মারছাদ (রাঃ)
১৬। আবু লুবাবা (রাঃ)
১৭। কাব ইবনে আমর (রাঃ)
১৮। আবদুল্লাহ ইবনে উনায়স (রাঃ)
১৯। আবু দ্দারদা (রাঃ) (মৃ ৩২ হি)
২০। ছাওবান [মাওলা রাসুলিল্লাহ (সঃ)] (রাঃ)
২১। সালিম ইবনে উমায়ের (রাঃ)
২২। খাব্বাব ইবনে আরাও (রাঃ)
২৩। মিসতাহ ইবনে উছাছা (রাঃ)
২৪। ওয়াছিলা ইবনুল আসকা (রাঃ)। (তথ্যসূত্রঃ হাদীসের পরিচয়, জিলহজ্ব আলী, সুহৃদ প্রকাশন, পৃষ্ঠা নং - ৪২)¹³³。
টিকাঃ
¹³² হাদীসের পরিচয়, জিলহজ্ব আলী, সুহৃদ প্রকাশন, পৃষ্ঠা নং - ১৩
¹³³ হাদীসের পরিচয়, জিলহজ্ব আলী, সুহৃদ প্রকাশন, পৃষ্ঠা নং - ৪২