📄 রাবী (راوي)
'রাবী' আরবী শব্দ, বাংলা অর্থ বর্ণনাকারী ও উদ্ধৃতকারী। হাদীসের পরিভাষায় সনদে বিদ্যমান প্রত্যেক ব্যক্তিকে
(রাবী) বলা হয়। অর্থাৎ হাদীস বা আসার বর্ণনাকারীকে ‘রাবী’ বলে। বস্তুতঃ রাবী (راوی) শব্দটি (روی) শব্দ থেকে উদ্ভূত ইসমে ফায়েলের সিগাহ্। এর মূল অর্থ হলো ভূমিকে পানি দ্বারা সিক্ত করা, পানি সরবরাহ করা, পানি সিঞ্চন করা, পিপাসা নিবারণ করা। তাই রাবীর অর্থ হলো পানি সরবরাহকারী, পিপাসা নিবারণকারী।
যেহেতু কোন বিষয়ের বর্ননা দানকারীরাও শ্রোতাদের ঔৎসুক্য জনিত পিপাসা নিয়ন্ত্রণ করেন পরবর্তী ব্যবহারে (راوی) শব্দটি বর্ননাকারীর অর্থেও ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তী ব্যবহারে (راوی) শব্দের আভিধানিক অর্থ বর্ননাকারী, বিবরণদাতা, কাহিনীকার ইত্যাদি করা হয়ে থাকে।
হাদীসের বর্ননাকারীদেরকে এই শেষোক্ত অর্থের প্রেক্ষিতেই রাবী হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। তবে ইলমে হাদীসের পরিভাষায় যারা কেবলমাত্র রাসূল (সাঃ) সাহাবায়ে কিরাম তাবেঈনদের কথা, কাজ ও অনুমোদন সংক্রান্ত বিষয়াদি বর্ননা করেন তাদেরকেই রাবী (راوی) বলা হয়। আর অন্য কারও কাছ থেকে বর্ননা করা হলে তাকে রাবী (راوی) বলা হয় না ¹⁰⁰। যেমনঃ ‘উসমান ইবন আবূ শায়বা (রঃ) হুযায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ أَبِي وَائِلٍ، عَنْ حُذَيْفَةَ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ يَشُوصُ فَاهُ بِالسَّوَاكِ
সাহাবী নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তাবে'ঈ সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন, এভাবে গ্রন্থকার পর্যন্ত সবাই বর্ণনা করেন, তাই সনদে বিদ্যমান প্রত্যেক ব্যক্তি রাবী ¹⁰¹। উদাহরণে পেশ করা মিসওয়াকের হাদীসে কয়েকজন রাবী রয়েছেন।
টিকাঃ
¹⁰⁰ আলী মুহাম্মাদ নসরকৃত আল নাহজুল হাদীস, পৃষ্ঠা নং- ২২
¹⁰¹ উজু অধ্যায় :: সহিহ বুখারী :: খন্ড ১ :: অধ্যায় ৪ :: হাদীস ২৪৬
📄 আসমউর রিজাল (الرجال اسماء)
যে শাস্ত্রে রাবীদের জীবন বৃত্তান্ত বর্ণনা করা হয়েছে তাকে ‘আসমাউর রিজাল’ বলে। আসমাউর রেজাল সম্পর্কে ডঃ স্প্রেনগার তার "লাইফ অব মুহাম্মদ।” গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেনঃ- "দুনিয়ায় এমন কোন জাতি দেখা যায়নি এবং আজও নেই যারা মুসলমানদের ন্যায় ‘আসমাউর রেজালের’ বিরাট তত্ত্ব ভান্ডার আবিষ্কার করেছে। আর এর বদৌলতে আজ পাঁচ লাখ লোকের বিবরণ জানা যেতে পারে।” (হাদীসের পরিচয়, সুহৃদ প্রকাশন)।
📄 সিরাত
হাদীসের মতন বা মূল বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যুক্তির কষ্টিপাথরে যে সমালোচনা করা হয় হাদীস বিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকে দিরায়াত বলে। "এটাকে হাদীস সমালোচনা যুক্তি-ভিত্তিক প্রক্রিয়ায়ো বলা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক রয়েছে। তবে এর সারকথা این যে। এতে হাদীসের মর্মকথা টুকুতে কোন ভুল, অসত্য, অবাস্তবতা এবং কোরআন ও সহীহ হাদীসের পরিপন্থী কিছু থাকলে এই পন্থার যাচাই-পরীক্ষায় তা ধরা পড়তে পারে না। অতএব কেবল মাত্র এই পদ্ধতিতে যাচাই করে কোন হাদীস উত্তীর্ণ পেলেই তা গ্রহণ করা যেতে পারে না। এই কারণে মূল হাদীস (মতন) - হাদীসের মর্মবাণীটুকু তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও বিবেচনার মানদন্ডে যাচাই করার উদ্দেশ্যে এই ‘দিরায়াত’ প্রক্রিয়ার প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। হাদীস যাচাই পরীক্ষার ব্যাপারে ‘দেরায়াত’ নীতির প্রয়োগ ‘রেওয়ায়েত’ নীতির মতই কোরআন ও হাদীস সম্মত। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই কেবলমাত্র ‘রেওয়ায়েতের উপর নির্ভরশীল কোণ কথা গ্রহণ বা বর্জনের সিদ্ধান্ত করিতে নিষেধ করেছেন। তিনি বরং দেরায়াত নীতির প্রয়োগ করতে কোরআনের বিভিন্ন স্থানে উৎসাহিত করেছেন।"¹⁰²
যেমন- মদিনার মুনাফিকগণ হযরত আয়েশা (রাঃ) এর নামে কুৎসা রটাচ্ছিল তখন কিছু সংখ্যক মুসলমানও কোন রকম বিচার বিবেচনা বাদেই তা বিশ্বাস করেন। এদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহপাক কোরআনের এই আয়াত নাযিল করেন “তোমরা যখন সে কথা শুনতে পেয়েছিলে তখন তোমরা (শুনে) কেন বললে না যে, এ ধরনের কথা বলা আমাদের কিছুতেই উচিত নয়। তখন বলা উচিত ছিল যে, আল্লাহ পবিত্র মহান, এ এক সুস্পষ্ট মিথ্যা কথা ও বিরাট দোষারোপ ছাড়া আর কিছুই নয়, এ কথা সত্য হয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।” [সূরা নূর - ৮১ আয়াত]। এখানে বলা হচ্ছে - যখন এ ধরনের অবিশ্বাস্য সংবাদ পৌছেছিল তখনই তা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয়া উচিৎ ছিল এবং এর প্রচার-প্রসার বন্ধ করাও জরুরী ছিল।
তাৎক্ষনিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জ্ঞানই দেরায়াত নীতির প্রয়োগ।
মূল নীতিসমূহঃ দিরায়াত প্রক্রিয়ার মূল নীতিগুলো হল-
১/ হাদীস-কোরআনের সুস্পষ্ট দলীলের বিপরীত হবে না।
২/ হাদীস-মুতাওয়াতের সূত্রে প্রমাণীত সুন্নাহের বিপরীত হবে না।
৩/ হাদীস-সাহাব্যে কিরামের সুস্পষ্ট ও অকাট্য ইজমার বিপরীত হবে না।
৪/ হাদীস-সুস্পষ্ট বিবেক বুদ্ধির বিপরীত হবে না।
৫/ হাদীস-শরীয়তের চির সমর্থিত ও সর্বসম্মত নীতির বিপরীত হবে না।
৬/ কোন হাদীস বিশুদ্ধ ও নির্ভুল গৃহীত হাদীসের বিপরীত হবে না।
৭/ হাদীসের ভাষা আরবী ভাষার রীতি নীতির বিপরীত হবে না। কেননা নবী করীম (সাঃ) কোন কথাই আরবী নীতির বিপরীত ভাষায় বলেন নি।
৮/ হাদীস-এমন কোন অর্থ প্রকাশ করবে না, যা অত্যন্ত হাস্যকর, নবীর মর্যাদা বিনষ্টকারী¹⁰³।
টিকাঃ
¹⁰² হাদীস সংকলনের ইতিহাস - মাওলানা আব্দুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী।
¹⁰³ হাদীসের পরিচয়, জিলহজ আলী, সুহৃদ প্রকাশন, পৃষ্ঠা নং- ১১
📄 সনদ (سند)
হাদীসের মূল কথাটুকু যে সূত্রে ও যে বর্ণনা পরম্পরা ধারায় গ্রন্থ সংকলনকারী পর্যন্ত পৌছেছে তাকে ইলমে হাদীসের পরিভাষায় সনদ বলে। অর্থাৎ হাদীস-এর রাবীর পরস্পর বর্ণনা সূত্রকে সনদ বলে।
অন্যভাবে বলা যায় যে, সনদ বলতে হাদীসের সূত্র বা Reference বুঝানো হয়। হাদীসের বর্ণনাকারীদের তালিকা। এটি সাধারণত হাদীসের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়। সাধারনতঃ কোন হাদীস এর সনদ বর্ণনা করাকে ইসনাদ (أَسْنَادُ) বলে। অর্থাৎ মুখে মুখে হাদীসের সনদ আবৃতি করাকে 'ইসনাদ' বলে। কখনও কখনও ইসনাদ সনদ অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
সনদ বা বর্ণনাকারীদের গুণগত পার্থক্যের দিক দিয়ে হাদীসকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। প্রথম ভাগে সেই সব হাদীস, যা 'হাফেযে মুতকিন' (নির্ভুলভাবে স্মরণ রাখিতে সক্ষম হাদীসের এমন হাফেয) লোকদের মাধ্যমে বর্ণিত হইয়াছে। দ্বিতীয় সেই সব হাদীস, যার বর্ণনাকারী অপ্রসিদ্ধ এবং স্মরণ ও সতর্কতার মধ্যম মানের লোক।
আর তৃতীয় হচ্ছে সে সব হাদীস, যা বর্ণনা করেছে দুর্বল ও গ্রহণ অযোগ্য এবং অগ্রাহ্য লোকেরা¹⁰⁴।
টিকাঃ
¹⁰⁴ হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা নং - ৪৪ - ৪৬