📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 সিরাত

📄 সিরাত


হাদীসের মতন বা মূল বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যুক্তির কষ্টিপাথরে যে সমালোচনা করা হয় হাদীস বিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকে দিরায়াত বলে। "এটাকে হাদীস সমালোচনা যুক্তি-ভিত্তিক প্রক্রিয়ায়ো বলা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক রয়েছে। তবে এর সারকথা این যে। এতে হাদীসের মর্মকথা টুকুতে কোন ভুল, অসত্য, অবাস্তবতা এবং কোরআন ও সহীহ হাদীসের পরিপন্থী কিছু থাকলে এই পন্থার যাচাই-পরীক্ষায় তা ধরা পড়তে পারে না। অতএব কেবল মাত্র এই পদ্ধতিতে যাচাই করে কোন হাদীস উত্তীর্ণ পেলেই তা গ্রহণ করা যেতে পারে না। এই কারণে মূল হাদীস (মতন) - হাদীসের মর্মবাণীটুকু তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও বিবেচনার মানদন্ডে যাচাই করার উদ্দেশ্যে এই ‘দিরায়াত’ প্রক্রিয়ার প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। হাদীস যাচাই পরীক্ষার ব্যাপারে ‘দেরায়াত’ নীতির প্রয়োগ ‘রেওয়ায়েত’ নীতির মতই কোরআন ও হাদীস সম্মত। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই কেবলমাত্র ‘রেওয়ায়েতের উপর নির্ভরশীল কোণ কথা গ্রহণ বা বর্জনের সিদ্ধান্ত করিতে নিষেধ করেছেন। তিনি বরং দেরায়াত নীতির প্রয়োগ করতে কোরআনের বিভিন্ন স্থানে উৎসাহিত করেছেন।"¹⁰²
যেমন- মদিনার মুনাফিকগণ হযরত আয়েশা (রাঃ) এর নামে কুৎসা রটাচ্ছিল তখন কিছু সংখ্যক মুসলমানও কোন রকম বিচার বিবেচনা বাদেই তা বিশ্বাস করেন। এদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহপাক কোরআনের এই আয়াত নাযিল করেন “তোমরা যখন সে কথা শুনতে পেয়েছিলে তখন তোমরা (শুনে) কেন বললে না যে, এ ধরনের কথা বলা আমাদের কিছুতেই উচিত নয়। তখন বলা উচিত ছিল যে, আল্লাহ পবিত্র মহান, এ এক সুস্পষ্ট মিথ্যা কথা ও বিরাট দোষারোপ ছাড়া আর কিছুই নয়, এ কথা সত্য হয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।” [সূরা নূর - ৮১ আয়াত]। এখানে বলা হচ্ছে - যখন এ ধরনের অবিশ্বাস্য সংবাদ পৌছেছিল তখনই তা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয়া উচিৎ ছিল এবং এর প্রচার-প্রসার বন্ধ করাও জরুরী ছিল।
তাৎক্ষনিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জ্ঞানই দেরায়াত নীতির প্রয়োগ।
মূল নীতিসমূহঃ দিরায়াত প্রক্রিয়ার মূল নীতিগুলো হল-
১/ হাদীস-কোরআনের সুস্পষ্ট দলীলের বিপরীত হবে না।
২/ হাদীস-মুতাওয়াতের সূত্রে প্রমাণীত সুন্নাহের বিপরীত হবে না।
৩/ হাদীস-সাহাব্যে কিরামের সুস্পষ্ট ও অকাট্য ইজমার বিপরীত হবে না।
৪/ হাদীস-সুস্পষ্ট বিবেক বুদ্ধির বিপরীত হবে না।
৫/ হাদীস-শরীয়তের চির সমর্থিত ও সর্বসম্মত নীতির বিপরীত হবে না।
৬/ কোন হাদীস বিশুদ্ধ ও নির্ভুল গৃহীত হাদীসের বিপরীত হবে না।
৭/ হাদীসের ভাষা আরবী ভাষার রীতি নীতির বিপরীত হবে না। কেননা নবী করীম (সাঃ) কোন কথাই আরবী নীতির বিপরীত ভাষায় বলেন নি।
৮/ হাদীস-এমন কোন অর্থ প্রকাশ করবে না, যা অত্যন্ত হাস্যকর, নবীর মর্যাদা বিনষ্টকারী¹⁰³।

টিকাঃ
¹⁰² হাদীস সংকলনের ইতিহাস - মাওলানা আব্দুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী।
¹⁰³ হাদীসের পরিচয়, জিলহজ আলী, সুহৃদ প্রকাশন, পৃষ্ঠা নং- ১১

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 সনদ (سند)

📄 সনদ (سند)


হাদীসের মূল কথাটুকু যে সূত্রে ও যে বর্ণনা পরম্পরা ধারায় গ্রন্থ সংকলনকারী পর্যন্ত পৌছেছে তাকে ইলমে হাদীসের পরিভাষায় সনদ বলে। অর্থাৎ হাদীস-এর রাবীর পরস্পর বর্ণনা সূত্রকে সনদ বলে।
অন্যভাবে বলা যায় যে, সনদ বলতে হাদীসের সূত্র বা Reference বুঝানো হয়। হাদীসের বর্ণনাকারীদের তালিকা। এটি সাধারণত হাদীসের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়। সাধারনতঃ কোন হাদীস এর সনদ বর্ণনা করাকে ইসনাদ (أَسْنَادُ) বলে। অর্থাৎ মুখে মুখে হাদীসের সনদ আবৃতি করাকে 'ইসনাদ' বলে। কখনও কখনও ইসনাদ সনদ অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
সনদ বা বর্ণনাকারীদের গুণগত পার্থক্যের দিক দিয়ে হাদীসকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। প্রথম ভাগে সেই সব হাদীস, যা 'হাফেযে মুতকিন' (নির্ভুলভাবে স্মরণ রাখিতে সক্ষম হাদীসের এমন হাফেয) লোকদের মাধ্যমে বর্ণিত হইয়াছে। দ্বিতীয় সেই সব হাদীস, যার বর্ণনাকারী অপ্রসিদ্ধ এবং স্মরণ ও সতর্কতার মধ্যম মানের লোক।
আর তৃতীয় হচ্ছে সে সব হাদীস, যা বর্ণনা করেছে দুর্বল ও গ্রহণ অযোগ্য এবং অগ্রাহ্য লোকেরা¹⁰⁴।

টিকাঃ
¹⁰⁴ হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা নং - ৪৪ - ৪৬

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 সনদ (سند) ও মতন (متن)

📄 সনদ (سند) ও মতন (متن)


হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য সাহাবীগণের যুগ থেকে মুসলিম উম্মাহ বিভিন্ন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এগুলোর অন্যতম হলো সূত্র সংরক্ষণ ও সূত্র বর্ননার অপরিহার্যতা।
কেউ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নামে কিছু বললেই তাঁকে সর্বপ্রথম বলতে হতো, তিনি কার নিকট থেকে এই কথাটি সংগ্রহ করেছেন এবং তিনি কার নিকট থেকে তা শুনছেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরাকে সনদ বলা হয়। মুহাদ্দিসঘনের পরিভাষায় হাদীস বলতে দুটি অংশের সমন্বিত রূপকে বুঝায়। প্রথম অংথঃ হাদীসের সূত্র বা সনদ এবং দ্বিতীয় অংশঃ হাদীসের মূল
বক্তব্য বা মতন ¹³¹। সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনায় বলা যায় যে, হাদীসের দু'টি প্রধান অংশঃ একটি সনদ, অপরটি মতন। এ হাদীসে ইমাম বুখারীর উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইব্‌ন্ন ইউসুফ থেকে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু পর্যন্ত অংশকে 'সনদ' বলা হয়। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীসের অবশিষ্ট অংশকে এক 'মতন' বলা হয়।
হাদীসের মতন ও সনদ একটির সাথে অপরটি ওতপ্রোত জড়িত। সনদ ব্যতীত মতন হয় না, মতন থাকলে অবশ্যই তার সনদ আছে। তবে একটি 'সহীহ' হলে অপরটি 'সহীহ' হওয়া জরুরী নয়। কখনো সনদ সহীহ হয়, কারণ সহির সকল শর্ত তাতে বিদ্যমান, যেমন সনদ মুত্তাসিল, রাবিগণ আদিল ও দ্বাবিত, তবে মতন শায বা 'ইল্লতের কারণে সহী নয়। কখনো মতন সহীহ হয়, তবে রাবির দুর্বলতা বা ইনকিতা' (বর্ণনাপরম্পরা কাটা পড়া) এর কারণে সনদ সহীহ হয় না। সনদ ও মতন উভয় সহি হলে হাদীস সহীহ। এরূপ হাদীস সম্পর্কে আমরা দৃঢ়ভাবে বলবঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। গ্রন্থকারের উস্তাদকে সনদের শুরু এবং সাহাবীকে সনদের শেষ বলা হয়।

টিকাঃ
¹³¹ হাদীসের সনদ: মৌখিক বর্ননা বনাম পান্ডুলিপি নির্ভরতা ডঃ খন্দকার আ. ন. ম. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, ইন্টটিটিউট অব ইসলামিক এডুকেশন এন্ড রিসার্স জার্নাল ১ম খন্ড, ১ম সংখ্যা, জুন ২০০৬ সালে প্রকাশিত

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 রিজাল

📄 রিজাল


হাদীসের রাবী সমষ্টিকে ‘রিজাল’ বলে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00